content stringlengths 0 129k |
|---|
সুতরাং গরম হওয়ার কথা, তবু কিলিমাঞ্জারোর চূড়ায় (এমন কিছু উঁচু পাহাড়ও নয়) বরফ জমে আছে, সেটাই আশ্চর্য ব্যাপার! |
আমার এই অভিজ্ঞতার কথা শুনে একজন বলেছিল, কলোরাডোতে পাহাড়ের ওপর দিয়ে হাইওয়ে গেছে |
আমেরিকানদের যদি মাউন্ট এভারেস্টটা দিয়ে দেওয়া যেত, তা হলে অনেক দিন আগেই ওরা চূড়া পর্যন্ত হাইওয়ে বানিয়ে ফেলতে পারত |
তেনজিং আর হিলারি শিখর জয় করত গাড়ি চেপে! |
এই কানাডিয়ান রকিজ-এর অনেক পাহাড়েই বরফ নেই, গাছপালাও নেই, শুধুই উলঙ্গ পাথর |
সেটাই এই পর্বতমালার বৈশিষ্ট্য |
গাছপালা থাকলে সব পাহাড়কেই দূর থেকে একরকম দেখায় |
এখানকার প্রতিটি পাহাড়কে মনে হয় যেন আলাদা-আলাদা ভাস্কর্য |
নানা রকমের আকার, তা দেখে কত কিছু কল্পনা করে নেওয়া যায়, কত রকমের মূর্তি কিংবা প্রাসাদ |
প্রকৃতিই এইসব ভাস্কর্যের স্রষ্টা |
কিংবা যারা ঈশ্বরের সৃষ্টিতত্বে বিশ্বাসী, তারা অবশ্যই ধরে নিতে পারে, এইসব রূপ অপ্রাকৃত |
আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, রাত্তিরে গাড়ি চালানো হবে না |
প্রতি রাত্রির জন্যই এক এক স্থানে মোটেলে তিনটি করে ঘর বুক করা আছে |
এখানে পাহাড়-পর্বত-জঙ্গলের মধ্যেও হোটেল মোটেল থাকে অনেক পর্যটক আসে অজস্র |
ইন্টারনেট দেখে কান্তি হোর সব ব্যবস্থা করে রেখেছে |
প্রথম দিনের গন্তব্য কামলুপস দুরত্ব ৩৬৬ কিলোমিটার |
এদেশে এতটা পথ দিব্যি ধীরেসুস্থে সন্ধের আগেই পৌঁছনো যায় |
পাহাড়ের পর পাহাড় এবং কয়েকটি নদীনালা পেরিয়ে এক উপত্যাকায় কামলুপস একটা ছোটখাটো শহরের মতন |
টমসন নদীর দুটি ধারার মাঝখানে |
এককালে ছিল 'লাল ভারতীয়' দের গ্রাম, স্বর্ণসন্ধানীরা হুড়মুড় করে এসে পড়ে এখানে |
তারপর আগে পশমলোভী ইউরোপীয়রা |
পশম তখন খুবই দামি জিনিস |
এইসব অঞ্চলে এক প্রকারের রামছাগল প্রচুর, যাদের বলে 'মাউন্টেন গোট', তাদের গায়ে বড় বড় লোম |
সেই লোমে তৈরি হয় উত্তম পশম |
হরিণের শরীরের মাংসই যেমন তার শত্রু, সেইরকম এই লোমের জন্যই হাজার-হাজার রামছাগল নিহত হয়েছে |
তা ছাড়া আছে বৃহৎ আকারের ভাল্লুক, তাদের গায়ের লোেমও মহার্ঘ, সেই 'গ্রিজলি বেয়ার' এখন প্রায় নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে |
আমরা অবশ্য সেই ভাল্লুক দেখিনি, তবে 'মাউন্টেন গোট' চোখে পড়েছে প্রায়ই |
কামলুপস নামটা আদিবাসীদের নিজস্ব নামের বিকৃতি, যার অর্থ অনেক জলের মাঝখানে |
