content
stringlengths
0
129k
ওরা আজ কেমন সেজেছে কে জানে! আবারো বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম
আজ স্কুল বন্ধ-সাপ্তাহিক ছুটি
মাঠে কয়েকটি ছাগল জিরিয়ে নিচ্ছে এই অলস দুপুরে
রুমে এসে টেলিভিশনটা ছেড়ে দিলাম
চ্যানেলগুলো শেষ অব্দি ঘুরে এলাম
বিশেষ কিছু হচ্ছে না
দ্যা টারমিনাল মুভিটার শেষ দৃশ্যটা আবারো দেখলাম
মা কাজে ব্যস্ত
আমাকে এই ভাবে সেজে-গুজে টিভি দেখতে দেখলে নিশ্চয় খুব রাগ করবেন
টিভি বন্ধ করে হুমায়ন আহমেদের আজ হিমুর বিয়ে বইটা হাতে নিলাম
গতকালই বইটা শেষ করেছি
কিছু কিছু জায়গা আবারও পড়লাম
হুমায়ন আহমেদ যদি প্রতি সপ্তায় সপ্তায় বই বের করতেন তাহলে বেশ হত! আমার না মাঝে মাঝে হিমু হতে ইচ্ছে করে! মেয়েরা কি হিমু হতে পারে? আমাদের এই সমাজে রাতে হিমুর বয়স্ক একটা মেয়ে হিমু হয়ে যদি হেঁটে বেড়ায় তাহয়ে তার কি কি ক্ষতি হবে ভাবতেই গা শিউরে ওঠে
মেয়েরা শিশুদের মত ঘরেই নিরাপদ
এসব ভাবনা মাথায় এলেই আমার আর হিমু হওয়া হয় না
আবারও বারান্দায় গেলাম
এখন নতুন পোশাকগুলো ছেড়ে সাদা-কাল মিক্সড সুতি কাপড়ের একটি ছালোয়ার পরে আছি
কিছু দূরে একটি একটি ল্যাংড়া ফকিরকে চাকা ওয়ালা গাড়িতে করে ওর বৌ টেনে নিয়ে যাচ্ছে
ফকিরটা আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে
ওর বোধহয় আমার বয়সী মেয়ে আছে; আমাকে দেখে তার কথা ভাবছে, কিন্তু দৃষ্টি বলছে অন্য কথা
আমার গা ঘিন ঘিন করে উঠল
আজ আর ঘুম আসল না কিছুতেই
জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিলাম
একছিটে আলোকচ্ছটা সামনের উঁচু দালানটির ফাক গলিয়ে আমার কপালে এসে পড়ল
আলো আমার ভালোলাগে না কিন্তু রোদ আমার বেশ লাগে
দাঁড়িয়ে রইলাম ঠাঁই
আমার রুমটা পশ্চিমে হওয়ায় দুপুরের রোদে বেশ তেতে ওঠে
আমার আবার গরম সহ্য হয় না
এ কারণে দুপুরে ঘুমাতে বেশ কষ্ট হত
মি. শাফিন আহমেদ আমার হ্যাসবেন্ড
বেশ মোটা বেতনের চাকুরী করে
প্রতিবেশীরা এ জন্য আমাকে বেশ সমীহ করে
গত একবছর থেকে ওর পিছনে লেগে থেকে রুমে এসি লাগিয়ে নিয়েছি
প্রথম প্রথম এসির ঠান্ডা সহ্য হত না
এখন সয়ে গেছে, এই নতুন জীবনটার মতন
পর্দা সরিয়ে দিলাম, কপাল তেতে গেছে
এসি থাকলে এই এক অসুবিধে-রুমের বাতাসকে আবদ্ধ রাখতে হয়
আচ্ছা বাতাস, তোর মন খারাপ হয়? নাকি তোরো সয়ে গেছে? ও মানে আমার হ্যাসব্যান্ড এখন অফিসে
কাজ পাগল মানুষ
ছুটির দিনেও গাদা গাদা কাজ নিয়ে বসে যায়
আমরা শেষ কবে একসাথে ঘুরতে বেরিয়ে ছিলাম, ঠিক মনে পড়ছে না,-তবে এটুকু মনে আছে, ঐ সময় শীতকাল ছিল
বাইরে প্রচন্ড হিম বাতাস বইতেছিল
আমি মেরুন শাড়ির ওপর কাল রঙের চাদরটা পেচিয়ে রেখেছিলাম, ও পরেছিল সাদা সার্টের হালকা এ্যাস কালারের ওপর কাশ্মিরি সোয়েটার
দিনটি ছিল শুক্রবার
আমরা বোধহয় ওর কলিগের বাচ্চার জন্মদিনে গিয়েছিলাম;-এর বেশি কিছু মনে নেই
গত ঈদে আমার তপনভাইয়ের বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল, বাবা যেদিন মারা গেলান-ঐ শেষ যাওয়া
মা কেমন আছেন কে জানে ! গেল সপ্তায়, তপন ভাইয়ের মেয়ে হয়েছে, আমার মতন নাকি দেখতে!
