content
stringlengths
0
129k
একটু যদি পরিষ্কার করত ঘরটা
আমি কিছু বললাম না
সবার চোখেমুখে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছু নজড়ে পড়ল না
এমন কক্ষ যত পরিষ্কার করা হবে তত অপরিষ্কার হবে
আল্পনা-কল্পনা রাকুর বকার ভয়ে কাঁপছে, কিন্তু রাকু বকল না
রুমে ফ্যান আছে, তবে বন্ধ
জানালাও দেখা গেল না
ঘুলঘুলিই একমাত্র ভরসা
তাও মাকড়সার জাল, চুলোর ধোঁয়া আর ধুলোবলিতে ঢেকে
প্রচণ্ড গরম লাগছে
চারদিকের টিনগুলো চুলোর গরম কড়াই যেন
ছ্যাঁদাগুলোই কেবল হাওয়া পাওয়ার পথ
কয়েক মিনিটের মধ্যে আমার জামাকাপড় ঘামে ভিজে জবজবে
রাকু আমাকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে চাইল
নিষেধ করায় থেমে গেল
ফ্যান চালাও না? প্রশ্ন করলাম
রাকু বলল, স্যার, ফ্যান চালালে মাসে অতিরিক্ত চারশ টাকা দিতে হয়
লাইন নেই, ফ্যানটাও নষ্ট
: এত কম আলোর লাইট কেন?
: এর বেশি হলে প্রতিমাসে আরও পঞ্চাশ টাকা করে দিতে হবে
আল্পনা আর কল্পনা আমার পরিচয় পেয়ে দুদিক হতে জাপটে ধরল
এমন গভীর পরশ অতুলনীয়
মনে হলো, তাদের মৃত বাবা সম্পদের পাহাড় হয়ে ফিরে এসেছে
রাকু ফরসা নয়, কিন্তু সুন্দর, চেহারায় গোধূলির মায়া
চোখ দুটো দেখলে স্নেহভরা আকর্ষণ অনুভূত হয়
এমন চোখ বস্তিতে একদম বেমানান
আল্পনা-কল্পনা ফরসা - মুখটা না গোল না লম্বা
পুরো শরীরে চামড়া আর হাড় ছাড়া মাংসের চিহ্ন তেমন একটা চোখে পড়ল না
বুড়ির বাসায় একবেলা খেতে না পেলে রাকুর অবস্থাও করুণ হতো
মাথা ন্যাড়া করে ফেলায় দুই বোনকে আরও রুগ্‌ণ দেখাচ্ছে
মনে হলো দুটো শুকনো শলা বাতাসে নড়ছে-উড়ে যাবে তাই
মশারির নিচে আবার চোখ দিলাম
টুটুলের ঘুম তখনো ভাঙেনি
ভালোভাবে তাকিয়ে দেখলাম, শিশু নয় যেন ঘুমন্ত কঙ্কাল
অভাবের ধাক্কায় সবকটি হাড় চামড়া ফুঁড়ে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছে
: রাকু, তোমার ভাইবোন দেখতে বেশ
: স্যার, আল্পনা-কল্পনা পেয়েছে মায়ের রং
টুটুল বাবার মতো হয়েছে
আমি বললাম, এখান থেকে কিছু নিয়ে যাওয়ার আছে কি?
রাকু টেবিলে ইশারা দিয়ে বলল, এটা কেনার জন্য বাবা ভিক্ষা পর্যন্ত করেছেন
আমি বললাম, টেবিল আর বইগুলোই শুধু নাও
কল্পনা বলল, আমাদের জামাকাপড়? টুটুলের মার্বেল, ডাস্টবিনে কুঁড়িয়ে পাওয়া পুতুল, আল্পনাপুর চিরুনি, আমাদের বাক্স?
বাক্সের দিকে তাকালাম
চৌকোনা একটা টিনের বাক্স
এগিয়ে যেতেই সুড়ুৎ করে কয়েকটি ইঁদুর বাক্স থেকে বেরিয়ে পালিয়ে গেল
আরও কাছে গিয়ে দেখলাম বাক্সের এক কোনায় ইঁদুর-সাইজের একটি ছ্যাঁদা
এটাই কি তোমাদের বাক্স?
