content
stringlengths
0
129k
১৯৭৫ সালের জুলাই মাসের শেষে রাত ১১ টার দিকে, লুঙ্গি-গেঞ্জি পরিহিত তাজউদ্দীন আহমদ কিছু দূর পায়ে হেঁটে ও রিকশায় করে বঙ্গবন্ধুর বাসায় গিয়েছিলেন
উনি তখন শোবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন
তাজউদ্দীন আহমদ, ওনার সোর্স থেকে পাওয়া খবরের উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে
তাঁর ওপর যে কোনো সময় হামলা হতে পারে
তিনি যেন অবিলম্বে সেনাবাহিনীর দিকে কড়া নজর দেন
বঙ্গবন্ধু তাঁর পরম শুভাকাঙক্ষী, বিশ্বস্ত বন্ধু ও সহকর্মী তাজউদ্দীন আহমদের সতর্কবাণী সেদিন আমলে নেননি
১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পক তদানীন্তন মেজর আবদুর রশীদ ও মেজর ফারুক রহমান, বাকশাল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও তদানীন্তন ডেপুটি চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে জুনিয়র আর্মি অফিসারদের অভ্যূত্থানের বিষয়টি অবহিত করে এবং উভয়...
বেসামরিক এবং সামরিক বাহিনীর যোগসাজশে এভাবেই সংঘটিত হয় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড
অতি বেদনাদায়ক ব্যাপারটি ছিল যে ১৯৭১ এর স্বাধীনতাবিরোধী ও পাকিস্তান-মার্কিন স্বার্থ রক্ষাকারী মোশতাক-তাহেরউদ্দীন ঠাকুর-মাহবুব আলম চাষী এই পরাজিত চক্রটিই স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজনে পরিণত হয়ে নিজ দলের ভেতর থেকেই ষড়যন্ত্র চালিয়ে যেতে থাকে
এরাই ছিল মুজিব-হত্যার অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী
এরা স্বাধীনতার প্রতীক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হবে না, উপরন্তু এরা আঘাত হানবে স্বাধীনতার আদর্শে বিশ্বাসী আপোসহীন নেতৃত্বের উপর- সে বিষয়ে তাজউদ্দীন আহমদের কোনো সন্দেহ ছিল না
এ কারণেই মন্ত্রিসভায় এবং বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটিতে না থাকলেও ১৫ আগস্ট তাঁকে গৃহবন্দি করা হয়
২২ আগস্ট যখন তাঁকে বাসা থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন আম্মা, বেগম জোহরা তাজউদ্দীন প্রশ্ন করেছিলেন যে কবে তাঁকে ছাড়বে বলে তিনি মনে করেন
আব্বু যেতে যেতেই পেছনে হাত নেড়ে বলেছিলেন, "টেক ইট ফর এভার"
তিনি চিরকালের জন্যই চলে যাচ্ছেন
এক যুগ পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডেভলপমেন্টাল সাইকোলজির ক্লাসে আমি অধ্যাপক ড. গার্সিয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, স্বপ্ন ভবিষ্যৎ দেখাতে পারে কিনা এবং এর মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া কী? তিনি আমাকে বলেছিলেন, প্যারা-সাইকোলজির উপরে প্রকাশিত গবেষণামূলক লেখাগুলি পড়তে যা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের অস্তিত্ব সমন্ধে ইঙ্গিত দেয় (সাম্প্রতিক হাজ...
