content
stringlengths
0
129k
বাড়ি ফিরেই আব্বু সুরু করলো ,"রিয়াজের আম্মি ! বলি শুনছো - -"
আম্মি তাড়াতাড়ি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো
আব্বু শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় বললেন , "এক কাপ চা পাওয়া যাবে ?"
আম্মি প্রতিদিনের মতই চা করে রেখেছিলেন
চা নিয়ে আব্বুর সামনের টেবিলে চায়ের কাপ টা রাখলেন
আমি পরদিন ফিল্ডে যেতে হবে বলে সেখানকার কাজ নিয়ে একটু তৈরি হচ্ছিলাম
আব্বু প্লেট টা নিয়ে এক চুমুক দিয়ে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন , " তোমার মেয়ের জন্য ভাল পাত্র তো জুটবেই না - " একটু থেমে বললেন , " এই মেয়ে শেরেক করতে কখন পিছপা হয় না
এই কাফের মেয়ে কে কোন ইমানদার বিয়ে করে দোজখের পথ পরিষ্কার করবে ? কোন ইমানদার মা বাপ তার ছেলের জন্য এমন কাফের, মুনাফেক মেয়ের বিয়ে দিতে চাইবে ?"
আম্মি কখনো আব্বুর কথার উপর কথা বলে না
আম্মি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল চা শেষ হওয়ার আশায়
আব্বু আম্মি কে চুপ থাকতে দেখে বলল , "সব তোমার জন্য ! তোমাকে আমি বারবার বলেছিলাম মুসলিমের ঘরের মেয়ে মাধ্যমিক পাস করেছে ,এবার বিয়ে দিয়ে দাও
তুমি বললে , 'ও যখন পড়তে চাইছে পড়াও না কিছুদিন
' উচ্চ মাধ্যমিকের পর ও বললাম
তুমি বললে, 'স্কুলে প্রথম হয়েছে
অতনু মাস্টার বললে আপনার মেয়ে অনেক দূর এগুবে , দেখ না পরিয়ে
দেখো ও ঠিক তোমার মুখ একদিন উজ্জ্বল করবে
' এরপর বি এ , এম এ , সব পরিয়ে ফেললাম ধর্ম কে আল্লাহ-র বানি কে জলাঞ্জলি দিয়ে
কোন সয়তান আমার উপর ভর করেছিল কে জানে !"
আম্মি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন , "অত চিন্তা কর না
দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে
এত বড় পৃথিবী তে কেউ না কেউ ঠিক জুটে যাবে
আব্বুর গলার স্বর সপ্তমে চড়ে গেলো - - " এই 'চিন্তা কর না' বলে বলেই তুমি আমার মাথা টা খেলে
নিজে তো দোজখের পথ পরিষ্কার করে নিয়েছ এবার মেয়ে কেও শেখাচ্ছ
মা মেয়ে মিলে ঘর তাকে জাহান্নাম বানিয়ে দাও ! এই জাহান্নামে কি নামাজ রোজা কায়েম হবে ? আমি আর এই ঘরে থাকব না
শুধরাও শুধরাও
এখনো সময় আছে ,একটু শুধরাও নিজেদের - "
আমি বাধ্য হয়ে উঠে এলাম কাজ ফেলে রেখে
আব্বু তখনো আম্মি কে বকতে বকতে বলে চলেছে, " - এত দিন তো মা মেয়ের কুফরি কালামেই গেলো
এবার একটু দ্বীন এর দিকে মুখ ফেরাও
চেষ্টা কর যাতে মরণের পড়ে জান্নাত নসিব হয়
" আমি অনেকক্ষণ সহ্য করছিলাম
আম্মির মত আদ্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ কে কাফের বলে গালাগালি করছিল বলে মাথা গরম হয়েই ছিল
আমার পড়াশুনা নিয়েও গালাগালি করছিল
যেই জান্নাত জান্নাত বলতে লাগল আমার মেজাজ আর ঠিক থাকল না
চিৎকার করতে করতে সামনে এসে বললাম , "পকেটে রাখো তোমার বেহেস্ত আর জান্নতের গল্প
কি আছে তোমার জান্নাতে যে কোরআন হাদিস মেনে চলতে হবে আমাকে ? সেখানে কি সুযোগ সুবিধা আছে যা এখানে নেই ,বলতে পার ?"
