content
stringlengths
0
129k
প্রতি জুলাইয়ে আব্বুর জন্ম মাসটিতে স্মারক বক্তৃতা, ফিমেল এমপাওয়ারমেন্ট বৃত্তি এবং স্নাতকে প্রথম শ্রেণিতে সর্বোচ্চ মার্কসপ্রাপ্ত ছাত্র বা ছাত্রীকে তাজউদ্দীন আহমদ শান্তি স্বর্ণপদক ও মাস্টার্স সমাপ্ত করার জন্য বৃত্তির আয়োজন করা হয়ে থাকে
ট্রাস্ট ফান্ডটির অনুষ্ঠানের আয়োজন উপলক্ষে আমি এ সময়টিতে আমেরিকা হতে ঢাকায় পাড়ি জমাই
আব্বুর জন্ম মাস, জন্মদিন এই শব্দগুলি ঘিরে কোনো আয়োজনের সময় আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে ভবিষ্যতে
নতুন প্রজন্মের দিকে
তাদের সঙ্গে চিন্তা-ভাবনা বিনিময়ের মাধ্যমে সেতুবন্ধনের সুযোগ আসে
তাদের মধ্য দিয়ে আগামীর স্বপ্ন ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ দেখার চেষ্টা করি
৩ নভেম্বর আব্বুর রক্তঝরা মৃত্যুর দিনটি- ১৯৭৫ সালের বেদনাপূর্ণ নভেম্বর মাসের স্মৃতি, আব্বুর জন্মদিনটিতে ভুলে থাকার চেষ্টা করি
কিন্তু ওই চেষ্টা যেন ক্ষতের উপর ব্যান্ডেজ লাগানোর মতোই
ব্যান্ডেজটা সরে গেলেই উন্মুক্ত হয় সেই স্মৃতি, কিশোরকালের সবচাইতে মর্মান্তিক বেদনার আলেখ্য
এবার তাই হল, অজান্তে, আকস্মিকভাবে
ট্রাস্ট ফান্ড অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র আমার মামাতো বোন নাসরিনকে দিতে গিয়ে
সে ওর পুরানা চিঠিপত্রের বাক্স গোছাতে গিয়ে খুঁজে পেয়েছে আমার এক চিঠি
আব্বুর ইহলোকত্যাগের মাত্র ছয় দিন পরে চট্টগ্রামে ওর পিঠোপিঠি বড় বোন ইয়াসমিন এবং ওকে লেখা চিঠি
আব্বুকে হত্যা করার পরেও আমাদের বাসায় আর্মি-পুলিশের নজরদারি ও হয়রানি এবং আমাদের নিরাপত্তার কারণে আমার বড় মামা ক্যাপ্টেন সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া ঢাকায় রাজাবাজারে, উনার ইন্দিরা রোডের ভাড়াবাড়িতে আমাদেরকে নিয়ে এসেছিলেন
ব্যবসার কারণে তিনি সে সময় ঢাকা ও চট্টগ্রামে যাতায়াত করতেন
চিঠিটা ওই সময় লেখা
এক পনেরো বছরের কিশোরী তার মনের অবস্থা ব্যক্ত করছে তারই সমবয়সী আত্মীয়দের কাছে
সামান্য বিবর্ণ হয়ে আসা নরম কাগজে লিপিবদ্ধ সেই চিঠির মধ্যে আমি ডুবে গেলাম
ভুলে যাওয়া চিঠিখানি পড়লাম নতুন করে
বেদনাসিক্ত সেই সময়ের দুয়ার উন্মোচন করে
চিঠির উপরে ইংরেজিতে লেখা "মে গড ব্লেস ইউ"
তার নিচে লেখা "ফরগেট মি নট", ডানে "লাভ" এবং বাঁয়ে "পিস"
চিঠিটি শুরু হয়েছে এভাবে-
"প্রিয় নাসরিন ও ইয়াসমিন, ৯/১১/৭৫
প্রথমেই তোমরা আমার আন্তরিক ভালোবাসা নিও
তোমরা কেমন আছ? আমরা এক রকম ভালো আছি
আমরা সবাই গত পরশুদিন থেকে তোমাদের বাসায় আছি
ভবিষ্যৎ বলতে আমার দুচোখে যেন কিছু আপাতত নেই
দেশেরই যদি ভবিষ্যৎ না থাকে তবে আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থাৎ দেশের জনগণের ভবিষ্যৎ থাকবে বলে কি আশা করা যায়
আব্বুর কথা তো জান
এ দেশের মাটিতেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ এটা
বাংলাদেশ কত নরম-কোমল-সবুজে ভরা একটি ছোট্ট দেশ- কিন্তু সে দেশের মাটির মাঝেই ঘটে যায় কতশত নিষ্ঠুর রক্তাক্ত ঘটনা ও ইতিহাস
তারই পুনরাবৃত্তি ঘটে গেল সেদিন
জান, আব্বু মারা গেছে যখন শুনলাম তখন বিশ্বাস করিনি একটুও
আমার শুধু মনে হচ্ছিল, হতেই পারে না আব্বুর মতো দেবতার মতো মানুষ, তিনি কেন মরতে যাবেন? তাছাড়া আব্বুর তো কতশত কাজ দেশের প্রতি এখনও পড়ে রয়েছে, তবে এমন কেন হতে যাবে!