অর্থাৎ মস্তিষ্ক অধিকতর নির্ভরশীল হৃদয়-জ্ঞানের ওপর
সেজন্যই আমরা হয়তো হৃদয় দিয়ে ভালোবাসার কথা বলি, মস্তিস্ক দিয়ে নয়
এ বিষয়ে জানতে আগ্রহীরা ডক চিলড্রে এবং হাওয়ার্ড মার্টিন প্রকাশিত "দা হার্টম্যাথ সল্যুশন" বইটি পড়ে দেখতে পারেন)
স্বপ্ন যে ভবিষ্যৎ দেখাতে পারে সেই উত্তর আমার জীবনের বেদনার অভিজ্ঞতা থেকে আমি তার আগেই পেয়ে গেছি
পৃথিবীর বহু মানুষও তা উপলব্ধি করেছেন
আমাদের পবিত্র কোরআনসহ প্রায় সব ধর্মগ্রন্থেও স্বপ্নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎজ্ঞানের কথা উল্লিখিত হয়েছে
প্রশ্নটি করেছিলাম স্বপ্নের মাধ্যমে অতীন্দ্রিয় জ্ঞানলাভ সম্পর্কে বিজ্ঞান কী বলে তা জানার জন্য (আমার এক প্রিয় এবং জগৎখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ কার্ল ইয়ুং-এর ( ) স্বপ্ন-অতীন্দ্রিয়-ভবিষ্যৎ জ্ঞান সম্পর্কে গবেষণা মনস্তত্ত্বসহ, জ্ঞানের বহু শাখায় অসাধারণ ও যুগান্তকারী অবদান রেখেছে
তিনি মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও অতীন্দ্রিয় জ্ঞানকে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছিলেন)
আব্বুকে জেলে বন্দি করার পরেও আমাদেরকে একমাস গৃহবন্দি করে রাখা হয়
আব্বুর সঙ্গে পুরাতন ঢাকার নাজিমউদ্দীন রোডে অবস্থিত কেন্দ্রীয় কারাগারে দেখা করার অনুমতি মেলে এক মাস পরে
সেপ্টেম্বর মাসে
অক্টোবরে, কারাগারে আব্বুর সঙ্গে আম্মার সাক্ষাৎ হয়
সেদিন তিনি আম্মাকে জানান যে স্বপ্নে তিনি মুজিব কাকুকে (বঙ্গবন্ধুকে আমরা ছেলেবেলা থেকে ওই নামেই সম্বোধন করতাম) বাগানে তার কাছে আসতে দেখেছেন
আব্বু জেলের ভেতরের পঁচা একটা নর্দমা ভরাট করে নিজেই কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে অতি মনোরম এক মৌসুমি ফুলের বাগান করেছিলেন
স্বপ্নে সেই বাগানে মুজিব কাকু এসে উপস্থিত
আব্বু যেন তখন খুরপি দিয়ে বাগানে কাজ করছেন
মুজিব কাকু আব্বুকে বলছেন, "তাজউদ্দীন, সেই চুয়াল্লিশ সাল থেকেই আমরা একসঙ্গে আছি
এখন আর তোমাকে ছাড়া ভালো লাগে না
তুমি চলে আস আমার কাছে
" আব্বু বললেন, "মুজিব ভাই, আমার অনেক কাজ রয়েছে
আমাকে কেন ডাকছেন?" মুজিব কাকু উত্তর দিলেন, "আমাদের আর কোনো কাজ নেই
সব কাজ শেষ
নভেম্বরের ১ তারিখ, শনিবার
আম্মা একটা দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠলেন
স্বপ্নে দেখেন যে বাঁশের চারটি তাঁবু পাশাপাশি রাখা
আম্মা জিজ্ঞেস করলেন, "কাদের এই তাঁবু?" কে যেন উত্তর দিল, "এই তাঁবুগুলো তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও কামারুজ্জামান সাহেবদের জন্য
স্বপ্নের মধ্যেই আম্মার মনে হল যে বাঁশের তাঁবু দেখা তো ভালো নয়
টিফিন ক্যারিয়ার ভরে আব্বুর পছন্দের খাবার রেঁধে সেদিনই আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়ে আম্মা একাই জেলে গেলেন আব্বুর সঙ্গে দেখা করতে