অন্য মতে, ফরাসিরা এসে এই জায়গার নাম দিয়েছিলেন 'কাম্প দে লুপস,' যার অর্থ নেকড়েদের আস্তানা! |
মোটেলগুলোতে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই, তার জন্য রেস্তোরাঁ খুঁজতে হয় |
মালপত্র রেখে কিছুক্ষণ আমরা উষ্ণ পানীয় নিয়ে গা-গরম করে নিই |
তারপর বেরিয়ে পড়ি খাদ্যের সন্ধানে |
এ ব্যাপারে মূল দায়িত্ব অসীমের |
পেশায় ইঞ্জিনিয়ার হলেও অসীম বেশ কয়েক বছর প্যারিস শহরে একটি রেস্তোরাঁর মালিক ছিল |
খাবারের গুণাগুণ ও দাম সে-ই ভালো বুঝবে |
এরকম ছোট জায়গাতেও চাইনিজ, মেক্সিকান ও নানা রকম রেস্তেরাঁ আছে, ভারতীয়ও থাকতে পারে, কিন্তু আমরা ভুলেও ভারতীয় রেস্তোরাঁ খুঁজি না |
সারা জীবন দিশি খাবার খাচ্ছি, বিদেশে এসে বিদেশি খাবার খাব না কেন? |
অসীম বেশি-বেশি জানে বলেই তাকে নিয়ে বেশি মুশকিল হয় |
সে একটার পর একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে মেনু আর দাম দেখবে, তার পছন্দ হবে না, এদিকে খিদেতে আমাদের পেট চুইচুই করছে! এমনও হয়, আট-দশটা জায়গা দেখার পর প্রথম যেটা দেখা হয়েছিল অসীম সেটাতেই ফিরে আসে |
আমি তা নিয়ে কখনও একটু ক্ষোভ প্রকাশ করতে গেলেও অতি ভদ্র কান্তি হোর তা চাপা দিয়ে বলে, না, না, সব ভালো যার শেষ ভালো |
অসীম যখন বলছে, এটাই সবচেয়ে ভালো... |
খাবারের অর্ডার দিতেও অনেক সময় যায় |
ছ'জনের পাঁচ রকম পছন্দ! দলের কনিষ্ঠা সদস্যটিই তার মতামত জানাবার সুযোগ পায় না |
অসীম হঠাৎ একটা ডিশ বেছে নিয়ে বলে, স্বাতী, এটা তুমি আর আমি ভাগ করে খাব, অনেকটা দেবে |
স্বাতী বেচারির হয়তো পুরো প্লেটটি খাওয়ার ইচ্ছে, কিংবা অন্য কোনও রান্না বেশি পছন্দ, তা আর বলা হয় না |
অসীম পাঁউরুটি খুব ভালোবাসে, যে-কোনও রান্নার সঙ্গে পাঁউরুটি খাবে অনেকটা |
কয়েকদিন পরে অবশ্য স্বাতী ক্ষীণ প্রতিবাদ করে নিজের পছন্দ জানাতে শুরু করেছিল |
আমাদের পরের দিনের গন্তব্য ব্যানফ () নামে এক বিখ্যাত উদ্যান অঞ্চল, দূরত্ব ৪৯২ কিলোমিটার |
প্রস্তুত হয়ে বেরতে বেরতে ন'টা বেজে যায় |
গাড়ি চালাচ্ছে রবীন, সে সবচেয়ে আগে তৈরি |
রবীন অতিমাত্রায় বাঙালি, কিন্তু ব্যবহারে পাশ্চাত্য দেশীয়দের মতন |
একেবারে সাহেবদের মতন চেহারার কান্তি ঘোরের মুখের ভাষা নিখুঁত বাংলা হলেও ব্যবহারে কোনও বাঙালিসুলভ ঢিলেঢালা ব্যাপার নেই |
সৌমিত্র চট্টেপাধ্যায়ের অন্য যত দোষই থাকুক, অনেকে স্বীকার করে যে, সে হাতঘড়ি পরে না, কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে সব জায়গায় সময়ের ঠিক রাখে |
