id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
2093
মহাদেব সাহা
এই বয়সে বিশ্ববাউল
চিন্তামূলক
শেষ বয়সে বিশ্ববাউল ভিতর-বাহির আউল-ঝাউল, বেঁধেছি ঘর পথের ওপর; সেই পথও কি মিথ্যা বা ভুল! কোথায় দুরে নীল সরোবর পদ্ম ফোটে অষ্টপ্রহর; পাখিরা গায় ফুল ঝরে যায়, মন্দাকিনী মগ্ন নিথর। নিজের ঘরে নিজেই বাউল এই বয়সে আউল-ঝাউল, যা ছিলো তা ছিন্ন কাঁথা, সব হারিয়ে নিঃস্ব বাউল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1339
1314
তসলিমা নাসরিন
কাঁপন ১৪
প্রেমমূলক
বয়স যত বাড়ে তত বয়স খসে পড়ে শরীর আগে স্পর্শ করো, প্রেমের কথা পরে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1984
2016
ভাস্কর চক্রবর্তী
আঁধার বিষয়ে
প্রেমমূলক
যে বিকেলে জ্বর আসে সেই বিকেলের মতো তুমি এসে দাঁড়িয়ে রয়েছো। ঘড়ির ভেতর দিয়ে রক্তের রেখার মতো সময় চলেছে। -আমি কি অসুখ থেকে কোনোদিন উঠে দাঁড়াব না?আজো রাত জাগাজাগি হয়। শরীর মিলিয়ে যায় নরম শরীরে।-আমি শুধু আমার প্ থিবী দেখে যাই…। চারপাশে কেমন হাজারো আলো জ্বলে আছে,তবু এমন আঁধার আমি জীবনে দেখিনি।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4219.html
3342
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পঁচিশে বৈশাখ চলেছে
চিন্তামূলক
শ্রীমান অমিয়চন্দ্র চক্রবতী কল্যাণীয়েষুপঁচিশে বৈশাখ চলেছে জন্মদিনের ধারাকে বহন করে মৃত্যুদিনের দিকে। সেই চলতি আসনের উপর বসে কোন্‌ কারিগর গাঁথছে ছোটো ছোটো জন্মমৃত্যুর সীমানায় নানা রবীন্দ্রনাথের একখানা মালা। রথে চড়ে চলেছে কাল; পদাতিক পথিক চলতে চলতে পাত্র তুলে ধরে, পায় কিছু পানীয়;-- পান সারা হলে পিছিয়ে পড়ে অন্ধকারে; চাকার তলায় ভাঙা পাত্র ধুলায় যায় গুঁড়িয়ে। তার পিছনে পিছনে নতুন পাত্র নিয়ে যে আসে ছুটে, পায় নতুন রস, একই তার নাম, কিন্তু সে বুঝি আর-একজন। একদিন ছিলেম বালক। কয়েকটি জন্মদিনের ছাঁদের মধ্যে সেই যে-লোকটার মূর্তি হয়েছিল গড়া তোমরা তাকে কেউ জান না। সে সত্য ছিল যাদের জানার মধ্যে কেউ নেই তারা। সেই বালক না আছে আপন স্বরূপে না আছে কারো স্মৃতিতে। সে গেছে চলে তার ছোটো সংসারটাকে নিয়ে; তার সেদিনকার কান্না-হাসির প্রতিধ্বনি আসে না কোনো হাওয়ায়। তার ভাঙা খেলনার টুকরোগুলোও দেখিনে ধুলোর 'পরে। সেদিন জীবনের ছোটো গবাক্ষের কাছে সে বসে থাকত বাইরের দিকে চেয়ে। তার বিশ্ব ছিল সেইটুকু ফাঁকের বেষ্টনীর মধ্যে। তার অবোধ চোখ-মেলে চাওয়া ঠেকে যেত বাগানের পাঁচিলটাতে সারি সারি নারকেল গাছে। সন্ধ্যেবেলাটা রূপকথার রসে নিবিড়; বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝখানে বেড়া ছিল না উঁচু, মনটা এদিক থেকে ওদিকে ডিঙিয়ে যেত অনায়াসেই। প্রদোষের আলো-আঁধারে বস্তুর সঙ্গে ছায়াগুলো ছিল জড়িয়ে, দুইই ছিল একগোত্রের। সে-কয়দিনের জন্মদিন একটা দ্বীপ, কিছুকাল ছিল আলোতে, কাল-সমুদ্রের তলায় গেছে ডুবে। ভাঁটার সময় কখনো কখনো দেখা যায় তার পাহাড়ের চূড়া, দেখা যায় প্রবালের রক্তিম তটরেখা। পঁচিশে বৈশাখ তার পরে দেখা দিল আর-এক কালান্তরে, ফাল্গুনের প্রত্যুষে রঙিন আভার অস্পষ্টতায়। তরুণ যৌবনের বাউল সুর বেঁধে নিল আপন একতারাতে, ডেকে বেড়াল নিরুদ্দেশ মনের মানুষকে অনির্দেশ্য বেদনার খ্যাপা সুরে। সেই শুনে কোনো-কোনোদিন বা বৈকুণ্ঠে লক্ষ্মীর আসন টলেছিল, তিনি পাঠিয়ে দিয়েছেন তাঁর কোনো কোনো দূতীকে পলাশবনের রঙমাতাল ছায়াপথে কাজ-ভোলানো সকাল-বিকালে। তখন কানে কানে মৃদু গলায় তাদের কথা শুনেছি, কিছু বুঝেছি, কিছু বুঝিনি। দেখেছি কালো চোখের পক্ষ্ণরেখায় জলের আভাস; দেখেছি কম্পিত অধরে নিমীলিত বাণীর বেদনা; শুনেছি ক্বণিত কঙ্কণে চঞ্চল আগ্রহের চকিত ঝংকার। তারা রেখে গেছে আমার অজানিতে পঁচিশে বৈশাখের প্রথম ঘুমভাঙা প্রভাতে নতুন ফোটা বেলফুলের মালা; ভোরের স্বপ্ন তারি গন্ধে ছিল বিহ্বল। সেদিনকার জন্মদিনের কিশোর জগৎ ছিল রূপকথার পাড়ার গায়ে-গায়েই, জানা না-জানার সংশয়ে। সেখানে রাজকন্যা আপন এলোচুলের আবরণে কখনো বা ছিল ঘুমিয়ে, কখনো বা জেগেছিল চমকে উঠে' সোনার কাঠির পরশ লেগে। দিন গেল। সেই বসন্তীরঙের পঁচিশে বৈশাখের রঙ-করা প্রাচীরগুলো পড়ল ভেঙে। যে পথে বকুলবনের পাতার দোলনে ছায়ায় লাগত কাঁপন, হাওয়ায় জাগত মর্মর, বিরহী কোকিলের কুহুরবের মিনতিতে আতুর হত মধ্যাহ্ন, মৌমাছির ডানায় লাগত গুঞ্জন ফুলগন্ধের অদৃশ্য ইশারা বেয়ে, সেই তৃণ-বিছানো বীথিকা পৌঁছল এসে পাথরে-বাঁধানো রাজপথে। সেদিনকার কিশোরক সুর সেধেছিল যে-একতারায় একে একে তাতে চড়িয়ে দিল তারের পর নতুন তার। সেদিন পঁচিশে বৈশাখ আমাকে আনল ডেকে বন্ধুর পথ দিয়ে তরঙ্গমন্দ্রিত জনসমুদ্রতীরে। বেলা-অবেলায় ধ্বনিতে ধ্বনিতে গেঁথে জাল ফেলেছি মাঝদরিয়ায়; কোনো মন দিয়েছে ধরা, ছিন্ন জালের ভিতর থেকে কেউ বা গেছে পালিয়ে। কখনো দিন এসেছে ম্লান হয়ে, সাধনায় এসেছে নৈরাশ্য, গ্লানিভারে নত হয়েছে মন। এমন সময়ে অবসাদের অপরাহ্নে অপ্রত্যাশিত পথে এসেছে অমরাবতীর মর্ত্যপ্রতিমা; সেবাকে তারা সুন্দর করে, তপঃক্লান্তের জন্যে তারা আনে সুধার পাত্র; ভয়কে তারা অপমানিত করে উল্লোল হাস্যের কলোচ্ছ্বাসে; তারা জাগিয়ে তোলে দুঃসাহসের শিখা ভস্মে-ঢাকা অঙ্গারের থেকে; তারা আকাশবাণীকে ডেকে আনে প্রকাশের তপস্যায়। তারা আমার নিবে-আসা দীপে জ্বালিয়ে গেছে শিখা, শিথিল-হওয়া তারে বেঁধে দিয়েছে সুর, পঁচিশে বৈশাখকে বরণমাল্য পরিয়েছে আপন হাতে গেঁথে। তাদের পরশমণির ছোঁওয়া আজো আছে আমার গানে আমার বাণীতে। সেদিন জীবনের রণক্ষেত্রে দিকে দিকে জেগে উঠল সংগ্রামের সংঘাত গুরু গুরু মেঘমন্দ্রে। একতারা ফেলে দিয়ে কখনো বা নিতে হল ভেরী। খর মধ্যাহ্নের তাপে ছুটতে হল জয়পরাজয়ের আবর্তনের মধ্যে। পায়ে বিঁধেছে কাঁটা, ক্ষত বক্ষে পড়েছে রক্তধারা। নির্মম কঠোরতা মেরেছে ঢেউ আমার নৌকার ডাইনে বাঁয়ে, জীবনের পণ্য চেয়েছে ডুবিয়ে দিতে নিন্দার তলায়, পঙ্কের মধ্যে। বিদ্বেষে অনুরাগে ঈর্ষায় মৈত্রীতে, সংগীতে পরুষ কোলাহলে আলোড়িত তপ্ত বাষ্পনিঃশ্বাসের মধ্য দিয়ে আমার জগৎ গিয়েছে তার কক্ষপথে। এই দুর্গমে, এই বিরোধ-সংক্ষোভের মধ্যে পঁচিশে বৈশাখের প্রৌঢ় প্রহরে তোমরা এসেছ আমার কাছে। জেনেছ কি, আমার প্রকাশে অনেক আছে অসমাপ্ত অনেক ছিন্ন বিচ্ছিন্ন অনেক উপেক্ষিত? অন্তরে বাহিরে সেই ভালো মন্দ, স্পষ্ট অস্পষ্ট, খ্যাত অখ্যাত, ব্যর্থ চরিতার্থের জটিল সম্মিশ্রণের মধ্য থেকে যে আমার মূর্তি তোমাদের শ্রদ্ধায়, তোমাদের ভালোবাসায়, তোমাদের ক্ষমায় আজ প্রতিফলিত, আজ যার সামনে এনেছ তোমাদের মালা, তাকেই আমার পঁচিশে বৈশাখের শেষবেলাকার পরিচয় বলে নিলেম স্বীকার করে, আর রেখে গেলেম তোমাদের জন্যে আমার আশীর্বাদ। যাবার সময় এই মানসী মূর্তি রইল তোমাদের চিত্তে, কালের হাতে রইল বলে করব না অহংকার। তার পরে দাও আমাকে ছুটি জীবনের কালো-সাদা সূত্রে গাঁথা সকল পরিচয়ের অন্তরালে; নির্জন নামহীন নিভৃতে; নানা সুরের নানা তারের যন্ত্রে সুর মিলিয়ে নিতে দাও এক চরম সংগীতের গভীরতায়।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prochesa-buesak-chhase/
2789
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উপহার
ছড়া
স্নেহ-উপহার এনে দিতে চাই, কী যে দেব তাই ভাবনা— যত দিতে সাধ করি মনে মনে খুঁজে - পেতে সে তো পাব না। আমার যা ছিল ফাঁকি দিয়ে নিতে সবাই করেছে একতা, বাকি যে এখন আছে কত ধন না তোলাই ভালো সে কথা। সোনা রুপো আর হীরে জহরত পোঁতা ছিল সব মাটিতে, জহরি যে যত সন্ধান পেয়ে নে গেছে যে যার বাটীতে। টাকাকড়ি মেলা আছে টাকশালে, নিতে গেলে পড়ি বিপদে। বসনভূষণ আছে সিন্দুকে, পাহারাও আছে ফি পদে। এ যে সংসারে আছি মোরা সবে এ বড়ো বিষম দেশ রে। ফাঁকিফুঁকি দিয়ে দূরে চ ' লে গিয়ে ভুলে গিয়ে সব শেষ রে। ভয়ে ভয়ে তাই স্মরণচিহ্ন যে যাহারে পারে দেয় যে। তাও কত থাকে, কত ভেঙে যায়, কত মিছে হয় ব্যয় যে। স্নেহ যদি কাছে রেখে যাওয়া যেত, চোখে যদি দেখা যেত রে, কতগুলো তবে জিনিস-পত্র বল্‌ দেখি দিত কে তোরে। তাই ভাবি মনে কী ধন আমার দিয়ে যাব তোরে নুকিয়ে, খুশি হবি তুই, খুশি হব আমি, বাস্‌, সব যাবে চুকিয়ে। কিছু দিয়ে-থুয়ে চিরদিন-তরে কিনে রেখে দেব মন তোর— এমন আমার মন্ত্রণা নেই, জানি নে ও হেন মন্তর। নবীন জীবন, বহুদূর পথ পড়ে আছে তোর সুমুখে; স্নেহরস মোরা যেটুকু যা দিই পিয়ে নিস এক চুমুকে। সাথিদলে জুটে চলে যাস ছুটে নব আশে নব পিয়াসে, যদি ভুলে যাস, সময় না পাস, কী যায় তাহাতে কী আসে। মনে রাখিবার চির-অবকাশ থাকে আমাদেরই বয়সে, বাহিরেতে যার না পাই নাগাল অন্তরে জেগে রয় সে। পাষাণের বাধা ঠেলেঠুলে নদী আপনার মনে সিধে সে কলগান গেয়ে দুই তীর বেয়ে যায় চলে দেশ-বিদেশে— যার কোল হতে ঝরনার স্রোতে এসেছে আদরে গলিয়া তারে ছেড়ে দূরে যায় দিনে দিনে অজানা সাগরে চলিয়া। অচল শিখর ছোটো নদীটিরে চিরদিন রাখে স্মরণে— যতদূর যায় স্নেহধারা তার সাথে যায় দ্রুতচরণে। তেমনি তুমিও থাক না'ই থাক, মনে কর মনে কর না, পিছে পিছে তব চলিবে ঝরিয়া আমার আশিস-ঝরনা।। (শিশু কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/upohar/
4220
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
দিনরাত
চিন্তামূলক
দিনরাত মৃত্যু চলে সন্তান অবধি। দেখা তো হয়েছে ক্রূর যমের সহিত, তাকে বলা গেছে, আমি একাকীই যাবো। গঙ্গার তরঙ্গভঙ্গে নিভে যাবে আলো, আমি যাবো, সঙ্গে নিয়ে যাবো না কারুকে একা যাবো দিনরাত মৃত্যু চলে সন্তান অবধি!
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/dinraat/
1382
তারাপদ রায়
ঈশ্বর ও আমার কবিতা
চিন্তামূলক
জয়দেবের কথা মনে রেখে তোমারই জন্য দারোয়ান রাখবো বাড়িতে। তুমি যাই করো, ঈশ্বর, আমার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে, আমার ছদ্মবেশে আমার কবিতা সম্পূর্ণ করতে এসো না।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3898.html
3321
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিরুদ্যম অবকাশ শূন্য শুধু
চিন্তামূলক
নিরুদ্যম অবকাশ শূন্য শুধু, শান্তি তাহা নয়— যে কর্মে রয়েছে সত্য তাহাতে শান্তির পরিচয়।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/niruddom-obokash-shunyo-sudhu/
414
কাজী নজরুল ইসলাম
বাগিচায় বুলবুলি তুই
প্রকৃতিমূলক
বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজই দোল। আজো তা’র ফুল কলিদের ঘুম টুটেনি, তন্দ্রাতে বিলোল।        আজো হায় রিক্ত শাখায় উত্তরী বায় ঝুরছে নিশিদিন, আসেনি, যখন’ হাওয়া গজল গাওয়া, মৌমাছি বিভোল।।        কবে সে ফুল কুমারী ঘোমটা চিরি’ আসবে বাহিরে, গিশিরের স্পর্শমুখে ভাঙ্গবে, রে ঘুম রাঙবে, রে কপোল।।        ফাগুনের মুকুল জাগা দুকুল ভাঙ্গা আসবে ফুলের বান, কুঁড়িদের ওষ্ঠপুটে লুটবে হাসি, ফুটবে গালে টোল।।        কবি তুই গন্ধে ভু’লে ডুবলি জলে কূল পেলিনে আর, ফুলে তোর বুক ভরেছিল, আজকে জলে ভরবে আঁখির কোল |
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/bagichabulbuly/
942
জীবনানন্দ দাশ
আশা ভরসা
চিন্তামূলক
ইতিহাসপথ বেয়ে অবশেষে এই শতাব্দীতে মানুষের কাজ আশায় আলোয় শুরু হয়েছিল বুঝি- শুভ্র কথা বলা হতেছিল;- রৌদ্রে জলে ভালোলেগেছিল শরীরকে- জীবনকে।কিন্তু তবু সবি প্রিয় মানুষের হাতে অপ্রিয় প্রহার হয়ে মূল্যহীন মানুষের গায়ে আশ্চর্য মৃত্যুর মত মূল্য হয়- হিম হয়।মানুষের সভ্যতার বয়ঃসন্ধি দোষ হয়তো কাটেনি আজো, তাই এরকমই হতে হবে আরো রাত্রি দিন;- নক্ষত্র সূর্যের সাথে সঞ্চালিত হয়ে তবু আলোকের পথে মৃত ম্যামথের কাছে কুহেলিত ঋণ শেষ ক'রে মানুষ সফল হতে পারে উৎসাহ সংকল্প প্রেমে মূল্যের অক্ষুন্ন সংস্কারে; আশা করা যাক।সুধীরাও সেই কথা ভাবে, আপ্রাণ নির্দেশ দান করে। ইতিহাসে ঘুরপথ ভুল পথ গ্লানি হিংসা অন্ধকার ভয় আরো ঢের আছে, তবু মানুষকে সেতু থেকে সেতুলোক পার হতে হয়।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/asha-vorosha/
802
জসীম উদ্‌দীন
গৌরী গিরির মেয়ে
ভক্তিমূলক
হিমালয় হতে আসিলে নামিয়া তুষার বসন ত্যাজি, হিমের স্বপন অঙ্গে মাখিয়া সাঁঝের বসনে সাজি। হে গিরি দুহিতা তোমার নয়নে অলকার মেঘগুলি, প্রতি সন্ধ্যায় পরাইয়া যেত মায়া-কাজলের তুলি। তুহিন তুষারে অঙ্গ মাজিতে দুগ্ধধবল কায়, রবির কিরণ পিছলি পিছলি লুটাত হিমানী বায়! রাঙা মাটি পথে চলিতে চলিতে পথ যেন মমতায়, আলতা রেকায় রঙিন হইয়া জড়াইত দুটি পায়। অলকে তোমার পাহাড়ী পবন ফুলের দেউল লুটি, গন্ধের বাসা রচনা করিত সারা রাত ছুটি ছুটি। গহিন গুহার কুহরে কুহরে কলকল্লোলে ঘুরি, ঝরণা তোমার চরণ বিছাত মণি-মানিকের নুড়ি! পাষাণের ভাষা শুনিতে যে তুমি ঝরণায় পাতি কান, শুনিতে শুনিতে কোন অজানায় ভেসে যেত তব প্রাণ! ঝরণার স্রোতে ভাসিয়া আসিত অলস সোনার ঘুম, তোমার মায়াবী নয়নে বিছাত দূর স্বপনের চুম। শিথিল দেহটি এলাইয়া দিয়া ঘন তুষারের গায়, ঘুমায়ে ঘুমায়ে ঘুমেরে যে ঘুম পাড়াইতে নিরালায়। তোমার দেহের বিম্ব আঁকিয়া আপন বুকের পরে, পরতের পর পরত বিছাত তুষার রজনী ভরে। তোমার ছাষায় যত সে লুকাত, চাঁদের কুমার তত তুষার পরত ভেদিয়া সেথায় একেলা উদয় হ। দূর গগনের সাত-ভাই তারা শিয়রে বিছায়ে ছায়া, পারুল বোনের নিশীথ শয়নে জ্বালতে আলোর মায়া। দিন রজনীর মোহনার সোঁতে শুক-তারকার তরী, চলিতে চলিতে পথ ভুলে যেন ঘাটের বাঁধন স্মরি। পূর্ব তোরণে দাঁড়ায়ে প্রভাত ছুঁড়িত আবীর ধূলি, তোমার নয়ন হইতে ফেলিত ঘুমের কাজল তুলি। কিশোর কুমার, প্রথম হেরিয়া তোমার কিশোরী কায়া, মেঘে আর মেঘে বরণে বরণে মাখাত রঙের মায়া। কি কুহকে ভুলে ওগো গিরিসুতা! এসেছ মরতে নামি, কে তোমার লাগি পূজার দেউল সাজায়েছে দিবা-যামি। হেথয় প্রখর মরীচি-মালীর জ্বলে হুতাশন জ্বালা, দহনে তোমার শুকাবে নিমেষে বুকে মন্দার মালা। মরতের জীব বৈকুন্ঠের নাহি জানে সন্ধান, ফুলের নেশায় ফুলেরে ছিঁড়িয়া ভেঙে করে শতখান। রূপের পূজারী রূপেরে লইয়া জ্বালায় ভোগের চিতা, প্রেমেরে করিয়া সেবাদাসী এরা রচে যে প্রেমের গীতা। হাত বাড়ালেই হেথা পাওয়া যায়, তৃষ্ণারে বড় করি, তপ-কৃষ তনু গৈরিকবাসে জাগেনাক বিভাবরী। হেথা সমতল, জোয়ারের পানি একধার হতে ভাসি, আরধারে এসে গড়াইয়া পড়ে ছল-কল-ধারে হাসি। হেথায় কাম সহজ লভ্য, পরিয়া যোগীর বাস, গহন গুহায় যোগাসনে কেউ করে না কাহারো আশ। হেথাকার লোক খোলা চিঠি পড়ে, বন-রহস্য আঁকি, বন্ধুর পথে চলে না তটিনী কারো নাম ডাকি ডাকি। তুমি ফিরে যাও হে গিরি-দুহিতা, তোমার পাষাণ পুরে, তোমারে খুঁজিয়া কাঁদিছে ঝরণা কুহরে কুহরে ঘুরে। তব মহাদেব যুগ যুগ ধরি ভস্ম লেপিয়া গায়, গহন গুহায় তোমার লাগিয়া রয়েছে তপস্যায়। অলকার মেয়ে! ফিরে যাও তুমি, তোমার ভবন-দ্বারে, চিত্রকূটের লেখন বহিয়া ফেরে মেঘ জলধারে। তোমার লাগিয়া বিরহী যক্ষ গিরি-দরী পথ-কোণে, পাষাণর গায়ে আপন ব্যথারে মদ্দিছে আনমনে; শোকে কৃশতনু, বিহবল মন, মৃণাল বাহুরে ছাড়ি, বার বার করে ভ্রষ্ট হইছে স্বর্ণ-বলয় তারি। বাণীর কুঞ্জে ময়ূর ময়ূরী ভিড়ায়েছে পাখা তরী, দর্ভ-কুমারী, নিবারের বনে তৃণ আছে বিস্মরি। তুমি ফিরে যাও তব আলকায়, গৌরী গিরির শিরে, চরণে চরণে তুষার ভাঙিও মন্দাকিনীর তীরে। কন্ঠে পরিও কিংশুকমালা, পাটল-পুষ্প কানে, নীপ-কেশরের রচিও কবরী নব আষাঢ়ের গানে। তীর্থ পথিক বহু পথ বাহি শ্রান্ত ক্লান্ত কায়, কোন এক প্রাতে যেয়ে পৌছিব শিঞ্চল গিরি ছায়। দিগ জোড়া ঘন কুয়াশার লোল অঞ্চলখানি, বায়ুরথে বসি কিরণ কুমার ফিরিবে সুদূরে টানি। আমরা হাজার নব নারী হেথা রহিব প্রতীক্ষায়, কোন শুভখনে গিরি-কন্যার ছায়া যদি দেখা যায়। দিবসের পর দিবস কাটিবে, মহাশূন্যের পথে, বরণের পর বরণ ঢালিবে উতল মেঘের রথে। কুহকী প্রকৃতি মেঘের গুচ্ছে বাঁধিয়া বাদল ঝড়, ঘন ঘোর রাতে মহাউল্লাসে নাচিবে মাথার পর। ভয়-বিহবল দিবস লুকাবে কপিল মেঘের বনে, খর বিদ্যুৎ অট্ট হাসিবে গগনের প্রাঙ্গণে। তীর্থ-পথিক তুব ফিরিবে না, কোন শুভদিন ধরি, বহুদূর পথে দাঁড়াবে আসিয়া গৌরী গিরির পরী। সোনার অঙ্গে জড়ায়ে জড়ায়ে বিজলীর লতাগুলি, ফুল ফোটাইবে, হাসি ছড়াইবে অধর দোলায় দুলি। কেউ বা দেখিবে, কেউ দেখিবে না, অনন্ত মেঘ পরে, আলোক প্রদীপ ভাসিয়া যাইবে শুধু ক্ষণিকের তরে। তারপর সেথা ঘন কুয়াশার অনন্ত আঁধিয়ার, আকাশ-ধরনী, বন-প্রান্তর করে দেবে একাকার। আমরা মানুষ-ধরার মানুষ এই আমাদের মন, যদি কোনদিন পরিতে না চাহে কুটীরের বন্ধন; যদি কোনদিন সুদূর হইতে আলেয়ার আলো-পরী, বেঘুম শয়ন করে চঞ্চল ডাকি মোর নাম ধরি। হয়ত সেদিন বাহির হইব, গৃহের তুলসী তলে, যে প্রদীপ জ্বলে তাহারে সেদিন নিবায়ে যাইব চলে। অঙ্গে পরিব গৈরিক বাস, গলায় অক্ষহার, নয়নে পরিব উদাস চাহনী মায়া মেঘ বলাকার। কাশীশ্বরের চরণ ছুঁইয়া পূতপবিত্র কায়, জীবনের যত পাপ মুছে যাব প্রয়াগের পথ গায়। হরিদ্বারের রঙিন ধূলায় ঘুমায়ে শ্রান্ত কায়, ত্রিগঙ্গা জলে সিনান করিয়া জুড়াইব আপনায়। কমন্ডলুতে ভরিয়া লইব তীর্থ নদীর বারি, লছমন ঝোলা পার হয়ে যাব পূজা-গান উচ্চারি। তাপসীজনের অঙ্গের বায়ে পবিত্র পথ ছায়ে, বিশ্রাম লভি সমুকের পানে ছুটে যাব পায়ে পায়ে। বিশ্রাম লভি সমুখের পানে ছুটে যাব পায়ে পায়ে। দেউলে দেউলে রাখিব প্রণাম, তীর্থ নদীর জলে পূজার প্রসূন ভাসাইয়া দিব মোর দেবতারে বলে। মাস-বৎসর কাটিয়া যাইবে, কেদার বদরী ছাড়ি, ঘন বন্ধুর পথে চলিয়াছে সন্যাসী সারি সারি, কঠোর তাপেতে ক্ষীন্ন শরীর শ্রান্তক্লান্ত কায়, সমুখের পানে ছুটে চলে কোন দুরন্ত তৃষ্ণায়। সহসা একদা মানস সরের বেড়িয়া কণক তীর, হোমের আগুন জ্বলিয়া উঠিবে হাজার সন্ন্যাসীর। শিখায় শিখায় লিখন লিখিয়া পাঠাবে শূন্যপানে, মন্ত্রে মন্ত্রে ছড়াবে কামনা মহা-ওঙ্কার গানে। তারি ঝঙ্কারে স্বর্গ হইতে বাহিয়া কণক রথ, হৈমবতীগো, নামিয়া আসিও ধরি মর্ত্ত্যের পথ। নীল কুবলয় হসে- ধরিও দাঁড়ায়ে সরসী নীরে, মরাল মরালী পাখার আড়াল রচিবে তোমার শিরে। প্রথম উদীতা-ঊষসী-জবার কুসুম মূরতি ধরি, গলিত হিরণ কিরণে নাহিও, হে গিরি দুহিতা পরি। অধর ডলিয়া রক্ত মৃণালে মুছিও বলাকা পাখে, অঙ্গ ঘেরিয়া লাবণ্য যেন লীলাতরঙ্গ আঁকে। চারিধার হতে ভকত কন্ঠে উঠিবে পূজার গান, তার সিঁড়ি বেয়ে স্বরগের পথে করো তুমি অভিযান। তীর্থ-পথিক, ফিরিয়া আসিব আবার মাটির ঘরে, গিরি গৌরীর বাহিনী আনিব কমন্ডলুতে ভরে। দেউলে দেউলে গড়িব প্রতিমা, পূজার প্রসূন করে, জনমে জনমে দেখা যেন পাই প্রণমিব ইহা স্মরে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/742
5081
শামসুর রাহমান
মধ্যমার প্রতি
মানবতাবাদী
ক’দিন থেকে আমার ডান হাতের মধ্যমা এক অর্থহীন হরতাল শুরু করেছে। কোনও কাজই করবে না আর। আজ সকালে হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সে টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে উদ্ধত ভঙ্গিতে। কোনও নেপথ্যাচারী স্বৈরাচারীর লেলিয়ে দেওয়া দালালের মতো আমার বিরুদ্ধে লাগাতার শ্লোগান দিতে শুরু করেছে। প্রেমের কবিতা লেখার সময় সে আমার কলম স্পর্শ করবে না-এই ওর ঘরফাটানো দাবি। বুঝতে পারি না, কেন এই না-হক দাবি মধ্যমার? আমার দিকে সরোষে এক স্মারকলিপি ছুঁড়ে দিয়েছে সে। স্মারলিপি পড়ে হতবাক আমি ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকি সেই লুম্পেনের দিকে। বিশেষত প্রেমের কবিতা লেখার সময় সহযোগিতার দরজায় সে ডবল তালা ঝুলিয়ে দেবে। টেবিলে দাঁড়ানো মধ্যমাকে বললাম, “দ্যাখো হে, বড্ড বাড়াবাড়ি শুরু করেছ। কী না করেছি আমি তোমার জন্যে? তোমার কষ্ট হবে ভেবে কখনও কখনও লেখা মাঝ-পথে থামিয়ে দিয়েছি। তোমাকে গোলাপের মখমল-পাপড়ি ছোঁবার, শিশুকে আদর করবার, আমার দয়িতার গাল, গলা, স্তন, কোমর স্পর্শ করবার অধিকার দিয়েছি অকুণ্ঠচিত্তে। ‘গীতবিতানে’র পাতা সমুদয়, গ্রিক ট্রাজেডি, প্লেটোর ‘রিপালিক’, রিল্কের ‘ডুইনো এলিজি’, জীবনানন্দের ‘সাতটি তারার তিমির’-এর পাতা ওল্টানোর অসামান্য সুযোগ কি দিইনি তোমাকে?”হে প্রিয় মধ্যমা আমার, কে তোমাকে আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে আজ? আমার কোনও কোনও প্রবীণ বন্ধু প্রেমের কবিতার সঙ্গে আমার এত লদকালদকি পছন্দ করেন না। ‘লদকালদকি’ শব্দটি অবিশ্যি তাদেরই মুখনিঃসৃত। ভাবলে কী করে তুমি অসহযোগ আন্দোলন শুরু করলেই আমি প্রেমের কবিতার দেশ থেকে নির্বাসিত হব হে মধ্যমা? তোমার অজানা নয় যে স্বদেশ, জ্ঞানান্বেষণ, কবিতা এবং ভালোবাসার প্রতি চিরনিবেদিত। যার ঠোঁটে হাসির ঝিলিক দেখতে না পেলে, যার সঙ্গে একদিন দেখা না হলেই হৃদয় হয় আহত পাখি, যার সঙ্গে কথা বলতে না পারলে কবিতার ভাষা ভুলে যাই, তাকে নিয়ে কবিতা লিখব না কারও ফরমানের ধমকে এমন উদ্ভট চিন্তা তোমার মাথায় ঢোকাল কে?দেখ, তোমার স্মারকলিপি কুটি কুটি ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছি বাজে কাগজের ঝুড়িতে। তুমি কোন্‌ ছার, তোমরা দশজন সঙ্গী ঐক্যজোট বেঁধে ধর্মঘট করলেও মাথা নত করব না, মানব না হার। যত কষ্টই হোক দাঁত দিয়ে কলম চেপে ধরে কবিতা লিখব, প্রেমের কবিতাই লিখব। দেখে নিও, প্রেমের দেবতা হবেন আমার পরম সহায়। আমার খাতার পাতা-জোড়া এক নন্দিনীর হরফে-গড়া প্রতিমার মুখের হাসির ঝর্ণাধারা দেখে তোমাদের ধর্মঘটী মুখ চুন হয়ে যাবে। তোমাদের ঘিরে ছেয়ে আসবে ঘোর অমাবস্যা।   (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/moddhyomar-proti/
5808
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
নীরার
প্রেমমূলক
নীরা এবং নীরার পাশে তিনটি ছায়া আমি ধনুকে তীর জুড়েছি, ছায়া তবুও এত বেহায়া পাশ ছাড়ে না এবার ছিলা সমুদ্যত, হানবো তীর ঝড়ের মতো– নীরা দু’হাত তুলে বললো, ‘মা নিষাদ! ওরা আমার বিষম চেনা!’ ঘূর্ণি ধুলোর সঙ্গে ওড়ে আমার বুক চাপা বিষাদ– লঘু প্রকোপে হাসলো নীরা, সঙ্গে ছায়া-অভিমানীরা ফেরানো তীর দৃষ্টি ছুঁয়ে মিলিয়ে গেল নীরা জানে না!