কিন্ত তারপর যখন কনফার্ম হলাম- তখন ঘরে বসে একলা চিৎকার করে অনেকক্ষণ কাঁদলাম- তারপরেই আমার কান্না যেন সব ফুরিয়ে গেল- একটুও আর কান্না আসেনি
আম্মার মুখের দিকে তাকিয়ে শক্ত হয়ে আছি
কেঁদে তো আর ফিরে পাব না
কিন্তু তবু মাঝে মাঝে মনে হয় একটু প্রাণভরে কেঁদে মনটা হালকা করে নিই
কিন্তু চোখে কান্না যে আসে না! ক' রাত ভালোভাবে ঘুম আসে না- আর ঘুম যখন অজান্তেই এসে পড়ে তখন রীতিমতো নাইটমেয়ার দেখি
অথচ কল্পনা কর, আগে আমি কেমন ঘুমকাতুরে ছিলাম! এখন বিছানায় শুই ঠিকই, কিন্তু শান্তির বিছানায় নয়, দুশ্চিন্তার কোলে শুয়ে পড়ি
আব্বুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের ফলে আমি যেন হঠাৎ করেই সত্যিকারের বিচ্ছেদ বেদনা আবিষ্কার করি প্রথমবারের মতো
আমাদের জীবনের অনেকখানিই বদলে যায় রাতারাতি
এমনকি একমাত্র ভাই, সে সময়ের পাঁচ বছরের ছোট্ট সোহেলকেও পরিচিত হতে হয় জীবনের এই নতুন ধারার সঙ্গে
এই আবিষ্কারটি দুঃখজনক হলেও জীবনের পরম পাওয়াও বটে
জীবনের গভীরতম দুঃখবোধই বোধহয় পারে অন্যের গভীরতম বেদনার আরও কাছাকাছি হতে এবং ক্ষণস্থায়ী জীবনের এই বৃত্ত পেরিয়ে অসীম দিগন্তকে খুঁজতে
এই দ্বৈততার নামই হয়তো জীবনের প্যাকেজ ডিল
আব্বুর হত্যাকাণ্ডের পর আমার জীবনের প্রথম পাওয়া ডায়েরিটিতে আমি উজাড় করে লিখতাম মনের কথা
যে ব্যথা প্রকাশ করতে পারতাম না তা নিভৃতে ব্যক্ত করতাম ডায়েরির পাতায়
লেখার মধ্যে অতি কষ্টদায়ক এই শূন্যতাবোধকে রূপ দিয়ে যে অনেকটা সেলফ থেরাপির কাজ করছিলাম তা সেদিন জানার কথা ছিল না
পরে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাঙ্গনে শিশু মনস্তত্ত্বের ওপর লেখাপড়া শুরু করার পর বিষয়টি সমন্ধে জানা হয়
নব্বই দশকে বসনিয়ায় গণহত্যা বন্ধের আন্দোলনে যখন সরাসরি জড়িয়ে পড়ি, তখন বসনিয়ার শিশু-কিশোর যারা প্রত্যক্ষ করেছে নির্মমতা এবং প্রিয়জনের সহিংস মৃত্যু তাদেরকে বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে নানারূপে সহায়তা ছাড়াও, তাদের হাতে আমরা তুলে দিই রঙ-তুলি
শিশু-কিশোররা, যারা বেদনার ভারে কথা বলা প্রায় ভুলে গিয়েছিল, তারা কথা বলা শুরু করে রঙ-তুলির মাধ্যমে
তো পঁচাত্তরের সেই ডায়েরিটিই হয়ে যায় অনেকটা রঙ-তুলির মতো
নতুন বছরের শুভেচ্ছাস্বরূপ আব্বু-আম্মার কাছে অনেকেই ক্যালেন্ডার, অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক ইত্যাদি পাঠাতেন
সেভাবেই ডায়েরিটি পাওয়া
এই প্রাযুক্তিক ও ভোগবাদী যুগের বিস্ফোরণ তখনও ঘটেনি
নতুন বইয়ের গন্ধ, ডায়েরির মলাটের স্পর্শ, রোজার ঈদের চাঁদ দেখা সবই হৃদয়কে উদ্বেলিত করত নির্মল আনন্দে
নিখরচায় সেই নির্দোষ আনন্দপ্রাপ্তির মূল্য ছিল অমূল্য