- "কেন পরিস নি কোরআন বুখারি তিরমিযী মুসলিম ? জানিস না কি আছে সেখানে ? আল্লার রহমতে যা চাইবি তাই পাবি সেখানে
যা চাই টা যদি পাওয়া যেতো তাহলে আমি কোরআন হাদিস মেনেই চলতাম
আল্লাহ যা দিয়েছে সবই তো ছেলেদের
মেয়েদের জন্য তো আল্লাহ কিছুই রাখেনি জান্নাতে
ছেলে দের জন্য সুরা ,হুরী আর গেলমান
আনন্দ ফুর্তি সেই সব জান্নাতি অদ্ভুত জীব দের সাথে
মেয়েদের জন্য কি আছে ? বলেছে কোরআন হাদিস ? (এর চেয়ে ডিটেল আব্বু কে বলতে পারলাম না ,কিন্তু আমার বক্তব্য তিনি ঠিকই বুঝে যাবে জানতাম , কিন্তু আমার কথা না শুনে উলটে আমাকেই প্রশ্ন করলো)
" - কি চায় কি তোর জান্নাতে ? অনন্তকাল সুখ এর চেয়ে বেশি চাওয়ার কি থাকতে পারে ?"
"______কোথায় বলা আছে সেখানে অনন্ত কাল মেয়েরা সুখ পাবে ? অত জন হুর পরি আর গেলমান দের সাথে নিজের আপন জন কে ভাগ করে নেওয়ার সুখ কি মেয়েরা কখনো চাইতে পারে ? কোরআন হাদিস তুমি একা পড়নি আব্বু ,আমিও পড়েছি
তোমার চেয়ে বেশি ই পড়েছি
"_______হ্যাঁ হ্যাঁ তোর পড়া আমার জানা আছে
" তাচ্ছিল্যের সাথে বলে উঠলো আব্বু
আমি বল্লাম , ঠিক আছে
আমি না হয় জানি না
তুমি বল দেখি
জান্নাতে কি সকল জান্নাতি মানুষের মনের সব ইচ্ছা পূরণ হয় ?
আব্বু খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে উঠলো, " হ্যাঁ"
আমি বললাম , "আচ্ছা ধরো আব্বু , আমি যদি আজ থেকে সব ধর্মীয় নির্দেশ মেনে চলি তাহলে আমি জান্নাতে যেতে পারব ? সামনা সামনি আল্লাহ কে দেখতে পাবো?"
আব্বু আবার বলে উঠলো , " হ্যাঁ
আমি বললাম , " আমার একটাই ইচ্ছা
আল্লাহ কে সামনা সামনি পেলে দুই গালে ঠাস ঠাস করে দুটো চড় মারতে চাই
ব্যাটা মেয়েদের জন্য শুধু বঞ্চনা রেখে দিয়েছে সারাজীবন
হবে? আমার আসা পূরণ হবে? নাকি হবে না?"
(আব্বু একটু অপ্রস্তুতে পড়ে চুপ করে রইল
কেন না , যদি জান্নাতে আল্লাকে চড় মারার ইচ্ছা পূরণ হয় , তাহলে তো আল্লাহ কে আর পরম উপাস্য অর্থাৎ "আল ইলাহ" বলা যাবে না, যেহেতু তাকে যে কেউ এসে চড় থাপ্পড় মেরে যেতে পারে
কিম্বা আল্লাহ কে সর্বশক্তিমান ও বলা যাবে না যেহেতু তাকে চড় মারার ইচ্ছা করলেও তিনি তা আটকাতে পারবেন না
অন্য দিকে যদি বলা হয় যে আমার এই ইচ্ছা কখনো পূরণ হবে না
তাহলে আমার কথাই মেনে নিতে হবে , অর্থাৎ মেনে নিতে হবে যে , ষে জান্নাতে সব ইচ্ছা পূরণ হয় না
অবশেষে কয়েক সেকেন্ড ভাবার পর আব্বু তৃতীয় পন্থা বের করলেন
) যুক্তির দুর্বলতা ঢাকতে একটু গম্ভীর গলায় বললেন , " জান্নাতে আল্লাহ-র রহমতে এই ইচ্ছাই তোর থাকবে না !"
