content
stringlengths
0
129k
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, সুদ জিনিসটাতে ঝামেলা কোথায়
কেন এটা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর
আমরা যদি এতক্ষণ ধরে বর্ণিত সুদের সংজ্ঞা বুঝে থাকি, তাহলে বুঝব যে এতে বিনিময়ের মাধ্যম আরও দুর্লভ হয়ে যায়
ঠিক যেন ব্রিজটার মতো
যারা টোল দিতে পারে না, তারা ব্রিজ পার হতে পারে না
যখন বিনিময়ের মাধ্যম থাকে না, কিংবা সুদ দেওয়ার ক্ষমতা থাকে না, তখন মানুষের লেনদেন করার ক্ষমতা কমে যায়
আর যখন মানুষ লেনদেন করতে পারে না, তখন সমাজে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্তিমিত হয়ে পড়ে
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেহেতু একটা সমাজের চালিকাশক্তি, তাই তখন সমাজটাই স্থবির হয়ে পড়ে
ঠিক যেন আমাদের শরীরের মতো
যখন রক্ত চলাচল করতে পারে না, তখন প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও অন্যান্য উপাদান শরীরের জরুরি অংশগুলোতে পৌঁছাতে পারে না এবং আমরা নানারকম রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হই
রিবা বা সুদ তাহলে শরীরের রক্ত তথা বিনিময়ের মাধ্যমকে জমাট বাঁধিয়ে দেয়, এটার অবাধ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে
এখানে লক্ষণীয়, অন্য যেকোনো পণ্যের (যেমন: ভাত, ডাল, পোশাক-আশাক সবকিছুর) দামই এভাবে নির্ধারিত হয় এর আপেক্ষিক ডিমান্ড এবং সাপ্লাইয়ের ওপর নির্ভর করে
যদি ডিমান্ড সাপ্লাই এর চেয়ে বেশি হয়, তাহলে দাম বেশি
আর সাপ্লাই ডিমার চেয়ে বেশি হলে দাম কম ... এভাবে
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে যে 'টাকার দাম'ও এভাবে নির্ধারিত হলে সমস্যা কোথায়? সুদকে আমরা 'টাকার দাম' হিসেবে চিন্তা করতেই পারি
এখানেই আল্লাহ্‌র বিধানের প্রাসঙ্গিকতা এবং প্রজ্ঞা
ইসলামে মুদ্রাকে আর দশটা পণ্যের মতো বিবেচনা করা যাবে না, কারণটা আমরা আগেই বলেছি
বিনিময়ের মাধ্যম জোগাড় করতেই যদি মানুষকে দাম দিতে হয়, তাহলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনেক স্থবিরতা আসবে
মানুষের দক্ষতা, যোগ্যতা ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও সে কোনো লেনদেন করতে পারবে না
কারণ, তার কাছে পর্যাপ্ত মুদ্রা নেই এবং সুদ দিয়ে মুদ্রা জোগাড় করার মতো সামর্থ্যও নেই
একটা ছবির সাহায্যে আমরা ব্যাপারটা আরও ভালো বুঝতে পারব ইনশা আল্লাহ্‌
এখন আমরা কীভাবে জানি যে, ইসলামে মুদ্রাকে আর দশটা পণ্যের মতো ব্যবহার করা যাবে না? উত্তর হচ্ছে সহীহ হাদীস থেকে
উবাদাহ বিন সামিত (রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم বলেছেন, "সোনার দ্বারা সোনা, রুপার দ্বারা রুপা, গমের বদলে গম, যবের বদলে যব, খেজুরের বদলে খেজুর ও লবণের বদলে লবণ লেনদেন (কম-বেশি না করে) একই রকমে সমপরিমাণে ও হাত বাঁ হাত অর্থাৎ নগদে বিক্রয় চলবে
যখন ওই বস্তুগুলোর মধ্যে প্রকারভেদ থাকবে, তখন নগদে তোমরা ইচ্ছানুযায়ী বিক্রয় করো
(মুসলিম, ১৫৮৭)
আপাতদৃষ্টিতে এই হাদীসটি খুবই বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে
যদি আমি নগদে এবং সমান পরিমাণে লেনদেন করি, তাহলে সেই লেনদেনের অর্থটা কী! আর এমন অর্থহীন লেনদেন নিষিদ্ধ করারই-বা কী দরকার! কিন্তু আমরা যদি হাদীসটি গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করি এবং মুদ্রার অবিশেষায়িত রূপের ( ) কথা বিবেচনায় রাখি, তাহলে বুঝব যে হাদীসে উল্লেখিত পণ্যগুলো আসলে তখন মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো
হাদীসটি আসলে ইসলামে মুদ্রার ব্যাপারে মূলনীতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে!
