content
stringlengths
0
129k
ছোট সাইকেলও এসেছে, কিন্তু কিছুক্ষণ পরপরই ও আব্বার কাছে চলে যেত
ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা ৩২ নম্বর সড়কে আমাদের বাসায় ফিরে এলাম
বাসাটা মেরামত করা হয়েছে
রাসেলের মুখে হাসি, সারা দিন খেলা নিয়ে ব্যস্ত
এর মাঝে গণভবনও মেরামত করা হয়েছে
পুরনো গণভবন বর্তমানে সুগন্ধাকে প্রধানমন্ত্রীর কর্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হতো
এবার গণভবন ও তার পাশেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কার্যক্রম শুরু করা হলো
গণভবন প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসস্থান আর এর পাশেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে, ভেতর থেকে রাস্তা ছিল, হেঁটেই কার্যালয়ে যাওয়া যেত
আব্বা প্রতিদিন সকালে অফিসে আসতেন, দুপুরে গণভবনে বিশ্রাম নিতেন, এখানেই খাবার খেতেন
বিকেলে হাঁটতেন আর এখানেই অফিস করতেন
রাসেল প্রতিদিন বিকেলে গণভবনে আসত
তার সাইকেলটাও সাথে আসত
রাসেলের মাছ ধরার খুব শখ ছিল
কিন্তু মাছ ধরে আবার ছেড়ে দিতো
মাছ ধরবে আর ছাড়বে এটাই তার খেলা ছিল
একবার আমরা সবাই মিলে নাটোরে উত্তরা গণভবনে যাই
সেখানেও সারা দিন মাছ ধরতেই ব্যস্ত থাকতো
রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তি হয়
তবে স্কুলে যেতে মাঝে মধ্যেই আপত্তি জানাত
তখন আমরা ছোটবেলা থেকে যে শিক্ষকের কাছে পড়েছি তার কাছে পড়বে না
তখন ও স্কুলে ভর্তি হয় নি এটা স্বাধীনতার আগের ঘটনা, তার পছন্দ ছিল ওমর আলীকে
বগুড়ায় বাড়ি
দি পিপল পত্রিকার অ্যাডে কণ্ঠ দিয়েছিল, টেলিভিশনে ইংরেজি খবর পড়ত
মাঝে মধ্যে আমাদের বাসায় আসত, তখন রাসেলের জন্য অনেক 'কমিক' বই নিয়ে আসত এবং রাসেলকে পড়ে শোনাত
যা হোক স্বাধীনতার পরে একজন ভদ্র মহিলাকে রাসেলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো
রাসেলকে পড়ানো খুব সহজ কথা ছিল না
শিক্ষককে তার কথাই শুনতে হতো
প্রতিদিন শিক্ষয়িত্রীকে দুটো করে মিষ্টি খেতে হবে
আর এ মিষ্টি না খেলে সে পড়বে না
কাজেই শিক্ষিকাকে খেতেই হতো
তা ছাড়া সব সময় তার লক্ষ্য থাকত শিক্ষিকার যেন কোনও অসুবিধা না হয়
মানুষকে আপ্যায়ন করতে খুই পছন্দ করত
টুঙ্গিপাড়া গ্রামের বাড়িতে গেলে তার খেলাধুলার অনেক সাথী ছিল
গ্রামের ছোট ছোট অনেক বাচ্চাদের জড়ো করত
তাদের জন্য ডামি বন্দুক বানিয়ে দিয়েছিল
সে-ই বন্দুক বানিয়ে দিয়েছিল
সেই বন্দুক হাতে তাদের প্যারেড করাত
প্রত্যেকের জন্য খাবার কিনে দিত
রাসেলের খুদে বাহিনীর জন্য জামা-কাপড় ঢাকা থেকেই কিনে দিতে হতো
মা কাপড়-চোপড় কিনে টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যেতেন
রাসেল সেই কাপড় তার খুদে বাহিনীকে দিত
সব সময় মা কাপড়-চোপড় কিনে আলমারিতে রেখে দিতেন
নাসের কাকা রাসেলকে এক টাকা নোটের বাণ্ডিল দিতেন
খুদে বাহিনীকে বিস্কুট লজেন্স কিনে খেতে টাকা দিত
প্যারেড শেষ হলেও তাদের হাতে টাকা দিত
এই খুদে বাহিনীকে নিয়ে বাড়ির উঠোনেই খেলা করতো
রাসলেকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করতো, বড় হয়ে তুমি কি হবে? তাহলে বলতো, আমি আর্মি অফিসার হব