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a7%87-%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%9b%e0%a6%be%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be-sunil-gangopadhay/
257
কাজী নজরুল ইসলাম
এক আল্লাহ জিন্দাবাদ
মানবতাবাদী
উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ; আমরা বলিব সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ। উহারা চাহুক সংকীর্ণতা, পায়রার খোপ, ডোবার ক্লেদ, আমরা চাহিব উদার আকাশ, নিত্য আলোক, প্রেম অভেদ। উহারা চাহুক দাসের জীবন, আমরা শহীদি দরজা চাই; নিত্য মৃত্যু-ভীত ওরা, মোরা মৃত্যু কোথায় খুঁজে বেড়াই! ওরা মরিবেনা, যুদ্ব বাধিঁলে ওরা লুকাইবে কচুবনে, দন্তনখরহীন ওরা তবু কোলাহল করে অঙ্গনে। ওরা নির্জীব; জিব নাড়ে তবু শুধূ স্বার্থ ও লোভবশে, ওরা জিন, প্রেত, যজ্ঞ, উহারা লালসার পাঁকে মুখ ঘষে। মোরা বাংলার নব যৌবন,মৃত্যুর সাথে সন্তরী, উহাদের ভাবি মাছি পিপীলিকা, মারি না ক তাই দয়া করি। মানুষের অনাগত কল্যাণে উহারা চির অবিশ্বাসী, অবিশ্বাসীরাই শয়তানী-চেলা ভ্রান্ত-দ্রষ্টা ভুল-ভাষী। ওরা বলে, হবে নাস্তিক সব মানুষ, করিবে হানাহানি। মোরা বলি, হবে আস্তিক, হবে আল্লাহ মানুষে জানাজানি। উহারা চাহুক অশান্তি; মোরা চাহিব ক্ষমাও প্রেম তাহার, ভূতেরা চাহুক গোর ও শ্মশান, আমরা চাহিব গুলবাহার! আজি পশ্চিম পৃথিবীতে তাঁর ভীষণ শাস্তি হেরি মানব ফিরিবে ভোগের পথ ভয়ে, চাহিবে শান্তি কাম্য সব। হুতুম প্যাচারা কহিছে কোটরে, হইবেনা আর সূর্যোদয়, কাকে আর তাকে ঠোকরাইবেনা, হোক তার নখ চষ্ণু ক্ষয়। বিশ্বাসী কভু বলেনা এ কথা, তারা আলো চায়, চাহে জ্যোতি; তারা চাহে না ক এই উৎপীড়ন এই অশান্তি দূর্গতি। তারা বলে, যদি প্রার্থনা মোরা করি তাঁর কাছে এক সাথে, নিত্য ঈদের আনন্দ তিনি দিবেন ধুলির দুনিয়াতে। সাত আসমান হতে তারা সাত-রঙা রামধনু আনিতে চায়, আল্লা নিত্য মহাদানী প্রভূ, যে যাহা চায়, সে তাহা পায়। যারা অশান্তি দুর্গতি চাহে, তারা তাই পাবে, দেখো রে ভাই, উহারা চলুক উহাদের পথে, আমাদের পথে আমরা যাই। ওরা চাহে রাক্ষসের রাজ্য, মেরা আল্লার রাজ্য চাই, দ্বন্দ্ব-বিহীন আনন্দ-লীলা এই পৃথিবীতে হবে সদাই। মোদের অভাব রবে না কিছুই, নিত্যপূর্ণ প্রভূ মোদের, শকুন শিবার মত কাড়াকাড়ি করে শবে লয়ে-- শখ ওদের! আল্লা রক্ষা করুন মোদেরে, ও পথে যেন না যাই কভূ, নিত্য পরম-সুন্দর এক আল্লাহ্ আমাদের প্রভূ। পৃথিবীতে যত মন্দ আছে তা ভালো হোক, ভালো হোক ভালো, এই বিদ্বেষ-আঁধার দুনিয়া তাঁর প্রেমে আলো হোক, আলো। সব মালিন্য দূর হয়ে যাক সব মানুষের মন হতে, তাঁহার আলোক প্রতিভাত হোক এই ঘরে ঘরে পথে পথে। দাঙ্গা বাঁধায়ে লুট করে যারা, তার লোভী, তারা গুন্ডাদল তারা দেখিবেনা আল্লাহর পথ চিরনির্ভয় সুনির্মল। ওরা নিশিদিন মন্দ চায়, ওরা নিশিদিন দ্বন্দ চায়, ভূতেরা শ্রীহীন ছন্দ চায়, গলিত শবের গন্ধ চায়! তাড়াবে এদের দেশ হতে মেরে আল্লার অনাগত সেনা, এরাই বৈশ্য, ফসল শৈস্য লুটে খায়, এরা চির চেনা। ওরা মাকড়সা, ওদের ঘরের ঘেরোয়াতে কভু যেয়ো না কেউ, পর ঘরে থাকে জাল পেতে, ওরা দেখেনি প্রাণের সাগর ঢেউ। বিশ্বাস করো এক আল্লাতে প্রতি নিঃশ্বাসে দিনে রাতে, হবে দুলদুল - আসওয়ার পাবে আল্লার তলোয়ার হাতে। আলস্য আর জড়তায় যারা ঘুমাইতে চাহে রাত্রিদিন, তাহারা চাহে না চাঁদ ও সূর্য্য, তারা জড় জীব গ্লানি-মলিন। নিত্য সজীব যৌবন যার, এস এস সেই নৌ-জোয়ান সর্ব-ক্লৈব্য করিয়াছে দূর তোমাদেরই চির আত্বদান! ওরা কাদা ছুড়ে বাঁধা দেবে ভাবে - ওদের অস্ত্র নিন্দাবাদ, মোরা ফুল ছড়ে মারিব ওদের, বলিব - "এক আল্লাহ জিন্দাবাদ"।
https://banglarkobita.com/poem/famous/862
5956
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
ড্রইং
ছড়া
এই এখানে মাঠ বসালো ওই ওখানে নদী গাছের নীচে বসিয়ে দিল ক্লান্ত রাখাল ছেলে মেঘ বসালো ওপর দিকে নীচের দিকে বাড়ি পুজোর মুখে এই বাড়িতে তোমরা যারা এলে তাদের হাতে তোরং দিলো হলুদ সবুজ ছাতা চেককাটা প্যান্ট, রবার জুতো, মালাই বরফ গাড়ি কাশের বাদার, ভরিয়ে দিল কু-ঝিকমিক ছুটি পাগলী মায়ের জন্য দিল, পুজোর নতুন শাড়ি প্যান্ডেলে মাইক লাগিয়ে দিলো, কোলের টাকে জামা আর যারা সব মেঘলা তাদের মুখের মেঘটুকু সরিয়ে দিতে বাবার সাথে ছাদের ওপর গিয়ে সূর্য ছিঁড়ে ড্রইং খাতায় আটকে দিলো খুকু
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a1%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%87%e0%a6%82-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a7%8e-%e0%a6%9a%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a4/
2236
মহাদেব সাহা
মানুষের
চিন্তামূলক
কেউ জানেনা একেকটি মানুষ বুকের মধ্যে কী গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বেড়ায়- কোনো বিষন্ন ক্যাসেটেও এতো বেদনার সংগ্রহ নেই আর, এই বুকের মধ্যে দীর্ঘশ্বাসের পর দীর্ঘশ্বাস যেন একখানি অন্তহীন প্রগাঢ় এপিক! পাতায় পাতায় চোখের জল সেখানে লিপিবদ্ধ আর মনোবেদনা সেই এপিকের ট্রাজিক মলাট; মানুষের বুকে এতো দীর্ঘশ্বাস, এতো দীর্ঘশ্বাস, কে জানতো!দীর্ঘশ্বাসভরা এই বুকের চেয়ে শীতপ্রধান বিপন্ন অঞ্চল আর কোথাও নেই, এমন হলুদ, ধূসর আর তুষারবৃত! একেকটি মানুষ বুকের মধ্যে কী গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বেড়ায়, কেউ জানে না।হঠাৎ একসঙ্গে অসংখ্য দুঃখ যদি কখনো কেঁদে ওঠে কিংবা যদি প্রাচীন শিলালিপি থেকে সব শোকের গান সশব্দে বেজে যায়, তাহলে যেমন মধ্যাহ্নের আকাশ সহসা দুঃখে ম্লান হয়ে যাবে গোলাপ হবে কৃষ্ণবর্ণ, তার চেয়েও বিষন্নতা নেমে আসবে মানুষের বুক থেকে এই দীর্ঘশ্বাস যদি বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে। তেমন সম্ভাবনা আছে বলেই মানুষ বুকের মধ্যে দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখে তার চোখে নিয়তই জল ঝরে তবু দেখা যায় না;মানুষের ভেতর কতো যে দীর্ঘশ্বাস, জমাট বেঁধে আছে কতো যে ক্রন্দন, পাতা ঝরার শব্দ, মৃত্যুসংবাদ মানুষের বুকের মধ্যে ব্যথিত ব্যাকুল ইতিহাস আর আহত সভ্যতা মেঘের মতো ঘনীভূত হতে হতে একেকটি মর্মান্তিক দীর্ঘশ্বাস হয়ে আছে মানুষ তাকে বয়ে বয়ে দগ্ধ বেঁচে থাকে।একেকটি মানুষ বুকের মধ্যে কী গভীর দীর্ঘশ্বাস বয়ে বেড়ায়, কেউ জানে না। একেকটি মানুষ নিজের মধ্যে কীভাবে নিজেই মরে যায়, হায়, কেউ জানে না!আরও পড়তে – www.kobitacocktail.wordpress.com
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%b7%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%87-%e0%a6%8f%e0%a6%a4%e0%a7%8b-%e0%a6%a6%e0%a7%80%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%98%e0%a6%b6%e0%a7%8d/
648
জয় গোস্বামী
কীভাবে
চিন্তামূলক
কীভাবে এলাম এই শহরে, সে মস্ত ইতিহাস! হামাগুড়ি দিয়ে আর ট্রেনের পিছনে ট্রেন ধরে রেললাইনে হাতেপায়ে তালা ও শিকল বেঁধে শুয়ে ট্রেন এসে পড়ামাত্র চক্ষের নিমিষে ড্রাইভারের কেবিনের জানলা দিয়ে জনতার প্রতি হাত নেড়ে টুপির ভেতর থেকে পায়রা খরগোশ ধরে, ছেড়ে, মাথার এদিক দিয়ে রড ঢুকিয়ে ওদিকে বার করে সম্মোহন করে নিজ সহকারিণীকে বাক্সে ভরে সে-বাক্সের চারদিকে ঢুকিয়ে ষোলোটা তরোয়াল টুং টাং লাইটার জ্বেলে বাক্সটি পুড়িয়ে ছাই করে উড়ো মন্ত্র বলতে বলতে নেমে গিয়ে নিজে সে-মেয়েকে দর্শক আসন থেকে বাহু ধরে মঞ্চে তুলে এনে ম্যাজিকে প্রমাণ করে আমি হচ্ছি পয়লা নম্বর তবেই শেষমেষ ডেকে জায়গা দিল আমাকে, শহর। এখন ম্যাজিকই ধ্যান, জ্ঞান, বুদ্ধি, বাঁচামরা পেশা ভোর থেকে হাতসাফাই, নিজের জিভ কেটে জোড়া দেওয়া সন্ধ্যায় হাজির হওয়া মঞ্চে মঞ্চে ভরাভর্তি শো-এ রাত্রিবেলা বাড়ি আসা ধুঁকে ধুঁকে করতালি সয়ে ভোর থেকে প্র্যাকটিস শুরু, প্রত্যহ দাঁত দিয়ে ওই কামড়ানো বুলেটে ধরা প্রাণ একবার ফসকালে শেষ, মনে রেখো, ও ম্যাজিশিয়ান!আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রকীভাবে এলাম এই শহরে, সে মস্ত ইতিহাস! হামাগুড়ি দিয়ে আর ট্রেনের পিছনে ট্রেন ধরে রেললাইনে হাতেপায়ে তালা ও শিকল বেঁধে শুয়ে ট্রেন এসে পড়ামাত্র চক্ষের নিমিষে ড্রাইভারের কেবিনের জানলা দিয়ে জনতার প্রতি হাত নেড়ে টুপির ভেতর থেকে পায়রা খরগোশ ধরে, ছেড়ে, মাথার এদিক দিয়ে রড ঢুকিয়ে ওদিকে বার করে সম্মোহন করে নিজ সহকারিণীকে বাক্সে ভরে সে-বাক্সের চারদিকে ঢুকিয়ে ষোলোটা তরোয়াল টুং টাং লাইটার জ্বেলে বাক্সটি পুড়িয়ে ছাই করে উড়ো মন্ত্র বলতে বলতে নেমে গিয়ে নিজে সে-মেয়েকে দর্শক আসন থেকে বাহু ধরে মঞ্চে তুলে এনে ম্যাজিকে প্রমাণ করে আমি হচ্ছি পয়লা নম্বর তবেই শেষমেষ ডেকে জায়গা দিল আমাকে, শহর। এখন ম্যাজিকই ধ্যান, জ্ঞান, বুদ্ধি, বাঁচামরা পেশা ভোর থেকে হাতসাফাই, নিজের জিভ কেটে জোড়া দেওয়া সন্ধ্যায় হাজির হওয়া মঞ্চে মঞ্চে ভরাভর্তি শো-এ রাত্রিবেলা বাড়ি আসা ধুঁকে ধুঁকে করতালি সয়ে ভোর থেকে প্র্যাকটিস শুরু, প্রত্যহ দাঁত দিয়ে ওই কামড়ানো বুলেটে ধরা প্রাণ একবার ফসকালে শেষ, মনে রেখো, ও ম্যাজিশিয়ান!আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রকীভাবে এলাম এই শহরে, সে মস্ত ইতিহাস! হামাগুড়ি দিয়ে আর ট্রেনের পিছনে ট্রেন ধরে রেললাইনে হাতেপায়ে তালা ও শিকল বেঁধে শুয়ে ট্রেন এসে পড়ামাত্র চক্ষের নিমিষে ড্রাইভারের কেবিনের জানলা দিয়ে জনতার প্রতি হাত নেড়ে টুপির ভেতর থেকে পায়রা খরগোশ ধরে, ছেড়ে, মাথার এদিক দিয়ে রড ঢুকিয়ে ওদিকে বার করে সম্মোহন করে নিজ সহকারিণীকে বাক্সে ভরে সে-বাক্সের চারদিকে ঢুকিয়ে ষোলোটা তরোয়াল টুং টাং লাইটার জ্বেলে বাক্সটি পুড়িয়ে ছাই করে উড়ো মন্ত্র বলতে বলতে নেমে গিয়ে নিজে সে-মেয়েকে দর্শক আসন থেকে বাহু ধরে মঞ্চে তুলে এনে ম্যাজিকে প্রমাণ করে আমি হচ্ছি পয়লা নম্বর তবেই শেষমেষ ডেকে জায়গা দিল আমাকে, শহর। এখন ম্যাজিকই ধ্যান, জ্ঞান, বুদ্ধি, বাঁচামরা পেশা ভোর থেকে হাতসাফাই, নিজের জিভ কেটে জোড়া দেওয়া সন্ধ্যায় হাজির হওয়া মঞ্চে মঞ্চে ভরাভর্তি শো-এ রাত্রিবেলা বাড়ি আসা ধুঁকে ধুঁকে করতালি সয়ে ভোর থেকে প্র্যাকটিস শুরু, প্রত্যহ দাঁত দিয়ে ওই কামড়ানো বুলেটে ধরা প্রাণ একবার ফসকালে শেষ, মনে রেখো, ও ম্যাজিশিয়ান!আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্রকীভাবে এলাম এই শহরে, সে মস্ত ইতিহাস! হামাগুড়ি দিয়ে আর ট্রেনের পিছনে ট্রেন ধরে রেললাইনে হাতেপায়ে তালা ও শিকল বেঁধে শুয়ে ট্রেন এসে পড়ামাত্র চক্ষের নিমিষে ড্রাইভারের কেবিনের জানলা দিয়ে জনতার প্রতি হাত নেড়ে টুপির ভেতর থেকে পায়রা খরগোশ ধরে, ছেড়ে, মাথার এদিক দিয়ে রড ঢুকিয়ে ওদিকে বার করে সম্মোহন করে নিজ সহকারিণীকে বাক্সে ভরে সে-বাক্সের চারদিকে ঢুকিয়ে ষোলোটা তরোয়াল টুং টাং লাইটার জ্বেলে বাক্সটি পুড়িয়ে ছাই করে উড়ো মন্ত্র বলতে বলতে নেমে গিয়ে নিজে সে-মেয়েকে দর্শক আসন থেকে বাহু ধরে মঞ্চে তুলে এনে ম্যাজিকে প্রমাণ করে আমি হচ্ছি পয়লা নম্বর তবেই শেষমেষ ডেকে জায়গা দিল আমাকে, শহর। এখন ম্যাজিকই ধ্যান, জ্ঞান, বুদ্ধি, বাঁচামরা পেশা ভোর থেকে হাতসাফাই, নিজের জিভ কেটে জোড়া দেওয়া সন্ধ্যায় হাজির হওয়া মঞ্চে মঞ্চে ভরাভর্তি শো-এ রাত্রিবেলা বাড়ি আসা ধুঁকে ধুঁকে করতালি সয়ে ভোর থেকে প্র্যাকটিস শুরু, প্রত্যহ দাঁত দিয়ে ওই কামড়ানো বুলেটে ধরা প্রাণ একবার ফসকালে শেষ, মনে রেখো, ও ম্যাজিশিয়ান!আরও পড়ুনঃ জয় গোস্বামী কবিতা সমগ্র
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%95%e0%a7%80%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a7%87-%e0%a6%8f%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%ae-%e0%a6%8f%e0%a6%87-%e0%a6%b6%e0%a6%b9%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%9c%e0%a7%9f-%e0%a6%97%e0%a7%8b%e0%a6%b8/
1768
পূর্ণেন্দু পত্রী
আমাদের তুমুল হৈ-হল্লা
চিন্তামূলক
আমরা যারা চল্লিশের চৌকাঠ পেরিয়ে পঞ্চাশের দিকে সেদিন আঠারো বছরের উথাল-পাথাল বাউগুলে সেজে সারারাত তুমুল হৈ-হল্লা। আগুনের পিন্ডি গিলে গিলে, আগুনের পিন্ডি গিলে গিলে প্রত্যেকে এক-একজন তালেবর। ‘বুঝেছি, পৃথিবীটাকে উচ্ছন্নে পাঠাবে ছোঁড়াগুলো । নিজের মনে গজ গজ জানলা খুলে পালিয়ে গেল হাওয়া। ‘বুঝেছি, একটা কেচ্ছা-কেলেঙ্কারী না ঘটিয়ে এরা ছাড়বে না। ভয়ে এক ঝটকায় নিভে গেল সমস্ত টিউব লাইট। আমাদের উড়ো চুলগুলো তখন মনুমেন্ট-মুখো মিছিলের পতাকা আমাদের শরীরের খাঁজে খাঁজে তখন বিরজু মহারাজের কথক গলায় আমীর খাঁকে বসিয়ে কোরাস ধরেছি -জগতে আনন্দ যজ্ঞে গান থামতেই, যেন রেডিওতে শোকসংবাদ, এমনি গলায় শান্তি বলে উঠল- ‘জানিস, আর মাত্র কুড়ি বছর পরে খতম হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত পেট্রোল আর তারপরেই কয়লা-, অমনি মরা আগুনে ঘি পড়ার মতো দাউ দাউ আমাদের তুমুল হৈ-হল্লা। শান্তি থামতেই নীলামদারের মতো হাঁক পাড়ল সুনীল- ‘মেরামতের অযোগ্য এই পৃথিবীটার অন্যে আমি কিনতে চাই একটা ব্রক্ষাণ্ডজোড়া ডাস্টবিন। অমনি একশোটা ঘোড়ার চিঁহি চিঁহি ্‌উল্লাসে আমাদের তুমুল হৈ-হল্লা। তার পরই রক্তাক্ত যীশুর ভঙ্গীতে টেবিলের উপর উঠে দাঁড়াল পৃথীশ। ‘বন্ধুগণ! যে-যার হাফ প্যান্টগুলো কাচিয়ে রাখুন খোঁড়া তৈমুর আবার জেগে উঠছে কবর ফুঁড়ে গেরিলা যুদ্ধের সময় দারুণ কাজে লাগবে। অমনি আমাদের তুমুল হৈ-হল্লা মিলিটারি ব্যান্ডের মতো ঝমঝমিয়ে। হিমালয় থেকে গড়াতে গড়াতে প্রকণ্ড বোল্ডারের মতো জেগে উঠল শক্তি। ‘এবার আমি কিছু বলতে চাই। গাছ এবং পাথর এমনকি ফুলের ছেঁড়া পাপড়ির সম্বন্ধে সাংঘাতিক কিছু কথাবার্র্তা জেনে গেছি আমি, বুড়ো শালিকগুলোর ঘাড়ের রোঁয়া ছিঁড়ে ছিঁড়ে এখন আকুপাংচারের মতো ঢুকিয়ে দিতে হবে সেগুলো।’ অমনি শান্তির গলা জড়িয়ে আমি আমার কোমর জড়িয়ে সুনীল সুনীলের পায়ের তলায় পৃথীশ পৃথীশের পাকস্থলীতে শক্তি শক্তির নাইকুণ্ডলীতে সুনীল, সুনীলের জুলফিতে আমি আমার ঊরু কিংবা ভুরুতে শান্তি এইভাবে দলা পাকাতে পাকাতে আমাদের তুমুল হৈ-হল্লার রাতটাকে নদীনালার দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে নক্ষত্রের দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে কলকাতার অন্ধকুপের দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে কী যে দুর্দান্ত কাণ্ডকারখানা ঘটিয়েছি, কিচ্ছু মনে নেই।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1204
4149
রেদোয়ান মাসুদ
ভাগ্যের পরিহাস
প্রেমমূলক
সাগরকে বলছিলাম এক ফোটা লোনা পানি দিতে বাতাসকে বলছিলাম একটু গন্ধ দিতে পাখিকে বলছিলাম একটা গান শুনাতে আকাশকে বলছিলাম একটু বৃষ্টি দিতে কিন্তু কেউ রাজি হলো না। সাগর বলল এখন সাগরে পানি নেই বাতাস বলল এখনও বাগানে ফুল ফুটেনি পাখি বলল এখন গান গাওয়ার সময় নেই আকাশ বলল আকাশে এখনও মেঘ জমেনি। অনেক দিন পর সবাই রাজি হল সাগর লোনা পানি দিয়ে গেল বাতাস নাকে গন্ধ দিয়ে গেল পাখি গান শুনিয়ে গেল আকাশ বৃষ্টিতে ভিজিয়ে গেল। হঠাৎ একদিন অবাক কান্ড ঘটলো সাগর মরুভূমি হয়ে গেল বাতাস নিস্তব্দ হয়ে গেল পাখির কণ্ঠ বন্ধ হয়ে গেল আকাশ অন্ধকার হয়ে গেল। তারপর যা হবার তাই হল তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে গেল বুকের ভিতর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল চারিদিকে কোলাহল শূন্য হয়ে গেল চোখ দূটি চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
http://kobita.banglakosh.com/archives/2220.html
2550
রজনীকান্ত সেন
পরোপকার
নীতিমূলক
নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল, তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল, গাভী কভু নাহি করে নিজ দুগ্ধ পান, কাষ্ঠ, দগ্ধ হয়ে, করে পরে অন্নদান, স্বর্ণ করে নিজরূপে অপরে শোভিত, বংশী করে নিজস্বরে অপরে মোহিত, শস্য জন্মাইয়া, নাহি খায় জলধরে, সাধুর ঐশ্বর্য শুধু পরহিত-তরে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4323.html
4415
শামসুর রাহমান
ইচ্ছেগুলি থেঁতলে দিয়ে
প্রেমমূলক
ইচ্ছেগুলি থেঁতলে দিয়ে করলে এ কি? চেয়ে চিন্তে কয়েক বিঘে দুঃখ নিলে? দুঃখ-দুঃখ বেড়াল শুধু তীক্ষ্ম দাঁতে মাংস ছিঁড়ে হৃদয় ফুঁড়ে ওষ্ঠে চাটে। তার সে অঙ্গে সঙ্গ চেয়ে মনের ভেতর মৎস্য হয়ে কেমন তুমি একলা হ’লে।তীষণ দগ্ধ দূর শতকী পাখির বাসা স্বপ্নে কেন ভস্ম ছড়ায় বারে বারে? বহুকালের উজান বেয়ে জ্বলজ্বলে তার যুগল বাহু জড়ায় কেন স্মৃতির গ্রীবা? শিরায় শিরায় এখনো কি জ্বলবে প্রদীপ, উড়বে পায়রা হৃদয় জুড়ে অবিরত?এই শহরে নগ্ন পায়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখলে হঠাৎ প্রচুর বেলা অস্ত গেল। রৌদ্র-সেঁকা শিশিরভেজা জামা তুমি ছেড়ে ছুড়ে বললে এবার ফিরতে হবে। ফিরতে গেলেই যায় কি ফেরা? পায়ের নিচে শুকনো পাতা, ব্যর্থ শিল্প কান্না জোড়ে।ইচ্ছেগুলি থেঁতলে তুমি সামনে গিয়ে ক্লান্তভাবে খুললে মুঠি বেলাশেষে- নেই তো কিছুই, কী-যেন সব ছাইয়ের মতো পড়ছে ঝরে,বিষণ্নতা আসে ব্যেপে। বিঘে কয়েক দুঃখে তুমি কেমন ফসল তুলবে বলো? পঙ্গপালের শব্দ জাগে।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/iccheguli-thethle-diye/
2688
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আপন শোভার মূল্য
নীতিমূলক
আপন শোভার মূল্য পুষ্প নাহি বোঝে, সহজে পেয়েছে যাহা দেয় তা সহজে।  (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/apon-shovar-mulyo/
25
অমিয় চক্রবর্তী
ওক্লাহোমা
রূপক
সাক্ষাত্ সন্ধান পেয়েছ কি ৩-টে ২৫-শে? বিকেলের উইলো বনে রেড্ এরো ট্রেনের হুইসিল শব্ দ শেষ ছুঁয়ে গাঁথে দূর শূণ্যে দ্রুত ধোঁয়া নীল ; মার্কিন ডাঙার বুকে ঝোড়ো অবসান গেলো মিশে || অবসান গেল মিশে || মাথা নাড়ে ‘জানি’ ‘জানি’ ক্যাথলিক গির্জাচুড়া স্থির, পুরোনো রোদ্দুরে ওড়া কাকের কাকলি পাখা ভিড় ; অন্যমনস্ক মস্ত শহরে হঠাত্ কুয়াশায় ইস্পাতি রেলের ধারে হুহু শীত-হাওয়া ট’লে যায়|| শীত হাওয়া ট’লে যায় || হৃত্পিণ্ডে রক্তের ধ্বনিযেখানে মনের শিরা ছিঁড়ে যাত্রী চ’লে গেল পথে কোটি ওক্লাহোমা পারে লীন, রক্ত ক্রুশে বিদ্ধ ক্ষণে গির্জে জ্বলে রাঙা সে-তিমিরে— বিচ্ছেদের কল্পান্তরে প্রশ্ন ফিরে আসে চিরদিন || ফিরে আসে চির দিন ||
http://kobita.banglakosh.com/archives/3777.html
1089
জীবনানন্দ দাশ
পরবাসী
প্রকৃতিমূলক
যাহাদের পায়ে পায়ে চলে চলে জাগিয়াছে আঁকাবাঁকা চেনা পথগুলি দিকে দিকে পড়ে আছে যাহাদের দেহমাটি—করোটির ধূলি, যাহারা ভেনেছে ধান গান গেয়ে—খুঁটেছে পাখির মতো মিঠে খুদকুঁড়া, যাহাদের কামনায় ইশারায় মাটি হল পানপাত্র, শষ্প হল সুরা! ছুঁয়ে ছেনে বারবার এ ভাঁড়ার করে গেছে স্যাঁতসেঁতে ম্লান, আনাচে-কানাচে আজও দুলিতেছে যাহাদের উড়ানি-পিরান, যাদের দেহের ছায়া পাঁচিলের গায় গায় মেখে গেছে মায়া, দেয়ালের শেওলায় নীল হয়ে জেগে আছে যাহাদের কায়া, যারা গেছে বীজ বুনে মাঠে মাঠে,—চষে গেছে মাটি, কেটেছে ফসল, শালি বেঁধে-বেঁধে নেছে আঁটি আঁটি, তুলিয়াছে গোলাবাড়ি—যত তিষি, ধান খড় ভরা, পেঁচা-ইঁদুরের সনে আন্‌মনে জাগিয়াছে যাদের প্রহরা, পনির ননীর গন্ধে ভরিয়াছে যাহাদের তুষ্ট গৃহস্থালি, ধুনুচিতে ধূপ ঢেলে—উঠানে প্ৰদীপ জ্বালি জ্বালি চরকায় সুতো কেটে তুলিয়াছে তন্ময় গুঞ্জন, কহিয়াছে আধো আধো কত কথা—নিভায়েছে–জুলায়েছে আলো, দেয়ালে তাদের ছায়া জাগিয়াছে এলোমেলো—কালো— না জানি কোথায় তারা, কত দূরে—জানি না তো কিছু! রাতভোর ঘোর ঘোর চোখ মোর, ঘাড়খানা নিচু তাদের সন্ধানে যেন–যাহাদের রেণুঝরা হিম মরা প্রজাপতি ডানা দিকে দিকে পড়ে আছে—মনে হয়। কত চেনা–কত তারা জানা! তাহাদেরই পরীপাখা ওড়ে যেন পাউষের নদীটির বুকে! শিশিরনিবিড় মাঠ-পাথরের মুখে তারা যেন কথা কয়!—শাঁইঝাড়ে—শালুকের দলে জোনাকির পাখনার তলে যেন তাঁহাদের দীপ আজও জ্বলে! সঙ্গোপনে বনে বনে ফেরে তারা—জ্যোৎস্নারাতে পিয়ালের মৌ আজও তারা পান করে, আজও তারা গান করে—বাসরের বর আর বউ! শিশিরের জলে জলে স্নান করে–ভিজে ভিজে বালুচর দিয়া বুনো হাঁস-হাঁসীদের সনে ফেরে পরবাসী প্রিয় আর প্রিয়া! কোরা-ডাহুকের বুকে কান পেতে শুনে যায় গান— তাদের আঙুল ছুঁয়ে চুলবুল করে ওঠে হেমন্তের মাঠভরা ধান! তাদের দেখেছি আমি গেঁয়ো পথে–দেখেছে রে ধাঙড়ের বধূ, মৌচুষ্‌কির সনে তারা বনে লুটে খায় কমলার মধু! নোনার পাতায় তারা মাথা পেতে খায় তাতা ক্ষীর! নোনার পাতায় তারা মাথা পেতে খায় তাতা ক্ষীর! বেদের মতন তারা আসে যায়–অবেলায় ভেঙে ফেলে ভিড়! তাদের দেখেছি আমি শাদা ভোরে—ঘুঘু ডাকা উদাস দুপুরে! —সাঁঝের নদীর বাটে—ভাঙা হাট–ভিজা মোঠ জুড়ে; পাড়াগাঁর পথে পথে নিঝ্‌ঝুম চাঁদিনীর রাতে ফিরেছে রে, ভিড়েছে রে কত বার তারা মোর সাথে!
