content
stringlengths
0
129k
সূরা মারইয়াম : (২৫)
আল্লাহ চাইলে নাড়া ব্যতীতই তার নিকট খেজুর পড়ত, কিন্তু তিনি তাকে আসবাব গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন
তাই সকলের কর্তব্য রিযকের আসবাব গ্রহণ করে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা
তাকওয়া অবলম্বন করা:
রিযকের জন্য প্রত্যেক মুসলমানের উচিত আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করা এবং হালাল রিযকের উপায় অবলম্বন করা ও হারাম থেকে বিরত থাকা
আল্লাহ তার ইচ্ছা ও হিকমতের দাবি অনুসারে প্রত্যেককে রিযক প্রদান করেন
অতএব যার জন্য আল্লাহ যে পরিমাণ রিযক নির্ধারণ করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকা এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করা
আল্লাহ তাআলা বলেন :
যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন
এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না
সূরা তালাক : (২-৩)
তিনি আরো বলেন :
আর আল্লাহ যদি তার বান্দাদের জন্য রিয্ক প্রশস্ত করে দিতেন, তাহলে তারা যমীনে অবশ্যই বিদ্রোহ করত
কিন্তু তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণে যা ইচ্ছা নাযিল করেন
নিশ্চয় তিনি তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে পূর্ণ অবগত, সম্যক দ্রষ্টা
সূরা শুরা : (২৭)
ইবনে কাসির রহ. বলেছেন : কিন্তু আল্লাহ তাআলা প্রত্যেককে সে পরিমাণ রিযক প্রদান করেন, যাতে তার কল্যাণ নিহিত
এ ব্যাপারে তিনিই বেশী জানেন
অতএব যে সম্পদের উপযুক্ত তাকে তিনি সম্পদ দান করেন
আর যে অভাবের উপযুক্ত তাকে তিনি অভাবে রাখেন
এর দলিল হিসেবে ইমাম ইবনে কাসির উল্লেখ করেন :
أن رسول الله صلى الله عليه قال: "أتاني جبريل، فقال: يا محمد، ربك يقرأ عليك السلام، ويقول: إن من عبادي من لا يصلح إيمانه إلا بالغنى ولو أفقرته لكفر، وإن من عبادي من لا يصلح إيمانه إلا القلة ولو أغنيته لكفر، وإن من عبادي من لا يصلح إيمانه إلا بالسقم ولو أصححته لكفر، وإن من عبادي من لا يصح إيمانه إلا بالصحة ولو أسقمته لكف...
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : আমার কাছে জিবরিল এসে বলে : হে মুহাম্মদ, তোমার রব তোমার কাছে সালাম প্রেরণ করেছেন এবং তিনি বলেছেন : আমার কিছু বান্দা রয়েছে, সচ্ছলতা ব্যতীত যার ঈমান ঠিক থাকবে না, আমি যদি তাকে অভাব দেই, তাহলে সে কুফরি করবে
আবার আমার কিছু বান্দা রয়েছে, অভাব ব্যতীত যার ঈমান ঠিক থাকবে না, আমি যদি তাকে সচ্ছলতা দেই, তাহলে সে কুফরি করবে
আবার আমার কিছু বান্দা রয়েছে অসুস্থতা ব্যতীত যার ঈমান ঠিক থাকবে না, আমি যদি তাকে সুস্থ করি তাহলে সে কুফরি করবে
আবার আমার কিছু বান্দা রয়েছে সুস্থতা ব্যতীত যার ঈমান ঠিক থাকবে না, আমি যদি তাকে অসুস্থ করি, তাহলে সে কুফরি করবে
হাদিসটি দুর্বল, ইবনে জাওজি রহ. যদিও ইলাল গ্রন্থে এ হাদিসটি উল্লেখ করেছেন, কিন্তু এর অর্থ সহিহ, আর এ জন্যই ইমাম ইবনে কাসির হাদিসটি উল্লেখ করে কোন মন্তব্য করেননি
এ ছাড়া আরো কিছু কারণ রয়েছে, যার ফলে রিযক বৃদ্ধি পায়, যেমন আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা
বুখারি ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
من سره أن يبسط له في رزقه وينسأ له في أثره فليصل رحمه.
