content
stringlengths
0
129k
প্রায় প্রতিটি স্ট্যাটাসেই হাজারখানেক লাইক, পাঁচ শতাধিক কমেন্ট
প্রায় তার সঙ্গে একই সময়ে পনের মিনিট আগের দেওয়া স্ট্যাটাসটি এমন: 'আজ আকাশের মন ভালো নেই'
সেখানে ইতোমধ্যে কমেন্ট এসেছে প্রচুর
যেমন- আমার নামও তো আকাশ, তুমি জানলে কী করে যে আমার মন ভালো নেই
আরেকজন লিখেছে, এতো সুন্দর কবিতা দীর্ঘদিন পর পড়লাম
তোমাকে, সালাম কবি
ফেসবুক ব্যবহারে চটপটে না হলেও, আজমত বুঝতে পারেন এতোক্ষণ পর আসলে একটি ফেক অ্যাকাউন্ট কমেন্ট করেছে তাকে
ব্লক করে বের হয়ে আসেন
ব্যাপারটি তিনি আগেও খেয়াল করেছেন যে মেয়েদের ছবি দেওয়া ফেক অ্যাকাউন্টে প্রচুর লাইক-কমেন্ট থাকে
নিজের মনকে প্ররোচিত করতে চেয়েছেন ফেক অ্যাকাউন্ট খুলতে
কিন্তু অমন সেলিব্রেটি তো তিনি হতে চান না, তিনি চান তার গুরুত্বপূর্ণ মতামত নিয়ে ফেসবুকে আলোচনা হোক
হাজার হোক তার অভিজ্ঞতা কম নয়
এই যেমন ক্রিকেট নিয়ে তুমুল হই চই হয়, ক্রিকেট যে জাতীয়তাবাদী ঘৃণা প্রকাশের একটি অন্যতম মাধ্যম হয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রায় সাতশো শব্দের একটি লেখা দিয়ছিলেন
সর্ব-সাকুল্যে পনেরটি লাইক পড়েছিল, কেউ কমেন্ট করেনি
কিংবা সাব্বির রহমান যে তিন নম্বরে খেলার ব্যাটসম্যান নয়, তাও তিনি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, কেন সাব্বিরের চাইতে মমিনুল হক তিন নম্বরে ভালো ব্যাটিং করবে
তার পোস্টে রেসপন্স না থাকলেও এক ফেসবুক সেলিব্রেটির সাব্বিরকে গালি দেওয়া পোস্টে দুই হাজার লাইক দেখে আজমতের ভিমরি খাওয়ার দশা হয়েছিল
ঘৃণার বাক্য যে জনপ্রিয়তা তৈরি করে তা অবশ্য ভালোই জানতেন তিনি
তিনিও গালি-গালাজ দিয়ে চেষ্টা করে দেখেছেন, তাতেও কারও নজরে আসতে পারেন ৎনি
মাঝেমধ্যে তিনি ভাবেন, আদৌ কি তাকে দেখছে ফ্রেন্ডলিস্টের পাঁচ হাজার মানুষ? এতোটা অবহেলা তো প্রাপ্য নয়
দুর্দমনীয় প্রতাপ নিয়ে চাকরি করেছেন, সচিবালয় কাঁপত তাকে দেখে, ঘুষ তো দূরে থাক, কোনোদিন একটা উপহার পর্যন্ত নেননি
দিনের পর দিন বিসিএস দিয়ে গেছেন, তারপর এই ট্রেনিং সেই ট্রেনিং করতে করতে দেখেছেন বিয়ের বয়স পার হয়ে গেছে
এরপর থাকতে পারতেন ছোটভাইয়ের সংসারে, কিন্তু একাই থাকে
এমন একজন সৎ, আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষ কী করে এতোটা আড়ালে চলে যেতে পারে যে সামান্য ফেসবুকের চ্যাংড়া ছেলেপেলেও তার চেয়ে বেশি মনোযোগ পাবে?
ফেসবুক থেকে হতাশা নিয়ে বের হয়েই দেখতে পান আবার তার পায়ের কাছে চলে এসেছে সিগারেটের দ্বিখণ্ডিত টুকরো
খানিক আগেই দুটো টুকরা ছুড়ে মেরেছিলেন
অথচ লাইক-কমেন্ট আসতে না চাইলেও, জড় মূল্যহীন খণ্ডিত অংশ দুটো ঠিক ঘুরে ফিরে যেনো আজমতের দুরবস্থা দেখার জন্য চলে এসেছে
সঙ্গত কারণেই আজমত ভাবতে পারেন, এ দুটো অবশ্যই আগের টুকরো নয় বরং নতুন করে কেউ এভাবে ভেঙে রেখে গেছে
টং দোকানের ছেলের কাছে জানতে চান তিনি, এই কাণ্ড কে করছে বারবার?