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/porobasi/
2900
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কালিদাসের প্রতি
সনেট
আজ তুমি কবি শুধু, নহ আর কেহ— কোথা তব রাজসভা, কোথা তব গেহ, কোথা সেই উজ্জয়িনী—কোথা গেল আজ প্রভু তব, কালিদাস, রাজ-অধিরাজ। কোনো চিহ্ন নাহি কারো। আজ মনে হয় ছিলে তুমি চিরদিন চিরানন্দময় অলকার অধিবাসী। সন্ধ্যাভ্রশিখরে ধ্যান ভাঙি উমাপতি ভূমানন্দভরে নৃত্য করিতেন যবে, জলদ সজল গর্জিত মৃদঙ্গরবে, তড়িৎ চপল ছন্দে ছন্দে দিত তাল, তুমি সেই ক্ষণে গাহিতে বন্দনাগান—গীতিসমাপনে কর্ণ হতে বর্হ খুলি স্নেহহাস্যভরে পরায়ে দিতেন গৌরী তব চূড়া-’পরে।   (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kalidaser-proti/
2692
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আপনি ফুল লুকায়ে বনছায়ে
রূপক
আপনি ফুল লুকায়ে বনছায়ে গন্ধ তার ঢালে দখিনবায়ে।  (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/apni-ful-lukaye-bonchye/
113
আল মাহমুদ
অবুঝের সমীকরণ
চিন্তামূলক
কবিতা বোঝে না এই বাংলার কেউ আর দেশের অগণ্য চাষী, চাপরাশী ডাক্তার উকিল মোক্তার পুলিস দারোগা ছাত্র অধ্যাপক সব কাব্যের ব্যাপারে নীরব! স্মাগলার আলোচক সম্পাদক তরুণীর দল কবিতা বোঝে না কোনো সঙ অভিনেত্রী নটী নারী নাটের মহল কার মনে কাতোটুকু রঙ? ও পাড়ার সুন্দরী রোজেনা সারা অঙ্গে ঢেউ তার, তবু মেয়ে কবিতা বোঝে না! কবিতা বোঝে না আর বাংলার বাঘ কুকুর বিড়াল কালো ছাগ, খরগোস গিরগিটি চতুর বানর চক্রদার যত অজগর! কবিতা বোঝে না এই বাঙলার বনের হরিণী জঙ্গলের পশু-পাশবিনী। শকুনী গৃধিনী কাক শালিক চড়ুই ঘরে ঘরে ছুঁচো আর উই; বাংলার আকাশের যতেক খেচর কবিতা বোঝে না তারা। কবিতা বোঝে না অই বঙ্গোপসাগরের কতেক হাঙর!
http://kobita.banglakosh.com/archives/3727.html
2312
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
কুরুক্ষেত্রে
সনেট
যথা দাবানল বেড়ে অনল-প্রাচীরে সিংহ-বৎসে । সপ্ত রথী বেড়িলা তেমতি কুমারে । অনল-কণা-রূপে শর, শিরে পড়ে পুঞ্জে পুঞ্জে পুড়ি, অনিবার-গতি! সে কাল অনল-তেজে, সে বনে যেমতি রোষে, ভয়ে সিংহ-শিশু গরজে অস্থিরে, গরজিলা মহাবাহু চারি দিকে ফিরে রোষে, ভয়ে। ধরি ঘন ধূমের মূরতি, উড়িল চৌদিকে ধুলা, পদ-আস্ফালনে অশ্বের । নিশ্বাস ছাড়ি আর্জ্জুনি বিষাদে, ছাড়িলা জীবন-আশা তরুণ যৌবনে। আঁধারি চৌদিক যথা রাহু গ্রাসে চাঁদে গ্রাসিলা বীরেশে যম । অস্তের শয়নে নিদ্রা গেলা অভিমন্যু অন্যায় বিবাদে।
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/kurukshetre/
4164
রেদোয়ান মাসুদ
শুধু ভালবাসি তোমায়
প্রেমমূলক
হাজার কাজের ভিড়ে ভুলতে চেয়েছি তোমায় পারিনি ভুলতে তোমায় স্মৃতিগুলো শুধু কাঁদায়। আকাশে বাতাসে শুনি শুধু তোমারি প্রতিধ্বনি মেঘের আড়ালে ভেসে ওঠে তোমারি প্রতিচ্ছবি। রাতের বেলা ঘুমের জন্য চোখ বুজে শুয়ে থাকি ঘুম আসেনা চোখে তাই সারা রাত জেগে থাকি। বিছানা থেকে উঠে জানালার ফাকে দেই উকি জ্যোৎস্না ছড়ানো চাঁদের মাঝে তোমায় খুজি, যখনি দেখি চাঁদের মাঝে তুমি নেই আছে এক চড়কা কাটা সাদা কাপড় পড়া নুয়ে পড়া বুড়ি হয়তোবা বয়সের ভাড়ে লুটিয়ে পরেছো তুমি এই ভেবে সারা রাত তোমার জন্য বসে থাকি। হঠাৎ কানে ভাসে মসজিদের আযানের ধ্বনি তারি মাঝে কান ঝাঝা করে পাখির কলকাকলি এভাবে রাতের পরে রাত আসে সময় চলে যায় চারিদিক থেকে জলের রাশি চোখ ভাসিয়ে যায় । সকাল বেলা বিছানা থেকে উঠে মাঠে চলে আসি দূর্বা ঘাসের উপর পড়ে থাকা শিশিরে পা রাখি। তখনি বুকের মাঝে শুরু হয়ে যায় কাপাকাপি যে শিশির বিন্দুতে তোমার পায়ের স্পর্শ লাগলে শিহরিত হয়ে বলতে আমায়, তোমায় ভালবাসি। আজও সেই কথা মনে পরলে ভেসে যায় আঁখি তুমি কি এখনও সকাল বেলা শিশিরে পা রাখ? শিশির বিন্দুর স্পর্শ লাগলে আমার কথা ভাব ? এখন কি শিশির বিন্দুর স্পর্শে তোমার শরীর শিহরিত হয়ে ভালবাসার অনুভূতি সৃষ্টি হয় না? কি বলবো তোমায়, বলার ভাষাটুকুও আজ নেই যে ভালবাসার জন্য প্রহর গুনতে কখন কথা হবে কখন আকাশে মেঘের ফাকে চাঁদের দেখা মিলবে। এখনও মেঘের ফাকে অনায়াসেই চাঁদের দেখা পাই চাঁদকে পেলেও মনে হয় কি যেন আজ পাশে নেই নিরবে কান পেতে তোমার কথা শুনতে না পাই এ দেহের প্রতিটি রক্ত মাংস জমাট বেধে যায়। হৃদযন্ত্রের সকল ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মরার উপক্রম হয়। একদিন হয়তো পৃথিবী তার সকল মায়া ছেড়ে ফেলে দিবে আমায় অচিন দেশের কোন এক ধারে। সেই দিনের অপেক্ষায় আজ আমার দিন চলে যায় জীবনের শেষ বেলায় এসে একবার হলেও এ মন তোমার আকাশে,তোমার বাতাসে বিচরণ করতে চায় যদি কখনও ভালবেসে থাকো এই অভাগা আমায় ভাসিয়ে যাও শেষবার আমায় তোমার ভালবাসায় শান্তি পাবে আত্মা আমার অচিন দেশের আস্তানায়। পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে শুধু তোমার প্রতীক্ষায় কখন এসে বলবে তুমি “শুধু ভালবাসি তোমায়”।
http://kobita.banglakosh.com/archives/2242.html
57
আবদুল হাকিম
বঙ্গবাণী
স্বদেশমূলক
কিতাব পড়িতে যার নাহিক অভ্যাস। সে সবে কহিল মোতে মনে হাবিলাষ।। তে কাজে নিবেদি বাংলা করিয়া রচন। নিজ পরিশ্রম তোষি আমি সর্বজন।। আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ। দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ।। আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত। যদি বা লিখয়ে আল্লা নবীর ছিফত।। যেই দেশে যেই বাক্য কহে নরগণ। সেই বাক্য বুঝে প্রভু আগে নিরঞ্জন।। সর্ববাক্য বুঝে প্রভু কিবা হিন্দুয়ানী। বঙ্গদেশী বাক্য কিবা যত ইতি বাণী।। মারফত ভেদে যার নাহিক গমন। হিন্দুর অক্ষর হিংসে সে সবের গণ।। যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী। সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।। দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়। নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়।। মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি। দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4349.html
1310
তসলিমা নাসরিন
ও মেয়ে শোনো
মানবতাবাদী
তোমাকে বলেছে –আস্তে, বলেছে –ধীরে. বলেছে –কথা না, বলেছে –চুপ। বলেছে– বসে থাকো, বলেছে– মাথা নোয়াও, বলেছে — কাঁদো। তুমি কি করবে জানো? তুমি এখন উঠে দাঁড়াবে পিঠটা টান টান করে, মাথাটা উঁচু করে দাঁড়াবে, তুমি কথা বলবে, অনর্গল বলবে, যা ইচ্ছে তাই বলবে, জোরে বলবে, চিৎকার করে বলবে, এমন চিৎকার করবে যেন ওরা দুহাতে ওদের কান চেপে রাখে। ওরা তোমাকে বলবে, ছি ছি! বেহায়া বেশরম শুনে তুমি হাসবে। ওরা তোমাকে বলবে, তোর চরিত্রের ঠিক নেই, শুনে তুমি জোরে হাসবে বলবে তুই নষ্ট ভ্রষ্ট তুমি আরও জোরে হাসবে হাসি শুনে ওরা চেঁচিয়ে বলবে, তুই একটা বেশ্যা তুমি কোমরে দুহাত রেখে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে বলবে, হ্যাঁ আমি বেশ্যা। ওদের পিলে চমকে উঠবে। ওরা বিস্ফারিত চোখে তোমাকে দেখবে। ওরা পলকহীন তোমাকে দেখবে। তুমি আরও কিছু বলো কি না শোনার জন্য কান পেতে থাকবে। ওদের মধ্যে যারা পুরুষ তাদের বুক দুরু দুরু কাঁপবে, ওদের মধ্যে যারা নারী তারা সবাই তোমার মত বেশ্যা হওয়ার স্বপ্ন দেখবে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/2014
696
জয় গোস্বামী
পাগলী, তোমার সঙ্গে
প্রেমমূলক
পাগলী, তোমার সঙ্গে ভয়াবহ জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোবালি কাটাব জীবন এর চোখে ধাঁধা করব, ওর জল করে দেব কাদা পাগলী, তোমার সঙ্গে ঢেউ খেলতে যাব দু’কদম।অশান্তি চরমে তুলব, কাকচিল বসবে না বাড়িতে তুমি ছুঁড়বে থালা বাটি, আমি ভাঙব কাঁচের বাসন পাগলী, তোমার সঙ্গে বঙ্গভঙ্গ জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে ৪২ কাটাব জীবন।মেঘে মেঘে বেলা বাড়বে, ধনে পুত্রে লক্ষ্মী লোকসান লোকাসান পুষিয়ে তুমি রাঁধবে মায়া প্রপন্ঞ্চ ব্যন্জ্ঞন পাগলী, তোমার সঙ্গে দশকর্ম জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে দিবানিদ্রা কাটাব জীবন।পাগলী, তোমার সঙ্গে ঝোলভাত জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে মাংসরুটি কাটাব জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে নিরক্ষর জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে চার অক্ষর কাটাব জীবন।পাগলী, তোমার সঙ্গে বই দেখব প্যারামাউন্ট হলে মাঝে মাঝে মুখ বদলে একাডেমি রবীন্দ্রসদন পাগলী, তোমার সঙ্গে নাইট্যশালা জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে কলাকেন্দ্র কাটাব জীবন।পাগলী, তোমার সঙ্গে বাবুঘাট জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে দেশপ্রিয় কাটাব জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে সদা সত্য জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে ‘কী মিথ্যুক’ কাটাব জীবন।এক হাতে উপায় করব, দুহাতে উড়িয়ে দেবে তুমি রেস খেলব জুয়া ধরব ধারে কাটাব সহস্র রকম লটারি, তোমার সঙ্গে ধনলক্ষ্মী জীবন কাটাব লটারি, তোমার সঙ্গে মেঘধন কাটাব জীবন।দেখতে দেখতে পুজো আসবে, দুনিয়া চিত্‍কার করবে সেল দোকানে দোকানে খুঁজব রূপসাগরে অরূপরতন পাগলী, তোমার সঙ্গে পুজোসংখ্যা জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে রিডাকশনে কাটাব জীবন।পাগলী, তোমার সঙ্গে কাঁচা প্রুফ জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে ফুলপেজ কাটাব জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে লে আউট জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে লে হালুয়া কাটাব জীবন।কবিত্ব ফুড়ুত্‍ করবে, পিছু পিছু ছুটব না হা করে বাড়ি ফিরে লিখে ফেলব বড়ো গল্প উপন্যাসোপম পাগলী, তোমার সঙ্গে কথাশিল্প জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে বকবকম কাটাব জীবন।নতুন মেয়ের সঙ্গে দেখা করব লুকিয়ে চুরিয়ে ধরা পড়ব তোমার হাতে, বাড়ি ফিরে হেনস্তা চরম পাগলী, তোমার সঙ্গে ভ্যাবাচ্যাকা জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে হেস্তনেস্ত কাটাব জীবন।পাগলী, তোমার সঙ্গে পাপবিদ্ধ জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে ধর্মমতে কাটাব জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে পুজা বেদি জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে মধুমালা কাটাব জীবন।দোঁহে মিলে টিভি দেখব, হাত দেখাতে যাব জ্যোতিষীকে একুশটা উপোস থাকবে, ছাব্বিশটা ব্রত উদযাপন পাগলী, তোমার সঙ্গে ভাড়া বাড়ি জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে নিজ ফ্ল্যাট কাটাব জীবন।পাগলী, তোমার সঙ্গে শ্যাওড়াফুলি জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে শ্যামনগর কাটাব জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে রেল রোকো জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে লেট স্লিপ কাটাব জীবন।পাগলী, তোমার সঙ্গে আশাপূর্ণা জীবন কাটাব আমি কিনব ফুল, তুমি ঘর সাজাবে যাবজ্জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে জয় জওয়ান জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে জয় কিষান কাটাব জীবন।সন্ধেবেলা ঝগড়া হবে, হবে দুই বিছানা আলাদা হপ্তা হপ্তা কথা বন্ধ মধ্যরাতে আচমকা মিলন পাগলী, তোমার সঙ্গে ব্রক্ষ্মচারী জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে আদম ইভ কাটাব জীবন।পাগলী, তোমার সঙ্গে রামরাজ্য জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে প্রজাতন্ত্রী কাটাব জীবন পাগলী, তোমার সঙ্গে ছাল চামড়া জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে দাঁতে দাঁত কাটাব জীবন।এর গায়ে কনুই মারব রাস্তা করব ওকে ধাক্কা দিয়ে এটা ভাঙলে ওটা গড়ব, ঢেউ খেলব দু দশ কদম পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোঝড় জীবন কাটাব পাগলী, তোমার সঙ্গে ‘ভোর ভয়োঁ’ কাটাব জীবন।
http://kobita.banglakosh.com/archives/1665.html
4411
শামসুর রাহমান
আসাদের
স্বদেশমূলক
গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায় ।বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো হৃদয়ের সোনালী তন্তুর সূক্ষতায় বর্ষীয়সী জননী সে-শার্ট উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে কতদিন স্নেহের বিন্যাসে ।ডালীম গাছের মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর- শেভিত মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে-শার্ট শহরের প্রধান সড়কে কারখানার চিমনি-চূড়োয় গমগমে এভেন্যুর আনাচে কানাচে উড়ছে, উড়ছে অবিরাম আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে, চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায় ।আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখন্ড বস্ত্র মানবিক ; আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা ।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%9f-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ae/
1228
জীবনানন্দ দাশ
সারাৎসার
প্রেমমূলক
এখন কিছুই নেই—এখনে কিছুই নেই আর, অমল ভোরের বেলা র’ইয়ে গেছে শুধু; আশ্বিনের নীলাকাশ স্পষ্ট ক’রে দিয়ে সূর্য আসে; অনেক আবছা জল জেগে উঠে নিজ প্রয়োজনে নদী হয়ে সমস্ত রৌদ্রের কাছে জানাতেছে দাবি;নক্ষত্রেরা মানুষের আগে এসে কথা কয় ভাবি; পল অনুপল দিয়ে অন্তহীন নিপলের চকমকি ঠুকে ঐ সব তারার পরিভাষার উজ্জ্বলতা; আমার লক্ষ্য ছিল মানুষের সাধারণ হৃদয়ের কথা সহজ সঙ্গের মতো জেগে নক্ষত্রকে কী ক’’রে মানুষও মানুষীর মতো ক’’রে রাখে।তবু তার উপচার নিয়ে সেই নারী কোথায় গিয়েছে আজ চ’লে; এই তো এখানে ছিল সে অনেক দিন; আকাশের সব নক্ষত্রের মৃত্যু হলে তারপর একটি নারীর মৃত্যু হয়ঃ অনুভব ক’’রে আমি অনুভব করেছি সময়।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/sharatshar/
2000
বিষ্ণু বিশ্বাস
গল্পের কুমার
চিন্তামূলক
ধরাতলে একদিন পৃথিবী এনেছে ধারাজল দেবতা-চোখের আলো ক্রমে নিভে হয়েছে সকাল। বেড়াতে এসেছে এক গল্পের কুমার অসময়ে তার অবসর ছিল। স্রোস্বতী কিনারে দেখেছে নীল বাঁদরের হাট। দীর্ঘক্ষণ পলক পড়েনি দেবতা-চোখের আলো ক্রমে নিভে হয়েছে সকাল। এমন গল্পের কবি অন্ধ হলে সৃষ্টি স্থিতি লয় নিশ্চিহ্ন আলোর সখা, তোমাদের শোনা কোন গান পাথরে স্থির হয়েছে। জ্যোতিষ্কের পরশ পাথর সীমাহীন ঘটমানে, নিয়তির চুল ছিঁড়ে ছিঁড়ে নীল পশমি ছাগল। হাটবারে হাটে বাঁধা থাকে। পাইকারি কথামালা। শোরগোল গন্ডোলায় ভেসে চলে যায় চলে যায় তারাদের পৈশুন্য আঁধার ধরাতলে একদিন পৃথিবী এনেছে ধারাজল দেবতা-চোখের আলো ক্রমে নিভে হয়েছে সকাল।
https://banglapoems.wordpress.com/2013/10/01/%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a7%8d%e0%a6%a3%e0%a7%81-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8d/
277
কাজী নজরুল ইসলাম
কৃষকের ঈদ
মানবতাবাদী
বেলাল! বেলাল! হেলাল উঠেছে পশ্চিম আসমানে, লুকাইয়া আছ লজ্জায় কোন মরুর গরস্থানে। হের ঈদগাহে চলিছে কৃষক যেন প্রেত- কংকাল কশাইখানায় যাইতে দেখেছ শীর্ণ গরুর পাল? রোজা এফতার করেছে কৃষক অশ্রু- সলিলে হায়, বেলাল! তোমার কন্ঠে বুঝি গো আজান থামিয়া যায়। থালা, ঘটি, বাটি বাঁধা দিয়ে হের চলিয়াছে ঈদগাহে, তীর খাওয়া বুক, ঋণে- বাঁধা- শির, লুটাতে খোদার রাহে।জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ মুমুর্ষ সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ? একটি বিন্দু দুধ নাহি পেয়ে যে খোকা মরিল তার উঠেছে ঈদের চাঁদ হয়ে কি সে শিশু- পাঁজরের হাড়? আসমান- জোড়া কাল কাফনের আবরণ যেন টুটে। এক ফালি চাঁদ ফুটে আছে, মৃত শিশুর অধর পুটে। কৃষকের ঈদ!ঈদগাহে চলে জানাজা পড়িতে তার, যত তকবির শোনে, বুকে তার তত উঠে হাহাকার। মরিয়াছে খোকা, কন্যা মরিছে, মৃত্যু- বন্যা আসে এজিদের সেনা ঘুরিছে মক্কা- মসজিদে আশেপাশে।কোথায় ইমাম? কোন সে খোৎবা পড়িবে আজিকে ঈদে? চারিদিকে তব মুর্দার লাশ, তারি মাঝে চোখে বিঁধে জরির পোশাকে শরীর ঢাকিয়া ধণীরা এসেছে সেথা, এই ঈদগাহে তুমি ইমাম, তুমি কি এদেরই নেতা? নিঙ্গাড়ি’ কোরান হাদিস ও ফেকাহ, এই মৃতদের মুখে অমৃত কখনো দিয়াছ কি তুমি? হাত দিয়ে বল বুকে। নামাজ পড়েছ, পড়েছ কোরান, রোজাও রেখেছ জানি, হায় তোতাপাখি! শক্তি দিতে কি পেরেছ একটুখানি? ফল বহিয়াছ, পাওনিক রস, হায় রে ফলের ঝুড়ি, লক্ষ বছর ঝর্ণায় ডুবে রস পায় নাকো নুড়ি।আল্লা- তত্ত্ব জেনেছ কি, যিনি সর্বশক্তিমান? শক্তি পেলো না জীবনে যে জন, সে নহে মুসলমান। ঈমান! ঈমান! বল রাতদিন, ঈমান কি এত সোজা? ঈমানদার হইয়া কি কেহ বহে শয়তানি বোঝা?শোনো মিথ্যুক! এই দুনিয়ায় পুর্ণ যার ঈমান, শক্তিধর সে টলাইতে পারে ইঙ্গিতে আসমান। আল্লাহর নাম লইয়াছ শুধু, বোঝনিক আল্লারে। নিজে যে অন্ধ সে কি অন্যরে আলোকে লইতে পারে? নিজে যে স্বাধীন হইলনা সে স্বাধীনতা দেবে কাকে? মধু দেবে সে কি মানুষে, যাহার মধু নাই মৌচাকে?কোথা সে শক্তি- সিদ্ধ ইমাম, প্রতি পদাঘাতে যার আবে- জমজম শক্তি- উৎস বাহিরায় অনিবার? আপনি শক্তি লভেনি যে জন, হায় সে শক্তি-হীন হয়েছে ইমাম, তাহারি খোৎবা শুনিতেছি নিশিদিন। দীন কাঙ্গালের ঘরে ঘরে আজ দেবে যে নব তাগিদ কোথা সে মহা- সাধক আনিবে যে পুন ঈদ? ছিনিয়া আনিবে আসমান থেকে ঈদের চাঁদের হাসি, ফুরাবে না কভু যে হাসি জীবনে, কখনো হবে না বাসি। সমাধির মাঝে গণিতেছি দিন, আসিবেন তিনি কবে? রোজা এফতার করিব সকলে, সেই দিন ঈদ হবে।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/krishokereid/
4353
শামসুর রাহমান
আবার নিভৃতে
প্রকৃতিমূলক
আবার নিভৃতে বসন্তকে কী ব্যাকুল আলিঙ্গন করলাম রাত্রির প্রথম যামে; জ্যোৎস্না ঝলসিত সরোবরে স্নিগ্ধতায় অবগাহনের অনুপম মুগ্ধতা আমাকে পৌঁছে দিয়েছিল অলকনন্দার তটে যেন মন্ত্রবলে। পুনরায় বাঁচার আনন্দে আশ্চর্য গা ঝাড়া দিয়ে উঠি, গীতবিতানের পাতা খুলে বসি, গীতধারা বয় শিরায় শিরায় আর ওষ্ঠ সিক্ত হয় ক্ষণে ক্ষণে পুলকের মদিনায়।এ প্রখর শীতে অনুভব করি আমার শরীরে গজায় সবুজ পাতা, রঙ-বেরঙের ফুল ফোটে অকস্মাৎ বহুদিন পর। সে, রূপসী সাহসিকা, আমাকে জাগিয়ে তোলে শোকগ্রস্ত ভস্মস্তূপ থেকে কী সহজে; করিনি শিকার কুড়া বন-বনান্তরে, তবুও পেয়েছি আমি মলুয়াকে কদমতলায়!   (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/abar-nivrite/
2973
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খোয়াই
প্রকৃতিমূলক
পশ্চিমে বাগান বন চষা-খেত মিলে গেছে দূর বনান্তে বেগনি বাষ্পরেখায়; মাঝে আম জাম তাল তেঁতুলে ঢাকা সাঁওতালপাড়া; পাশ দিয়ে ছায়াহীন দীর্ঘ পথ গেছে বেঁকে রাঙা পাড় যেন সবুজ শাড়ির প্রান্তে কুটিল রেখায়। হঠাৎ উঠেছে এক-একটা যূথভ্রষ্ট তালগাছ, দিশাহারা অনির্দিষ্টকে যেন দিক দেখাবার ব্যাকুলতা। পৃথিবীর একটানা সবুজ উত্তরীয় তারি এক ধারে ছেদ পড়েছে উত্তর দিকে, মাটি গেছে ক্ষ’য়ে,               দেখা দিয়েছে উর্মিল লাল কাঁকরের নিস্তব্ধ তোলপাড়– মাঝে মাঝে মরচে-ধরা কালো মাটি মহিষাসুরের মুণ্ড যেন। পৃথিবী আপনার একটি কোণের প্রাঙ্গণে বর্ষাধারার আঘাতে বানিয়েছে ছোটো ছোটো অখ্যাত খেলার পাহাড়, বয়ে চলেছে তার তলায় তলায় নামহীন খেলার নদী।শরৎকালে পশ্চিম-আকাশে সূর্যাস্তের ক্ষণিক সমারোহে রঙের সঙ্গে রঙের ঠেলাঠেলি– তখন পৃথিবীর এই ধূসর ছেলেমানুষির উপরে দেখেছি সেই মহিমা যা একদিন পড়েছে আমার চোখে দুর্লভ দিনাবসানে রোহিত সমুদ্রের তীরে তীরে জনশূন্য তরুহীন পর্বতের রক্তবর্ণ শিখরশ্রেণীতে, রুষ্টরুদ্রের প্রলয়ভ্রূকুঞ্চনের মতো। এই পথে ধেয়ে এসেছে কালবৈশাখীর ঝড়, গেরুয়া পতাকা উড়িয়ে ঘোড়সওয়ার বর্গি- সৈন্যের মতো– কাঁপিয়ে দিয়েছে শাল-সেগুনকে, নুইয়ে দিয়েছে ঝাউয়ের মাথা, হায়-হায় রব তুলেছে বাঁশের বনে, কলাবাগানে করেছে দুঃশাসনের দৌরাত্ম্য। ক্রন্দিত আকাশের নীচে ওই ধূসর বন্ধুর কাঁকরের স্তূপগুলো দেখে মনে হয়েছে লাল সমুদ্রে তুফান উঠল, ছিটকে পড়ছে তার শীকরবিন্দু।এসেছিলেম বালককালে। ওখানে গুহাগহ্বরে ঝির্‌ ঝির্‌ ঝর্নার ধারায় রচনা করেছি মন-গড়া রহস্যকথা, খেলেছি নুড়ি সাজিয়ে নির্জন দুপুর বেলায় আপন-মনে একলা। তার পরে অনেক দিন হল, পাথরের উপর নির্ঝরের মতো আমার উপর দিয়ে বয়ে গেল অনেক বৎসর। রচনা করতে বসেছি একটা কাজের রূপ ওই আকাশের তলায় ভাঙামাটির ধারে, ছেলেবেলায় যেমন রচনা করেছি নুড়ির দুর্গ! এই শালবন, এই একলা-মেজাজের তালগাছ, ওই সবুজ মাঠের সঙ্গে রাঙামাটির মিতালি এর পানে অনেক দিন যাদের সঙ্গে দৃষ্টি মিলিয়েছি, যারা মন মিলিয়েছিল এখানকার বাদল-দিনে আর আমার বাদল-গানে, তারা কেউ আছে কেউ গেল চলে। আমারও যখন শেষ হবে দিনের কাজ, নিশীথরাত্রের তারা ডাক দেবে আকাশের ও পার থেকে– তার পরে? তার পরে রইবে উত্তর দিকে ওই বুক-ফাটা ধরণীর রক্তিমা, দক্ষিণ দিকে চাষের খেত, পুব দিকের মাঠে চরবে গোরু। রাঙামাটির রাস্তা বেয়ে গ্রামের লোক যাবে হাট করতে। পশ্চিমের আকাশপ্রান্তে আঁকা থাকবে একটি নীলাঞ্জনরেখা। ৩০ শ্রাবণ, ১৩৩৯পশ্চিমে বাগান বন চষা-খেত মিলে গেছে দূর বনান্তে বেগনি বাষ্পরেখায়; মাঝে আম জাম তাল তেঁতুলে ঢাকা সাঁওতালপাড়া; পাশ দিয়ে ছায়াহীন দীর্ঘ পথ গেছে বেঁকে রাঙা পাড় যেন সবুজ শাড়ির প্রান্তে কুটিল রেখায়। হঠাৎ উঠেছে এক-একটা যূথভ্রষ্ট তালগাছ, দিশাহারা অনির্দিষ্টকে যেন দিক দেখাবার ব্যাকুলতা। পৃথিবীর একটানা সবুজ উত্তরীয় তারি এক ধারে ছেদ পড়েছে উত্তর দিকে, মাটি গেছে ক্ষ’য়ে,               দেখা দিয়েছে উর্মিল লাল কাঁকরের নিস্তব্ধ তোলপাড়– মাঝে মাঝে মরচে-ধরা কালো মাটি মহিষাসুরের মুণ্ড যেন। পৃথিবী আপনার একটি কোণের প্রাঙ্গণে বর্ষাধারার আঘাতে বানিয়েছে ছোটো ছোটো অখ্যাত খেলার পাহাড়, বয়ে চলেছে তার তলায় তলায় নামহীন খেলার নদী।শরৎকালে পশ্চিম-আকাশে সূর্যাস্তের ক্ষণিক সমারোহে রঙের সঙ্গে রঙের ঠেলাঠেলি– তখন পৃথিবীর এই ধূসর ছেলেমানুষির উপরে দেখেছি সেই মহিমা যা একদিন পড়েছে আমার চোখে দুর্লভ দিনাবসানে রোহিত সমুদ্রের তীরে তীরে জনশূন্য তরুহীন পর্বতের রক্তবর্ণ শিখরশ্রেণীতে, রুষ্টরুদ্রের প্রলয়ভ্রূকুঞ্চনের মতো। এই পথে ধেয়ে এসেছে কালবৈশাখীর ঝড়, গেরুয়া পতাকা উড়িয়ে ঘোড়সওয়ার বর্গি- সৈন্যের মতো– কাঁপিয়ে দিয়েছে শাল-সেগুনকে, নুইয়ে দিয়েছে ঝাউয়ের মাথা, হায়-হায় রব তুলেছে বাঁশের বনে, কলাবাগানে করেছে দুঃশাসনের দৌরাত্ম্য। ক্রন্দিত আকাশের নীচে ওই ধূসর বন্ধুর কাঁকরের স্তূপগুলো দেখে মনে হয়েছে লাল সমুদ্রে তুফান উঠল, ছিটকে পড়ছে তার শীকরবিন্দু।