content stringlengths 0 129k |
|---|
আমাকে হাসুপা বলে ডাকত |
কামাল ও জামালকে ভাই বলত আর রেহানাকে আপু |
কামাল ও জামালের নাম কখনও বলতো না |
আমরা অনেক চেষ্টা করতাম নাম শেখাতে, মিষ্টি হেসে মাথা নেড়ে বলতো ভাই |
দিনের পর দিন আমরা যখন চেষ্টা করে যাচ্ছি- একদিন বলেই ফেলল 'কামমাল', 'জামমাল' |
তবে সব সময় ভাই বলেই ডাকত |
চলাফেরায় বেশ সাবধানি কিন্তু সাহসী ছিল, সহসা কোনও কিছুতে ভয় পেতো না |
কালো কালো বড় পিপড়া দেখলে ধরতে যেত |
একদিন একটা বড় ওলা (বড় কালো পিঁপড়া) ধরে ফেললো আর সাথে সাথে কামড় খেল |
ছোট্ট আঙ্গুল কেটে রক্ত বের হলো |
সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ দেওয়া হলো |
আঙ্গুলটা ফুলে গেছে |
তারপর থেকে আর পিঁপড়া ধরতে যেত না |
কিন্তু ওই পিঁপড়ার একটা নাম নিজেই দিয়ে দিল |
কামড় খাওয়ার পর থেকেই কালো বড় পিপড়া দেখলেই বলতো 'ভুট্টো' |
নিজে থেকেই নামটা দিয়েছিল |
রাসেলের কথা ও কান্না টেপরেকর্ডারে টেপ করতাম |
তখনকার দিনে বেশ বড় টেপরেকর্ডার ছিল |
এর কান্না মাঝে মাঝে ওকেই শোনাতাম |
সব থেকে মজা হতো ও যদি কোনও কারণে কান্নাকাটি করতো, আমরা টেপ ছেড়ে দিতাম, ও তখন চুপ হয়ে যেত |
অবাক হতো মনে হয় |
একদিন আমি রাসেলের কান্না টেপ করে বারবার বাজাচ্ছি, মা ছিলেন রান্নাঘরে |
ওর কান্না শুনে মা ছুটে এসেছেন |
ভেবেছিলেন ও বোধহয় একা, কিন্তু এসে দেখেন আমি টেপ বাজাচ্ছি আর ওকে নিয়ে খেলছি |
মার আর কী বলবেন |
প্রথমে বকা দিলেন, কারণ মা খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন ও একা আছে মনে করে |
তারপর হেসে ফেললেন ওর টেপ করা কান্না শুনে |
আমি ওকে দিয়ে কথা বলিযে টেপ করতে চেষ্টা করছিলাম |
আব্বা যখন ৬-দফা দিলেন তারপরই তিনি গ্রেফতার হয়ে গেলেন |
রাসেলের মুখে হাসিও মুছে গেল |
সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে রাসেল আব্বাকে খুঁজত |
রাসেল যখন কেবল হাঁটতে শিখেছে, আধো আধো কথা বলতে শিখেছে, আব্বা তখনই বন্দি হয়ে গেলেন |
মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আব্বার মামলা-মকদ্দমা সামলাতে, পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা |
সংগঠনকে সক্রিয় রেখে আন্দোলন-সংগ্রাম চালাতেও সময় দিতে হতো |
আমি কলেজে পড়ি, সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিতে সক্রিয় হযে কাজ শুরু করি |
কামাল স্কুল শেষ করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয় |
সেও রাজনীতিতে যোগ দেয় |
জামাল ও রেহানা স্কুলে যায় |
আব্বা গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই রাসেলের খাওয়া-দাওয়া একরকম বন্ধ হয়ে যায় |
কিছু খেতে চাইতো না |
ওকে মাঝে মাঝ ছোট ফুফুর বাসায় নিয়ে যেতাম |
সেখানে গেলে আমার ছোট ফুফার সাথে বসে কিছু খেতে দিতেন |
ছোট ফুফা ডিম পোচের সাথে চিনি দিয়ে রাসেলকে খেতে দিতেন |
ঢেঁড়স ভাজির সাথেও চিনি দিয়ে রুটি খেতেন, রাসেলকেও খাওয়াতেন |
আমাদের বাসায় আম্বিয়ার মা নামে এক বুয়া ছিল, খুব আদর করতো রাসেলকে |
কোলে নিয়ে ঘুরে ঘুরে খাবার খাওয়াতো |
আমাদের বাসায় কবুতরের ঘর ছিল |
বেশ উঁচু করে ঘর করা হয়েছিল |
অনেক কবুতর থাকতো সেখানে |
মা খুব ভোরে উঠতেন, রাসেলকে কোলে নিয়ে নিচে যেতেন এবং নিজের হাতে কবুতরদের খাবার দিতেন |
রাসেল যখন হাঁটতে শেখে তখন নিজেই কবুতরের পেছনে ছুটত, নিজে হাতে করে তাদের খাবার দিত |
আমাদের গ্রামের বাড়িতেও কবুতর ছিল |