আমি বললাম , " তার মানে জান্নাতে আমার স্বাধীন ইচ্ছাও থাকবে না
আমি যা করতে চাই ,যা পেতে চাই তা তো পাবই না ,উলটে নিজের বিচার বুদ্ধি টুকু হারিয়ে আল্লাহ-র পুতুলে পরিণত হব
আমাদের স্বাধীন ইচ্ছার উপর তিনি সর্বদা হস্তক্ষেপ করবেন ? সেখানে যদি স্বাধীন ইচ্ছা টুকুই না থাকে ,তাহলে তার সুখই বা কি আর তার দুখই বা কি? আমি মানুষ , স্বাধীন ইচ্ছাই আমার স্বাতন্ত্র্য, আমার সত্তা
এটা হারাতে আমি পারব না
জান্নাতেও না , জাহান্নামেও না
তোমার জান্নাতের গল্প যদি সত্যিও হয় তবুও সেখানে যেতে আমার এক বিন্দু আগ্রহ নেই
( আমি একটু থেমে আব্বু কে বলার সুযোগ দিলাম
আব্বু বাইরে ইসলাম নিয়ে বক্তৃতা দিতে পারে কিন্তু আমার সাথে যুক্তি তে কখনই পেরে ওঠে নি
ভুল তত্ত্ব তথ্য আর যুক্তি নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য মানুষ কে প্রভাবিত করা যায়
কিন্তু স্থায়ী ভাবে নয়
আমাকে কখনই ভুল বোঝানোর ক্ষমতা তার নেই, এটা আব্বু খুব ভাল ভাবেই জানে
আব্বু চুপ করেই রইল ,যদিও মুখ চোখ রাগে লাল হয়ে উঠেছিল
- - -" তার চেয়ে আমি রক্ত মাংসের মানুষ
মরার সময় আমি প্রদীপের মত দপ করে নিভে যাবো
তখন আমি আর নেই
এটা ভাবতে আমার ভয় লাগলেও আমি মেনে নিতে প্রস্তুত
তবু গোর আযাব কিম্বা জান্নাত আর জাহান্নাম মেনে নিতে পারব না
যত্ত সব ঈশ্বরবাদীদের দেওয়া গোঁজামিল তত্ত্ব! বোগাস !"
বলতে বলতে কখন আমার গলা চড়ে গিয়েছিল নিজেই বুঝি নি
আমার এই তাচ্ছিল্য ভরা উত্তরে যা হওয়ার ছিল তাই হল
একমাত্র পন্থা যেটা ধার্মিকরা বরাবর করে এসেছে
বলপ্রয়োগ
আব্বু আমার বাঁ গালে এক চড় কষিয়ে বললেন ,
" - - -সব তোর ওই কুফরি কালাম চর্চার ফল ! জেনে রাখ বিচারের দিনে এসব কোন কাজে লাগবে না ! "
গালে আচমকা প্রচণ্ড লাগায় আমার বাঁ হাত টা বাঁ গালে চলে গিয়েছিল
কস্ত পেলেও আনন্দই হচ্ছিল
আব্বুর আবার হারার আনন্দ
ওই অবস্থাতেও হাসি পেয়ে গেলো
একটু মুচকি হেসে গালে হাত বোলাতে বোলাতে নিজের রুমে চলে গেলাম
বাইরে আব্বু তখনো চিৎকার করেই যাচ্ছিল
পোস্ট শেয়ার করুন
: মহসিনা খাতুন
মুক্তমনা ব্লগার