যে তার রিযক বৃদ্ধি ও পশ্চাতে সুখ্যাতি কামনা করে, সে যেন রেহেম তথা আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট ও অবিচ্ছন্ন রাখে
(বুখারি ও মুসলিম)
অনুরূপ আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের জন্য দান-সদকা করার ফলেও রিযক বৃদ্ধি পায়
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, রিযকের প্রসস্ততা বা সচ্ছলতা দ্বারা সর্বপ্রথম উদ্দেশ্য আল্লাহ তাআলার বরকত, বান্দাকে দেয়া তার সুখ ও শান্তি
অল্প সম্পদে যদি আল্লাহ কাউকে এসব নিআমত দান করেন, তাহলে তিনি প্রকৃত সচ্ছলতা ও প্রসস্ততা দান করেছেন
মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে এটাই প্রমাণিত হয়
আল্লাহ তাআলা বলেন :
আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও যমীন থেকে বরকতসমূহ তাদের উপর খুলে দিতাম; কিন্তু তারা অস্বীকার করল
অতঃপর তারা যা অর্জন করত তার কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম
সূরা আরাফ : (৯৬)
দোয়া করা:
দোয়ার কোন বিকল্প নেই, যে কোন প্রয়োজনে আল্লাহর নিকট দোয়া করা, কখনো আল্লাহর রহমত ও দোয়া কবুলের আশা থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না
সহিহ মুসলিমে রয়েছে :
يستجاب لأحدكم ما لم يدع بإثم أو قطيعة رحم ما لم يستعجل
'তোমাদের প্রত্যেকের দোয়া কবুল হয়, যদি গুনাহ অথবা আত্মীয়তা ছিন্নের দোয়া করা না হয়, এবং যে পর্যন্ত তাড়াহুড়ো করা না হয়'
মুসিবত দুর করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার দোয়া
ইমাম তিরমিযি সুলাইমান থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
لا يرد القضاء إلا الدعاء، ولا يزيد في العمر إلا البر. والحديث حسنه الألباني
'দোয়াই একমাত্র তাকদীর পরিবর্তন করতে পারে এবং নেকিই শুধু মানুষের বয়ষ বৃদ্ধি করতে সক্ষম'
তিরমিজি, হাদিসটি আল-বানি হাসান বলেছেন
হাদিসে এসেছে, জিন্নুন (ইউনুস আলাইহিস সালাম) এর দোয়া, যার মাধ্যমে তিনি মাছের পেটে আল্লাহকে আহ্বান করেছেন, তা হচ্ছে :
لا إله إلا أنت سبحانك إني كنت من الظالمين،
কোন মুসলিম মুসিবতে এ দোয়া পড়লে, অবশ্যই আল্লাহ তার দোয়া কবুল করবেন
' তিরমিযি, হাকেম- তিনি হাদিসটি সহিহ বলেছেন, আর যাহাবি তার সমর্থন করেছেন
আনাস বিন মালেক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : 'আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বসা ছিলাম, এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছে, সে রুকু করল, সেজদা করল, তাশাহহুদ পড়ল এবং দোয়া করল, সে তার দোয়ায় বলল :
اللهم إني أسألك بأن لك الحمد لا إله إلا أنت، المنان بديع السموات والأرض، يا ذا الجلال والإكرام، يا حي يا قيوم إني أسألك،
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাথীদের বললেন : তোমরা জান সে কিসের মাধ্যমে দোয়া করেছে ? তারা বলল : আল্লাহ ও তার রাসূলই ভাল জানেন
তিনি বললেন : যার হাতে আমার নফস, তার শপথ করে বলছি, সে আল্লাহর ইসমে আজমের মাধ্যমে দোয়া করেছে, যার মাধ্যমে দোয়া করলে, দোয়া কবুল হয় এবং যার মাধ্যমে প্রার্থনা করলে মনোবাসনা পূর্ণ হয়'
নাসায়ী, ইমাম আহমদ, আল-বানি হাদিসটি সহিহ বলেছেন
অতএব প্রত্যেকের উচিত ইউনুস আলাইহিস সালাম দোয়া ও ইসমে আজমের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা
রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দোয়া করা, সেজদায় দোয়া করা
মুসলিম ও সুনান গ্রন্থে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যখন রাতের অর্ধেক অথবা দুই তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হয়, আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন, অতঃপর বলেন :
هل من سائل يعطى؟ هل من داع يستجاب له؟ هل من مستغفر يغفر له؟ حتى ينفجر الصبح
আছে কেউ প্রশ্নকারী, যাকে দেয়া হবে ? আছে কেউ দোয়াকারী, যার দোয়া কবুল করা হবে ? আছে কেউ ইস্তেগফারকারী, যার গুনা ক্ষমা করা হবে ? এভাবেই ফজর উদিত হয়
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেজদায় দোয়া করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করে বলেন:
وأما السجود فاجتهدوا في الدعاء فقمن أن يستجاب لكم. رواه مسلم.
