id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
4889
শামসুর রাহমান
নিজের পায়ের দিকে তাকাতেই
চিন্তামূলক
আমাকে কেউ ইশ্বরের প্রতিদ্বন্দী বলে সম্বোধন করল কি করল না তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার স্তুতি কিংবা নিন্দায় পাড়াপাড়শিরা হুল্লোড়ের হাট বসিয়ে লাঠালাঠি, মাথা ফাটাফাটি করলেও সেদিকে আমার লেশামাত্র নজর নেই।তোমরা কি দ্যাখো নি কী করে নিমেষে বিকল্প সৌরলোক, ভিন্ন চাঁদ, স্বতন্ত্র তারাভরা নিশীথের আকাশ আমি তৈরি করি? তোমাদের চোখে কি পড়ে নি আমার বানানো সেই বাগিচা যা’ আদম ও হাওয়ার উদ্যানের চেয়েও সুন্দর, অথচ সেখানে নেই সবুজ সাপের হিস্‌হিসে পরামর্শ? নিশ্চয়ই সেই বাগানে তোমরা দেখেছ বেহেশ্‌তের হুরীদের অধিক রূপবতী তরুণীদের, যারা তারায়-গড়া ময়ূরপঙ্খী নাও কুমারী জলে ভাসিয়ে রওয়ানা হয় প্রেমোপাখ্যানময় দ্বীপের উদ্দেশে। ঢেউয়ের তালে তালে দোলে তাদের স্তন, তাদের উল্লসিত কেশে জলকণা চিক চিক করে। সমুদ্রতলে সুলেমানী রত্ন ভাণ্ডারের চেয়েও ঐশ্বর্যময় খাজাঞ্চিখানা নির্মাণ করেছি, এ-ও তোমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় নি, আমার বিশ্বাস।তোমরা কি অগ্রাহ্য করো আমার দাবি? আমাকে আজ গোধূলি বেলায় প্রতারক অপবাদ দিয়ে এই তমসাচ্ছন্ন, অবক্ষয়-স্পৃষ্ট নগরী থেকে তাড়িয়ে দিতে চাও? এই তো আমি মেঘের শাদা ঘোড়ায় সওয়ার, ঘোরাচ্ছি আঙুল আর চতুর্দিকে অন্ধকারকে লজ্জা দিয়ে শিশুর হাসির মতো ফুটে উঠছে আলো, খরাপীড়িত নরনারীর পায়ের তলায় বয়ে যাচ্ছে জলধারা গ্রামীণ কন্যাদের গীত ধ্বনির মতো- তোমরা দেখতে পাচ্ছ না? দ্যাখো, আমারই ইচ্ছায়কীরকম মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে অজস্র গোলাপ আবর্জনার স্তূপে, দুঃস্থ কবিয়াল যুবরাজের ভঙ্গিতে তার সারিন্দায় লাগাচ্ছে দিক-জাগানো নতুন সুর, জমির আল মিশে যাচ্ছে স্বর্গগঙ্গায় এবং আততায়ীদের ধারালো অস্ত্রগুলো মিলনমালা হয়ে দুলছে।এখন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে আমার অস্তিত্ব তরঙ্গিত নদীর মতো এক নাচ, ঘূর্ণমান দরবেশের মতো আত্মহারা আর টাল সামলে নিজের পায়ের দিকে তাকাতেই আমি কেমন পাথুরে স্তব্ধতা।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nijer-payer-dike/
4579
শামসুর রাহমান
কারো একলার নয়
রূপক
অকস্মাৎ লেখার টিবিল থেকে যদি আমাকে উপড়ে নেয়, ঘর গেরস্থালি, প্রেমিকার একরাশ চুলের সৌরভ, সন্তানের চুমো জনপথ, কবিসভা থেকে ঝোড়ো হাওয়া এক ফুঁয়ে আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় পালকের মতো, হাতলে কি এ শহর হয়ে যাবে ধনুকের প্রোজ্জ্বল টংকার?এ রকম কিছুই হবে না। যে মচ্ছব সালঙ্করা গণিকার অঙ্গভঙ্গি, তাতে ভাটা গড়বার লক্ষণ দুর্লক্ষ্য আপাতত। কত নির্ঘুম রাত্রিরস্মৃতি আনে কর্কশ অস্বস্তি। সর্বদাই নির্ঘুম কবির চোখ, অবসাদে, ক্লেশে দু’চোখের পাতা জোড়া লাগলেও অন্য চোখ জেগে থাকে, দ্যাখে রাত্রির তৃতীয় যামে চাঁদ হাঁটে নীলিমার দবিজ কার্পেট, ফুটপাতে ঘুমন্ত শিশুর কপালে নিবিড় টিপ দিয়ে যায় খুব চুপিসারে। তোমার সৌন্দর্য, হে স্বদেশ, আকৈশোর মুগ্ধ আমি অনিন্দ্য ফুলের মতো তোমার এ মুখ উন্মীলিত, যেখানেই যাই তোমার মুখশ্রী সঙ্গী আমার এবং দেশ-দেশান্তরে ভ্রমণের ঘোর কেটে গেলে তোমার রূপের টানে ফিরে আসি তোমার কাছেই। আমাকে কখনো যদি নির্বাসনে যেতে হয়, তবে দূরদেশে কী ক’রে বাঁচব আমি তোমাকে না দেখে? ভাবি খুব উদাসীনতায় ডুবে থাকব, অথচ দুখিনী তোমার কথা কিছুতেই ভুলতে পারি না।হে অনিন্দ্য ফুল, তোমার ভেতরে ওরা ছড়িয়ে দিয়েছে মুঠো মুঠো কীট, কালিমার গাঢ়ঝ, পোঁচড়া পড়েছে তোমার চোখের নিচে, তবু কী সুন্দর তুমি, রোগ শোক অর্ধাহারে। কত নোংরা হাত সাপ হয়ে নাচে ডোরাকাটা শাড়ির চৌদিকে, চায় দরবারি স্খলিত বসনে দেখে পেতে লালসার যৌথ বাহারের ভাগ।তোমাকে বন্ধক রেখে পেট্রোডলারের খাদেমেরা নিটোল মুক্তোর মতো নিজেদের আখেরকে সাততাড়াতাড়ি পৌঁছে দেয় সাত আসমানে। স্থিতি নেই কোনোখানে, আঙনের কোলাহলে দিশেহারা মানুষ, বনের পশুপাল আমার জীবন ঘূর্ণিজলে পাতা যেন, ডোবে আর ভাসে।এই ডামাডোলে যার রাজবেশ তার প্রত্যাবর্তনের উপলক্ষে অসংখ্য তোরণ তৈরি হয় প্রধান শহরে, তাকে বরণ করার জন্যে সভাসদদের তুমুল উদ্দীপনায় শূন্য হয়ে যায় সব ফুলের নার্সারি। জনসাধারণ বিস্ময়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে দ্যাখে, কবি দ্যাখে তার কবিতার ছন্দ ভুলে, শোনে একটি তোরণ থেকে ভুখা শিশুদের কান্না ভেসে আসে, আরেকটি থেকে রাজবন্দিদের দীর্ঘশ্বাস স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে ঘৃণার উচ্চারণ, কোনো কোনো তোরণের চিত্রিত গা বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়ে গত ধর্মৎটে শহীদের পবিত্র শোণিত। এরই মধ্যে নানা ডৌলে শব্দ লিখি, ছন্দ গেঁথে যাই আর দশদিকব্যাপী অন্ধকার থেকে একমুঠো কালো তুলো নিয়ে ব্যাজ পড়ি, যা নয় কখনো পরবশে, কিংবা কারো একলার নয়।   (না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/karo-eklar-noy/
3542
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাংলাদেশের মানুষ হয়ে
নীতিমূলক
বাংলাদেশের মানুষ হয়ে ছুটিতে ধাও চিতোরে, কাঁচড়াপাড়ার জলহাওয়াটা লাগল এতই তিতো রে? মরিস ভয়ে ঘরের প্রিয়ার, পালাস ভয়ে ম্যালেরিয়ার, হায় রে ভীরু, রাজপুতানার ভূত পেয়েছে কী তোরে। লড়াই ভালোবাসিস, সে তো আছেই ঘরের ভিতরে।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/bangladesher-manus-hoye/
7
অনিতা অগ্নিহোত্রী
জলকণ্ঠস্বর
চিন্তামূলক
গঞ্জের ধ্বনি আর সারি সারি চালা শেষ হলে সমুদ্র রয়েছে। নীলাভ সবুজ। অপার্থিব। আকাশের কাছাকাছি অথচ বিযুক্ত, বেদনায়।। সমুদ্রের দিন রাত মিলেমিশে একটিই জলকণ্ঠস্বর।উল্টানো নৌকার কাছে গিয়ে বসি। সন্ন্যাসী কাঁকড়া। পরিবার দ্রুত হাঁটে গরম বালুর অপসৃয়মানতায়। আমার চিবুকে নুন, গালে নুন, ওষ্ঠাধর লবণে স্থবির রাত্রি নামার আগে আমার ফেরার আছে গঞ্জের দোকানে।হিসাব মেলাবো বলে রাতে এসে দেখি সদ্য ভেজা বধির খাতার মধ্যে শুয়ে আছে শঙ্খ, কড়ি, সৈন্ধবলবণ ঘুমের অনেক নীচে সমুদ্রের স্বর মালা, সমুদ্রের সকাতর প্রেম। গৃহস্থালি জমে ওঠে: অতিথিরা ভাত-গন্ধ দ্রব কারো থাকে না মনে: কিছু দূরে, প্রহরায়, সমুদ্র রয়েছে।গঞ্জের ধ্বনি আর সারি সারি চালা শেষ হলে সমুদ্র রয়েছে। নীলাভ সবুজ। অপার্থিব। আকাশের কাছাকাছি অথচ বিযুক্ত, বেদনায়।। সমুদ্রের দিন রাত মিলেমিশে একটিই জলকণ্ঠস্বর।উল্টানো নৌকার কাছে গিয়ে বসি। সন্ন্যাসী কাঁকড়া। পরিবার দ্রুত হাঁটে গরম বালুর অপসৃয়মানতায়। আমার চিবুকে নুন, গালে নুন, ওষ্ঠাধর লবণে স্থবির রাত্রি নামার আগে আমার ফেরার আছে গঞ্জের দোকানে।হিসাব মেলাবো বলে রাতে এসে দেখি সদ্য ভেজা বধির খাতার মধ্যে শুয়ে আছে শঙ্খ, কড়ি, সৈন্ধবলবণ ঘুমের অনেক নীচে সমুদ্রের স্বর মালা, সমুদ্রের সকাতর প্রেম। গৃহস্থালি জমে ওঠে: অতিথিরা ভাত-গন্ধ দ্রব কারো থাকে না মনে: কিছু দূরে, প্রহরায়, সমুদ্র রয়েছে।গঞ্জের ধ্বনি আর সারি সারি চালা শেষ হলে সমুদ্র রয়েছে। নীলাভ সবুজ। অপার্থিব। আকাশের কাছাকাছি অথচ বিযুক্ত, বেদনায়।। সমুদ্রের দিন রাত মিলেমিশে একটিই জলকণ্ঠস্বর।উল্টানো নৌকার কাছে গিয়ে বসি। সন্ন্যাসী কাঁকড়া। পরিবার দ্রুত হাঁটে গরম বালুর অপসৃয়মানতায়। আমার চিবুকে নুন, গালে নুন, ওষ্ঠাধর লবণে স্থবির রাত্রি নামার আগে আমার ফেরার আছে গঞ্জের দোকানে।হিসাব মেলাবো বলে রাতে এসে দেখি সদ্য ভেজা বধির খাতার মধ্যে শুয়ে আছে শঙ্খ, কড়ি, সৈন্ধবলবণ ঘুমের অনেক নীচে সমুদ্রের স্বর মালা, সমুদ্রের সকাতর প্রেম। গৃহস্থালি জমে ওঠে: অতিথিরা ভাত-গন্ধ দ্রব কারো থাকে না মনে: কিছু দূরে, প্রহরায়, সমুদ্র রয়েছে।গঞ্জের ধ্বনি আর সারি সারি চালা শেষ হলে সমুদ্র রয়েছে। নীলাভ সবুজ। অপার্থিব। আকাশের কাছাকাছি অথচ বিযুক্ত, বেদনায়।। সমুদ্রের দিন রাত মিলেমিশে একটিই জলকণ্ঠস্বর।উল্টানো নৌকার কাছে গিয়ে বসি। সন্ন্যাসী কাঁকড়া। পরিবার দ্রুত হাঁটে গরম বালুর অপসৃয়মানতায়। আমার চিবুকে নুন, গালে নুন, ওষ্ঠাধর লবণে স্থবির রাত্রি নামার আগে আমার ফেরার আছে গঞ্জের দোকানে।হিসাব মেলাবো বলে রাতে এসে দেখি সদ্য ভেজা বধির খাতার মধ্যে শুয়ে আছে শঙ্খ, কড়ি, সৈন্ধবলবণ ঘুমের অনেক নীচে সমুদ্রের স্বর মালা, সমুদ্রের সকাতর প্রেম। গৃহস্থালি জমে ওঠে: অতিথিরা ভাত-গন্ধ দ্রব কারো থাকে না মনে: কিছু দূরে, প্রহরায়, সমুদ্র রয়েছে।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9c%e0%a6%b2%e0%a6%95%e0%a6%a3%e0%a7%8d%e0%a6%a0%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%b0-%e0%a6%85%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%85%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%a8%e0%a6%bf/
2488
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
দমন পোষণের ছড়া
মানবতাবাদী
দারিদ্রকে মেরো না কেউ দরিদ্রকে মারো মারো যতো পারো ।। রাষ্ট্র-শাসন আইন কানুন বানাও এমন করে মার খেলেও দরিদ্র সব যায় না যেন মরে ডর দেখিয়ে ঘর ভেঙে দাও জমি জিরেত সব কেড়ে নাও পেটের দায়ে কাজের খোঁজে যখন হবে হন্যে তখন ওদের কাজে লাগাও রক্ত চোষার জন্যে । ভেবে দ্যাখো মারার উপায় কী কী আছে আরো মারো যতো পারো ।। সুযোগ লোভী মধ্যবিত্ত সুজন বুদ্ধিজীবী ওদের নিয়ে ভয় পেয়ো না, ওরা তো সব ক্লীব-ই । গুণ্ডাদেরে পাণ্ডাদেরে আদর করে ডাকো চাপড়িয়ে পিঠ বাহবা দাও তাদের পাশে থাকো চোরদেরে দাও বাহাদুরী ব্যাংক বীমা সব করুক চুরি দরিদ্রদের মধ্য থেকে দু'এক জনকে পাকড়ে লেলিয়ে দাও, ভাইকে মারুক তোমার আস্তিন পাকড়ে । মার না খেলে দরিদ্রদের ভরবে না পেট কারো মারো যতো পারো ।।
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/domon-poshoner-chhora/
679
জয় গোস্বামী
তুমি আর তোমার ক্যাডার
মানবতাবাদী
১ দলে দলে মোটর বাইকে ঢুকে পড়ে কারা ঢুকে পড়ে ভোর বেলা কারা ঢুকে পড়ে জানা যায় না কিন্তু তারই পরে এ গ্রামে, ও গ্রামে, ঘরে ঘরে অবাধে কৃষক-রক্ত ঝরে জাগ্রত কৃষক রক্ত ঝরে ২ অস্ত্র প্রয়োগের অধিকারী তুমি আর তোমার ক্যাডার আমরা শুধু খুন হতে পারি মুখ বুজে খুন হতে পারি এই একমাত্র অধ
http://kobita.banglakosh.com/archives/1681.html
1944
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
জলে ফুলে
চিন্তামূলক
১ কে ভাসাল জলে তোরে কানন-সুন্দরী! বসিয়া পল্লবাসনে,       ফুটেছিলে কোন্ বনে নাচিতে পবন সনে, কোন্ বৃক্ষোপরি? কে ছিঁড়িল শাখা হতে শাখার মঞ্জরী? ২ কে আনিল তোরে ফুল তরঙ্গিণী-তীরে? কাহার কুলের বালা,      আনিয়া ফুলের ডালা, ফুলের আঙ্গুলে তুলে ফুল দিল নীরে? ফুল হতে ফুল খসি, জলে ভাসে ধীরে! ৩ ভাসিছে সলিলে যেন, আকাশেতে তারা। কিম্বা কাদম্বিনী-গায়,       যেন বিহঙ্গিনী প্রায়, কিম্বা যেন মাঠে ভ্রমে, নারী পথহারা; কোথায় চলেছ ধরি, তরঙ্গিণীধারা? ৪ একাকিনী ভাসি যাও, কোথায় অবলে! তরঙ্গের রাশি রাশি,        হাসিয়া বিকট হাসি, তাড়াতাড়ি করি তোরে খেলে কুতূহলে? কে ভাসাল তোরে ফুল কাল নদীজলে! ৫ কে ভাসাল তোরে ফুল, কে ভাসাল মোরে! কাল স্রোতে তোর(ই) মত, ভাসি আমি অবিরত, কে ফেলেছে মোরে এই তরঙ্গের ঘোরে? ফেলেছে তুলিছে কভু, আছাড়িছে জোরে ৬ শাখার মঞ্জরী আমি, তোরই মত ফুল। বোঁটা ছিঁড়ে শাখা ছেড়ে, ঘুরি আমি স্রোতে পড়্যে, আশার আবর্ত্ত বেড়ে, নাহি পাই কূল। তোরই মত আমি ফুল তরঙ্গে আকুল। ৭ তুই যাবি ভেসে ফুল, আমি যাব ভেসে। কেহ না ধরিবে তোরে    কেহ না ধরিবে মোরে অনন্ত সাগরে তুই,       মিশাইবি শেষে। চল যাই দুই জনে অনন্ত উদ্দেশে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/929
3800
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যেদিন তুমি আপনি ছিলে একা
ভক্তিমূলক
যেদিন তুমি আপনি ছিলে একা আপনাকে তো হয় নি তোমার দেখা। সেদিন কোথাও কারো লাগি ছিল না পথ-চাওয়া; এপার হতে ওপার বেয়ে বয় নি ধেয়ে কাঁদন-ভরা বাঁধন-ছেঁড়া হাওয়া। আমি এলেম, ভাঙল তোমার ঘুম, শূন্যে শূন্যে ফুটল আলোর আনন্দ-কুসুম। আমায় তুমি ফুলে ফুলে ফুটিয়ে তুলে দুলিয়ে দিলে নানা রূপের দোলে। আমায় তুমি তারায় তারায় ছড়িয়ে দিয়ে কুড়িয়ে নিলে কোলে। আমায় তুমি মরণমাঝে লুকিয়ে ফেলে ফিরে ফিরে নূতন করে পেলে। আমি এলেম, কাঁপল তোমার বুক, আমি এলেম, এল তোমার দুখ, আমি এলেম, এল তোমার আগুনভরা আনন্দ, জীবন-মরণ তুফান-তোলা ব্যাকুল বসন্ত। আমি এলেম, তাই তো তুমি এলে, আমার মুখে চেয়ে আমার পরশ পেয়ে আপন পরশ পেলে। আমার চোখে লজ্জা আছে, আমার বুকে ভয়, আমার মুখে ঘোমটা পড়ে রয়; দেখতে তোমায় বাধে ব'লে পড়ে চোখের জল। ওগো আমার প্রভু, জানি আমি তবু আমায় দেখবে ব'লে তোমার অসীম কৌতূহল, নইলে তো এই সূর্যতারা সকলি নিস্ফল। পদ্মাতীরে, ২৫ মাঘ, ১৩২১
https://banglarkobita.com/poem/famous/1941
5583
সুকুমার রায়
কহ ভাই কহ রে
হাস্যরসাত্মক
বদ্যিরা কেন কেউ আলুভাতে খায় না? লেখা আছে কাগজে আলু খেলে মগজে ঘিলু যায় ভেস্তিয়ে বুদ্ধি গজায় না।
https://banglarkobita.com/poem/famous/520
3403
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পুরাতন বৎসরের জীর্ণক্লান্ত রাত্রি
মানবতাবাদী
পুরাতন বৎসরের জীর্ণক্লান্ত রাত্রি ওই কেটে গেল; ওরে যাত্রী। তোমার পথের 'পরে তপ্ত রৌদ্র এনেছে আহ্বান রুদ্রের ভৈরব গান। দূর হতে দূরে বাজে পথ শীর্ণ তীব্র দীর্ঘতান সুরে, যেন পথহারা কোন্‌ বৈরাগীর একতারা। ওরে যাত্রী, ধূসর পথের ধুলা সেই তোর ধাত্রী; চলার অঞ্চলে তোরে ঘূর্ণাপাকে বক্ষেতে আবরি ধরার বন্ধন হতে নিয়ে যাক হরি দিগন্তের পারে দিগন্তরে। ঘরের মঙ্গলশঙ্খ নহে তোর তরে, নহে রে সন্ধ্যার দীপালোক, নহে প্রেয়সীর অশ্রু-চোখ। পথে পথে অপেক্ষিছে কালবৈশাখীর আশীর্বাদ, শ্রাবণরাত্রির বজ্রনাদ। পথে পথে কন্টকের অভ্যর্থনা, পথে পথে গুপ্তসর্প গুপ্তসর্প গূঢ়ফণা। নিন্দা দিবে জয়শঙ্খনাদ এই তোর রুদ্রের প্রসাদ। ক্ষতি এনে দিবে পদে অমূল্য অদৃশ্য উপহার। চেয়েছিলি অমৃতের অধিকার-- সে তো নহে সুখ, ওরে, সে নহে বিশ্রাম, নহে শান্তি, নহে সে আরাম। মৃত্যু তোরে দিবে হানা, দ্বারে দ্বারে পাবি মানা, এই তোর নব বৎসরের আশীর্বাদ, এই তোর রুদ্রের প্রসাদ ভয় নাই, ভয় নাই, যাত্রী। ঘরছাড়া দিকহারা অলক্ষ্মী তোমার বরদাত্রী। পুরাতন বৎসরের জীর্ণক্লান্ত রাত্রি ওই কেটে গেল, ওরে যাত্রী। এসেছে নিষ্ঠুর, হোক রে দ্বারের বন্ধ দূর, হোক রে মদের পাত্র চুর। নাই বুঝি, নাই চিনি, নাই তারে জানি, ধরো তার পাণি; ধ্বনিয়া উঠুক তব হৃৎকম্পনে তার দীপ্ত বাণী। ওরে যাত্রী গেছে কেটে, যাক কেটে পুরাতন রাত্রি। কলিকাতা, ৯ বৈশাখ, ১৩২৩
https://banglarkobita.com/poem/famous/1957
4651
শামসুর রাহমান
খুপরির গান
মানবতাবাদী
ধুলো গিলে ভিড় ছেনে উকুনের উৎপাত উজিয়ে ক্লান্তি ঠেলে রাত্তিরে ঘুমোতে যাই মাথাব্যথা নিয়ে। না-জ্বেলে ক্ষয়িষ্ণু মোমবাতি স্বপ্নচারী বিছানায় গড়াই, লড়াই করি ভাবনার শক্রদের সাথে- হাত নাড়ি লাথি ছুড়ি পৃথিবীর গোলগালা মুখ লক্ষ্য করে। বিবেকের পিঁপড়ে যদি সত্যি হেঁটে যায়পিচ্ছিল দেয়ালে, মন থেকে মুছে নেব ছোটখাটো পাপবোধ অল্পবিস্তরেণ…পোষমানা মূল্যায়নে পাব সুখ দেখব কি নেড়েচেড়ে এক টুকরো হলদে নিষ্প্রাণ কাগজে মোড়া আত্মা, সত্যি একরত্তি সেই আধ্যাত্মিক পিণ্ড…আর পরাবিদ্যা ভাসাব জ্যোৎস্নায়? দিনে কৃষ্ণচূড়া রাতে রজনীগন্ধার স্পর্শ যারা পেতে চায় অন্তরঙ্গ সাহচর্যে, যদি বলে তারা ‘গুনে-গুনে রেজগি দিয়ে প্রতিদিন অভ্যাসবশত ছুঁয়েছি লাভের বুড়ি, লোকসান বলে কাকে জানি না ইয়ার’ ‘কী দেবে জবাব তবে অসংখ্য তারার ব্যালেরিনা,ভ্যানগগ রক্তে তার কালো কাক ফসলের ক্ষেত সূর্যমুখী এক জোড়া জীর্ণ বুটজুড়ো কেবলি মথিত করে রোদে সূচ্যগ্রে বিদ্ধ হল শাশ্বতীর আকাঙ্ক্ষায়, সহযাত্রী বন্ধু তার হলুদ যেসাস খোঁজে আরেক প্রান্তরে নতজানু, ঊর্ধ্ববাহু, কণ্ঠে কালো বৃষ্টির আরক।এ-পাড়ায় ১৭টি উজবুক ৫ জন বোবা ৭টি মাতাল আর ৩ জন কালা বেঁচেবর্তে আছে আজও দুর্দশার নাকের তলায়। মাঝে-মাঝে দুর্লভ আঙুর চেয়ে কেউ-কেউ তারা বলে থাকে ‘টক সব টক-তার চেয়ে তাড়ির ঝাঁঝালো ঢোঁক ঢের ভালো, ভালো সেই গলির মোড়ে জ্বলজ্বলে পানের দোকান আর বাইজির নাচের ঘুঙুর।বমির নোংরায় ভাসে মেঝে, রুটির বাদামি টুকরো চড়ুই পালাল নিয়ে। তাকাব না কখনো বাইরে… ঘরে জানলা নেই…হলুদ যেসাস বিদ্ধ কড়িকাঠে… রৌদ্রঝলসিত কাক ওড়ে মত্ত রক্তে কাঠফাটা আত্মার প্রান্তরে। সারারাত অনিদ্রা দুঃস্বপ্ন আর ছারপোকা, ছিদ্রান্বেষী ইঁদুরের উৎপাত উজিয়ে ময়লা চাদর ছেড়ে উঠি ফের মাথাব্যথা নিয়ে।   (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/khuprir-gan/
5998
হুমায়ূন আহমেদ
কব্বর
চিন্তামূলক
তিনি শায়িত ছিলেন গাঢ় কব্বরে যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বেঁধে দেয়া, গভীরতা নয়। কব্বরে শুয়ে তাঁর হাত কাঁপে পা কাঁপে গভীর বিস্ময়বোধ হয়। মনে জাগে নানা সংশয়। মৃত্যু তো এসে গেছে, শুয়ে আছে পাশে তবু কেন কাটে না এ বেহুদা সংশয়?
http://kobita.banglakosh.com/archives/1124.html
2608
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অপরাজিতা ফুটিল
প্রকৃতিমূলক
অপরাজিতা ফুটিল, লতিকার গর্ব নাহি ধরে— যেন পেয়েছে লিপিকা আকাশের আপন অক্ষরে।  (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/oporajita-futil/
4747
শামসুর রাহমান
টেলিফোন
রূপক
প্রত্যহ সকাল সন্ধ্যা বসে থাকি তীব্র প্রতীক্ষায়, বস্তুত অপেক্ষমাণ আমার নিজস্ব গৃহকোণ সারা দিনমান, কান পেতে থাকি, হয়তো টেলিফোন এখুনি উঠবে বেজে ঘরময় কালো স্তব্ধাতায়। নিবদ্ধ আমার দৃষ্টি শাদা ধূসর খরগোশ-প্রায় যন্ত্রটির গায়ে, ওর এই অন্ধ নীরবতা মন মেনে নিতে চায় না কিছুতে। বুঝি তাই সারাক্ষণ বলো কিছু বলো, বলে চেঁচাই শব্দের সাহারায়।টেলিফোন হার্দ্য বেজে উঠলেই হয়তো কোন্‌ দূর দেশ থেকে (নাবিকের গান-ঝলসিত দ্বীপ?) ভেসে আসবে, ঝরবে হৃদয়ের কানে তোমার মধুর কণ্ঠস্বর, নিরন্তর মনে হয় স্তব্ধ মধ্যরাতে এইতো উঠেছে বেজে, টেলিফোন আমার উদ্দেশে, কিন্তু ভুল শুনি আর কষ্ট পাই নিঃশব্দ সংঘাতে।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/telefon/
6060
হেলাল হাফিজ
যেভাবে সে এলো
মানবতাবাদী
অসম্ভব ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছিলো, সামনে যা পেলো খেলো, যেন মন্বন্তরে কেটে যাওয়া রজতজয়ন্তী শেষে এসেছে সে, সবকিছু উপাদেয় মুখে। গাভিন ক্ষেতের সব ঘ্রাণ টেনে নিলো, করুণ কার্নিশ ঘেঁষে বেড়ে ওঠা লকলকে লতাটিও খেলো, দুধাল গাভীটি খেলো খেলো সব জলের কলস। শানে বাধা ঘাট খেলো সবুজের বনভূমি খেলো উদাস আকাশ খেলো কবিতার পান্ডুলিপি খেলো। দু’পায়া পথের বুক, বিদ্যালয় উপাসনালয় আর কারখানার চিমনি খেলো মতিঝিলে স্টেটব্যাংক খেলো। রাখালের অনুপম বাঁশিটিকে খেলো, মগড়ার তীরে বসে চাল ধোয়া হাতটিকে খেলো স্বাধীনতা সব খেলো, মানুষের দুঃখ খেলো না। ১৮.৩.৮১
https://banglarkobita.com/poem/famous/131
1065
জীবনানন্দ দাশ
ধান কাটা হয়ে গেছে
রূপক
ধান কাটা হয়ে গেছে কবে যেন — ক্ষেত মাঠে পড়ে আছে খড় পাতা কুটো ভাঙা ডিম — সাপের খোলস নীড় শীত। এই সব উৎরায়ে ওইখানে মাঠের ভিতর ঘুমাতেছে কয়েকটি পরিচিত লোক আজ — কেমন নিবিড়। ওইখানে একজন শুয়ে আছে — দিনরাত দেখা হত কত কত দিন হৃদয়ের খেলা নিয়ে তার কাছে করেছি যে কত অপরাধ; শান্তি তবু: গভীর সবুজ ঘাস ঘাসের ফড়িং আজ ঢেকে আছে তার চিন্তা আর জিজ্ঞাসার অন্ধকার স্বাদ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/961
3816
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজা বসেছেন ধ্যানে
হাস্যরসাত্মক
রাজা বসেছেন ধ্যানে, বিশজন সর্দার চীৎকাররবে তারা হাঁকিছে– “খবরদার’।সেনাপতি ডাক ছাড়ে, মন্ত্রী সে দাড়ি নাড়ে, যোগ দিল তার সাথে ঢাকঢোল-বর্দার।ধরাতল কম্পিত, পশুপ্রাণী লম্ফিত, রানীরা মূর্ছা যায় আড়ালেতে পর্দার।  (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/raja-bosechen-dhane/
2243
মহাদেব সাহা
মেঘের জামা
প্রকৃতিমূলক
পাহাড় যেন ট্রাফিক পুলিশ গায়ে মেঘের জামা জেলগেটে ওই ঘন্টা বাজে পড়ায় শপথনামা; ঝড়জলে তাই ঘুমিয়ে যাই- আলস্যে এই মেঘনাঘাটে হয় না দেখি নামা, আকাশ যেন বিরহী এক গায়ে মেঘের জামা। আকাশ বুঝি বলিভিয়ার গভীর ঘন ঘন জেলগেটে ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়ানো একজন। কে সে প্রিয়ংবদা তিস্তা কি নর্মদা; তার কাছে কে পৌছে দেবে সোনার সিংহাসন, মেঘের জামা পরেছে ওই বলিভিয়ার বন।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1420
1475
নির্মলেন্দু গুণ
ওটা কিছু নয়
প্রেমমূলক
এইবার হাত দাও, টের পাচ্ছো আমার অস্তিত্ব ? পাচ্ছো না ? একটু দাঁড়াও আমি তৈরী হয়ে নিই । এইবার হাত দাও, টের পাচ্ছো আমার অস্তিত্ব ? পাচ্ছো না ? তেমার জন্মান্ধ চোখে শুধু ভুল অন্ধকার । ওটা নয়, ওটা চুল । এই হলো আমার আঙ্গুল, এইবার স্পর্শ করো,–না, না, না, -ওটা নয়, ওটা কন্ঠনালী, গরলবিশ্বাসী এক শিল্পীর মাটির ভাস্কর্য, ওটা অগ্নি নয়, অই আমি–আমার যৌবন ।সুখের সামান্য নিচে কেটে ফেলা যন্ত্রণার কবন্ধ–প্রেমিক, ওখানে কী খোঁজ তুমি ? ওটা কিছু নয়, ওটা দুঃখ ; রমণীর ভালোবাসা না-পাওয়ার চিহ্ন বুকে নিয়ে ওটা নদী, নীল হয়ে জমে আছে ঘাসে,–এর ঠিক ডানপাশে , অইখানে হাত দাও, হ্যাঁ, ওটা বুক, অইখানে হাত রাখো, ওটাই হৃদয় ।অইখানে থাকে প্রেম, থাকে স্মৃতি, থাকে সুখ, প্রেমের সিম্ফনি ; অই বুকে প্রেম ছিল, স্মৃতি ছিল, সব ছিল তুমিই থাকো নি ।
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/ota-kicho-noy/
5671
সুকুমার রায়
ভাল ছেলের নালিশ
ছড়া
মাগো! প্রসন্নটা দুষ্টু এমন! খাচ্ছিল সে পরোটা গুড় মাখিয়ে আরাম ক'রে বসে - আমায় দেখে একটা দিল ,নয়কো তাও বড়টা, দুইখানা সেই আপনি খেল ক'ষে! তাইতে আমি কান ধরে তার একটুখানি পেঁচিয়ে কিল মেরেছি 'হ্যাংলা ছেলে' বলে- অম্‌‌নি কিনা মিথ্যা করে ষাঁড়ের মত চেচিয়ে গেল সে তার মায়ের কাছে চলে!মাগো! এম্‌‌নিধারা শয়তানি তার, খেলতে গেলাম দুপুরে, বল্‌ল, 'এখন খেলতে আমার মানা'- ঘন্টাখানেক পরেই দেখি দিব্যি ছাতের উপরে ওড়াচ্ছে তার সবুজ ঘুড়ি খানা। তাইতে আমি দৌড়ে গিয়ে ঢিল মেরে আর খুঁচিয়ে ঘুড়ির পেটে দিলাম করে ফুটো- আবার দেখ বুক ফুলিয়ে সটান মাথা উঁচিয়ে আনছে কিনে নতুন ঘুড়ি দুটো!
