content
stringlengths
0
129k
ছোট বোন রিমি ও মিমিসহ ঘরে ঢুকে দেখি বাবুল একবার বিছানায় ও একবার মাটিতে 'মামা' 'মামা' বলে চিৎকার করে লুটোপুটি খাচ্ছে
খালেদ মোশাররফের মা বাবুলকে দুঃসংবাদটি দিয়ে উনি চলে যাবার পর জানাতে বলেছিলেন
বঙ্গভবন হতে খন্দকার মোশতাক ও মেজর আবদুর রশীদের নির্দেশে রাতের অন্ধকারে এই বর্বর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়
এই দুজন হত্যাকারীদের জন্য জেল গেট খুলে দিতে আইজিকে হুকুম দেয়
যুক্তরাষ্ট্র হতে ঢাকায় এসে জেল হত্যাকাণ্ডের ওপর তথ্য সংগ্রহের সময় ব্রিগেডিয়ার আমিনুল হক, যাকে খালেদ মোশাররফ জেলহত্যার তদন্তে নিয়োগ করেছিলেন, তিনি এই তথ্য আমাকে ১৬ জুন, ১৯৮৭-এর সাক্ষাতে দিয়েছিলেন
পরে তো ৭ নভেম্বর খালেদ মোশাররফ নিহত হবার পর এবং জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করে জেলহত্যার তদন্ত বন্ধ করে দেয়
বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যাকারীরা বরং বিদেশের দূতাবাসে পদমর্যাদাযুক্ত চাকরির মাধ্যমে পুরষ্কৃত হয়
মোশতাককে দুর্নীতির দায়ে জেল খাটতে হয়, বঙ্গবন্ধু ও জেলহত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শাস্তিকে পাশ কাটিয়ে!
সবচেয়ে বড় বেদনা তখনই যখন প্রকাশের সব ভাষা হারিয়ে যায় নিমিষেই
কেমন যেন যন্ত্রচালিতের মতোই রিমিকে নিয়ে ফিরে এলাম আমাদের বাসায়
মনে হল সারাদিন পাওয়া খবরগুলো কোনো অদ্ভূত দুঃস্বপ্ন
জেলে পাগলা ঘণ্টি, গোলাগুলি, আব্বু নিহত!!! এবার হয়তো বাসায় কেউ ভালো খবর নিয়ে আসবেন, এমনি নিভুনিভু আশায় বুক বেঁধে আম্মার পাশে এসে আমরা দাঁড়ালাম
এক এক করে আম্মাকে ঘিরে মানুষের ভিড় জমে উঠতে থাকল
আম্মা বারান্দার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসা
বেদনাক্লিষ্ট
সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ময়েজউদ্দীন আহমেদসহ আব্বুর বেশ ক'জন সহকর্মী ও বন্ধু নিয়ে এলেন পাকা খবর
জেলখানায় আব্বু ও তাঁর তিন সহকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে
সংবাদদাতাদের দিকে আম্মা তাকিয়ে রইলেন কেমন নিস্পন্দ দৃষ্টিতে
আমি সেই মুহূর্তে ছুটে আব্বু ও আম্মার ঘরে ঢুকে ওনাদের খাটে বসে কান্নায় ভেঙে পড়লাম
কতক্ষণ ওভাবে অশ্রুপ্লাবনে সিক্ত হয়েছিলাম জানি না
পানির ঝাপটায় দুঃখ ধুয়ে যায় না, তারপরও বৃথা আশায় বেসিন খুলে সমানে চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিতে থাকলাম
ঘরের বাইরে বেরিয়ে দেখি আম্মাকে ড্রইংরুমের সোফাতে বসানো হয়েছে
এলোমেলো চুলে ঘেরা আম্মার চোখে-মুখে কী নিদারুণ হাহাকার! এক পর্যায়ে আম্মা ডুকরে কেঁদে বললেন, "এই সোনার মানুষটাকে ওরা কীভাবে মারল! দেশ কী হারাল!"