এসেছিলেম বালককালে। ওখানে গুহাগহ্বরে ঝির্‌ ঝির্‌ ঝর্নার ধারায় রচনা করেছি মন-গড়া রহস্যকথা, খেলেছি নুড়ি সাজিয়ে নির্জন দুপুর বেলায় আপন-মনে একলা। তার পরে অনেক দিন হল, পাথরের উপর নির্ঝরের মতো আমার উপর দিয়ে বয়ে গেল অনেক বৎসর। রচনা করতে বসেছি একটা কাজের রূপ ওই আকাশের তলায় ভাঙামাটির ধারে, ছেলেবেলায় যেমন রচনা করেছি নুড়ির দুর্গ! এই শালবন, এই একলা-মেজাজের তালগাছ, ওই সবুজ মাঠের সঙ্গে রাঙামাটির মিতালি এর পানে অনেক দিন যাদের সঙ্গে দৃষ্টি মিলিয়েছি, যারা মন মিলিয়েছিল এখানকার বাদল-দিনে আর আমার বাদল-গানে, তারা কেউ আছে কেউ গেল চলে। আমারও যখন শেষ হবে দিনের কাজ, নিশীথরাত্রের তারা ডাক দেবে আকাশের ও পার থেকে– তার পরে? তার পরে রইবে উত্তর দিকে ওই বুক-ফাটা ধরণীর রক্তিমা, দক্ষিণ দিকে চাষের খেত, পুব দিকের মাঠে চরবে গোরু। রাঙামাটির রাস্তা বেয়ে গ্রামের লোক যাবে হাট করতে। পশ্চিমের আকাশপ্রান্তে আঁকা থাকবে একটি নীলাঞ্জনরেখা। ৩০ শ্রাবণ, ১৩৩৯পশ্চিমে বাগান বন চষা-খেত মিলে গেছে দূর বনান্তে বেগনি বাষ্পরেখায়; মাঝে আম জাম তাল তেঁতুলে ঢাকা সাঁওতালপাড়া; পাশ দিয়ে ছায়াহীন দীর্ঘ পথ গেছে বেঁকে রাঙা পাড় যেন সবুজ শাড়ির প্রান্তে কুটিল রেখায়। হঠাৎ উঠেছে এক-একটা যূথভ্রষ্ট তালগাছ, দিশাহারা অনির্দিষ্টকে যেন দিক দেখাবার ব্যাকুলতা। পৃথিবীর একটানা সবুজ উত্তরীয় তারি এক ধারে ছেদ পড়েছে উত্তর দিকে, মাটি গেছে ক্ষ’য়ে,               দেখা দিয়েছে উর্মিল লাল কাঁকরের নিস্তব্ধ তোলপাড়– মাঝে মাঝে মরচে-ধরা কালো মাটি মহিষাসুরের মুণ্ড যেন। পৃথিবী আপনার একটি কোণের প্রাঙ্গণে বর্ষাধারার আঘাতে বানিয়েছে ছোটো ছোটো অখ্যাত খেলার পাহাড়, বয়ে চলেছে তার তলায় তলায় নামহীন খেলার নদী।শরৎকালে পশ্চিম-আকাশে সূর্যাস্তের ক্ষণিক সমারোহে রঙের সঙ্গে রঙের ঠেলাঠেলি– তখন পৃথিবীর এই ধূসর ছেলেমানুষির উপরে দেখেছি সেই মহিমা যা একদিন পড়েছে আমার চোখে দুর্লভ দিনাবসানে রোহিত সমুদ্রের তীরে তীরে জনশূন্য তরুহীন পর্বতের রক্তবর্ণ শিখরশ্রেণীতে, রুষ্টরুদ্রের প্রলয়ভ্রূকুঞ্চনের মতো। এই পথে ধেয়ে এসেছে কালবৈশাখীর ঝড়, গেরুয়া পতাকা উড়িয়ে ঘোড়সওয়ার বর্গি- সৈন্যের মতো– কাঁপিয়ে দিয়েছে শাল-সেগুনকে, নুইয়ে দিয়েছে ঝাউয়ের মাথা, হায়-হায় রব তুলেছে বাঁশের বনে, কলাবাগানে করেছে দুঃশাসনের দৌরাত্ম্য। ক্রন্দিত আকাশের নীচে ওই ধূসর বন্ধুর কাঁকরের স্তূপগুলো দেখে মনে হয়েছে লাল সমুদ্রে তুফান উঠল, ছিটকে পড়ছে তার শীকরবিন্দু।এসেছিলেম বালককালে। ওখানে গুহাগহ্বরে ঝির্‌ ঝির্‌ ঝর্নার ধারায় রচনা করেছি মন-গড়া রহস্যকথা, খেলেছি নুড়ি সাজিয়ে নির্জন দুপুর বেলায় আপন-মনে একলা। তার পরে অনেক দিন হল, পাথরের উপর নির্ঝরের মতো আমার উপর দিয়ে বয়ে গেল অনেক বৎসর। রচনা করতে বসেছি একটা কাজের রূপ ওই আকাশের তলায় ভাঙামাটির ধারে, ছেলেবেলায় যেমন রচনা করেছি নুড়ির দুর্গ! এই শালবন, এই একলা-মেজাজের তালগাছ, ওই সবুজ মাঠের সঙ্গে রাঙামাটির মিতালি এর পানে অনেক দিন যাদের সঙ্গে দৃষ্টি মিলিয়েছি, যারা মন মিলিয়েছিল এখানকার বাদল-দিনে আর আমার বাদল-গানে, তারা কেউ আছে কেউ গেল চলে। আমারও যখন শেষ হবে দিনের কাজ, নিশীথরাত্রের তারা ডাক দেবে আকাশের ও পার থেকে– তার পরে? তার পরে রইবে উত্তর দিকে ওই বুক-ফাটা ধরণীর রক্তিমা, দক্ষিণ দিকে চাষের খেত, পুব দিকের মাঠে চরবে গোরু। রাঙামাটির রাস্তা বেয়ে গ্রামের লোক যাবে হাট করতে। পশ্চিমের আকাশপ্রান্তে আঁকা থাকবে একটি নীলাঞ্জনরেখা। ৩০ শ্রাবণ, ১৩৩৯
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%96%e0%a7%8b%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%87/
1834
পূর্ণেন্দু পত্রী
দেবতা আছেন
ভক্তিমূলক
দেবতা আছেন কোথাও কাছাকাছি পায়ের চিহ্ন বনে বনের চিহ্ন তারঁই তুলির টান সরল রেখাঙ্কনে। জানি না ঘর বসত-বাটী ডেরা আছেন জানি শুধু প্রতিদিনের কাঠে ও কেরোসিনে উঠোন-ভর্তি দুঃখে ও দুর্দিনে তাঁরই ব্যথার অগ্নিকণা ধু ধু । তুমুল হাওয়া, তরল রক্তপাত চতুর্দিকে দাঁড়কাকেদের দাঁত স্তুপীকৃত করাত-চেরা বুক। কুরুক্ষেত্রে ভাঙা রথের চাকা মৃত মানুষ জ্যান্ত শকুন ঢাকা তীর ধনুকে ঝলমলিয়ে হাসে তাঁহারই কৌতুক। দেবতা আছেন কোথাও কাছাকাছি হয়তো বোধে, হয়তো ক্রোধে, ক্ষোভে অবিশ্বাসেও হয়তো কারু-কারু তাঁরই ডাকে বজ্র ডাকে মেঘে রৌদ্র ওঠে প্রকিজ্ঞায় রেগে দৃপ্ত হাঁটে দীর্ঘ দেবদারু। দেবতা আছেন কোথাও কাছাকাছি জানি না ঘর বসত-বার্টী ডেরা। প্রতিদিনের খড়ে এবং কুটোয় তার ভিতরেই বিদীর্ণ প্রায় তাঁহার দুঃখী চলাফেরা। ‘আমি তোমারে করিব নিবেদন আমার সকল প্রাণমন’
https://banglarkobita.com/poem/famous/1253
683
জয় গোস্বামী
তোমাকে কাদার মধ্যে কাদাপাখি মনে করলাম
স্বদেশমূলক
তোমাকে কাদার মধ্যে কাদাপাখি মনে করলাম। মাছ খুঁজছ? লম্বা সরু ঠোঁট দিয়ে আমার খাবার জোগাড় করছ বুঝি? ওগো ও জননী পাখি, আমি স্বপ্নে ডাকি তোমার মা নাম তোমার জরায়ু-কলসী এখন তো শুকনো, শুধু বালিমাটি ভরা বুড়ি, তবু আমাকে একবার, হাত পা মুড়ে তোমার ডিমের মধ্যে শুয়ে থাকতে দেবে?
https://banglarkobita.com/poem/famous/1743
3208
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দিদিমণি– অফুরান সান্ত্বনার খনি
চিন্তামূলক
দিদিমণি– অফুরান সান্ত্বনার খনি। কোনো ক্লান্তি কোনো ক্লেশ মুখে চিহ্ন দেয় নাই লেশ। কোনো ভয় কোনো ঘৃণা কোনো কাজে কিছুমাত্র গ্লানি সেবার মাধুর্যে ছায়া নাহি দেয় আনি। এ অখণ্ড প্রসন্নতা ঘিরে তারে রয়েছে উজ্জ্বলি, রচিতেছে শান্তির মণ্ডলী; ক্ষিপ্র হস্তক্ষেপে চারি দিকে স্বস্তি দেয় ব্যেপে; আশ্বাসের বাণী সুমধুর আবসাদ করি দেয় দূর। এ স্নেহমাধুর্যধারা অক্ষম রোগীরে ঘিরে আপনার রচিছে কিনারা; অবিরাম পরশ চিন্তার বিচিত্র ফসলে যেন উর্বর করিছে দিন তার। এ মাধুর্য করিতে সার্থক এতখানি নির্বলের ছিল আবশ্যক। অবাক হইয়া তারে দেখি, রোগীর দেহের মাঝে অনন্ত শিশুরে দেখেছে কি।  (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/didimoni-ofuran-santonar-khoni/
4379
শামসুর রাহমান
আমার নিবাস
চিন্তামূলক
কখনো গিয়েছি আগে সেখানে, মানে সে বহুদূরে মফস্বলী পুরানো মহলে? দুপুর, নিবিড় হয় চোখের পাতায় আর উদাস পুকুরে; সিঁড়িতে পা রাখতেই উষ্ণ করতলে তার হাত চলে আসে। কার? আজ ছায়াচ্ছন্ন নিস্তব্ধ দুপুরে, নিসর্গের অন্তঃপুরে গাছগাছালির মাঝে দৈববলে সহসা পেয়েছি যাকে, তার? নাকি ভুলে-যাওয়া কোনো পাঁচালির সুন্দরীতমার? সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাই, পাশে হাঁটে আমার জাগর স্বপ্ন শাড়ির আঁচলে নিয়ে অতীতের ঘ্রাণ। কে যেন রয়েছে বসে শ্যাওলাঢাকা পুকুরের ঘাটে বড় একা, অস্তিত্বের ভাঁজে ভাঁজে তার কিছু আলো, কিছু অন্ধকার। পঞ্জিকার পাতা ওড়ে উল্টাপাল্টা, মাঝে-মধ্যে দোলে ঝাড়বাতি প্রাচীন অট্রালিকার হঠাৎ হাওয়ায়, পাখি তার সাথী খুঁজতে খুঁজতে ফের কী মসৃণ সবুজে লুকায়, সে আমাকে ডাকে মনে মনে, আমি তাকে ডাকি; শিউলিতলার ছায়া স্মৃতি খুঁটে খায়। ঘরের ভেতরে ইতিহাস অলৌকিক কলরবে জেগে ওঠে বর্ষীয়ান কান্তিমান কথকের গাঢ় কণ্ঠস্বরে পুরানো গানের মতো। দেয়ালে হরিণ শিং বাতিল গৌরবে যেনবা কৌতুকপ্রদ, তাতে মায়া আছে; মায়া আছে সারা ঘরে। বৃষ্টিগুঁড়ো দুপুরকে করে বুটিদার; মনে পড়ে আরেক বর্ষার গান, অবিকল এই সিঁটি কবেকার, এমন চত্বরে, মনে পড়ে, নিরিবিলি ঘরে কারো ওষ্ঠে ওষ্ঠ রেখে অমরতা খুঁজেছি ব্যাকুল; বুঝি তারও রাত্রিময় গহন খোঁপায় ছিল ফুল এবং পরনে চাঁপারঙ শাড়ি, তাকেও দিয়েছি কথা, টেনেছি বুকের কাছে, আমার ত্বকের গান বেজেছে সুদূর তার ত্বকে! সে মুখ পড়লে মনে রক্তে লতাগুল্ম গান হয়, চোখ হয় কণ্ঠস্বর, হস্তদ্বয় কালহীন স্পন্দিত হৃদয়, আর মাঝে-মধ্যে মনে হয়, সব কিছু জাতিষ্মর দীর্ঘশ্বাস, মনে হয় আমার নিবাস, ছিল সেখানেই, সেই প্রাচীন মহলে দূর বিস্মৃত শতকে।   (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/amar-nibas/
5677
সুকুমার রায়
মাসি গো মাসি
ছড়া
মাসি গো মাসি পাচ্ছে হাসি নিম গাছেতে হচ্ছে শিম্- হাতীর মাথায় ব্যাঙের ছাতা কাগের বাসায় বগের ডিম্ ।।   (অন্যান্য ছড়াসমূহ)
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/masi-go-masi/
1138
জীবনানন্দ দাশ
ভিখিরী
রূপক
একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি আহিরীটোলায়, একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি বাদুরবাগানে, একটি পয়সা যদি পাওয়া যায় আরো--- তবে আমি হেঁটে চ ’লে যাবো মানে মানে । ---ব’ লে সে বাড়ায়ে দিলো অন্ধকারে হাত ।আগাগোড়া শরীরটা নিয়ে এক কানা যেন বুনে যেতে চেয়েছিলো তাঁত; তবুও তা নুলো শাঁখারীর হাতে হয়েছে করাত ।একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি মাঠকোটা ঘুরে, একটি পয়সা পেয়ে গেছি পাথুরিয়াঘাটা, একটি পয়সা যদি পাওয়া যায় আরো--- তাহ ’লে ঢেঁকির চাল হবে কলে ছাঁটা । ব ’লে সে বাড়ায়ে দিলো গ্যাসলাইটে মুখ । ভিড়ের ভিতরে তবু--- হ্যারিসন রোডে আরো গভীর অসুখ, এক পৃথিবীর ভুল;ভিখিরীর ভুলে : এক পৃথিবীর ভুলচুক ।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/vikhiri/
3836
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রূপসী আমার, প্রেয়সী আমার
প্রেমমূলক
রূপসী আমার, প্রেয়সী আমার যাইবি কি তুই যাইবি কি তুই, রূপসী আমার যাইবি কি তুই, ভ্রমিবারে গিরি-কাননে? পাদপের ছায়া মাথার ‘পরে, পাখিরা গাইছে মধুর স্বরে অথবা উড়িছে পাখা বিছায়ে হরষে সে গিরি-কাননে! রূপসী আমার প্রেয়সী আমার যাইবি কি তুই যাইবি কি তুই, রূপসী আমার, যাইবি কি তুই ভ্রমিবারে গিরি-কাননে? শিখর উঠেছে আকাশ-‘পরি, ফেনময় স্রোত পড়িছে মরি, সুরভি-কুঞ্জ ছায়া বিছায়ে শোভিছে সে গিরি-কাননে! রূপসী আমার, প্রেয়সী আমার যাইবি কি তুই যাইবি কি তুই, রূপসী আমার, যাইবি কি তুই ভ্রমিবারে গিরি-কাননে? ধবল শিখর কুসুমে ভরা সরসে ঝরিছে নিঝর-ধারা উছসে উঠিয়া সলিল-কণা শীতলিছে গিরি-কাননে! রূপসী আমার, প্রেয়সী আমার যাইবি কি তুই যাইবি কি তুই, রূপসী আমার, যাইবি কি তুই ভ্রমিবারে গিরি-কাননে? সুখ দুখ যাহা দিলেন, বিধি, কিছুই মানিতে চায় না হৃদি, তোমারে ও প্রেমে লইয়া পাশে ভ্রমি যদি গিরি-কাননে!Robert Burns (অনুবাদ কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ruposi-amar-preyosi-amar/
3541
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাঁশিওয়ালা
প্রেমমূলক
‘ওগো বাঁশিওয়ালা, বাজাও তোমার বাঁশি, শুনি আমার নূতন নাম’- এই বলে তোমাকে প্রথম চিঠি লিখেছি, মনে আছে তো? আমি তোমার বাংলাদেশের মেয়ে। সৃষ্টিকর্তা পুরো সময় দেন নি আমাকে মানুষ ক‘রে গড়তে, রেখেছেন আধাআধি করে। অন্তরে বাহিরে মিল হয় নি- সেকালে আর আজকের কালে, মিল হয় নি ব্যথায় আর বুদ্ধিতে, মিল হয় নি শক্তিতে আর ইচ্ছায়। আমাকে তুলে দেন নি এ যুগের পারানি নৌকোয়- চলা আটক করে ফেলে রেখেছেন, কালস্রোতের ও পারে বালুডাঙায়।            সেখান থেকে দেখি প্রখর আলোয় ঝাপসা দূরের জগৎ; বিনা কারণে কাঙাল মন অধীর হয়ে ওঠে; দুই হাত বাড়িয়ে দিই নাগাল পাই নে কিছুই কোন দিকে।।        বেলাতো কাটে না, বসে থাকি জোয়ার-জলের দিকে চেয়ে- ভেসে যায় মুক্তিপারের খেয়া, ভেসে যায় ধনপতির ডিঙা, ভেসে যায় চলতি বেলার আলোছায়া। এমন-সময় বাজে তোমার বাঁশি ভরা জীবনের সুরে, মরা দিনের নাড়ীর মধ্যে দব্দবিয়ে ফিরে আসে প্রাণের বেগ।।কী বাজাও তুমি, জানি নে সে সুর জাগায় কার মনে কী ব্যথা। বুঝি বাজাও পঞ্চম রাগে দক্ষিণ হাওয়ার নবযৌবনের ভাটিয়ারি। শুনতে শুনতে নিজেকে মনে হয়- যে ছিল পাহাড়তলীর ঝিরঝিরে নদী তার বুকে হঠাৎ উঠেছে ঘনিয়ে শ্রাবণের বাদলরাত্রি। সকালে উঠে দেখা যায় পাড়ি গেছে ভেসে, একগুঁয়ে পাথরগুলোকে ঠেলা দিচ্ছে অসহ্য স্রোতের ঘূর্ণিমাতন।।আমার রক্তে নিয়ে আসে তোমার সুর ঝড়ের ডাক, বন্যার ডাক, আগুনের ডাক, পাঁজরের-উপরে-আছাড়-খাওয়া মরণসাগরের ডাক, ঘরের-শিকল-নাড়া উদাসী হাওয়ার ডাক। যেন হাঁক দিয়ে আসে অপূর্ণের সংকীর্ণ খাদে পূর্ণ স্রোতের ডাকাতি- ছিনিয়ে নেবে, ভাসিয়ে দেবে বুঝি। অঙ্গে অঙ্গে পাক দিয়ে ওঠে কালবৈশাখীর-ঘূর্ণি-মার-খাওয়া অরণ্যের বকুনি।।ডানা দেয় নি বিধাতা- তোমার গান দিয়েছে আমার স্বপ্নে ঝোড়ো আকাশে উড়ো প্রাণের পাগলামি।।ঘরে কাজ করি শান্ত হয়ে; সবাই বলে ‘ভালো’। তারা দেখে আমার ইচ্ছার নেই জোর, সাড়া নেই লোভের, ঝাপট লাগে মাথার উপর- ধূলোয় লুটোই মাথা। দুরন্ত ঠেলায় নিষেধের পাহারা কাত ক’রে ফেলি নেই এমন বুকের পাটা; কঠিন করে জানি নে ভালোবাসতে, কাঁদতে শুধু জানি, জানি এলিয়ে পড়তে পায়ে।।বাঁশিওয়ালা, বেজে ওঠে তোমার বাঁশি, ডাক পড়ে অমর্তলোকে; সেখানে আপন গরিমায় উপরে উঠেছে আমার মাথা। সেখানে কুয়াশার পর্দা-ছেঁড়া তরুণ সূর্য আমার জীবন। সেখানে আগুনের ডানা মেলে দেয় আমার বারণ-না-মানা আগ্রহ, উড়ে চলে অজানা শূন্যপথে প্রথম-ক্ষুধায়-অস্থির-গরুড়ের মতো। জেগে ওঠে বিদ্রোহিনী, তীক্ষè চোখের আড়ে জানায় ঘৃণা চারদিকে ভীরুর ভিড়কে- কৃশ কুটিলের কাপুরুষতাকে।।বাঁশিওয়ালা, হয়তো আমাকে দেখতে চেয়েছ তুমি। জানি নে, ঠিক জায়গাটি কোথায়, ঠিক সময় কখন, চিনবে কেমন ক’রে। দোসরহারা আষাঢ়ের ঝিল্লিঝণক রাত্রে সেই নারীতো ছায়ারূপে গেছে তোমার অভিসারে চোখ-এড়ানো পথে। সেই অজানাকে কত বসন্তে পরিয়েছ ছন্দের মালা- শুকোবে না তার ফুল।।তোমার ডাক শুনে একদিন ঘরপোষা নির্জীব মেয়ে অন্ধকার কোণ থেকে বেরিয়ে এল ঘোমটা খসা নারী। যেন সে হঠাৎ-গাওয়া নতুন ছন্দ বাল্মীকির, চমক লাগালো তোমাকেই। সে নামবে না গানের আসন থেকে; সে লিখবে তোমাকে চিঠি রাগিনীর আবছায়ায় বসে- তুমি জানবে না তার ঠিকানা। ওগো বাঁশিওয়ালা, সে থাক তোমার বাঁশির সুরের দূরত্বে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bashiwala/
3076
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জন্মতিথির উপহার
ছড়া
একটি কাঠের বাক্স শ্রীমতী ইন্দিরা প্রাণাধিকাসু স্নেহ-উপহার এনেছি রে দিতে লিখেও এনেছি দু-তিন ছত্তর । দিতে কত কী যে সাধ যায় তোরে দেবার মতো নেই জিনিস-পত্তর! টাকাকড়িগুলো ট্যাঁকশালে আছে ব্যাঙ্কে আছে সব জমা , ট্যাঁকে আছে খালি গোটা দুত্তিন , এবার করো বাছ ক্ষমা! হীরে জহরাৎ যত ছিল মোর পোঁতা ছিল সব মাটিতে , জহরী যে যেত সন্ধান পেয়ে নে গেছে যে যার বাটীতে! দুনিয়া শহর জমিদারি মোর , পাঁচ ভূতে করে কাড়াকাড়ি , হাতের কাছেতে যা-কিছু পেলুম , নিয়ে এনু তাই তাড়াতাড়ি! স্নেহ যদি কাছে রেখে যাওয়া যেত চোখে যদি দেখা যেত রে , বাজারে-জিনিস কিনে নিয়ে এসে বল্ দেখি দিত কে তোরে! জিনিসটা অতি যৎসামান্য রাখিস ঘরের কোণে , বাক্সখানি ভরে স্নেহ দিনু তোরে এইটে থাকে যেন মনে! বড়োসড়ো হবি ফাঁকি দিয়ে যাবি , কোন্খেনে রবি নুকিয়ে , কাকা-ফাকা সব ধুয়ে-মুছে ফেলে দিবি একেবারে চুকিয়ে । তখন যদি রে এই কাঠখানা মনে একটুকু তোলে ঢেউ — একবার যদি মনে পড়ে তোর ‘ বুজি ' বলে বুঝি ছিল কেউ! এই-যে সংসারে আছি মোরা সবে এ বড়ো বিষম দেশটা! ফাঁকিফুঁকি দিয়ে দূরে চলে যেতে ভুলে যেতে সবার চেষ্টা! ভয়ে ভয়ে তাই সবারে সবাই কত কী যে এনে দিচ্ছে , এটা-ওটা দিয়ে স্মরণ জাগিয়ে বেঁধে রাখিবার ইচ্ছে! মনে রাখতে যে মেলাই কাঠ-খড় চাই , ভুলে যাবার ভারি সুবিধে , ভালোবাস যারে কাছে রাখ তারে যাহা পাস তারে খুবি দে! বুঝে কাজ নেই এত শত কথা , ফিলজফি হোক ছাই! বেঁচে থাকো তুমি সুখে থাকো বাছা বালাই নিয়ে মরে যাই! (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jonmotithir-upohar/
3500
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বন-ফুল (তৃতীয় সর্গ)
কাহিনীকাব্য
‘যমুনার জল করে থল্‌ থল্‌ কলকলে গাহি প্রেমের গান। নিশার আঁচোলে পড়ে ঢোলে ঢোলে সুধাকর খুলি হৃদয় প্রাণ! বহিছে মলয় ফুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে, নুয়ে নুয়ে পড়ে কুসুমরাশি! ধীরি ধীরি ধীরি ফুলে ফুলে ফিরি মধুকরী প্রেম আলাপে আসি! আয় আয় সখি! আয় দুজনায় ফুল তুলে তুলে গাঁথি লো মালা। ফুলে ফুলে আলা বকুলের তলা, হেথায় আয় লো বিপিনবালা। নতুন ফুটেছে মালতীর কলি, ঢলি ঢলি পড়ে এ ওর পানে! মধুবাসে ভুলি প্রেমালাপ তুলি অলি কত কি-যে কহিছে কানে! আয় বলি তোরে, আঁচলটি ভোরে কুড়া-না হোথায় বকুলগুলি! মাধবীর ভরে লতা নুয়ে পড়ে, আমি ধীরি ধীরি আনি লো তুলি। গোলাপ কত যে ফুটেছে কমলা, দেখে যা দেখে যা বনের মেয়ে! দেখ‍্‌সে হেথায় কামিনী পাতায় গাছের তলাটি পড়েছে ছেয়ে। আয় আয় হেথা, ওই দেখ্‌ ভাই, ভ্রমরা একটি ফুলের কোলে— কমলা, ফুঁ দিয়ে দে-না লো উড়িয়ে, ফুলটা আমি লো নেব যে তুলে। পারি না লো আর, আয় হেথা বসি ফুলগুলি নিয়ে দুজনে গাঁথি! হেথায় পবন খেলিছে কেমন তটিনীর সাথে আমোদে মাতি! আয় ভাই হেথা, কোলে রাখি মাথা শুই একটুকু ঘাসের 'পরে— বাতাস মধুর বহে ঝুরু ঝুর, আঁখি মুদে আসে ঘুমের তরে! বল্‌ বনবালা এত কি লো জ্বালা! রাত দিন তুই কাঁদিবি বসে! আজো ঘুমঘোর ভাঙ্গিল না তোর, আজো মজিলি না সুখের রসে! তবে যা লো ভাই! আমি একেলাই রাশ্‌ রাশ্‌ করি গাঁথিয়া মালা। তুই নদীতীরে কাঁদ‍্‌গে লো ধীরে যমুনারে কহি মরমজ্বালা! আজো তুই বোন! ভুলিবি নে বন? পরণকুটীর যাবি নে ভুলে? তোর ভাই মন কে জানে কেমন। আজো বলিলি নে সকল খুলে?’ ‘কি বলিব বোন! তবে সব শোন্‌!’ কহিল কমলা মধুর স্বরে, ‘লভেছি জনম করিতে রোদন রোদন করিব জীবন ভোরে! ভুলিব সে বন?— ভুলিব সে গিরি? সুখের আলয় পাতার কুঁড়ে? মৃগে যাব ভুলে— কোলে লয়ে তুলে কচি কচি পাতা দিতাম ছিঁড়ে। হরিণের ছানা একত্রে দুজনা খেলিয়ে খেলিয়ে বেড়াত সুখে! শিঙ ধরি ধরি খেলা করি করি আঁচল জড়িয়ে দিতাম মুখে! ভুলিব তাদের থাকিতে পরাণ? হৃদয়ে সে সব থাকিতে লেখা? পারিব ভুলিতে যত দিন চিতে ভাবনার আহা থাকিবে রেখা? আজ কত বড় হয়েছে তাহারা, হয়ত আমার না দেখা পেয়ে কুটীরের মাঝে খুঁজে খুঁজে খুঁজে বেড়াতেছে আহা ব্যাকুল হয়ে! শুয়ে থাকিতাম দুপরবেলায় তাহাদের কোলে রাখিয়ে মাথা, কাছে বসি নিজে গলপ কত যে করিতেন আহা তখন মাতা! গিরিশিরে উঠি করি ছুটাছুটি হরিণের ছানাগুলির সাথে তটিনীর পাশে দেখিতাম বসে মুখছায়া যবে পড়িত তাতে! সরসীভিতরে ফুটিলে কমল তীরে বসি ঢেউ দিতাম জলে, দেখি মুখ তুলে— কমলিনী দুলে এপাশে ওপাশে পড়িতে ঢলে! গাছের উপরে ধীরে ধীরে ধীরে জড়িয়ে জড়িয়ে দিতেম লতা, বসি একাকিনী আপনা-আপনি কহিতাম ধীরে কত কি কথা! ফুটিলে গো ফুল হরষে আকুল হতেম, পিতারে কতেম গিয়ে! ধরি হাতখানি আনিতাম টানি, দেখাতেম তাঁরে ফুলটি নিয়ে! তুষার কুড়িয়ে আঁচল ভরিয়ে ফেলিতাম ঢালি গাছের তলে— পড়িলে কিরণ, কত যে বরণ ধরিত, আমোদে যেতাম গলে! দেখিতাম রবি বিকালে যখন শিখরের শিরে পড়িত ঢলে করি ছুটাছুটি শিখরেতে উঠি দেখিতাম দূরে গিয়াছে চোলে! আবার ছুটিয়ে যেতাম সেখানে দেখিতাম আরও গিয়াছে সোরে! শ্রান্ত হয়ে শেষে কুটীরেতে এসে বসিতাম মুখ মলিন করে! শশধরছায়া পড়িলে সলিলে ফেলিতাম জলে পাথরকুচি— সরসীর জল উঠিত উথুলে, শশধরছায়া উঠিত নাচি। ছিল সরসীতে এক-হাঁটু জল, ছুটিয়া ছুটিয়া যেতেম মাঝে, চাঁদের ছায়ারে গিয়া ধরিবারে আসিতাম পুন ফিরিয়া লাজে। তটদেশে পুন ফিরি আসি পর অভিমানভরে ঈষৎ রাগি চাঁদের ছায়ায় ছুঁড়িয়া পাথর মারিতাম— জল উঠিত জাগি। যবে জলধর শিখরের ‘পর উড়িয়া উড়িয়া বেড়াত দলে, শিখরেতে উঠি বেড়াতাম ছুটি— কাপড়-চোপড় ভিজিত জলে! কিছুই— কিছুই— জানিতাম না রে, কিছুই হায় রে বুঝিতাম না। জানিতাম হা রে জগৎমাঝারে আমরাই বুঝি আছি কজনা! পিতার পৃথিবী পিতার সংসার একটি কুটীর পৃথিবীতলে জানি না কিছুই ইহা ছাড়া আর— পিতার নিয়মে পৃথিবী চলে! আমাদেরি তরে উঠে রে তপন, আমাদেরি তরে চাঁদিমা উঠে, আমাদেরি তরে বহে গো পবন, আমাদেরি তরে কুসুম ফুটে! চাই না জ্ঞেয়ান, চাই না জানিতে সংসার, মানুষ কাহারে বলে। বনের কুসুম ফুটিতাম বনে, শুকায়ে যেতেম বনের কোলে। জানিব আমারি পৃথিবী ধরা, খেলিব হরিণশাবক-সনে— পুলকে হরষে হৃদয় ভরা, বিষাদভাবনা নাহিক মনে। তটিনী হইতে তুলিব জল, ঢালি ঢালি দিব গাছের তলে। পাখিরে বলিব ‘কমলা বল্‌’, শরীরের ছায়া দেখিব জলে! জেনেছি মানুষ কাহারে বলে। জেনেছি হৃদয় কাহারে বলে! জেনেছি রে হায় ভালবাসিলে কেমন আগুনে হৃদয় জ্বলে! এখন আবার বেঁধেছি চুলে, বাহুতে পরেছি সোনার বালা। উরসেতে হার দিয়েছি তুলে, কবরীর মাঝে মণির মালা! বাকলের বাস ফেলিয়াছি দূরে— শত শ্বাস ফেলি তাহার তরে, মুছেছি কুসুম রেণুর সিঁদুরে আজো কাঁদে হৃদি বিষাদভরে! ফুলের বলয় নাইক হাতে, কুসুমের হার ফুলের সিঁথি— কুসুমের মালা জড়ায়ে মাথে স্মরণে কেবল রাখিনু গাঁথি! এলো এলো চুলে ফিরিব বনে রুখো রুখো চুল উড়িবে বায়ে। ফুল তুলি তুলি গহনে বনে মালা গাঁথি গাঁথি পরিব গায়ে! হায় রে সে দিন ভুলাই ভালো! সাধের স্বপন ভাঙিয়া গেছে! এখন মানুষে বেসেছি ভালো, হৃদয় খুলিব মানুষ-কাছে! হাসিব কাঁদিব মানুষের তরে, মানুষের তরে বাঁধিব চুলে— মাখিব কাজল আঁখিপাত ভরে, কবরীতে মণি দিব রে তুলে। মুছিনু নীরজা! নয়নের ধার, নিভালাম সখি হৃদয়জ্বালা! তবে সখি আয় আয় দুজনায় ফুল তুলে তুলে গাঁথি লো মালা! এই যে মালতী তুলিয়াছ সতি! এই যে বকুল ফুলের রাশি; জুঁই আর বেলে ভরেছ আঁচলে, মধুপ ঝাঁকিয়া পড়িছে আসি! এই হল মালা, আর না লো বালা— শুই লো নীরজা! ঘাসের 'পরে। শুন‍্‌ছিস বোন! শোন্‌ শোন্‌ শোন্‌! কে গায় কোথায় সুধার স্বরে! জাগিয়া উঠিল হৃদয় প্রাণ! স্মরণের জ্যোতি উঠিল জ্বলে! ঘা দিয়েছে আহা মধুর গান হৃদয়ের অতি গভীর তলে! সেই-যে কানন পড়িতেছে মনে সেই-যে কুটীর নদীর ধারে! থাক্‌ থাক্‌ থাক্‌ হৃদয়বেদন নিভাইয়া ফেলি নয়নধারে! সাগরের মাঝে তরণী হতে দূর হতে যথা নাবিক যত— পায় দেখিবারে সাগরের ধারে মেঘ্‌লা মেঘ্‌লা ছায়ার মত! তেমনি তেমনি উঠিয়াছে জাগি— অফুট অফুট হৃদয়-'পরে কী দেশ কী জানি, কুটীর দুখানি, মাঠের মাঝেতে মহিষ চরে! বুঝি সে আমার জনমভূমি সেখান হইতে গেছিনু চলে! আজিকে তা মনে জাগিল কেমনে এত দিন সব ছিলুম ভুলে। হেথায় নীরজা, গাছের আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে শুনিব গান, যমুনাতীরেতে জ্যোছনার রেতে গাইছে যুবক খুলিয়া প্রাণ! কেও কেও ভাই? নীরদ বুঝি? বিজয়ের[১] আহা প্রাণের সখা! গাইছে আপন ভাবেতে মজি যমুনা পুলিনে বসিয়ে একা! যেমন দেখিতে গুণও তেমন, দেখিতে শুনিতে সকলি ভালো— রূপে গুণে মাখা দেখি নি এমন, নদীর ধারটি করেছে আলো! আপনার ভাবে আপনি কবি রাত দিন আহা রয়েছে ভোর! সরল প্রকৃতি মোহনছবি অবারিত সদা মনের দোর মাথার উপরে জড়ান মালা— নদীর উপরে রাখিয়া আঁখি জাগিয়া উঠেছে নিশীথবালা জাগিয়া উঠেছে পাপিয়া পাখি! আয় না লো ভাই গাছের আড়ালে আয় আর একটু কাছেতে সরে এই খানে আয় শুনি দুজনায় কি গায় নীরদ সুধার স্বরে!’