আম্মা, আইনজীবীদের সহায়তায় হাইকোর্টের মাধ্যমে আব্বুর আটকাদেশকে অবৈধ চ্যালেঞ্জ করে আব্বুকে মুক্ত করার জন্য নথিপত্র জোগাড় করেছিলেন
হত্যাকারী সেই আর্মি-মোশতাক সরকার আব্বুকে দুর্নীতিতে জড়ানোর নিরন্তর চেষ্টা করেও দুর্নীতি তো দূরের কথা, একটা সাধারণ নিয়ম লঙ্ঘণের অভিযোগও দাঁড় করাতে পারেনি
আব্বুকে মুক্ত করার জন্য ৫ নভেম্বর আদালতে রিট পিটিশন ওঠার কথা
আম্মা আব্বুকে সেই খবর জানালেন
কিন্তু আব্বু যেন কেমন চিন্তামগ্ন রইলেন
তিনি আম্মার ডাক নাম ধরে বললেন, "লিলি, আজ রাতে ডায়েরির শেষ পাতা লেখা হবে
সেই সঙ্গে শেষ হবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা
" তারপর বললেন, "আর বোধহয় বাঁচব ন
'' জেলে আব্বুর সঙ্গে আম্মার সেই শেষ সাক্ষাৎ
৩ নভেম্বর, মাত্র ভোর হওয়া শুরু হয়েছে
আব্বু ও তার সহকর্মীদের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে রয়েছে কারাগৃহের মাটিতে
সেই ভয়াল সংবাদটি আমরা জানতে পারব আরও একদিন পরে
আম্মা সেই একই ভোরে স্বপ্নে দেখলেন যে, বিস্তীর্ণ মহাকাশে বিচরণকারী মধ্য গগনের সূর্যটি যেন আচমকাই অস্তগামী সূর্যের মতো রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে
সিংহাসনের মতো এক আসনে বসা আব্বুর সারা শরীরের ওপর ছড়িয়ে পড়ছে রক্তলাল আলো
আব্বুর পরনের সাদা গেঞ্জিটি ক্রমশই লাল হয়ে উঠছে
যেন সূর্য থেকে বের হচ্ছে রক্তের ধারা
আম্মা স্বপ্নের মধ্যেই ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞেস করলেন, "মধ্য গগনের সূর্যের রঙ অস্তগামী সূর্যর মতো লালরঙের হয় কী করে?" অদৃশ্য থেকে কে যেন গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল, "দেশের উপর মহাবিপদ নেমে আসছে"
আম্মা এক অজানা আশঙ্কা নিয়ে দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠলেন
সাতসকালে জঙ্গি বিমানের প্রচণ্ড শব্দে আমাদেরও ঘুম ভেঙে গেল
আমাদের বাসার খুব নিচ দিয়ে জঙ্গি বিমান ও হেলিকপ্টার ঘন ঘন উড়ে যেতে দেখলাম
ঘর থেকে বেরিয়ে আমার নানা আম্মাকে জিজ্ঞেস করলেন, "লিলি, এত প্লেন কেন উড়ছে?" আম্মা বললেন, "অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না
মনে হয় আমাদের বাসা ছাড়তে হবে
ইতোমধ্যে সকাল সাতটায় রেডিওর অনুষ্ঠান হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়াতে লিভার সিরোসিস রোগাক্রান্ত আমাদের মেজকাকু (আব্বুর পরবর্তী ভাই প্রয়াত মফিজউদ্দীন আহমদ) চিন্তিত হয়ে ছোট ফুফুর ছেলে ঢাকা কলেজের ছাত্র বাবুলকে (নজরুল ইসলাম খান) আমাদের বাসায় পাঠালেন কোনো খবর আছে কিনা জানতে
বাবুল সকাল আটটার দিকে আমাদের বাসায় পৌঁছে দেখে আম্মা চিন্তিতভাবে ডাইনিং টেবিলের কাছে বসা