গভীর রাতে, বড় ফুপুর ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শাহিদ ভাইয়ের কাছে জেল কর্তৃপক্ষ আব্বুর মরদেহ হস্তান্তর করে
৫ নভেম্বর দিবাগত রাত ১২:২৫ মিনিটে, পুলিশের ট্রাকে করে জেলখানা থেকে চিরনিদ্রায় শায়িত আব্বু ঘরে ফিরলেন
সঙ্গে ফিরল আব্বুর রক্তমাখা ঘড়ি, জামা, স্যান্ডেল ও বুলেটে ছিদ্র হওয়া টিফিন ক্যারিয়ার, যাতে করে ১ নভেম্বর আম্মা শেষ খাবার নিয়ে গিয়েছিলেন
আব্বুর কোরআন শরীফটি যা তিনি জেলে পাঠ করতেন, তা বুলেটে ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল, সেটা আর ফেরত দেবার অবস্থায় ছিল না
আব্বুর মহামূল্যবান সেই কালো চামড়ায় সোনালী বর্ডারওয়ালা ডায়েরিটি যাতে তিনি লিখছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কীভাবে চলবে তার দিকনির্দেশনা, সেটা রহস্যজনকভাবে জেলেই হারিয়ে যায় (আব্বুর সঙ্গে অন্যান্যদের মধ্যে বন্দি ছিলেন এ এস এম মহসীন বুলবুল
১৯৮৭ সালের ৮ জুলাই যখন ওনার টেপে ধারণ করা সাক্ষাৎকারটি নিই, উনি উল্লেখ করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগের এক নেতা কোরবান আলী, যিনি পরে প্রেসিডেন্ট এরশাদের দলে যোগ দেন, তিনি আব্বুর মৃত্যুর পর নিজের কাছে সেই ডায়েরিটি রেখে দিয়েছিলেন এবং লুকিয়ে লুকিয়ে তা পড়তেন
বুলবুল সাহেব আব্বুকে এই ডায়েরিটি লিখতে দেখেছিলেন এবং কৌতূহলবশত ডায়েরিতে কী লিখছেন জিজ্ঞেস করলে আব্বু মাঝে মাঝে ডায়েরিটি থেকে পড়ে শোনাতেন
শনিবার, ১৩ মার্চ, ১৯৭৬ যখন বুলবুল সাহেব জেল থেকে ছাড়া পান, তখন তিনি অনুরোধ করেছিলেন কোরবান আলী যিনি তখনও মুক্তিলাভ করেননি তিনি যেন ডায়েরিটি তাঁর কাছে দেন, যাতে আম্মাকে তিনি এই মহামূল্যবান ঐতিহাসিক ডকুমেন্টটি ফেরত দিতে পারেন
কিন্তু কোরবান আলী ডায়েরিটি ফেরত দেয় না
পরবর্তীতে কোরবান আলীর কাছ থেকে ডায়েরিটি উদ্ধারের চেষ্টা করা হলেও লাভ হয়নি
তার মৃত্যুর পর ডায়েরিটির আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি)
আব্বু চিরকালের জন্য মুক্তিলাভ করে ঘরে ফিরে এলেন
৭৫১, সাত মসজিদ রোডের নিচতলার জলছাদওয়ালা গাড়িবারান্দার পাশের ঘরটিতে আব্বু শুয়ে রয়েছেন
১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর এই ঘরটিতেই মিলিটারি আস্তানা গেড়ে আমাদেরকে গৃহবন্দি করে রাখে
স্বাধীনতা-পূর্বকালে এই ঘরটি আব্বু ব্যবহার করতেন লেখাপড়া, মিটিং ও অফিসের কাজকর্মের জন্য
অসহযোগ আন্দোলনের সময় এই ঘরটিতে বসেই আব্বু দেশপরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ তৈরি করেছিলেন
শৈশবে এই ঘরটির জানালার পাশে বসে আমি খেলতাম
আব্বু টেবিলে রাখা মর্নিং নিউজ পত্রিকার পাতা থেকে আমার জন্য কার্টুন জমিয়ে রাখতেন
জানালাপথে গাড়িবারান্দার কলাম বেয়ে ওঠা মাধবীলতা ফুলগাছের ঝাড়ে পাখির আনাগোনা দেখে আমি উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠতাম, "আব্বু, পাখি, পাখি!" আব্বু মিষ্টি হেসে বলতেন, "ওই পাখির নাম জান? ওর নাম তিতির
'' ওই একই ঘরে সেদিন আমরা প্রবেশ করছি
কিন্তু পরিবেশ ও পরিস্থিতি কত ভিন্ন!