কবুতরের মাংস সবাই খেত |
বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন অধিকাংশ জমি পানির নিচে থাকতো তখন তরকারি ও মাছের বেশ অভাব দেখা দিত |
তখন প্রায়ই কবুতর খাওয়ার রেওয়াজ ছিল |
সকালের নাস্তার জন্য পরোটা ও কবুতরের মাংস ভুনা সবার প্রিয় ছিল |
তাছাড়া কারও অসুখ হলে কবুতরের মাংসের ঝোল খাওয়ানো হতো |
ছোট ছোট বাচ্ছাদের কবুতরের স্যুপ করে খাওয়ালে রক্ত বেশি হবে, তাই বাচ্চাদের নিয়মিত কবুতরের স্যুপ খাওয়াতো |
রাসেলকে কবুতর দিলে কোনও দিন খেত না |
এত ছোট বাচ্চা কিভাবে যে টের পেত কে জানে |
ওকে আমরা অনেকভাবে চেষ্টা করেছি |
ওর মুখের কাছে নিলেও খেত না |
মুখ ফিরিয়ে নিত |
শত চেষ্টা করলেও কোনোদিন কেউ ওকে কবুতরের মাংস খাওয়াতে পারে নি |
আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম |
রাসেলকে নিয়ে গেলে আর আসতে চাইতো না |
খুবই কান্নাকাটি করতো |
ওকে বোঝানো হয়েছিল যে আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি |
আমরা বাসায় ফেরত যাবো |
বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফেরত আনা হতো |
আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো তা আমরা বুঝতে পারতাম |
বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতো এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন |
মাকেই আব্বা বলে ডাকতো |
১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি আব্বাকে আগরতলা মামলায় আসামি করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে বন্দি করে রাখে |
ছয় মাস আব্বার সঙ্গে দেখা হয়নি |
আমরা জানতেও পারিনি আব্বা কেমন আছেন, কোথায় আছেন |
রাসেলের শরীর খারাপ হয়ে যায় |
খাওয়া-দাওয়া নিয়ে আরও জেদ করতে শুরু করে |
ছোট্ট বাচ্চা মনের কষ্টের কথা মুখ ফুটে বলতেও পারে না, আবার সহ্যও করতে পারে না |
কী যে কষ্ট ওর বুকের ভেতরে তা আমরা বুঝতে পারতাম |
কলেজ শেষ করে ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই |
মা আব্বার মামলা ও পার্টি নিয়ে ব্যস্ত |
প্রায়ই বাসার বাইরে যেতে হয় |
মামলার সময় কোর্টে যান |
আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন জোরদার করার জন্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ১৯৬৮ সালে ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন নিয়ে সবাই ব্যস্ত |
আন্দোলন সংগ্রাম তখন জোরদার হয়েছে |
রাসলকে সময় দিতে পারি না বেশি |
আম্বিয়ার মা সব সময় দেখে রাখতো |
এমনি খাবার খেতে চাইত না কিন্তু রান্নাঘরে যখন সবাই খেত তখন সবার সঙ্গে বসতো |
পাশের ঘরে বসে লাল ফুল আঁকা থালায় করে পিঁড়ি পেতে বসে কাজের লোকদের সঙ্গে ভাত খেতে পছন্দ করতো |
আমাদের একটা পোষা কুকুর ছিল; ওর নাম টমি |
সবার সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব ছিল |
ছোট্ট রাসেলও টমিকে নিয়ে খেলতো |
একদিন খেলতে খেলতে হঠাৎ টমি ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে, রাসেল ভয় পেয়ে যায় |
কাঁদতে কাঁদতে রেহানার কাছে এসে বলে, টমি বকা দিচ্ছে |
তার কথা শুনে আমরা তো হেসেই মরি |
টমি আবার কিভাবে বকা দিল |
কিন্তু রাসেলকে দেখে মনে হলো বিষয়টা নিয়ে সে বেশ বেশ গম্ভীর |
টমি তাকে বকা দিয়েছে এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না, কারণ টমিকে সে খুব ভালোবাসতো |
হাতে করে খাবার দিত |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.