বাবুলকে তিনি ভোর রাতে দেখা স্বপ্নটি বললেন
তারপর অবস্থা ভালো না ঠেকায় আমরা কাছেই ধানমণ্ডির ১৯ নম্বর রোডে মফিজ কাকুর বাসায় আশ্রয় নিলাম
সেদিন ঢাকার রাস্তাঘাট জুড়ে নানা রকম গুজব চলছিল
অনেকেই আম্মাকে বিভিন্ন খবর দিলেন
কেউ বললেন যে, আব্বু ও তার সহকর্মীদের জেল থেকে বের করে বঙ্গভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সরকার গঠনের জন্য
কেউ বললেন, ওনাদেরকে কোনো গোপন জায়গায় নিয়ে সেখান তাদেরকে চাপ দেওয়া হচ্ছে মোশতাকের (অবৈধ) সরকারে যোগ দিতে ইত্যাদি
আম্মা নিজেও ছুটলেন বিভিন্ন জায়গায় সঠিক খবরের আশায়
তখন তো আর সেল ফোনের যুগ নয়; ফোনও সবার বাড়িতে নেই
নিজেদেরই বিভিন্ন জায়গায় যেতে হচ্ছিল সঠিক সংবাদের আশায়
পরদিন, ৪ নভেম্বর, মঙ্গলবার, সকাল সাড়ে সাতটার দিকে খবর এল আব্বুর বন্ধু ডাক্তার এম করিম আম্মার জন্য অপেক্ষা করছেন মফিজ কাকুর বাসার কাছেই, অ্যাডভোকেট মেহেরুননেসা রহমানের বাসার সামনে
ওনার কাছে জরুরি খবর আছে
সংবাদ পাওয়া মাত্রই আম্মা আমাকে নিয়ে রিকশায় চেপে বসলেন
রিকশা থামল বাড়ির সামনে
আম্মার সামনে দাঁড়ালেন করিম কাকু
ছোটবেলায় অসুখ-বিসুখ হলে আব্বুর এই রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী ও নিঃস্বার্থ সেবক বন্ধু ড. করিম ছিলেন আমাদের ভরসাস্থল
ওনার সদাহাস্য চেহারা ও মজার মজার আলাপ শুনে অসুখ অর্ধেক ভালো হয়ে যেত
আজ ওনাকে এমন বিমর্ষ, বেদনাসিক্ত কেন লাগছে?
উনি হাউমাউ করে কেঁদে বললেন, "ভাবি, তাজউদ্দীন ও তাঁর সহকর্মীদেরকে আর্মিরা মেরে ফেলেছে
" খবরটি শুনে আম্মা যেন পাথর হয়ে গেলেন
আম্মার হাত আঁকড়ে ধরে আমি বলে উঠলাম, "এ নিশ্চয়ই ভুল খবর!" করিম কাকুর পরিচিত ডাক্তার সেকান্দারের চেম্বার ছিল জেলের কাছেই বকশিবাজারে
তিনি ভোরবেলায় ওনাকে ফোন করে এই মর্মান্তিক খবরটি জানান
তারপরও বিশ্বাস হতে চায় না
যেহেতু সরকারি তরফ থেকে কিছু বলা হয়নি এবং মিডিয়াও নিরব ভূমিকা পালন করছে, সেহেতু আমাদের পক্ষে ওই হৃদয়বিদারক খবরটি বিশ্বাস করা কঠিন ছিল
একটা গভীর আতঙ্ক নিয়ে আমরা সারাদিন ছোটাছুটি করলাম সংবাদের আশায়
ততক্ষণে একটা কথা সকলের মুখেই শোনা যাচ্ছিল
গতকাল ভোররাতে জেলে পাগলা ঘণ্টি ও গোলাগুলির শব্দ শোনা গিয়েছে
বিকেল চারটার দিকে মফিজ কাকুর বাসায় কয়েকজন মহিলা প্রবেশ করলেন
তাদের একজন পরিচয় দিলেন যে তিনি মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের মা
আম্মা তখনও ফেরেননি
তিনি ফুপাতো ভাই বাবুলকে জিজ্ঞেস করলেন, "তাজউদ্দীন সাহেব তোমার কে হয়?" বাবুল জবাব দিল, "মামা হয়"
উনি এবং বাকি মহিলারা বাবুলকে আমাদের থেকে আলাদা করে পাশের ঘরে নিয়ে কী যেন বলেই সঙ্গে সঙ্গে চলে গেলেন
তাঁরা যেতে না যেতেই ঘরের ভেতর থেকে ভেসে এল বাবুলের হাহাকারভরা আর্তনাদ