৫ নভেম্বর, বুধবার
সূর্য তখনও ওঠেনি
শান্ত ভোর সরব হয়ে উঠেছে অগুণতি মানুষের গুঞ্জরণে
সাত মসজিদ রোডের মাইল খানিক দূর থেকে মানুষের বিশাল লাইন শুরু হয়েছে
শ্রদ্ধাবনতভাবে তাঁরা নিচতলার ঘরটিতে প্রবেশ করছেন
তাঁদের প্রিয় নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে শৃঙ্খলার সঙ্গে একে একে তাঁরা বেরিয়ে আসছেন
আমি দরজার এক কোণে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছি
ওই তো দেখা যায় ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম দরজার কাছে দাঁড়ানো
চোখে অশ্রু টলমল
ওই দেখা যায় অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে "মামা মামা" (পরিচয়সূত্রে) বলে অঝোরে কেঁদে চলেছেন
ওই যে একসারি মানুষ চোখের পানি ঝরাতে ঝরাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন
কিছু মানুষ চেনা
অধিকাংশই অচেনা
এনারা কারা? কেন আসছেন? আব্বু কি সত্যি নেই!
ছোট্ট সোহেল কেমন অসহায়ের মতো আব্বুর চারপাশে ঘুরে ঘুরে আব্বুকে দেখছে
মাঝে মাঝে আব্বুর মাথার কাছে বসে থাকছে অনেকক্ষণ ধরে
বিমর্ষভাবে মিমি একবার আম্মার কাছে, আরেকবার আব্বুর কাছে ঘুরাফিরা করছে
রিমি বলল যে, গোসল করানোর সময় সে আব্বুর ডান পায়ের গোড়ালিতে বুলেটের রক্তাক্ত ক্ষত দেখেছে
আমাদের সমবয়সী চাচাতো বোন (মফিজ কাকুর মেয়ে) দীপি দেখল যে, বুলেট আব্বুর গোড়ালির এপাশ ওপাশ ফুঁড়ে বেরিয়েছে
আমার শক্তি ছিল না সেই দৃশ্য দেখার
আমাদের দরদরিয়া গ্রামের বারেক মিয়া এবং খালাতো ভাই সাঈদ গোসল করাতে গিয়ে আব্বুর শরীরের তিন জায়গায় বুলেটের ক্ষত দেখতে পান
একটি ডান পায়ের গোড়ালির সন্ধিস্থলে, দ্বিতীয়টি উরুতে এবং তৃতীয়টি ছিল নাভি থেকে ছয়-সাত ইঞ্চি দূরত্বে, ডান কোমরের হাড়ের পাশে
আব্বুর মৃত্যু নিয়ে ভিড়ের মধ্যে কিছু মন্তব্য আমাদের কানে এল
কেউ একজন বললেন যে, পোস্টমর্টেম রিপোর্টে নাকি উল্লেখ করা হয়েছে যে রক্তক্ষরণে আব্বুর মৃত্যু হয়
অন্য কেউ আফসোস করে বললেন, "আহা, জেল কর্তৃপক্ষ যদি সঙ্গে সঙ্গেই তাজউদ্দীন ভাইকে হাসপাতালে নিয়ে যেতেন, উনি বেঁচে যেতেন
দোতালায় ভেতরের বারান্দায় বসা আম্মার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই আম্মা আমার হাত আঁকড়ে ধরে বললেন, "দেখ, তোমার আব্বুকে বিদায় দিতে আজ কতজন এসেছে