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bon-ful-tritio-sorgo/
4886
শামসুর রাহমান
নিজের কবিতার প্রতি
চিন্তামূলক
কবিতা আমার ধমনীকে তোর জোগাই নিত্য রক্তকণা। হায় রে তবুও তোর জন্যেই পদে পদে জোটে প্রবঞ্চনা।হেঁটেছিস পথ গুরুজনদের শত গজ্ঞনা মাথায় করে। কাটা ঘুড়ি তুই, বাতাসের লেজ শাসাচ্ছে তোকে অবুঝ ওরে।হায় রে দুস্থ কবিতা আমার তুলে নিলি কোন্‌ জোয়াল কাঁধে! কিসের তাড়ায় এখানে যে তোর চক্ষুলজ্জা খোয়াতে বাধে!ছেঁড়া কাঁথাটাকে সম্বল করে কতকাল আর ঘুরবি বল? নির্বোধ নারী, বাতুল পুরুষ তোর কাছে চায় সুখের ছল।অনাবশ্যক মুক্তো ছড়ালি ফোটালি অলীক কথার খই। যোগ্য মূল্য দেবে যে তেমন উলুবনে বল ক্রেতারা কই?পয়ারে কিংবা মাত্রাবৃত্তে আঁধারকে দিলি আলোর ধার। বিশ্বজোড়া সে সন্তাপ ছেঁকে এনেছিস বটে সত্যসার।প্রতি পক্ষের বাছা বাছা চাঁই নিন্দা রটায় কাব্যলোকেঃ রোগজর্জর এক দশকেই দারুণ শনিতে পেয়েছে তোকেখ্যাতির দ্রাক্ষা নাগালে পাসনি বলেই দিবি কি গলায় দড়ি? তোর দর্পণে চিরন্তনের প্রতিবিম্বকে ঈষৎ ধরি।   (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nijer-kobitar-proti/
1347
তসলিমা নাসরিন
পারো তো ধর্ষণ করো
মানবতাবাদী
আর ধর্ষিতা হয়ো না, আর না আর যেন কোনও দুঃসংবাদ কোথাও না শুনি যে তোমাকে ধর্ষণ করেছে কোনও এক হারামজাদা বা কোনও হারামজাদার দল। আমি আর দেখতে চাই না একটি ধর্ষিতারও কাতর করুণ মুখ, আর দেখতে চাই না পুরুষের পত্রিকায় পুরুষ সাংবাদিকের লেখা সংবাদ পড়তে পড়তে কোনও পুরুষ পাঠকের আরও একবার মনে মনে ধর্ষণ করা ধর্ষিতাকে। ধর্ষিতা হয়ো না, বরং ধর্ষণ করতে আসা পুরুষের পুরুষাঙ্গ কেটে ধরিয়ে দাও হাতে, অথবা ঝুলিয়ে দাও গলায়, খোকারা এখন চুষতে থাক যার যার দিগ্বিজয়ী অঙ্গ, চুষতে থাক নিরূপায় ঝুলে থাকা অণ্ডকোষ, গিলতে থাক এসবের রস, কষ। ধর্ষিতা হয়ো না,পারো তো পুরুষকে পদানত করো, পরাভূত করো, পতিত করো, পয়মাল করো পারো তো ধর্ষণ করো, পারো তো ওদের পুরুষত্ব নষ্ট করো। লোকে বলবে, ছি ছি, বলুক। লোকে বলবে এমন কী নির্যাতিতা নারীরাও যে তুমি তো মন্দ পুরুষের মতই, বলুক, বলুক যে এ তো কোনও সমাধান নয়, বলুক যে তুমি তো তবে ভালো নও বলুক, কিছুতে কান দিও না, তোমার ভালো হওয়ার দরকার নেই, শত সহস্র বছর তুমি ভালো ছিলে মেয়ে, এবার একটু মন্দ হও। চলো সবাই মিলে আমরা মন্দ হই, মন্দ হওয়ার মত ভালো আর কী আছে কোথায়!
https://banglarkobita.com/poem/famous/2021
2610
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপরিবর্তনীয়
নীতিমূলক
এক যদি আর হয় কী ঘটিবে তবে? এখনো যা হয়ে থাকে, তখনো তা হবে। তখন সকল দুঃখ ঘোচে যদি ভাই, এখন যা সুখ আছে দুঃখ হবে তাই।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/oporibortonio/
3012
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গুপ্তিপাড়ায় জন্ম তাহার
ছড়া
গুপ্তিপাড়ায় জন্ম তাহার; নিন্দাবাদের দংশনে অভিমানে মরতে গেল মোগলসরাই জংসনে। কাছা কোঁচা ঘুচিয়ে গুপি ধরল ইজের, পরল টুপি, দু হাত দিয়ে লেগে গেল কোফ্‌তা-কাবাব-ধ্বংসনে। গুরুপুত্র সঙ্গে ছিল– বললে তারে, “অংশ নে।’   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/gupti-paray-jonmo-tahar/
5495
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পুরনো ধাঁধা
মানবতাবাদী
বলতে পার বড়মানুষ মোটর কেন চড়বে? গরীব কেন সেই মোটরের তলায় চাপা পড়বে? বড়মানুষ ভোজের পাতে ফেলে লুচি-মিষ্টি, গরীবরা পায় খোলামকুচি, একি অনাসৃষ্টি? বলতে পার ধনীর বাড়ি তৈরি যারা করছে, কুঁড়েঘরেই তারা কেন মাছির মতো মরছে? ধনীর মেয়ের দামী পুতুল হরেক রকম খেলনা, গরীব মেয়ে পায় না আদর, সবার কাছে ফ্যালনা। বলতে পার ধনীর মুখে যারা যোগায় খাদ্য, ধনীর পায়ের তলায় তারা থাকতে কেন বাধ্য? ‘হিং-টিং-ছট্’ প্রশ্ন এসব, মাথার মধ্যে কামড়ায়, বড়লোকের ঢাক তৈরি গরীব লোকের চামড়ায়।   (মিঠে কড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/purono-dhadha/
2385
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
লক্ষ্মণের প্রতি সূর্পণখা
লিপিমূলক
কে তুমি,--বিজন বনে ভ্রম হে, একাকী, বিভূতি-ভূষিত অঙ্গ? কি কৌতুকে, কহ, বৈশ্বানর, লুকাইছ ভস্মের মাঝারে? মেঘের আড়ালে যেন পূর্ণশশী আজি? ফাটে বুক জটাজুট হেরি তব শিরে, মঞ্জুকেশি! স্বর্ণশয্যা ত্যজি জাগি আমি বিরাগে, যখন ভাবি, নিত্য নিশাযোগে শয়ন, বারাঙ্গ তব, হায় রে, ভূতলে! উপাদেয় রাজভোগ যোগাইলে দাসী, কাঁদি ফিরাইয়া মুখ, পড়ে যাবে মনে তোমার আহার নিত্য ফল মূল, বলি! সুবর্ণ-মন্দিরে পশি নিরানন্দ গতি, কেন না--নিবাস তব বঞ্জুল মঞ্জুলে! হে সুন্দর, শীঘ্র আসি কহ মোরে শুনি-- কোন্ দুঃখে ভব-সুখে বিমুখ হইলা এ নব যৌবনে তুমি? কোন্ অভিমানে রাজবেশ ত্যজিলা হে উদাসীর বেশে? হেমাঙ্গ মৈনাক-সম, হে তেজস্বি কহ, কার ভয়ে ভ্রম তুমি এ বন সাগরে একাকী, আবরি তেজঃ, ক্ষীণ, ক্ষুন্ন খেদে? তোমার মনের কথা কহ আসি মোরে |-- যদি পরাভূত তুমি রিপুর বিক্রমে, কহ শিঘ্র ; দিব সেনা ভব-বিজয়িনী, রথ, গজ, অশ্ব, রথী--অতুল জগতে! বৈজয়ন্ত-ধামে নিত্য শচিকান্ত বলী ত্রস্ত অস্ত্র-ভয়ে যার, হেন ভীম রথী যুঝিবে তোমার হেতু--আমি আদেশিলে! চন্দ্রলোকে, সূর্যলোকে,--যে লোকে ত্রিলোকে লুকাইবে অরি তব, বাঁধি আনি তারে দিব তব পদে, শূর! চামুণ্ডা আপনি, (ইচ্ছা যদি কর তুমি) দাসীর সাধনে, (কুলদেবী তিনি, দেব,) ভীমখণ্ডা হাতে, ধাইবেন হুহুঙ্কারে নাচিতে সংগ্রামে-- দেব-দৈত্য-নর-ত্রাস!--যদি অর্থ চাহ, কহ শীঘ্র ; --অলঙ্কার ভান্ডার খুলিব তুষিতে তোমার মনঃ ; নতুবা কুহকে শুষি রত্নাকরে, লুটি দিব রত্ন-জালে! মণিযোনি খনি যত, দিব হে তোমারে! প্রেম-উদাসীন যদি তুমি, গুণমণি, কহ, কোন্ যুবতীর--(আহা, ভগ্যবতী রামাকুলে সে রমণী!)--কহ শীঘ্র করি,-- কোন্ যুবতীর নব যৌবনের মধু বাঞ্ছা তব? অনিমেষে রূপ তার ধরি, (কামরূপা আমি, নাথ,) সেবিব তোমারে! আনি পারিজাত ফুল, নিত্য সাজাইব শয্যা তব! সঙ্গে মোর সহস্র সঙ্গিনী, নৃত্য গীত রঙ্গে রত | অপ্সরা, কিন্নরী, বিদ্যাধরী,--ইন্দ্রাণীর কিঙ্করী যেমতি, তেমতি আমারে সেবে দশ শত দাসী | সুবর্ণ-নির্মিত গৃহে আমার বসতি-- মুক্তাময় মাঝ তার ; সোপান খচিত মরকতে ; স্তম্ভে হীরা ; পদ্মরাগ মণি ; গবাক্ষে দ্বিরদ-রদ, রতন কপাটে! সুকল স্বরলহরী উথলে চৌদিকে দিবানিশি ; গায় পাখী সুমধুর স্বরে ; সুমধুরতর স্বরে গায় বীণাবাণী বামাকুল! শত শত কুসুম-কাননে লুটি পরিমল, বায়ু অনুক্ষণ বহে! খেলে উত্স ; চলে জল কল কল কলে! কিন্তু বৃথা এ বর্ণনা | এস, গুণনিধি, দেখ আসি,--এ মিনতি দাসীর ও পদে! কায়, মনঃ, প্রাণ আমি সঁপিব তোমারে! ভঞ্জ আসি রাজভোগ দাসীর আলয়ে ; নহে কহ, প্রাণেশ্বর! অম্লান বদনে, এ বেশ ভূষণ ত্যজি, উদাসিনী-বেশে সাজি, পূজি, উদাসীন, পাদ-পদ্ম তব! রতন কাঁচলি খুলি, ফেলি তারে দূরে, আবরি বাকলে স্তন ; ঘুচাইয়া বেণী, মণ্ডি জটাজূটে শিরঃ ; ভুলি রত্নরাজী, বিপিন-জনিত ফুলে বাঁধি হে কবরী! মুছিয়া চন্দন, লেপি ভস্ম কলেবরে | পরি রুদ্রাক্ষের মালা, মুক্তামালা ছিঁড়ি গলদেশে! প্রেম-মন্ত্র দিও কর্ণ-মূলে ; গুরুর দক্ষিণা-রূপে প্রেম-গুরু-পদে দিব এ যৌবন-ধন প্রেম-কুতূহলে! প্রেমাধীনা নারীকুল ডরে কি হে দিতে জলাঞ্জলি, মঞ্জুকেশি, কুল, মান, ধনে প্রেম-লাভ লোভে কভু?--বিরলে লিখিয়া লেখন, রাখিনু, সখে, এই তরুতলে | নিত্য তোমা হেরি হেথা ; নিত্য ভ্রম তুমি এই স্থলে | দেখ চেয়ে ; ওই যে শোভিছে শমী,--লতাবৃতা, মরি, ঘোনটায় যেন, লজ্জাবতী!--দাঁড়াইয়া উহার আড়ালে, গতিহীনা লজ্জাভয়ে, কত যে চেয়েছি তব পানে, নরবর--হায়! সূর্যমুখী চাহে যথা স্থির-আঁখি সে সূর্যের পানে!-- কি আর কহিব তার? যত ক্ষণ তুমি থাকিতে বসিয়া, নাথ ; থাকিত দাঁড়ায়ে প্রেমের নিগড়ে বদ্ধা এ তোমার দাসী! গেলে তুমি শূণ্যাসনে বসিতাম কাঁদি! হায় রে, লইয়া ধূলা, সে স্থল হইতে যথায় রাখিতে পদ, মাখিতাম ভালে, হব্য-ভস্ম তপস্বিনী মাখে ভালে যথা! কিন্তু বৃথা কহি কথা! পড়িও নৃমণি, পড়িও এ লিপিখানি, এ মিনতি পদে! যদিও ও হৃদয়ে দয়া উদয়ে, যাইও গোদাবরী-পূর্বকূলে ; বসিব সেখানে মুদিত কুমুদীরূপে আজি সায়ংকালে ; তুষিও দাসীরে আসি শশধর-বেশে! লয়ে তরি সহচরী থাকিবেক তীরে ; সহজে পাইবে পার | নিবিড় সে পারে কানন, বিজন দেশ | এস, গুণনিধি! দেখিব প্রেমের স্বপ্ন জাগি হে দুজনে! যদি আজ্ঞা দেহ, এবে পরিচয় দিব সংক্ষেপে | বিখ্যাত, নাথ, লঙ্কা, রক্ষঃপুরী স্বর্ণময়ী, রাজা তথা রাজ-কুল-পতি রাবণ, ভগিনী তাঁর দাসী ; লোকমুখে যদি না শুনিয়া থাক, নাম সূর্পনখা | কত যে বয়স তার ; কি রূপ বিধাতা দিয়েছেন, আশু আসি দেখ, নরমণি! আইস মলয়-রূপে ; গন্ধহীন যদি এ কুসুম, ফিরে তবে যাইও তখনি! আইস ভ্রমর-রূপে ; না যোগায় যদি মধু এ যৌবন-ফুল, যাইও উড়িয়া গুঞ্জরি বিরাগ-রাগে! কি আর কহিব? মলয় ভ্রমর, দেব, আসি সাধে দোহে বৃন্তাসনে মালতীরে! এস, সখে, তুমি ;-- এই নিবেদন করে সূর্পনখা পদে | শুন নিবেদন পুনঃ | এত দূর লিখি লেখন, সখীর মুখে শুনিনু হরষে, রাজরথী দশরথ অযোধ্যাধিপতি, পুত্র তুমি, হে কন্দর্প-গর্ব্ব-খর্ব্ব-কারি, তাঁহার ; অগ্রজ সহ পশিয়াছ বনে পিতৃ-সত্য-রক্ষা-হেতু | কি আশ্চর্য্য! মরি,-- বালাই লইয়া তব, মরি, রঘুমণি, দয়ার সাগর তুমি! তা না হলে কভু রাজ্য-ভোগ ত্যজিতে কি ভাতৃ-প্রেম-বশে? দয়ার সাগর তুমি | কর দয়া মোরে, প্রেম-ভিখারিনী আমি তোমার চরণে! চল শীঘ্র যাই দোঁহে স্বর্ণ লঙ্কাধামে | সম পাত্র মানি তোমা, পরম আদরে, অর্পিবেন শুভ ক্ষণে রক্ষঃ-কুল-পতি দাসীরে কমল-পদে | কিনিয়া, নৃমণি, অযোধ্যা-সদৃশ রাজ্য শতেক যৌতুকে, হবে রাজা ; দাসী-ভাবে সেবিবে এ দাসী! এস শীঘ্র, প্রাণেশ্বর ; আর কথা যত নিবেদিব পাদ-পদ্মে বসিয়া বিরলে | ক্ষম অশ্রু-চিহ্ন পত্রে ; আনন্দে বহিছে অশ্রু-ধারা! লিখেছে কি বিধাতা এ ভালে হেন সুখ, প্রাণসখে? আসি ত্বরা করি, প্রশ্নের উত্তর, নাথ, দেহ এ দাসীরে |
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/lokkhoner-proti-shurponokha/
4011
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্মৃতি-পাথেয়
চিন্তামূলক
একদিন কোন্‌ তুচ্ছ আলাপের ছিন্ন অবকাশে সে কোন্‌ অভাবনীয় স্মিতহাসে অন্যমনা আত্মভোলা যৌবনেরে দিয়ে ঘন দোলা মুখে তব অকস্মাৎ প্রকাশিল কী অমৃত-রেখা কভু যার পাই নাই দেখা, দুর্লভ সে প্রিয় অনির্বচনীয়। হে মহা অপরিচিত এক পলকের লাগি হয় সচকিত গভীর অন্তরতর প্রাণে কোন্‌ দূরে বনান্তের পথিকের গানে; সে অপূর্ব আসে ঘরে পথহারা মুহূর্তের তরে। বৃষ্টিধারামুখরিত নির্জন প্রবাসে সন্ধ্যাবেলা যূথিকার সকরুণ স্নিগ্ধ গন্ধশ্বাসে, চিত্তে রেখে দিয়ে গেল চিরস্পর্শ স্বীয় তাহারি স্খলিত উত্তরীয়। সে বিস্মিত ক্ষণিকেরে পড়ে মনে কোনোদিন অকারণে ক্ষণে ক্ষণে শীতের মধ্যাহ্নকালে গোরুচরা শস্যরিক্ত মাঠে চেয়ে চেয়ে বেলা যবে কাটে। সঙ্গহারা সায়াহ্নের অন্ধকারে সে স্মৃতির ছবি সূর্যাস্তের পার হতে বাজায় পূরবী। পেয়েছি যে-সব ধন যার মূল্য আছে ফেলে যাই পাছে সেই যার মূল্য নাই, জানিবে না কেও সঙ্গে থাকে অখ্যাত পাথেয়।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/seter-pathay/
4221
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
দুঃখকে তোমার
চিন্তামূলক
দুঃখকে তোমার কোনো ভয় নেই, সেও ভালোবাসে ভালোবাসা থেকে তুমি ভয় পাও? সুখ থেকে পাও? উল্লেখযোগ্যতা যদি নিয়ে যায় সমুদ্রের তীরে– সেখানে তোমার ভয় আছে নাকি? আনন্দও আছে? তীরে সারবন্দী গাছ, সেখানে ভূমিষ্ঠ ছায়াতলে যদি তুমি একবার গিয়ে বসো পাথরের মতো তবেও তোমার ভয়? ভয় সবখানে! তোমার অবোধ ভয় থেকে আমি পাই অন্য মানে। দুঃখকে তোমার কোন ভয় নেই, সেও ভালোবাসে…
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/dukkhoke-tomar/
6040
হেলাল হাফিজ
নাম ভূমিকায়
প্রকৃতিমূলক
তাকানোর মতো করে তাকালেই চিনবে আমাকে। আমি মানুষের ব্যকরণ জীবনের পুষ্পিত বিজ্ঞান আমি সভ্যতার শুভ্রতার মৌল উপাদান, আমাকে চিনতেই হবে তাকালেই চিনবে আমাকে। আমাকে না চেনা মানে মাটি আর মানুষের প্রেমের উপমা সেই অনুপম যুদ্ধকে না চেনা। আমাকে না চেনা মানে সকালের শিশির না চেনা, ঘাসফুল, রাজহাঁস, উদ্ভিত না চেনা। গাভিন ক্ষেতের ঘ্রাণ, জলের কসম, কাক পলিমাটি চেনা মানে আমাকেই চেনা। আমাকে চেনো না? আমি তোমাদের ডাক নাম, উজাড় যমুনা। ৫.১২.৮০
https://banglarkobita.com/poem/famous/112
5707
সুকুমার রায়
হিতে-বিপরীত
ছড়া
ওরে ছাগল, বল্‌ত আগে সুড় সুড়িটা কেমন লাগে? কই গেল তোর জারিজুরি লম্ফঝম্ফ বাহাদুরি। নিত্যি যে তুই আসতি তেড়ে শিং নেড়ে আর দাড়ি নেড়ে, ওরে ছাগল করবি রে কি? গুঁতোবি তো আয়না দেখি।হাঁ হাঁ হাঁ, এ কেমন কথা ? এমন ধারা অভদ্রতা! শান্ত যারা ইতরপ্রাণী, তাদের পরে চোখরাঙানি! ঠান্ডা মেজাজ কয় না কিছু, লাগতে গেছে তারই পিছু? শিক্ষা তোদের এম্নিতর ছি-ছি-ছি! লজ্জা বড়।ছাগল ভাবে সামনে একি! একটুখানি গুতিয়ে দেখি। গুতোর চোটে ধড়াধ্বড় হুড়মুড়িয়ে ধুলোয় পড়। তবে রে পাজি লক্ষ্মীছাড়া, আমার পরেই বিদ্যেঝড়া, পাত্রাপাত্র নাই কিরে হুঁশ্ দে দমাদম্ ধুপুস্ ধাপুস্।
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/hite-biporit/
4059
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান
মানবতাবাদী
হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান! মানুষের অধিকারে বঞ্চিত করেছ যারে, সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে। বিধাতার রুদ্ররোষে দুর্ভিক্ষের দ্বারে বসে ভাগ করে খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান। অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান। তোমার আসন হতে যেথায় তাদের দিলে ঠেলে সেথায় শক্তিরে তব নির্বাসন দিলে অবহেলে। চরণে দলিত হয়ে ধুলায় সে যায় বয়ে সে নিম্নে নেমে এসো, নহিলে নাহি রে পরিত্রাণ। অপমানে হতে হবে আজি তোরে সবার সমান। যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে। অজ্ঞানের অন্ধকারে আড়ালে ঢাকিছ যারে তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব্যবধান। অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান। শতেক শতাব্দী ধরে নামে শিরে অসম্মানভার, মানুষের নারায়ণে তবুও কর না নমস্কার। তবু নত করি আঁখি দেখিবারে পাও না কি নেমেছে ধুলার তলে হীন পতিতের ভগবান, অপমানে হতে হবে সেথা তোরে সবার সমান।দেখিতে পাও না তুমি মৃত্যুদূত দাঁড়ায়েছে দ্বারে, অভিশাপ আঁকি দিল তোমার জাতির অহংকারে। সবারে না যদি ডাক’, এখনো সরিয়া থাক’, আপনারে বেঁধে রাখ’ চৌদিকে জড়ায়ে অভিমান– মৃত্যুমাঝে হবে তবে চিতাভস্মে সবার সমান।
http://kobita.banglakosh.com/archives/487.html
3329
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নীল বায়লেট নয়ন দুটি করিতেছে ঢলঢল
প্রেমমূলক
নীল বায়লেট নয়ন দুটি করিতেছে ঢলঢল রাঙা গোলাপ গাল দুখানি, সুধায় মাখা সুকোমল। শুভ্র বিমল করকমল ফুটে আছে চিরদিন! হৃদয়টুকু শুষ্ক শুধু পাষাণসম সুকঠিন!Heinrich Hein (অনুবাদ কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nil-byolet-noyon-duti-koritese-dholdhol/
3690
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মনে মনে দেখলুম
চিন্তামূলক