তোমরা সেজদায় খুব দোয়া কর, কারণ সেখানে দোয়া কবুল করা হয়'
তাকদীরে সন্তুষ্ট থাকার কিছু পদ্ধতি:
এক. নিচের লোকের প্রতি দৃষ্টি দেয়া : ইমাম মুসলিম প্রমুখগণ বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
"انظروا إلى مَنْ أَسْفَلَ منكم، ولا تنظروا إلى مَن هو فوقكم؛ فهو أجدر ألَّا تَزْدَرُوا نعمة الله"
তোমাদের নিচে যারা রয়েছে, তাদের দিকে তোমরা দৃষ্টি প্রদান কর
তোমাদের উপররের লোকের দিকে তাকিয়ে না, তাহলে তোমরা আল্লাহর নিআমতের অকৃতজ্ঞ হবে না
ইমাম নববী বলেন : ইবনে জারির প্রমুখগণ বলেছেন : এ হাদিসে সব ধরনের কল্যানের কথা রয়েছে, কারণ মানুষ যখন দুনিয়ার দিক থেকে তার উপরে তাকায়, তখন সে তার ন্যায় নিআমত প্রত্যাশা করে
আর তার নিকট রক্ষিত আল্লাহর নিআমত সে অবহেলার দৃষ্টিতে দেখে, আরো অধিক কামনা করে তার সমকক্ষ বা নিকটবর্তী হওয়ার জন্য, এটাই মানুষের সাবাভিক প্রকৃতি
আর যদি দুনিয়াবী বিষয়ে তার নিচের দিকে তাকায়, তখন তার সামনে আল্লাহর নিআমত বিকশিত হবে, ফলে সে আল্লাহর শোকর আদায় করবে, বিনয়ী হবে ও কল্যাণমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করবে
দুই. অন্তর থেকে এ ধারণা দূরীভূত করা যে, সচ্ছলতা সম্মানের প্রতিক আর অসচ্ছলতা অসম্মানের প্রতিক
আল্লাহ তাআলা এ ধারণা খণ্ডণ করে দিয়েছেন
তিনি বলেন :
আর মানুষ তো এমন যে, যখন তার রব তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর তাকে সম্মান দান করেন এবং অনুগ্রহ প্রদান করেন, তখন সে বলে, আমার রব আমাকে সম্মানিত করেছেন
আর যখন তিনি তাকে পরীক্ষা করেন এবং তার উপর তার রিয্ককে সঙ্কুচিত করে দেন, তখন সে বলে, আমার রব আমাকে অপমানিত করেছেন'
তিন. এ বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ মানুষের কল্যানের দিকে লক্ষ্য রেখেই কম দেন বা বেশী দেন
তিনি বলেন :
আর আল্লাহ যদি তার বান্দাদের জন্য রিয্ক প্রশস্ত করে দিতেন, তাহলে তারা যমীনে অবশ্যই বিদ্রোহ করত
কিন্তু তিনি নির্দিষ্ট পরিমাণে যা ইচ্ছা নাযিল করেন
নিশ্চয় তিনি তাঁর বান্দাদের ব্যাপারে পূর্ণ অবগত, সম্যক দ্রষ্টা
সূরা শুরা : (২৭)
চার. এ জগতে যদি মানুষ রিযক ও সামর্থের ব্যাপারে সমান হয়ে যেত, তাহেল এ পার্থিব জগত অচল হয়ে যেত, অনেক কর্মই বিনষ্ট হতো
এ দিকেই ইশারা করে আল্লাহ বলছেন :
তারা কি তোমার রবের রহমত ভাগ বণ্টন করে? আমিই দুনিয়ার জীবনে তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করে দেই এবং তাদের একজনকে অপর জনের উপর মর্যাদায় উন্নীত করি যাতে একে অপরকে অধিনস্থ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে
আর তারা যা সঞ্চয় করে তোমার রবের রহমত তা অপো উৎকৃষ্ট
সূরা জুখরুফ : (৩২)
পাঁচ. আমরা যখন এসব অনুধাবন করতে পারলাম, এখন মুসলিমদের জানা উচিত, রিযক আল্লাহর তাকদির, তার ইচ্ছা ও ইলমের উপর নির্ভরশীল, অতএব আল্লাহর বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকা এবং তার তাকওয়া অবলম্বন করা, যেমন তিনি বলেছেন :
যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন
এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না
সূরা তালাক : (২-৩)
মুদ্দাকথা : সচ্ছলতা অসচ্ছলতা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য একটি পরীক্ষা
এর মাধ্যমে তিনি কৃতজ্ঞ ও অকৃতজ্ঞ, সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদী যাচাই করেন
ধনী ব্যক্তির উচিত তার উপর আল্লাহর নিআমতের শোকর আদায় করা এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী দান-সদকা করা
আর ফকীর ব্যক্তির উচিত দৈর্য ধরা ও আল্লাহর প্রশংসা করা
আবু হামিদ মোহাম্মদ ইবনে মোহাম্মদ আল-গাজ্জালি