content
stringlengths
0
129k
এই ছ'টি চরিত্রের একটু পরিচয় দেওয়া যাক
একটা প্রায় অবিশ্বাস্য কিন্তু সত্যি তথ্য হল যে, আড্ডাপ্রিয় আর অ্যাডভেঞ্চার-উৎসুক এই দলটির ছ'জনের মধ্যে চারজনেরই বয়স সত্তরের গণ্ডি পেরিয়েছে
কিন্তু সবারই শরীর ফিটফাট, কেউ কোনও অসুখের কথা উচ্চারণ করে না, আর খাদ্যপানীয়ের ব্যাপারে কিছুমাত্র বাছ-বিচার বা শুচিবাই নেই, বরং কিছু কিছু অনিয়ম করার দিকেই ঝোঁক
পাঁচজনই সিগারেট ফোঁকে, চা-কফি ও আরও কড়া জাতীয় পানীয় চলে সকাল থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত
সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ জন পঁচাত্তরে পা দিয়েছেন, তিনিই সবচেয়ে উৎসাহী ও প্রাণবন্ত
এই মানুষটি প্রকৃতির এক আশ্চর্য সৃষ্টি
বয়সের কোনও ছাপ পড়েনি শরীরে, আড্ডায় অক্লান্ত, তাঁর নাম কান্তি হোর
পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে পাড়ি দিয়েছিলেন ইউরোপে, জার্মানিতে থেকেছেন অনেক বছর, তারপর আবার সমুদ্র ডিঙিয়ে কানাডায়
এখন নামমাত্র বসতি টরন্টো শহরে, আজও কাজের জীবনে সক্রিয়, কাজের জন্য সারা বছরই পশ্চিম গোলার্ধের নানা দেশে ছুটে বেড়াচ্ছেন
এসবের মধ্যে তেমন বিস্ময়ের কিছু নেই, আসল বিস্ময় হল, প্রায় পঞ্চান্ন বছর ধরে দেশের বাইরে থেকেও কান্তি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে সম্পূর্ণ আপন করে রেখে দিয়েছেন
কত লোককে তো দেখলাম, দশ-পনেরো বছর বিলেতে বা বিদেশে থেকে সাহেব হয়ে যায়, বাংলা বলতেই চায় না
আর কান্তি অর্ধ-শতাব্দীরও বেশি বিদেশে, তাঁর চেহারাটা বিদেশিদের মতনই হয়ে গেছে, অনায়াসেই স্প্যানিশ মনে হতে পারে, কিন্তু তাঁর অন্তরটা খাঁটি বাংলা
বয়সের হিসেবে এর পরেই আমি
এই দলের মধ্যে আমিই কিছুটা কমজোরি হয়ে পড়েছিলাম সেই সময়, আমার হাঁটুতে বেশ ব্যথা ছিল, কিন্তু ইচ্ছাশক্তিতে তো পঙ্গুও গিরি লঙ্ন করতে পারে
তৃতীয়জন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, আমার চেয়ে কয়েক মাসের ছোট
'অপুর সংসার'-এর এই নায়ককে আমি সিনেমার নায়ক হওয়ার আগে থেকেই চিনি
সৌমিত্র তুখোড় আড্ডাবাজ, আজ্ঞার টানে অনেক জরুরি কাজ ফেলেও চলে আসতে পারে
এর পর ফরাসি দেশ নিবাসী অসীম রায়
কান্তি হোরের মতন অসীম রায়ও বহুঁকাল প্রবাসী, প্রথমে লন্ডন, তারপর প্যারিস
পেশায় ইঞ্জিনিয়ার
ছোটবেলায় দেওয়াল পত্রিকায় লেখার হাতেখড়ি, বিদেশে গিয়ে আর লেখালেখি করেনি, কিন্তু বাংলা সাহিত্যকে ছাড়েনি, তার বাড়িতে পুরো রবীন্দ্ররচনাবলি থেকে শুরু করে কয়েকজন আধুনিক কবির কবিতার বই পর্যন্ত আছে
মাত্র কয়েক বছর আগে, হঠাৎ কী খেয়ালে সে একটা ছোট গল্প লিখে ফেলেছিল, সে গল্প এমনই মান-উত্তীর্ণ যে অনায়াসে ছাপা হয়ে গেল 'দেশ' পত্রিকায়
কিন্তু আর লেখেনি
এখন কলমের চেয়ে ক্যামেরা তার বেশি প্রিয়
পঞ্চমজন রবীন চ্যাটার্জি, ইনিও যাদবপুরের ইঞ্জিনিয়ার, দীর্ঘকায়, অতি ভদ্র মানুষ, মৃদুভাষী, ইনি অল্প বয়সে কখনও গল্প-কবিতা লিখেছেন কিনা আমি জানি না
বহু কাল কানাডাবাসী, ওঁর স্ত্রী বিদেশিনী, কিন্তু ওঁর বাংলা ভাষাপ্রীতি খুবই উল্লেখযোগ্য
প্রায় প্রতি বছরই কলকাতায় এসে বইমেলা থেকে কিনে নিয়ে যান একগাদা বাংলা বই
রবীন স্বেচ্ছায় আমাদের গাড়ি চালাবার ভার নিয়েছেন
এই দলের ষষ্ঠ এবং একমাত্র মহিলা সদস্যদের নাম স্বাতী, ইনি এখনও সত্তর বছরে পৌঁছবার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি
অনেক দেরি
এতজন পুরুষের সঙ্গে একজন মহিলা কি মানিয়ে নিতে পারবেন? এ মহিলাটির এমনই ভ্রমণের নেশা যে, কোনও বাধাই মানবেন না, কোনও অসুবিধেই ধর্তব্যের মধ্যে আনেন না, শুধু বাথরুমটা ভালো হওয়া চাই
আমাদের দেশে অনেক জায়গায় বাথরুমের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে নানা সমস্যা হয়, কিন্তু সাহেবদের দেশে সে প্রশ্নই নেই
পরিচ্ছন্নতাবোধে সাহেবরা আমাদের থেকে অনেকটা এগিয়ে, তা স্বীকার করতেই হবে
সৌমিত্র, আমার ও স্বাতীর ভ্যাঙ্কুভারে আসার একটা উপলক্ষ আছে
আমরা এসেছি বঙ্গ সন্মেলনের আমন্ত্রণে
এখন প্রতি বছরেই উত্তর আমেরিকার (যার মধ্যে কানাডাও আছে) কোনও না কোনও শহরে বঙ্গ সংস্কৃতি সন্মেলন হয়
বাড়তে-বাড়তে তা বিরাট আকার ধারণ করেছে, অংশগ্রহণকারী ও প্রতিনিধিদের সংখ্যা ছ'-সাত হাজার ছাড়িয়ে যায়
সারা ভারতে কোথাও বাঙালিদের এমন সম্মেলন হয় না, যেখানে এত বেশি সংখ্যক মানুষ যোগ দেয়
আমেরিকার মতন এত বেশি ধুতি-পাঞ্জাবি আর শাড়ি পরা বাঙালিও একসঙ্গে কোথাও দেখা যায় ভারতে
মূল বার্ষিক সম্মেলন ছাড়াও কয়েক বছর ধরে কয়েকটি ছোট-ছোট বঙ্গ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে কোনও কোনও শহরে
যেমন শিকগোয়, কলম্বাস-ওহায়োতে, এই ভ্যাঙ্কুভারে
ছোট বলেই (তাও উপস্থিতি দেড়-দু-হাজার তো হবেই) আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগত স্পর্শ পাওয়া যায় অনেকটা
তিনদিনের সম্মেলন তো শেষ হল ভালোভাবেই, ততদিন বাকি তিনজন এক হোটেলে ঘাপটি মেরে বসেছিল, আমাদের কর্তব্য শেষ হলেই শুরু হবে আজ্ঞা ও ভ্রমণ
সেই টানেই তো এসেছে ওরা
পৃথিবীতে যে ক'টি অতি সৃদৃশ্য শহর আছে, তার মধ্যে ভ্যাঙ্কুভার অন্যতম
প্রকৃতি এখানে যেমন অকৃপণ, তেমনই তা বিশুদ্ধ সুন্দর করে রেখেছে এখানকার মানুষ
আর ভ্যাঙ্কুভার থেকে বেরোলেই যে শত-শত মাইল পর্বতমালা ও হিমবাহ, তা বিশ্বের বিস্ময়
এর রূপ সমস্ত কল্পনাকেই হার মানায়
ভ্যাঙ্কুভার আসলে একটা দ্বীপ
এক সময় ছিল বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর লীলাভূমি
তথাকথিত সভ্যতার সংস্পর্শে না এসে তারা নিজস্ব সুখে-শান্তিতেই ছিল
তারপর এল ইউরোপীয় ভাগ্যান্বেষী ও রাজশক্তি
জর্জ ভ্যাঙ্কুভার নামে ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর এক অফিসার প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিম উপকূল ছুঁড়তে-ছুঁড়তে এখানে এসে পৌঁছল
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি 'গোল্ড রাশ' নামে যে পাগলামি শুরু হয় তার একটা কেন্দ্র ছিল এই দ্বীপ
ততদিনে অবশ্য আদিবাসীদের জীবনযাত্রা তছনছ হয়ে গেছে
যাই হোক, আমরা তো চানাচুর, বিস্কুট, চিজ, আরও সব নানা রকম প্রয়োজনীয় দ্রব্য মজুত করে বেরিয়ে পড়লাম শহর ছেড়ে
একটা বড় গাড়ি ভড়া করা হয়েছে, যাতে ছ'জনে মিলে বেশ হাত-পা ছড়িয়ে বসা যায়
ছয় সংখ্যাটা একটু গণ্ডগোলের, ছয় রিপুর কথা মনে পড়ে
এখানে কিন্তু আমাদের ছ'জনের মধ্যে একটুও মনের গরমিল নেই
দীর্ঘযাত্রায় সাধারণত একজনকে বেছে নিয়ে নানারকম লেগ পুল ('পদাকৰ্ষণ', অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর ভাষায়) আর নির্দোষ মজা করতে করতে যাওয়া হয়
এবারে অবশ্য আমাদের মধ্যে তেমন বিশেষ একজন কেউ নেই, সুতরাং এক-এক সময় এক-এক জন
তবে অসীমই নিজগুণে বেশি সুযোগ করে দিচ্ছিল
এর আগেও প্রতি বছরই আমরা দল বেঁধে কোথাও না কোথাও অভিযানে বেরিয়েছি, কখনও ভারতে কখনও বিদেশে
দলের সদস্যদের মধ্যে দু-একজন অদল বদল হয়েছে, কখনও গাড়ির স্টিয়ারিং ধরেছে টরন্টোর দীপ্তেন্দু চক্রবর্তী, নানানরকম খাবার-দাবার জোগাড় করার অদ্ভুত ক্ষমতা তার
এবার সে আসতে পারেনি
অথবা লন্ডনের ভাস্কর দত্ত, স্বাভাবিকভাবেই সে দলের নেতা, অসীমের সঙ্গে তার খুনসুটি ছিল বিশেষ উপভোগ্য
ভাস্কর দত্ত আর কোনওদিন আসবে না
বাদল বসুও থেকেছে কয়েকবার
এবারে আমরা যে-পথে বেরোলাম, সে-পথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিশ্ববিখ্যাত
কানাডিয়ান রকি মাউন্টেনস
টানা চার-পাঁচদিন ধরে পাহাড়ের মধ্যে ঘোরাফেরা
সে পাহাড়ের বৈশিষ্ট্যের কথা ক্রমশ প্রকাশ্য
পাহাড় ছাড়াও আরও কিছু
তবে, এ কথাও ঠিক, প্রকৃতি যতই মনোহর হোক, সব সময় তো আর সেদিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা যায় না! দল বেঁধে গেলে মাঝেমাঝেই আড্ডাটা প্রধান হয়ে ওঠে
প্রত্যেক দলে একজন থাকে প্রধান আড্ডাধারী, এই দলে সৌমিত্র
অফুরন্ত তার গল্পের স্টক আর কথায় কথায় সে গান গেয়ে উঠতেও পারে
আর মাঝেমাঝেই বুদ্ধির ঝিলিকে ছোট্ট মন্তব্য করে কান্তি, অসীম প্রায়ই সম্পূর্ণ উলটো কিছু বলে ফেলে
এই অভিযাত্রীদের গড় বয়স সত্তর হলেও একমাত্র মহিলা সদস্যটি ছাড়া আর সবাই ধূমপায়ী
কিন্তু অসীমের কঠোর নির্দেশ, চলন্ত গাড়িতে সিগারেট ধরানো নিষেধ
একবার ফ্রান্সে তার গাড়িতে এই ব্যাপারে একটা দুর্ঘটনার উপক্রম হয়েছিল
তা ছাড়া, এখানকার চলন্ত গাড়িতে যেহেতু জানলা খোলা যায় না, (দুরন্ত গতির জন্য এমন জোর হু-হুঁ শব্দ হয় যে কথাই বলা যায় না) তাই বন্ধ গাড়িতে ধূমপান দ্বিগুণ অস্বাস্থ্যকর
সুতরাং ঘণ্টাখানেক পরপর কোনও ছুতোয় রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে সিগারেট ব্রেক দিতে হয়
যদিও দুপাশে পাহাড়, কিন্তু রাস্তা মোটেই পাহাড়ি নয়, অতি মসৃণ যথেষ্ট প্রশস্ত
এসব দেশের রাস্তা দেখলে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়
কিছুদিন আগেও এইসব দেশের রাস্তা দেখে নিজের দেশের রাস্তার জন্য ভারী হীনম্মন্যতা বোধ হত, কিন্তু এখন 'সোনালি চতুর্ভজ'-এর সুবাদে এমন সব চমৎকার হাইওয়ে তৈরি হয়েছে, যা সাহেবদের দেশের সঙ্গে অনায়াসে পাল্লা দিতে পারে, কোনও কোনও রাস্তা আমাদের দেশেই বেশি ভালো
কলকাতা থেকে আগে গাড়িতে শান্তিনিকেতন যেতে সময় লাগত সাড়ে ছ'ঘণ্টা, এখন তিন ঘণ্টা বড়জোর!
এই প্রসঙ্গে আর একটা রাস্তার কথা মনে পড়ল
উত্তর আমেরিকার কলোরাডো রাজ্যেও এরকম পাহাড়ের ট্রেল রয়েছে
বোলডার শহর থেকে আমার এক বাল্যবন্ধু শুভেন্দু দত্ত (এখন ওদেশে বিখ্যাত অধ্যাপক) আমাকে ওই রাস্তায় নিয়ে গিয়েছিল কিছু দূর
সেবারে আমার এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল
জুন মাস, সোয়েটার কোট পরার প্রশ্নই নেই, গায়ে শুধু একটা হাওয়াই শার্ট
এক জায়গায় এসে দেখি, রাস্তার দুধারে দু'তিন ফুট বরফ জমে আছে
অথচ একটুও শীত নেই
প্রথমটা আমি হতবাক
গাড়ি থেকে নেমে বরফের পাশে দাঁড়ালেও একটুও শীতের কাঁপুনি লাগছে না, বাচ্চা ছেলেমেয়েরা টি-শার্ট পরে বরফ নিয়ে খেলা করছে, এটা কী করে সম্ভব? কয়েকজন ভৌগোলিক ব্যাখ্যা দিয়েছিল, সেটাও আমার ঠিক বোধগম্য হয়নি
কিন্তু বরফ তো জমে আছে! উত্তাপ শূন্যের নীচে না গেলে বরফ জমে কী করে? বরফ তো গলছেও না
কেউ বলল, হাওয়া নেই বলে শীত লাগে না! যাই হোক, সেটা আমার জীবনে একটা বিস্ময়কর ব্যাপার হয়ে আছে
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের একটি উপন্যাসের নাম 'স্লেজ অফ কিলিমাঞ্জারো
' আফ্রিকার কেনিয়ায় গিয়ে আমি কিলিমাঞ্জারো পাহাড় দেখেছি
কত পাহাড়ের চূড়াতেই তো বরফ জমে, তা হলে এই নামকরণের তাৎপর্য কী? এখান থেকে গেছে বিষুব রেখা