: কোন কাণ্ড?
: এই যে, বারবার সিগারেট ফেলে যাচ্ছে এভাবে?
: এতো কাস্টোমারের মাঝে কে করছে, দেখার খেয়াল থাকে?
: তারপরেও, দাম দিয়ে কিনে এভাবে ফেলে যাবে? অর্থের অপচয় যারা করে, তারা মানুষ? রাস্তায় কতোজন না খেয়ে আছে
টং দোকানের ছেলেটি অবাক চোখে তাকিয়ে বলে, গত এক ঘণ্টায় এখানে আপনি ছাড়া তো আর কেউ আসে নাই
বিহ্বল বোধ করেন আজমত
খেয়াল করেন, তিনি ছেলেটির সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলেছেন, তা মূলত ফেসবুকীয় ভাষা
বিশেষ করে, খেলোয়াড় ও টিভি তারকাদের স্ট্যাটাসে-ছবিতে এ ধরনের কমেন্ট দেখা যায়- আপনারা কীভাবে পারলেন, এতো টাকা অপচয় করে ফাইভ-স্টার হোটেলে গিয়ে ফূর্তি করতে, কতো মানুষ না খেয়ে থাকে জানেন? সুতরাং, ছেলেটিকে বলা কথাটি যে সম্পূর্ণ অপাত্রে বলা হয়েছে, তা বুঝতে পেরে লজ্জিত বোধ করেন তিনি
ভাবনায় ছেদ ঘটে তার অস্থির আঙুল পুনরায় মোবাইলে সচল হলে
দেখতে পান, খানিক আগে পোস্ট করা ছবিটি নেই
তবে কি, ফেক অ্যাকাউন্ট ব্লক করতে গিয়ে স্ট্যাটাস ডিলেট করে দিয়েছেন? এমন ভুল তো হওয়ার কথা নয়
গ্যালারি থেকে আপলোড করতে গিয়ে চমকে যান
কোথাও খুঁজে পান না ছবিটি
ফেসবুক থেকে কোনোভাবে মুছে গেলেও গ্যালারি থেকে কীভাবে গায়েব হয়ে যাবে? এ তো ছবি, ডুমুর ফুল নয়- আপনমনে বিড়বিড় করে বলেন
আবার পড়ে থাকা সিগারেটের ছবিটি তুলে টুকরো দুটো আগের জায়গাতেই ছুড়ে মারেন
ফের তিনি তাকান, পায়ের দিকে
টুকরো দুটো দেখতে পান না
সুতরাং নিশ্চিত হয়ে একই ক্যাপশন দিয়ে পুনরায় ছবিটি পোস্ট করে ফেসবুক স্ক্রল করতে থাকেন
কবিদের ভেতর আবার ঝগড়া লেগেছে
কোনো এক পত্রিকার সংকলন বের হয়েছে
যারা বাদ পড়েছে তারা হুলস্থুল সব কাণ্ড করছে ফেসবুকে
যারা সংকলনে আছে, তারাও খানিকটা বিব্রত
কবিদের ঝামেলার সুযোগ নিয়ে মাঝে একবার আলোচনায় আসার চেষ্টা করেছিলেন তিনি
ছন্দ নিয়ে ঝগড়া লেগেছিল তরুণ ও সিনিয়র কবিদের মাঝে
বেশ তাচ্ছিল্য নিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তিনিও
কয়েকজন তরুণ কবির পোস্টে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন, কিন্তু কেউ ফিরেও তাকায়নি
গল্পকার-কথাসাহিত্যিকদেরও খোঁচানোর চেষ্টা কম করেননি
বাংলা কথা-সাহিত্য কোথায় যাচ্ছে, এই শিরোনামে লিখেছিলেন- আজকাল ছেলেপেলে কেউ গল্প লিখতে পারে? সব তো বানোয়াট, বাক্যের খেলা দেখাতে গিয়ে মূল গল্পের খোঁজ নেই, কেউ কেউ তো আবার হুমায়ূনের অন্ধ অনুকরণ করে বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছে, এক লাইন শুদ্ধ বাক্য লিখতে পারে না, অথচ বইয়ের মুদ্রণ হচ্ছে একের পর এক, নিজেরাই নিজেদের বই কিনিয়ে বেস্ট-সেলার হচ্ছে
সর্বোচ্চ ত্রিশটি লাইক পড়েছিল সেই স্ট্যাটাসে
অথচ একই কথা যদি অন্য কেউ বলত, তবে ঠিক সয়লাব হয়ে যেত হোম ফিড
নোটিফিকেশনের শব্দ পান
সেই ফেক অ্যাকাউন্ট ফের কমেন্ট করেছে সিগারেটের ছবিটিতে
এবার একটু ভিন্নভাবে
লেখা- আপনি, আমার মনের কথা কীভাবে জানলেন? আসলেই তো দ্বিখণ্ডিত জীবন আমাদের
কোনটা যে আসল, নিজেরাই টের পাই না
আপনি কী পান?