ওর খুব ইচ্ছা ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেবে
মুক্তিযুদ্ধের চলাকালীন থেকেই ওর ওই ইচ্ছা
কামাল ও জামাল মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর সব গল্প বলার জন্য আবদার করতো
খুব আগ্রহ নিয়ে শুনতো
রাসেল আব্বাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতো
আব্বাকে মোটেই ছাড়তে চাইতো না
যেখানে যেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব আব্বা সেখানে তাকে নিয়ে যেতেন
মা ওর জন্য প্রিন্স স্যুট বানিয়ে দিয়েছিলেন
কারণ আব্বা প্রিন্স স্যুট যেদিন পরতেন রাসেলও পরতো
কাপড়-চোপড়ের ব্যাপারে ছোটবেলা থেকেই তার নিজের পছন্দ ছিল
তবে একবার একটা পছন্দ হলে তা আর ছাড়তে চাইতো না
ওর নিজের আলাদা একটা ব্যক্তিত্ব ছিল
নিজের পছন্দের ওপর খুব বিশ্বাস ছিল
খুব স্বাধীন মত নিয়ে চলতে চাইতো
ছোট মানুষটার চরিত্রের দৃঢ়তা দেখে অবাক হতে হতো
বড় হয়ে সে যে বিশেষ কেউ একটা হবে তাতে কোনও সন্দেহ ছিল না
জাপান থেকে আব্বার রাষ্ট্রীয় সফরের দাওয়াত আসে
জাপানিরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দেয়
শরণার্থীদের সাহায্য করে জাপানের শিশুরা তাদের টিফিনের টাকা দেয় আমাদের দেশের শিশুদের জন্য
সেই জাপান যখন আমন্ত্রণ জানায় তখন গোটা পরিবারকেই আমন্ত্রণ দেয় বিশেষভাবে রাসেলের কথা উল্লেখ করে
রাসেল ও রেহানা আব্বার সাথে জাপান যায়
রাসেলের জন্য বিশেষ কর্মসূচিও রাখে জাপান সরকার
খুব আনন্দ করেছিল রাসেল সেই সফরে
তবে মাকে ছেড়ে কোথাও ওর থাকতে কষ্ট হয়
সারাদিন খুব ব্যস্ত থাকতো কিন্তু রাতে আব্বার কাছেই ঘুমাতো
আর তখন মাকে মনে পড়ত
মার কথা মনে পড়লেই মন খারাপ করতো
আব্বার সঙ্গে দেশেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দিতো
আব্বা নেভির কর্মসূচিতে যান
সমুদ্রে জাহাজ কমিশন করতে গেলে সেখানে রাসেলকে সাথে নিয়ে যান
খুব আনন্দ করেছিল ছোট্ট রাসেল
রাসেলের একবার খুব বড় অ্যাকসিডেন্ট হলো
সে দিনটার কথা এখনও মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে
রাসেলের একটা ছোট মপেট মোটরসাইকেল ছিল আর একটা সাইকেলও ছিল
বাসায় কখনও রাস্তায় সাইকেল নিয়ে চলে যেত
পাশের বাড়ির ছেলেরা ওর সঙ্গে সাইকেল চালাতো
আদিল ও ইমরান দুই ভাই এবং রাসেল একসঙ্গে খেলা করতো
একদিন মপেট চালানোর সময় রাসেল পড়ে যায় আর ওর পা আটকে যায় সাইকেলের পাইপে
বেশ কষ্ট করে পা বের করে
আমি বাসার উপর তলায় জয় ও পুতুলকে নিয়ে ঘরে
হঠাৎ রাসেলের কান্নার আওয়াজ পাই
ছুটে উত্তর- পশ্চিমের খোলা বারান্দায় চলে আসি, চিৎকার করে সবাইকে ডাকি
এর মধ্যে দেখি কে যেন ওকে কোলে নিয়ে আসছে
পায়ের অনেকখানি জায়গা পুড়ে গেছে
বেশ গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হযেছে
ডাক্তার এসে ওষুধ দিল
অনেকদিন পর্যন্ত পায়ের ঘা নিয়ে কষ্ট পেয়েছিল
এর মধ্যে আব্বা অসুস্থ হয়ে পড়েন
রাশিয়া যান চিকিৎসা করাতে
সেখানে রাসেলের পায়ে চিকিৎসা হয়
কিন্তু সারতে অনেক সময় নেয়
আমাদের সবার আদরের ছোট ভাইটি
ওর ছোটবেলার কথা মনে পড়ে