content stringlengths 0 129k |
|---|
নিজের পছন্দমতো খাবারগুলো টমিকে ভাগ দেবেই, কাজেই সেই টমি বকা দিলে দুঃখ তো পাবেই |
১৯৬৯ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি প্রায় তিন বছর পর আব্বা গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যখন মুক্তি পান তখন রাসেলের বয়স চার বছর পার হয়েছে |
কিন্তু ভীষণ রোগা হয়ে গিয়েছিল বলে আরও ছোট্ট দেখাতো |
ওর মধ্যে আর একটি জিনিস আমরা লক্ষ্য করলাম |
খেলার ফাঁকে ফাঁকে কিছুক্ষণ পরপরই আব্বাকে দেখে আসত |
আব্বা নিচে অফিস করতেন |
আমরা তখন দোতলায় উঠে গেছি |
ও সারাদিন নিচে খেলা করত |
আর কিছুক্ষণ পরপর আব্বাকে দেখতে যেত |
মনে মনে বোধহয় ভয় পেত যে আব্বাকে বুঝি আবার হারায় |
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে, তখন বাসার সামনে দিয়ে মিছিল যেত আর মাঝে মধ্যে পুলিশের গাড়ি চলাচল করত |
দোতলায় বারান্দায় রাসেল খেলা করত, যখনই দেখত পুলিশের গাড়ি যাচ্ছে তখনই চিৎকার করে বলত, 'ও পুলিশ কাল হরতাল' |
যদিও ওই ছোট্ট মানুষের কণ্ঠস্বর পুলিশের কানে পৌঁছত না কিন্তু রাসেল হরতালের কথা বলবেই |
বারন্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে 'হরতাল হরতাল' বলে চিৎকার করত |
স্লোগান দিত 'জয় বাংলা' |
আমরা বাসায় সবাই আন্দোলনের ব্যাপারে আলোচনা করতাম, ও সব শুনত এবং নিজেই আবার তা বলত |
১৯৭১ সালের পঁচিশ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হামলা চালালে আব্বা স্বাধীনতার ঘোষণা দেন |
ছাব্বিশ মার্চ প্রথম প্রহরের পরপরই আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় |
পরদিন আবার আমাদের বাসা আক্রমণ করে |
রাসেলকে নিয়ে মা ও জামাল পাশের বাসায় আশ্রয় নেন |
কামাল আমাদের বাসার পেছনে জাপানি কনস্যুলেটের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেয় |
কামাল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চলে যায় |
আমার মা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হন |
আমাদের ধানমণ্ডির ১৮ নম্বর সড়কে (পুরাতন) একটা একতলা বাসায় বন্দি করে রাখে |
ছোট্ট রাসেলও বন্দি জীবনযাপন করতে শুরু করে |
ঠিকমতো খাবার-দাবার নেই |
কোনো খেলনা নেই, বইপত্র নেই, কী কষ্টের দিন যে ওর জন্য শুরু হলো |
বন্দিখানায় থাকতে আব্বার কোনও খবরই আমরা জানি না |
কোথায় আছেন কেমন আছেন কিছুই জানি না |
প্রথম দিনে রাসেল আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করত |
তার ওপর আদরের কামাল ভাইকে পাচ্ছে না, সেটাও ওর জন্য কষ্টকর |
মনের কষ্ট কীভাবে চেপে রাখবে আর কীভাবেই বা ব্যক্ত করকে |
চোখের কোণে সব সময় পানি |
যদি জিজ্ঞাসা করতাম, 'কি হয়েছে রাসেল?' বলত 'চোখে ময়লা' |
ওই ছোট্ট বয়সে সে চেষ্টা করত মনের কষ্ট লুকাতে |
মাঝে মধ্যে রমার কাছে বলত |
রমা ছোট থেকেই আমাদের বাসায় থাকতো, ওর সাথে খেলতো |
পারিবারিকভাবে ওদের বংশ পরম্পরায় আমাদের বাড়িতে বিভিন্ন কাজ করত |
ওকে মাঝে মধ্যে দুঃখের কথা বলত |
ওর চোখে পানি দেখলে যদি জিজ্ঞেস করতাম, বলত চোখে কী হয়েছে |
অবাক লাগত এটুকু একটা শিশু কীভাবে নিজের কষ্ট লুকাতে শিখল |
আমরা বন্দিখানায় সব সময় দুঃশ্চিন্তায় থাকতাম, কারণ পাকবাহিনী মাঝে মধ্যেই ঘরে এসে সার্চ করত |
আমাদের নানা কথা বলত |
জামালকে বলত, তোমাকে ধরে নিয়ে শিক্ষা দেব |
রেহানাকে নিয়েও খুব চিন্তা করতো |
জয় এরই মধ্যে জন্ম নেয় |
জয় হওয়ার পর রাসেল যেন একটু আনন্দ পায় |
সারাক্ষণ জয়ের কাছে থাকত |
ওর খোঁজ নিতো |
যখন ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধ শুরু হয় তখন তার জয়কে নিয়েই চিন্তা |
এর কারণ হলো, আমাদের বাসার ছাদে বাংকার করে মেশিনগান বসানো ছিল, দিন-রাতই গোলাগুলি করত |
প্রচণ্ড আওয়াজ হতো |
জয়কে বিছানায় শোয়াতে কষ্ট হতো |
