content
stringlengths
0
129k
আমরা এখন বাস করি মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতিতে, যেখানে সব লেনদেনের এক দিকে থাকে মুদ্রা
আমাদের হয়তো মনে আছে যে, আমরা বলেছিলাম মুদ্রার একটি কাজ হচ্ছে মূল্যের মানদণ্ড হিসেবে কাজ করা
এখন হয়তো বিষয়টা ক্লিয়ার হয়েছে
আমরা যদি সব লেনদেনে পণ্যের বিনিময়ে মুদ্রা পেতে চাই, তাহলে একটা কমন রেফারেন্স পয়েন্ট লাগবে, যার মাধ্যমে আমার উপযোগের যে হ্রাস বা বৃদ্ধি ঘটেছে সেটা প্রকাশ করা যাবে
আগেও বলেছি, আবারো বলছি, মুদ্রা এখানে স্রেফ একটা তথ্য হিসেবে কাজ করছে
ধরুন আমার উপযোগ যদি ৫০ ইউনিট বেড়ে থাকে, টাকার হিসেবে সেটার মূল্য হয়তো-বা ২৫ টাকা
কীভাবে এই মূল্য তথা দামটা নির্ধারিত হয়?
আগে আমরা দেখেছি একজন মাত্র কৃষক ও মাছওয়ালার উদাহরণ
এমন তো হতে পারে যে, বাজারে আরও মাছওয়ালা আছে, যে এক প্লেট ভাতের বিনিময়ে কেউ দুটি-তিনটি মাছ দিতে ইচ্ছুক
আবার অনেকে পোলাওর চালও বিক্রি করে
এভাবে বাজারে কোনো জিনিসে চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে কোনো জিনিসের 'দাম' সৃষ্টি হয়
আমরা সবাই বহুলপ্রচলিত চাহিদা ও জোগান রেখার মিথস্ক্রিয়া-সংক্রান্ত নিচের ছবিটা হয়তো দেখেছি:
বাজারে চাহিদা ও জোগানের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় যে 'দাম' নির্ধারিত হয়, তা কিন্তু ক্রেতা বা বিক্রেতা যে দামে কেনা-বেচা করতে রাজি থাকে, তার সমান না
ক্রেতা যত দাম দেয়, জিনিসটার মূল্য তার কাছে এর চেয়ে বেশি
একই কথা বিক্রেতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য
সেও আসলে এর চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে রাজি ছিল
বাজারের উপস্থিতির জন্য তাদের যে লাভ হলো, সেটা নিচের ছবিতে বোঝানোর চেষ্টা করা হলো:
ছবি থেকে আমরা বুঝতে পারছি, ক্রেতা ১০ ইউনিট দামেই দ্রব্যটি কিনতে রাজি ছিল
কিন্তু বাজারে ৫ ইউনিটেই পেয়ে গেছে
এই ৫ ইউনিট তার লাভ
একই কথা বিক্রেতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য
এ জন্য আমরা খুব সহজ ভাষায় বলি, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্যকে মুনাফা বলে
এটার নেপথ্যের মিথস্ক্রিয়া আসলে এটা
তাহলে আমরা কী বুঝলাম?
মুনাফা = বিক্রেতা বিক্রি করে যত টাকা পেয়েছে (আয়) - যত টাকায় বেচতে রাজি ছিল (খরচ)
তাহলে সুদ আর মুনাফার মাঝে পার্থক্য কি আমাদের কাছে স্পষ্ট হলো কিছুটা? মূল পার্থক্য যেটা আমাদের ব্রেইনে গেঁথে নেওয়া দরকার, সেটা হচ্ছে যে মুনাফাতে দুই পক্ষই লাভবান হচ্ছে এবং দুই পক্ষের জন্যই উপযোগ সৃষ্টি হচ্ছে ( )
এটা শুধু প্রকৃত সম্পদের ( ) লেনদেনেই হওয়া সম্ভব
প্রকৃত সম্পদ কী? প্রকৃত সম্পদ হচ্ছে সেই সম্পদ, যা থেকে আমরা সরাসরি কোনো উপযোগ () পাই
যেমন: বাড়ি, খাবার, পোশাক-আশাক, ল্যাপটপ ইত্যাদি
আরও একধরনের সম্পদ আছে, যাকে আমরা বলতে পারি আর্থিক সম্পদ ( )
আর্থিক সম্পদকে সংজ্ঞায়িত করা যায় এভাবে যে, এটা হলো প্রকৃত সম্পদের ( ) ওপর কারও দাবি বা
যেমন: শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদি
অর্থাৎ এগুলো থেকে প্রত্যক্ষভাবে উপযোগ পাওয়া যায় না
পরোক্ষভাবে পাওয়া যায়
মানে আমরা এগুলোর মাধ্যমে যেসব প্রকৃত সম্পদ ভোগ করতে পারি, সেগুলো থেকে উপযোগ পাই
এখন উপযোগ কীভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে? আগে আমরা দেখেছি, আমার কাছে কোনো সম্পদ অতিরিক্ত থাকলে সেটার অতিরিক্ত অংশটা লেনদেন করলে উপযোগ বৃদ্ধি হয়
মানে আমার কাছে কম উপযোগের কিছু বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে আমি এমন কিছু কিনতে পারি, যার উপযোগ আমার কাছে অনেক বেশি
কিন্তু এটাই কি একমাত্র উপায়?