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/valo-cheler-nalish/
1890
পূর্ণেন্দু পত্রী
রামকিস্কর
চিন্তামূলক
খানিকটা পাথর দাও আর একটু বুক-খোলা মাঠ হে কলকাতা, হে আমার রুগ্ন জীর্ণ মুহ্যমান শিল্পের সম্রাট রক্তে নাচে ছেণী বাতাসে উড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে যুবতীর বেপরোয়া বেশী কিংবা কারো কালো চুলে অকষ্মাৎ কালবৈশাখী একটু পাথর পেলে আঁকি মেঘ কিংবা ঝড় পাড়াগাঁর অন্ধকারে রোদে জলে হিম রাতে স্থির আলো জ্বালে ধুলোর সংসারে বসে যে সকল নিঃসম্বল পার্বতী ও পরমেশ্বর কিংবা গাছ, গাছই ভালো, গাছের অরণ্যমুখী হাঁটা আজানুলম্বিত বাহু, দীর্ঘকায়, দৃপ্ত পদক্ষেপ, রোদমাখা ঋষি ফুলের মশাল হাতে, বাকলে ফাটল, গায়ে কাঁটা অথবা গাছের মতো কিছু সুর্যের নিকটবর্তী, নক্ষত্রলোকের চেয়ে যৎসামান্য নীচু মানুষ বা মানুষের বুকের নদীর মহোৎসব ভালোবাসা ফুটে আছে, হাড় মাংসে আলোড়িত টব অথবা জীবন, এই জীবনের নিশ্বাস-প্রশ্বাস রক্ত স্বেদ ক্ষুধা, তৃষ্ণা, খেদ সাহস, সংগ্রাম, অট্রহাসি, আর্তনাদ, গান অনেক আগুনে পুড়ে তবুও বজ্রের ভঙ্গী যার অঙ্গ নয়, শুধু অঙ্গ নয় আমার ছেণীতে নাচে চৈতন্যের প্রতি অঙ্গীকার। একটু পাথর দাও হে কলকাতা রক্তে আকুলতা বাতাসে উড়িয়ে দিই যুবতীর আঁচলের মতো কোনো প্রিয় সত্য কথা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1238
4988
শামসুর রাহমান
বন্ধুদের প্রতি
চিন্তামূলক
সময়ের প্রশংসা করবো বলে আমরা ক’জন খুজি কিছু বাছা-বাছা চিত্রকলা, উপমা প্রতীক মগজকে হুকুম খাটিয়ে। কল্পনার জামেয়ারে সত্তা ঢেকে দেখি ক’টি অপোগণ্ড পোকা ইতিমধ্যে রূপক করেছে নষ্ট। দর্শনের মেরাপ-বাঁধানো প্রাঙ্গণ কয়েক বিঘা জুড়ে আছে, একটি জিজ্ঞাসা ভেঙে চুরে হাজার জিজ্ঞাসা আড়চোখে চেয়ে থাকে দ্বিধান্বিত নীলিমার দিকে। আমরা চেঁচিয়ে মরি সমস্বরে- ইতিহাস লেখে কতো কাকের ছা বকের ছা- পাই না স্তুতির ভাষা। কয়েক পুরুষ অপেক্ষায় স্থিত হলে হয়তো উজ্জ্বল লোকভাষা জন্ম নেবে, কবিত্বের শৃঙ্গারে বাড়বে জানি কালের জৌলুস।আমরা কয়েকজন আমোদ প্রমোদ ক্লান্ত হয়ে আত্মপরিচয় ঢেকে ব্যক্তিগত বিকারী ধোঁয়ায় দুশ্চিন্তার উপদ্রবে ছিঁড়ে ফেলি শিল্পের জটিল অন্তর্বাস, পণ্ড করি, কনাব, তারার শুদ্ধ খেলা।কী ভ্রান্তিবিলাসে দেখি ধাতুর প্রাসাদে কয়েকটি অন্ধ ঘোড়া রাত্রিদিন ঘোরে এক অর্থহীনতায়ঃ তাদের আরোহী নেই, মালিকানা জানা নেই কারো ত্রিধাতু নির্মিত সেই প্রাসাদের। অন্ধ ও বধির ঘোড়াগুলি নক্ষত্রে বমন করে, লেজের দাপটে তাড়িয়ে বেড়ায় খোজা ক্রীতদাস, নগ্ন ক্রীতদাসী সর্বক্ষণ একই বৃত্তে। অবিবেকী সুরে স্তূপীকৃত শব হলো ছিন্নভিন্ন, চতুর্দিক নক্ষত্র, বিষ্ঠায় মতিচ্ছন্ন একাকার। আশেপাশে যা-কিছু চোখের চাওয়ায় এখনো স্পষ্ট, জোবজগতের সেই সব আনন্দ সঙ্কট ত্রাস প্রতিক্রিয়া খোঁজে মননের তীব্র সত্যে, স্বচ্ছতায়। কিন্তু আজো ক’পা বাড়ালেই পণ্ড হয় চৈতন্যের নব্য নাট্য, মনন গোঙায়!আমাদের পিতৃপুরুষের চেনা রূপলোক আজ ব্যঙ্গচিত্র বর্ণাভাসে চৈতন্যের বিনিদ্র নিষ্ঠায়, জীবন যাত্রার নাটে। যখন বাতিকগ্রস্ত আলো গাধার চিৎকার হয়ে ফেটে পড়ে ধাতুর চত্বরে, আমরা কয়েকজন একচ্ছত্র ভীষণ পিতলে নীলিমা মিশিয়ে কিছু, মানবিক গলিঘুঁজি ঘেঁটে ভুলে যেতে চাই এই শতকের জলাতঙ্ক, দূর সমাজের সুখসঙ্গ, ভুল রূপকের খেসারৎ!সমস্ত আকাশে চাঁদ পিটিয়ে রুপালি কানাস্তারা আস্তাকুঁড়ে ভাবুককে বেকুব বানায়। অবসাদে হাই তোলে ইতিহাস। হরিণ এবং খচ্চরের সংগমে নিতেছে জন্ম অদ্ভুত বেখাপ্পা জন্তু সব।পৃথিবীকে বদলাতে পারি না আমরা, পারবো না ওষুধবিষুধ দিয়ে কিংবা ঝাড়ফুঁকে পৃথিবীর শুশ্রূষা করতে। শুধু কিছু উপমা প্রতীক আর চিত্রকল্পে শিল্পের শুদ্ধতা দেব ভাষার গতিকে।   (বিধ্বস্ত নিলীমা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/bondhuder-proti/
2022
ভাস্কর চক্রবর্তী
রক্ত
চিন্তামূলক
শুধু ফোটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরে পড়ে রক্ত। এক মুহূর্তের রক্ত অন্য মুহূর্তের গায়ে ঝরে পড়ে। …চশমা পরিষ্কার করে আমি ইতিহাস পড়ি। ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরে পড়ে বিছানার ওপর রক্ত ঝরে পড়ে সমস্ত জীবন বেয়ে
http://kobita.banglakosh.com/archives/4234.html
4768
শামসুর রাহমান
তাঁর পেছনে
মানবতাবাদী
নানা জনের নানা কথা, কেউ কারো কথা শুনছে বলে মনে হলো না। শুধু একটা কলরব সারা ঘর জুড়ে। বহু কণ্ঠস্বরের মধ্যে আমার গলার আওয়াজ সাঁঝ বেলার আলোর মতো আবছা।আমি থমকে দাঁড়ানো, জখমি, তেজী ঘোড়ার মতো আন্দোলন বিষয়ে কিছু বলতে চাইলাম। নামী দামী নেতারা মুখে ঐক্যের বুলি নিয়ে অনৈক্যের বহু মুণ্ডু-অলা ষাঁড়টিকে ছেড়ে দিয়েছেন ময়দানে; এই সুযোগ যিনি এদেশের হর্তা কর্তা বিধাতা, তিনি গণতন্ত্রকে দিব্যি ঘোল খাইয়ে ছাড়ছেন। নিজে তিনি সাচ্চা ধার্মিক কিনা তা শুধু আলেমুল গায়েবই বলতে পারেন, তবে নিজের তখতটিকে সামলে সুমলে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কায়েমের তাগিদে ধর্মের কল নাড়াতে চাইছেন জোরেশোরে। কিন্তু তার কি জানা নেই ধর্মের কল বাতাসে নড়ে?এসব কথা বলতে চাইছিলাম উচ্চকণ্ঠে, কিন্তু আমার গলা থেকে কোনো আওয়াজ বেরুচ্ছিল না। ক্লান্ত হয়ে জনশূন্য ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম টেবিলে মাথা রেখে; হতাশার কুয়াশা আমাকে জড়িয়ে রেখেছে। হঠাৎ চমকে উঠে দেখি, কে যেন হাত রেখেছে আমার কাঁধে। তাকে কখনো দেখেছি বলে মনে হলো না, অথচ অনেক চেনা সেই মুখ।তাঁর হাতে জ্বলজ্বলে একটি পতাকা,রক্তের মতো লাল! জোরালো কণ্ঠে বললেন তিনি-, তোমরা এভাবে অরণ্যে রোদন করবে, একে অন্যের কুশ পুত্তলিকা পোড়াবে, হতাশার আলিঙ্গনে আত্মসমর্পণে বুঁদ হয়ে থাকবে পরাজয়ের নেশায়, এ জন্যেই কি রাজবন্দিরা বছরের পর বছর জীবন ক্ষইয়ে দিচ্ছেন জেলে? এ জন্যেই কি আমরা বুকের রক্ত দিয়ে স্বদেশের ধুলোমাখা পা ধুয়েছি বার বার? এ জন্যেই কি সেজে গুজে নওশা হবার বয়সে আমরা বরণ করেছি শাহাদত? কেন তুমি এমন নীরব, নিঝুম হয়ে আছো? আমার কণ্ঠস্বর কোথাও পৌছয় না, আমি বললাম তাঁর চোখে চোখ রেখে। ‘এ নিয়ে ভাবনা করো না, বজ্র বয়ে বেড়াবে তোমার কণ্ঠস্বর, আর সেই আওয়াজ পৌঁছে যাবে ঘরে ঘরে। কানে আসে তাঁর গমগমে উত্তর।তারপর সেই শহীদ মাথা উঁচিয়ে হাওয়ায় নিশান উড়িয়ে জোর কদমে চললেন এগিয়ে। আমি তাঁকে অনুসরণ করবো কি করবো না ভাবছি এবং চেয়ার ছেড়ে ওঠার আগেই দেখি তাঁর পেছনে গনগনে এক জনসমুদ্র।   (হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tar-pechone/
4315
শামসুর রাহমান
অভিমানী বাংলাভাষা
স্বদেশমূলক
মানুষের অবয়ব থেকে, নিসর্গের চোখ থেকে এমন কি শাক সব্‌জি, আসবাব ইত্যাদি থেকেও স্মৃতি ঝরে অবিরল। রাজপথ এবং পলাশ যখন চমকে উঠেছিল পদধ্বনি, বন্দুকের শব্দে ঘন ঘন, স্মৃতি নিজস্ব বুননে অন্তরালে করেছে রচনা কিছু গল্প-গাথা, সত্যের চেয়েও বেশি দীপ্র। কান্তিমান মোরগের মতো মাথা তুলে কখনো একটি দিন দেয় ডাক, পরিপার্শ্ব দোলে, মানুষ তাকায় চতুর্দিকে, কেউ কৌতূহলে, কেউগভীর তাগিদে কোনো, যেন কিছু করবার আছে, সত্তায় চাঞ্চল্য আসে। করতলে স্বপ্নের নিভৃতে মনে পড়ে, দিকচিহ্ন, গেরস্থালি, নক্ষত্র দুলিয়ে অভিমানী বাংলাভাষা সে কবে বিদ্রোহ করেছিল।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ovimani-banglavasha/
2659
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আজ
প্রকৃতিমূলক
আজ তালের বনের করতালি কিসের তালে পূর্ণিমাচাঁদ মাঠের পারে ওঠার কালে॥ না-দেখা কোন্‌ বীণা বাজে আকাশ-মাঝে, না-শোনা কোন্‌ রাগ রাগিণী শূন্যে ঢালে॥ ওর খুশির সাথে কোন্‌ খুশির আজ মেলামেশা, কোন্‌ বিশ্বমাতন গানের নেশায় লাগল নেশা। তারায় কাঁপে রিনিঝিনি যে কিঙ্কিণী তারি কাঁপন লাগল কি ওর মুগ্ধ ভালে॥
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%9c-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%bf-%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a7%80/
2468
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
এ কালের নামতা
মানবতাবাদী
এক এককে এক আমার দিকে দ্যাখ চাঁদাবাজির টাকায় কেমন ফুলিয়েছি ট্যাক । দুই এককে দুই কি ভাবছিস তুই কেমন করে বুক ফুলিয়ে পরের টাকা ছুঁই? তিন এককে তিন ভাবনা চিন্তাহীন নেতার হস্ত মাথার উপর আছে যতো দিন । চার এককে চার কে ধারে কার ধার এই টাকাতেই করবো শুরু ইয়াবা কারবার । পাঁচ এককে পাঁচ নেশার ঘোরে নাচ কার সাথে কি ঘটে যাবে পাবো না তার আঁচ । ছয় এককে ছয় পুলোক যখন হয় ফুটুস-ফাটাস ছুড়তে গুলি পাই না কোনো ভয় । সাত এককে সাত হত্যা-তো ডাল-ভাত বিশ্বজিতের মতো কতোই মরবে তো নির্ঘাত । আট এককে আট এতোই আমার ঠাট আমার সাথে হাত মিলিয়ে যা খুশী মার-কাট । নয় এককে নয় আমার পরিচয়? এতক্ষণেও হলো না তোর কোনোই বোধোদয় ! দশ এককে দশ সবই আমার বশ ক্ষমতাটা আছে পিছে তাই এতো হাত-যশ ।
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/e-kaler-namta/
2813
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এক গাঁয়ে
প্রেমমূলক
আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি সেই আমাদের একটিমাত্র সুখ, তাদের গাছে গায় যে দোয়েল পাখি তাহার গানে আমার নাচে বুক। তাহার দুটি পালন-করা ভেড়া চরে বেড়ায় মোদের বটমূলে, যদি ভাঙে আমার খেতের বেড়া কোলের 'পরে নিই তাহারে তুলে।আমাদের এই গ্রামের নামটি খঞ্জনা, আমাদের এই নদীর নাম অঞ্জনা, আমার নাম তো জানে গাঁয়ের পাঁচ জনে-- আমাদের সেই তাহার নামটি রঞ্জনা।দুইটি পাড়ায় বড়োই কাছাকাছি, মাঝে শুধু একটি মাঠের ফাঁক-- তাদের বনের অনেক মধুমাছি মোদের বনে বাঁধে মধুর চাক। তাদের ঘাটে পূজার জবামালা ভেসে আসে মোদের বাঁধা ঘাটে, তাদের পাড়ার কুসুম-ফুলের ডালা বেচতে আসে মোদের পাড়ার হাটে।আমাদের এই গ্রামের নামটি খঞ্জনা, আমাদের এই নদীর নাম অঞ্জনা, আমার নাম তো জানে গাঁয়ের পাঁচ জনে-- আমাদের সেই তাহার নামটি রঞ্জনা।আমাদের এই গ্রামের গলি-'পরে আমের বোলে ভরে আমের বন, তাদের খেতে যখন তিসি ধরে মোদের খেতে তখন ফোটে শণ। তাদের ছাদে যখন ওঠে তারা আমার ছাদে দখিন হাওয়া ছোটে। তাদের বনে ঝরে শ্রাবণধারা, আমার বনে কদম ফুটে ওঠে।আমাদের এই গ্রামের নামটি খঞ্জনা, আমাদের এই নদীর নামটি অঞ্জনা, আমার নাম তো জানে গাঁয়ের পাঁচ জনে-- আমাদের সেই তাহার নামটি রঞ্জনা।কাব্যগ্রন্থ - ক্ষণিকা
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ek-ganye/
1131
জীবনানন্দ দাশ
বিভিন্ন কোরাস
চিন্তামূলক
পৃথিবীতে ঢের দিন বেঁচে থাকে আমাদের আয়ু এখন মৃত্যুর শব্দ শোনে দিনমান। হৃদয়কে চোখঠার দিয়ে ঘুমে রেখে হয়তো দুর্যোগে তৃপ্তি পেতে পারে কান; এ রকম একদিন মনে হয়েছিলো; অনেক নিকটে তবু সেই ঘোর ঘনায়েছে আজ; আমাদের উঁচু-নিচু দেয়ালের ভিতরে খোড়লে ততোধিক গুনাগার আপনার কাজ ক'রে যায়;- ঘরের ভিতর থেকে খ'সে গিয়ে সন্তুতির মন বিভীষণ, নৃসিংহের আবেদন পরিপাক ক'রে ভোরের ভিতর থেকে বিকেলের দিকে চ'লে যায়, রাতকে উপেক্ষা ক'রে পুনরায় ভোরে ভিরে আসে;- তবুও তাদের কোনো বাসস্থান নেই, যদিও বিশ্বাসে চোখ বুজে ঘর করেছি নির্মাণ ঢের আগে একদিন;- গ্রাসাচ্ছাদন নেই তবুও তাদের, যদিও মাটির দিকে মুখ রেখে পৃথিবীর ধান রুয়ে গেছি একদিন;- অন্যসব জিনিস হারায়ে, সমস্ত চিন্তার দেশ ঘুরে তবু তাহাদের মন আলোকসামন্য ভাবে সুচিন্তাকে অধিকার ক'রে কোথাও সম্মুখে পথ, পশ্চাদ্‌গমন হারায়েছে- উতরোল নিরবতা আমাদের ঘরে। আমরা তো বহুদিন লক্ষ্য চেয়ে নগরীর পথে হেঁটে গেছি;- কাজ ক'রে চ'লে গেছি অর্থভোগ করে; ভোট দিয়ে মিশে গেছি জনমতামতে। গ্রন্থকে বিশ্বাস ক'রে প'ড়ে গেছি; সহধর্মীদের সাথে জীবনের আখড়াই, সাক্ষরের অক্ষরের কথা মনে ক'রে নিয়ে ঢের পাপ ক'রে, পাপকথা উচ্চারণ ক'রে, তবুও বিশ্বাসভ্রষ্ট হ'য়ে গয়ে জীবনের যৌন একাগ্রতা হারাইনি; তবুও কোথাও কোনো প্রীতি নেই এতদিন পরে। নগরীর রাজপথে মোড়ে-মোড়ে চিহ্ন প'ড়ে আছে; একটি মৃতের দেহ অপরের শবকে জড়ায়ে তবুও আতঙ্কে হিম- হয়তো দ্বিতীয় কোনো মরণের কাছে। আমাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, নারী, হেমন্তের হলুদ ফসল ইতস্তত চ'লে যায় যে যাহার স্বর্গের সন্ধানে; কারু মুখে তবুও দ্বিরুক্তি নেই- পথ নেই ব'লে, যথাস্থান থেকে খ'সে তবুও সকলি যথাস্থানে র'য়ে যায়;- শতাব্দীর শেষ হ'লে এ-রকম আবিষ্ট নিয়ম নেমে আসে;- বিকেলের বারান্দার থেকে সব জীর্ণ নরনারী চেয়ে আছে পড়ন্ত রোদের পারে সূর্যের দিকেঃ খণ্ডহীন মণ্ডলের মতো বেলোয়ারি।২নিকটে মরুর মতো মহাদেশ ছড়ায়ে রয়েছেঃ যতদূর চোখ যায়- অনুভব করি; তবু তাকে সমুদ্রের তিতীর্ষু আলোর মতো মনে ক'রে নিয়ে আমাদের জানালায় অনেক মানুষ, চেয়ে আছে দিনমান হেঁয়ালির দিকে। তাদের মুখের পানে চেয়ে মনে হয় হয়তো বা সমুদ্রের সুর শোনে তারা, ভীত মুখশ্রীর সাথে এ-রকম অনন্য বিস্ময় মিশে আছে;- তাহারা অনেক কাল আমাদের দেশে ঘুরে-ফিরে বেড়িয়েছে শারীরিক জিনিসের মতো; পুরুষের পরাজয় দেখে গেছে বাস্তব দৈবের সাথে রণে; হয়তো বস্তুর বল জিতে গেছে প্রজ্ঞাবশত; হয়তো বা দৈবের অজেয় ক্ষমতা- নিজের ক্ষমতা তার এত বেশি ব'লে শুনে গেছে ঢের দিন আমাদের মুখের ভণিতা; তবুও বক্তৃতা শেষ হ'য়ে যায় বেশি করতালি শুরু হ'লে। এরা তাহা জানে সব। আমাদের অন্ধকারে পরিত্যক্ত ক্ষেতের ফসল ঝাড়ে-গোছে অপরূপ হ'য়ে ওঠে তবু বিচিত্র ছবির মায়াবল। ঢের দূরে নগরীর নাভির ভিতরে আজ ভোরে যাহারা কিছুই সৃষ্টি করে নাই তাহাদের অবিকার মন শৃঙ্খলায় জেগে উঠে কাজ করে,- রাত্রে ঘুমায় পরিচিত স্মৃতির মতন। সেই থেকে কলরব, কাড়াকাড়ি, অপমৃত্যু, ভ্রাতৃবিরোধ, অন্ধকার সংসার, ব্যাজস্তুতি, ভয়, নিরাশার জন্ম হয়। সমুদ্রের পরপার থেকে তাই স্মিতচক্ষু নাবিকেরা আসে; ঈশ্বরের চেয়ে স্পর্শময় আক্ষেপে প্রস্তুত হ'য়ে অর্ধনারীশ্বর তরাইয়ের থেকে লুব্ধ বঙ্গোপসাগরে সুকুমার ছায়া ফেলে সূর্যিমামার নাবিকের লিবিডোকে উদ্বোধিত করে।৩ঘাসের উপর দিয়ে ভেসে যায় সবুজ বাতাস। অথবা সবুজ বুঝি ঘাস। অথবা নদীর নাম মনে ল'রে নিতে গেলে চারদিকে প্রতিভাত হ'য়ে উঠে নদী দেখা দেয় বিকেল অবধি; অসংখ্য সূর্যের চোখে তরঙ্গের আনন্দে গড়ায়ে ডাইনে আর বাঁয়ে চেয়ে দ্যাখে মানুষের দুঃখ, ক্লান্তি, দীপ্তি, অধঃপতনের সীমা; ঊনিশশো বেয়াল্লিশ সালে ঠেকে পুনরায় নতুন গরিমা পেতে চায় ধোঁইয়া, রক্ত, অন্ধ আঁধারের খাত বেয়ে; ঘাসের চেয়েও বেশী মেয়ে; নদীর চেয়েও বেশি ঊনিশশো তেতাল্লিশ, চুয়াল্লিশ উৎক্রান্ত পুরুষের হাল; কামানের ঊর্ধ্বে রৌদ্রে নীলাকাশে অমল মরাল ভারতসাগর ছেড়ে উড়ে যায় অন্য এক সমুদ্রের পানে- মেঘের ফোঁটার মতো স্বচ্ছ, গড়ানে; সুবাতাস কেটে রাতা পালকের পাখি তবু; ওরা এলে সহসা রোদের পথে অনন্ত পারুলে ইস্পাতের সূচীমুখ ফুটে ওঠে ওদের কাঁধের 'পরে, নীলিমার তলে; অবশেষে জাগরূক জনসাধারণ আজ চলে? রিরাংসা, অন্যায়, রক্ত, উৎকোচ, কানাঘুষো, ভয় চেয়েছে ভাবের ঘরে চুরি বিনে জ্ঞান ও প্রণয়? মহাসাগরের জল কখমো কি সৎবিজ্ঞতার মতো হয়েছিলো স্থির- নিজের জলের ফেনশির নীড়কে কি চিনেছিলো তনুবাত নীলিমার নীচে? না হ'লে উচ্ছল সিন্ধু মিছে? তবুও মিথ্যা নয়ঃ সাগরের বালি পাতালের কালি ঠেলে সময়সুখ্যাত গুণে অন্ধ হ'য়ে, পরে আলোকিত হ'য়ে গেলে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/bivinno-corus/
1462
নির্মলেন্দু গুণ
আবার
প্রেমমূলক
আবার একটা ফুঁ দিয়ে দাও, মাথার চুল মেঘের মতো উড়ুক । আবার একটা ফুঁ দিয়ে দাও, স্বপ্নগুলো ছায়ার মতো ঘুরুক ।আবার একটা ফুঁ দিয়ে দাও, আটোমেটিক ঘড়ির মতো চলতে থাকি একা ।আবার একটা ফুঁ দিয়ে দাও, অন্ধকারে সলতে হয়ে জ্বলতে থাকি একা ।আবার একটা ফুঁ দিয়ে দাও, ফুসফুসে পাই হাওয়া ।আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই বলে দেব স্ট্রেটকাটঃ ‘ভালোবাসি’। এরকম সত্য-ভাষণে যদি কেঁপে ওঠে, অথবা ঠোঁটের কাছে উচ্চারিত শব্দ থেমে যায়, আমি নখাগ্রে দেখাবো প্রেম, ভালোবাসা, বক্ষ চিরে তোমার প্রতিমা। দেয়ালে টাঙ্গানো কোন প্রথাসিদ্ধ দেবীচিত্র নয়, রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে দেখবে নিজের মুখে ভালোবাসা ছায়া ফেলিয়াছে।এরকম উন্মোচনে যদি তুমি আনুরাগে মুর্ছা যেতে চাও মূর্ছা যাবে,জাগাবো না,নিজের শরীর দিয়ে কফিন বানাবো।‘ভালোবাসি’ বলে দেব স্ট্রেটকাট, আবার যখনই দেখা হবে।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%af%e0%a6%96%e0%a6%a8%e0%a6%87-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%be-%e0%a6%b9%e0%a6%ac%e0%a7%87-%e0%a6%a8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b2/
3221
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দু-কানে ফুটিয়ে দিয়ে
হাস্যরসাত্মক