এটুকু ছোট্ট বাচ্চা মাত্র চার মাস বয়স, মেশিনগানের গুলিতে কেঁপে কেঁপে উঠত |
এরপর শুরু হল এয়ার রেইড |
আক্রমণের সময় সাইরেন বাজত |
রাসেল এ ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিল |
যখনই সাইরেন বাজত বা আকাশে মেঘের মতো আওয়াজ হত, রাসেল তুলা নিয়ে এসে জয়ের কানে গুঁজে দিত |
সব সময় পকেটে তুলা রাখত |
সে সময় খাবারের কষ্টও ছিল, ওর পছন্দের কোনো খাবার দেওয়া সম্ভব হতো না |
দিনের পর দিন বন্দি থাকা, কোনো খেলার সাথি নেই |
পছন্দমতো খাবার পাচ্ছে না একটা ছোট বাচ্চার জন্য কত কষ্ট নিয়ে দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে তা কল্পনাও করা যায় না |
রাসেল অত্যন্ত মেধাবী ছিল |
পাকসেনারা তাদের অস্ত্রশস্ত্র পরিস্কার করত |
ও জানালায় দাঁড়িয়ে সব দেখত |
অনেক অস্ত্রের নামও শিখেছিল |
যখন এয়ার রেইড হতো তখন পাকসেনারা বাংকারে ঢুকে যেত আর আমরা তখন বারান্দায় বের হওয়ার সুযোগ পেতাম |
আকাশে যুদ্ধবিমানের 'ডগ ফাইট' দেখারও সুযোগ হয়েছিল |
প্লেন দেখা গেলেই রাসেল খুশি হয়ে হাতে তালি দিত |
ষোল ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সারেন্ডার হয়, পাকিস্তান যুদ্ধে হেরে যায়, বাংলাদেশ মুক্ত হয় |
আমরা সেদিন মুক্তি পাইনি |
আমরা মুক্তি পাই ১৭ ডিসেম্বর সকালে |
যে মুহূর্তে আমরা মুক্ত হলাম এবং বাসার সৈনিকদের ভারতীয় মিত্রবাহিনী বন্দি করল, তারপর থেকে আমাদের বাসায় দলে দলে মানুষ আসতে শুরু করল |
এর মধ্যে রাসেল মাথায় একটা হেলমেট পরে নিল, সাথে টিটোও একটা পরল |
দুইজন হেলমেট পরে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা শুরু করল |
আমরা তখন একদিকে মুক্তির আনন্দে উদ্বেলিত আবার আব্বা, কামাল, জামালসহ অগণিত মানুষের জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত |
কে বেঁচে আছে কে নেই কিছুই তো জানি না |
এক অনিশ্চয়তার ভার বুকে নিয়ে বিজয়ের উল্লাস করছি |
চোখে পানি, মুখে হাসি--এই ক্ষণগুলো ছিল অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে, কখও হাসছি কখনও কান্নাকাটি করছি |
আমাদের কাঁদতে দেখলেই রাসেল মন খারাপ করত |
ওর ছোট্ট বুকের ব্যথা আমরা কতটুকু অনুভব করতে পারি? এর মধ্যে কামাল ও জামাল রণাঙ্গন থেকে ফিরে এসেছে |
রাসেলের আনন্দ ভাইদের পেয়ে, কিন্তু তখন তার দু'চোখ ব্যথায় ভরা, মুখফুটে বেশি কথা বলত না |
কিন্তু ওই দুটো চোখ যে সব সময় আব্বাকে খঁজে বেড়াচ্ছে তা আমি অনুভব করতে পারতাম |
আমরা যে বাসায় ছিলাম তার সামনে বাড়িভাড়া নেওয়া হলো |
কারণ এত মানুষ আসছে যে বসারও জায়গা দেওয়া যাচ্ছে না |
এদিকে আমাদের ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বাসা লুটপাট করে বাথরুম, দরজা-জানলা সব ভেঙে রেখে গেছে পাকসেনারা |
মেরামত না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকতে হবে |
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি আব্বা ফিরে এলেন বন্দিখানা থেকে মুক্তি পেয়ে |
আমার দাদা রাসেলকে নিয়ে এয়ারপোর্ট গেলেন আব্বাকে আনতে |
লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল সেদিন, আব্বা প্রথম গেলেন তার প্রিয় মানুষের কাছে |
তারপর এলেন বাড়িতে |
আমরা সামনের বড় বাড়িটায় উঠলাম |
ছোট যে বাসাটায় বন্দি ছিলাম সে বাসাটা দেশ-বিদেশ থেকে সব সময় সাংবাদিক ফটোগ্রাফার আসত আর ছবি নিত |
মাত্র দুটো কামরা ছিল |
আব্বার থাকার মতো জায়গা ছিল না এবং কোনও ফার্নিচারও ছিল না |
যা হোক, সব কিছু তড়িঘড়ি করে জোগাড় করা হলো |
রাসেলের সব থেকে আনন্দের দিন এলো যেদিন আব্বা ফিরে এলেন |
এক মুহূর্তে যেন আব্বাকে কাছছাড়া করতে চাইত না |
সব সময় আব্বার পাশে পাশে ঘুরে বেড়াত |
ওর জন্য ইতোমধ্যে অনেক খেলনাও আনা হয়েছে |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.