⬛ আমার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আমি কোনো বস্তুর রূপান্তর ঘটাতে পারি এবং সেটা বেশি দামে বিক্রি করতে পারি
যেমন: কাপড় থেকে জামা বানাতে পারি; আটা থেকে রুটি, পিঠা
এগুলো বানিয়ে বিক্রি করতে পারি এমন মানুষদের কাছে, যাদের এগুলো করার সময়/দক্ষতা/এনার্জি নেই
⬛ আমি কোনো জিনিসকে সহজ প্রাপ্য করতে পারি
ধরুন সুপার স্টোরগুলোতে জিনিসপত্রের দাম বেশি হয়
কারণ, সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে, সাজানোভাবে জিনিসগুলো পাওয়া যায়, অনেক কিছু একসাথে পাওয়া যায়, যেটা হয়তো এলাকার কাঁচা বাজারগুলো থেকে কেনা কষ্টকর
এ রকম আরও উদাহরণ দেওয়া যায়
সুদ সম্পর্কে আলোচনার প্রাক্কালে আমরা বলেছি যে, একই বিনিময়ের মাধ্যম লেনদেনের সময় কোয়ালিটি কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়
২২ ক্যারেটের সোনা আর ১৮ ক্যারেটের সোনা একই ভাবে ওজন করতে হবে
এখন কারও কাছে যদি এই কোয়ালিটির পার্থক্য থেকে উপযোগ সৃষ্টি হয়? তাহলে কী করতে হবে, সেটাও হাদীসে আমাদের বলে দেওয়া হচ্ছে:
আবু সা'ঈদ খুদরি (রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু) ও আবু হুরায়রা (রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু) থেকে বর্ণিত,
আল্লাহ্‌র রাসূল صلى الله عليه وسلم এক ব্যক্তিকে খায়বারে তহসীলদার নিযুক্ত করেন
সে জানীব নামক (উত্তম) খেজুর নিয়ে উপস্থিত হলে আল্লাহ্‌র রাসূল صلى الله عليه وسلم জিজ্ঞেস করলেন, "খায়বারের সব খেজুর কি এ রকমের?" সে বললো, "না, আল্লাহ্‌র কসম, হে আল্লাহ্‌র রসূল! এরূপ নয়, বরং আমরা দু' সা' এর পরিবর্তে এ ধরনের এক সা' খেজুর নিয়ে থাকি এবং তিন সা' এর পরিবর্তে এক দু' সা'
" তখন আল্লাহ্‌র রাসূল صلى الله عليه وسلم বললেন, "এরূপ করবে না
বরং মিশ্রিত খেজুর দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দিরহাম দিয়ে জানীব খেজুর ক্রয় করবে
" (সহীহ বুখারি, ক্রয়-বিক্রয়, ২২০২)
অর্থাৎ, ওই বস্তুটাকে (হোক সেটা খেজুর বা সোনা বা রুপা ইত্যাদি) একটা পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে অন্য বিনিময়ের মাধ্যমের সাথে বাজারে লেনদেন করতে হবে
তারপর যা পাওয়া যাবে, সেটা দিয়ে যতটুকু ভিন্ন কোয়ালিটির বস্তু পাওয়া যায় সেটা কিনতে হবে
সরাসরি খারাপ কোয়ালিটির বস্তুর সাথে ভালো কোয়ালিটির পরিমাণে কমবেশি করে লেনদেন করা যাবে না
আশা করি সুদ এবং মুনাফার মাঝে মূল পার্থক্যটা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে
এখন আমরা সেগুলো একটা ছক আকারে উপস্থাপন করব
সুদ মুনাফা
কোনো উপযোগের সৃষ্টি হয় না, এক পক্ষ থেকে আরেক পক্ষের মাঝে অন্যায়ভাবে হস্তান্তর হয়
উপযোগ সৃষ্টি হয়, দুই পক্ষই লাভবান হয়
উৎস হচ্ছে বিনিময়ের মাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ, কোনো যোগ্যতা থাকা লাগে না
উৎস হচ্ছে দক্ষতা ও যোগ্যতা
বিনিময়ের মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, কুক্ষিগত বা জিম্মি করেই আদায় করা হয়