বিনিময়ের মাধ্যম থেকে সুবিধা আসলে দুইভাবে নেয়া যায়
দেরিতে শোধ করার সুযোগ থাকলে অথবা লেনদেনের সময় খারাপ কোয়ালিটি আর ভালো কোয়ালিটির পরিমাণের মাঝে কমবেশি করার মাধ্যমে
বিনিময়ের মাধ্যম থেকে সুবিধা নেয়ার সকল সম্ভাব্য রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে এই হাদীস
এই হাদীসে উল্লেখিত নিষেধাজ্ঞার সীমারেখা শুধু এই ছয়টি পণ্যের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ কি না, এ নিয়ে ফকীহদের মাঝে মতভেদ রয়েছে
তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতটি হলো, স্কলারগণ ওপরের ছয়টি পণ্যকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন এদের বিচার্য বিষয়ের ( ) ওপর ভিত্তি করে
সোনা ও রুপা বাদে বাকি চারটি পণ্যের ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় ( ) হবে এদের ওজন বা পরিমাণ; তা ছাড়াও এটা ভক্ষণযোগ্য হতে হবে
আর সোনা ও রুপার ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় হচ্ছে মূল্য
কেন? কারণ, আমাদের কমন সেন্স থেকেই আমরা বুঝি যে, সোনা ও রুপার বৈশিষ্ট্য অন্য চারটি পণ্য থেকে একটু আলাদা
আমাদের সমকালীন উদাহরণ থেকে বুঝতে পারি যে, দুই টাকার কয়েন ও দুই টাকার নোটের ওজন আলাদা হলেও এদের বাজারমূল্য একই
সামগ্রিকভাবে লেনদেন-সংক্রান্ত যে হাদীসগুলো আমরা পাই, সেখান থেকে আমরা বুঝতে পারি যে
লেনদেনের ধরন শর্ত
টাইপ ও আইটেম দুইটাই একই
যেমন: সোনার সাথে সোনা
· নগদ লেনদেন হতে হবে এবং পরিমাণ একই হতে হবে, যেন সেটার জন্য কোনো 'দাম' রাখার কোনো সুযোগই থাকে না
অর্থাৎ বাকিতে লেনদেন করার বা পণ্যের গুণগত মান, পরিমাণ এগুলো কোনোকিছু কমবেশি করার সুবিধা দেওয়ার/পাওয়ার মাধ্যমে কেউ যেন কোনো লাভ না করতে পারে
টাইপ একই কিন্তু আইটেম ভিন্ন
যেমন: সোনার সাথে রুপা · শুধু নগদ লেনদেন হতে হবে, পরিমাণ ভিন্ন হলে সমস্যা নেই
কারণ, মূল্যমান ভিন্ন হওয়াতে পরিমাণে কম-বেশি নিয়ে কোনো সুবিধা নেয়া হচ্ছে না
টাইপ ও আইটেম ২টাই ভিন্ন
যেমন, সোনার সাথে লবণ · এ ক্ষেত্রে একটি মুদ্রা এবং আরেকটি পণ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে
তখন মুনাফা করতে অসুবিধা নেই, তাই বাকিতেও লেনদেন করা যাবে, পরিমাণও কমবেশি করা যাবে
তবে এটা মাথায় রাখতে হবে যে, যেকোনো একটি প্রদানে বিলম্ব করা যাবে; দুটোই নয়
অর্থাৎ, কোনো লেনদেন করার সময় হয় দাম দেওয়া দেরি করা যাবে, নয়তো পণ্য পৌঁছে দেওয়া
দুটোই দেরি করা যাবে না
তাহলে কোন কোন লেনদেনে সুদ হয় না?