কল্পনা বাক্সটি জড়িয়ে ধরে বলল, হ্যাঁ
কী আছে ওখানে? জানতে চাইলাম
রাকু বাক্সটা খুলল
আলনার কাপড়ের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম পুরানো কয়েকটি ফ্রক-জামা, একটি চাদর, একটি অ্যালবাম, চার জোড়া কাপ-পিরিস, ম্যালামাইনের চারটা প্লেট, চারটা গ্লাস, সস্তা দামের কিছু অলংকার, প্লাস্টিকের দুটো বল, কয়েকটা মার্বেল - টাকার হিসাবে সব মিলিয়ে পাঁচশ টাকার বেশি হবে না
বস্তিঘরের মালিককে খবর দেওয়া হলো
তিনি কাছেই ছিলেন, খবর পাওয়ামাত্র চলে এলেন
ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি
বেশ সুঠাম দেহ
দাড়িগুলো মেহেদিরঙে রঞ্জিত
আমি সালাম দিলাম
ভদ্রলোক কোনোরূপ ভদ্রতা না-দেখিয়ে বললেন, মুই এই বস্তিগো সর্দার, মালিক বি কইতে পারেন
মুই বাংলাদেশের হক্কল ভাষায় বইলতে পারি
মুর নামডা মাজিদ, তই মাইনষ্যে কসাই মইজ্যা ডাহে, বুইজলাইননি? গোরুর মতো মানুষ কাইটা আরাম পাই
আমি বললাম, রাকুদের নিয়ে যেতে এসেছি
: কহন যাইব?
: আজকে, এক্ষুনি
কোনো পাওনা থাকলে বলুন
কসাই মইজ্যা বললেন, তিন মাস সাত দিনের ভাড়া পাইবাম
শোধ না-কইরলে নইড়তেও দিমু না কইলাম
হিসাব করে ভাড়াটা বুঝিয়ে দিলাম
ভাড়া পেয়ে কসাই মইজ্যা খুশি হলেন না, বরং বেজার হয়ে গেলেন
চাপা রাগে উপহাস ঢেলে বললেন, সায়েব অইব না
মাইয়াগো মুর বস্তিতে দুই সাল থাইকতে অইব
: কেন?
: ভাড়া দেড় আজার ট্যাকা
মাইয়া মানুষ বইলা একআজার ট্যাকায় ভাড়া দিছিলাম
ভাইবছিলাম এমন ডাঙ্গর মাইয়া, ফিউচারে কাজে লাইগবার পারে
আমার বুকটা বেবাক খালি কইরা আপনে ফুর্তি করার লাইগা লিয়া যাইবেন, অইত না
আপনে যান, চেমরিগো আমার লাইগবো
কী কইছি হুইনছন?
স্যমন্তক সিরিজের, দ্বিতীয় উপন্যাস
পুথিনিলয়
বাপডা মইরা ভালোই অইছে
অহন পথ ক্লিয়ার
আমি রাগের গলায় বললাম, আপনি কিন্তু সীমা লংঘন করছেন!
: সায়েব চিমা-টিমা রাহেন
এটা আমাগো রাইজ্য
জন্ম আমার পাকিস্তান, কৈশোর কাইটছে চাডিয়া
আমার নয় পোলা
এক একডা বাঘের লাহান
দুইশ মাস্তান বি আছে, এক একডা হায়নার লাহান
আমি যা কই, তাই অইবো
বেশি মাতলে কাইটা-কুইটা হাওয়া কইরা দিমু, দেখাইমুনি? থানা-পুলিশ আমাগো কেনা গোলাম
যা কই তাই হুনে
ওসি আমার পালা কুত্তা
আপনি এসব কী বলছেন? আমি আরও রেগে যাই
কসাই মইজ্জা চিৎকার দিলেন, তোরা কে কোনাই এদিক আয়, হালার এই সায়েবটারে কুইট্টা গোরুর মাংসের সঙ্গে মিচাই দি
কসাই মইজ্জার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চার জন লোক এসে আমাকে ঘিরে ধরল
সবার হাতে মারাত্মক সব অস্ত্র
এতগুলো লোকের চিৎকারে টুটুলের ঘুম ভেঙে গেল
সে 'আপু' বলে চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠল
আল্পনা-কল্পনা ভয়ে কাঁপছে
রাকু কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, স্যার, আপনি চলে যান