বিনিময়ের মাধ্যমের দুষ্প্রাপ্যতার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই
প্রকৃত সম্পদের লেনদেন ছাড়াই শুধু বিনিময়ের মাধ্যম লেনদেন করে আদায় করা সম্ভব
প্রকৃত সম্পদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে উপযোগের সৃষ্টি ছাড়া মুনাফা অর্জন সম্ভব নয়
উপযোগের সৃষ্টিটাই মূল পয়েন্ট; কারণ, উপযোগের সৃষ্টি ছাড়া শুধু প্রকৃত সম্পদের সম্পৃক্ততা মুনাফা অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়
এক পক্ষ লাভবান হয় আরেক পক্ষের দুরবস্থার সুযোগ নেয়ার মাধ্যমে
দুই পক্ষই লাভবান হয় ( )
অনেক সময় কোনোকিছু নগদে বিক্রি করলে আর কিস্তিতে বিক্রি করলে দামের একটা হেরফের হয়, কিস্তিতে বিক্রি করলে দাম বেশি পড়ে
এটাকে অনেকে সুদের সাথে গুলিয়ে ফেলেন
কিন্তু আসলে এটা সুদ নয়
কারণ, কিস্তিতে পাওয়ার কারণে ক্রেতা পণ্যটা পূর্ণ মূল্য শোধ করার আগে থেকেই ব্যবহার করতে পারেন, এই সুবিধার বিনিময়ে কিছু অতিরিক্ত মূল্য চার্জ করাতে কোনো সমস্যা নেই
মূল কথা হচ্ছে, বিনিময়ের মাধ্যম থেকে সুবিধা নেওয়া যাবে না, পণ্য ব্যবহার করে নিলে সমস্যা নেই
যারা বিনিময়ের মাধ্যমকে আর ১০টা পণ্যের মতোই ভাবেন, তাঁরা সুদ আর মুনাফার মাঝে পার্থক্যটা গুলিয়ে ফেলেন, যেটার কথা আল্লাহ্‌ কুরআনে বলেছেন,
তারা বলেছে,"বিক্রয়ও তো সুদ নেওয়ার মতোই
" অথচ আল্লাহ তা'আলা ক্রয়-বিক্রয়কে বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন
[সূরাহ আল-বাকারাহ (২):২৭৫]
আমরা যদি বর্তমান অর্থব্যবস্থার আদ্যোপান্ত জানতে পারি, তাহলে আরও কিছু পার্থক্য আমরা বুঝতে পারব
কিন্তু আজকের আলোচনা এতটুকুই
আল্লাহ্‌ আমাদের সুদ এবং মুনাফার মাঝে পার্থক্য বোঝার এবং সেই জ্ঞানের ওপর আমল করার তাওফীক্ব দান করুন
[1] ://.//49045
মুসলিম মিডিয়া ব্লগের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা সহ তা সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আপনার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন
ব্লগ পরিচালনায় প্রতি মাসের খরচ বহনে আপনার সাহায্য আমাদের একান্ত কাম্য
বিস্তারিত জানতে এখানে ভিজিট করুন
নিচে মন্তব্যের ঘরে আপনাদের মতামত জানান
ভালো লাগবে আপনাদের অভিপ্রায়গুলো জানতে পারলে
আর লেখা সম্পর্কিত কোন জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে অবশ্যই "ওয়ার্ডপ্রেস থেকে কমেন্ট করুন"
অর্থনীতিউপযোগঋণক্রয়চাহিদাটাকাপণ্যবিক্রয়মুনাফালাভলেনদেনসরবরাহসুদহামিদা মুবাশ্বেরা
হামিদা মুবাশ্বেরা
হামিদা মুবাশ্বেরা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পিএইচডি করছেন
এর আগে মালয়শিয়ার আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় () থেকে ইসলামিক ফিনান্সে মাস্টার্স করেছেন আর ব্যাচেলর করেছেন ব্যবসা প্রশাসনে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ থেকে
সেই সাথে ইসলামিক অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামী স্টাডিজে ২য় ব্যাচেলরও সম্পন্ন করেছেন
ফিয়াট () মানির ইতিকথা
ইকোনমিক রি-কোলোনিয়ালাইজেশন !!
মোহাম্মাদ শিবলু