মনে মনে দেখলুম সেই দূর অতীত যুগের নিঃশব্দ সাধনা যা মুখর ইতিহাসকে নিষিদ্ধ রেখেছে আপন তপস্যার আসন থেকে। দেখলেম দুর্গম গিরিব্রজে কোলাহলী কৌতূহলী দৃষ্টির অন্তরালে অসূর্যম্পশ্য নিভৃতে ছবি আঁকছে গুণী গুহাভিত্তির 'পরে, যেমন অন্ধকার পটে সৃষ্টিকার আঁকছেন বিশ্বছবি। সেই ছবিতে ওরা আপন আনন্দকেই করেছে সত্য, আপন পরিচয়কে করেছে উপেক্ষা, দাম চায়নি বাইরের দিকে হাত পেতে, নামকে দিয়েছে মুছে। হে অনামা, হে রূপের তাপস, প্রণাম করি তোমাদের। নামের মায়াবন্ধন থেকে মুক্তির স্বাদ পেয়েছি তোমাদের এই যুগান্তরের কীর্তিতে। নাম-ক্ষালন যে পবিত্র অন্ধকারে ডুব দিয়ে তোমাদের সাধনাকে করেছিলে নির্মল, সেই অন্ধকারের মহিমাকে আমি আজ বন্দনা করি। তোমাদের নিঃশব্দ বাণী রয়েছে এই গুহায়, বলছে--নামের পূজার অর্ঘ্য, ভাবীকালের খ্যাতি, সে তো প্রেতের অন্ন; ভোগশক্তিহীন নিরর্থকের কাছে উৎসর্গ-করা। তার পিছনে ছুটে সদ্য বর্তমানের অন্নপূর্ণার পরিবেষণ এড়িয়ে যেয়ো না, মোহান্ধ। আজ আমার দ্বারের কাছে শজনে গাছের পাতা গেল ঝ'রে, ডালে ডালে দেখা দিয়েছে কচি পাতার রোমাঞ্চ; এখন প্রৌঢ় বসন্তের পারের খেয়া চৈত্রমাসের মধ্যস্রোতে; মধ্যাহ্নের তপ্ত হাওয়ায় গাছে গাছে দোলাদুলি; উড়তি ধুলোয় আকাশের নীলিমাতে ধূসরের আভাস, নানা পাখির কলকাকলিতে বাতাসে আঁকছে শব্দের অস্ফুট আলপনা। এই নিত্য-বহমান অনিত্যের স্রোতে আত্মবিস্মৃত চলতি প্রাণের হিল্লোল; তার কাঁপনে আমার মন ঝলমল করছে কৃষ্ণচূড়ার পাতার মতো। অঞ্জলি ভরে এই তো পাচ্ছি সদ্য মুহূর্তের দান, এর সত্যে নেই কোনো সংশয়, কোনো বিরোধ। যখন কোনোদিন গান করেছি রচনা, সেও তো আপন অন্তরে এইরকম পাতার হিল্লোল, হাওয়ার চাঞ্চল্য, রৌদ্রের ঝলক, প্রকাশের হর্ষবেদনা। সেও তো এসেছে বিনা নামের অতিথি, গর-ঠিকানার পথিক। তার যেটুকু সত্য তা সেই মুহূর্তেই পূর্ণ হয়েছে, তার বেশি আর বাড়বে না একটুও, নামের পিঠে চড়ে। বর্তমানের দিগন্তপারে যে-কাল আমার লক্ষ্যের অতীত সেখানে অজানা অনাত্মীয় অসংখ্যের মাঝখানে যখন ঠেলাঠেলি চলবে লক্ষ লক্ষ নামে নামে, তখন তারি সঙ্গে দৈবক্রমে চলতে থাকবে বেদনাহীন চেতনাহীন ছায়ামাত্রসার আমারো নামটা, ধিক থাক্‌ সেই কাঙাল কল্পনার মরীচিকায়। জীবনের অল্প কয়দিনে বিশ্বব্যাপী নামহীন আনন্দ দিক আমাকে নিরহংকার মুক্তি। সেই অন্ধকারকে সাধনা করি যার মধ্যে স্তব্ধ বসে আছেন বিশ্বচিত্রের রূপকার, যিনি নামের অতীত, প্রকাশিত যিনি আনন্দে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mna-mna-daklum/
3623
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বুধু
ছড়া
মাঠের শেষে গ্রাম, সাতপুরিয়া নাম। চাষের তেমন সুবিধা নেই কৃপণ মাটির গুণে, পঁয়ত্রিশ ঘর তাঁতির বসত, ব্যাবসা জাজিম বুনে। নদীর ধারে খুঁড়ে খুঁড়ে পলির মাটি খুঁজে গৃহস্থেরা ফসল করে কাঁকুড়ে তরমুজে ঐখানেতে বালির ডাঙা, মাঠ করছে ধু ধু, ঢিবির 'পরে বসে আছে গাঁয়ের মোড়াল বুধু। সামনে মাঠে ছাগল চরছে ক'টা-- শুকনো জমি, নেইকো ঘাসের ঘটা। কী যে ওরা পাচ্ছে খেতে ওরাই সেটা জানে, ছাগল ব'লেই বেঁচে আছে প্রাণে। আকাশে আজ হিমের আভাস, ফ্যাকাশে তার নীল, অনেক দূরে যাচ্ছে উড়ে চিল। হেমন্তের এই রোদ্‌দুরটা লাগছে অতি মিঠে, ছোটো নাতি মোগ্‌লুটা তার জড়িয়ে আছে পিঠে। স্পর্শপুলক লাগছে দেহে, মনে লাগছে ভয়-- বেঁচে থাকলে হয়। গুটি তিনটি মরে শেষে ঐটি সাধের নাতি, রাত্রিদিনের সাথি! গোরুর গাড়ির ব্যাবসা বুধুর চলছে হেসে-খেলেই, নাড়ি ছেঁড়ে এক পয়সা খরচ করতে গেলেই। কৃপণ ব'লে গ্রামে গ্রামে বুধুর নিন্দে রটে, সকালে কেউ নাম করে না উপোস পাছে ঘটে। ওর যে কৃপণতা সে তো ঢেলে দেবার তরে, যত কিছু জমাচ্ছে সব মোগ্‌লু নাতির 'পরে। পয়সাটা তার বুকের রক্ত, কারণটা তার ঐ-- এক পয়সা আর কারো নয় ঐ ছেলেটার বই। না খেয়ে, না প'রে, নিজের শোষণ ক'রে প্রাণ যেটুকু রয় সেইটুকু ওর প্রতি দিনের দান। দেব্‌তা পাছে ঈর্ষাভরে নেয় কেড়ে মোগ্‌লুকে, আঁকড়ে রাখে বুকে। এখনো তাই নাম দেয়নি, ডাক নামেতেই ডাকে, নাম ভাঁড়িয়ে ফাঁকি দেবে নিষ্ঠুর দেব্‌তাকে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/vudu/
5383
শ্রীজাত
বর্ষার
প্রেমমূলক
সোনা, তোমায় সাহস করে লিখছি। জানি বকবে প্রিপারেশন হয়নি কিচ্ছু। বসছি না পার্ট টুতে মাথার মধ্যে হাজারখানেক লাইন ঘুরছে, লাইন এক্ষুনি খুব ইচ্ছে করছে তোমার সঙ্গে শুতেচুল কেটে ফেলেছ? নাকি লম্বা বিনুনিটাই এপাশ ওপাশ সময় জানায় পেন্ডুলামের মতো দেখতে পাচ্ছি স্কুলের পথে রেলওয়ে ক্রসিং-এ ব্যাগ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছ শান্ত, অবনতএখানে ঝড় হয়ে গেল কাল। জানলার কাচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছিল সবার নোংরা বিছানায় তুলতে গিয়ে হাত কেটেছে। আমার না, অঞ্জনের একেকজনের রক্ত আসে একেক ঝাপটায়সবাই বলছে আজও নাকি দেদার হাঙ্গামা বাসে আগুন, টিয়ার গ্যাস, দোকান ভাঙচুর কিন্তু আমি কোনও আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি না বৃষ্টি এসে টিনের ছাদে বাজাচ্ছে সন্তুর…ঝালা চলছে। ঘোড়া যেমন সমুদ্রে দৌড়য় ভেতর-ভেতর পাগল, কিন্তু সংলাপে পোশাকি… তুমিই উড়ান দিও, আমার ওড়ার গল্প শেষ পালক বেচি, আমিও এখন এই শহরের পাখি
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%9a%e0%a6%bf%e0%a6%a0%e0%a6%bf-%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%a4/
5485
সুকান্ত ভট্টাচার্য
নিবৃত্তির পূর্বে
মানবতাবাদী
দুর্বল পৃথিবী কাঁদে জটিল বিকারে, মৃত্যুহীন ধমনীর জ্বলন্ত প্রলাপ; অবরুদ্ধ বে তার উন্মাদ তড়িৎ; নিত্য দেখে বিভীষিকা পূর্ব অভিশাপ।ভয়ার্ত শোণিত-চক্ষে নামে কালোছায়া, রক্তাক্ত ঝটিকা আনে মূর্ত শিহরণ দিক্প্রান্তে শোকাতুরা হাসে ক্রূর হাসি, রোগগ্রস্ত সন্তানের অদ্ভুত মরণ।দৃষ্টিহীন আকাশের নিষ্ঠুর সান্ত্বনাঃ ধূ-ধূ করে চেরাপুঞ্জি- সহিষ্ণু হৃদয়। ক্লান্তিহারা পথিকের অরণ্য ক্রন্দনঃ নিশীথে প্রেতের বুকে জাগে মৃত্যুভয়।।
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/nibrittir-purbe/
82
আবিদ আনোয়ার
পাথরে গজানো ফুল
রূপক
নিরালা বাড়ির পুকুরের ঘাটে স্নানরতা রাঙা নিবিড় বউয়ের মতো তোমার কবিতা ডুব দিয়ে ওঠে রূপনারাণের জলে, যদিও অমোঘ নিজেকেও ফাড়ো দ্বিধার করাতকলে।হয়তো বা খোঁজো কালের নালী-ঘা ঘেঁয়ো মাছিদের মতো, নিবিষ্ট মনে ঘেঁটে-ঘুঁটে দেখো শতকের পচা মল, তবু চাও পূত জলাঙ্গী থেকে ক’ফোঁটা ঝরুক চেতনার ক্ষতে বিশুদ্ধতার জল।তোমার কবিতা কংক্রিটে ঘাস, পাথরে গজানো ফুল, ভেনাসের কানে যত্নে পরানো খেঁদির কানের দুল।
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/pathore-gojano-phul/
1973
বিনয় মজুমদার
মুকুরে প্রতিফলিত
প্রেমমূলক
মুকুরে প্রতিফলিত সূর্যালোক স্বল্পকাল হাসে | শিক্ষায়তনের কাছে হে নিশ্চল, স্নিগ্ধ দেবদারু জিহ্বার উপরে দ্রব লবণের মত কণা-কণা কী ছড়ায়, কে ছড়ায় ; শোনো, কী অস্ফুট স্বর, শোনো ‘কোথায়, কোথায় তুমি, কোথায় তোমার ডানা, শ্বেত পক্ষীমাতা, এই যে এখানে জন্ম, একি সেই জনশ্রুত নীড় না মৃত্তিকা? নীড় না মৃত্তিকা পূর্ণ এ অস্বচ্ছ মৃত্যুময় হিমে…’ তুমি বৃক্ষ, জ্ঞানহীন, মরণের ক্লিষ্ট সমাচার জানো না, এখন তবে স্বর শোনো,অবহিতহও | সুস্থ মৃত্তিকার চেয়ে সমুদ্রেরাকত বেশি বিপদসংকুল তারো বেশি বিপদের নীলিমায় প্রক্ষালিত বিভিন্ন আকাশ, এ-সত্য জেনেও তবু আমরা তো সাগরে আকাশে সঞ্চারিত হ’তে চাই, চিরকাল হ’তে অভিলাষী, সকল প্রকার জ্বরে মাথা ধোয়া আমাদের ভালো লাগে ব’লে | তবুও কেন যে আজো, হায় হাসি, হায় দেবদারু, মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়!
http://kobita.banglakosh.com/archives/4044.html
1715
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
হ্যালো দমদম
রূপক
আমার হাতের মধ্যে টেলিফোন; আমার পায়ের কাছে খেলা করছে সূর্যমণি মাছেরা। পিচ-বাঁধানো সড়কের উপর দিয়ে নৌকো চালিয়ে আমি পৃথিবীর তিন-ভাগ জল থেকে এক-ভাগ ডাঙায় যাব। সেই নৌকোর জন্যে আমি বসে আছি; আর, পাঁচ মিনিট পরপর ডায়াল ঘুরিয়ে চিৎকার করছি: হ্যালো দমদম…হ্যালো দমদম…হ্যালো… আমার মাথার উপরে জ্বলছে নিয়ন-বাতি; আর আমার গোড়ালির চারপাশে চক্কর মেরে হাঁটুর কাছে উঠে আসছে মোহেনজোদড়োর নর্দমা থেকে উপচে-পড়া নোংরা কালো জলস্রোত। আমার দেওয়ালে ফুটেছে সাইকেডেলিক ছবি। সেই ছবির দিকে তাকিয়ে আমি ভাবতে থাকি যে, আমার জুঁইলতা এখন পাঁচ ফুট জলের তলায় ফুল ফোটাচ্ছে। কিন্তু খুব-বেশি ভাবনা-চিন্তার সময় আমি পাই না। আচমকা আমার মনে পড়ে যায় যে, দমদম-থানা থেকে একটা রেস্‌ক্যু-বোট আসবে। সেই প্রতিশ্রুত উদ্ধারের জন্য পুনশ্চ আমি চেঁচাতে থাকি; হ্যালো দমদম…হ্যালো দমদম…হ্যালো… জল ঠেলে আমি শোবার ঘরে আসি। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে আমার মেয়ের গা। তার টেম্পারেচার নিয়ে, জল ঠেলে, আমি আবার টেলিফোনের কাছে ফিরে যাই। সেই অবসরে, দরজা খোলা পেয়ে, রাজ্যের কচুরিপানা ও একটা নেড়িকুত্তা সাঁতার কেটে আমার ড্রইংরুমে এসে ঢোকে। আমি বিস্মিত হই না। কচুরিপানার ফুলগুলিকে আমি ফ্লাওয়ার-ভাসে সাজিয়ে রাখি, এবং নেড়িকুত্তাটিকে খুব যত্ন করে আমার সোফার উপরে বসাই। তারপর টেলিফোনের মাউথপিসটাকে তার মুখের কাছে এগিয়ে দিয়ে বলি, “যদি বাঁচতে চাস হারামজাদা তা হলে আয়, আমার সঙ্গে গলা মিলিয়ে বল: হ্যালো দমদম…হ্যালো দমদম…হ্যালো…”
https://banglarkobita.com/poem/famous/1603
3660
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভারতের কোন্‌ বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্তি তুমি
ভক্তিমূলক
ভারতের কোন্‌ বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্তি তুমি হে আচার্য জগদীশ। কী অদৃশ্য তপোভূমি বিরচিলে এ পাষাণনগরীর শুষ্ক ধূলিতলে। কোথা পেলে সেই শান্তি এ উন্মত্ত জনকোলাহলে যার তলে মগ্ন হয়ে মুহূর্তে বিশ্বের কেন্দ্র-মাঝে দাঁড়াইলে একা তুমি– এক যেথা একাকী বিরাজে সূর্যচন্দ্র পুষ্পপত্র-পশুপক্ষী-ধুলায়-প্রস্তরে– এক তন্দ্রাহীন প্রাণ নিত্য যেথা নিজ অঙ্ক-‘পরে দুলাইছে চরাচর নিঃশব্দ সংগীতে। মোরা যবে মত্ত ছিনু অতীতের অতিদূর নিষ্ফল গৌরবে– পরবস্ত্রে, পরবাক্যে, পরভঙ্গিমার ব্যঙ্গরূপে কল্লোল করিতেছিনু স্ফীতকন্ঠে ক্ষুদ্র অন্ধকূপে– তুমি ছিলে কোন্‌ দূরে। আপনার স্তব্ধ ধ্যানাসন কোথায় পাতিয়াছিলে। সংযত গম্ভীর করি মন ছিলে রত তপস্যায় অরূপরশ্মির অন্বেষণে লোকলোকান্তের অন্তরালে — যেথা পূর্ব ঋষিগণে বহুত্বের সিংহদ্বার উদ্‌ঘাটিয়া একের সাক্ষাতে দাঁড়াতেন বাক্যহীন স্তম্ভিত বিস্মিত জোড়হাতে। হে তপস্বী, ডাকো তুমি সামমন্ত্রে জলদগর্জনে, “উত্তিষ্ঠত নিবোধত!’ ডাকো শাস্ত্র-অভিমানী জনে পাণ্ডিত্যের পণ্ডতর্ক হতে। সুবৃহৎ বিশ্বতলে ডাকো মূঢ় দাম্ভিকেরে। ডাক দাও তব শিষ্যদলে, একত্রে দাঁড়াক তারা তব হোমহুতাগ্নি ঘিরিয়া। আরবার এ ভারত আপনাতে আসুক ফিরিয়া নিষ্ঠায়, শ্রদ্ধায়, ধ্যানে– বসুক সে অপ্রমত্তচিতে লোভহীন দ্বন্দ্বহীন শুদ্ধ শান্ত গুরুর বেদীতে  (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/varoter-kon-briddho-hrishir-torun-murti-tumi/
5022
শামসুর রাহমান
বিকল্প
প্রেমমূলক
যখন আমার কেউ থাকে না, তখনও সে থাকে। সকল সময় ওর ঠোঁটে শরতের রোদ্দুরের মতো হাসি জড়ানো। ওর ঘন কালো চুলের বিন্যাস কখনো বিপর্যস্ত; শরীরের ঢেউ স্বপ্নের নক্‌শা আঁকে অবিরত সন্ধ্যার আবছা স্বপ্নাভায়, রাত্রির স্তব্ধতায়। তার কাছে যেন আমি প্রার্থনা করি ভালোবাসবার অবসর এবং অমিতরায়ের ধরনে তার কানে কানে বলি, আমার ভালোবাসা নয় ঘড়ার জল, ওতে আছে দিঘির সাঁতার। আমাদের ভালোবাসাবাসি শেষ অব্দি টিকবে কিনা জানিনা, তবে এই মুহূর্তগুলি সত্যের জ্যোর্তবলয়ে ঘূর্ণ্যমান। ওকে নিয়ে পার্কে বেড়াই বিকেল বেলা, ফুচকা, চটপটি খাই, মাঝে-মধ্যে রেঁস্তরার কেবিনে বসি; পায়ে পা ঘষি, চুমু চুমু খেলা খেলি, একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমীর গ্রন্থমেলায় যাই, কখনো পাশাপাশি হাঁটি মীনাবাজারে।কোনো কোনো মধ্যরাতে দেয়াল থেকে নামিয়ে আনি তাকে, চোখে তুলে নিই, আলিঙ্গন করি বারবার। তখন হঠাৎ আমার ভেতর জেগে ওঠে পাগলা মেহের আলি।   (অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bikolpo/
4929
শামসুর রাহমান
পুরাণ
মানবতাবাদী
হে পিতৃপুরুষবর্গ তোমরা মহৎ ছিলে জানি, রূপদক্ষ কীর্তির প্রভাবে আজো পাতঃস্মরণীয়, সে কথা বিশ্বাস করি। যে-প্রাসাদ করেছো নির্মাণ প্রজ্ঞায় অক্লান্ত শ্রমে, জোগায় তা কতো ভ্রাম্যমাণ চোখের আনন্দ নিত্যঃ অতীতের ডালপালা এসে চোখে-মুখে লাগে আর ফুটে ওঠে সৃষ্টির বিস্ময়।আরো গাঢ় অন্ধকারে ভিজিয়ে শরীর পেঁচা, কাক অথবা বাদুড় আসে শূন্য কক্ষে বিশাল প্রাসাদে উত্তরাধিকারী খোঁজে, কিন্তু কিছুতেই কোনোখানে মানবের কণ্ঠস্বর হয় না ধ্বনিত। অলিন্দের অন্ধকারে ওড়ে শুধু কয়েকটি দারুণ অস্থির চামচিকে। লেপ্‌টে থাকে দুর্বোধ আতঙ্ক স্তব্ধতায়।দূরত্ব বজায় রেখে দেখে সব খিলান, গম্বুজ ইত্যাদিতে জমেছে শ্যাওলা আর সিংহ দরজায় হিংসুক সময় তার বসিয়েছে থাবা। প্রশংসিত কীর্তিস্তম্ভে ঝরে যাচ্ছে বহু প্রতিবিম্ব পুরাণেরঃ বিধ্বস্ত ভাঁড়ার ঘরে অতীতের সারসত্য, সব ভাবনাকে আনায়াসে খুঁটে খায় ইঁদুর, আরশোলা।হে পিতৃপুরুষবর্গ আমাকে ভেবো না দোষী যদি এ প্রাসাদ বসবাসযোগ্য মনে না-হয় আমার,- কেন না এ-সৌধ আর মরচে-পড়া তালার বাহার করে না বহন কোনো অর্থ অন্তত আমার কাছে। তোমাদের কারুকাজে শ্রদ্ধা অবিচল, কিন্তু বলো- কী করে পিতার শব কাঁধে বয়ে বেড়াই সর্বদা?আমাকে জড়ায় সত্য, অর্ধসত্য কিংবা প্রবচন, তবু জানি কিছুতে মজে না মন বাতিল পরাণে।   (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/puran/
1947
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বৃষ্টি
মানবতাবাদী
চল নামি-আষাঢ় আসিয়াছে-চল নামি। আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃষ্টিবিন্দু, একা এক জনে যূথিকাকলির শুষ্ক মুখও ধুইতে পারি না-মল্লিকার ক্ষুদ্র হৃদয় ভরিতে পারি না। কিন্তু আমরা সহস্র সহস্র, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি,-মনে করিলে পৃথিবী ভাসাই। ক্ষুদ্র কে? দেখ, যে একা, সেই ক্ষুদ্র, সেই সামান্য। যাহার ঐক্য নাই, সেই তুচ্ছ। দেখ, ভাই সকল কেহ একা নামিও না-অর্দ্ধপথে ঐ প্রচণ্ড রবির কিরণে শুকাইয়া যাইবে,-চল, সহস্রে সহস্রে, লক্ষে লক্ষে, অর্ব্বুদে, অর্ব্বুদে এই বিশোষিতা পৃথিবী ভাসাইব। পৃথিবী ভাসাইব। পর্ব্বতের মাথায় চড়িয়া, তাহার গলা ধরিয়া, বুকে পা দিয়া, পৃথিবীতে নামিব ; নির্ঝরপথে স্ফটিক হইয়া বাহির হইব। নদীকূলের শূন্যহৃদয় ভরাইয়া, তাহাদিগকে রূপের বসন পরাইয়া, মহাকল্লোলে ভীম বাদ্য বাজাইয়া, তরঙ্গের উপর তরঙ্গ মারিয়া, মহারঙ্গে ক্রীড়া করিব। এসো, সবে নামি। কে যুদ্ধ দিবে-বায়ু। ইস! বায়ুর ঘাড়ে চড়িয়া দেশ দেশান্তরে বেড়াইব। আমাদের এ বর্ষাযুদ্ধে বায়ু ঘোড়া মাত্র ; তাহার সাহায্য পাইলে স্থলে জলে এক করি। তাহার সাহায্য পাইলে, বড় বড় গ্রাম অট্টালিকা, পোত মুখে করিয়া ধুইয়া লইয়া যাই। তাহার ঘাড়ে চড়িয়া, জানালা লোকের ঘরে ঢুকি। যুবতীর যত্ননির্ম্মিত শয্যা ভিজাইয়া দিই-সুষুপ্ত সুন্দরীর গায়ের উপর গা ঢালি। বায়ু! বায়ু ত আমাদের গোলাম। দেখ ভাই, কেহ একা নামিও না-ঐক্যেই বল-নহিলে আমরা কেহ নাই। চল-আমরা ক্ষুদ্র বৃষ্টিবিন্দু-কিন্তু পৃথিবী রাখিব। শস্যক্ষেত্রে শস্য জন্মাইব-মনুষ্য বাঁচিবে। নদীতে নৌকা চালাইব-মনুষ্যের বাণিজ্য বাঁচিবে। তৃণ লতা বৃক্ষাদির পুষ্টি করিব-পশু পক্ষী কীট পতঙ্গ বাঁচিবে। আমরা ক্ষুদ্র বৃষ্টিবিন্দু-আমাদের সমান কে? আমরাই সংসার রাখি। তবে আয়, ডেকে ডেকে, হেঁকে হেঁকে, নবনীল কাদম্বিনী! বৃষ্টিকুলপ্রসূতি! আয় মা দিঙ্মণ্ডলব্যাপিনী ; সৌরতেজঃসংহারিণি! এসো এসো গগনমণ্ডল আচ্ছন্ন কর, আমরা নামি! এসো ভগিনি সুচারুহাসিনি চঞ্চলে! বৃষ্টিকুলমুখ আলো কর! আমরা ডেকে ডেকে, হেসে হেসে, নেচে নেচে, ভূতলে নামি। তুমি বৃত্রমর্ম্মভেদী বজ্র, তুমিও ডাক না –এ উৎসবে তোমার মতো বাজান কে‌ ? ‌তুমিও ভূতেল পড়িবে? পড়, কিন্তু কেবল গর্ব্বোন্নতের মস্তকের উপর পড়িও। এই ক্ষুদ্র পরোপকারী শস্যমধ্যে পড়িও না-আমরা তাহাদের বাঁচাইতে যাইতেছি। ভাঙ্গ ত এই পর্ব্বতশৃঙ্গ ভাঙ্গ ; পোড়াও ত ঐ উচ্চ দেবালয়চূড়া পোড়াও। ক্ষুদ্রকে কিছু বলিও না-আমরা ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্রের জন্য আমাদের বড় ব্যথা। দেখ, দেখ, আমাদের দেখিয়া আহ্লাদ দেখ! গাছপালা মাথা নাড়িতেছে-নদী দুলিতেছে, ধান্যক্ষেত্র মাথা নামাইয়া প্রণাম করিতেছে-চাষা চষিতেছে-ছেলে ভিজিতেছে-কেবল বেনে বউ আমসী ও আমসত্ত্ব লইয়া পলাইতেছে। মর্ পাপিষ্ঠা! দুই একখানা রেখে যা না-আমরা খাব। দে, মাগীর কাপড় ভিজিয়ে দে। আমরা জাতিতে জল, কিন্তু রঙ্গরস জানি। লোকের চাল ফুটা করিয়া ঘরে উঁকি মারি-দম্পতির গৃহে ছাদ ফুটা করিয়া টু দিই। যে পথে সুন্দর বৌ জলের কলসী লইয়া যাইবে, সেই পথে পিছল করিয়া রাখি। মল্লিকার মধু লইয়া গিয়া, ভ্রমরের অন্ন মারি। মুড়ি মুড়কির দোকান দেখিলে প্রায় ফলার মাখিয়া দিয়া যাই। রামী চাকরাণী কাপড় শুকুতে দিলে, প্রায় তাহার কাজ বাড়াইয়া রাখি। ভণ্ড বামুনের জন্য আচমনীয় যাইতেছে দেখিলে, তাহার জাতি মারি। আমরা কি কম পাত্র! তোমরা সবাই বল-আমরা রসিক। তা যাক্-আমাদের বল দেখ। দেখ, পর্ব্বতকন্দর, দেশ প্রদেশ ধুইয়া লইয়া, নূতন দেশ নির্ম্মান বিশীর্ণা সূত্রাকারা তটিনিকে কূলপ্লাবিনী দেশমজ্জিনী অনন্তদেহধারিণী অনন্ত তরঙ্গিণী জলরাক্ষসী করিব। কোন দেশের মানুষ রাখিব-কোন দেশের মানুষ মারিব-কত জাহাজ বহিব, কত জাহাজ ডুবাইব-পৃথিবী জলময় করিব-অথচ আমরা কি ক্ষুদ্র! আমাদের মত ক্ষুদ্র কে? আমাদের মত বলবান্ কে?