সমস্যা দুজনকে নিয়ে |
মেয়েদের তৈরি হতে বেশি সময় লাগতেই পারে, ঠিকমতন সাজগোজ না করে তারা বেরতে পারে না |
সবাই তাড়া দেওয়ার পর স্বাতী বেরিয়ে এলেও আবার একবার নিজের ঘরে যাবেই |
কী যেন সে ফেলে এসেছে |
প্রায় প্রত্যেকবারই দেখা যায়, সে টুথব্রাশটা আনতে ভুলে গেছে |
আর অসীম অনেক আগেই তৈরি হয়ে কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ে, ছবি তোলা তার নেশা, তাই গাড়িতে ওঠার আগে তাকে দেখতে পাওয়া যায় না |
ডাকাডাকি করে তাকে তো ফিরিয়ে আনা গেল, তখন সে বলবে, আমাকে আর দু'মিনিট সময় দাও |
তাকে একবার টয়লেটে যেতে হবেই হবে! অন্তত দশবারো বছর ধরে আমি দেখছি, অসীমের এই লাস্ট মিনিট টয়লেটে যাওয়ার দুর্বলতা |
আমি জিগ্যেস করেছি, অসীম, সত্যিই কি তোমাকে সকালে দ্বিতীয়বার টয়লেট যেতে হয়? অসীম আমতা আমতা করে বলে, না, তা নয়, তবে যদি মাঝ রাস্তায় হঠাৎ যদি... |
দ্বিতীয় দিনে পার্বত্য শোভা সত্যিই শ্বাসরুদ্ধকর |
রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা খুবই কম, চতুর্দিক শান্ত ও নিস্তব্ধ, পাহাড়ের চূড়া যেন দেখছে আমাদের |
কখনও মনে হচ্ছে দুর্গ, কখনও মন্দির, গির্জা কিংবা মসজিদ, কখনও কোনও মোষের মাথা, কখনও যেন ভবিষ্যৎ কালের স্থাপত্য |
এই দলটির সকলেই অনেক দেশে অনেক পাহাড় দেখেছে, কিন্তু এই পর্বতমালার সৌন্দর্য যে সম্পূর্ণ অন্য রকম, তা মানতেই হয় |
কয়েক ঘণ্টা পর পথের পাশে সাময়িক বিরতি |
পাশাপাশি দুটি পর্বতশৃঙ্গের ধারালো চূড়া, যেন আকাশের দিকে উদ্যত অস্ত্র |
এ দৃশ্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হৃদয়ঙ্গম করতে হয় |
ফ্লাস্কে আছে কফি, তাছাড়া বিস্কিট, চিজ, এবং সিগারেট |
গাড়ি চালাতে রবীনের ক্লান্তি নেই, সে সৌমিত্রকে বলল, আপনার অভিজ্ঞতার কিছু গল্প বলুন |
কলকাতার সিটি কলেজে সৌমিত্র আর আমি একসঙ্গে পড়েছি |
কলেজের বার্ষিক উৎসবে একবার একটা নাটকে সৌমিত্র আর আমি দুজনেই অভিনয় করেছিলাম |
একটা বিদেশি নাটকের (খুব সম্ভবত গলসওয়ার্দির) 'অ্যান ইনসপেক্টর কলস'-এর বাংলা অনুবাদ |
সে নাটকে সৌমিত্র আর আমার ভূমিকা ছিল সমান সমান কিন্তু যা হয়, পরবর্তীকালে অভিনেতা হিসেবে |
আমার কোনও স্থানই হল না |
আর সৌমিত্র উঠে গেল কত ওপরে |
তখন কে জানত যে সিটি কলেজের এই ছেলেটিকে সত্যজিৎ রায় পছন্দ করে ডেকে নেবেন 'অপুর সংসার' ফিলমের জন্য, পরবর্তীকালে সত্যজিৎ রায়ের অনেক ফিলমে তো বটেই, গোটা বাংলা সিনেমাতেই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় হয়ে উঠবে অন্যতম প্রাধন নায়ক! |