দু-কানে ফুটিয়ে দিয়ে কাঁকড়ার দাঁড়া বর বলে, “কান দুটো ধীরে ধীরে নাড়া।’ বউ দেখে আয়নায়, জাপানে কি চায়নায় হাজার হাজার আছে মেছনীর পাড়া– কোথাও ঘটেনি কানে এত বড়ো ফাঁড়া।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/du-kan-futie-diye/
5492
সুকান্ত ভট্টাচার্য
পরিচয়
ছড়া
ও পাড়ার শ্যাম রায় কাছে পেলে কামড়ায় এমনি সে পালোয়ান, একদিন দুপুরে ডেকে বলে গুপুরে ‘এক্ষুনি আলো আন্’৷ কী বিপদ তা হ’লে মার খাব আমরা? দিলে পরে উত্তর রেগে বলে ‘দুত্তর, যত সব দামড়া’৷ কেঁদে বলি, শ্রীপদে বাঁচাও এ বিপদে— অক্ষম আমাদের৷ হেসে বলে শাম-দা নিয়ে আয় রামদা ধুবড়ির রামাদের॥‘পরিচয়’ ছড়াটির রচনাকাল ১৯৩৯-৪০ সাল বলে মনে হয়৷
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/porichoy/
3384
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পাঠশালে হাই তোলে
হাস্যরসাত্মক
পাঠশালে হাই তোলে মতিলাল নন্দী; বলে, “পাঠ এগোয় না যত কেন মন দি।’ শেষকালে একদিন গেল চড়ি টঙ্গায়, পাতাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে ভাসালো মা-গঙ্গায়, সমাস এগিয়ে গেল, ভেসে গেল সন্ধি– পাঠ এগোবার তরে এই তার ফন্দি।  (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/pathshale-hai-tole/
3335
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
নূতন চাল
নীতিমূলক
এক দিন গরজিয়া কহিল মহিষ, ঘোড়ার মতন মোর থাকিবে সহিস। একেবারে ছাড়িয়াছি মহিষি-চলন, দুই বেলা চাই মোর দলন-মলন। এই ভাবে প্রতিদিন, রজনী পোহালে, বিপরীত দাপাদাপি করে সে গোহালে। প্রভু কহে,চাই বটে! ভালো, তাই হোক! পশ্চাতে রাখিল তার দশ জন লোক। দুটো দিন না যাইতে কেঁদে কয় মোষ, আর কাজ নেই প্রভু, হয়েছে সন্তোষ। সহিসের হাত হতে দাও অব্যাহতি, দলন-মলনটার বাড়াবাড়ি অতি।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/nuton-chal/
223
কাজী নজরুল ইসলাম
আমাদের নারী
মানবতাবাদী
গুনে গরিমায় আমাদের নারী আদর্শ দুনিয়ায়। রূপে লাবন্যে মাধুরী ও শ্রীতে হুরী পরী লাজ পায়।। নর নহে, নারী ইসলাম পরে প্রথম আনে ঈমান, আম্মা খাদিজা জগতে সর্ব-প্রথম মুসলমান, পুরুষের সব গৌরবস্নান এক এই  মহিমায়।। নবী নন্দিনী ফাতেমা মোদের সতী নারীদের রাণী, যাঁর ত্যাগ সেবা স্নেহ ছিল মরূভুমে কওসর পানি, যাঁর গুণ-গাথা ঘরে ঘরে প্রতি  নর-নারী আজো গায়।। রহিমার মত মহিমা কাহার, তাঁর সম সতী কেবা, নারী নয় যেন মূর্তি ধরিয়া এসেছিল পতি সেবা মোদের খাওয়ালা জগতের আলা বীরত্বে গরিমায়।। রাজ্য শাসনের রিজিয়ার নাম ইতিহাসে অক্ষয়, শৌর্যে সাহসে চাঁদ সুলতানা বিশ্বের বিস্ময়। জেবুন্নেসার তুলনায় কোথায় জ্ঞানের তাপস্যার।। বারো বছরের বালিকা লায়লা ওহাবীব দলপতি মোদের সাকিনা জাহানারা যেন ধৈর্য মূর্তিমতী, সে গৌরবের গোর হয়ে গেছে আঁধারের বোরকায়।। আঁধার হেরেমে বন্দিনী হলো সহসা আলোর মেয়ে, সেই দিন হতে ইসলাম গেল গ্লানির কালিতে ছেয়ে লক্ষ খালিদা আসিবে, যদি এ নারীরা মুক্তি পায়।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/amader-nari/
5625
সুকুমার রায়
দাঁড়ের কবিতা
হাস্যরসাত্মক
চুপ কর্ শোন্ শোন্, বেয়াকুফ হোস্ নে ঠেকে গেছি বাপ্ রে কি ভয়ানক প্রশ্নে! ভেবে ভেবে লিখে লিখে বসে বসে দাঁড়েতে ঝিম্‌ঝিম্ টন্‌টন্ ব্যথা করে হাড়েতে। এক ছিল দাঁড়ি মাঝি— দাড়ি তার মস্ত, দাড়ি দিয়ে দাঁড়ি তার দাঁড়ে খালি ঘষ্‌ত। সেই দাঁড়ে একদিন দাঁড়কাক দাঁড়াল, কাঁকড়ার দাঁড়া দিয়ে দাঁড়ি তারে তাড়াল। কাক বলে রেগেমেগে, “বাড়াবাড়ি ঐতো! না দাঁড়াই দাঁড়ে তবু দাঁড়কাক হই তো? ভারি তোর দাঁড়িগিরি, শোন্ বলি তবে রে— দাঁড় বিনা তুই ব্যাটা দাঁড়ি হোস্ কবে রে? পাখা হলে ‘পাখি’ হয় ব্যাকরণ বিশেষে— কাঁকড়ার দাঁড়া আছে, দাঁড়ি নয় কিসে সে? দ্বারে বসে দারোয়ান, তারে যদি ‘দ্বারী’ কয়, দাঁড়ে-বসা যত পাখি সব তবে দাঁড়ি হয়! দূর দূর! ছাই দাঁড়ি! দাড়ি নিয়ে পাড়ি দে!” দাঁড়ি বলে, “বাস্ বাস্! ঐখেনে দাঁড়ি দে।”
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/darer-kobita/
49
আখতারুজ্জামান আজাদ
চা-পানের
চিন্তামূলক
মুখতার, চা দাও এক কাপ!প্রিয় দেশবাসী, আজ এই টিএসসির খোলা চত্বরে দাঁড়িয়ে ধূমায়মান চায়ের কাপ হাতে নিয়ে, আপনাদেরকে আমি আমার লাগামহীন চা-পানের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করব।আমার হাতে চা-ভর্তি এই যে কাপটি দেখছেন — এই কাপটি একটি ইতিহাস, টিএসসির টি স্টলের প্রতিটি কাপই একেকটি ইতিহাস!খানিক আগে এই কাপে চা খেয়ে গেছে ঘামে-নাওয়া এক রিকশাশ্রমিক, সদ্য-চুমু-খাওয়া রেসকোর্সফেরত এক উদ্বাহু প্রেমিক।শ্রমিকের নাকের ঘাম, প্রেমিকের ঠোঁটের কাম — লেগে আছে এই চায়ের কাপে। শ্রমিকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, প্রেমিকের ওষ্ঠীভূত লোভ — গলে আছে এই চায়ের তাপে।হয়তো এই কাপেই চা খেতে খেতে কোনো খুনি এঁকে গেছে কোনো খুনের নকশা, কোনো মুণী আবিষ্কার করে গেছে দর্শনের নয়া নয়া ধোঁয়াশা, প্রেমবঞ্চিত কোনো কবি কারো প্রেমকেলী দেখে ফেলে গেছে দু ফোঁটা চোখের জল, সদ্য-অঙ্কুরোদগম-ঘটা কোনো প্রেমিকা লাগিয়ে গেছে ঠোঁটের ছল।প্রেমিক থেকে শ্রমিক, খুনি থেকে মুণী, কবিনেতা থেকে অভিনেতা — প্রত্যেকের মুখস্থ তপ্ত থুতু লেগে এই চায়ের কাপে!এই ঐতিহাসিক কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে আমি পাই ইতিহাসের ছোঁয়া, কেতলির নলে আমি দেখি ইতিহাসের দাউদাউ ধোঁয়া।প্রিয় ধোঁয়া উড়ছে, উড়ছে তো উড়ছেই; চোখের জল পুড়ছে, পুড়ছে তো পুড়ছেই!প্রিয় দেশবাসী, আমি বিশ্বাস করি — হাজার বছরের হাজার আয়োজন শেষে, বহু দূর হতে দ্ব্যর্থক হাসি হেসে, চায়ের চুলোর ধোঁয়ায় ভেসে ভেসে, একদিন সাবালিকা এসে দাঁড়াবে টিএসসির এই টি স্টলে!এবং বলবে — “শত বরষের শতেক স্বপন চায়ের কাপে মাখাও; স্বপ্ন এবার সত্যি তোমার, চা খাও কবি, চা খাও!”মুখতার, চা দাও এক কাপ!প্রিয় দেশবাসী, আজ এই টিএসসির খোলা চত্বরে দাঁড়িয়ে ধূমায়মান চায়ের কাপ হাতে নিয়ে, আপনাদেরকে আমি আমার লাগামহীন চা-পানের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করব।আমার হাতে চা-ভর্তি এই যে কাপটি দেখছেন — এই কাপটি একটি ইতিহাস, টিএসসির টি স্টলের প্রতিটি কাপই একেকটি ইতিহাস!খানিক আগে এই কাপে চা খেয়ে গেছে ঘামে-নাওয়া এক রিকশাশ্রমিক, সদ্য-চুমু-খাওয়া রেসকোর্সফেরত এক উদ্বাহু প্রেমিক।শ্রমিকের নাকের ঘাম, প্রেমিকের ঠোঁটের কাম — লেগে আছে এই চায়ের কাপে। শ্রমিকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, প্রেমিকের ওষ্ঠীভূত লোভ — গলে আছে এই চায়ের তাপে।হয়তো এই কাপেই চা খেতে খেতে কোনো খুনি এঁকে গেছে কোনো খুনের নকশা, কোনো মুণী আবিষ্কার করে গেছে দর্শনের নয়া নয়া ধোঁয়াশা, প্রেমবঞ্চিত কোনো কবি কারো প্রেমকেলী দেখে ফেলে গেছে দু ফোঁটা চোখের জল, সদ্য-অঙ্কুরোদগম-ঘটা কোনো প্রেমিকা লাগিয়ে গেছে ঠোঁটের ছল।প্রেমিক থেকে শ্রমিক, খুনি থেকে মুণী, কবিনেতা থেকে অভিনেতা — প্রত্যেকের মুখস্থ তপ্ত থুতু লেগে এই চায়ের কাপে!এই ঐতিহাসিক কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে আমি পাই ইতিহাসের ছোঁয়া, কেতলির নলে আমি দেখি ইতিহাসের দাউদাউ ধোঁয়া।প্রিয় ধোঁয়া উড়ছে, উড়ছে তো উড়ছেই; চোখের জল পুড়ছে, পুড়ছে তো পুড়ছেই!প্রিয় দেশবাসী, আমি বিশ্বাস করি — হাজার বছরের হাজার আয়োজন শেষে, বহু দূর হতে দ্ব্যর্থক হাসি হেসে, চায়ের চুলোর ধোঁয়ায় ভেসে ভেসে, একদিন সাবালিকা এসে দাঁড়াবে টিএসসির এই টি স্টলে!এবং বলবে — “শত বরষের শতেক স্বপন চায়ের কাপে মাখাও; স্বপ্ন এবার সত্যি তোমার, চা খাও কবি, চা খাও!”মুখতার, চা দাও এক কাপ!প্রিয় দেশবাসী, আজ এই টিএসসির খোলা চত্বরে দাঁড়িয়ে ধূমায়মান চায়ের কাপ হাতে নিয়ে, আপনাদেরকে আমি আমার লাগামহীন চা-পানের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করব।আমার হাতে চা-ভর্তি এই যে কাপটি দেখছেন — এই কাপটি একটি ইতিহাস, টিএসসির টি স্টলের প্রতিটি কাপই একেকটি ইতিহাস!খানিক আগে এই কাপে চা খেয়ে গেছে ঘামে-নাওয়া এক রিকশাশ্রমিক, সদ্য-চুমু-খাওয়া রেসকোর্সফেরত এক উদ্বাহু প্রেমিক।শ্রমিকের নাকের ঘাম, প্রেমিকের ঠোঁটের কাম — লেগে আছে এই চায়ের কাপে। শ্রমিকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, প্রেমিকের ওষ্ঠীভূত লোভ — গলে আছে এই চায়ের তাপে।হয়তো এই কাপেই চা খেতে খেতে কোনো খুনি এঁকে গেছে কোনো খুনের নকশা, কোনো মুণী আবিষ্কার করে গেছে দর্শনের নয়া নয়া ধোঁয়াশা, প্রেমবঞ্চিত কোনো কবি কারো প্রেমকেলী দেখে ফেলে গেছে দু ফোঁটা চোখের জল, সদ্য-অঙ্কুরোদগম-ঘটা কোনো প্রেমিকা লাগিয়ে গেছে ঠোঁটের ছল।প্রেমিক থেকে শ্রমিক, খুনি থেকে মুণী, কবিনেতা থেকে অভিনেতা — প্রত্যেকের মুখস্থ তপ্ত থুতু লেগে এই চায়ের কাপে!এই ঐতিহাসিক কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে আমি পাই ইতিহাসের ছোঁয়া, কেতলির নলে আমি দেখি ইতিহাসের দাউদাউ ধোঁয়া।প্রিয় ধোঁয়া উড়ছে, উড়ছে তো উড়ছেই; চোখের জল পুড়ছে, পুড়ছে তো পুড়ছেই!প্রিয় দেশবাসী, আমি বিশ্বাস করি — হাজার বছরের হাজার আয়োজন শেষে, বহু দূর হতে দ্ব্যর্থক হাসি হেসে, চায়ের চুলোর ধোঁয়ায় ভেসে ভেসে, একদিন সাবালিকা এসে দাঁড়াবে টিএসসির এই টি স্টলে!এবং বলবে — “শত বরষের শতেক স্বপন চায়ের কাপে মাখাও; স্বপ্ন এবার সত্যি তোমার, চা খাও কবি, চা খাও!”
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9a%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%87%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%a4-%e0%a6%86%e0%a6%96%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%81/
574
কায়কোবাদ
প্রণয়ের প্রথম চুম্বন
প্রেমমূলক
(১) মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন! যবে তুমি মুক্ত কেশে ফুলরাণী বেশে এসে, করেছিলে মোরে প্রিয় স্নেহ-আলিঙ্গন! মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন?(২) প্রথম চুম্বন! মানব জীবনে আহা শান্তি-প্রস্রবণ! কত প্রেম কত আশা, কত স্নেহ ভালবাসা, বিরাজে তাহায়, সে যে অপার্থিব ধন! মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!(৩) হায় সে চুম্বনে কত সুখ দুঃখে কত অশ্রু বরিষণ! কত হাসি, কত ব্যথা, আকুলতা, ব্যাকুলতা, প্রাণে প্রাণে কত কথা, কত সম্ভাষণ! মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!(৪) সে চুম্বন, আলিঙ্গন, প্রেম-সম্ভাষণ, অতৃপ্ত হৃদয় মূলে ভীষণ ঝটিকা তুলে, উন্মত্ততা, মাদকতা ভরা অনুক্ষণ, মনে কি পড়ে গো সেই প্রথম চুম্বন!
http://kobita.banglakosh.com/archives/3828.html
1237
জীবনানন্দ দাশ
সূর্য নক্ষত্র নারী
প্রেমমূলক
তোমার নিকট থেকে সর্বদাই বিদায়ের কথা ছিলো সব চেয়ে আগে; জানি আমি। সে-দিনও তোমার সাথে মুখ-চেনা হয় নাই। তুমি যে এ-পৃথিবীতে র’য়ে গেছো। আমাকে বলেনি কেউ। কোথাও জল্কে ঘিরে পৃথিবীর অফুরান জল র’য়ে গেছে;– যে যার নিজের কাজে আছে, এই অনুভবে চ’লে শিয়রে নিয়ত স্ফীত সুর্যকে চেনে তারা; আকাশের সপ্রতিভ নক্ষত্রকে চিনে উদীচীর কোনো জল কী ক’রে অপর জল চিনে নেবে অন্য নির্ঝরের? তবুও জীবন ছুঁ’য়ে গেলে তুমি;- আমার চোখের থেকে নিমেষ নিহত সূর্যকে সরায়ে দিয়ে।স’রে যেতো; তবুও আয়ুর দিন ফুরোবার আগে। নব-নব সূর্যকে কে নারীর বদলে ছেড়ে দেয়; কেন দেব? সকল প্রতীতি উৎসবের চেয়ে তবু বড়ো স্থিরতর প্রিয় তুমি;- নিঃসূর্য নির্জন ক’রে দিতে এলে। মিলন ও বিদায়ের প্রয়োজনে আমি যদি মিলিত হতাম তোমার উৎসের সাথে, তবে আমি অন্য সব প্রেমিকের মতো বিরাট পৃথিবী আর সুবিশাল সময়কে সেবা ক’রে আত্মস্থ হতাম। তুমি তা জানো না, তবু, আমি জানি, একবার তোমাকে দেখেছি;- পিছনের পটভূমিকায় সময়ের শেষনাগ ছিলো, নেই;- বিজ্ঞানের ক্লান্ত নক্ষত্রেরা নিভে যায়;- মানুষ অপ্রিজ্ঞাত সে-আমায়; তবুও তাদের একজন গভীর মানুষী কেন নিজেকে চেনায়! আহা, তাকে অন্ধকার অনন্তের মতো আমি জেনে নিয়ে, তবু, অল্পায়ু রঙিন রৌদ্রে মানবের ইতিহাসে কে না জেনে কোথায় চলেছি!দুইচারিদিকে সৃজনের অন্ধকার র’য়ে গেছে, নারী, অবতীর্ণ শরীরের অনুভূতি ছাড়া আরো ভালো কোথাও দ্বিতীয় সূর্য নেই, যা জ্বালালে তোমার শরীর সব অলোকিত ক’রে দিয়ে স্পষ্ট ক’রে দেবে কোনো কালে শরীর যা র’য়ে গেছে। এই সব ঐশী কাল ভেঙে ফেলে দিয়ে নতুন সময় গ’ড়ে নিজেকে না গ’ড়ে তবু তুমি ব্রহ্মান্ডের অন্ধকারে একবার জন্মাবার হেতু অনুভব করেছিলে;- জন্ম-জন্মান্তের মৃত স্মরণের সাঁকো তোমার হৃদয় স্পর্শ করে ব’লে আজ আমাকে ইসারাপাত ক’রে গেলে তারি;- অপার কালের স্রোত না পেলে কী ক’রে তবু, নারী তুচ্ছ, খন্ড, অল্প সময়ের স্বত্ব কাটায়ে অঋণী তোমাকে কাছে পাবে- তোমার নিবিড় নিজ চোখ এসে নিজের বিষয় নিয়ে যাবে? সময়ের কক্ষ থেকে দূর কক্ষে চাবি খুলে ফেলে তুমি অন্য সব মেয়েদের আত্ম অন্তরঙ্গতার দান দেখায়ে অনন্তকাল ভেঙ্গে গেলে পরে, যে-দেশে নক্ষত্র নেই- কোথাও সময় নেই আর- আমারো হৃদয়ে নেই বিভা- দেখাবো নিজের হাতে- অবশেষে কী মকরকেতনে প্রতিভা।তিনতুমি আছো জেনে আমি অন্ধকার ভালো ভেবে যে-অতীত আর যেই শীত ক্লান্তিহীন কাটায়েছিলাম; তাই শুধু কাটায়েছি। কাটায়ে জানেছি এই-ই শূন্যে, তবু হৃদয়ের কাছে ছিল অন্য-কোন নাম। অন্তহীন অপেক্ষার চেয়ে তবে ভালো দ্বীপাতীত লক্ষ্যে অবিরাম চ’লে যাওয়া শোককে স্বীকার ক’রে অবশেষে তবে নিমেষের শরীরের উজ্জলতায়-অনন্তের জ্ঞানপাপ মুছে দিতে হবে। আজ এই ধ্বংসমত্ত অন্ধকার ভেদ ক’রে বিদ্যুতের মতো তুমি যে শরীর নিয়ে র’য়ে গেছো, সেই কথা সময়ের মনে জানাবার আশার কি একজন পুরুষের নির্জন শরীরে একটি পলক শুধু- হৃদয়বিহীন সব অপার আলোকবর্ষ ঘিরে? অধঃপতিত এই অসময়ে কে-বা সেই উপচার পুরুষ মানুষ?- ভাবি আমি;- জানি আমি,তবু সে-কথা আমাকে জানাবার হৃদয় আমার নেই;– যে-কোনো প্রেমিক আজ এখন আমার দেহের প্রতিভূ হয়ে নিজের নারীকে নিয়ে পৃথিবীর পথে একটি মুহূর্তে যদি আমার অনন্ত হয় মহিলার জ্যোতিষ্ক জগতে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shurjo-nakkhatro-naari/
4610
শামসুর রাহমান
কে আসে এমন ধু ধু অবেলায়
রূপক
কে আসে এমন ধু ধু অবেলায় আমার নিবাসে? জীর্ণ শীর্ণ আমার নিবাসে কে আসে তীক্ষ্ণ ক্ষুধার্ত চোখে? করে না তেমন পীড়াপীড়ি কিছু, চায় না কিছুই, নগ্ন সিঁড়িতে বসে থাকে একা, বসে থাকে একা, বসে থাকে একা। বসে থাকে একা।উস্‌কো খুস্‌কো চুলের ভেতরে স্বপ্ন বুঝিবা হরিণের মতো করে ছোটছুটি। সরু আঙুলের ডগায় জমেছে স্মৃতির অভ্র। এখানে আসার কথাই ছিল না। এই লোকালয়, ফুটপাত, গলি কমলালেবুর স্নেহপরায়ণ রঙ, শহরের দুঃস্থ বুড়োটে বাজিকর আর খাঁচার ময়না। ছেড়ে ছুড়ে কবে চলে গিয়েছিল; তবু সে এসেছে ফিরে উদাসীন। চোখের কিনারে রঙ-বেরঙের পাখি মরে যায়, পাখি মরে যায়, পাখি মরে যায়।নিজেকে বন্দি রেখেছে বাক্যের জালে। মুক্তির গান শুনে জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়তে চাইলে দ্যাখে সে জালের সীমানা বাড়তেই থাকে মোহের বুননে বাড়তেই থাকে, বাড়তেই থাকে, বাড়তেই থাকে। একদা ছিলাম সতেজ যুবক, একদা আমার দিনের অশ্ব ছুটেছিল কত খোলা প্রান্তরে বালিয়াড়ি আর গিরি-সংকটে, ক্ষুরের ঝিলিকে মুগ্ধ সবাই। এখন এইতো ছেঁড়া খোঁড়া আমি, অবসাদ-ছাওয়া। মনে বসে আছি, দুঃখের সাথে ভাগাভাগি করে নিজেকে; দু’বেলা করছি আহার, নিজেরই রক্তে ওজু সেরে ফেলি তীব্র খরায়, বকুল এখন ফুটলো কোথায় ইত্যাদি কথা বলে সে হঠাৎ নিশ্চুপ হয়। অলক্ষ্যে তার বুকের ভেতরে বুক ভেঙে যায়, বুক ভেঙে যায়, বুক ভেঙে যায়।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ke-ase-emon-dhu-dhu-obelayi/
5883
সুফিয়া কামাল
বাসন্তী
প্রেমমূলক
আমার এ বনের পথে কাননে ফুল ফোটাতে ভুলে কেউ করত না গো কোনদিন আসা-যাওয়া। সেদিন ফাগুন-প্রাতে অরুণের উদয়-সাথে সহসা দিল দেখা উদাসী দখিন হাওয়া।… বুকে মোর চরণ ফেলে বধুঁ মোর আজকে এলে আজি যে ভরা সুখে কেবলই পরাণ কাঁদে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/33.html
5450
সুকান্ত ভট্টাচার্য
কবে
মানবতাবাদী
অনেক স্তব্ধ দিনের এপারে চকিত চুতুর্দিক, আজো বেঁচে আছি মৃত্যুতাড়িত আজো বেঁচে আছি ঠিক। দুলে ওঠে দিন; শপথমুখর কিষাণ শ্রমিকপাড়া, হাজারে হাজারে মাঠে বন্দরে আজকে দিয়েছে সাড়া। জ'লে আলো আজ, আমাদের হাড়ে জমা হয় বিদ্যুৎ, নিহত দিনের দীর্ঘ শাখায় ফোটে বসন্তদূত। মূঢ় ইতিহাস; চল্লিশ কোটি সৈন্যের সেনাপতি। সংহত দিন, রুখবে কে এই একত্রীভূত গতি? জানি আমাদের অনেক যুগের সঞ্চিত স্বপ্নেরা দ্রুত মুকুলিত তোমার দিন ও রাত্রি দিয়েই ঘেরা। তাই হে আদিম, ক্ষতবিক্ষত জীবনের বিস্ময়, ছড়াও প্লাবন, দুঃসহ দিন আর বিলম্ব নয়। সারা পৃথিবীর দুয়ারে মুক্তি, এখানে অন্ধকার, এখানে কখন আসন্ন হবে বৈতরণীর পার?