এবার আর অ্যাঞ্জেল হিমি অর্থাৎ ফেক অ্যাকাউন্টটি ব্লক দেন না আজমত
বরং চিন্তায় ডুবে যান
তিনি নিজেও আসলে খণ্ডিত জীবন-যাপন করছেন
এক অংশ ফেসবুকে, আরেক অংশ তার ছোট্ট ঘরে
এ কথা সত্য যে ফেসবুকের ভাগ প্রায় তাকে গ্রাস করে ফেলেছে
বাকি অংশের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াও দায় এখন
পারিবারিক জীবনে যোগাযোগ বলতে, তার ভাইঝি আর ভাগ্নের সঙ্গে ফেসবুক চ্যাট
তার নিয়মিত দুজন লাইকার
এজন্য বেশ পছন্দ করেন তাদের
এই জায়গাতেও যে ফেসবুক প্রাধান্য বিস্তার করছে তা বুঝতে পেরে শরীর ছেড়ে ঘাম আসে আজমতের
অবশ্য ফেসবুক ব্যবহার করা ছাড়া তিনি করবেনটা কী? আবার চাইলে কোনো প্রাইভেট ফার্মে জয়েন করতে পারেন- কিন্তু সারাজীবন তো কাজে কাজে গেলো
আর কতো? বিয়ে থা করেননি, প্রাক্তন প্রেমিকাদের ছেলে-মেয়ের বিয়ে পর্যন্ত হয়ে গেছে
একা বাসা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই যে যার জীবনে ব্যস্ত, তিনি চাইলেও তো চক্র থেকে বের হতে পারবেন না
কমেন্টে উত্তর দিতে গিয়ে দেখেন, পোস্টটি আবার মুছে গেছে জাদুবলে
পায়ের কাছে ঠিক হাজির হয়েছে সিগারেটের দুই টুকরো
বারবার কেন ফিরে আসছে সিগারেটের টুকরো দুটো? তিনি সিদ্ধান্ত নেন, আবারও ছবি তুলে পোস্ট করবেন
এবার অবশ্য ঝোপের দিকে ছুড়ে দেন না টুকরো দু'টো
অপেক্ষা করতে থাকেন
ঠিক পনের মিনিট পর অ্যাঞ্জেল হিমির কমেন্ট আসে
আগের দুবারের চাইতে আলাদা
এবার লিখেছে- মনে হচ্ছে এই ছবিটায় নিজেকে দেখতে পাচ্ছি
আমাকে কেউ মাঝ বরাবর কেটে ফেলার চেষ্টা করেছে
কিন্তু সমান করে কাটতে পারেনি
একটা অংশ এতো বেশি কেটে ফেলেছে যে, আরেক অংশের হারিয়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র
ঠিক এই ব্যাপারটি ভাবছিলেন আজমত
এবার আগে-পিছে না ভেবে কমেন্টের উত্তর দিতে যান আজমত
কিন্তু বিধিবাম
এবার যেনো সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্য থেকে হারিয়ে গেছে পোস্টটি
এবার যেহেতু ছুড়ে ফেলেননি, তাই টুকরো দুটো পায়ের কাছে থাকাতে আর অবাক হন না আজমত
ভেবেছিলেন, দুটোর জায়গায় চারটি হয়ে যায় কিনা
না, তা হয় নি
অবশ্য হলেও বিস্মিত হতেন না
সুতরাং, ছবি পোস্ট ও কমেন্ট দেখার খেলা চলতে থাকে
একেকবার একেক রকম উত্তরে নিজেকে আবিষ্কার করতে থাকেন আজমত
সন্ধ্যা নেমে এলেও আবিষ্কারের নেশায় তিনি বাসায় ফিরতে পারেন না
দুপুরে পেটে কিছু পড়েনি