রিমোর্টটা হাতে নিলাম
এখন পরিচিত কোন সিরিয়াল নেই
যেগুলো হয় পুনঃপ্রচারিত, রাতেই দেখা হয়ে গেছে
মাঝে মাঝে তাও দেখি
ওদের কি হবে আগে থেকেই বলে দিই,-ভবিষ্যৎকে যদি এমন করে দেখতে পেতাম, মাঝে মাঝে খুব লোভ হয়! আজ শনিবার
এই দিনে তেমন কিছু হয় না
আমির খানের অনেক পুরানো একটা সিনেমা খুলে বসে থাকি
সিনেমাটি যে কতবার দেখেছি তার ইয়াত্তা নেই
আমার যদি ভুলে যাওয়ার কঠিন কোন রোগ থাকতো, তাহলে টিভি দেখেই দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারতাম কয়েকটি জীবন
ঘন্টাখানেক টিভির সামনে ঠাঁই বসে রইলাম
৭৭টি চ্যানেল আছে, সবগুলো কয়েকবার পাক মেরে এসেছি
রিমোটের ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেছে তাই ঝুঝি এক চাপে কাজ হচ্ছে না
বিদ্যুৎ চলে গেল
দুপুর দু'টা, এই সময় একবার যাবেই
এ মাসের সানন্দাটা নিয়ে বাইরের রুমের সোফাই গিয়ে বসলাম
এই সংখ্যাই রুপ চর্চার ওপর ভালো একটা আর্টিকেল আছে, গতকাল ট্রাই করেছিলাম
এই সংখ্যাই মেয়েদের ব্যয়াম নিয়ে দীর্ঘ এক ফিচার আছে
আমার ঠিক কাজে লাগবে না তবুও পড়লাম
বাংলাদেশের মেয়েরা নাকি বসে থেকে থেকে মুটিয়ে যাচ্ছে
আমার স্বামীর আবার স্বাস্থ্যবান মেয়ে পছন্দ সুতরাং আমার শরীরে আরেকটু মাংস লাগলে মন্দ হবে না, সে বরং খুশিই হবে
বাচ্চা হওয়ার পর মেয়েদের স্বাস্থ্য নাকি ঢিলে হয়ে যায়, আমার ক্ষেত্রে তা ঘটে নি
সানন্দায় কারিনার স্বল্প কাপড়ে বেশ বড়সড় একটা ছবি প্রিন্ট করা হয়েছে, বাঙালি মেয়েদের ব্যামের সুফল বোঝানোর জন্য এই আয়োজন
এতে করে অবশ্য পুরুষ মহলেও সানন্দার কদর বাড়বে
পুরুষদের কিত্তির কথা ভাবলে মাঝে মাঝে আমার খুব হাসি পাই, আবার করুনাও হয়
সানন্দাটা বেশ কয়েকবার উল্টে-পাল্টে দেখলাম, পড়তে আর কিছুই বাকি নেই
প্রতি মাসে তিনটে করে বেরুলে বেশ হত
ওটা টেবিলের ওপর রেখে বারান্দায় চলে আসলাম
যখন তখন বারান্দায় আসাতে স্বামীর বারণ আছে, এ কারণে কেন জানি বারান্দায় আসাটা বেশি হয়ে যায় ইদানিং
এ বাসাতে একটিই বারান্দা
যতদূর চোখ যায় বিল্ডিং আর বিল্ডিং-উঁচু-নিচু, চ্যাপ্টা-সরু, নতুন-পুরানো, ঝকঝকে-ধূসর বিল্ডিং
আমাদের বিল্ডিং এর এই পার্শে ছোট্ট একটা জায়গা ফাকা পড়ে আছে
এই জায়গাটি বেশ নোংরা
আশে পাশের বিল্ডিংগুলোর যতসব আবর্জনা এখানে এসে আবাস গড়ে,-খুব বাজে একটা গন্ধ বেরুই ওদের শরীর থেকে
আমি এই পাঁচতলা থেকেও দিব্যি টের পাই ওদের অবস্থান
জায়গাটির এক কোনায় খুব স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে একটি গাছ, গাছটির নাম জানা হয়নি আজও
আমার স্বামীকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি
ও আবার উদ্ভিদবিদ্যায় খুব কাঁচা
বাড়ীর কাজের মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ও বলেছে পাতা না দেখে বলতে পারবে না
সমস্যা হল, গাছটিতে পাতা গজাতে দেখেনি কখনও
আচ্ছা, ও বেঁচে আছে তো? অনেক আগে একবার রাস্তায় একটি কুকুর দেখেছিলাম : শরীরে কে বা কারা যেন গরম পানি ঢেলে দিয়েছিল, ফলত শরীরে কোথাও কোন লোম ছিল না
আমি দেখেই বমি করে ফেলেছিলাম
গাছটিকে দেখলে আমার ঐ কুকুরের কথা মনে হয়
এখন আর বমি পাই না আমার, খুব করুনা হয় গাছটির জন্য
মাঝে মাঝে মনে হয় আমি যেন গাছটির সাথে মিশে যাচ্ছি ক্রমশঃ
বারান্দায় বসে থেকে আমি গাছটিকে দেখি-ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়
বজ্জাত কাকের দল সব ময়লা আবর্জনা ঘেটে ঘেটে গাছটিতে চেপে বসে
আমি অনেক বারন করেছি, ধমকও দিয়েছি, কাজ হয়নি
শূন্য গাছটির শরীর জুড়ে যখন ক্ষুধার্ত কাকের দল হা করে ঠিকরে তাকায় আমার দিকে
ভয়ে জড়সড় হয়ে যায় আমি
তড়িঘড়ি করে কপাট লাগায় দরজার : পন করি, বারান্দায় আর নয়
গাছটির মায়ায় এ পন বেশিক্ষণ টেকে না
আজ কাকগুলো কোথায় যেন বেড়াতে গেছে
আমি অনেকক্ষণ গাছটির সাথে কথা বললাম