তবে এখানে আমাদের অবশ্যই একটা বিষয় বুঝতে হবে যে, লেনদেনের প্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করবে যে অর্থনীতিতে আমরা বাস করছি সেটার স্বরূপের ওপর
যদি ওই এলাকায় লবণ এবং রুপা এই দুটাই মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে লবণ এবং রুপার লেনদেনও নগদ হতে হবে
যদি তা না হয়, তাহলে রুপাকে মুদ্রা এবং লবণকে সাধারণ পণ্য ভাবতে হবে
কারণটা আমরা আগেই বলেছি, আবারো বলছি যে, সোনা ও রুপার ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় ( ) এবং অন্য ৪টা দ্রব্যের ক্ষেত্রে বিচার্য বিষয় একই না
ঐতিহাসিকভাবে সোনা এবং রুপা মূলত মুদ্রা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে এসেছে
এই হাদীসটা আমাদের সাধারণ মূলনীতি জানিয়ে দিচ্ছে
তাই যদিও আমরা এখন সোনা বা রুপা কোনোটাই মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করি না, তবুও আমাদের সময়ে প্রচলিত মুদ্রা তথা ডলার, রিঙ্গিত, টাকা এগুলোর ক্ষেত্রে এই হাদীসে উল্লেখিত মূলনীতি প্রয়োগ করতে হবে
আবার যেহেতু এই হাদীসে নাম ধরে ৬টা দ্রব্যের নাম এসেছে, তাই সোনা, রুপা ইত্যাদির ক্ষেত্রে হাদীসে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হবে
অর্থাৎ আক্ষরিক এবং পারিভাষিক দুইভাবেই এই হাদীস আমাদের মেনে চলতে হবে; আমাদের পরিবর্তিত সময়েও
এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কি এই হাদীসের কোনো প্রয়োগ আছে? অবশ্যই!
⬛ আমরা যদি দুটো দেশের মুদ্রার মাঝে লেনদেন করতে চাই, যেমন ডলার আর টাকা, তাহলে এক্সচেঞ্জ রেট অনুসারে আমরা লেনদেন করতে পারি, কিন্তু সেটা হতে হবে নগদ
⬛ আমরা অনেক সময় ভাংতি টাকা খুঁজে থাকি
ভাংতি টাকা দেওয়া নিয়ে কোনো ব্যবসা করা যাবে না; কারণ, সেটা একই ধরনের মুদ্রা
⬛ ঈদের সময়ে আমরা পুরোনো নোটের বদলে নতুন নোট নিয়ে থাকি, তখন পরিমাণে কমবেশি করি, যেটা করা যাবে না
⬛ পুরোনো সোনার গয়নার সাথে নতুন গয়না আদান-প্রদান করে পার্থক্যটা টাকায় শোধ করা যাবে না
রিবা নিয়ে তো অনেক কথাই হলো
এখন নিশ্চয়ই আমাদের জানতে ইচ্ছা করছে যে, মুনাফা কী
সুদ আর মুনাফার মাঝে পার্থক্যটাই-বা কী
মুনাফার কন্সেপ্ট বুঝতে হলে আমাদের আগে বুঝতে হবে প্রান্তীয় উপযোগের কন্সেপ্ট
প্রান্তীয় উপযোগ ( ) হচ্ছে কোনো বস্তুর একটা ইউনিট ভোগ করা হলে অতিরিক্ত যে উপযোগ পাওয়া যায়, সেটা
অর্থাৎ কমলা খাচ্ছি এই অবস্থায় একটা কমলা খেলে যে অতিরিক্ত উপযোগ পাব, তাকে বলে প্রান্তীয় উপযোগ
একটু খেয়াল করলেই আমরা বুঝব যে, কোনো জিনিস ভোগ করতে থাকলে সেটার প্রান্তীয় উপযোগ কমতে থাকে