আমি মনের আবেগে সেই ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেছিলাম বসন্তের আগমনী, নীল সাগর, জোসনা ও আব্বু-আম্মার সঙ্গে শ্রাবণের ঝড়ো হাওয়ায় বৃষ্টি দেখার মধুর স্মৃতি
স্মরণ করেছিলাম ১৮ এপ্রিলের দিনটিতে মহান বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়ে ইংরেজদের সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রামের কথা
তখন কে জানত যে এক স্বপ্নপিয়াসী কিশোরী ওই একই ডায়েরিতে ধারণ করবে তার জীবনের সবচেয়ে বেদনার স্মৃতি! মুক্তিযুদ্ধের কাণ্ডারি, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে আপোসহীন, নিষ্কলুষ নেতা তাজউদ্দীন আহমদের মর্মান্তিক ও অকাল মৃত্যুকে তাঁর কন্যা গেঁথে রাখবে রক্তাক্ষরে তার জীবনের প্রথম পাওয়া ডায়েরিটিতে
বুধবার, ৫ নভেম্বর, ১৯৭৫
"আমার জীবনে একি ঘটে গেল? কেন এমন ঘটল? আব্বু আর নেই
এ পৃথিবী ছেড়ে অনেক দূরে চলে গিয়েছে
গতকাল সকাল থেকেই শুনছিলাম আব্বুকে নাকি রোববার (দিবাগত) রাতে জেলে ঢুকে গুলি করে মেরেছে
আমি বিশ্বাস করিনি, হেসে উড়িয়ে দিয়েছি
ভেবেছি আব্বুকে মারবে কেন? মারবে কেন? হাসান ভাই (আমাদের ভাতৃসম পারিবারিক বন্ধু) ও আমি রিকশায় চড়লাম
আব্বুর খবর শুনলাম
(আম্মা, ছোট বোন রিমি ও আমি সারাদিন ধরে পাগলের মতো ঘুরছিলাম জেলে হত্যাকাণ্ডের গুজবের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য
হত্যাকাণ্ডের পর দুই দিন পর্যন্ত সরকারি প্রশাসন ও মিডিয়া এই বিষয়ে নিস্তব্ধ থাকে)
আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল
বাসায় এলাম
ঘরে গেলাম
চিৎকার করে সবার আড়ালে কাঁদলাম
কাঁদবার পর যেন পথ দেখতে পেলাম
আব্বু যেন হাসছে, বলছে, 'চিন্তা কোর না, সব ঠিক হয়ে যাবে!' মনকে শক্ত করলাম
যতক্ষণ লাশ না দেখেছি, বিশ্বাস করতে পারিনি
লাশ এল, দেখলাম
সবার সঙ্গে কাঁদলাম
তারপর থেকে আমার একি হল! আমার চোখে যে জল আসছে না
আমি পাথর হয়ে গেছি
আম্মার দিকে তাকিয়ে মনকে পাষাণ বেঁধেছি
আমরা শুধু আব্বুকে হারাইনি, সারা দেশের একটা সম্পদ হারিয়েছি
অমানুষিক হত্যা! জেলে ঢুকে রাতের বেলা পশুর মতো গুলি করে মেরেছে
আব্বু তো মরেনি, ঘুমিয়ে আছে সারা পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের অন্তরে
আব্বুর আদর্শ, আব্বুর কাজ, কত মহান লক্ষ্যের দিকে ধাবিত ছিল! দেশের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মুহূর্তেই যেন আব্বু দূরে চলে গেল! কে এখন পথ দেখাবে? আর তো কোনো নেতা নেই! আব্বু আমার আব্বু
স্বাধীনতা-উত্তরকালের অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সেদিনের রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্যদের কাছে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে দেশ যেভাবে চলছে, বঙ্গবন্ধু বাঁচবেন না, ওনাদেরকেও বাঁচিয়ে রাখা হবে না এবং দেশ চলে যাবে গণহত্যাকারী স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাতে
১৯৭৪ সালের শুরু থেকেই তিনি এ কথা বলা শুরু করছিলেন
প্রখর দূরদর্শী, অপ্রিয় সত্যভাষী ও সৎপরামর্শক তাজউদ্দীন আহমদের সতর্কবাণী ও উপদেশ সেদিন শুধু অগ্রাহ্যই হয়নি, ওনাকেই বরং অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে সরে যেতে হয়েছিল
তাজউদ্দীন আহমদের আশংকা ও ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছিল
বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবারবর্গ ও জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে আসন গেড়ে নেয় সুদীর্ঘকালের জন্য
যার অশুভ জের আজও চলছে
শক্তিশালী আন্তর্জাতিক চক্রের যোগসাজশে ১৫ আগস্টে সংঘটিত সামরিক অভ্যুথান ও নভেম্বর মাসের জেলহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল সেই বেসামরিক চক্র যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে সিআইএ-পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করছিল এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যাদের ষড়যন্ত্রকে বলিষ্ঠভাবে প্রতিহত করেছিলেন
প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক প্রয়াত ক্রিস্টোফার হিচিন্স তাঁর সাড়াজাগানো "দা ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার" গ্রন্থে (২০০১) উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস বেসরকারি সংগঠনটি ১৫০ জনের বেশি স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা ও সিআইএ এজেন্টদের সাক্ষাৎকার নেবার মাধ্যমে গণহত্যার সঙ্...
রিপোর্টটি জনসমক্ষে প্রকাশ না করা হলেও সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলয সেই রিপোর্ট পড়ার সুযোগ পান
রিপোর্টটিতে ১৯৭১ সালে কিসিঞ্জারের প্ররোচনায় এবং খন্দকার মোশতাকের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বিলম্বিত করার উদ্যোগ এবং মোশতাকের ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করার বিষয়টি উল্লিখিত হয়
লিফশুলয তাঁর নিজের সাড়াজাগানো বই "বাংলাদেশ দা আনফিনিশড রেভুলুশন" গ্রন্থেও এ বিষয়ে উল্লেখ করেন যে, নিরঙ্কুশ এবং আপোসহীন স্বাধীনতা অর্জনের পক্ষে তাজউদ্দীন আহমদের শক্ত অবস্থানের কারণেই কিসিঞ্জার গোপনে বেছে নিয়েছিল খন্দকার মোশতাক ও তার অনুসারীদের
লিফশুলযের তথ্যানুসন্ধানের মাধ্যমে আরও জানা যায় যে, ১৯৭৫ সালে ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ডেভিড ইউজিন বোস্টার ওয়াকিবহাল ছিলেন যে মুজিবের বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভ্যূত্থান সংগঠিত হতে চলেছে
অভ্যূত্থানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে মার্কিন দূতাবাসের আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল