content stringlengths 0 129k |
|---|
আমরা স্তম্ভিত |
বলে কী অসীম! পাশে বসে আছে বাংলা চলচ্চিত্রের এখনকার প্রধান পুরুষ, তার সামনে এইসব কথা? |
রবীন ব্যাপারটা সামলাবার জন্য মুখ ফিরিয়ে বলল, অসীম রায় বোধহয় ওয়েস্টার্ন সিনেমার কথা বলছেন.... |
কান্তি বললেন, হ্যাঁ, আমরা শুনেছি, ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডে সিনেমার কিছু কিছু ব্যাপারে, অনেক রকম... |
অসীম সে ইঙ্গিত না নিয়ে আবার বলল, না, না, ওসব বাংলা ইংরেজি একই ব্যাপার |
লোকগুলো নানা রকম.... |
আমি তো জানি, অসীম একটু ট্যালা ধরনের, স্থান-কাল পরিস্থিতি খেয়াল রাখে না, হঠাৎ একটা কিছু বলে বসে |
এই ব্যাপারে সবচেয়ে যার আহত হওয়ার কথা, সেই সৌমিত্র হা-হা করে হেসে উঠে বলল, অসীম ঠিকই বলেছে, সিনেমার লোকগুলো এমন ভণ্ড আর পাজি হয়... |
তখন অসীমের খেয়াল হল |
সে থতমত খেয়ে বলল, ইয়ে, মানে, প্রেজেন্ট কোম্পানি একজেমটেড...আমি সৌমিত্রকে কিছু বলছিনা |
সৌমিত্র আবার হেসে উঠে বলল, না, না, শালা, সিনেমার লোকগুলো... |
আমি পুরো ব্যাপারটা থেকে দৃষ্টি ফেরাবার জন্য বললাম, ওই দ্যাখো, দ্যাখো, সামনে কী হচ্ছে |
রাস্তার ধারে, আমাদের সামনে একটা গাড়ি থেমে আছে |
জানলা দিয়ে বায়নোকুলার বার করে কী যেন দেখছে একজন |
ওখানে নিশ্চয়ই দ্রষ্টব্য কিছু আছে |
আমরাও নিঃশব্দে গাড়ি থামালাম সেখানে |
আমাদের সঙ্গে বায়নোকুলার নেই, খালি চোখেই দেখতে পেলাম, গাছপালার আড়ালে দুটো মুস |
অর্থাৎ প্রায় গরুর আকারের প্রাণী, মাথায় মোটা মোটা শিং ধীর গতিতে ঘাস খাচ্ছে |
এরাও শিকারিদের প্রিয় প্রাণী |
অসীম নেমে গেল ছবি তোলার জন্য |
অসীম খুব ভালো ফটোগ্রাফার |
কয়েকটি সারা দেশীয় প্রদর্শনীতে তার ছবি স্থান পেয়েছে |
কিন্তু ভাস্কর বলত, অসীম শুধু শূন্যে ঝোলা মাকড়সা, পুকুরে ব্যাঙের লাফ কিংবা কুকুরের হাই তোলার ছবি তোলে, মানুষের দিকে কক্ষনো ক্যামেরার মুখ ঘোরায় না |
আমি একটু সংশোধন করে বলেছি, অসীম পুরুষ মানুষের ছবি তোলে না, কিন্তু ওর বাড়িতে আমি অনেক সুন্দরী মেয়ের ছবি দেখেছি |
সুতরাং একসঙ্গে বেড়াতে বেরলেও অসীমের কাছ থেকে আমরা নিজেদের ছবি কখনও পাই |
কখনও খুব কাকুতিমিনতি করলে অসীম ব্যাজার মুখে বলে, ঠিক আছে, সবাই একসঙ্গে দাঁড়াও দেখা যাক কী করা যায় |
ছবি তোলার ব্যাপারে অসীম খুব পরিশ্রমী |
পছন্দমতন বিষয়বস্তু পেলে সে জল-কাদা, ঝোঁপ ঝাড় পেরিয়েও চলে যায় |
তার এই অধ্যবসায় দেখে আমাদের যাত্রার বিরতি দিতেই হয় |
জুলাই মাসের ১১ তারিখ থেকে টানা ছ'দিন আমাদের এই ভ্রমণ |
শুধু পাহাড় আর পাহাড়, একসঙ্গে এত পাহাড়ের অভ্যন্তরে এতদিন ধরে ঘোরাফেরা করিনি আগে |
সব পাহাড়ের বর্ণনা দেওয়ার কোনও অর্থ হয় না |
এর মধ্যে অনেক হ্রদ, অনেক উদ্যান, অনেক গিরিনদীর মধ্যে দুটি জায়গার কথা না বললেই নয় |
যদিও লেক লুইসের অভিজ্ঞতাও অবিস্মরণীয়, ব্যানফ, জ্যাসপারের মতন বিখ্যাত স্থানগুলিও বাদ দিতে হচ্ছে |
বিশেষ উল্লেখযোগ্য দুটি জায়গার মধ্যে একটি হিমবাহ, অন্যটি উষ্ণ জলের প্রস্রবণ |
প্রকৃতির কী বিচিত্র লীলা, এক জায়গায় অনাদিকাল থেকে সঞ্চিত তুষার আর অদূরেই মাটি খুঁড়ে টগবগ করে উঠছে গরম জল |
যেখানেই পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণ, সেখনেই ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি |
এ তো আর বক্রেশ্বরের উষ্ণ প্রস্রবণ নয় যে যার ইচ্ছে সেই এসে নেমে পড়ছে! এখানে উষ্ণ জলের ধারাকে এক জায়গায় সুইমিং পুলের মতন বেঁধে রাখা হয়েছে |
টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলে তোয়ালে আর পোশাক বদলাবার ব্যবস্থা সব নিখুঁত |
দুটি সুইমিং পুলের মধ্যে একটি বেশি গরম, অন্যটি ততটা নয়, যার যেটি পছন্দ |
কিংবা ইচ্ছে করলে একবার এখানে, আর একবার ওখানেও নামা যায় |
আগে থেকেই পরিকল্পনা করা ছিল বলে, আমরা সবাই সুইমিং স্যুট সঙ্গে করে এনেছি |
নারী-পুরুষের সহান এদেশে বেশ চালু |
কেন জানি না, পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যাই বেশি মনে হয় |
মেয়েদের পোশাকের কত রকম বাহার |
কিংবা সঠিক বলতে গেলে, পোশাক না থাকার কত রকম বাহার |
একেবারে নিরাবরণ কেউ নয়, তবে অনেকেরই পোশাক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর |
সুইমিং স্যুটের ক্ষুদ্র সংস্করণের নাম বারমুডা, আর তার থেকেও ছোট হলে? সৈয়দ মুজতবা আলির ভাষায়, আমার গলার টাই দিয়ে তিনটি মেয়ের জাঙ্গিয়া হয়ে যায় |
একবার টিকিট কেটে ঢুকলে যার যতক্ষণ ইচ্ছে থাকতে পারে |
আরামদায়ক গরম জল আর চতুর্দিকে স্বল্পবসনা সুন্দরীরা |
অর্থাৎ সিনেমার মতন বেদিং বিউটির ছড়াছড়ি, এই অবস্থায় উঠে যেতে কার ইচ্ছে করে! কিন্তু আমাদের তো অনেক দূরে যেতে হবে! কে কাকে তাড়া দেবে? ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে, প্রত্যেকেই বলছি, এবার ওঠা উচিত, তবু ওঠার নাম নেই |
মাঝেমাঝে সৌমিত্র চলে যাচ্ছে গভীর জলে, কখনও হারিয়ে যাচ্ছে অসীম |
শেষ পর্যন্ত উঠতেই হল খিদের তাড়নায় |
এর পর আবার অসীমের রেস্তোরাঁ খোঁজার পালা |
হঠাৎ এক জায়গায় নির্দেশ চোখে পড়ল যে মাইলখানেক দূরে গেলেই এই উষ্ণ প্রস্রবণের উৎসটা দেখা যাবে |
স্বাতী সেটা দেখতে যাবেই |
অন্যরাও রাজি |
একমাত্র আমিই অপারগ |
সেই সময় আমার হাঁটুতে খুব ব্যথা, পাহাড়ি রাস্তায় দু'মাইল আসা-যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব |
কিন্তু স্বার্থপরের মতন আমি তো আর অন্যদের নিষেধ করতে পারি না! তাই ঠিক হল, আমি রাস্তার ধারে বসে থেকে অপেক্ষা করব, ওরা ঘুরে আসবে |
কান্তি হোর অবশ্য বলল, সে থেকে গিয়ে আমাকে সঙ্গ দিতে পারে, যদি আমার কোনও অসুবিধে হয়! আমি তাকে ধমক দিয়ে বললুম, আমি কি বাচ্চা ছেলে নাকি যে অসুবিধে হবে? তুমিও ঘুরে এসো |
আমি বসলাম একটা উঁচু পাথরে, অন্য পাঁচজন হাঁটতে-হাঁটতে মিলিয়ে গেল ঢালু রাস্তায় |
এবার আমার প্রতীক্ষা, ওরা কতক্ষণে ফিরবে |
এইরকম সময়ে প্রতি মিনিটকেই অনেক গুণ বেশি লম্বা মনে হয়, যেন অনন্তকাল কেটে যাচ্ছে |
চতুর্দিকে পাহাড় ও জঙ্গল, আকাশ একবারে মেঘমুক্ত নীল, ঝকঝক করছে রোদ, আর কোনও জনমনুষ্যের সাড়াশব্দ নেই, ঝিমঝিম করছে স্তব্ধতা, তার মধ্যে আমি বসে আছি একা |
কান্তিকে বলেছিলাম, আমি বাচ্চাছেলে নই, কিন্তু একসময় একটা পরিত্যক্ত শিশুর মতনই আমার বুক অভিমানে ভরে গেল, যেন আমাকে ইচ্ছে করে পথে ফেলে রেখে চলে গেছে আমার ঘনিষ্ঠ সঙ্গীসাথীরা! এর পর কি আমি কেঁদে ফেলব নাকি? |
কতক্ষণ পর কে জানে, সেই ঢেউখেলানো রাস্তায় প্রথম দেখতে পেলাম একজন স্প্যানিশ সাহেবকে, অর্থাৎ আমাদের কান্তি হোর |
উৎসস্থলটি নাকি খুবই রমণীয়, আসতে ইচ্ছে করছিল না, কান্তিই সবাইকে তাড়া দিয়ে এনেছে |
যতই সৌন্দর্য উপভোগ করা যাক, এখন সকলেরই খিদেয় পেট জ্বলছে |
আজ আর অসীমকে বেশি সুযোগ দেওয়া যায় না, কাছাকাছি প্রথম রেস্তেরাঁতেই ঢুকে পড়া গেল |
অসীমেরও তেমন আপত্তি নেই |
বেশিক্ষণ স্নান করলে বেশি খিদে লাগে |
মূল খাবার আসার আগেই বুভুক্ষুর মতন আমরা টেবিলের ওপর রাখা পাঁউরুটি আর মাখনই খেতে শুরু করলাম |
শুধু কান্তিরই খিদেবোধ কম |
এরই মধ্যে উঠে গিয়ে সে কাউন্টার থেকে কিনে আনল ছ'খানা রঙিন ছবির পোস্ট কার্ড |
অন্যদের বলল, যার যেখানে মন চায়, চিঠি লেখো |
আমি পোস্ট করে দেব |
চিঠি লেখা এখন তো প্রায় উঠেই গেছে |
একমাত্র অর্ধশতাব্দীরও বেশি প্রবাসী কান্তি এখনও চিঠি লেখার অভ্যেস ধরে রেখেছে |
পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্ত থেকে মাঝেমাঝেই তার মুক্তোর মতন হস্তাক্ষরে বাংলা চিঠি আসে |
এই যাত্রাতেও সে কয়েকবার আমাদের দিয়ে চিঠি লিখিয়েছে |
আথাবাস্কা গ্লেসিয়ার বিশ্ববিখ্যাত |
গোটা উত্তর আমেরিকার মধ্যে এই গ্লেসিয়ার দেখতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ আসে |
অনেকে বলে, এই হিমবাহের ওপর দাঁড়ালে ঠিক যেন চাঁদের বুকে হাঁটার অভিজ্ঞতা হয় |
ভূগোল বইতেই হিমবাহের কথা পড়েছি |
তা যে কখনও দেখব, আর সত্যি সত্যি সেখানে দাঁড়াবার অভিজ্ঞতা হবে, তা কি কখনও কল্পনাতেও ভেবেছি? অবশ্য সেখানে পদার্পণ করাও কম বিপজ্জনক নয় |
মৃত্যুভয় আছে |
গুপ্ত ক্রিভাস বা তুষারফাঁদ আছে |
হুট করে সেখানে হাঁটতে গেলে অতলে তলিয়ে যেতে হয়, বেশ কয়েকজন এভাবে মারাও গেছে |
কত কোটি বছর আগে এই হিমবাহ শুরু হয়েছে, তা কেউ জানে না |
একটু-একটু করে নীচে নামছে, প্রতিদিন কয়েক সেন্টিমিটার করে নামে, বছরে দু-তিন মিটার |
এখানেও ব্যবসাসায়ীরা বেশ কিছু অর্থের বিনিময়ে পর্যটকদের অবতরণের ব্যবস্থা করেছে |
মূল রাস্তা থেকে একটা বাসে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় হিমবাহের অনেকটা কাছে |
তারপর খাড়া নামতে হয়, তার জন্য আছে অন্য গাড়ি |
সে এক অত্যাশ্চর্য স্নো কোচ, তার এক-একটি চাকা একজন মানুষের সমান |
সারা পৃথিবীতেই এরকম গাড়ি কয়েকটি মাত্র আছে |
আমার বন্ধুরা আমার প্রতি সদিচ্ছাবশতই উপদেশ দিল, সুনীল, তুমি যেও না, এক জায়গায় বসে থাকো, গাড়িটাই বিপজ্জনক, তা ছাড়া নীচে নামলে টালমাটাল পায়ে হাঁটতে হবে, আছাড় খেয়ে পড়লে তোমার হাঁটুতে চোট লাগবে |
অসীম আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলল, নেমো না |
রবীন বলল, না নামাই উচিত হবে |
সৌমিত্র বলল, কেন শুধু শুধু রিস্ক নেবে! স্বাতীর দু'চোখে উদ্বেগ, একমাত্র কান্তি নীরব |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.