https://banglarkobita.com/poem/famous/934
3393
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাহাড়ের নীলে আর দিগন্তের নীলে
প্রকৃতিমূলক
পাহাড়ের নীলে আর দিগন্তের নীলে শূন্যে আর ধরাতলে মন্ত্র বাঁধে ছন্দে আর মিলে। বনেরে করায় স্নান শরতের রৌদ্রের সোনালি। হলদে ফুলের গুচ্ছে মধু খোঁজে বেগুনি মৌমাছি। মাঝখানে আমি আছি, চৌদিকে আকাশ তাই দিতেছে নিঃশব্দ করতালি। আমার আনন্দে আজ একাকার ধ্বনি আর রঙ, জানে তা কি এ কালিম্পঙ। ভান্ডারে সঞ্চিত করে পর্বতশিখর অন্তহীন যুগ-যুগান্তর। আমার একটি দিন বরমাল্য পরাইল তারে, এ শুভ সংবাদ জানাবারে অন্তরীক্ষে দুর হতে দুরে অনাহত সুরে প্রভাতে সোনার ঘণ্টা বাজে ঢঙ ঢঙ, শুনিছে কি এ কালিম্পঙ।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/paharay-nila-ar-diganta-nila/
4588
শামসুর রাহমান
কিংবদন্তী
মানবতাবাদী
ধারে কাছেই একটা বাড়ি মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে রোজ নিরিবিলি চাইতো যেতে। কিন্তু আমার হয় না যাওয়া কোনোদিনই। ফটকে নেই দৈত্যপানা মুখের মানুষ, কুকুর টুকুর নেইকো কিছুই; সকালবেলা কিংবা কোনো রক্তজবা-কমান গোধূলিতে কিংবা ঝোড়ো হাওয়ার রাতে সেই বাড়িতে তবু আমার হয় না যাওয়া কোনোদিনই।সেই বাড়িতে থাকে যারা, নয়তো তারা শত্রু আমার। তীক্ষ্ম ছুরি, কিংবা ধরো বিষের পাত্র আমার জন্যে রাখে না কেউ। কিন্তু তবু এই আমিটার সত্যিমিথ্যে সেখানে হায় হয় না যাওয়া কোনোদিনই। সেখানে এক নিরুপমা বসত করে চারদেয়ালের অন্তরালে। সুরের মিহি নকশা দিয়ে সাজায় প্রহর মনের মতো, শূন্যে ফোটায় রক্তগোলাপ হৃদয় যেন। গাছের পাতায় আদর রাখে ইতস্তত। শেখায় কথা কেমন সুরে দাঁড়ের সবুজ পাখিটাকে। নিরুপমার ভোরের মতো হাসির ছটায় দেয়ালগুল এক পলকে উৎসবেরই নামান্তর। কখনো ফের সেই বাড়িটা রাত্রিমাখা উদাসী এক মেঘ হ’য়ে যায় যখন সে তার কান্নাপাওয়া শরীরটাকে দেয় লুটিয়ে শূন্য খাটে। সিংদরজায় অদৃশ্য দুই পশু আছে, তাদের মুখে লুপ্ত চাবি। কোন্‌ খাবারে তৃপ্ত কেবা, নেই কো জানা; তাইতো দুয়ার বন্ধ থাকে এবং আমার হয় না যাওয়া কোনোদিনই।   (আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kigbodonti/
4248
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
সন্ধ্যায় দিলো না পাখি
চিন্তামূলক
শালিখের ডাকে আমি হয়েছি বাহির রোজ ঘর থেকে পাতায় লুকায় সে যে ডেকে জনশূন্য অথচ নিবিড় এ-উঠানে শালিখেরই ভিড়!দুপুরে শালিখের হাতে ভাসিয়ে দিয়েছি অকস্মাতে চেতনার পাখা– ডাকের আড়ালে তার বেদনাই রাখা।সন্ধ্যায় দিলো না আর প্রতি ডাকে সারা শালিখের দল আমার জীবন যেন শ্রুতির নিষ্ফল প্রবাসের পাড়া সন্ধ্যায় দিলো না পাখি প্রতি ডাকে সাড়া।
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/shondhyay-dilo-na-pakhi/
1611
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
দেখা-শোনা, ক্বচিৎ কখনো
প্রেমমূলক
সর্বদা দেখি না, শুধু মাঝে-মাঝে দেখতে পাই। যেমন গভীর রাত্রে, অন্ধকারে, ক্বচিৎ কখনো দুঃখের তাপিত বুক, বুকের উন্মত্ত ওঠানামা করতলে ধরা পড়ে, যেমন সমস্ত কিছু আঙুলের চক্ষু দিয়ে দেখা যায়! সেইমতো। যে-শরীর কোথাও দেখিনি, তার নতজানু অর্পিত ভঙ্গিমা; যে-ওষ্ঠ কোথাও নেই, তার নিমন্ত্রণ; যে-কঙ্কণ কোথাও ছিল না, তার রিনিঠিনি; যে-আতর কোথাও বাসিনি, তার মাতাল সুবাস– সব দেখা যায়। সর্বদা শুনি না, শুধু মাঝে-মাঝে শুনতে পাই। যেমন বধির তার কব্জির ঘড়িকে কপালে ঠেকায়; ঠেকিয়ে, যন্ত্রের হৃৎপণ্ডের ধুকধুক ধ্বনি শুনে নেয়; যেমন ললাট-লিপি তা-ই তার। সেইমতো শ্রবণে পড়ে না ধরা যত কিছু, যা-কিছু। রাত্রির খরস্রোত প্রতীক্ষার বিশাল ধুকধুক। ঘন অন্ধকারে নয়নের তরল আগুন। যেন আগুলের মধ্যে যে বাসনা পুড়ে যাচ্ছে, এই মাত্র তার শব্দহীন অথচ বুকের-রক্ত-জমানো ভীষণ আর্তনাদ শোনা গেল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1638
3314
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিদ্রিতা
প্রেমমূলক
একদা রাতে নবীন যৌবনে স্বপ্ন হতে উঠিনু চমকিয়া, বাহিরে এসে দাঁড়ানু একবার--- ধরার পানে দেখিনু নিরখিয়া । শীর্ণ হয়ে এসেছে শুকতারা, পূর্বতটে হতেছে নিশিভোর । আকাশকোণে বিকাশে জাগরণ, ধরণীতলে ভাঙে নি ঘুমঘোর । সমুখে প'ড়ে দীর্ঘ রাজপথ, দু ধারে তারি দাঁড়ায়ে তরুসার, নয়ন মেলি সুদূর-পানে চেয়ে আপন-মনে ভাবিনু একবার--- অরুণ-রাঙা আজি এ নিশিশেষে ধরার মাঝে নূতন কোন্ দেশে দুগ্ধফেনশয়ন করি আলা স্বপ্ন দেখে ঘুমায়ে রাজবালা ।।অশ্ব চড়ি তখনি বাহিরিনু, কত যে দেশ বিদেশ হনু পার ! একদা এক ধূসরসন্ধ্যায় ঘুমের দেশে লভিনু পুরদ্বার । সবাই সেথা অচল অচেতন, কোথাও জেগে নাইকো জনপ্রাণী, নদীর তীরে জলের কলতানে ঘুমায়ে আছে বিপুল পুরীখানি । ফেলিতে পদ সাহস নাহি মানি, নিমেষে পাছে সকল দেশ জাগে । প্রাসাদ মাঝে পশিনু সাবধানে, শঙ্কা মোর চলিল আগে আগে । ঘুমায় রাজা, ঘুমায় রানীমাতা, কুমার-সাথে ঘুমায় রাজভ্রাতা । একটি ঘরে রত্নদীপ জ্বালা, ঘুমায়ে সেথা রয়েছে রাজবালা ।। কমলফুল বিমল শেজখানি, নিলীন তাহে কোমল তনুলতা । মুখের পানে চাহিনু অনিমেষে, বাজিল বুকে সুখের মত ব্যাথা । মেঘের মত গুচ্ছ কেশরাশি শিথান ঢাকি পড়েছে ভারে ভারে । একটি বাহু বক্ষ-'পরে পড়ি, একটি বাহু লুটায় এক ধারে । আঁচলখানি পড়েছে খসি পাশে, কাঁচলখানি পড়িবে বুঝি টুটি--- পত্রপুটে রয়েছে যেন ঢাকা অনাঘ্রাত পূজার ফুল দুটি । দেখিনু তারে, উপমা নাহি জানি--- ঘুমের দেশে স্বপন একখানি, পালঙ্কেতে মগন রাজবালা আপন ভরা লাবণ্যে নিরালা ।।ব্যাকুল বুকে চাপিনু দুই বাহু, না মানে বাধা হৃদয়কম্পন । ভূতলে বসি আনত করি শির মুদিত আঁখি করিনু চুম্বন । পাতার ফাঁকে আঁখির তারা দুটি, তাহারি পানে চাহিনু একমনে--- দ্বারের ফাঁকে দেখিতে চাহি যেন কী আছে কোথা নিভৃত নিকেতনে । ভূর্জপাতে কাজলমসী দিয়ে লিখিয়া দিনু আপন নামধাম । লিখিনু, 'অয়ি নিদ্রানিমগনা, আমার প্রাণ তোমারে সঁপিলাম ।' যতন করে কনক-সুতে গাঁথি রতন-হারে বাঁধিয়া দিনু পাঁতি--- ঘুমের দেশে ঘুমায়ে রাজবালা, তাহারি গলে পরায়ে দিনু মালা ।।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nidrita/
4804
শামসুর রাহমান
তোমার ঔদাস্য
প্রেমমূলক
ইদানীং তুমি বড় বেশি ঔদাস্যের কথা বলো, বড় বেশি তুমি খেলে যাচ্ছো ধুধু নির্লিপ্তির হাতে- যেন সূর্যরাজা তার অন্ধকার রাণীকে সপ্রাণ করে না চুম্বন আর, যেন দূর স্বপ্নের গাংচিল এখন তোমার চারপাশে ওড়াউড়ি ভুলে গেছে, কোনো ফুলে ঘ্রাণ নেই, সবচে সুস্বাদু ফলও খুব স্বাদহীন, এ রকম তোমার ধরন ইদানীং।যখন তোমার কণ্ঠস্বরে ঔদাস্যের ছায়া পড়ে, হু হু রুক্ষ প্রান্তরের দৃশ্যহীন দৃশ্যাবলী জাগে, অকস্মাৎ করোটির ভেতরে আমার চকচকে রেজরের মতো কিছু ভীষণ ঝিকিয়ে ওঠে আর স্বপ্নময় তারপুঞ্জ ছিন্নভিন্ন হয়। করোটিতে শত শত নামহীন কবরের ফলক এবং রাশি রাশি উন্মুখর ফুল, প্যাগোডার স্বর্ণচূড়ো,তিনটি বিবর্ণ তাস, পলায়নপর অশ্বপাল, ব্রোঞ্জস্থিত পরস্পর নানা স্বপ্ন বিনিময়কারী যমজ বিযার ক্যান প্রতিবেশী। ঔদাস্য তোমার তোমাকে বসিয়ে রাখে ভুল প্রত্যাশার পথপ্রান্তে, স্বপ্ন-বিবর্জিত হাহাকারময় বিজন সৈকতে। তোমার ঔদাস্য-মরু উজিয়ে সকাল দশটায় অথবা বিকেল পাঁচটায় কিংবা কোনো সন্ধ্যেবেলা যখনই তোমার কাছে যাবো বলে দর্পণে তাকাই শার্টের কলার ঠিক করে নিই, আড়চোখে দেখি শাদাকালো চুল, শিরাপুঞ্জে বেজে ওঠে কনসার্ট, কোন্‌ ইন্দ্রজালে এ আমার আটচল্লিশের মুখ আটাশের মুখ হয়ে যায়? সুদূর সুন্দরবন, চাটগাঁর কুঁজোপিঠ কাজল পাহাড়, সমুদ্রের ঢেউমালা সিলেটের টিলাস্থিত কোনো স্মৃতিময় প্রাচীন দুর্গের মতো বাড়ি, মন্টি-মন্টি প্রতিধ্বনি পরিপূর্ণ ঝিল, গাছপালা আর ঢাকার আকাশ ছাপিয়ে তোমারই মুখ উদ্ভাসিত আমার দৃষ্টিতে।যখন পাইনা দেখা, আমার নিকট থেকে তুমি যখন অনেক দূরে, তোমাকেই দেখি তন্বী গাছে, ফুলের আভায়, শস্যক্ষেতে, হরিণের মতো এই থমকে দাঁড়ানো গলিপথে আর আমার আপন করতলে, পাঁজরের মরুভূমি, চোখের সৈকতে। আমার এখনকার প্রতিটি কবিতা তার বুক উন্মোচন করে বলে,-এই তো এখানে তুমি আছো। তুমিহীনতায় প্রতিদিন আমার কবিতাবলী তুমিময় হয়, সেখানেই রোজ খুঁজবো তোমাকে, দেখবো দু’চোখ ভরে বহুবর্ণ বাক্যের ওপারে। কি উপমা কি উৎপ্রেক্ষা অথবা প্রতীক ইত্যাদির পরপারে তুমি আছো হৃদয়ের পরগণা জুড়ে।যতদিন বেঁচে আছি, থাকবে আমার কাছে তুমি চিরকাল হৃৎস্পন্দনের মতো, অবিচ্ছিন্ন কোনোযন্ত্রণার মতো সর্বক্ষণ। আপাতত ঔদাস্যের বিজন গেরুয়া প্রান্তে দাঁড়িয়ে একাকী ছায়াময় তোমার ভবিষ্যতের দিকে মুখ রেখে এ হৃদয় কেবলি ডাকতে থাকে আর্ত এক পাখির মতোন।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tomar-oudasyo/
3318
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নিন্দুকের দুরাশা
নীতিমূলক
মালা গাঁথিবার কালে ফুলের বোঁটায় ছুঁচ নিয়ে মালাকর দুবেলা ফোটায়। ছুঁচ বলে মনদুঃখে, ওরে জুঁই দিদি, হাজার হাজার ফুল প্রতিদিন বিঁধি, কত গন্ধ কোমলতা যাই ফুঁড়ে ফুঁড়ে কিছু তার নাহি পাই এত মাথা খুঁড়ে। বিধি-পায়ে মাগি বর জুড়ি কর দুটি ছুঁচ হয়ে না ফোটাই, ফুল হয়ে ফুটি। জুঁই কহে নিশ্বসিয়া, আহা হোক তাই, তোমারো পুরুক বাঞ্ছা আমি রক্ষা পাই।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ninduker-durasha/
5933
সৈয়দ শামসুল হক
তুমিই শুধু তুমি
স্বদেশমূলক
তোমার দেহে লতিয়ে ওঠা ঘন সবুজ শাড়ি। কপালে ওই টকটকে লাল টিপ। আমি কি আর তোমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারি? তুমি আমার পতাকা, আমার কৃষির বদ্বীপ।করতলের স্বপ্ন-আমন ধানের গন্ধ তুমি তুমি আমার চিত্রকলার তুলি। পদ্য লেখার ছন্দ তুমি−সকল শব্দভুমি। সন্তানের মুখে প্রথম বুলি।বুকে তোমার দুধের নদী সংখ্যা তেরো শত। পাহাড় থেকে সমতলে যে নামি−নতুন চরের মতো তোমার চিবুক জাগ্রত− তুমি আমার, প্রেমে তোমার আমি।এমন তুমি রেখেছ ঘিরে−এমন করে সব− যেদিকে যাই−তুমিই শুধু−তুমি! অন্ধকারেও নিঃশ্বাসে পাই তোমার অনুভব, ভোরের প্রথম আলোতেও তো তুমি!
https://www.bangla-kobita.com/shamsulhaque/tumi-e-shudhu-tumi/
5286
শামসুর রাহমান
সে এক মাটির ঘর
চিন্তামূলক
আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম এই শহরের অখ্যাত গলির এক মাটির ঘরে; এতকাল পরেও হঠাৎ যখন আমার হাত নিজের অজান্তেই নাকের কাছে এসে যায়, একটা মন-কেমন করা সোঁদা গন্ধ পাই। যে ঘরে প্রথম চোখ মেলেছিলাম কার্তিকের রৌদ্রে, সে-ঘরে পড়ত একটা গেয়ারা গাছের ছায়া, সে ছায়া এখনও ঘন হয়ে আছে আমার চোখে। এখনও পেয়ারা গাছের আনন্দিত সবুজ পাতাগুলি মর্মরিত আমার শিরায় শিরায়। গাছটার ডালে অনেক দূর থেকে-আসা পাখি যে সুর ঝরিয়ে দিত ঋতুতে-ঋতুতে তা’ এখনও খুব গুঞ্জরণময় স্মৃতিতে আমার। যে-ঘরে আমি জন্মেছিলাম তাকে কিছুতেই বলা যাবে না গানের ঘর। সে ঘরে সেতার কি সরোদ, এস্রাজ কি সারেঙ্গি গুমরে ওঠেনি কোনো দিন। কখনো বোল ফোটেনি তবলায় কিংবা কারো কণ্ঠে জাগেনি চমকিলা কোনো তানকারি। তবে ছেলেবেলায় আমাদের সরু গলিতে সেই কবে কোন মধ্যরাতে কে পথিক আমার মনের ভেতর সুদূর এক নদীতীরের ছবি জাগিয়ে হেঁটে গিয়েছিল, আজও মনে পড়ে। আজও কোনো-কোনো রাতে যখন আমার ঘুম আসে না কিংবা মন ভালো থাকে না, হঠাৎ আমি শুনতে পাই রাতের গলায় দরবারি কানাড়া, পায়ে স্বপ্নের নূপুর। এবং একজন মানুষের পুতুলনাচ ঝলসে ওঠে বারংবার। হ্যাঁ, চিনতে পারছি এঁকে; এই লোকটাই কৈশোরে চুল ছেঁটে দিত আমার সাবান, ফিটকিরি আর সস্তা পাউডারের ঘ্রাণময় সেলুনে। ওর মাথায় পাগড়ি, যুগল ভোজালির মতো উচ্চকিত গোঁফ, তার সালোয়ারের ভাঁজে ভাঁজে সুদূর পাহাড়ি কোনো দেশের নানা চিত্রকল্প।এখন আমার ঘর কাঁটা চুলের স্তূপে নিমজ্জিত; সেই স্তূপ থেকে এই মাত্র উঠে এলো এক নারী, যার গ্রীবায় মীরার ভজনের ছায়া, দু’চোখের যমজ গোলাপ, ওষ্ঠে চন্দ্রভস্ম। সে এক মাটির ঘরে প্রবেশ করে আস্তেসুস্থে আমার অভিলাষকে উসকে দিয়ে। কখনো দেখি, সে মাটির ঘরের দিকে স্মৃতি ফিরিয়ে দেখি, আমার আশার গুচ্ছ-গুচ্ছ মঞ্জরি ইলেকট্রিকের তারে আটকে-থাকা ঘুড়ির মতো ক্রমশ বিবর্ণ হচ্ছে, কখনোবা চাঁদকে বিশ্বাস করে দেখি পূর্ণিমা চাঁদের মতো টেবিলের দু’দিকে দু’জন নাবিক খেলছে রামি; একজনের চোখ থেকে ঝুলছে অত্যন্ত পাথুরে স্বপ্ন, অন্যজনের ঠোঁট থেকে ঝুলছে ঈগলের চঞ্চুর মতো পাইপ।মেশকে আম্বরের অস্পষ্ট ঘ্রাণময় আতরদানি, হুঁকোর দীঘল নল, পোষা পায়রা, তাকে-রাখা বিষাদসিন্ধু, একটি চোখ আমার নানার কণ্ঠনিঃসৃত সুবে-সাদেকের মতো আয়াত, নানীর দীর্ঘশ্বাসসমেত সেই মাটির ঘর এখন আমার উদরে। সেই ঘরের কথা ভাবতে গিয়ে আমি সে ঘর আর দেখি না।   (উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/se-ek-matir-ghor/
666
জয় গোস্বামী
জলহাওয়ার লেখা
প্রেমমূলক
স্নেহসবুজ দিন তোমার কাছে ঋণ বৃষ্টিভেজা ভোর মুখ দেখেছি তোর মুখের পাশে আলো ও মেয়ে তুই ভালো আলোর পাশে আকাশ আমার দিকে তাকা– তাকাই যদি চোখ একটি দীঘি হোক যে-দীঘি জ্যো‌ৎস্নায় হরিণ হয়ে যায় হরিণদের কথা জানুক নীরবতা– নীরব কোথায় থাকে জলের বাঁকে বাঁকে জলের দোষ? — নাতো! হাওয়ায় হাত পাতো! হাওয়ার খেলা? সেকি! মাটির থেকে দেখি! মাটিরই গুণ? — হবে! কাছে আসুক তবে! কাছে কোথায়? — দূর! নদী সমুদ্দুর সমুদ্র তো নোনা ছুঁয়েও দেখবো না ছুঁতে পারিস নদী– শুকিয়ে যায় যদি? শুকিয়ে গেলে বালি বালিতে জল ঢালি সেই জলের ধারা ভাসিয়ে নেবে পাড়া পাড়ার পরে গ্রাম বেড়াতে গেছিলাম গ্রামের কাছে কাছে নদীই শুইয়ে আছে নদীর নিচে সোনা ঝিকোয় বালুকণা সোনা খুঁজতে এসে ডুবে মরবি শেষে বেশ, ডুবিয়ে দিক ভেসে উঠবো ঠিক ভেসে কোথায় যাবো? নতুন ডানা পাবো নামটি দেবো তার সোনার ধান, আর বলবোঃ শোন, এই কষ্ট দিতে নেই আছে নতুন হাওয়া তোমার কাছে যাওয়া আরো সহজ হবে কত সহজ হবে ভালোবাসবে তবে? বলো কবে ভালোবাসবে?
http://kobita.banglakosh.com/archives/1683.html
2195
মহাদেব সাহা
নিসর্গের খুন
প্রকৃতিমূলক
এই প্রকৃতি একদিন আমাদের গ্রাস করবে জিরাফের মতো গ্রীবা বড়িয়ে অকস্মাৎ, কাঁঠালিচাপার বন, এই জ্যোৎস্নারাত অমলিন নিসর্গের শোভা হানাদার দস্যুর মতো ভয়ঙ্করভাবে ছুটে আসবে আমাদের দিকে,অবরোধ করবে ঘরবাড়ি, শস্যের গোলা খাদ্যভান্ডার লুট করে নিয়ে যাবে আমাদের মুখের গ্রাস ভেঙে ফেলবে যাতায়াতযোগ্য স্থলপথ, এই শান্ত চুপচাপ জলরাশি একদিন ধেয়ে আসবে আমাদের দিকে নিশিডাকাতের মতো ডাক ছেড়ে হামলা করবে চারদিক থেকে ঘিরে হত্যা করবে আমাদের , কেড়ে নেবে নগরকোটালের হাতের বাঁশি, বর্ম, মাথার টুপি, শাদা পোশাক সরল চাষার লণ্ডভণ্ড করবে খামার, শস্যক্ষেত নিশিরাতে গোয়াল থেকে খেদিয়ে নেবে গরুর পাল কালো খোঁয়াড়ে বন্দী করবে একে একে, লুটপাট করবে স্থানীয় মুদির দোকান, সারাগ্রাম কাঠমিন্ত্রির সাজসরঞ্জাম তছনঝ করবে, জলের স্বেচ্ছাচার ছিনিয়ে নেবে গৃহবাসী ভালোবাসা গোঁয়ার ট্রাকচালকদের মতো নিসর্গ আমাদের একদিন ফেলে দেবে গভীর খাদে যেখানে ধসে পড়বে আমাদের এই দিনরাত্রি শক্ত প্রাচীর, বড়ো বড়ো অট্টপালিকা মহেঞ্জোদাড়োর মতো ধ্বংস হবে আমাদের নগরসভ্যতা শাদা হাসপাতাল, পৌরসভা, পার্ক ও খেলার মাঠ বাঁধ ও সেতু ভেঙে আমাদের ভসিয়ে নেবে দুর্ধর্ষ প্লাবন, আকাশ আমাদের বিরুদ্ধে একদিন ষড়যন্ত্র করবে এই কাঁঠালিচাঁপার বন, জ্যোৎস্নারাত, পাখিডাকা নিসর্গ সমুদ্রের বেলাভূমি সবাই, এই আক্রমণকারী প্রকৃতির হাতে একে একে ধ্বংস হবো আমরা শিশু, বৃদ্ধ, যুবা নিসর্গের প্লানে ভাসবো অন্তহীন লাশ!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1471
5475
সুকান্ত ভট্টাচার্য
তারুণ্য
মানবতাবাদী
হে তারুণ্য, জীবনের প্রত্যেক প্রবাহ অমৃতের স্পর্শ চায়; অন্ধকারময় ত্রিকালের কারাগৃহ ছিন্ন করি’ উদ্দাম গতিতে বেদনা-বিদ্যুৎ-শিখা জ্বালাময় আত্মার আকাশে, ঊর্ধ্বমুখী আপনারে দগ্ধ করে প্রচণ্ড বিস্ময়ে। জীবনের প্রতি পদপে তাই বুঝি ব্যাথাবিদ্ধ বিষণ্ণ বিদায়ে। রক্তময় দ্বিপ্রহরে অনাগত সন্ধ্যার আভাসে তোমার অক্ষয় বীজ অঙ্কুরিত যবে বিষ-মগ্ন রাত্রিবেলা কালের হিংস্রতা কণ্ঠরোধ করে অবিশ্বাসে। অগ্নিময় দিনরাত্রি মোর; আমি যে প্রভাতসূর্য স্পর্শহীন অন্ধকারে চৈতন্যের তীরে উন্মাদ, সন্ধান করি বিশ্বের বন্যায় সৃষ্টির প্রথম সুর। বজ্রের ঝংকারে প্রচণ্ড ধ্বংসের বার্তা আমি যেন পাই। মুক্তির পুলক-লুব্ধ বেগে একী মোর প্রথম স্পন্দন! আমার বক্ষের মাঝে প্রভাতের অস্ফুট কাকলি, হে তারুণ্য, রক্তে মোর আজিকার বিদ্যুৎ-বিদায় আমার প্রাণের কণ্ঠে দিয়ে গেল গান; বক্ষে মোর পৃথিবীর সুর। উচ্ছ্বসিত প্রাণে মোর রোমাঞ্চিত আদিম উল্লাস। আমি যেন মৃত্যুর প্রতীক। তাণ্ডবের সুর যেন নৃত্যময় প্রতি অঙ্গে মোর, সম্মুখীন সৃষ্টির আশ্বাসে। মধ্যাহ্নের ধ্যান মোর মুক্তি পেল তোমার ইঙ্গিতে। তারুণ্যের ব্যর্থ বেদনায় নিমজ্জিত দিনগুলি যাত্রা করে সম্মুখের টানে। নৈরাশ্য নিঃশ্বাসে ক্সত তোমার বিশ্বাস প্রতিদিন বৃদ্ধ হয় কালের কর্দমে। হৃদয়ের সূক্ষ্ম তন্ত্রী সঙ্গীত বিহীন, আকাশের স্বপ্ন মাঝে রাত্রির জিজ্ঞাসা ক্ষয় হয়ে যায়। নিভৃত ক্রন্দনে তাই পরিশ্রান্ত সংগ্রামের দিন। বহ্নিময় দিনরাত্রি চক্ষে মোর এনেছে অন্তিম। ধ্বংস হোক, লুপ্ত হোক ক্ষুদিত পৃথিবী আর সর্পিল সভ্যতা। ইতিহাস স্তুতিময় শোকের উচ্ছ্বাস! তবু আজ তারুণ্যের মুক্তি নেই, মুমূর্ষু মানব। প্রাণে মোর অজানা উত্তাপ অবিরাম মুগ্ধ করে পুষ্টিকর রক্তের সঙ্কেতে! পরিপূর্ণ সভ্যতা সঞ্চয়ে আজ যারা রক্তলোভী বর্ধিত প্রলয় অন্বেষণে, তাদের সংহার করো মৃতের মিনতি। অন্ধ তমিস্রার স্রোতে দূরগামী দিন আসন্ন রক্তের গন্ধে মূর্ছিত সভয়ে। চলেছে রাত্রির যাত্রী আলোকের পানে দূর হতে দূরে। বিফল তারুণ্য-স্রোতে জরাগ্রস্ত কিশলয় দিন। নিত্যকার আবর্তনে তারুণ্যের উদ্‌গত উদ্যম বার্ধক্যের বেলাভূমি ‘পরে অতর্কিতে স্তব্ধ হয়ে যায়। তবু, হায়রে পৃথিবী, তারুণ্যের মর্মকথা কে বুঝাবে তোরে! কালের গহ্বরে খেলা করে চিরকাল বিস্ফোরণহীন। স্তিমিত বসন্তবেগ নিরুদ্দেশ যাত্রা করে জোয়ারের জলে। অন্ধকার, অন্ধকার, বিভ্রান্ত বিদায়; নিশ্চিত ধ্বংসের পথে ক্ষয়িষ্ণু পৃথিবী। বিকৃত বিশ্বের বুকে প্রকম্পিত ছায়া মরণের, নক্ষত্রের আহ্বানে বিহ্বল তারুণ্যের হৃৎপিণ্ডে বিদীর্ণ বিলাস। ক্ষুব্ধ অন্তরের জ্বালা, তীব্র অভিশাপ; পর্বতের বক্ষমাঝে নির্ঝর-গুঞ্জনে উৎস হতে ধবমান দিক্-চক্রবালে। সম্মুখের পানপাত্রে কী দুর্বার মোহ, তবু হায় বিপ্রলব্ধ রিক্ত হোমশিখা! মত্ততায় দিক্ভ্রান্তি, প্রাণের মঞ্জরী দক্ষিণের গুঞ্জরণে নিষ্ঠুর প্রলাপে অস্বীকার করে পৃথিবীরে। অলক্ষিতে ভূমিলগ্ন আকাশ কুসুম ঝরে যায় অস্পষ্ট হাসিতে। তারুণ্যের নীলরক্ত সহস্র সূর্যের স্রোতে মৃত্যুর স্পর্ধায় ভেসে যায় দিগন্ত আঁধারে। প্রত্যুষের কালো পাখি গোধূলির রক্তিম ছায়ায় আকাশের বার্তা নিয়ে বিনিদ্র তারার বুকে ফিরে গেল নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়। দিনের পিপাসু দৃষ্টি, রাত্রি ঝরে বিবর্ণ পথের চারিদিকে। ভয়ঙ্কর দিনরাত্রি প্রলয়ের প্রতিদ্বন্দ্বে লীন; তারুণ্যের প্রত্যেক আঘাতে কম্পমান উর্বর-উচ্ছেদ। অশরীরী আমি আজ তারুণ্যের তরঙ্গের তলে সমাহিত উত্তপ্ত শয্যায়। ক্রমাগত শতাব্দীর বন্দী আমি অন্ধকারে যেন খুঁজে ফিরি অদৃশ্য সূর্যের দীপ্তি উচ্ছিষ্ট অন্তরে। বিদায় পৃথিবী আজ, তারুণ্যের তাপে নিবদ্ধ পথিক-দৃষ্টি উদ্বুদ্ধ আকাশে, সার্থক আমার নিত্য-লুপ্ত পরিক্রমা ধ্বনিময় অনন্ত প্রান্তরে। দূরগামী আমি আজ উদ্বেলিত পশ্চাতের পানে উদাস উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি রেখে যাই সম্মুখের ডাকে। শাশ্বত ভাস্বর পথে আমার নিষিদ্ধ আয়োজন, হিমাচ্ছন্ন চক্ষে মোর জড়তার ঘন অন্ধকার। হে দেবতা আলো চাই, সূর্যের সঞ্চয় তারুণ্যের রক্তে মোর কী নিঃসীম জ্বালা! অন্ধকার অরণ্যের উদ্দাম উল্লাস লুপ্ত হোক আশঙ্কায় উদ্ধত মৃত্যুতে।।   (পূর্বাভাস কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/tarunyo/
5155
শামসুর রাহমান
যদি সে-পাখি বলে যেত
রূপক