https://banglarkobita.com/poem/famous/1117
2283
মহাদেব সাহা
হিংসা তার আদিগ্রন্থ
মানবতাবাদী
মানুষ কিছুই শিখলো না আর, কিছুই শিখলো না এইসব বয়স্ক বালক- শুধু আদিবিদ্যা তীর ছোঁড়া ছাড়া তার কিচুই হলো না শেখা, কেবল শিকার আর রক্তপাত ব্যতীত বিশেষ কোনো পাঠ করলো না শেষ বুঝি এই নির্বোধ মানুষ; মনে হয় হিংসা তার আদিগ্রন্থ, শেষ বই এই রক্তপাত তাই কি এখনো তার চোখেমুখে লেখা সেই আদিম অক্ষর? সে কোনো নিলো না শিক্ষা আলোকিত দিবসের কাছে উজ্জ্বল সূর্যের কাছে, দ্যুতিময় নক্ষত্রের কাছে- তার যা কিছু সামান্য বিদ্যা অন্ধকার রাত্রি আর বধ্যভূমি, পিশাচের কাছ থেকে শেখা। কখনো বসলো না সে হাঁটু গেড়ে স্নিগ্ধ নদী, নীলাকাশ শ্যামল বৃক্ষের পাদদেশে- শিশুর পবিত্র মুখ থেকে নিলো না সে অনন্ত সুঘ্রাণ, সে কেবল বারবার তুলে নিলো শিকারীর তীর, তরবারি আজো সে তেমনি কুরুক্ষেত্রে দুষ্ট দুঃশাসন। পাঁচ সহস্র বছর আগে যেখানে সে ছিলো এখনো তেমনি সেখানেই হামাগুঁড়ি দেয়, চার পায়ে হাঁটে, এর বেশি কিছুই হলো না তার শেখা একচুলও এগুলো না তার এই লনড় জাহাজ। ঘুরে ফিরে সেখানেই ফিরে এলো অর্বাচীন অথর্ব মানুষ নিজেকে ধ্বংস করা ছাড়া সম্ভবত কিছুই হলো না জানা তার- আর অপরের হৃদয় রক্তাক্ত করা ছাড়া কিছুই শিখলো না এই মানুষ নামের দ্বিপদ প্রাণীরা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1336
4097
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প
মানবতাবাদী
তাঁর চোখ বাঁধা হলো। বুটের প্রথম লাথি রক্তাক্ত করলো তার মুখ। থ্যাতলানো ঠোঁটজোড়া লালা-রক্তে একাকার হলো, জিভ নাড়তেই দুটো ভাঙা দাঁত ঝরে পড়লো কংক্রিটে। মা...মাগ... চেঁচিয়ে উঠলো সে। পাঁচশো পঞ্চান্ন মার্কা আধ-খাওয়া একটা সিগারেট প্রথমে স্পর্শ করলো তার বুক। পোড়া মাংসের উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো ঘরের বাতাসে। জ্বলন্ত সিগারেটের স্পর্শ তার দেহে টসটসে আঙুরের মতো ফোস্কা তুলতে লাগলো। দ্বিতীয় লাথিতে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে গেলো দেহ, এবার সে চিৎকার করতে পারলো না। তাকে চিৎ করা হলো। পেটের ওপর উঠে এলো দু’জোড়া বুট, কালো ও কর্কশ। কারণ সে তার পাকস্থলির কষ্টের কথা বলেছিলো, বলেছিলো অনাহার ও ক্ষুধার কথা। সে তার দেহের বস্ত্রহীনতার কথা বলেছিলো- বুঝি সে-কারণে ফর ফর করে টেনে ছিঁড়ে নেয়া হলো তার সার্ট। প্যান্ট খোলা হলো। সে এখন বিবস্ত্র, বীভৎস। তার দুটো হাত- মুষ্টিবদ্ধ যে-হাত মিছিলে পতাকার মতো উড়েছে সক্রোধে, যে-হাতে সে পোস্টার সেঁটেছে, বিলিয়েছে লিফলেট, লোহার হাতুড়ি দিয়ে সেই হাত ভাঙা হলো। সেই জীবন্ত হাত, জীবন্ত মানুষের হাত। তার দশটি আঙুল- যে-আঙুলে ছুঁয়েছে সে মার মুখ, ভায়ের শরীর, প্রেয়সীর চিবুকের তিল। যে-আঙুলে ছুঁয়েছে সে সাম্যমন্ত্রে দীক্ষিত সাথীর হাত, স্বপ্নবান হাতিয়ার, বাটখারা দিয়ে সে-আঙুল পেষা হলো। সেই জীবন্ত আঙুল, মানুষের জীবন্ত উপমা। লোহার সাঁড়াশি দিয়ে, একটি একটি করে উপড়ে নেয়া হলো তার নির্দোষ নখগুলো। কী চমৎকার লাল রক্তের রঙ। সে এখন মৃত। তার শরীর ঘিরে থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়ার মতো ছড়িয়ে রয়েছে রক্ত, তাজা লাল রক্ত। তার থ্যাতলানো একখানা হাত পড়ে আছে এদেশের মানচিত্রের ওপর, আর সে হাত থেকে ঝরে পড়ছে রক্তের দুর্বিনীত লাভা-
https://banglarkobita.com/poem/famous/324
268
কাজী নজরুল ইসলাম
কর্ণফুলী
প্রেমমূলক
ওগো ও কর্ণফুলী, উজাড় করিয়া দিনু তব জলে আমার অশ্রুগুলি। যে লোনা জলের সিন্ধু-সিকতে নিতি তব আনাগোনা, আমার অশ্রু লাগিবে না সখী তার চেয়ে বেশি লোনা! তুমি শুধু জল করো টলমল ; নাই তব প্রয়োজন আমার দু-ফোঁটা অশ্রুজলের এ গোপন আবেদন। যুগ যুগ ধরি বাড়াইয়া বাহু তব দু-ধারের তীর ধরিতে চাহিয়া পারেনি ধরিতে, তব জল-মঞ্জীর বাজাইয়া তুমি ওগো গর্বিতা চলিয়াছ নিজ পথে! কূলের মানুষ ভেসে গেল কত তব এ অকূল স্রোতে! তব কূলে যারা নিতি রচে নীড় তারাই পেল না কূল, দিশা কি তাহার পাবে এ অতিথি দুদিনের বুলবুল? – বুঝি প্রিয় সব বুঝি, তবু তব চরে চখা কেঁদে মরে চখিরে তাহার খুঁজি!* * *তুমি কি পদ্মা, হারানো গোমতী, ভোলে যাওয়া ভাগিরথী – তুমি কি আমার বুকের তলার প্রেয়সী অশ্রুমতী? দেশে দেশে ঘুরে পেয়েছি কি দেখা মিলনের মোহানায়, স্থলের অশ্রু নিশেষ হইয়া যথায় ফুরায়ে যায়? ওরে পার্বতী উদাসিনী, বল এ গৃহ-হারারে বল, এই স্রোত তোর কোন পাহাড়ের হাড়-গলা আঁখি-জল? বজ্র যাহারে বিঁধিতে পারেনি, উড়াতে পারেনি ঝড়, ভূমিকম্পে যে টলেনি, করেনি মহাকালেরে যে ডর, সেই পাহাড়ের পাষাণের তলে ছিল এত অভিমান? এত কাঁদে তবু শুকায় না তার চোখের জলের বান?তুই নারী, তুই বুঝিবি না নদী পাষাণ নরের ক্লেশ, নারী কাঁদে – তার সে-আঁখিজলের একদিন শেষ। পাষাণ ফাটিয়া যদি কোনোদিন জলের উৎস বহে, সে জলের ধারা শাশ্বত হয়ে রহে রে চির-বিরহে! নারীর অশ্রু নয়নের শুধু ; পুরুষের আঁখি-জল বাহিরায় গলে অন্তর হতে অন্তরতম তল! আকাশের মতো তোমাদের চোখে সহসা বাদল নেমে রৌদ্রের তাত ফুটে ওঠে সখী নিমেষে সে মেঘ থেমে!সারা গিরি হল শিরী-মুখ হায়, পাহাড় গলিল প্রেমে, গলিল না শিরী! সেই বেদনা কি নদী হয়ে এলে নেমে? ওই গিরি-শিরে মজনুন কি গো আজিও দিওয়ানা হয়ে লায়লির লাগি নিশিদিন জাগি ফিরিতেছে রোয়ে রোয়ে? পাহাড়ের বুক বেয়ে সেই জল বহিতেছ তুমি কি গো? – দুষ্মন্তের খোঁজ-আসা তুমি শকুন্তলার মৃগ? মহাশ্বেতা কি বসিয়াছে সেথা পুণ্ডরীকের ধ্যানে? – তুমি কি চলেছ তাহারই সে প্রেম নিরুদ্দেশের পানে? – যুগে যুগে আমি হারায়ে প্রিয়ারে ধরণির কূলে কূলে কাঁদিয়াছি যত, সে অশ্রু কি গো তোমাতে উঠেছে দুলে?* * *– ওগো চির উদাসিনী! তুমি শোনো শুধু তোমারই নিজের বক্ষের রিনিরিনি। তব টানে ভেসে আসিল যে লয়ে ভাঙা ‘সাম্পান’ তরি, চাহনি তাহার মুখ-পানে তুমি কখনও করুণা করি। জোয়ারে সিন্ধু ঠেলে দেয় ফেলে তবু নিতি ভাটি-টানে ফিরে ফিরে যাও মলিন বয়ানে সেই সিন্ধুরই পানে! বন্ধু, হৃদয় এমনই অবুঝ কারও সে অধীন নয়! যারে চায় শুধু তাহারেই চায়– নাহি মনে লাজ ভয়। বারে বারে যায় তারই দরজায়, বারে বারে ফিরে আসে! যে আগুনে পুড়ে মরে পতঙ্গ – ঘোরে সে তাহারই পাশে!* * *–ওগো ও কর্ণফুলী! তোমার সলিলে পড়েছিল কবে কার কান-ফুল খুলি? তোমার স্রোতের উজান ঠেলিয়া কোন তরুণী কে জানে, ‘সাম্পান’-নায়ে ফিরেছিল তার দয়িতের সন্ধানে? আনমনা তার খুলে গেল খোঁপা, কান-ফুল গেল খুলি, সে ফুল যতনে পরিয়া কর্ণে হলে কি কর্ণফুলী ?যে গিরি গলিয়া তুমি বও নদী, সেথা কি আজিও রহি কাঁদিছে বন্দী চিত্রকূটের যক্ষ চির-বিরহী? তব এত জল একি তারই সেই মেঘদূত-গলা বাণী? তুমি কি গো তার প্রিয়-বিরহের বিধুর স্মরণখানি? ওই পাহাড়ে কি শরীরে স্মরিয়া ফারেসের ফরহাদ, আজিও পাথর কাটিয়া করিছে জিন্দেগি বরবাদ?তব জলে আমি ডুবে মরি যদি, নহে তব অপরাধ, তোমার সলিলে মরিব ডুবিয়া, আমারই সে চির-সাধ!‌ আপনার জ্বালা মিটাতে এসেছি তোমার শীতল তলে, তোমারে বেদনা হানিতে আসিনি আমার চোখের জলে! অপরাধ শুধু হৃদয়ের সখী, অপরাধ কারও নয়! ডুবিতে যে আসে ডুবে সে একাই, তটিনী তেমনই বয়!* * *সারিয়া এসেছি আমার জীবনে কূলে ছিল যত কাজ, এসেছি তোমার শীতল নিতলে জুড়াইতে তাই আজ! ডাকনিকো তুমি, আপনার ডাকে আপনি এসেছি আমি যে বুকের ডাক শুনেছি শয়নে স্বপনে দিবস-যামি। হয়তো আমারে লয়ে অন্যের আজও প্রয়োজন আছে, মোর প্রয়োজন ফুরাইয়া গেছে চিরতরে মোর কাছে! – সে কবে বাঁচিতে চায়, জীবনের সব প্রয়োজন যার জীবনে ফুরায়ে যায়!জীবন ভরিয়া মিটায়েছি শুধু অপরের প্রয়োজন, সবার খোরাক জোগায়ে নেহারি উপবাসী মোরই মন! আপনার পানে ফিরে দেখি আজ – চলিয়া গেছে সময়, যা হারাবার তা হারাইয়া গেছে, তাহা ফিরিবার নয়! হারায়েছি সব, বাকি আছি আমি, শুধু সেইটুকু লয়ে বাঁচিতে পারিনা, যত চলি পথে তত উঠি বোঝা হয়ে!বহিতে পারি না আর এই বোঝা, নামানু সে ভার হেথা; তোমার জলের লিখনে লিখিনু আমার গোপন ব্যথা! ভয় নাই প্রিয়, নিমেষে মুছিয়া যাইবে এ জল-লেখা, তুমি জল – হেথা দাগ কেটে কভু থাকে না কিছুরই রেখা! আমার ব্যথায় শুকায়ে যাবে না তব জল কাল হতে, ঘূর্ণাবর্ত জাগিবে না তব অগাধ গভীর স্রোতে। হয়তো ঈষৎ উঠিবে দুলিয়া, তারপর উদাসিনী, বহিয়া চলিবে তব পথে তুমি বাজাইয়া কিঙ্কিণি! শুধু লীলাভরে তেমনই হয়তো ভাঙিয়া চলিবে কূল, তুমি রবে, শুধু রবে নাকো আর এ গানের বুলবুল!তুষার-হৃদয় অকরুণা ওগো, বুঝিয়াছি আমি আজি – দেওলিয়া হয়ে কেন তব তীরে কাঁদে ‘সাম্পান’-মাঝি!   (চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/kornofuli/
1105
জীবনানন্দ দাশ
পৃথিবীলোক
চিন্তামূলক
দূরে কাছে কেবলি নগর, ঘর ভাঙ্গে গ্রাম পতনের শব্দ হয়; মানুষেরা ঢের যুগ কাটিয়ে দিয়েছে পৃথিবীতে, দেয়ালে তাদের ছায়া তবু ক্ষতি,মৃত্যু,ভয় বিহবলতা ব’লে মনে হয়।এসব শূণ্যতা ছাড়া কোনোদিকে আজ কিছু নেই সময়ের তীরে। তবু ব্যর্থ মানুষের গ্লানি ভুল চিন্তা সংকল্পের অবিরল মরুভূমি ঘিরে বিচিত্র বৃক্ষের শব্দে স্নিগ্ধ এক দেশ এ পৃথিবী, এই প্রেম, জ্ঞান আর হৃদয়ের এই নির্দেশ।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/prithibilok/
2306
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
করুণ-রস
সনেট
সুন্দর নদের তীরে হেরিনু সুন্দরী বামারে মলিন-মুখী,শরদের শশী রাহুর তরাসে যেন!সে বিরলে বসি, মৃদে কাঁদে সুবদনা;ঝরঝরে ঝরি, গলে অশ্রু-বিন্দু,যেন মুক্তা-ফল খসি! সে নদের স্রোতঃ অশ্রু পরশন করি, ভাসে,ফুল্ল কমলের স্বর্ণকান্তি ধরি, মধুলোভী মধুকরে মধুরসে রসি গন্ধামোদী গন্ধবহে সুগন্ধ প্রদানী। না পারি বুঝিতে মায়া,চাহিনু চঞ্চলে চৌদিকে;বিজন দেশ;হৈল দেব-বাণী;--- ''কবিতা-রসের স্রোতঃ এ নদের ছলে; করুণা বামার নাম---রস-কুলে রাণী; সেই ধন্য,বশ সতী যার তপোবলে!''
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/korun-ros/
4767
শামসুর রাহমান
তসলিম রশিদের জীবনযাপন
মানবতাবাদী
এড়িয়ে পিতার দৃষ্টি যৌবনপ্রত্যুষ দরজায় খিল দিয়ে কবিতা লিখেছি আমি আর মনে প্রাণে কবিতাকে করেছি গ্রহণ পৃথিবীর সর্বোত্তম বস্তু বলে, অথচ জনক কস্মিনকালে ও জানাননি সমর্থন আমার এ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের প্রতি। ভরা সূর্যাস্তের দিকে মুখ রেখে তিনি উঁচিয়ে বয়স্ক ছড়ি তাঁর দিয়েছেন তাড়িয়ে বেবাক অলৌকিক হরিণ এবং পরী ভাড়াটে বাড়ির সংকীর্ণ চৌহদ্দি থেকে, আমি অসহায় বন্ধ ঘরে মেরেছি সকালসন্ধ্যা কপালে চাপড়া।জননীকে বোঝাতে চেয়েছি কবিতাই প্রকৃত আবেহায়াত অস্তিত্বের ব্যাপক খরায় মা আমার প্রশ্রয়ের হাসি হেসে গ্রীষ্মের দুপুরে নিরিবিলি ঢেলেছেন মাটির সুরাই থেকে পানি, যেমন শৈশবে তিনি আমাকে সাদরে ভুলিয়ে ভালিয়ে রেখে গৃহকোণে শাণিত বটিতে কাঁটতেন রান্নাঘরে রুপোলি ইলিশ।বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ বর্ষে দয়িতার কানে কানে, মনে পড়ে, গোধূলি বেলায়রমনা লেকের ধারে কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা আউড়ে বলেছি- কবিতা তোমারই মতো অনিবার্য স্বপ্নভূমি আমার জীবনে। অর্থনীতিকানা তুমি ব’লে সে যুবতী জ্বলজ্বলে কূটনীতিকের ঘনিষ্ঠ জীবনলগ্ন হয়ে দিলো পাড়ি মার্কিন মুলুকে। কারুর পিতাই নয় বস্তুত অমর। তাই পেনসনভোগী জনক গেলেন পৌছে একদিন মায়াবী স্টেশনে বিপন্ন সংসার ফেলে হাভাতে আঁধারে; আমার কলেজ-পলাতক সহোদর রাত জেগে টকটকে লাল কত আশার অক্ষরেদিলখোলা অজস্র পোস্টার লেখে চোখের আড়ালে, মাঝে মাঝে জেল খাটে এবং বিবাহযোগ্য বোন প্রত্যহ শাপান্ত করে উদ্ভিন্ন উজ্জাত যৌবনকে। আমি নিজে যেন তেন প্রকারেণ চাকরির খোঁজেদিনে অফিসে অফিসে ঘুরি আনকোরা গোয়েন্দার মতো, রাতে পরাবাস্তবের পিঠে তুমুল সওয়ার হয়ে ক্ষিপ্র বলপেনে ক্ষণজীবী বসন্তের এবং ফেরারি কোকিলের জন্যে হা-পিত্যেশ করে ছিমছাম আঠারো মাত্রার সুঠাম অক্ষরবৃত্তে কত তন্দ্রালু কবিতা লিখি ঢুল ঢুল চোখে। সন্ধ্যা নামে, নিরক্ষর সন্ধ্যা নামে শহরের বেল্লিক বস্তিতে। আমার ভূতলবাসী অস্থির অনুজ আসে খুব সন্তর্পণে মায়ের হাতের রান্না চেখে নিতে মাঝে-সাঝে ফের চকিতে গা-ঢাকা দ্যায় কে জানে কোথায়। আমার ধৈর্যের বাঁধে ফাটায় সে বোমা বেধড়ক, গালমন্দ দিই ওকে, বিশেষত যখন অফিসি মহাপ্রভু আমাকে শুনিয়ে দেন বাছা বাছা স্ল্যাং। ইতোমধ্যে একটি নিখাদ চাকরি জুটিয়ে নিয়েছি দৈববলে। বোনটিকে ফাঁকি দিয়ে মহল্লার মাশাল্লা যুবক সটকে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। সহোদরা যৌবনের জতুগৃহে পোড়ে দিনরাত। আমার জননী তাকে সর্ব্দা রাখেন চোখে চোখে, পাছে সে গলায় দ্যায় দড়ি কিংবা ঝাঁপ লাখেরাজ জন্মান্ধ কুয়ায়।কোনো কোনো মধ্যরাতে সঙ্গমান্তে গৃহিণী বলেন চুপিসারে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সারাটা জীবন যাবে ভাড়াটে বাড়িতে,আজো তো হলো ছাই নিজের বসতবাড়ি কোনো। আমি বিদূষক সেজে হাসন রাজার মতো গেয়ে উঠি- কী ঘর বানামু আমি শূন্যের মাঝার। যদিও বাসাড়ে আমি জন্মবধি এই দুনিয়ায়, রোজানা বানাচ্ছি দ্যাখো গায়েবি মহল।আমার অনুজ জপে প্রত্যহ মাও সে-তুঙ আর পড়ে কৃশকায় চারুবাবুর কেতাব, যা নিশ্চিত পাইপগানের চেয়ে বেশি অগ্নিউদগীরণকারী। আমার অনুজ সুকান্তের সংক্রামক প্রেরণায় নিজেকেই ঠাউরেছে মহান লেনিন। দিন যায়, মাস যায়, বছর গড়িয়ে যায়, তবু কোথাও পাই না খুজে অনুজকে আর।কখনো সখনো আমি কবিসম্মেলনে যাই, নামজাদা সব কবিদের সঙ্গে মফস্বলী মঞ্চে সদ্য-লেখা পদ্য পাঠ করি। খদ্দরের পুরোনো পাঞ্জাবি উড়ন্ত ঘোড়ার ডানা; বিবর্ণ স্যাণ্ডেল হোলি গ্রেল; কিছুক্ষণ শব্দের নিজস্ব ইন্দ্রজালে পিঠচাপড়ানি পেয়ে, দিশি মাল টেনে ভুলে থাকি বাস্তবের কচ্ছপ-কামড় তোতাপাখি বিবেক ছোলার লোভে সকল সময় নিঃশব্দে ঘাপটি মেরে থাকে। আমার বাঁদিকে বসে চোখের পিচুঁটি মোছে আর হাই তোলে বারো বছরের স্বাধীনতা। ইদানীং প্রায়শই পড়ি অনুজের বিস্ফোরক পুরোনো ডায়েরি, দাঁড়া-বার-করা হিংস্র পোকার মতন ভাবনা মগযে ঘোরে। হতচ্ছাড়া জীবনকে কিছুতে পারি না নিয়ে যেতে অন্য কোনো বাঁকে শুধু পালটে দিই, ক্রমাগত দিতে থাকি আমার নিজের কবিতার কিছু শব্দ রাগে, চরম ঘেন্নায়।   (আমার কোন তাড়া নেই কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/toslim-roshider-jibonzapon/
1936
ফররুখ আহমদ
পাঞ্জেরি
রূপক
রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি? এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে? সেতারা, হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে? তুমি মাস্তলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে; অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি। রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি? দীঘল রাতের শ্রান্তসফর শেষে কোন দরিয়ার কালো দিগন্তে আমরা পড়েছি এসে? এ কী ঘন-সিয়া জিন্দেগানীর বা’ব তোলে মর্সিয়া ব্যথিত দিলের তুফান-শ্রান্ত খা’ব অস্ফুট হয়ে ক্রমে ডুবে যায় জীবনের জয়ভেরী। তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে; সম্মুখে শুধু অসীম কুয়াশা হেরি। রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি? বন্দরে বসে যাত্রীরা দিন গোনে, বুঝি মৌসুমী হাওয়ায় মোদের জাহাজের ধ্বনি শোনে, বুঝি কুয়াশায়, জোছনা- মায়ায় জাহাজের পাল দেখে। আহা, পেরেশান মুসাফির দল। দরিয়া কিনারে জাগে তক্দিরে নিরাশায় ছবি এঁকে! পথহারা এই দরিয়া- সোঁতারা ঘুরে চলেছি কোথায়? কোন সীমাহীন দূরে? তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে; একাকী রাতের ম্লান জুলমাত হেরি! রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরি? শুধু গাফলতে শুধু খেয়ালের ভুলে, দরিয়া- অথই ভ্রান্তি- নিয়াছি ভুলে, আমাদেরি ভুলে পানির কিনারে মুসাফির দল বসি দেখেছে সভয়ে অস্ত গিয়াছে তাদের সেতারা, শশী। মোদের খেলায় ধুলায় লুটায়ে পড়ি। কেটেছে তাদের দুর্ভাগ্যের বিস্বাদ শর্বরী। সওদাগরের দল মাঝে মোরা ওঠায়েছি আহাজারি, ঘরে ঘরে ওঠে ক্রন্দনধ্বনি আওয়াজ শুনছি তারি। ওকি বাতাসের হাহাকার,- ও কি রোনাজারি ক্ষুধিতের! ও কি দরিয়ার গর্জন,- ও কি বেদনা মজলুমের! ও কি ধাতুর পাঁজরায় বাজে মৃত্যুর জয়ভেরী। পাঞ্জেরি! জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি হেরি, জাগো অগণন ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি! দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরি, কত দেরি!!
http://kobita.banglakosh.com/archives/4011.html
387
কাজী নজরুল ইসলাম
পূজারিণী
প্রেমমূলক
এত দিনে অবেলায়- প্রিয়তম! ধূলি-অন্ধ ঘূর্ণি সম দিবাযামী যবে আমি নেচে ফিরি র”ধিরাক্ত মরণ-খেলায়- এ দিনে অ-বেলায় জানিলাম, আমি তোমা’ জন্মে জন্মে চিনি। পূজারিণী! ঐ কন্ঠ, ও-কপোত- কাঁদানো রাগিণী, ঐ আখি, ঐ মুখ, ঐ ভুর”, ললাট, চিবুক, ঐ তব অপরূপ রূপ, ঐ তব দোলো-দোলো গতি-নৃত্য দুষ্ট দুল রাজহংসী জিনি’- চিনি সব চিনি। তাই আমি এতদিনে জীবনের আশাহত ক্লান- শুষ্ক বিদগ্ধ পুলিনে মূর্ছাতুর সারা প্রাণ ভ’রে ডাকি শুকু ডাকি তোমা’ প্রিয়তমা! ইষ্ট মম জপ-মালা ঐ তব সব চেয়ে মিষ্ট নাম ধ’রে! তারি সাথে কাঁদি আমি- ছিন্ন-কন্ঠে কাঁদি আমি, চিনি তোমা’, চিনি চিনি চিনি, বিজয়িনী নহ তুমি-নহ ভিখারিনী, তুমি দেবী চির-শুদ্ধ তাপস-কুমারী, তুমি মম চির-পূজারিণী! যুগে যুগে এ পাষাণে বাসিয়াছ ভালো, আপনারে দাহ করি, মোর বুকে জ্বালায়েছ আলো, বারে বারে করিয়াছ তব পূজা-ঋণী। চিনি প্রিয়া চিনি তোমা’ জন্মে জন্মে চিনি চিনি চিনি! চিনি তোমা’ বারে বারে জীবনের অস–ঘাটে, মরণ-বেলায়, তারপর চেনা-শেষে তুমি-হারা পরদেশে ফেলে যাও একা শুণ্য বিদায়-ভেলায়! দিনানে-র প্রানে- বসি’ আঁখি-নীরে তিনি’ আপনার মনে আনি তারি দূর-দূরানে-র স্মৃতি- মনে পড়ে-বসনে-র শেষ-আশা-ম্লান মৌন মোর আগমনী সেই নিশি, যেদিন আমার আঁখি ধন্য হ’ল তব আখি-চাওয়া সনে মিশি। তখনো সরল সুখী আমি- ফোটেনি যৌবন মম, উন্মুখ বেদনা-মুখী আসি আমি ঊষা-সম আধ-ঘুমে আধ-জেগে তখনো কৈশোর, জীবনের ফোটো-ফোটো রাঙা নিশি-ভোর, বাধা বন্ধ-হারা অহেতুক নেচে-চলা ঘূর্ণিবায়ু-পারা দুরন- গানের বেগ অফুরন- হাসি নিয়ে এনু পথ-ভোলা আমি অতি দূর পরবাসী। সাথে তারি এনেছিনু গৃহ-হারা বেদনার আঁখি-ভরা বারি। এসে রাতে-ভোরে জেগে গেয়েছিনু জাগরণী সুর- ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছিলে তুমি কাছে এসেছিলে, মুখ-পানে চেয়ে মোর সকর”ণ হাসি হেসেছিলে,- হাসি হেরে কেঁদেছিনু-‘তুমি কার পোষাপাখী কান-ার বিধুর?’ চোখে তব সে কী চাওয়া! মনে হ’ল যেন তুমি মোর ঐ কন্ঠ ঐ সুর- বিরহের কান্না-ভারাতুর বনানী-দুলানো, দখিনা সমীরে ডাকা কুসুম-ফোটানো বন-হরিণী-ভুলানো আদি জন্মদিন হ’তে চেন তুমি চেন! তারপর-অনাদরে বিদায়ের অভিমান-রাঙা অশ্র”-ভাঙা-ভাঙা ব্যথা-গীত গেয়েছিনু সেই আধ-রাতে, বুঝি নাই আমি সেই গান-গাওয়া ছলে কারে পেতে চেয়েছিনু চিরশূন্য মম হিয়া-তলে- শুধু জানি, কাঁচা-ঘুমে জাগা তব রাগ-অর”ণ-আঁখি-ছায়া লেগেছিল মম আঁখি-পাতে। আরো দেখেছিনু, ঐ আঁখির পলকে বিস্ময়-পুলক-দীপ্তি ঝলকে ঝলকে ঝ’লেছিল, গ’লেছিল গাঢ় ঘন বেদানার মায়া,- কর”ণায় কেঁপে কেঁপে উঠেছিল বিরহিণী অন্ধকার-নিশীথিনী-কায়া। তৃষাতুর চোখে মোর বড় যেন লেগেছিল ভালো পূজারিণী! আঁখি-দীপ-জ্বালা তব সেই সিগ্ধ সকর”ণ আলো। তারপর-গান গাওয়া শেষে নাম ধ’রে কাছে বুঝি ডেকেছিনু হেসে। অমনি কী গ’র্জে-উঠা র”দ্ধ অভিমানে (কেন কে সে জানে) দুলি’ উঠেছিল তব ভুর”-বাঁধা সি’র আঁখি-তরী, ফুলে উঠেছিল জল, ব্যথা-উৎস-মুখে তাহা ঝরঝর প’ড়েছিল ঝরি’! একটু আদরে এত অভিমানে ফুলে-ওঠা, এত আঁখি-জল, কোথা পেলি ওরে কা’র অনাদৃতা ওরে মোর ভিখারিনী বল্‌ মোরে বল্‌ । এই ভাঙা বুকে ঐ কান্না-রাঙা মুখ থুয়ে লাজ-সুখে বল্‌ মোরে বল্‌- মোরে হেরি’ কেন এত অভিমান? মোর ডাকে কেন এত উথলায় চোখে তব জল? অ-চেনা অ-জানা আমি পথের পথিক মোরে হেরে জলে পুরে ওঠে কেন এত ঐ বালিকার আঁখি অনিমিখ? মোর পানে চেয়ে সবে হাসে, বাঁধা-নীড় পুড়ে যায় অভিশপ্ত তপ্ত মোর শ্বাসে; মণি ভেবে কত জনে তুলে পরে গলে, মণি যবে ফণী হয়ে বিষ-দগ্ধ-মুখে দংশে তার বুকে, অমনি সে দলে পদতলে! বিশ্ব যারে করে ভয় ঘৃণা অবহেলা, ভিখরিণী! তারে নিয়ে এ কি তব অকর”ণ খেলা? তারে নিয়ে এ কি গূঢ় অভিমান? কোন্‌ অধিকারে নাম ধ’রে ডাকটুকু তা’ও হানে বেদনা তোমারে? কেউ ভালোবাসে নাই? কেই তোমা’ করেনি আদর? জন্ম-ভিখারিনী তুমি? তাই এত চোখে জল, অভিমানী কর”ণা-কাতর! নহে তা’ও নহে- বুকে থেকে রিক্ত-কন্ঠে কোন্‌ রিক্ত অভিমানী কহে- ‘নহে তা’ও নহে।’ দেখিয়াছি শতজন আসে এই ঘরে, কতজন না চাহিতে এসে বুকে করে, তবু তব চোখে-মুখে এ অতৃপ্তি, এ কী স্নেহ-ক্ষুধা মোরে হেলে উছলায় কেন তব বুক-ছাপা এত প্রীতি সুধা? সে রহস্য রাণী! কেহ নাহি জানে- তুমি নাহি জান- আমি নাহি জানি। চেনে তা প্রেম, জানে শুধু প্রাণ- কোথা হ’তে আসে এত অকারণে প্রাণে প্রাণে বেদনার টান! নাহি বুঝিয়াও আমি সেদিন বুঝিনু তাই, হে অপরিচিতা! চির-পরিচিতা তুমি, জন্ম জন্ম ধ’রে অনাদৃতা সীতা! কানন-কাঁদানো তুমি তাপস-বালিকা অনন- কুমারী সতী, তব দেব-পূজার থালিকা ভাঙিয়াছি যুগে যুগে, ছিঁড়িয়াছি মালা খেলা-ছলে; চিন-মৌনা শাপভ্রষ্টা ওগো দেববালা! নীরবে স’য়েছ সবি- সহজিয়া! সহজে জেনেছ তুমি, তুমি মোর জয়লক্ষ্মী, আমি তব কবি। তারপর-নিশি শেষে পাশে ব’সে শুনেছিনু তব গীত-সুর লাজে-আধ-বাধ-বাধ শঙ্কিত বিধুর; সুর শুনে হ’ল মনে- ক্ষণে ক্ষণে মনে-পড়ে-পড়ে না হারা কন্ঠ যেন কেঁদে কেঁদে সাধে, ‘ওগো চেন মোরে জন্মে জন্মে চেন।’ মথুরায় গিয়ে শ্যাম, রাধিকার ভুলেছিল যবে, মনে লাগে- এই সুর গীত-রবে কেঁদেছিল রাধা, অবহেলা-বেঁধা-বুক নিয়ে এ যেন রে অতি-অন-রালে ললিতার কাঁদা বন-মাঝে একাকিনী দময়নী ঘুরে ঘুরে ঝুরে, ফেলে-যাওয়া নাথে তার ডেকেছিল ক্লান–কন্ঠে এই গীত-সুরে। কানে- প’ড়ে মনে বনলতা সনে বিষাদিনী শকুন-লা কেঁদেছিল এই সুরে বনে সঙ্গোপনে। হেম-গিরি-শিরে হারা-সতী উমা হ’য়ে ফিরে ডেকেছিল ভোলানাথে এমনি সে চেনা কন্ঠে হায়, কেঁদেছিল চির-সতী পতি প্রিয়া প্রিয়ে তার পেতে পুনরায়!- চিনিলাম বুঝিলাম সবি- যৌবন সে জাগিল না, লাগিল না মর্মে তাই গাঢ় হ’য়ে তব মুখ-ছবি। তবু তব চেনা কন্ঠ মম কন্ঠ -সুর রেখে আমি চ’লে গেনু কবে কোন্‌ পল্লী-পথে দূরে!– দু’দিন না যেতে যেতে এ কি সেই পুণ্য গোমতীর কূলে প্রথম উঠিল কাঁদি’ অপরূপ ব্যথা-গন্ধ নাভি-পদ্ম-মুলে! খুঁজে ফিরি কোথা হ’তে এই ব্যাথা-ভারাতুর মদ-গন্ধ আসে- আকাশ বাতাস ধরা কেঁপে কেঁপে ওঠে শুধু মোর তপ্ত ঘন দীর্ঘশ্বাসে। কেঁদে ওঠে লতা-পাতা, ফুল পাখি নদীজল মেঘ বায়ু কাঁদে সবি অবিরল, কাঁদে বুকে উগ্রসুখে যৌবন-জ্বালায়-জাগা অতৃপ্ত বিধাতা! পোড়া প্রাণ জানিল না কারে চাই, চীৎকারিয়া ফেরে তাই-‘কোথা যাই, কোথা গেলে ভালোবাসাবাসি পাই? হু-হু ক’রে ওঠে প্রাণ, মন করে উদাস-উদাস, মনে হয়-এ নিখিল যৌবন-আতুর কোনো প্রেমিকের ব্যথিত হুতাশ! চোখ পুরে’ লাল নীল কত রাঙা, আবছায়া ভাসে, আসে-আসে- কার বক্ষ টুটে মম প্রাণ-পুটে কোথা হ’তে কেন এই মৃগ-মদ-গন্ধ-ব্যথা আসে? মন-মৃগ ছুটে ফেরে; দিগন-র দুলি’ ওঠে মোর ক্ষিপ্ত হাহাকার-ত্রাসে! কস’রী হরিণ-সম আমারি নাভির গন্ধ খুঁজে ফেলে গন্ধ-অন্ধ মন-মৃগ মম! আপনারই ভালোবাসা আপনি পিইয়া চাহে মিটাইতে আপনার আশা! অনন- অগস-্য-তৃষাকুল বিশ্ব-মাগা যৌবন আমার এক সিন্ধু শুষি’ বিন্দু-সম, মাগে সিন্ধু আর! ভগবান! ভগবান! এ কি তৃষ্ণা অনন- অপার! কোথা তৃপ্তি? তৃপ্তি কোথা? কোথা মোর তৃষ্ণা-হরা প্রেম-সিন্ধু অনাদি পাথার! মোর চেয়ে স্বে”ছাচারী দুরন- দুর্বার! কোথা গেলে তারে পাই, যার লাগি’ এত বড় বিশ্বে মোর নাই শানি- নাই! ভাবি আর চলি শুধু, শুধু পথ চলি, পথে কত পথ-বালা যায়, তারি পাছে হায় অন্ধ-বেগে ধায় ভালোবাসা-ক্ষুধাতুর মন, পিছু ফিরে কেহ যদি চায়, ‘ভিক্ষা লহ’ ব’লে কেহ আসে দ্বার-পাশে। প্রাণ আরো কেঁদে ওঠে তাতে, গুমরিয়া ওঠে কাঙালের লজ্জাহীন গুর” বেদনাতে! প্রলয়-পয়োধি-নীরে গর্জে-ওঠা হুহুঙ্কার-সম বেদনা ও অভিমানে ফুলে’ ফুলে’ দুলে’ ওঠে ধূ-ধূ ক্ষোভ-ক্ষিপ্ত প্রাণ-শিখা মম! পথ-বালা আসে ভিক্ষা-হাতে, লাথি মেরে চুর্ণ করি গর্ব তার ভিক্ষা-পাত্র সাথে। কেঁদে তারা ফিরে যায়, ভয়ে কেহ নাহি আসে কাছে; ‘অনাথপিন্ডদ’-সম মহাভিক্ষু প্রাণ মম প্রেম-বুদ্ধ লাগি’ হায় দ্বারে দ্বারে মহাভিক্ষা যাচে, “ভিক্ষা দাও, পুরবাসি! বুদ্ধ লাগি’ ভিক্ষা মাগি, দ্বার হ’তে প্রভু ফিরে যায় উপবাসী!’’ কত এল কত গেল ফিরে,- কেহ ভয়ে কেহ-বা বিস্ময়ে! ভাঙা-বুকে কেহ, কেহ অশ্র”-নীরে- কত এল কত গেল ফিরে! আমি যাচি পূর্ণ সমর্পণ, বুঝিতে পারে না তাহা গৃহ-সুখী পুরনারীগণ। তারা আসে হেসে; শেষে হাসি-শেষে কেঁদে তারা ফিরে যায় আপনার গৃহ স্নেহ”ছায়ে। বলে তারা, “হে পথিক! বল বল তব প্রাণ কোন্‌ ধন মাগে? সুরে তব এত কান্না, বুকে তব কা’র লাগি এত ক্ষুধা জাগে? কি যে চাই বুঝে না ক’ কেহ, কেহ আনে প্রাণ মম কেহ- বা যৌবন ধন, কেহ রূপ দেহ। গর্বিতা ধনিকা আসে মদমত্তা আপনার ধনে আমারে বাঁধিতে চাহে রূপ-ফাঁদে যৌবনের বনে।…. সর্ব ব্যর্থ, ফিরে চলে নিরাশায় প্রাণ পথে পথে গেয়ে গেয়ে গান- “কোথা মোর ভিখারিনী পূজারিণী কই? যে বলিবে-‘ভালোবেসে সন্ন্যাসিনী আমি ওগো মোর স্বামি! রিক্তা আমি, আমি তব গরবিনী,বিজয়িনী নই!” মর” মাঝে ছুটে ফিরি বৃথা, হু হু ক’রে জ্ব’লে ওঠে তৃষা- তারি মাঝে তৃষ্ণা-দগ্ধ প্রাণ ক্ষণেকের তরে কবে হারাইল দিশা। দূরে কার দেখা গেল হাতছানি যেন- ডেকে ডেকে সে-ও কাঁদে- ‘আমি নাথ তব ভিখারিনী, আমি তোমা’ চিনি, তুমি মোরে চেন।’ বুঝিনু না, ডাকিনীর ডাক এ যে, এ যে মিথ্যা মায়া, জল নহে, এ যে খল, এ যে ছল মরীচিকা ছাষা! ‘ভিক্ষা দাও’ ব’লে আমি এনু তার দ্বারে, কোথা ভিখারিনী? ওগো এ যে মিথ্যা মায়াবিনী, ঘরে ডেকে মারে। এ যে ক্রূর নিষাদের ফাঁদ, এ যে ছলে জিনে নিতে চাহে ভিখারীর ঝুলির প্রসাদ। হ’ল না সে জয়ী, আপনার জালে প’ড়ে আপনি মরিল মিথ্যাময়ী। কাঁটা-বেঁধা রক্ত মাথা প্রাণ নিয়ে এনু তব পুরে, জানি নাই ব্যথাহত আমার ব্যথায় তখনো তোমার প্রাণ পুড়ে। তবু কেন কতবার মনে যেন হ’ত, তব স্নিগ্ধ মদিন পরশ মুছে নিতে পারে মোর সব জ্বালা সব দগ্ধ ক্ষত। মনে হ’ত প্রাণে তব প্রাণে যেন কাঁদে অহরহ- ‘হে পথিক! ঐ কাঁটা মোরে দাও, কোথা তব ব্যথা বাজে কহ মোরে কহ! নীরব গোপন তুমি মৌন তাপসিনী, তাই তব চির-মৌন ভাষা শুনিয়াও শুনি নাই, বুঝিয়াও বুঝি নাই ঐ ক্ষুদ্র চাপা-বুকে কাঁদে কত ভালোবাসা আশা! এরি মাঝে কোথা হ’তে ভেসে এল মুক্তধারা মা আমার সে ঝড়ের রাতে, কোলে তুলে নিল মোরে, শত শত চুমা দিল সিক্ত আঁখি-পাতে। কোথা গেল পথ- কোথা গেল রথ- ডুবে গেল সব শোক-জ্বালা, জননীর ভালোবাসা এ ভাঙা দেউলে যেন দুলাইল দেয়ালীর আলা! গত কথা গত জন্ম হেন হারা-মায়ে পেয়ে আমি ভুলে গেনু যেন। গৃহহারা গৃহ পেনু, অতি শান- সুখে কত জন্ম পরে আমি প্রাণ ভ’রে ঘুমাইনু মুখ থুয়ে জননীর বুকে। শেষ হ’ল পথ-গান গাওয়া, ডেকে ডেকে ফিরে গেল হা-হা স্বরে পথসাথী তুফানের হাওয়া। আবার আবার বুঝি ভুলিলাম পথ- বুঝি কোন্‌ বিজয়িনী-দ্বার প্রানে- আসি’ বাধা পেল পার্থ-পথ-রথ। ভুলে গেনু কারে মোর পথে পথ খোঁজা,- ভুলে গেনু প্রাণ মোর নিত্যকাল ধ’রে অভিসারী মাগে কোন্‌ পূজা, ভুলে গেনু যত ব্যথা শোক,- নব সুখ-অশ্র”ধারে গ’লে গেল হিয়া, ভিজে গেল অশ্র”হীন চোখ। যেন কোন্‌ রূপ-কমলেতে মোর ডুবে গেল আঁখি, সুরভিতে মেতে উঠে বুক, উলসিয়া বিলসিয়া উথলিল প্রাণে এ কী ব্যগ্র উগ্র ব্যথা-সুখ। বাঁচিয়া নূতন ক’রে মরিল আবার সীধু-লোভী বাণ-বেঁধা পাখী।…. …. ভেসে গেল রক্তে মোর মন্দিরের বেদী- জাগিল না পাষাণ-প্রতিমা, অপমানে দাবানল-সম তেজে র”খিয়া উঠিল এইবার যত মোর ব্যথা-অর”নিমা। হুঙ্কারিয়া ছুটিলাম বিদ্রোহের রক্ত-অশ্বে চড়ি’ বেদনার আদি-হেতু স্রষ্টা পানে মেঘ অভ্রভেদী, ধূমধ্বজ প্রলয়ের ধূমকেতু-ধুমে হিংসা হোমশিখা জ্বালি’ সৃজিলাম বিভীষিকা স্নেহ-মরা শুষ্ক মর”ভূমে। …. এ কি মায়া! তার মাঝে মাঝে মনে হ’ত কতদূরে হ’তে, প্রিয় মোর নাম ধ’রে যেন তব বীণা বাজে! সে সুদূর গোপন পথের পানে চেয়ে হিংসা-রক্ত-আঁখি মোর অশ্র”রাঙা বেদনার রসে যেত ছেয়ে। সেই সুর সেই ডাক স্মরি’ স্মরি’ ভুলিলাম অতীতের জ্বালা, বুঝিলাম তুমি সত্য-তুমি আছে, অনাদৃতা তুমি মোর, তুমি মোরে মনে প্রাণে যাচ’, একা তুমি বনবালা মোর তরে গাঁথিতেছ মালা আপনার মনে লাজে সঙ্গোপনে। জন্ম জন্ম ধ’রে চাওয়া তুমি মোর সেই ভিখারিনী। অন-রের অগ্নি-সিন্ধু ফুল হ’য়ে হেসে উঠে কহে- ‘চিনি, চিনি। বেঁচে ওঠ্‌ মরা প্রাণ! ডাকে তোরে দূর হ’তে সেই- যার তরে এত বড় বিশ্বে তোর সুখ-শানি- নেই!’ তারি মাঝে কাহার ক্রন্দন-ধ্বনি বাজে? কে যেন রে পিছু ডেকে চীৎকারিয়া কয়- ‘বন্ধু এ যে অবেলায়! হতভাগ্য, এ যে অসময়! শুনিনু না মানা, মানিনু না বাধা, প্রাণে শুধু ভেসে আসে জন্মন-র হ’তে যেন বিরহিণী ললিতার কাঁদা! ছুটে এনু তব পাশে উর্ধ্বশ্বাসে, মৃত্যু-পথ অগ্নি-রথ কোথা প’ড়ে কাঁদে, রক্ত-কেতু গেল উড়ে পুড়ে, তোমার গোপান পূজা বিশ্বের আরাম নিয়া এলো বুক জুড়ে। তারপর যা বলিব হারায়েছি আজ তার ভাষা; আজ মোর প্রাণ নাই, অশ্র” নাই, নাই শক্তি আশা। যা বলিব আজ ইহা গান নহে, ইহা শুধু রক্ত-ঝরা প্রাণ-রাঙা অশ্র”-ভাঙা ভাষা। ভাবিতেছ, লজ্জাহীন ভিখারীর প্রাণ- সে-ও চাহে দেওয়ার সম্মান! সত্য প্রিয়া, সত্য ইহা, আমিও তা স্মরি’ আজ শুধু হেসে হেসে মরি! তবু শুধু এইটুকু জেনে রাখো প্রিয়তমা, দ্বার হ’তে দ্বারান-রে ব্যর্থ হ’য়ে ফিরে এসেছিনু তব পাশে, জীবনের শেষ চাওয়া চেয়েছিনু তোমা’, প্রাণের সকল আশা সব প্রেম ভালোবাসা দিয়া তোমারে পূজিয়াছিনু, ওগো মোর বে-দরদী পূজারিণী প্রিয়া! ভেবেছিনু, বিশ্ব যারে পারে নাই তুমি নেবে তার ভার হেসে, বিশ্ব-বিদ্রোহীরে তুমি করিবে শাসন অবহেলে শুধু ভালোবাসে। ভেবেছিনু, দুর্বিনীত দুর্জয়ীরে জয়ের গরবে তব প্রাণে উদ্ভাসিবে অপরূপ জ্যোতি, তারপর একদিন তুমি মোর এ বাহুতে মহাশক্তি সঞ্চারিয়া বিদ্রোহীর জয়লক্ষ্মী হবে। ছিল আশা, ছিল শক্তি, বিশ্বটারে টেনে ছিঁড়ে তব রাঙা পদতলে ছিন্ন রাঙা পদ্মসম পূজা দেব এনে! কিন’ হায়! কোথা সেই তুমি? কোথা সেই প্রাণ? কোথা সেই নাড়ী-ছেঁড়া প্রাণে প্রাণে টান? এ-তুমি আজ সে-তুমি তো নহ; আজ হেরি-তুমিও ছলনাময়ী, তুমিও হইতে চাও মিথ্যা দিয়া জয়ী! কিছু মোরে দিতে চাও, অন্য তরে রাখ কিছু বাকী,- দুর্ভাগিনী! দেখে হেসে মরি! কারে তুমি দিতে চাও ফাঁকি? মোর বুকে জাগিছেন অহরহ সত্য ভগবান, তাঁর দৃষ্টি বড় তীক্ষ্ন, এ দৃষ্টি যাহারে দেখে, তন্ন তন্ন ক’রে খুঁজে দেখে তার প্রাণ! লোভে আজ তব পূজা কলুষিত, প্রিয়া, আজ তারে ভুলাইতে চাহ, যারে তুমি পূজেছিলে পূর্ণ মন-প্রাণ সমর্পিয়া। তাই আজি ভাবি, কার দোষে- অকলঙ্ক তব হৃদি-পুরে জ্বলিল এ মরণের আলো কবে প’শে? তবু ভাবি, এ কি সত্য? তুমিও ছলনাময়ী? যদি তাই হয়, তবে মায়াবিনী অয়ি! ওরে দুষ্ট, তাই সত্য হোক। জ্বালো তবে ভালো ক’রে জ্বালো মিথ্যালোক। আমি তুমি সুর্য চন্দ্র গ্রহ তারা সব মিথ্যা হোক; জ্বালো ওরে মিথ্যাময়ী, জ্বালো তবে ভালো ক’রে জ্বালো মিথ্যালোক। তব মুখপানে চেয়ে আজ বাজ-সম বাজে মর্মে লাজ; তব অনাদর অবহেলা স্মরি’ স্মরি’ তারি সাথে স্মরি’ মোর নির্লজ্জতা আমি আজ প্রাণে প্রাণে মরি। মনে হয়-ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠি, ‘মা বসুধা দ্বিধা হও! ঘৃণাহত মাটিমাখা ছেলেরে তোমার এ নির্লজ্জ মুখ-দেখা আলো হ’তে অন্ধকারে টেনে লও! তবু বারে বারে আসি আশা-পথ বাহি’, কিন’ হায়, যখনই ও-মুখ পানে চাহি- মনে হয়,-হায়,হায়, কোথা সেই পূজারিণী, কোথা সেই রিক্ত সন্ন্যাসিনী? এ যে সেই চির-পরিচিত অবহেলা, এ যে সেই চির-ভাবহীন মুখ! পূর্ণা নয়, এ যে সেই প্রাণ নিয়ে ফাঁকি- অপমানে ফেটে যায় বুক! প্রাণ নিয়া এ কি নিদার”ণ খেলা খেলে এরা হায়! রক্ত-ঝরা রাঙা বুক দ’লে অলক্তক পরে এরা পায়! এর দেবী, এরা লোভী, এরা চাহে সর্বজন-প্রীতি! ইহাদের তরে নহে প্রেমিকের পূর্ণ পূজা, পূজারীর পূর্ণ সমর্পণ, পূজা হেরি’ ইহাদের ভীর” বুকে তাই জাগে এত সত্য-ভীতি। নারী নাহি হ’তে চায় শুধু একা কারো, এরা দেবী, এরা লোভী, যত পূজা পায় এরা চায় তত আরো! ইহাদের অতিলোভী মন একজনে তৃপ্ত নয়, এক পেয়ে সুখী নয়, যাচে বহু জন।.. যে-পূজা পূজিনি আমি স্রষ্টা ভগবানে, যারে দিনু সেই পূজা সে-ই আজি প্রতারণা হানে। বুঝিয়াছি, শেষবার ঘিরে আসে সাথী মোর মৃত্যু-ঘন আঁখি, রিক্ত প্রাণ তিক্ত সুখে হুঙ্কারিয়া উঠে তাই, কার তরে ওরে মন, আর কেন পথে পথে কাঁদি? জ্বলে’ ওঠ্‌ এইবার মহাকাল ভৈরবের নেত্রজ্বালা সম ধ্বক্‌-ধ্বক্‌, হাহাকার-করতালি বাজা! জ্বালা তোর বিদ্রোহের রক্তশিখা অনন- পাবক। আন্‌ তোর বহ্নি-রথ, বাজা তোর সর্বনাশী তূরী! হান্‌ তোর পরশু-ত্রিশুল! ধ্বংস কর্‌ এই মিথ্যাপুরী। রক্ত-সুধা-বিষ আন্‌ মরণের ধর টিপে টুটি! এ মিথ্যা জগৎ তোর অভিশপ্ত জগদ্দল চাপে হোক্‌ কুটি-কুটি!
https://banglarkobita.com/poem/famous/173
1702
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
স্নানযাত্রা
প্রেমমূলক
বাইরে এসো …কে যেন বুকের মধ্যে বলে ওঠে… বাইরে এসো… এখুনি আমার বুকের ভিতরে কার স্নান সমাপন হল! সারাদিন ঘুরেছি অনেক দূরে দূরে। তবুও বাইরে যাওয়া হলো না। ঘরের ভিতরে অনেক দূরে দূরে পা ফেলেছি। ঘরের ভিতরে দশ-বিশ মাইল আমি ঘুরেছি! এখন সন্ধ্যায় কে যেন ফের বুকের ভিতরে বলে উঠল : এসো। বাইরে এসো… কে যেন বুকের ভিতর ঘড়ির ঘন্টায় বলে যাচ্ছে। এখুনি আমার বুকের ভিতর যেন কার অবগাহনের পালা সমাপন হল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1649
1629
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
নিশির ডাক
মানবতাবাদী
নিশির ডাক শুনে মাঝরাত্তিরে যারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল, এখন আবার খুব শান্ত আর খুব সুন্দর এই সকালবেলায় একে-একে সেই ছেলেগুলো যে যার ঘরে ফিরে আসছে। ওদের ছেঁড়া জামাকাপড়, ওদের রক্তাক্ত হাত-পা, আর সেইসঙ্গে ওদের ভাষাহীন চাউনি দেখেই বোঝা যায় যে, যা পাবে বলে ওরা রাস্তায় গিয়ে নেমেছিল, তা ওরা পায়নি। মাথা নিচু করে ওরা এখন ফিরে আসছে। অথচ, রাত্তিরের অন্ধকারে অনেক-অনেক কাঁটাঝোপ ওরা পেরিয়ে গিয়েছিল, অনেক-অনেক পথ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1548
3271
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ধ্যান
সনেট
যত ভালোবাসি, যত হেরি বড়ো ক’রে তত, প্রিয়তমে, আমি সত্য হেরি তোরে। যত অল্প করি তোরে, তত অল্প জানি— কখনো হারায়ে ফেলি, কভু মনে আনি। আজি এ বসন্তদিনে বিকশিতমন হেরিতেছি আমি এক অপূর্ব স্বপন— যেন এ জগৎ নাহি, কিছু নাহি আর, যেন শুধু আছে এক মহাপারাবার, নাহি দিন নাহি রাত্রি নাহি দন্ড পল, প্রলয়ের জলরাশি স্তব্ধ অচঞ্চল; যেন তারি মাঝখানে পূর্ণ বিকাশিয়া একমাত্র পদ্ম তুমি রয়েছ ভাসিয়া; নিত্যকাল মহাপ্রেমে বসি বিশ্বভূপ তোমামাঝে হেরিছেন আত্মপ্রতিরূপ।   (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dhan/
2715
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমার খোলা জানালাতে
প্রেমমূলক
আমার খোলা জানালাতে শব্দবিহীন চরণপাতে কে এলে গো, কে গো তুমি এলে। একলা আমি বসে আছি অস্তলোকের কাছাকাছি পশ্চিমেতে দুটি নয়ন মেলে। অতিসুদূর দীর্ঘ পথে আকুল তব আঁচল হতে আঁধারতলে গন্ধরেখা রাখি জোনাক-জ্বালা বনের শেষে কখন এলে দুয়ারদেশে শিথিল কেশে ললাটখানি ঢাকি।তোমার সাথে আমার পাশে কত গ্রামের নিদ্রা আসে– পান্থবিহীন পথের বিজনতা, ধূসর আলো কত মাঠের, বধূশূন্য কত ঘাটের আঁধার কোণে জলের কলকথা। শৈলতটের পায়ের ‘পরে তরঙ্গদল ঘুমিয়ে পড়ে, স্বপ্ন তারি আনলে বহন করি। কত বনের শাখে শাখে পাখির যে গান সুপ্ত থাকে এনেছ তাই মৌন নূপুর ভরি।মোর ভালে ওই কোমল হস্ত এনে দেয় গো সূর্য-অস্ত, এনে দেয় গো কাজের অবসান– সত্যমিথ্যা ভালোমন্দ সকল সমাপনের ছন্দ, সন্ধ্যানদীর নিঃশেষিত তান। আঁচল তব উড়ে এসে লাগে আমার বক্ষে কেশে, দেহ যেন মিলায় শূন্য’পরি, চক্ষু তব মৃত্যুসম স্তব্ধ আছে মুখে মম কালো আলোয় সর্বহৃদয় ভরি।যেমনি তব দখিন-পাণি তুলে নিল প্রদীপখানি, রেখে দিল আমার গৃহকোণে, গৃহ আমার এক নিমেষে ব্যাপ্ত হল তারার দেশে তিমিরতটে আলোর উপবনে। আজি আমার ঘরের পাশে গগনপারের কারা আসে অঙ্গ তাদের নীলাম্বরে ঢাকি। আজি আমার দ্বারের কাছে অনাদি রাত স্তব্ধ আছে তোমার পানে মেলি তাহার আঁখি।এই মুহূর্তে আধেক ধরা লয়ে তাহার আঁধার-ভরা কত বিরাম, কত গভীর প্রীতি, আমার বাতায়নে এসে দাঁড়ালো আজ দিনের শেষে– শোনায় তোমায় গুঞ্জরিত গীতি। চক্ষে তব পলক নাহি, ধ্রুবতারার দিকে চাহি তাকিয়ে আছ নিরুদ্দেশের পানে। নীরব দুটি চরণ ফেলে আঁধার হতে কে গো এলে আমার ঘরে আমার গীতে গানে।–কত মাঠের শূন্যপথে, কত পুরীর প্রান্ত হতে, কত সিন্ধুবালুর তীরে তীরে, কত শান্ত নদীর পারে, কত স্তব্ধ গ্রামের ধারে, কত সুপ্ত গৃহদুয়ার ফিরে, কত বনের বায়ুর ‘পরে এলো চুলের আঘাত ক’রে আসিলে আজ হঠাৎ অকারণে। বহু দেশের বহু দূরের বহু দিনের বহু সুরের আনিলে গান আমার বাতায়নে।   (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amar-khola-janalete/
3051
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চুরি-নিবারণ
নীতিমূলক
সুয়োরাণী কহে, রাজা দুয়োরাণীটার কত মতলব আছে বুঝে ওঠা ভার। গোয়াল্‌-ঘরের কোণে দিলে ওরে বাসা, তবু দেখো অভাগীর মেটে নাই আশা। তোমারে ভুলায়ে শুধু মুখের কথায় কালো গরুটিরে তব দুয়ে নিতে চায়। রাজা বলে, ঠিক ঠিক, বিষম চাতুরী— এখন কী ক’রে ওর ঠেকাইব চুরি! সুয়ো বল, একমাত্র রয়েছে ওষুধ, গোরুটা আমারে দাও, আমি খাই দুধ।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/churi-nibaron/
5437
সুকান্ত ভট্টাচার্য
আমার মৃত্যুর পর
চিন্তামূলক
আমার মৃত্যুর পর থেমে যাবে কথার গুঞ্জন, বুকের স্পন্দনটুকু মূর্ত হবে ঝিল্লীর ঝংকারে জীবনের পথপ্রান্তে ভুলে যাব মৃত্যুর শঙ্কারে, উজ্জ্বল আলোর চোখে আঁকা হবে আঁধার-অঞ্জন। পরিচয়ভারে ন্যুব্জ অনেকের শোকগ্রস্ত মন, বিস্ময়ের জাগরণে ছদ্মবেশ নেবে বিলাপের মুহূর্তে বিস্মৃত হবে সব চিহ্ন আমার পাপের। কিছুকাল সন্তর্পণে ব্যক্ত হবে সবার স্মরণ।আমার মৃত্যুর পর, জীবনের যত অনাদর লাঞ্ছনার বেদনায়, ষ্পৃষ্ট হবে প্রত্যেক অন্তর।।   (পূর্বাভাস কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/amar-mrityur-por/
1564
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
কলকাতার যীশু
চিন্তামূলক
লালবাতির নিষেধ ছিল না, তবুও ঝড়ের বেগে ধাবমান কলকাতা শহর অতর্কিতে থেমে গেল; ভয়ঙ্করভাবে টাল সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল ট্যাক্সি ও প্রাইভেট, টেমপো, বাঘমার্কা ডবল-ডেকার। ‘গেল গেল’ আর্তনাদে রাস্তার দুদিক থেকে যারা ছুটে এসেছিল— ঝাঁকামুটে, ফিরিওয়ালা, দোকানি ও খরিদ্দার— এখন তারাও যেন স্থির চিত্রটির মতো শিল্পীর ইজেলে লগ্ন হয়ে আছে। স্তব্ধ হয়ে সবাই দেখছে, টালমাটাল পায়ে রাস্তার এক-পার থেকে অন্য পারে হেঁটে চলে যায় সম্পূর্ণ উলঙ্গ এক শিশু। খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে চৌরঙ্গিপাড়ায়। এখন রোদ্দুর ফের অতিদীর্ঘ বল্লমের মতো মেঘের হৃৎপিণ্ড ফুঁড়ে নেমে আসছে; মায়াবী আলোয় ভাসছে কলকাতা শহর। স্টেটবাসের জানালায় মুখ রেখে একবার আকাশ দেখি, একবার তোমাকে। ভিখারি-মায়ের শিশু, কলকাতার যিশু, সমস্ত ট্রাফিক তুমি মন্ত্রবলে থামিয়ে দিয়েছ। জনতার আর্তনাদ, অসহিষ্ণু ড্রাইভারের দাঁতের ঘষটানি, কিছুতে ভ্রুক্ষেপ নেই; দু’দিকে উদ্যত মৃত্যু, তুমি তার মাঝখান দিয়ে টলতে টলতে হেঁটে যাও। যেন মূর্ত মানবতা, সদ্য হাঁটতে শেখার আনন্দে সমগ্র বিশ্বকে তুমি পেয়ে চাও হাতের মুঠোয়। যেন তাই টাল্‌মাটাল পায়ে তুমি পৃথিবীর এক-কিনার থেকে অন্য-কিনারে চলেছ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1587
2761
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আশিষ-গ্রহণ
ভক্তিমূলক
চলিয়াছি রণক্ষেত্রে সংগ্রামের পথে। সংসারবিপ্লবধ্বনি আসে দূর হতে। বিদায় নেবার আগে, পারি যতক্ষণ পরিপূর্ণ করি লই মোর প্রাণমন নিত্য-উচ্চারিত তব কলকণ্ঠস্বরে উদার মঙ্গলমন্ত্রে—হৃদয়ের ‘পরে লই তব শুভস্পর্শ, কল্যাণসঞ্চয়। এই আশীর্বাদ করো, জয়পরাজয় ধরি যেন নম্রচিত্তে করি শির নত দেবতার আশীর্বাদী কুসুমের মতো। বিশ্বস্ত স্নেহের মূর্তি দুঃস্বপ্নের প্রায় সহসা বিরূপ হয়—তবু যেন তায় আমার হৃদয়সুধা না পায় বিকার, আমি যেন আমি থাকি নিত্য আপনার।   (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ashish-grohon/
3658
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভারতসমুদ্র তার বাষ্পোচ্ছ্বাস নিশ্বসে গগনে
সনেট
ভারতসমুদ্র তার বাষ্পোচ্ছ্বাস নিশ্বসে গগনে আলোক করিয়া পান, উদাস দক্ষিণসমীরণে অনির্বচনীয় যেন আনন্দের অব্যক্ত আবেগ। উর্ধ্ববাহু হিমাচল, তুমি সেই উদ্বাহিত মেঘ শিখরে শিখরে তব ছায়াচ্ছন্ন গুহায় গুহায় রাখিছ নিরুদ্ধ করি– পুনর্বার উন্মুক্ত ধারায় নূতন আনন্দস্রোতে নব প্রাণে ফিরাইয়া দিতে অসীমজিজ্ঞাসারত সেই মহাসমুদ্রের চিতে। সেইমতো ভারতের হৃদয়সমুদ্র এতকাল করিয়াছে উচ্চারণ ঊর্ধ্ব-পানে যে বাণী বিশাল, অনন্তের জ্যোতিস্পর্শে অনন্তেরে যা দিয়েছে ফিরে, রেখেছ সঞ্চয় করি হে হিমাদ্রি, তুমি স্তব্ধশিরে। তব মৌন শৃঙ্গ-মাঝে তাই আমি ফিরি অন্বেষণে ভারতের পরিচয় শান্ত-শিব-অদ্বৈতের সনে।   (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/varotsomudro-tar-baspocchash/
210
কাজী নজরুল ইসলাম
আগ্নেয়গিরি বাংলার যৌবন
স্বদেশমূলক