অর্থাৎ কমলা যদি আপনার খুব পছন্দের হয়, তাহলে প্রথম ১-২টা কমলা খেতে আপনার যত ভালো লাগবে, পরেরগুলো খেতে আরে তত ভালো লাগবে না
কমলার সংখ্যা যত বাড়তে থাকবে, সেখান থেকে প্রাপ্ত প্রান্তীয় উপযোগের পরিমাণ তত কমতে থাকবে এবং একসময় তার পরিমাণ হয়ে যাবে ঋণাত্মক
মানে খেতে ভালো তো আর লাগবেই না; বরং খারাপ লাগবে/বমি আসবে
অর্থনীতির ভাষায় একে বলে . নিচে একটা ছবির সাহায্যে ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করা হলো:
ছবি থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, প্রথম প্লেট ভাত থেকে কৃষকের প্রান্তীয় উপযোগ ছিল ১০০ ইউনিট
কমতে কমতে পরে তা হয়েছে মাইনাস ১০ ইউনিট
একই কথা মাছওয়ালার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য
এখন চিন্তা করলে দেখব যে, যেকোনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এই প্রান্তীয় উপযোগ/প্রান্তীয় খরচ/প্রান্তীয় আয় এগুলোর ভিত্তিতে
যেমন: ধরুন, একটা কোম্পানি
তারা নতুন একজন শ্রমিক নিয়োগ করবে কি না, সেটা ঠিক করবে তাকে নিয়োগের ফলে বৃদ্ধি পাওয়া প্রান্তীয় খরচ ( ) এবং অর্জিত প্রান্তীয় আয়ের ( ) মাঝে তুলনা করে
তেমনিভাবে আমরা যখন কোনো একটা কিছু কিনব কি না বা নিজের কাছে রাখব কি না, সেই সিদ্ধান্ত নিই; সেটাও নিই প্রান্তীয় উপযোগের পরিমাণের ভিত্তিতে, মোট উপযোগের ভিত্তিতে নয়
ওপরের ছবিতে দেখানো কৃষক বা মাছওয়ালার মতো কোনো কিছুর প্রান্তীয় উপযোগ যখন আমাদের কাছে কমে যায়, তখন তা আমাদের কাছে অপ্রয়োজনীয় লাগতে থাকে
তাই যেই জিনিসটা আমার কাছে অনেক আছে, সেই অতিরিক্ত জিনিসগুলো আমি নিজের কাছে রাখতে চাই না
এখন একটা অপশন হচ্ছে আমি এটা দিয়ে লেনদেন করতে পারি এবং বিনিময়ে এমন জিনিস পেতে পারি, যেটার প্রান্তীয় উপযোগ আমার কাছে অনেক বেশি, কিন্তু যে বিক্রি করছে তার কাছে অনেক কম
এভাবে যখন আমরা বিনিময় করছি, তখন উভয়েই লাভবান হচ্ছি
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন কৃষক এক প্লেট ভাতের বিনিময়ে একটা মাছ নিচ্ছে
যে ভাত দিলো, তার প্রান্তীয় উপযোগ তার কাছে ছিল ১০ ইউনিট
আর যে মাছটা পেল, তারটা ১০০ ইউনিট
তাহলে কাটাকাটি করার পরও তার নেট উপযোগ বৃদ্ধি পেল ৯০ ইউনিট
একই কথা মাছওয়ালার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য
তার কাছে মাছের প্রান্তীয় উপযোগ খুবই কম, তাই সে দিয়ে দিচ্ছে
পক্ষান্তরে ভাতের প্লেটেরটা অনেক বেশি
লেনদেনের ফলে এই যে উপযোগের বৃদ্ধি ঘটে, এটাই হচ্ছে মুনাফা বা লাভ
খেয়াল করলে দেখব যে, আমরা কিন্তু এখানে বিনিময় অর্থনীতির কথা বলছি, যেখানে পণ্যের সাথে পণ্যের বিনিময় হচ্ছে
এটা এখন প্রায় অনুপস্থিত বললে অত্যুক্তি হবে না