হঠাৎ মধ্যরাতে কেন যে উধাও হল ঘুম, বুঝতে পারিনি। অনেকক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে অন্ধকার আর গাছের পাতাগুলোর কাঁপুনি দেখে নিজেকে কেন যেন ভীষণ অসহায় মনে হল। বুঝিবা জানালায় রাতজাগা এক পাখি এসে বসল।পাখিকে বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকতে দেখে ভাবলাম সে বুঝি বোবা। অথচ বেশ পরে ওর বেজায় খড়খড়ে স্বর শুনে নিজের ভুল গেল ভেঙে। ওর ওই নীরবতা এবং হঠাৎ প্রায় গর্জে-ওঠা শুনতে পেয়ে খানিক ভীত হয়ে পড়ি! কে এই পাখি? আমাকে করবে না তো আক্রমণ? কিছুক্ষণ আবার চোখ বন্ধ রেখে জানি না কিসের ভরসায় আবার দৃষ্টি মেলে ধরি। হঠাৎ পাখিটি কী ক’রে যে মধুর সুরে ডেকে ওঠে, কথা বলে মানবিক ভাষায়- বিস্ময়ে চমকে উঠে দিখে ওকে। হঠাৎ পাখি উড়ে চ’লে যায়-জানব না কখনও। শুধু ভাবব! ভাবছি এতকাল পরে আজও, যদি সে পাখি বলে যেত আমাকে জীবন আর কাব্যের নানা সমস্যার সমাধন তা হ’লে খেদ যেত ডুবে আক্ষেপের শত ঢিল। এখনও হাতে কলম নিয়ে কী দিনে কী রাতে কাগজে আঁচড় কাটি; জানি না কখনও সার্থকতা আমাকে চুম্বন করবে কি না।   (অন্ধকার থেকে আলোয় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jodi-se-pakhi-bole-jeto/
1018
জীবনানন্দ দাশ
ঘোড়া
রূপক
আমরা যাইনি মরে আজও - তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়: মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে; প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন - এখনও ঘাসের লোভে চরে পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর 'পরে।আস্তাবলের ঘ্রাণ ভেসে আসে একভিড় রাত্রির হাওয়ায়; বিষন্ন খড়ের শব্দ ঝরে পড়ে ইস্পাতের কলে; চায়ের পেয়ালা ক'টা বেড়ালছানার মতো - ঘুমে-ঘেয়ো কুকুরের অস্পষ্ট কবলেহিম হয়ে নড়ে গেল ও - পাশের পাইস্-রেস্তরাঁতে, প্যারাফিন-লন্ঠন নিভে গেল গোল আস্তাবলে। সময়ের প্রশান্তির ফুঁয়ে; এইসব নিওলিথ - স্তব্ধ তার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ghora/
558
কাজী নজরুল ইসলাম
হিন্দি গান
ভক্তিমূলক
॥ ১॥          আজ বন-উপবন-মে চঞ্চল মেরে মন-মে মোহন মুরলীধারী কুঞ্জ কুঞ্জ ফিরে শ্যাম। সুনো মোহন নূপুর গুঁজত হ্যায়, বাজে মুরলী বোলে রাধা নাম॥ কুঞ্জ কুঞ্জ ফিরে শ্যাম॥ বোলে বাঁশরি আও শ্যাম-পিয়ারি– ঢুঁড়ত হ্যায় শ্যাম-বিহারী, বনবালা সব চঞ্চল ওড়াওয়ে অঞ্চল কোয়েল সখী গাওয়ে সাথ গুণধাম॥ কুঞ্জ কুঞ্জ ফিরে শ্যাম॥ ফুলকলি ভোলে ঘুংঘট খোলে পিয়াকি মিলনকি প্রেমকি বোলি বোলে, পবন পিয়া লেকে সুন্দর সৌরভ হাঁসত যমুনা সখী দিবস-যাম॥ কুঞ্জ কুঞ্জ ফিরে শ্যাম॥ ॥ ২॥ খেলত বায়ু ফুল-বনমে আও প্রাণ-পিয়া। আও মনমে প্রেম-সাথি আজ রজনি গাও প্রাণ-প্রিয়া॥ মন-বনমে প্রেম মিলি ভোলত হ্যায় ফুল-কলি, বোলত হ্যায় পিয়া পিয়া। বাজে মুরলিয়া॥ মন্দিরমে রাজত হ্যায় পিয়া তব মুরতি, প্রেম-পূজা লেও পিয়া, আও প্রেম-সাথি, চাঁদ হাসে তারা সাথে আও পিয়া প্রেম-রাথে, সুন্দর হ্যায় প্রেম-রাতি, আও মোহনিয়া। আও প্রাণ-পিয়া॥॥ ৩॥ চক্র সুদর্শন ছোড়কে মোহন তুম ব্যনে বনওয়ারি। ছিন লিয়ে হ্যায় গদা পদম সব মিল করকে ব্রজনারী॥ চার ভুজা আব দো বানায়ে, ছোড়কে বৈকুন্ঠ ব্রিজ-মে আয়ে, রাস রচায়ে ব্রিজ-কে মোহন ব্যন গয়ে মুরলীধারী॥ সত্যভামা-কো ছোড়কে আয়ে, রাধা-প্যারি সাথ-মে লায়ে, বৈতরণি-কো ছোড়কে ব্যন গয়ে যমুনাকে তটচারী॥ ॥ ৪॥ তুম প্রেমকে ঘনশ্যাম ম্যায় প্রেম কি শ্যাম প্যারি। প্রেম কা গান তুমহরে দান ম্যায় হুঁ প্রেম-ভিখারি॥ হৃদয় বিচমে যমুনা-তীর তুমহরি মুরলী বাজে ধীর, নয়ন-নীর কী বহত যমুনা প্রেমকে মাতোয়ারি॥ যুগ যুগ হোয়ে তুমহরি লীলা মেরে হৃদয়-বনমে। তুমহরে মোহন মন্দির পিয়া মোহত মেরে মনমে। প্রেম-নদী-নীর নিত বহি যায়, তুমহরে চরণ কো কাঁহু না পায়, রোয়ে শ্যাম-প্যারি সাথে ব্রজনারী আও মুরলীধারী॥ ॥ ৫॥ ঝুলন ঝুলায়ে ঝাউ ঝক ঝোরে, দেখো সখী চম্পা লচকে। বাদরা গরজে দামিনী দমকে॥ আও ব্রজ-কি কুঙারি ওঢ়ে নীল শাড়ি, নীল কমল-কলিকে পহনে ঝুমকে॥ হাররে ধান কি লও মে হো বালি, ওড়নি রাঙাও শতরঙ্গি আলি, ঝুলা ঝুলো ডালি ডালি, আও প্রেম-কুঙারি মন ভাও, প্যারে প্যারে সুর-মে শাওনি সুনাও! রিমঝিম রিমঝিম পড়ত কোয়ারে, সুন পিয়া পিয়া কহে মুরলী পুকারে, ওহি বোলি-সে হিরদয় খটকে॥॥ ৬॥ ঝুলে কদমকে ডারকে ঝুলনা মে কিশোরী কিশোর। দেখে দোউ এক এক-কে মুখকো চন্দ্রমা-চকোর– য্যায়সা চন্দ্রমা চকোর হোকে প্রেম-নেশা বিভোর॥ মেঘ-মৃদং বাজে ওহি ঝুলনাকে ছন্দ্-মে, রিমঝিম বাদর বরষে আনন্দ্-মে, দেখনে যুগল শ্রীমুখ-চন্দ-কো গগন ঘেরি আয়ে ঘনঘটা-ঘোর॥ নব নীর বরষণে কো চাতকী চায়, ওয়সে গোপী ঘনশ্যাম দেখ তৃষ্ণা মিটায়; সব দেবদেবী বন্দনা-গীত গায়– ঝরে বরষা-মে ত্রিভুবন-কি আনন্দাশ্রু-লোর॥ ॥ ৭॥ প্রেমনগর-কা ঠিকানা কর-লে প্রেমনগর-কা ঠিকানা। ছোড় কারিয়ে দো-দিন-কা ঘর ওহি রাহ-মে জানা॥ দুনিয়া দওলত হ্যায় সব মায়া, সুখ-দুখ হ্যায় দো জগৎ কা কায়া, দুখ-কো তু গলে লাগা লে– আগে না পসতানা॥ আতি হ্যায় যব রাত আঁধারি– ছোড় তুম মায়া বন্ধন ভারি, প্রেম-নগর কি কর তৈয়ারি আয়া হ্যায় পরোয়ানা॥ ॥ ৮॥ সোওত জগত আঁঠু জান রাহত প্রভু মন-মে তুমহারে ধ্যান। রাত-আঁধেরি-সে চাঁদ সমান প্রভু উজ্জ্বল কর মেরা প্রাণ॥ এক সুর বোলে ঝিওর সারে রাত– এ্যায়সে হি জপ তুহু তেরা নাম, হে নাথ! রুম রুম মে রম রহো মেরে এক তুমহারা গান॥ গয়ি বন্ধু কুটুম স্বজন– ত্যজ দিনু ম্যায় তুমহারে কারণ, তুম হো মেরে প্রাণ-আধারণ– দাসী তুমহারি জ্ঞান॥ (ঝড় কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/hindi-gan/
3872
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শূন্য ছিল মন
প্রেমমূলক
না-কোলাহলে-ঢাকা নানা-আনাগোনা-আঁকা দিনের মতন। নানা-জনতায়-ফাঁকা কর্মে-অচেতন শূন্য ছিল মন।জানি না কখন এল নূপুরবিহীন নিঃশব্দ গোধূলি। দেখি নাই স্বর্ণরেখা কী লিখিল শেষ লেখা দিনান্তের তুলি। আমি যে ছিলাম একা তাও ছিনু ভুলি। আইল গোধূলি।হেনকালে আকাশের বিস্ময়ের মতো কোন্‌ স্বর্গ হতে চাঁদখানি লয়ে হেসে শুক্লসন্ধ্যা এল ভেসে আঁধারের স্রোতে। বুঝি সে আপনি মেশে আপন আলোতে এল কোথা হতে।অকস্মাৎ বিকশিত পুষ্পের পুলকে তুলিলাম আঁখি। আর কেহ কোথা নাই, সে শুধু আমারি ঠাঁই এসেছে একাকী। সম্মুখে দাঁড়ালো তাই মোর মুখে রাখি অনিমেষ আঁখি।রাজহংস এসেছিল কোন্‌ যুগান্তরে শুনেছি পুরাণে। দময়ন্তী আলবালে স্বর্ণঘটে জল ঢালে নিকুঞ্জবিতানে, কার কথা হেনকালে কহি গেল কানে– শুনেছি পুরাণে।জ্যোৎস্নাসন্ধ্যা তারি মতো আকাশ বাহিয়া এল মোর বুকে। কোন্‌ দূর প্রবাসের লিপিখানি আছে এর ভাষাহীন মুখে। সে যে কোন্‌ উৎসুকের মিলনকৌতুকে এল মোর বুকে।দুইখানি শুভ্র ডানা ঘেরিল আমারে সর্বাঙ্গে হৃদয়ে। স্কন্ধে মোর রাখি শির নিস্পন্দ রহিল স্থির কথাটি না কয়ে। কোন্‌ পদ্মবনানীর কোমলতা লয়ে পশিল হৃদয়ে?আর কিছু বুঝি নাই,শুধু বুঝিলাম আছি আমি একা। এই শুধু জানিলাম জানি নাই তার নাম লিপি যার লেখা। এই শুধু বুঝিলাম না পাইলে দেখা রব আমি একা।ব্যর্থ হয়, ব্যর্থ হয় এ দিনরজনী, এ মোর জীবন! হায় হায়, চিরদিন হয়ে আছে অর্থহীন এ বিশ্বভুবন। অনন্ত প্রেমের ঋণ করিছে বহন ব্যর্থ এ জীবন।ওগো দূত দূরবাসী, ওগো বাক্যহীন, হে সৌম্য-সুন্দর, চাহি তব মুখপানে ভাবিতেছি মুগ্ধপ্রাণে কী দিব উত্তর। অশ্রু আসে দু নয়ানে, নির্বাক্‌ অন্তর, হে সৌম্য-সুন্দর।  (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shunyo-chilo-mon/
4948
শামসুর রাহমান
প্রণয়কৌতুকী তুই
প্রেমমূলক
প্রণয়কৌতুকী তুই, ওরে যদি বলি সরাসরি, ছিনালি স্বভাব তোর, সুনিশ্চিত জানি হবে না সত্যের অপলাপ। একদা দুপুরে তুই, সে তো আজ নয়, যৌবনের জ্বলজ্বলে ফাল্গুনে আমার থরথর পিপাসার্ত ওষ্ঠে দিয়েছিলি এঁকে প্রগাঢ় চুম্বন।অপরূপ আলিঙ্গনে সেই যে আমাকে বেঁধেছিলি, অতীন্দ্রিয় সেই গাঢ় স্পর্শে করেছি ভ্রমণ দূর মেঘলোকে, স্বর্গীয় হ্রদের তীরে শুয়ে অচিন পাখির সখ্য, ঝুঁকে-পড়া নিরুপম গাছের পাতার প্রাণঢালা মৃদু ছোঁয়া, নক্ষত্রের মদির চাউনি পেয়ে গেছি বারবার, না চাইতে এখনও তো কিছু পেয়ে যাই।তবে কেন হৈ-হুল্লোড়ে মজে তুই এক ঝটকায় বেচারা সর্বদা-অনুগত এই ক্ষমা প্রেমিকের সান্নিধ্যের উষ্ণতা হেলায় ঠেলে দূরে চলে যাস মাঝে মাঝে? অকুণ্ঠ কবুল করি, জীবিকার চাবুকের ঘায়ে বিব্রত, রক্তাক্ত হই, তবুও তো ভুলিনি তোমায়, ওরে তোর সত্তার অনিন্দ্য ঘ্রাণ, আজও চাই, তোকেই তো চাই মায়াবিনী।তোমার সন্ধ্যানে আজ চা-খানায়, অলিতে-গলিতে, পার্কে, মাঠে, নদী তীরে হই না হাজির অসুস্থতা হেতু, তবে গোপন আস্তানা আছে আমার হৃদয় জুড়ে, যার আওতায় বেহেশ্‌ত-দোজখ, দিঘির বুকের চাঁদ, তপ্ত রাজপথময় প্রতিবাদী দীপ্র মিছিলের কলরব। তবুও কি ছেড়ে যাবে তোমার কবিকে?   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/pronoykoutuki-tui/
1208
জীবনানন্দ দাশ
শ্মশান
চিন্তামূলক
কুহেলির হিমশয্যা অপসারি ধীরে রূপময়ী তন্বী মাধবীরে ধরণী বরিয়া লয় বারে-বারে-বারে! -আমাদের অশ্রুর পাথারে ফুটে ওঠে সচকিতে উৎসবের হাসি,- অপরূপ বিলাসের বাঁশি! ভগ্ন প্রতিমারে মোরা জীবনের বেদীতটে আরবার গড়ি, ফেনাময় সুরাপাত্র ধরি ভুলে যাই বিষের অস্বাদ! মোহময় যৌবনের সাধ আতপ্ত করিয়া তোলে স্থবিরের তুহিন অধর! চিরমৃত্যুচর হে মৌন শ্মশান ধূম-অবগুন্ঠনের অন্ধকারে আবরি বয়ান হেরিতেছ কিসের স্বপন! ক্ষণে ক্ষণে রক্তবহ্নি করি নির্বাপন স্তব্ধ করি রাখিতেছ বিরহীর ক্রন্দনের ধ্বনি! তবু মুখপানে চেয়ে কবে বৈতরণী হ’য়ে গেছে কলহীন! বক্ষে তব হিম হ’য়ে আছ কত উগ্রশিখা চিতা হে অনাদি পিতা! ভস্মগর্ভে, মরণের অকূল শিয়রে জন্মযুগ দিতেছ প্রহরা- কবে বসুন্ধরা মৃত্যুগাঢ় মদিবার শেষ পাত্রখানি তুলে দেবে হসে- তব, কবে লবে টানি কাঙ্কাল আঙুলি তুলি শ্যামা ধরণীরে শ্মশান-তিমিরে, লোলুপ নয়ন মেলি হেরিবে তাহার বিবসনা শোভা দিব্য মনোলোভা! কোটি কোটি চিতা-ফণা দিয়া রূপসীর অঙ্গ-আলিঙ্গিয়া শুষে নেবে সৌন্দর্যের তামরস-মধু! এ বসুধা-বধূ আপনারে ডারি দেবে উরসে তোমার! ধ্বক্‌-ধ্বক্‌-দারুণ তৃষ্ণার রসনা মেলিয়া অপেক্ষায় জেগে আছে শ্মশানের হিয়া! আলোকে আঁধারে অগণন চিতার দুয়ারে যেতেছে সে ছুটে, তৃপ্তিহীন তিক্ত বক্ষপুটে আনিতেছে নব মৃত্যু পথিকের ডাকি, তুলিতেছে রক্ত-ধুম্র আঁখি! -নিরাশার দীর্ঘশ্বাস শুধু বৈতরণীমরু ঘেরি জ্বলে যায় ধু ধু আসে না প্রেয়সী! নিদ্রাহীন শশী, আকাশের অনাদি তারকা রহিয়াছে জেগে তার সনে; শ্মশানের হিম বাতায়নে শত শত প্রেতবধূ দিয়া যায় দেখা,- তবু সে যে প’ড়ে আছে একা, বিমনা-বিরহী! বক্ষে তার কত লক্ষ সভ্যতার স্মৃতি গেছে দহি, কত শৌর্য-সাম্রাজ্যের সীমা প্রেম-পুণ্য-পূজার গরিমা অকলঙ্ক সৌন্দর্যের বিভা গৌরবের দিবা! তবু তার মেটে নাই তৃষা; বিচ্ছেদের নিশা আজও তার হয় নাই শেষ! আশ্রান্ত অঙুলি সে যে করিছে নির্দেশ অবনীর পক্কবিম্ব অধরের পর! পাতাঝরা হেমন্তের স্বর, ক’রে দেয় সচকিত তারে, হিমানী-পাথারে কুয়াশাপুরীর মৌন জানায়ন তুলে চেয়ে থাকে আঁধারে অকূলে সুদূরের পানে! বৈতরণীখেয়াঘাটে মরণ-সন্ধানে এল কি রে জাহ্নবীর শেষ উর্মিধারা! অপার শ্মশান জুড়ি জ্বলে লক্ষ চিতাবহ্নি-কামনা-সাহারা!
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shosan/
5840
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
ভালোবাসার পাশেই
প্রেমমূলক
ভালোবাসার পাশেই একটা অসুখ শুয়ে আছে ওকে আমি কেমন করে যেতে বলি ও কি কোনো ভদ্রতা মানবে না? মাঝে মাঝেই চোখ কেড়ে নেয়, শিউরে ওঠে গা ভালোবাসার পাশেই একটা অসুখ শুয়ে আছে। দু’হাত দিয়ে আড়াল করা আলোর শিখাটুকু যখন তখন কাঁপার মতন তুমি আমার গোপন তার ভেতরেও ঈর্ষা আছে, রেফের মতন তীক্ষ্ম ফলা ছেলেবেলার মতন জেদী এদিক ওদিক তাকাই তবু মন তো মানে না ভালোবাসার পাশেই একটা অসুখ শুয়ে আছে। তোময় আমি আদর করি, পায়ের কাছে লুটোই সিংহাসনে বসিয়ে দিয়ে আগুন নিয়ে খেলি তবু নিজের বুক পুড়ে যায়, বুক পুড়ে যায় বুক পুড়ে যায় কেউ তা বোঝে না ভালোবাসার পাশেই একটা অসুখ শুয়ে আছে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1802
5614
সুকুমার রায়
ছোটে হনহন
ছড়া
চলে হন্ হন্ ছোটে পন্ পন্ ঘোরে বন্ বন্ কাজে ঠন্ ঠন্ বায়ু শন্ শন্ শীতে কন্ কন্ কাশি খন্ খন্ ফোঁড়া টন্ টন্ মাছি ভন্ ভন্ থালা ঝন্ ঝন্   (অন্যান্য ছড়াসমূহ)
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/chote-honhon/
1511
নির্মলেন্দু গুণ
যতটুকু প্রেমে
চিন্তামূলক
বৈরীতে বিশ্বাসী নই, হিংস্রতা মানায় সিংহে, বনরাজ্যে, তাই জীবজ্ঞানে ক্ষমা করি সব অরণ্যের ক্ষিপ্র ব্যভিচার। সিংহ নেই, ছড়ানো ভুবন জুড়ে প্রেমার্ত বোধের অশ্ব ছোটে প্রতিদিন। রেশমী কেশর থেকে ঝরে নিত্য মানবিক ক্ষুধার চুম্বন। সিংহের শোণিত বীর্যে তবু ফের ধুয়ে আসি হৃদয়ের পরাজিত ভীরুতা আমার। প্রকৃত বিশ্বাস নেই প্রকৃতির বৈরী বসবাসে, হিংস্রতায় নাহি পারঙ্গম তাই যতটুকু প্রেমে।
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/jototuku-prem/
5168
শামসুর রাহমান
যে এলো তোমার কাছে
সনেট
যে এলো তোমার কাছে অবশেষে উড়িয়ে আঁচল বিরূপ হাওয়ায় তার সৌন্দর্য তুলনাহীন; তাকে দেখে তুমি দূরবর্তী সন্ধ্যায় হঠাৎ অচেনাকে বড় বেশী চেনা বলে অন্তরালে কেমন চঞ্চল হ’য়ে উঠেছিলে, তার সুগভীর চোখের কাজল, মনে হলো, যুগ-যুগান্তের স্মৃতি নিয়ে কাকে ডাকে স্বপ্নের সংকেতে, তুমি ভেবেছিলে হয়তো তোমাকে নিয়ে যাবে খৃষ্টপূর্ব কালে, শুষে নেবে অমঙ্গল।এখন সে স্মিত হেসে দাঁড়ায় তোমার পাশে, ঠোঁটে হৃদয় পুষ্পিত হয় ক্ষণে ক্ষণে, ঝরে যায় কত যে শতক সুপ্রাচীন থরথর চুম্বনে চুম্বনে ভালোবাসা মিসরীয় সম্রাজ্ঞীর চোখের মতন জ্বলে ওঠে- মাঝে মাঝে স্বপ্নে দ্যাখো যমজ সোনালি ঘোড়া চক চক করে জ্যোৎস্নারাতে, বুকে জাগে শোণিতের ভাষা।    (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/je-elo-tomar-kache/
3768
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যতক্ষণ স্থির হয়ে থাকি
চিন্তামূলক
যতক্ষণ স্থির হয়ে থাকি ততক্ষণ জমাইয়া রাখি যতকিছু বস্তুভার। ততক্ষণ নয়নে আমার নিদ্রা নাই; ততক্ষণ এ বিশ্বেরে কেটে কেটে খাই কীটের মতন; ততক্ষণ চারি দিকে নেমে নেমে আসে আবরণ; দুঃখের বোঝাই শুধু বেড়ে যায় নূতন নূতন; এ জীবন সতর্ক বুদ্ধির ভারে নিমেষে নিমেষে বৃদ্ধ হয় সংশয়ের শীতে, পক্ককেশে। যখন চলিয়া যাই সে-চলার বেগে বিশ্বের আঘাত লেগে আবরণ আপনি যে ছিন্ন হয়, বেদনার বিচিত্র সঞ্চয় হতে থাকে ক্ষয়। পুণ্য হই সে-চলার স্নানে, চলার অমৃত পানে নবীন যৌবন বিকশিয়া ওঠে প্রতিক্ষণ। ওগো আমি যাত্রী তাই-- চিরদিন সম্মুখের পানে চাই। কেন মিছে আমারে ডাকিস পিছে আমি তো মৃত্যুর গুপ্ত প্রেমে রব না ঘরের কোণে থেমে। আমি চিরযৌবনেরে পরাইব মালা, হাতে মোর তারি তো বরণডালা। ফেলে দিব আর সব ভার, বার্ধক্যের স্তূপাকার আয়োজন। ওরে মন, যাত্রার আনন্দগানে পুর্ণ আজি অনন্ত গগন। তোর রথে গান গায় বিশ্বকবি, গান গায় চন্দ্র তারা রবি। সুরুল, ২৯ পৌষ, ১৩২১-প্রাতঃকাল
https://banglarkobita.com/poem/famous/1930
4123
রেদোয়ান মাসুদ
এত রূপ তোমার কি করে তোমায় ভুলি
প্রেমমূলক
এত রূপ তোমার কি করে তোমায় ভুলি? সারাক্ষণ তাই দু’চোখ মেলে তোমায় দেখি। হৃদয়ের ডায়রিতে রঙ তুলি দিয়ে তোমারি ছবি আঁকি যেন যেতে নাহি পার কোন দিন আমায় ছাড়ি। যেদিকে তাকাই সেদিকেই দেখি তোমারি ছবি মনের জানালা খুলে তোমারি কথা ভাবি। তুলসী পাতার মত নরম তোমার ঐ হাত খানি মন চায় সারাক্ষণ হাতটি ধরে রাখি। বল কি করে তোমায় ভুলতে পারি? যখনি দেখি তোমার কাজল কাল আঁখি পারিনা সরাতে চোখের নজর, বল কি করি আমি? সারারাত এই ভেবে টলমল করে আখি বুকভরা ভালবাসা নিয়ে তাই তোমারি আশায় থাকি। দুনিয়ার যত মায়া মমতা নিয়ে তোমারি কাছে আসি বল কি করে ছেড়ে যাবে আমায় তুমি। তোমার মিষ্টি মাখা কোমল ঠোঁট দুটি কেড়েছে নজর আমার, ভরেছে হৃদয়খানি। যতদিন বেঁচে থাকি পারবোনা ভুলতে তোমায় আমি তাইতো হৃদয়ের ডোরে বেধে রাখব তোমায় চিরদিনি। যতদূর চোখ যায় তোমাকে ছাড়া কি ই বা দেখি বল কি করে তোমায় ভুলতে পারি? মায়া ভরা মন জুড়ানো তোমার সেই হাসি মন চায় বারে বারে তোমারি কাছে চলে আসি। তুমি আমার মনের বাগানে ফুটে থাকা গোলাপগুলি সুভাসিত ঘ্রাণে তাই হয়েছি পাগল আমি। এত রূপ তোমার কি করে তোমায় ভুলি? সারাক্ষণ তাই দু’চোখ মেলে তোমায় দেখি।
http://kobita.banglakosh.com/archives/2178.html
4681
শামসুর রাহমান
গুঢ় সহবতে
সনেট
বেলী আর কনকচাঁপার গুঢ় সহবতে থাকি, বেশ আছি সর্ষে ক্ষেত, প্রজাপতি, শালুক, শামুক, দোয়েল ঘুঘুর সঙ্গে। কোকিলের সঙ্গে কুহু ডাকি নির্জন নেপথ্যেঃ কত বলাবলি-লোকটা কী সুখ পায় এতে? চুল খায় রূপালি আদর, রাতে ভালো ঘুম নেই, থাকি না কখনো হুজরায়। খোলা মাঠ, জোনাকির দাওয়াত কবুল করি, চাঁদের আলোয় ওজু সারি বারংবার। মধ্যরাতে পুকুরের ঘাটডেকে নেয় চুপিসাড়ে, দেখবো পরীর নাচ আর ঝিঁঝি পোকাদের সঙ্গে মাতবো জিকিরে সারা রাত। হরফের তসবি হাতে ঘুরি, প্রায় অলৌকিক বাজনার তালে নেচে উঠে দেখি অকস্মাৎ কী সুন্দর হাত আমার কপালে দেয় আলগোছে চন্দনের ফোঁটা; ফলত দিগন্তপানে একা ছোটা, নিরন্তর ছোটা।   (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/gur-sohobote/
267
কাজী নজরুল ইসলাম
কমল-কাঁটা
মানবতাবাদী
আজকে দেখি হিংসা-মদের মত্ত-বারণ-রণে জাগ্‌ছে শুধু মৃণাল-কাঁটা আমার কমল-বনে। উঠল কখন ভীম কোলাহল, আমার বুকের রক্ত-কমল কে ছিঁড়িল-বাঁধ-ভরা জল শুধায় ক্ষণে ক্ষণে। ঢেউ-এর দোলায় মরাল-তরী নাচ্‌বে না আন্‌মনে।। কাঁটাও আমার যায় না কেন, কমল গেল যদি! সিনান-বধূর শাপ শুধু আজ কুড়াই নিরবধি! আস্‌বে কি আর পথিক-বালা? প’রবে আমার মৃণাল-মালা? আমার জলজ-কাঁটার জ্বালা জ্ব’লবে মোরই মনে? ফুল না পেয়েও কমল-কাঁটা বাঁধবে কে কঙ্কণে?
https://banglarkobita.com/poem/famous/847
3106
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনে যত পূজা
ভক্তিমূলক
জীবনে যত পূজা হল না সারা, জানি হে জানি তাও হয় নি হারা। যে ফুল না ফুটিতে ঝরেছে ধরণীতে, যে নদী মরুপথে হারালো ধারা, জানি হে জানি তাও হয় নি হারা। জীবনে আজো যাহা রয়েছে পিছে, জানি হে জানি তাও হয় নি মিছে। আমার অনাগত আমার অনাহত তোমার বীণা-তারে বাজিছে তারা– জানি হে জানি তাও হয় নি হারা।
http://kobita.banglakosh.com/archives/467.html
3651
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভজহরি
ছড়া
হংকঙেতে সারাবছর আপিস করেন মামা , সেখান থেকে এনেছিলেন চীনের দেশের শ্যামা , দিয়েছিলেন মাকে, ঢাকার নীচে যখন-তখন শিস দিয়ে সে ডাকে। নিচিনপুরের বনের থেকে ঝুলির মধ্যে ক'রে ভজহরি আনত ফড়িঙ ধরে । পাড়ায় পাড়ায় যত পাখি খাঁচায় খাঁচায় ঢাকা আওয়াজ শুনেই উঠত নেচে , ঝাপট দিত পাখা । কাউকে ছাতু , কাউকে পোকা , কাউকে দিত ধান , অসুখ করলে হলুদজলে করিয়ে দিত স্নান । ভজু বলত , “ পোকার দেশে আমিই হচ্ছি দত্যি , আমার ভয়ে গঙ্গাফড়িঙ ঘুমোয় না একরত্তি । ঝোপে ঝোপে শাসন আমার কেবলই ধরপাকড় , পাতায় পাতায় লুকিয়ে বেড়ায় যত পোকামাকড় । ”একদিন সে ফাগুন মাসে মাকে এসে বলল , “ গোধূলিতে মেয়ের আমার বিয়ে হবে কল্য । ” শুনে আমার লাগল ভারি মজা , এই আমাদের ভজা , এরও আবার মেয়ে আছে , তারও হবে বিয়ে , রঙিন চেলির ঘোমটা মাথায় দিয়ে । শুধাই তাকে , “ বিয়ের দিনে খুব বুঝি ধুম হবে ?” ভজু বললে , “ খাঁচার রাজ্যে নইলে কি মান রবে । কেউবা ওরা দাঁড়ের পাখি , পিঁজরেতে কেউ থাকে , নেমন্তন্ন চিঠিগুলো পাঠিবে দেব ডাকে । মোটা মোটা ফড়িঙ দেব , ছাতুর সঙ্গে দই , ছোলা আনব ভিজিয়ে জলে , ছড়িয়ে দেব খই । এমনি হবে ধুম, সাত পাড়াতে চক্ষে কারও রইবে না আর ঘুম। ময়নাগুলোর খুলবে গলা, খাইয়ে দেব লঙ্কা; কাকাতুয়া চীৎকারে তার বাজিয়ে দেবে ডঙ্কা । পায়রা যত ফুলিয়ে গলা লাগাবে বক্‌বকম , শালিকগুলোর চড়া মেজাজ , আওয়াজ নানারকম । আসবে কোকিল , চন্দনাদের শুভাগমন হবে , মন্ত্র শুনতে পাবে না কেউ পাখির কলরবে । ডাকবে যখন টিয়ে বরকর্তা রবেন বসে কানে আঙুল দিয়ে । ”
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bujhare/
2112
মহাদেব সাহা
কতো নতজানু হবো, দাঁতে ছোঁবো মাটি
মানবতাবাদী
কতো নতজানু হবো, কতো দাঁতে ছোঁবো মাটি এই শিরদাঁড়া হাঁটু ভেঙে কতোবার হবো ন্যুব্জ আধোমুখ? আজীবন সেজদার ভঙ্গিতে কতো আর নোয়াবো শরীর? এক রকম স্পষ্ট দাঁড়ানো দৃঢ়ভাব কারো কারো সহজাত থাকে, মানুষের মধ্যে থেকে তাহাদের পাঁচফুট নয় ইঞ্চি মাথা মানুষের চে’ও কিছু উঁচু আমি কতো আর নতজানু হবো দাঁতে ছোঁবো মাটি? আমার জনক সে কি জন্ম থেকে নিয়েছেন এই ভিক্ষা, এই শিশুপালনের ব্রত ওরে তুই জন্ম নতজাঁনু হয়ে বেড়ে ওঠ সবাই যখন পায়ের পাতায় ভর করে পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি মাথা আরো উচ্চে তুলে দম্ভে দাঁড়াবে আমার বালক তুই তখনো লুকাবি মুখ নিজেরই পায়ের তলদেশে; আমি তাই জন্ম নতজানু, নতমুখ মাথা তুলে বুক খাড়া করে কোনোদিন দাঁড়ানো হলো না বুকভাঙা বাঁকানো কোমর আমি নতজানু লোক কতো আর নতজানু হবো কতো দাঁতে ছোঁবো মাটি!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1451