ঘুমাইয়া ছিল আগ্নেয়গিরি বাংলার যৌবন, বহু বৎসর মুখ চেপে ছিল পাষাণের আবরণ। তার এ ঘুমের অবসরে যত ধনলোভী রাক্ষস প্রলোভন দিয়ে করেছিল যত বুদ্ধিজীবীরে বশ। অর্থের জাব খাওয়ায়ে তাদের বলদ করিয়ে শেষে লুঠতরাজের হাট ও বাজার বসাইল সারা দেশে। সেই জাব খেয়ে বুদ্ধিওয়ালার হইল সর্বনাশ, ‘শুদ্ধি স্বামী’ ও ‘বুদ্ধু মিয়াঁ-র হইল তাহারা দাস! বুঝিল না, এই শুদ্ধি স্বামী ও বুদ্ধু মিয়াঁরা কারা খাওয়ায় কাগুজে পুরিয়ায় পুরে এরাই আফিম, পারা! সাত কোটি বাঙালির সাত জনে শুধু টাকা দিয়ে দাস করে, এরা হল কোটিপতি বাঙালি রক্ত পিয়ে। কাগুজে মগুজে ধূর্ত বুদ্ধিজীবীর বুদ্ধিবলে, ছুরি আর লাঠি ধরাইয়া দিল বাঙালির করতলে। জানে এরা ভায়ে ভায়ে হেথা যদি নাহি করে লাঠালাঠি, কেমন করিয়া শাঁস শুষে খাবে, ইহাদের দিয়া আঁটি? আঁটি খেয়ে যবে ভরে নাকো পেট, শূন্য বাটি ও থালা, বাঙালি দেখিল এত পাট, ধান, মেটে না ক্ষুধার জ্বালা! তখন বিরাট আগ্নেয়গিরি বাংলার যৌবনে নাড়া দিয়া যেন জাগাইয়া দিল ঝঞ্জা প্রভঞ্জনে! জেগে উঠে দেখে রক্তনয়নে আগ্নেয়গিরি একী! ওরই ধান ওরই বুকে কুটিতেছে বিদেশি কল ও ঢেঁকি! উহারই বিরাট অঙ্গে উঠেছে মিলের চিমনিরাশি, উহারই ধোঁয়ায় ধোঁয়াটে হয়েছে আঁখির দৃষ্টি, হাসি। এ কোন যন্ত্রদৈত্য আসিয়া যন্ত্রণা দেয় দেহে? দাসদাসী হয়ে আছে নরনারী স্বীয় পৈতৃক গেহে। একী কুৎসিত মূর্তিরা ফেরে আগুনের পর্বতে, ক্যাঙালির মতো, বাঙালি কি ওরা – লেজ ধরে চলে পথে? ভুঁড়ি-দাস আর নুড়ি-দাস যত মুড়ি খায় আর চলে, যে-কথা উহারা বলাইতে চায়, চিৎকার করে বলে! বিদারিত হল বহ্নিগিরির মুখের পাষাণভার, কাঁপিয়া উঠিল লোভীর প্রাসাদ ভীম কম্পনে তার! ক্রোধ হুংকার ওঠে ঘন ঘন প্রাণ-গহ্বর হতে, ‘লাভা’ ও অগ্নিশিখা উঠে ছুটে উর্ধ্ব আকাশপথে।কই রে কই রে স্বৈরাচারীরা বৈরী এ বাংলার? দৈন্য দেখেছ ক্ষুদ্রের, দেখনিকো প্রবলের মার! দেখেছ বাঙালি দাস, দেখনিকো বাঙালির যৌবন, অগ্নিগিরির বক্ষে বেঁধেছ যক্ষ তব ভবন! হেরো, হেরো, কুণ্ডলী-পাক খুলি আগ্নেয় অজগর বিশাল জিহ্বা মেলিয়া নামিছে ক্রোধ-নেত্র প্রখর। ঘুমাইয়া ছিল পাথর হইয়া তার বুকে যত প্রাণ, অগ্নিগোলক হইয়া ছুটিছে তিরবেগে সে পাষাণ! নিঃশেষ করে দেবে আপনারে আগ্নেয়গিরি আজি, ফুলঝুরি-সম ঝরিবে এবার প্রাণের আতসবাজি! ঊর্ধ্বে উঠেছে ক্রুদ্ধ হইয়া অদেখা আকাশ ঘেরি ; তোমাদের শিরে পড়িবে আগুন, নাই বেশি আর দেরি! তোমাদের যন্ত্রের এই যত যন্ত্রণা-কারাগার এই যৌবনবহ্নি করিবে পুড়াইয়া ছারখার। সুতি ধুতিপরা দেখেছ বিনয়- নম্র বাঙালি ছেলে, ঢল ঢল চোখ জলে ছলছল একটু আদর পেলে! দুধ পায় নাই, মানুষ হয়েছে শুধু শাকভাত খেয়ে, তবুও কান্তি মাধুরী ঝরিছে কোমল অঙ্গ বেয়ে। তোমাদের মতো পলোয়ান নয়, নয় মাংসল ভারী, ওরা কৃশ, তবু ঝকমক করে সুতীক্ষ্ণ তরবারি! বঙ্গভূমির তারুণ্যের এ রঙ্গনাটের খেলা বুঝেও বোঝেনি যক্ষ রক্ষ, বুঝিবে সে শেষ বেলা!শাড়ি-মোড়া যেন আনন্দ-শ্রী দেখো বাংলার নারী, দেখনি এখনও, ওঁরাই হবেন অসি-লতা তরবারি! ওরা বিদ্যুল্লতা-সম, তবু ওরাই বজ্র হানে, ওরা কোথা থাকে, তোমরা জান না, সাগর ও মেঘ জানে। যুগান্তরের সূর্য যখন উদয়-গগনে ওঠে, সূর্যের টানে ছুটে আসে মেঘ ; তাহারই আড়ালে ছোটে ওরা যেন ভীরু পর্দানশীন! ওরাই সময় হলে ঘন ঘন ছোঁড়ে অশনি অত্যাচারীর বক্ষতলে! শ্যামবঙ্গের লীলা সে ভীষণ সুন্দর, রেখো জেনে, বাঘের মতন নাগের মতন দেখি, যে বাঙালি চেনে! তাদেরই জড়তা-পাষাণ টুটিয়া ঝরিছে অগ্নিশিখা, কে জানে কাহার তকদীরে ভাই কী শাস্তি আছে লিখা! ধোঁয়া দেখে যদি না নোয়াও মাথা, বছর খানিক বেঁচো! দেখিবে হয়েছি ফেরেশতা মোরা, তোমরা হয়েছ কেঁচো!   (শেষ সওগাত কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/agneygiri-banglar-joubon/
910
জীবনানন্দ দাশ
অন্ধকার থেকে
চিন্তামূলক
গাঢ় অন্ধকার থেকে আমরা এ-পৃথিবীর আজকের মুহূর্তে এসেছি। বীজের ভেতর থেকে কী ক’রে অরণ্য জন্ম নেয়,- জলের কণার থেকে জেগে ওঠে নভোনীল মহান সাগর, কী ক’রে এ-প্রকৃতিতে—পৃথিবীতে, আহা, ছায়াচ্ছন্ন দৃষ্টি নিয়ে মানব প্রথম এসেছিল, আমরা জেনেছি সব,—অনুভব করেছি সকলই। সূর্য জেলে,—কল্লোল সাগর জল কোথাও দিগন্তে আছে, তাই শুভ্র অপলক সব শঙ্খের মতন আমাদের শরীরের সিন্ধু-তীর।এই সব ব্যাপ্ত অনুভব থেকে মানুষের স্মরণীয় মন জেগে ব্যথা বাধা ভয় রক্তফেনশীর্ষ ঘিরে প্রাণে সঞ্চারিত ক’রে গেছে আশা আর আশা; সকল অজ্ঞান কবে জ্ঞান আলো হবে, সকল লোভের চেয়ে সৎ হবে না কি সব মানুষের তরে সব মানুষের ভালোবাসা।আমরা অনেক যুগ ইতিহাসে সচকিত চোখ মেলে থেকে দেখেছি আসন্ন সূর্য আপনাকে বলয়িত ক’রে নিতে জানে নব নব মৃত সূর্যে শীতে; দেখেছি নির্ঝর নদী বালিয়াড়ি মরুর উঠানে মরণের-ই নামরূপ অবিরল কী যে।তবু শ্মশান থেকে দেখেছি চকিত রৌদ্রে কেমন জেগেছে শালিধান; ইতিহাস-ধূলো-বিষ উৎসারিত ক’রে নব নবতর মানুষের প্রাণ প্রতিটি মৃত্যুর স্তর ভেদ ক’রে এক তিল বেশি চেতনার আভা নিয়ে তবু খাঁচার পাখির কাছে কী নীলাভ আকাশ-নির্দেশী! হয়তো এখনো তাই;—তবু রাত্রি শেষ হলে রোজ পতঙ্গ-পালক-পাতা শিশির-নিঃসৃত শুভ্র ভোরে আমরা এসেছি আজ অনেক হিংসার খেলা অবসান ক’রে; অনেক দ্বেসের ক্লান্তি মৃত্যু দেখে গেছি। আজো তবু আজো ঢের গ্লানি-কলঙ্কিত হয়ে ভাবিঃ রক্তনদীদের পারে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির শোকাবহ অঙ্ক কঙ্কালে কি মাছি তোমাদের মৌমাছির নীড় অল্পায়ু সোনালি রৌদ্রে; প্রেমের প্রেরণা নেই—শুধু নির্ঝ্রিত শ্বাস পণ্যজাত শরীরের মৃত্যু-ম্লান পণ্য ভালোবেসে; তবুও হয়তো আজ তোমার উড্ডীন নব সূর্যের উদ্দেশ্য।ইতিহাসে-সঞ্চারিত হে বিভিন্ন জাতি, মন, মানব-জীবন, এই পৃথিবীর মুখ যত বেশি চেনা যায়—চলা যায় সময়ের পথে, তত বেশি উওরণ সত্য নয়;—জানি; তবু জ্ঞানের বিষণ্ণলোকী আলো অধিক নির্মল হলে নটীর প্রেমের চেয়ে ভালো সফল মানব প্রেমে উৎসারিত হয় যদি, তবে নব নদী নব নীড় নগরী নীলিমা সৃষ্টি হবে। আমরা চলেছি সেই উজ্জ্বল সূর্যের অনুভবে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ondhokar-thekey/
1290
টুটুল দাস
যে
প্রেমমূলক
ঝালমুড়ি ঠোঙায় ছোটবেলার মুখস্থ না হওয়া ছড়া একযুগ বয়স কমিয়ে দেয়- নীল ফ্রকের হাত ধরে হাঁটতে থাকা লাল গেঞ্জি যেন বৃন্দাবন উঠে আসে পাড়ার গলিতে।যে শহরে প্রজাপতি ওড়ার জায়গা নেই সেখানে কীটপোকা থাকবেই।পুরুষ লাঙ্গল কাঁধে ভোরবেলা বেরিয়ে গেছে তার টিফিনবক্সে দু’মুটো পান্তা ভাত, আলু সেদ্ধর সাথে এক চামচ ভালোবাসা মাটির স্পর্শ পেলেই শুক্লপক্ষের চাঁদ।যার অাঙ্গুলের গন্ধ এখনো লেগে আছে নাকে মুখে বুকে তাকে ভুলে যাবার নাম টর্চ জ্বালিয়ে চাঁদ দেখা।মুখস্থ না হওয়া ছড়াগুলো অমুখস্থই থাক সব ছড়া মুখস্ত করতে নেই।যাকে ভালোবেসে ঠোঁট দিয়েছো, বুক দিয়েছো আগুনের তার দরকারই বা কি?টুটুল দাসের পাতায় যেতেঃ এখানে ক্লিক করুন
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%85%e0%a6%be%e0%a6%81%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%be-%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%97%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%93-%e0%a6%a5%e0%a6%be/
4576
শামসুর রাহমান
কাদের জন্যে
মানবতাবাদী
লিখতে কহ যে দিনরাত্তির কাদের জন্যে লিখব? কাদের জন্যে দুঃখের পাঠ করুণ ভাষ্যে শিখব?ইঞ্জিনিয়ার ডাক্তার আর মোক্তার আর রাজনীতিবিদ আদার ব্যাপারী আর ব্যাংকার পেডেন্ডো আর মিহি কলাবিদ খুঁটবে আমার কাব্য। তাদের জন্যে লিখব এবং তাদের জন্যে ভাবব?শকুন-উকিল ঘোর ঠিকাদার আর নিধিরাম সর্দার আর হুজুরের জি-হাঁ হুঁকোবরদার বৈদ্য এবং বৈশ্য ঘাঁটব আমার প্রাণ-নিংড়ানো সাধের অনেক শস্য।তাদের জন্যে সকাল সন্ধে গাধার খাটুনি খাটব? হঠাৎ-আলোর ঝলকানি-লাগা সরু দড়িটায় হাঁটব?   (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kader-jonyo/
3939
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সর্বদেহের ব্যাকুলতা কী বলতে চায় বাণী
প্রেমমূলক
সর্বদেহের ব্যাকুলতা কী বলতে চায় বাণী, তাই আমার এই নূতন বসনখানি। নূতন সে মোর হিয়ার মধ্যে দেখতে কি পায় কেউ। সেই নূতনের ঢেউ অঙ্গ বেয়ে পড়ল ছেয়ে নূতন বসনখানি। দেহ-গানের তান যেন এই নিলেম বুকে টানি। আপনাকে তো দিলেম তারে, তবু হাজার বার নূতন করে দিই যে উপহার। চোখের কালোয় নূতন আলো ঝলক দিয়ে ওঠে, নূতন হাসি ফোটে, তারি সঙ্গে, যতনভরা নূতন বসনখানি অঙ্গ আমার নূতন করে দেয়-যে তারি আনি। চাঁদের আলো চাইবে রাতে বনছায়ার পানে বেদনভরা শুধু চোখের গানে। মিলব তখন বিশ্বমাঝে আমরা দোঁহে একা, যেন নূতন দেখা। তখন আমার অঙ্গ ভরি নূতন বসনখানি। পাড়ে পাড়ে ভাঁজে ভাঁজে করবে কানাকানি। ওগো, আমার হৃদয় যেন সন্ধ্যারি আকাশ, রঙের নেশায় মেটে না তার আশ, তাই তো বসন রাঙিয়ে পরি কখনো বা ধানী, কখনো জাফরানী, আজ তোরা দেখ্‌ চেয়ে আমার নূতন বসনখানি বৃষ্টি-ধোওয়া আকাশ যেন নবীন আসমানী। অকূলের এই বর্ণ, এ-যে দিশাহারার নীল, অন্য পারের বনের সাথে মিল। আজকে আমার সকল দেহে বইছে দূরের হাওয়া সাগরপানে ধাওয়া। আজকে আমার অঙ্গে আনে নূতন কাপড়খানি বৃষ্টিভরা ঈশান কোণের নব মেঘের বাণী। পদ্মা, ১২ অগ্রহায়ণ, ১৩২২
https://banglarkobita.com/poem/famous/1950
1843
পূর্ণেন্দু পত্রী
নেলকাটার
প্রকৃতিমূলক
সুখ নেইকো মনে নেলকাটারটা হারিয়ে গেছে হলুদ বনে বনে। সাত বছর সাঁতার কাটিনি সমুদ্রের নীল শাড়ির আমিষ অন্ধকারে দশ বছর আগে শেষ ছুয়েছি পাহাড়ের স্তনচূড়া মাদল বাজিয়ে কতবার ডেকেছে হৈ-হল্লার জঙ্গল, যাইনি। আলজিভে উপুড় করে দিয়েছে মাতাল-হওয়ার কলসী, খাইনি। যাবার মধ্যে গত ডিসেম্বরে সাঁচী হাজার বছর পরে আবার দেখা যক্ষিনীদের সঙ্গে, হাসি ঠাট্টা-গল্পো। কিন্তু নেলকাটার তো তারা নেবেনা। সুখ নেইকো মনে নেলকাটারটা হারিয়ে গেছে হলুদ বনে বনে। বেনারসী পরে মেধ নামবে ছাঁদনাতলায় সর্বাঙ্গে আলোর গয়না, অথচ আমার আলিঙ্গন করা বারণ। ছুলেই তো রক্তের ফিনকি, করকরে ঘা। যে শাঁখ বাজিয়ে কাল বলেছে-এসো সে ঢাক বাজিয়ে আজ বলবে- যা। আমাকে এবার খুঁজতে হবে একটা ন্যড়া মাথা নদী তারই বালিতে বাঘছালের মতো বিছিয়ে দিতে হবে শুকনো স্মৃতি। তারই উপরেই শোয়া-বসা, জপ-তপ, বাসন-কোসন, কাপড় কাচা এবং নিজের নখে নিজেকে ছিড়তে বাঁচা। সুখ নেইকো মনে নেলকাটারটা হারিয়ে গেছে হলুদ বনে বনে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1307
2498
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
পালাবার পথ নেই
চিন্তামূলক
ইদানীং হুট-হাট চিন্তা তার লম্বা লম্বা পা ফেলে বেড়াতে চলে আসে এসেই স্বভাব মত খুলির ভিতরে ঢুকে মাকড়ের জাল বুনে চলে - আমার ইচ্ছের বিপরীতে সেই জালে ধরা পড়ে বিচিত্র পতঙ্গ-কীট - যেমন কেবল আজ প্রথম সকাল উঁকি দিতে না দিতেই এক উড়ো মাছি এসে জড়িয়ে সেখানে ভন-ভন করে যাচ্ছে - এসব আমার ভালো লাগে না বলেই আমি তাকে যেতে বলি কিন্তু সে জাঁকিয়ে বসে বলে- তার মত এতখানি নিকটের প্রতিবেশী আর কেউ নেই শুধুমাত্র পাগল ছাড়া তার তীক্ষ্ণ নখের আশ্রয়ে আঁচড়ের সুখ থেকে বঞ্চিত থাকে না কোনো মানুষ কখনো- আমারই মগজে আমি এই ভাবে শত্রু পুষে আপ্যায়ন করি বুঝি এর থেকে আর পালাবার পথ নেই কোনো
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/palabar-poth-nei/
4959
শামসুর রাহমান
প্রত্যাশার বাইরেই ছিল
চিন্তামূলক
প্রত্যাশার বাইরেই ছিল ব্যাপারটি। রোজকার মতোই টেবিল ঘেঁষে পুরোনো চেয়ারে আরামে ছিলাম বসে, ঘড়িতে তখন সকাল আটটা ফ্যাল ফ্যাল ক’রে তাকিয়ে রয়েছে। আমি কি না-লেখা কোনও কবিতার পঙ্‌ক্তি মনে-মনে সৃজনে ছিলাম মগ্ন? একটি কি দুটি শব্দ হয়তো-বা ভেসে উঠছিল আমার মানস-হ্রদে। আচমকা চোখে পড়ে ঘরে একটি প্রজাপতির চঞ্চলতা।বেশ কিছুকাল থেকে কৃষ্ণপক্ষ দিব্যি গিলে রেখেছে আমার, আমাদের বসতিকে। আলো জ্বালাবার প্রয়াস নিমেষে ব্যর্থ হয় জাহাঁবাজ তিমিরবিলাসী ক্রূর হাওয়ার সন্ত্রাসে নিত্যদিন। তবুও তোএকজন রঙিন অতিথি ঘরটিকে দান করে অকৃপণ সোন্দর্যের আভা, মুগ্ধ চোখে দেখি তাকে। মনে হয়, একটি কবিতা যেন ওড়াউড়ি করছে এ-ঘরে, অথচ দিচ্ছে না ধরা আমার একান্ত করতলে, যার ধ্যানে দীর্ঘকাল মগ্ন ছিল কবিচিত্ত সম্ভবত অবচেতনায় আধো জাগরণে কিংবা ঘুমের আংশিক এলাকায়।   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/prottyashar-baire-chilo/
3719
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মানিক কহিল পিঠ পেতে দিই দাঁড়াও
হাস্যরসাত্মক
মানিক কহিল, “পিঠ পেতে দিই দাঁড়াও। আম দুটো ঝোলে, ওর দিকে হাত বাড়াও। উপরের ডালে সবুজে ও লালে ভরে আছে, কষে নাড়াও। নিচে নেমে এসে ছুরি দিয়ে শেষে ব’সে ব’সে খোসা ছাড়াও। যদি আসে মালি চোখে দিয়ে বালি পারো যদি তারে তাড়াও। বাকি কাজটার মোর ‘পরে ভার, পাবে না শাঁসের সাড়াও। আঁঠি যদি থাকে দিয়ো মালিটাকে, মাড়াব না তার পাড়াও। পিসিমা রাগিলে তাঁর চড়ে কিলে বাঁদরামি-ভূত তাড়াও।’   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/manik-kohilo-pith-pete-dei-darao/
959
জীবনানন্দ দাশ
এই পৃথিবীর
চিন্তামূলক
এই পৃথিবীর বুকের ভিতরে কোথাও শান্তি আছে; অঘ্রাণ মাস রাত্রি হ’লে অনেক বিষয়াবিষের সমাধান মাঠে জলে পাখির নীড়ে নক্ষত্রেতে থাকে; অমেয় গোলকধাঁধাঁয় ঘুরে প্রাণ চেষ্টা করে সমাজ জাতি সময় সৃষ্টি সঠিক বুঝে নিতে। সকল প্রয়াণ সফল হবে গ্লাশিয়ারের দীপ্তি আসার আগে; এখন রৌদ্রে আজন্মকাল অনুষ্ঠানের দিন; সফল হতে ইতিহাসের অনেক দিন লাগে। সে সফলতা এই পৃথিবী- হয়তো সৃশঠি চূর্ণ হ’লে হবে; আমি অনেক দূরের থেকে তাহার কারণধ্বনি নদীর জলে সমস্ত দিন ক্রন্দসী উজ্জ্বল; তোমায় আমি ভালোবাসি- এই সত্য স্বভাবপৃথিবীর দানের মতন নিজেরই ফলাফল।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ei-prithibiir/
1794
পূর্ণেন্দু পত্রী
কবি
চিন্তামূলক
ওহে দেখতো দেখতো লোকটা চলে যাওয়ার সময় কি রেখে গেল? ভারী লুকনো স্বভাবের ছিল মানুষটা। ঘাড় গুজে, হাঁটু ভেঙে, চোখ জ্বালিয়ে বন-বাদাড়, নুড়ি পাথর, আগুন অন্ধকার, ঘেঁটে ঘেঁটে কী সব কুড়িয়ে বেড়াত দিনরাত। দেখতো কী রেখে গেল যাওয়ার সময়? সিন্ধুকটা খোল। ভিতরে কি? আজ্ঞে পান্ডুলিপি। ভল্টটা ভাঙো। ভিতরে কি? আজ্ঞে পান্ডুলিপি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1299
2089
মহাদেব সাহা
এই কবিতার জন্যে
মানবতাবাদী
এই কবিতার জন্যে কতোবার বদ্ধ উন্মাদের মতো ঘুরলাম রাস্তায় রাস্তায় কতোবার আগুনে দিলাম হাত, প্রবল তুষারপাত নিলাম মাথায়; এই কবিতার জন্যে পঞ্চপাণ্ডবের মতো আবদ্ধ হলাম জতুগৃহে শুধু এই কবিতাকে ভালোবেসে কতোবার দাঁড়ালাম পরমানু বোমার বিরুদ্ধে কতোবার একা বুক পেতে দাঁড়ালাম আণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের সম্মুখে, কবিতাকে ভালোবেসে এই পৃথিবীকে কতোবার বাঁচালাম যুদ্ধ ও ধ্বংসের হাত থেকে। কবিতার প্রতি এই তীব্র ভালোবাসা ছাড়া এমন বিরূপ আবহাওয়া ও জলবায়ুতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কখনো সম্ভব নয় বাঁচা; এই কবিতার জন্রে কতোবার দাঁড়ালাম বিপদের মুখোমুখি ট্রাফিক সঙ্কেত ভুলে পথের ওপরে, কতোবার প্রমত্ত ঝঞ্ঝার মুখে, স্রোতের আবর্তে এই কবিতার জন্যে খোয়ালাম পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি যা কিচু সম্বল কানাকড়ি। এই কবিতার জন্রে আমিও রিলকের মতো গোলাপের দংশনেই হলাম আহত আমও বুদ্ধের মতো জরামৃত্যুব্যাধি দেখে হলাম ব্যাকুল; কতোবার এই কবিতার জন্যে সেই কৈশোর থেকেই তছনছ করেছি জীবন এই কবিতার জন্যে আমি আপাদমস্তক ছিন্নভিন্ন এমন ফতুর ভাঙা শিরদাঁড়া, পোড়-খাওয়া একটি মানুষ এই কবিতার জন্যে যীশুর মতোই আমি ক্রুশবিদ্ধ। এই কবিতার জন্যেখনো শিশুর মতো কাঁদি, দুঃখ পাই এখনো আগের মতোই ঠিক কবিতার জন্যে হই গভীর ব্যথিত, মণঃক্ষুণ্ন কিংবা উত্তেজিত; এই কবিতার জন্যে এখনো দাঁড়াই এসে অনায়াসে সকল ঝুঁকির মুখে আমি এই কবিতার জন্যে জীবনকে এখনো আমি এতো ভালোবাসি, এতো ঘৃণা করি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1368
2703
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমাদের এই পল্লিখানি পাহাড় দিয়ে ঘেরা
রূপক
আমাদের এই পল্লিখানি পাহাড় দিয়ে ঘেরা, দেবদারুর কুঞ্জে ধেনু চরায় রাখালেরা। কোথা হতে চৈত্রমাসে হাঁসের শ্রেণী উড়ে আসে, অঘ্রানেতে আকাশপথে যায় যে তারা কোথা আমরা কিছুই জানি নেকো সেই সুদূরের কথা। আমরা জানি গ্রাম ক’খানি, চিনি দশটি গিরি– মা ধরণী রাখেন মোদের কোলের মধ্যে ঘিরি।সে ছিল ওই বনের ধারে ভুট্টাখেতের পাশে যেখানে ওই ছায়ার তলে জলটি ঝ’রে আসে। ঝর্না হতে আনতে বারি জুটত হোথা অনেক নারী, উঠত কত হাসির ধ্বনি তারি ঘরের দ্বারে– সকাল-সাঁঝে আনাগোনা তারি পথের ধারে। মিশত কুলুকুলুধ্বনি তারি দিনের কাজে, ওই রাগিনী পথ হারাত তারি ঘুমের মাঝে।সন্ধ্যাবেলায় সন্ন্যাসী এক, বিপুল জটা শিরে, মেঘে-ঢাকা শিখর হতে নেমে এলেন ধীরে। বিস্ময়েতে আমরা সবে শুধাই, “তুমি কে গো হবে।’ বসল যোগী নিরুত্তরে নির্ঝরিণীর কূলে নীরবে সেই ঘরের পানে স্থির নয়ন তুলে। অজানা কোন্‌ অমঙ্গলে বক্ষ কাঁপে ডরে– রাত্রি হল, ফিরে এলেম যে যার আপন ঘরে।পরদিনে প্রভাত হল দেবদারুর বনে, ঝর্নাতলায় আনতে বারি জুটল নারীগণে। দুয়ার খোলা দেখে আসি– নাই সে খুশি, নাই সে হাসি, জলশূন্য কলসখানি গড়ায় গৃহতলে, নিব-নিব প্রদীপটি সেই ঘরের কোণে জ্বলে। কোথায় সে যে চলে গেল রাত না পোহাতেই, শূন্য ঘরের দ্বারের কাছে সন্ন্যাসীও নেই।চৈত্রমাসে রৌদ্র বাড়ে, বরফ গ’লে পড়ে– ঝর্নাতলায় বসে মোরা কাঁদি তাহার তরে। আজিকে এই তৃষার দিনে কোথায় ফিরে নিঝর বিনে, শুষ্ক কলস ভরে নিতে কোথায় পাবে ধারা। কে জানে সে নিরুদ্দেশে কোথায় হল হারা। কোথাও কিছু আছে কি গো, শুধাই যারে তারে– আমাদের এই আকাশ-ঢাকা দশ পাহাড়ের পারে।গ্রীষ্মরাতে বাতায়নে বাতাস হু হু করে, বসে আছি প্রদীপ-নেবা তাহার শূন্য ঘরে। শুনি বসে দ্বারের কাছে ঝর্না যেন তারেই যাচে– বলে, “ওগো, আজকে তোমার নাই কি কোনো তৃষা। জলে তোমার নাই প্রয়োজন, এমন গ্রীষ্মনিশা?’ আমিও কেঁদে কেঁদে বলি, “হে অজ্ঞাতচারী, তৃষ্ণা যদি হারাও তবু ভুলো না এই বারি।’হেনকালে হঠাৎ যেন লাগল চোখে ধাঁধা, চারি দিকে চেয়ে দেখি নাই পাহাড়ের বাধা। ওই-যে আসে, কারে দেখি– আমাদের যে ছিল সে কি। ওগো, তুমি কেমন আছ, আছ মনের সুখে? খোলা আকাশতলে হেথা ঘর কোথা কোন্‌ মুখে? নাইকো পাহাড়, কোনোখানে ঝর্না নাহি ঝরে, তৃষ্ণা পেলে কোথায় যাবে বারিপানের তরে?সে কহিল, “যে ঝর্না বয় সেথা মোদের দ্বারে, নদী হয়ে সে’ই চলেছে হেথা উদার ধারে। সে আকাশ সেই পাহাড় ছেড়ে অসীম-পানে গেছে বেড়ে সেই ধরারেই নাইকো হেথা পাষাণ-বাঁধা বেঁধে।’ “সবই আছে, আমরা তো নেই’ কইনু তারে কেঁদে। সে কহিল করুণ হেসে, “আছ হৃদয়মূলে।’ স্বপন ভেঙে চেয়ে দেখি আছি ঝর্নাকূলে।   (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amader-ei-pollikhani-pahar-die-ghera/
332
কাজী নজরুল ইসলাম
ঝোড়ো গান
মানবতাবাদী
[কীর্তন] (আমি) চাইনে হতে ভ্যাবাগঙ্গারাম ও দাদা শ্যাম! তাই গান গাই আর যাই নেচে যাই ঝম্‌ঝমা্‌ঝম্ অবিশ্রাম ॥ আমি সাইক্লোন আর তুফান আমি দামোদরের বান খোশখেয়ালে উড়াই ঢাকা, ডুবাই বর্ধমান। আর শিবঠাকুরকে কাঠি করে বাজাই ব্রহ্মা-বিষ্ণু-ড্রাম॥
https://banglarkobita.com/poem/famous/835
3410
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পূর্ণ মিলন
সনেট
নিশিদিন কাঁদি , সখী , মিলনের তরে যে মিলন ক্ষুধাতুর মৃত্যুর মতন । লও লও বেঁধে লও কেড়ে লও মোরে — লও লজ্জা , লও বস্ত্র , লও আবরণ । এ তরুণ তনুখানি লহ চুরি করে — আঁখি হতে লও ঘুম , ঘুমের স্বপন । জাগ্রত বিপুল বিশ্ব লও তুমি হরে অনন্তকালের মোর জীবন – মরণ । বিজন বিশ্বের মাঝে মিলনশ্মশানে নির্বাপিতসূর্যালোক লুপ্ত চরাচর , লাজমুক্ত বাসমুক্ত দুটি নগ্ন প্রাণে তোমাতে আমাতে হই অসীম সুন্দর । এ কী দুরাশার স্বপ্ন হায় গো ঈশ্বর , তোমা ছাড়া এ মিলন আছে কোন্খানে ! (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/purno-milon/
3967
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সুপ্তোত্থিতা
প্রেমমূলক
ঘুমের দেশে ভাঙিল ঘুম, উঠিল কলস্বর । গাছের শাখে জাগিল পাখি, কুসুমে মধুকর । অশ্বশালে জাগিল ঘোড়া, হস্তীশালে হাতি । মল্লশালে মল্ল জাগি ফুলায় পুন ছাতি । জাগিল পথে প্রহরীদল, দুয়ারে জাগে দ্বারী, আকাশে চেয়ে নিরখে বেলা জাগিয়া নরনারী । উঠিল জাগি রাজাধিরাজ, জাগিল রানীমাতা । কচলি আঁখি কুমার-সাথে জাগিল রাজভ্রাতা । নিভৃত ঘরে ধূপের বাস, রতন-দীপ জ্বালা, জাগিয়া উঠি শয্যাতলে শুধালো রাজবালা --- 'কে পরালে মালা ! 'খসিয়া-পড়া আঁচলখানি বক্ষে তুলে নিল । আপন-পানে নেহারি চেয়ে শরমে শিহরিল । ত্রস্ত হয়ে চকিত চোখে চাহিল চারি দিকে--- বিজন গৃহ, রতন-দীপ জ্বলিছে অনিমিখে । গলার মালা খুলিয়া লয়ে ধরিয়া দুটি করে সোনার সূতে যতনে গাঁথা লিখনখানি পড়ে। পড়িল নাম, পড়িল ধাম, পড়িল লিপি তার, কোলের 'পরে বিছায়ে দিয়ে পড়িল শতবার । শয়নশেষে রহিল বসে, ভাবিল রাজবালা --- 'আপন ঘরে ঘুমায়ে ছিনু নিতান্ত নিরালা, 'কে পরালে মালা !'নূতন-জাগা কুঞ্জবনে কুহরি উঠে পিক, বসন্তের চুম্বনেতে বিবশ দশ দিক । বাতাস ঘরে প্রবেশ করে ব্যাকুল উচ্ছাসে, নবীনফুলমঞ্জরীর গন্ধ লয়ে আসে । জাগিয়া উঠে বৈতালিক গাহিছে জয়গান, প্রাসাদদ্বারে ললিত স্বরে বাঁশিতে উঠে তান । শীতলছায়া নদীর পথে কলসে লয়ে বারি --- কাঁকন বাজে, নূপুর বাজে, চলিছে পুরনারী । কাননপথে মর্মরিয়া কাঁপিছে গাছপালা, আধেক মুদে নয়ন দুটি ভাবিছে রাজবালা --- 'কে পরালে মালা !'বারেক মালা গলায় পরে, বারেক লহে খুলি--- দুইটি করে চাপিয়া ধরে বুকের কাছে তুলি । শয়ন -'পরে মেলায়ে দিয়ে তৃষিত চেয়ে রয়, এমনি করে পাইবে যেন অধিক পরিচয় । জগতে আজ কত-না ধ্বনি উঠিছে কত ছলে --- একটি আছে গোপন কথা, সে কেহ নাহি বলে । বাতাস শুধু কানের কাছে বহিয়া যায় হূহু, কোকিল শুধু অবিশ্রাম ডাকছে কুহু কুহু । নিভৃত ঘরে পরান মন একান্ত উতালা, শয়নশেষে নীরবে বসে ভাবিছে রাজবালা--- 'কে পরালে মালা !'কেমন বীর-মুরতি তার মাধুরী দিয়ে মিশা ---- দীপ্তিভরা নয়ন-মাঝে তৃপ্তিহীন তৃষা । স্বপ্নে তারে দেখেছে যেন এমনি মনে লয় --- ভুলিয়া গেছে রয়েছে শুধু অসীম বিস্ময় । পার্শ্বে যেন বসিয়াছিল, ধরিয়াছিল কর, এখনো তার পরশে যেন সরস কলেবর । চমকি মুখ দু হাতে ঢাকে, শরমে টুটে মন, লজ্জাহীন প্রদীপ কেন নিভে নি সেইক্ষণ ! কন্ঠ হতে ফেলিল হার যেন বিজুলিজ্বালা, শয়ন-'পরে লুটায়ে প'ড়ে ভাবিল রাজবালা --- 'কে পরালে মালা !'এমনি ধীরে একটি করে কাটিছে দিন রাতি । বসন্ত সে বিদায় নিল লইয়া যূথীজাতি । সঘন মেঘে বরষা আসে, বরষে ঝরঝর্, কাননে ফুটে নবমালতী কদম্বকেশর । স্বচ্ছহাসি শরৎ আসে পূর্ণিমামালিকা, সকল বন আকুল করে শুভ্র শেফালিকা । আসিল শীত সঙ্গে লয়ে দীর্ঘ দুখনিশা, শিশির-ঝরা কুন্দফুলে হাসিয়া কাঁদে দিশা । ফাগুন-মাস আবার এল বহিয়া ফুলডালা, জানালা-পাশে একেলা বসে ভাবিছে রাজবালা --- 'কে পরালে মালা !'