" জানালাপথে আমগাছের নিচে ট্রাকে শায়িত আব্বুকে ঘিরে থাকা শত শত জনতার দিকে তাকিয়ে বললেন, "যে দেশ, যে মানুষ ছাড়া তুমি কিছু বোঝনি আজ দেখ তোমাকে বিদায় দিতে কত মানুষ এসেছে
আর্মি-পুলিশ কর্তৃপক্ষের নানা বাধার মধ্য দিয়ে আব্বুর লাগানো আমগাছের নিচেই, বেলা দেড়টার দিকে, রুগ্ন ও শোকাতুর মফিজ কাকু তাঁর পরম ভালোবাসার 'ভাই সাহেবের' জানাজা পড়ালেন
আম্মার পাশে দাঁড়িয়ে আমরা দোতলার জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইলাম
জানাজা শেষে আব্বুকে বহনকারী ট্রাকটি আমাদের "যেতে নাহি দেব হায়" কান্না উপেক্ষা করে ধীরে ধীরে বনানী গোরস্তানের দিকে রওয়ানা হল
ট্রাকের সঙ্গে সোহেলকে কোলে করে চলে গেলেন মফিজ কাকু
তাঁর সঙ্গে গেলেন ছোট কাকু আফসারউদ্দীন আহমদ, শাহিদ ভাই, সাঈদ ভাই, দলিল ভাই, মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান, খালেদ খুররম, আবু মোহাম্মদ খান বাবলু ও আরও দুয়েকজন
আর্মি-পুলিশের বাধায় খুব বেশি লোক সেদিন বনানী গোরস্তানে যেতে পারেননি
যারা সেদিন যেতে পেরেছিলেন তারাই বকুল গাছের নিচে আব্বুকে তাঁর শেষশয্যায় শায়িত করলেন
বড় মামু সোহেলকে ডাকলেন
শিশু সোহেলের হাতে পড়ল তার বাবার কবরের প্রথম মাটি
আব্বু অমর্ত্যলোকে চলে গেলেন আমাদের হৃদয় শূন্য করে
কিন্তু আসলেই কি চলে গেলেন? যারা অসীম প্রেমময়, সর্বজ্ঞানী স্রষ্টার আরাধনাকে রূপান্তরিত করেন মেহনতি ও নির্যাতিত মানুষের কল্যাণ ও মুক্তির সংগ্রামে- তাঁরা আশা-আলোর দিশারী হয়ে অমরত্ব লাভ করেন এ জগতেও
লেখক: তাজউদ্দীন আহমদ এর কন্যা
শেয়ার করুন !
এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য- লেখকের একান্তই নিজস্ব
.-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই
লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে . আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না
খালেদা না থাকলে বিএনপি থাকবে কিনা সেটাই দেখার বিষয়: কাদের
ডিসেম্বর ৮, ২০২১
'কে কোথায় কী করছে, সব খবর শেখ হাসিনার কাছে আছে'
ডিসেম্বর ৮, ২০২১
'কোনো ভুল করিনি'- বিবিসিকে বললেন ড. মুরাদ
ডিসেম্বর ৭, ২০২১
মার্বেল দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিল গাম্বিয়ার জনগণ
ডিসেম্বর ৮, ২০২১
বিএনপি নেতা মেয়র আরিফের বিরুদ্ধে বাসাবাড়ি ভাঙার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন
ডিসেম্বর ৮, ২০২১
খালেদা না থাকলে বিএনপি থাকবে কিনা সেটাই দেখার বিষয়: কাদের