অন্যতম বললাম এই জন্য যে, বেশ কিছু বছর উত্তমকুমার আর সৌমিত্র ছিল দুই প্রধান নায়ক |
অনেক দর্শকই ছিল উত্তমকুমারের বেশি ভক্ত, আবার অনেক দর্শক সৌমিত্রর |
যেমন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গানের |
যেমন, সুচিত্রা মিত্র ও কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রসংগীতের |
এরকম মনে হতেই পারে যে পাশাপাশি দু'জন সমান মাপের শিল্পীর মধ্যে খানিকটা রেষারেষি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতেই পারে |
অন্যদের কথা জানি না, সৌমিত্রের মধ্যে সেরকম মনোভাব আমি কখনও দেখিনি |
উত্তমকুমারকে সে মনে করেছে বড় ভাইয়ের মতন, আর উত্তমকুমারও কনিষ্ঠের মতন স্নেহ করতেন সৌমিত্রকে |
এটা ভারী চমৎকার ব্যাপার |
গাড়ি চলতে শুরু করার পর সৌমিত্র শুরু করল নানারকম টুকিটাকি গল্প |
তার মধ্যে একটি তরুণকুমার সম্পর্কে |
উত্তমকুমারের এই ভাইটিরও বেশ অভিনয়প্রতিভা ছিল, ছায়াছবিতে প্রথম আবির্ভাবের পর তার চেহারাও ছিল ছিপছিপে, সুশ্রী, কিন্তু সে কোনওদিনই নায়কের পর্যায়ে উন্নীত হল না, কারণ দিন দিন সে মোটা হতে লাগল |
সৌমিত্র একদিন উত্তমকুমাকে বলল, উত্তমদা, আপনি তরুণকুমারকে (ডাকনাম বুড়ো) বলতে পারেন না, একটু ব্যায়াম করতে, শরীরটা ঠিক রাখতে? |
যারা পারফরমিং আর্টিস্ট, তাদের শরীর ঠিক রাখতেই হয় |
বাংলায় একটা কথা আছে, কেশো রুগি চোর আর মুখচোরা বেশ্যার কখনও উন্নতি হয় না |
সেই রকমই গলা ভাঙা গায়ক, বানান ভুল করা লেখক, চোখের দোষ থাকা ক্রিকেটার, বেশি অহংকারী রাজনীতিবিদ, এদের কোনও উন্নতির আশা নেই |
উত্তমকুমার একদিন সৌমিত্রের বাড়িতে এলেন ভোরবেলা |
সৌমিত্র আর উত্তমকুমার দুজনই নিয়মিত ব্যায়াম করেন, ভোরবেলা জগিং করতে যান, দুজনকেই প্রচুর খাটতে হয় |
উত্তমকুমার সৌমিত্রকে বললেন, পুলু (ডাকনাম) তুমি তো বলেছিলে বুড়োর ব্যায়াম-ট্যায়ামের কথা! এসো, |
আমার সঙ্গে দেখবে এসো |
আমি ওকে জোর করে ডেকে জগিং করাতে এনেছি, তার ফল কী হয়েছে |
সৌমিত্র গিয়ে দেখল, লেকে একটা গাড়ির মধ্যে বসে তরুণকুমার ভোঁস-ভোঁস করে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে! |
এই রকম গল্পের মাঝখানে অসীম রায় হঠাৎ বলে উঠল, সিনেমার সব লোকগুলো বড় দু'নম্বরি হয়! |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.