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shuptotthita/
3056
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ছল
প্রেমমূলক
তোমারে পাছে সহজে বুঝি     তাই কি এত লীলার ছল - বাহিরে যবে হাসির ছটা     ভিতরে থাকে আঁখির জল। বুঝি গো আমি, বুঝি গো তব     ছলনা - যে কথা তুমি বলিতে চাও     সে কথা তুমি বল না।।তোমারে পাছে সহজে ধরি     কিছুরই তব কিনারা নাই - দশের দলে টানি গো পাছে     কিরূপ তুমি, বিমুখ তাই। বুঝি গো আমি, বুঝি গো তব     ছলনা - যে পথে তুমি চলিতে চাও     সে পথে তুমি চল না।।সবার চেয়ে অধিক চাহ,     তাই কি তুমি ফিরিয়া যাও - হেলার ভরে খেলার মতো     ভিক্ষাঝুলি ভাসায়ে দাও? বুঝেছি আমি, বুজেছি তব     ছলনা - সবার যাহে তৃপ্তি হল     তোমার তাহে হল না।।(কাব্যগ্রন্থঃ সঞ্চয়িতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chhol/
2460
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
অসময়
মানবতাবাদী
ক্রসফায়ারের এক দুর্নাম শিকার হয়ে ফজর বয়াতি চিৎপাত পড়ে আছে ডোবার জঙ্গলে - শুধু তার বাম পা'টা ঝোপে বেঁধে ঊর্ধ্বমুখী ঔদ্ধত্যের লাথি হয়ে আছে কারো দিকে, এপার-ওপার ছিদ্র মগজ সাঁতার দিচ্ছে না এখন তার তর্জা কিংবা বিচারগানের কোনো ধারা-- যদি দিতো - তবে কি তা জমাট রক্তের গন্ধ শুঁকে খুঁজে পেতো কারো পাপ - এবং সে বাজিয়ে দোতারা শোনাতো তর্জার ছন্দে কার হিংস্র বুকের সিন্দুকে জমে আছে পাপ-লোভ-পোশাকি বারুদ-ক্রোধ-ঘৃণানা - এখানে গান নেই - এমনকি নেই কোনো ক্রন্দন বিলাপ ফজর আলীর মতো মৃত চোখে চেয়ে সদ্য-বিধবা সখিনা রিমান্ডের কথা শোনে - বোঝে না এ তার না-কি সময়ের পাপ
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/oshomoy/
1775
পূর্ণেন্দু পত্রী
আরশিতে সর্বদা এক উজ্জল রমনী
রূপক
আরশিতে সর্বদা এক উজ্জল রমণী বসে থাকে। তার কোনো পরিচয়, পাসপোর্ট, বাড়ির ঠিকানা মানুষ পায়নি হাত পেতে। অনুসন্ধানের লোভে মুলত সর্বতোভাবে তাকে পাবে বলে অনেক মোটর গাড়ি ছুটে গেছে পাহাড়ের ঢালু পথ চিরে অনেক মোটর গাড়ি চুরমার ভেঙে গেছে নীল সিন্ধুতীরে তারও আগে ধ্বসে গেছে শতাধিক প্রাসাদের সমৃদ্ধ খিলান হাজার জাহাজ ডুবি হয়ে গেছে হোমারের হলুদ পাতায়। আরশির ভিতরে বসে সে রমণী ভ্রু-ভঙ্গিতে আলপনা আঁকে কর্পুর জলের মতো স্নিগ্ধ চোখে হেসে বা না হেসে নানান রঙ্গীন উলে বুনে যায় বন উপবন বেড়াবার উপত্যকা, জড়িয়ে ধরার যোগ্য কুসুমিত গাছ লোভী মাছরাঙা চায় যতটুকু জল আর মাছ যতটুকু জ্যোৎস্না পেলে মানুষ সন্তুষ্ট হয় স্নানে। স্নানের ঘাটে সে নিজে কিন্তু তারও স্নান চাই বলে অনেক সুইমিং পুল কাপেট বিছানো বেডরুমে অনেক সুগন্ধী ফ্ল্যাট পার্ক স্ট্রীটে জুহুর তল্লাটে ডানলোপিলোর ঢেউ ডাবলবেডের সুখী খাটে জোনাকী যেভাবে মেশে অন্ধকারে সর্বস্ব হারিয়ে প্রভাতে সন্ধ্যায় তারা সেইভাবে মিলেমিশে হাঁটে। বহু জল ঘাঁটাঘাঁটি স্নান বা সাঁতার দিতে দিতে মানুষেরা একদিন অনুভব করে আচম্বিতে যে ছিল সে চলে গেছে নিজের উজ্জল আরশিতে। প্রাকৃতিক বনগন্ধ, মেঘমালা, নক্ষত্রের থালা কিংবা এই ছ’রকম ঋতুর প্রভাবে এত নষ্ট হয়ে তবু মানুষ এখনও ভাবে সুনিশ্চিত তাকে কাছে পাবে কাল কিংবা অন্য কোন শতাব্দীর গোধুলি লগনে কলকাতায়, কানাডায় অথবা লন্ডনে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1227
4834
শামসুর রাহমান
দিব্যোন্মদ
প্রেমমূলক
মানি অর্ডার ফর্মে একটি প্রেমের কবিতার খসড়া। দু’তিনটি পঙ্‌ক্তির পর কিছু কাটাকুটি, তারপর কয়েকটি পঙূক্তি। শেষের দিকের বাক্যটি অসমাপ্ত। নিজের হস্তাক্ষর সে নিজেই বুঝতে ব্যর্থ। হঠাৎ এক সময় ওর মনে হয়, সে তো একজন নয়, নানা জন। এই মুহূর্তে প্রত্যেকে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে নিজেকে ওদের ভেতর থেকে বের করে এনে বসে চেয়ারে। কিসের আকর্ষণে বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে। সে জাঁহাবাজ দুপুরে নিজের উপস্থিতি টের পায় হলদে শস্য ক্ষেতের ধারে। শস্য ক্ষেতের ওপর এক ঝাঁক উড়ন্ত কালো কাক। তার ভেতর কবেকার এক চিত্রকর ভর করে যেন, তার হাত ক্ষুধার্ত হয়ে ওঠে রঙ আর তুলির জন্যে, ঝাঁ ঝাঁ করছে মাথা, এক ধরনের উন্মাদনা তাকে কী সহজে গ্রেপ্তার করে ফেলেছে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।বাজখাঁই সূর্যের তাপ স্তিমিত হলে সে ফিরে আসে নিজের ঘরে। ঘরে ঢুকতেই ওর চোখে পড়ে মানি অর্ডার ফর্মে লেখা প্রেমের কবিতার খসড়াটি টেবিল থেকে উঠে দেয়ালে সেঁটে গেছে সমুদ্র থেকে উঠে আসা ভেনাস হয়ে। ঘরময় নেচে বেড়াচ্ছে একটা কাটা কান আর মেঝেতে পড়ে থাকা একটা ব্যান্ডেজ গাঙচিল-রূপে উড়ে যায় দূরে। আয়নার দিকে তাকিয়ে সে প্রশ্ন করে, “আমি কি উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি?” প্রত্যুত্তরে ঘরের কিন্নরকণ্ঠ চারদেয়াল উচ্চারণ করে, তুমি দিব্যোন্মাদ।   (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dibyonmad/
3440
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রভাত
সনেট
নির্মল তরুণ উষা, শীতল সমীর, শিহরি শিহরি উঠে শান্ত নদীনীর। এখনো নামে নি জলে রাজহাঁসগুলি, এখনো ছাড়ে নি নৌকা সাদা পাল তুলি। এখনো গ্রামের বধূ আসে নাই ঘাটে, চাষি নাহি চলে পথে, গোরু নাই মাঠে। আমি শুধু একা বসি মুক্ত বাতায়নে তপ্ত ভাল পাতিয়াছি উদার গগনে। বাতাস সোহাগস্পর্শ বুলাইছে কেশে, প্রসন্ন কিরণখানি মুখে পড়ে এসে। পাখির আনন্দগান দশ দিক হতে দুলাইছে নীলাকাশ অমৃতের স্রোতে। ধন্য আমি হেরিতেছি আকাশের আলো, ধন্য আমি জগতেরে বাসিয়াছি ভালো।(চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/provat/
3796
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যে-মাসেতে আপিসেতে
ছড়া
যে-মাসেতে আপিসেতে হল তার নাম ছাঁটা স্ত্রীর শাড়ি নিজে পরে, স্ত্রী পরিল গামছাটা। বলে, “আমি বৈরাগী, ছেড়ে দেব শিগ্‌গির, ঘরে মোর যত আছে বিলাস-সামিগ্‌গির।’ ছিল তার টিনে-গড়া চা-খাওয়ার চাম্‌চাটা, কেউ তা কেনে না সেটা যত করে দাম-ছাঁটা।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/je-masete-apisete/
3793
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যে রত্ন সবার সেরা
চিন্তামূলক
যে রত্ন সবার সেরা তাহারে খুঁজিয়া ফেরা ব্যর্থ অন্বেষণ। কেহ নাহি জানে, কিসে ধরা দেয় আপনি সে এলে শুভক্ষণ।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/je-rotno-sobar-sera/
4922
শামসুর রাহমান
পাস্তারনাকের কাব্যগ্রন্থের নিচে
প্রেমমূলক
১ কোনও কোনও কবিতা দূরে দাঁড়িয়ে থাকে; রুখু লালচে চুল, নীল চোখ, গালে আপেলের রক্তিমাভা; ক্ষুৎ-পিপাসা, বুলেট এবং বোমা থেকে পালিয়ে বেড়ানো উদ্বাস্তু ইরাকী বালিকা। হাত নেড়ে ডাকি, রুটি, কোকাকোলা আর লজেন্সের প্রতিশ্রুতি দিই, তবু সে অনড়। যেন আমার চারপাশে অদৃশ্য কাঁটাতারের বেড়া, টপকিয়ে আসার আগ্রহ নেই ওর। আমাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে এক দৌড়ে বালিকা-কবিতা শূন্যতায়। মেঘ নেমে আসে বুকের ভেতর। ক’দিন পর রিকশায় যেতে যেতে ওর মতোই কাউকে দেখি আগুনের হল্কা- ছড়ানো চৈত্রের রাস্তায়, রিকশাচালককে থামতে বলে পেছনে ফিরে তাকাই; বাসস্ট্যান্ডে ব্যস্ত যাত্রীর ঠেলাঠেলি, ক’জন ভিখারী-সেই ভিড়ে তাকে খুঁজে পেলাম না। রোদে-পুড়ে-যাওয়া নির্বাক কাক খুঁজছে গাছ, হয়তো কোনও ডোবায় সেরে নেবে ত্বরিত স্নান। কোন্‌ মজা খালে বইবে আমার ভাবনার স্রোত? এমনও তো হতে পারে, কোনও রাতে পালিয়ে-বেড়ানো সেই কবিতা জ্যোৎস্নার ছোঁয়া লাগা আমার জানালায় বসে পা দোলাবে আর আমি ঘুমে কাদা, অথচ কত রাত আমার নিদ্রাহীনতায় মরুভূমির মতো ধু ধু। আবার কোনও দুপুরে আমার বিছানার পাশে এসে দাঁড়াবে, পেলব হাত রাখবে কপালে; তখন ঝাঁ ঝাঁ জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে আমার গা, চোখ খুলে কোনও কিছু দেখার শক্তি পর্যন্ত গায়েব। হায়, উদ্বাস্তু ইরাকী বালিকা ও তোমার কেমন ধরন? তুমি কি আমাকে নিয়ে যেতে চাও এই শ্যামলিমা থেকে ইরাকের পাথুরে জমিনে, যেখানে ব্যাণ্ডেজ-বাঁধা পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটবো, ক্ষুৎ- পিপাসায় কাতর? আর তুমি ‘কেমন মজা’ বলে ছুটবে আমার আগে আগে এক নির্দয় কৌতুক।২ আজ অব্দি, হ্যাঁ, এতদিন পরেও কিছুতেই তোমাকে বোঝানো গেল না আমার নিঃসীম ব্যাকুলতা। কতবার চোখে সেই ভাষা এনে তাকিয়েছি তোমার দিকে যা নিভৃততম উপলব্ধিকেও টেনে তোলে প্রত্যক্ষে, যেমন গহন ডুবুরি সমুদ্রগর্ভ থেকে বয়ে আনে মূল্যবান, গুপ্ত সামগ্রী। আমার আঙুলগুলো কি বাঙ্ময় হয়ে ওঠেনি কখনও? আমার ওষ্ঠে অনুরাগের ঢেউ আছড়ে পড়েনি বারবার, এ আমি স্বীকার করি কীভাবে? আমার দিনরাত্রি নিবেদিত তোমার উদ্দেশে, আমার সকল কাজে তোমারই ছায়া খেলা করে-এই সত্যের নগ্নতা তোমার দৃষ্টিতে দেখতে পাওয়ার আশাকে দাফন করেছি। কালেভদ্রে আমাদের দেখা, মাঝে-মাঝে টেলিফোনে দ্বিধাজড়িত, সংক্ষিপ্ত আলাপ। বাজে, এলোমেলো কথার ঝোপঝাড়ে কঞ্চির বাড়ি পড়ে, সবচেয়ে জরুরি কথাই উচ্চারণের পরপারে থেকে যায়। কী করে সেসব কথা পৌঁছে দেব তোমার কাছে। যদি বারান্দায় এসে দাঁড়াও অন্যমনস্কভাবে, তাকাও ভেসে-বেড়ানো মেঘের দিকে, দেখবে সেখানে লেখা আছে আমার সেই কথাগুচ্ছ, যা এতদিনেও বলা হয়নি তোমাকে; তুমি পড়ে নিও যদি ইচ্ছে হয়। যখন তুমি দরজা খুলে বেরুবে কোথাও বেড়ানোর জন্যে তখন লক্ষ করলে দেখতে পাবে, কাঠ কিংবা লোহা থেকে ঝুরঝুর ঝরছে আমার আকাঙ্ক্ষার অনূদিত ভাষা। কখনও তোমাকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না সময়ের পায়ে বেলাগাম বুনো ঘোড়ার ক্ষুর। আমাদের প্রেম একটি অসমাপ্ত কবিতার মতো, তুমি কি জান?৩ অন্ধকারে এ কার হাত ছুঁল আমাকে? হতেই পারে না, দুপুর রাতে তুমি এসে ঘুম ভাঙালে আমার। কে আমাকে একবার স্পর্শ করে চলে গেল? আমার শরীর ছাড়া কোনও আলোড়ন নেই ঘরের কোনওখানে। তোমার নিদ্রার উদ্যানে যাওয়া হবে না আমার; এই মুহূর্তে তোমার শয্যার পাশে গিয়ে বসব, তোমার চুল নিয়ে খেলব কিছুক্ষণ, নিদ্রিত স্তনকে জাগিয়ে তুলব চুমোয়, এমন সাধ্য আমার নেই। আমার হৃৎপিণ্ড এখন তোমার নামের ধ্বনি জড়িয়ে বেজে চলেছে দ্রুত, তুমি শুনতে পাবে না। তোমাদের রাস্তায় এখন হয়ত জিনস্‌ পরা কোনও মাতাল যুবক গালি ছুঁড়ছে ল্যাম্পপোস্ট তার পথ আগলে দাঁড়িয়েছে বলে। হয়ত গত রাতে ওর পিতার মৃত্যু হয়েচেহ প্রবল স্ট্রোকে; মাথায় একটা গোটা সংসার নিয়ে মাতলামো করা পলায়বৃত্তিকেই এক ধরনের আস্কারা। তোমার চুলের ঘ্রাণ, স্তনের গোলাপি চাউনি, আঙুলের চঞ্চল শোভা নিয়ে আজ মধ্যরাতে আমিও বড় মাতাল। আমার নিঝুম ছোট ঘর দুলছে, যেন বুড়িগঙ্গায় বজরা; লেখার টেবিল, বুক শেলফ, টেলিভিশন সেট জুড়ে দিয়েছে জিপসি- নাচ। বোদলেয়ারের অমোঘ বিধান মেনে নেয়া ছাড়া আর উপায় কী? আমার এই মাতলামো কারও কাছে শুদ্ধ শিল্প আখ্যা পাক, চাই না। তোমরা কেউ কবিকে খুঁজো না তার রঙিন মওতায়, মানুষটিকে তুলে নাও বুকে।৪ খট্রাশ সমাজের গালে জোরসে কয়েকটা চড় কষিয়ে দিলেই তো পার। তোমার কি কখনও ইচ্ছে করে না আমার হাত ধরে খোলা রাস্তায় হেঁটে যেতে ভ্রূক্ষেপহীন? রোজ তোমার ত্রিভুবন-ভোলানো চুম্বনের ঘ্রাণে বুঁদ হয়ে থাকি, এ-ও কি তোমার ইচ্ছার পরিপন্থী? তোমার বাক্যসমূহে ‘নায়ের আধিক্য আমাকে পীড়িত করে। হঠাৎ কোনওদিন আমি বৃষ্টিতে ভিজে এলে তুমি আঁচল দিয়ে মাথা মুছিয়ে দিতে দিতে আমার মাথাটা বুকে চেপে ধরবে, এরকম আশা নিশ্চয় আকাশছোঁয়া নয়। অনিয়মের চৌখুপি চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে আসার আগ্রহ আহত চিলের মতো মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে এক কোণে। নির্ভুল সামাজিকতা তোমার নখদর্পণে, আমি অবাক হয়ে দেখি। তুমি নির্ভর আমার স্বপ্নগুলো গ্রীষ্মের কুকুরের জিভের মতো লক লক করুক, এই কি তোমার প্রত্যাশা? তুমি কি চাও আমার শেষ পারানি কড়ি, ভালোবাসা, ভিক্ষুকের ভঙ্গিতে সর্বদা হাত পেতে থাক? তাহলে সাফ সাফ বলে দাও, আমি আমার প্রিয় বাসনাসমূহকে ফাঁসিতে লটকিয়ে কিংবা দাউ দাউ চিতায় তুলে দিয়ে দশদিক কাঁপিয়ে হো-হো হেসে উঠি। অনন্তর এপিটাফ লিখে তোমাকে শোনাতে আসব না।৫ অনেকক্ষণ ক্ষেতের আল-পথে হেঁটে আমি কি কখনও কোনও তরুণীকে শেষরাতে আলুঘাটায় নৌকায় তুলে দিয়েছিলাম? স্তব্ধতা-চেরা বৈঠার শব্দে চমকে উঠেছিলাম? জানি না কেন এই প্রশ্ন আজ হঠাৎ তোমাকে ভরদুপুরে রিকশায় তুলে দিতে গিয়ে মনের গহন স্তরে ঝিকিয়ে উঠল! তোমার শাড়ির আঁচল আটকে গিয়েছিল ত্রিচক্রযানের কোনও অংশে, আমি আলগোছে ছাড়িয়ে দেয়ার সময় লক্ষ করি, তোমার মুখাবয়বে লজ্জার ঈষৎ রঙধনু। তোমাকে নিয়ে রিকশা সদর রাস্তায়। ফিরে আসি ঘরে, পল এলুয়ারের কবিতায় মন বসে না। আমার হৃদয় জুড়ে সারা দুপুর তুমি, বিকেলে তুমি রাত্রিতেও তুমি। সন্‌জীদা খাতুনের ‘গীতাঞ্জলি’ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে টেলিভিশন বন্ধ করে দিই। কিন্তু মনের পর্দার আলো কী করে নিভিয়ে দেব, যেখানে তুমি বসে আছ, নিজস্ব পরিবেশের সম্রাজ্ঞী, চুল খোলা, ঈষৎ ভেজা ঠোঁটে প্রজাপতির মতো উড়ছে কবিতার পঙ্‌ক্তি? তোমার রিকশা চলেছে কালপুরুষের পাশ দিয়ে। তোমার মাথায় নক্ষত্রের মুকুট; তোমাকে শুভেচ্ছা জানায় স্বাতী এবং অরুন্ধতী।৬ ভৌতিক জ্যোৎস্নায় ঘণ্টাধ্বনি শুনি; আমার যাবার সময় হয়ে এল। মুগ্ধতাবোধ আছে, অথচ কোকিলের ডাক শুনি না বহুদিন। সুন্দরের মুখে জলবসন্তের দাগ। কিছু কিছু কাজ অর্ধসমাপ্ত, অনেক কিছুই অসমাপ্ত, তবু চলে যেতে হবে অনিবার্যভাবে, ঢেউয়ের আঘাতে আঘাতে যাবে একলা, ফাঁকা নৌকা; অনিশ্চয়তার মুখে ক্রূর হাসি। কবিতার খাতার অনেকগুলো পাতা শাদা, ডুকরে ডুকরে কাঁদবে নাকি? টেবিলে প্রুফের তাড়া পড়ে আছে সংশোধনের অপেক্ষায়। তোমার সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলা হয়ে ওঠনি। কী করছ তুমি এই রাতে ভৌতিক জ্যোৎস্নায়? গভীর রাতে সফল সঙ্গম শেষে তুমি কি তৃপ্তিকর ঘুমের মসলিনে আবৃতা। না কি বাথরুমে ঢোকার আগে বুক চিরে বেরুল দীর্ঘশ্বাস অতীতের চৌকাঠে ঠোকর খেয়ে? কামকলার সাময়িক অবসানে ভাবছ আধুনিক শিল্পকলার অগ্রযাত্রার কথা। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি; দেখছি নক্ষত্রের অস্পষ্ট উদ্যান; প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো ছায়াপ্রতিম ট্রেন, আবছা গার্ড বাজাচ্ছেন অস্পষ্টশ্রুত হুইসেল। অকস্মাৎ মনে পড়ে, পাস্তারনাকের কাব্যগ্রন্থের নিচে ইলেকট্রিক বিল সেই কবে থেকে চাপা পড়ে আছে।      (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/pastarnaker-kabyogronther-niche/
5400
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
চম্পা
প্রকৃতিমূলক
আমারে ফুটিতে হ’লো বসন্তের অন্তিম নিশ্বাসে, বিষণ্ণ যখন বিশ্ব নির্মম গ্রীষ্মের পদানত; রুদ্র তপস্যার বনে আধ ত্রাসে আধেক উল্লাসে, একাকী আসিতে হ’লো — সাহসিকা অপ্সরার মতো। বনানী শোষণ-ক্লিষ্ট মর্মরি’ উঠিল এক বার, বারেক বিমর্ষ কুঞ্জে শোনা গেল ক্লান্ত কুহু স্বর; জন্ম-যবনিকা-প্রান্তে মেলি’ নব নেত্র সুকুমার দেখিলাম জলস্থল, — শুন্য, শুষ্ক, বিহ্বল, জর্জর।তবু এনু বাহিরিয়া, — বিশ্বাসের বৃন্তে বেপমান, – চম্পা আমি, — খর তাপে আমি কভু ঝরিবো না মরি, উগ্র মদ্য-সম রৌদ্র — যার তেজে বিশ্ব মুহ্যমান, – বিধাতার আশির্বাদে আমি তা সহজে পান করি।ধীরে এনু বাহিরিয়া, ঊষার আতপ্ত কর ধরি'; মূর্ছে দেহ, মোহে মন, — মুহুর্মুহু করি অনুভব! সূর্যের বিভূতি তবু লাবণ্যে দিতেছ তনু ভরি'; দিনদেবে নমস্কার! আমি চম্পা! সূর্যের সৌরভ।
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/chompa/
4175
লালন শাহ
আমারে কি রাখবেন গুরু চরণদাসী
চিন্তামূলক
আমারে কি রাখবেন গুরু চরণদাসী? ইতরপনা কার্য আমার অহর্নিশি।। জঠর যন্ত্রণা পেয়ে এলাম যে করার দিয়ে রইলাম তা সব ভুলিয়ে ভবে আসি।। চিনলাম না সে গুরু কি ধন জানলাম না তার সেবা সাধন ঘুরতে বুঝি হল রে মন চোরাশি।। গুরু যার থাকে সদয় শমন বলে তার কিসের ভয় লালন বলে, মন তুই আমার করলি দুষি।।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4405.html
5396
সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত
কোনো ধর্মধ্বজের প্রতি
মানবতাবাদী
প্রেমের ধর্ম করছ প্রচার কে গো তুমি সবুট লাথি নিয়ে, ডায়ার-মার্কা শিষ্টাচারের লাল-পেয়ালার শেষ তলানি পিয়ে! কুষলে তো চলছে তোমার অর্ধঘন্টা ধর্মোপদেশ দেওয়া, টিফিন এবং টি-এর ফাঁকে? জমছে ভাল ঋষ্ট কথার খেয়া? মুখোস খোলা, মুখস্থ বোল বোলো না আর টিয়াপাখির মত, মোটা মাসহারার মোহে,- দোরেখা ঢং চালাবে আর কত? বয়স গত, ক্ষ্যাপার মত কামড় দিতে এলে নকল দাঁতে? বাঁধানো দাঁত উল্টে গিয়ে, আহা, শেষে লাগবে যে টাক রাতে! নিরীহ যে সত্যাগ্রহী -কি লাভ হল তারে লাথি মেরে? সে করেছে তোমায় ক্ষমা, তার চোখে আজ নাও দেখে খৃষ্টেরে। অক্রোধে ক্রোধ জিনতে হবে, -সে শিক্ষা কি রইল শিকেয় তোলা, ডিগ্রি নিয়ে ফুরিয়ে গেছে ডাগর-বুলির যা কিছু বোলাবোলা? উদর তন্ত্র উদরতা? ধর্ম কেবল কথারই কাপ্তেনী? ডঙ্কা-নাদের পিছন পিছন সত্য নিয়ে খেলছ ছেনিমেনি? চেয়ে দেখ ক্রুসের পরে ক্ষুদ্ধ কে ওই তোমার ব্যবহারে। জীবন্তবৎ পাষাণ-মুরৎ! -হেঁটমাথা তার লজ্জাতে ধিক্কারে। কুড়ি শ বতসরের ক্ষত লাল হয়ে তাঁর উঠছত্র নতুন করে। দেখছে জগৎ  -পাথর ফেটে ফোঁটায় ফোঁটায় পড়ছে শোণিত ঝরে। দাও ক্ষমা দাও, চোখ মেলে চাও,-- কি কান্ড হায় করছ গজাল ঠুকে? নিরীহদের নির্যাতনের সব ব্যথা কার বাজছে দ্যাখো বুকে! কিম্বা দ্যাখার নাই প্রয়োজন, তোমরা এখন সবাই বিজিগীষু, জিঙ্গো আসল ইষ্ট সবার, তার আবরণ-দেবতা মাত্র যীশু! ডায়ার-ডৌল জবরদস্তি, -তাতেই দেখি আজ তোমাদের রুচি। গোবর-দস্ত আইন গড়ে নিষ্ঠুরতায় নিচ্ছ করে শুচি। বীরত্বেরই বিজয়-মালা বর্বরতার দিচ্ছ গলায় তুলে। অমানুষের করছ পূজা, সেরা-মানুষ কৃষ্টদেবে ভুল। মরদ-মেয়ে ভুগছ সমান হূণ-বিজয়ের বড়াই-লালচ-রোগে, মানুষকে আর মানুষ বলেই চিনতে যেন চাইছ না, হায়, চোখে। ঢাকের পিছে ট্যামট্যামি-প্রায় টমির ধাঁচায় ট্যাঁশটোশও আজ ঘোরে। শয়তানই যে হাওয়ায় হাঁটায় শূন্যে ওঠায় সে হুঁশ গেছে সরে। নেইক খেয়াল, আত্মা বেচে জগত-জোড়া কিনছে জমিদারী। কে জানে ক'দিনের ঠিকা, ঠিকাদারের ঠ্যাকার কিন্তু ভারি! ধিঙ্গি চলে জঙ্গী চালে, কুচ, করে লাল কাগজ-ওলা চলে, নাক তুলে যায় দালাল-ফোড়ে, আজ দেখি হায় পাদরীও সেই দলে! যাও দলে যাও, ডঙ্কা বাজাও, অহঙ্কারের ছায়া ক্ষণস্থায়ী। মিছাই ব্রতের বিঘ্ন ঘটাও অহঙ্কারের হুমকি-ব্যবসায়ী! আমরা তোমার চাই না শিক্ষা, চাই না বিদ্যা, হে বিদ্যা-বিক্রয়ী! ধর্ম-কথাও পণ্য যাদের তাদের পণ্য কিনতে ব্যাগ্র নাহি। মানুষ খুঁজে ফিরছি মোরা, -মানুষ হবার রাস্তা যে বাতলাবে, তিক্ত হয়ে গেছে জীবন ঘরের পরের অমানুষের তাঁবে। ফলিয়ে দেবে মর্ত্যে যে জন বুদ্ধ-যীশুর স্বর্গ-সূচন বাণী, শহীদ-কুলের হৃদ্য-শৌর্য হৃদয়ে যার পেতেছে রাজধানী, জাতিভেদের টিটকারী যে পরকে শুধুই দেয় না নানান ছলে, জমিয়ে বুকে জিঙ্গোয়ানীর জবর জাতিভেদের হলাহলে, ষোল-আনা মানুষ হবার নিমন্ত্রণ দেবে যে সব জনে, সেই মানুষে খুঁজছি মোরা, অহনিশি খুঁজছি ব্যাকুল মনে, নিক্তি ধরে করলে তৌল ওহন সে যার ভজবে পুরাপুরি, লোভের মোহের মন্ত্রণাতে ভাবের ঘরে করবে না যে চুরি, পথ চেয়ে তার সই অনাচার দুঃখ অপার অন্তত লাঞ্চনা, বেশ জানি, আজ সয় যারা ক্লেশ তাদের তরেই স্বর্গীয় সান্তনা, নিরীহ যেই ধন্য যে সেই ধৃত-ব্রত দৈব-মাশাল-ধারী, নিঃস্ব যারা তারাই হবে বিপুল ভবে রাজ্যে-অধিকারী।
https://www.bangla-kobita.com/satyendranath/kono-dhormodhojjer-proti/
1711
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
হাতে ভীরু দীপ
প্রকৃতিমূলক
হাতে ভীরু দীপ, পথে উন্মাদ হাওয়া, ভ্রুকুটিকুটিল সহস্র ভয় মনে। কেন ভয়? কেন এমন সঙ্গোপনে পথে নেমে তোর বারে-বারে ফিরে চাওয়া? এ কী ভয় তোর সকল সত্তা কাঁপায়? আমি যে এসেছি, সে যেন জানতে না পায়। দূরে হেলঙের পাহাড়, পাহাড়তলি ছাড়িয়ে পিপলকোঠির চড়াই, আর তারপর সাঁকো। বাঁয়ে গেলে গঙ্গার ধারে সেই গ্রাম, অমৌঠি রঙ্কোলি। সেইখানে যাব। সামনের শীতে যদি পাওয়া যায় জমি ঢালু সিয়াসাঙে, তাই চলেছি। এ ছাড়া, জানেন গঙ্গামাঈ, কোনো আশা নেই। বরফের তাড়া খেয়ে নির্জন পাকদণ্ডির পথ বেয়ে নীচে নেমে যাই। কী ভয়ে আমাকে কাঁপায়– জানে মানাগাঁও, জানে পাহাড়িয়া নদী। আমি যে এসেছি, সে যেন জানতে না পায়।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1704
5124
শামসুর রাহমান
মূর্তি
চিন্তামূলক
না, আমি ভাস্কর নই, রোজ তাল তাল কাদামাটি নিয়ে মূর্তি গড়ি না, অথবা পাথরের স্তব্ধতায় পারি না জাগাতে কোনোক্রমে মৃত্যুঞ্জয় ধ্বনি, হায়, প্রতিমার। আমার আঙুলে নয় দীপ্র জাদুকাঠি, স্পর্শে যার দেয়াল চকিতে যাবে ছেয়ে কিছু খাঁটি অজর ফ্রেস্কোয় কিংবা জাগবে জোয়ার সাহারায়, অথবা উঠবে গড়ে মরুদ্যান; আমিতো ভূতল আস্তানায় একা ছন্দমিল খুঁজে খনি শ্রমিকের মতো খাটি।   (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/murti/
2479
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
গজলাঙ্গ - তিন অন্তরা
প্রেমমূলক
এখনো প্রানের কম্পন শুনি বুকের ভিতরে চলছে তুমি কেন থেমে - বিনষ্ট প্রেমে আবারো আগুন দিয়ে দেখে নাও, হৃদয় কতোটা জ্বলছে ।।আগুনের প্রতি ফুলকি এ-বুকে কাঁটায় ধন্য ফুল হয় নইলে যে আমি মরে গেছি বলে ভুল হয়। এখনো আতশ বাকি আছে আরো, পোড়া প্রেম তাই বলছে ।।এ-জীবন শুধু জ্বলবে বলে-ই প্রেমের জন্ম বুকটায় পুড়ছে সে তবু আরো পুড়ে পুড়ে সুখ চায়। সুখের নেশায় পেয়ালা ভরানো, বুঝি তাই মন টলছে ।।আতশের ডালি শেষ হলেও-তো জ্বালার তৃষ্ণা রইবেই শ্বাস ছেড়ে তাতে কালো ধোঁয়া ওড়া, সইবেই। শেষের সময় খুশী হয়ে দেখো, পোড়া এক মোম গলছে ।।
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/gazalanga-tin-antara/
1367
তসলিমা নাসরিন
রাতগুলো
প্রেমমূলক
একদিন অনেক রাতে ফোন করলে, ঘুম থেকে জেগে সে ফোন ধরতে ধরতে অনেকটা সময় চলে গেল ইস আরেকটু হলে তো রেখেই দিতে! সেই থেকে কোনও রাতেই এখন আর আমি ঘুমোই না, যদি ফোন করো! যদি কথা বলতে ইচ্ছে করো! অনেক অনেক কথা আমি মনে মনে মুখস্ত করে রাখি তোমাকে বলবো বলে, যদি কোনওদিন কথা শুনতে ইচ্ছে করো! দিনে তো ঘুমোইই না, দিনে তো হঠাৎ হঠাৎ ফোন করই তুমি, দিনে কিন্তু তোমাকে আমি বলি না আমি যে রাত জেগে থাকি! সব কথা তো আর তোমার জানার দরকার নেই, কিছু কথা আমি একা জানলেই তো হল! যদি আবার ফোন করো, ফোন বাজতে থাকে আর ধরতে ধরতেই রেখে দাও ওদিকে, যদিও একবারই করেছিলে, সেই রাতের পর আর করোনি, কিন্তু যদি করে ফেলো হঠাৎ কোনও রাতে! ঘুমোই না, জেগে থাকি ফোনটা হাতের কাছে নিয়ে। আমার কিন্তু খুব ইচ্ছে হয় তোমাকে ফোন করি, যে কথা আমার বলতে ইচ্ছে করে, বলি। কিন্তু ফোন করি না, বলি না, তুমি যদি আবার বলে বসো প্রেমে পড়ে আমার মাথাটা গেছে, ণত্ব ষত্ব জ্ঞান নেই! প্রেমেও পড়বো, মাথাও ঠিক থাকবে — এরকমটা ভালো জানো বলে মাথাটা যে সত্যি সত্যি আমার গেছে তার কিছুই তোমাকে বুঝতে দিই না। তার চেয়ে এই ভেবে ছাড়া ছাড়া সুখ পাও যে প্রেমে পড়েছি, আজকালকার চালাকচতুর রমণীরা যেরকম প্রেমে পড়ে। এই ভেবেই স্বস্তি পাও যে তুমি এখন আমাকে ছেড়ে গেলেও, আমার খুব একটা কিছু যাবে আসবে না।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1976
174
উৎপল কুমার বসু
উৎসর্গ
প্রেমমূলক
দয়িতা, তোমার প্রেম আমাদের সাক্ষ্য মানে নাকি? সূর্য-ডোবা শেষ হল কেননা সূর্যের যাত্রা বহুদূর। নক্ষত্র ফোটার আগে আমি একা মৃত্তিকার পরিত্যক্ত,বাকি আঙুর, ফলের ঘ্রাণ, গম, যব, তরল মধু-র রৌদ্রসমুজ্জল স্নান শেষ করি। এখন আকাশতলে সিন্ধুসমাজের ভাঙা উতরোল স্বর শোনা যায় গুঞ্জনের মতো- দয়িতা, তোমার প্রেম অন্ধকারে শুধু প্রবাসের আরেক সমাজযাত্রা। আমাদেরই বাহুবল বিচূর্ণ, আহত সেই সব সাক্ষ্যগুলি জেগে ওঠে। মনে হল প্রতিশ্রুত দিন হতে ক্রমাগত, ধীরে ধীরে, গোধুলিনির্ভর সূর্যের যাত্রার পথ। তবু কেন ষোলো অথবা সতের-এই খেতের উৎসব শেষে, ফল হাতে, শস্যের বাজারে আমাদের ডেকেছিলে সাক্ষ্য দিতে? তুমুল, সত্বর, পরস্পরাহীন সাক্ষ্য সমাপন হতে হতে ক্রমান্বয়ে বাড়ে।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%89%e0%a7%8e%e0%a6%b8%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%97-%e0%a6%89%e0%a7%8e%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a7%81/
859
জসীম উদ্‌দীন
ফুটবল খেলোয়াড়
ভক্তিমূলক
আমাদের মেসে ইমদাদ হক ফুটবল খেলোয়াড়, হাতে পায়ে মুখে শত আঘাতের ক্ষতে খ্যাতি লেখা তার। সন্ধ্যা বেলায় দেখিবে তাহারে পটি বাঁধি পায়ে হাতে, মালিশ মাখিছে প্রতি গিঠে গিঠে কাত হয়ে বিছানাতে। মেসের চাকর হয় লবেজান সেঁক দিতে ভাঙ্গা হাড়ে, সারা রাত শুধু ছটফট করে কেঁদে কেঁদে ডাক ছাড়ে। আমরা তো ভাবি ছমাসের তরে পঙ্গু সে হল হায়, ফুটবল-টিমে বল লয়ে কভু দেখিতে পাব না তায়। প্রভাত বেলায় খবর লইতে ছুটে যাই তার ঘরে, বিছানা তাহার শূন্য পড়িয়া ভাঙা খাটিয়ার পরে। টেবিলের পরে ছোট বড় যত মালিশের শিশিগুলি, উপহাস যেন করিতেছে মোরে ছিপি- পরা দাঁত তুলি। সন্ধ্যা বেলায় খেলার মাঠেতে চেয়ে দেখি বিস্ময়ে, মোদের মেসের ইমদাদ হক আগে ছোটে বল লয়ে! বাপ পায়ে বল ড্রিবলিং করে ডান পায়ে মারে ঠেলা, ভাঙা কয়খানা হাতে পায়ে তার বজ্র করিছে খেলা। চালাও চালাও আরও আগে যাও বাতাসের মত ধাও, মারো জোরে মারো- গোলের ভেতরে বলেরে ছুঁড়িয়া দাও। গোল-গোল-গোল, চারিদিক হতে ওঠে কোলাহলকল, জীবনের পণ, মরণের পণ, সব বাঁধা, পায়ে দল। গোল-গোল-গোল-মোদের মেসের ইমদাদ হক কাজি, ভাঙা দুটি পায়ে জয়ের ভাগ্য লুটিয়া আনিল আজি। দর্শকদল ফিরিয়া চলেছে মহা-কলবর করে, ইমদাদ হক খোড়াতে খোড়াতে আসে যে মেসের ঘরে। মেসের চাকর হয়রান হয় পায়েতে মালিশ মাখি, বে-ঘুম রাত্র কেটে যায় তার চীৎকার করি ডাকি। সকালে সকালে দৈনিক খুলি মহা-আনন্দে পড়ে, ইমদাদ হক কাল যা খেলেছে কমই তা নজরে পড়ে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/206
5639
সুকুমার রায়
ন্যাড়া
হাস্যরসাত্মক
রোদে রাঙা ইঁটের পাঁজা, তার উপরে বসল রাজা- ঠোঙাভরা বাদাম ভাজা খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না। গায়ে আঁটা গরম জামা, পুড়ে পিঠ হচ্ছে ঝামা; রাজা বলে, “বৃষ্টি নামা- নইলে কিচ্ছু মিলছে না”। থাকে সারা দুপুর ধ’রে, ব’সে ব’সে চুপটি করে, হাঁড়িপানা মুখটি ক’রে আঁকড়ে ধরে শ্লেটটুকু; ঘেমে ঘেমে উঠছে ভিজে, ভ্যাবাচ্যাকা একলা নিজে, হিজিবিজি লিখ্ছে কি যে বুঝ্ছে না কেউ একটুকু।ঝাঁঝা রোদ আকাশ জুড়ে, মাথাটার ঝাঝ্‌রা ফুঁড়ে, মগজেতে নাচ্ছে ঘুরে রক্তগুলো ঝ্ন্‌র ঝন: ঠাঠা-পড়া দুপুর দিনে, রাজা বলে “আর বাঁচিনে, ছুটে আন্ বরফ কিনে- ক’চ্ছে কেমন গা ছন্‌ছন্।” সবে বলে, “হায় কি হল! রাজা বুঝি ভেবেই মোলো। ওগো রাজা মুখ্টি খোল- কওনা ইহার কারণ কি? রাঙামুখ পান্‌সে যেন, তেলে ভাজা আম্‌সি হেন, রাজা এত ঘাম্‌ছে কেন- শুনতে মোদের বারণ কি”?রাজা বলে, “কেইবা শোনে যে কথাটা ঘুরছে মনে, মগজের নানান্ কোণে- আন্‌ছি টেনে বাইরে তায়; সে কথাটি বলছি শোন, যতই ভাব যতই গোন, নাহি তার জবাব কোন কুলকিনারা নাইরে হায়। লেখা আছে পুথিঁর পাতে, ‘নেড়া যায় বেলতলাতে’, নাহি কোনো সন্ধ তাতে – কিন্তু প্রশ্ন ক’বার যায়? এ কথাটা এদ্দিনেও পারে নিকো বুঝতে কেও, লেখে নিকো পুস্তকেও, দিচ্ছে না কেউ জবাব তায়।লাখোবার যায় যদি সে, যাওয়া তার ঠেকায় কিসে? ভেবে তাই পাইনে দিশে নাই কি কিচ্ছু উপায় তার?” এ কথাটা যেম্মি বলা, রোগা এক ভিস্তিওলা টিপ্ ক’রে বাড়িয়ে গলা প্রণাম করল দু’পায় তাঁর। হেসে বলে, “আজ্ঞে সে কি?, এতে আর গোল হবে কি? নেড়াকে তো নিত্যি দেখি আপন চোখে পরিষ্কার- আমাদেরি বেলতলা যে, নেড়া সেথা খেলতে আসে হরে দরে হয়তো মাসে নিদেন পক্ষে পঁচিশ বার”।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a7%9c%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a6%a4%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b8/
5787
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
তুমি জেনেছিলে
ভক্তিমূলক
তুমি জেনেছিলে মানুষে মানুষে হাত ছুঁয়ে বলে বন্ধু তুমি জেনেছিলে মানুষে মানুষে মুখোমুখি এসে দাঁড়ায় হাসি বিনিময় করে চলে যায় উত্তরে দক্ষিণে তুমি যেই এসে দাঁড়ালে- কেউ চিনলো না কেউ দেখলে না সবাই সবার অচেনা!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1837
5283
শামসুর রাহমান
সুফীরা বলেন
প্রেমমূলক
আমার কাটে না দিন, কাটে না যে রাত, প্রিয়তমা, তোমার বিহনে আর। আকাশের মেঘ, গাছের পাতায় রোদে, অন্ধকারে, পূর্ণিমায়, শ্রাবণ ধারায়, নির্দয় খরায়, ঝিলে, পাখির স্বপ্নিল চোখে, রুক্ষ পাথরে, ঝর্ণায় আর হরিণের চিত্রল শরীরে তোমাকেই খুঁজি নিশিদিন। বস্তুত তোমারই শুদ্ধ ধ্যানে রোজ বেলা ব’য়ে যায় আমাকে ক্ষতার্ত ক’রে। ব’সে থাকি অসহায়, একা।কখনো যখন কবিতার খাতা খুলে বসি অতি সঙ্গোপনে, তুমি অক্ষরের অনিন্দ্য প্রতিমা হ’য়ে দাঁড়াও পাতায়। তোমাকেই সারাক্ষণ দেখার আশায় থাকি এই বিরূপ শহরে পায়ে ফোস্কা নিয়ে, ধূসর মাথায় কাঁটার মুকুট প’রে। তবু যদি তুমি বোধাতীত অভিমানে, ক্ষোভে নিজে খুব দগ্ধ হয়ে আমাকে পোড়াও, তবে আমি অনিন্দ্রপীড়িত এই মাথা কার জানু কিংবা বুকে রেখে স্নিগ্ধ বাগানের ঘ্রাণ পাবো, বলো?প্রিয়তমা, হয়ো না বিমুখ, একবার এসে দেখে যাও আজ তোমার ইস্‌কের আতশের কুণ্ডলীতে আমার যা হাল, একেই তো সুফীরা বলেন জানি ফানা হ’য়ে যাওয়া।   (তুমিই নিঃশ্বাস তুমিই হৃৎস্পন্দন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sufira-bolen/
3853
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শরতের শুকতারা
প্রেমমূলক
একাদশী রজনী পোহায় ধীরে ধীরে — রাঙা মেঘ দাঁড়ায় উষারে ঘিরে ঘিরে । ক্ষীণ চাঁদ নভের আড়ালে যেতে চায় , মাঝখানে দাঁড়ায়ে কিনারা নাহি পায় । বড়ো ম্লান হয়েছে চাঁদের মুখখানি , আপনাতে আপনি মিশাবে অনুমানি । হেরো দেখো কে ওই এসেছে তার কাছে , শুকতারা চাঁদের মুখেতে চেয়ে আছে । মরি মরি কে তুমি একটুখানি প্রাণ , কী না জানি এনেছ করিতে ওরে দান । চেয়ে দেখো আকাশে আর তো কেহ নাই , তারা যত গিয়েছে যে যার নিজ ঠাঁই । সাথীহারা চন্দ্রমা হেরিছে চারি ধার , শূন্য আহা নিশির বাসর-ঘর তার! শরতের প্রভাতে বিমল মুখ নিয়ে তুমি শুধু রয়েছে শিয়রে দাঁড়াইয়ে । ও হয়তো দেখিতে পেলে না মুখ তোর! ও হয়তো তারার খেলার গান গায় , ও হয়তো বিরাগে উদাসী হতে চায়! ও কেবল নিশির হাসির অবশেষ! ও কেবল অতীত সুখের স্মৃতিলেশ! দ্রুতপদে তাহারা কোথায় চলে গেছে — সাথে যেতে পারে নি পিছনে পড় আছে! কত দিন উঠেছ নিশির শেষাশেষি , দেখিয়াছ চাঁদেতে তারাতে মেশামেশি! দুই দণ্ড চাহিয়া আবার চলে যেতে , মুখখানি লুকাতে উষার আঁচলেতে । পুরবের একান্তে একটু দিয়ে দেখা , কী ভাবিয়া তখনি ফিরিতে একা একা । আজ তুমি দেখেছ চাঁদের কেহ নাই , স্নেহময়ি , আপনি এসেছ তুমি তাই! দেহখানি মিলায় মিলায় বুঝি তার! হাসিটুকু রহে না রহে না বুঝি আর! দুই দণ্ড পরে তো রবে না কিছু হায়! কোথা তুমি , কোথায় চাঁদের ক্ষীণকায়! কোলাহল তুলিয়া গরবে আসে দিন , দুটি ছোটো প্রাণের লিখন হবে লীন । সুখশ্রমে মলিন চাঁদের একসনে নবপ্রেম মিলাবে কাহার রবে মনে!    (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/shoroter-shuktara/
1953
বন্দে আলী মিঞা
আমাদের গ্রাম
প্রকৃতিমূলক
আমাদের ছোটো গাঁয়ে ছোটো ছোটো ঘর থাকি সেথা সবে মিলে কেহ নাহি পর। পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই একসাথে খেলি আর পাঠশালে যাই। হিংসা ও মারামারি কভু নাহি করি, পিতা-মাতা গুরুজনে সদা মোরা ডরি। আমাদের ছোটো গ্রামে মায়ের সমান, আলো দিয়ে বায়ু দিয়ে বাঁচাইছে প্রাণ। মাঠভরা ধান আর জলভরা দিঘি, চাঁদের কিরণ লেগে করে ঝিকিমিকি। আমগাছ জামগাছ বাঁশ ঝাড় যেন, মিলে মিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন। সকালে সোনার রবি পূব দিকে ওঠে পাখি ডাকে, বায়ু বয়, নানা ফুল ফোটে।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4015.html
3729
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুক্তধারা
ভক্তিমূলক
উত্তরকূট পার্বত্য প্রদেশ। সেখানকার উত্তরভৈরব-মন্দিরে যাইবার পথ। দূরে আকাশে একটা অভ্রভেদী লৌহযন্ত্রের মাথাটা দেখা যাইতেছে এবং তাহার অপরদিকে ভৈরবমন্দিরচূড়ার ত্রিশূল। পথের পার্শ্বে আমবাগানে রাজা রণজিতের শিবির। আজ অমাবস্যায় ভৈরবের মন্দিরে আরতি, সেখানে রাজা পদব্রজে যাইবেন, পথে শিবিরে বিশ্রাম করিতেছেন। তাঁহার সভার যন্ত্ররাজ বিভূতি বহুবৎসরের চেষ্টায় লৌহযন্ত্রের বাঁধ তুলিয়া মুক্তধারা ঝরনাকে বাঁধিয়াছেন। এই অসামান্য কীর্তিকে পুরস্কৃত করিবার উপলক্ষ্যে উত্তরকূটের সমস্ত লোক ভৈরব-মন্দির-প্রাঙ্গণে উৎসব করিতে চলিয়াছে। ভৈরব-মন্ত্রে দীক্ষিত সন্ন্যাসিদল সমস্তদিন স্তবগান করিয়া বেড়াইতেছে। তাহাদের কাহারও হাতে ধূপাধারে ধূপ জ্বলিতেছে, কাহারও হাতে শঙ্খ, কাহারও ঘন্টা। গানের মাঝে মাঝে তালে তালে ঘন্টা বাজিতেছে।গানজয় ভৈরব, জয় শংকর, জয় জয় জয় প্রলয়ংকর, শংকর শংকর। জয় সংশয়ভেদন, জয় বন্ধন-ছেদন, জয় সংকট-সংহর শংকর শংকর।[সন্ন্যাসিদল গাহিতে গাহিতে প্রস্থান করিল ]পূজার নৈবেদ্য লইয়া একজন বিদেশী পথিকের প্রবেশ উত্তরকূটের নাগরিককে সে প্রশ্ন করিলপরবর্তী অংশ পড়ুন উত্তরকূট পার্বত্য প্রদেশ। সেখানকার উত্তরভৈরব-মন্দিরে যাইবার পথ। দূরে আকাশে একটা অভ্রভেদী লৌহযন্ত্রের মাথাটা দেখা যাইতেছে এবং তাহার অপরদিকে ভৈরবমন্দিরচূড়ার ত্রিশূল। পথের পার্শ্বে আমবাগানে রাজা রণজিতের শিবির। আজ অমাবস্যায় ভৈরবের মন্দিরে আরতি, সেখানে রাজা পদব্রজে যাইবেন, পথে শিবিরে বিশ্রাম করিতেছেন। তাঁহার সভার যন্ত্ররাজ বিভূতি বহুবৎসরের চেষ্টায় লৌহযন্ত্রের বাঁধ তুলিয়া মুক্তধারা ঝরনাকে বাঁধিয়াছেন। এই অসামান্য কীর্তিকে পুরস্কৃত করিবার উপলক্ষ্যে উত্তরকূটের সমস্ত লোক ভৈরব-মন্দির-প্রাঙ্গণে উৎসব করিতে চলিয়াছে। ভৈরব-মন্ত্রে দীক্ষিত সন্ন্যাসিদল সমস্তদিন স্তবগান করিয়া বেড়াইতেছে। তাহাদের কাহারও হাতে ধূপাধারে ধূপ জ্বলিতেছে, কাহারও হাতে শঙ্খ, কাহারও ঘন্টা। গানের মাঝে মাঝে তালে তালে ঘন্টা বাজিতেছে।গানজয় ভৈরব, জয় শংকর, জয় জয় জয় প্রলয়ংকর, শংকর শংকর। জয় সংশয়ভেদন, জয় বন্ধন-ছেদন, জয় সংকট-সংহর শংকর শংকর।[সন্ন্যাসিদল গাহিতে গাহিতে প্রস্থান করিল ]পূজার নৈবেদ্য লইয়া একজন বিদেশী পথিকের প্রবেশ উত্তরকূটের নাগরিককে সে প্রশ্ন করিলপরবর্তী অংশ পড়ুন
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be-%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a7%80%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%a5/
3429
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রত্যাশা
সনেট
সকলে আমার কাছে যত কিছু চায় সকলেরে আমি তাহা পেরেছি কি দিতে ! আমি কি দিই নি ফাঁকি কত জনে হায় , রেখেছি কত – না ঋণ এই পৃথিবীতে । আমি তবে কেন বকি সহস্র প্রলাপ , সকলের কাছে চাই ভিক্ষা কুড়াইতে ! এক তিল না পাইলে দিই অভিশাপ , অমনি কেন রে বসি কাতরে কাঁদিতে ! হা ঈশ্বর , আমি কিছু চাহি নাকো আর , ঘুচাও আমার এই ভিক্ষার বাসনা । মাথায় বহিয়া লয়ে চির ঋণভার ‘ পাইনি’ ‘পাইনি’ বলে আর কাঁদিব না । তোমারেও মাগিব না , অলস কাঁদনি — আপনারে দিলে তুমি আসিবে আপনি ।   (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prottyasha/
2037
মলয় রায়চৌধুরী
ঘুণপোকার সিংহাসন
রূপক
ওগো স্তন্যপায়ী ভাষা পিপীলিকাভূক মুখচোরা ভূচর খেচর জলচর দাম্পত্যজীবনে তুষ্ট একশিঙা নীলগাই বারাশিঙা চোরাকিশোরীর হাতে মূল্যবান প্রাণী স্হলে বিচরণকারী উদবিড়াল গন্ধগোকোল বিনোদিনী শব্দগহ্বর খেয়ে নোকরশাহির রাজ্য এনেছো এদেশে। ২ ভাদ্র ১৩৯২
https://banglarkobita.com/poem/famous/1145