id
stringlengths 1
4
| poet
stringclasses 120
values | title
stringlengths 1
54
| class
stringclasses 21
values | text
stringlengths 13
18.7k
| source_url
stringlengths 40
246
|
|---|---|---|---|---|---|
3008
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
গিরিবক্ষ হতে আজি
|
প্রকৃতিমূলক
|
গিরিবক্ষ হতে আজি
ঘুচুক কুজ্ঝটি-আবরণ,
নূতন প্রভাতসূর্য
এনে দিক্ নবজাগরণ।
মৌন তার ভেঙে যাক,
জ্যোতির্ময় ঊর্ধ্ব লোক হতে
বাণীর নির্ঝরধারা
প্রবাহিত হোক শতস্রোতে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/giribokkho-hote-aji/
|
1910
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
স্বপ্নগুলি হ্যাঙ্গারে রয়েছে
|
চিন্তামূলক
|
মুহূর্তের সার্থকতা মানুষের কাছে আজ
বড় বেশি প্রিয়।
জীবনের স্থাপত্যের উচ্চতা ও অভিপ্রায়মালা
ছেঁটে ছোট করে দিতে
চতুর্দিকে উগ্র হয়ে রয়েছে সেলুন।
মানুষের ভাঙা-চোরা ভুরুর উপরে
চাঁদের ফালির মতো
আজ কোনো স্থির আলো নেই।
ছাতার দোকানে ছাতা যে-রকম ঝোলে
সেইভাবে মানুষের রক্ত ও চন্দনমাখা স্বপ্নগুলি
হ্যাঙ্গারে রয়েছে।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1290
|
4241
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
যদি
|
প্রেমমূলক
|
যদি পারো দুঃখ দাও, আমি দুঃখ পেতে ভালোবাসি
দাও দুঃখ, দুঃখ দাও – আমি দুঃখ পেতে ভালোবাসি।
তুমি সুখ নিয়ে থাকো, সুখে থাকো, দরজা হাট-খোলা।আকাশের নিচে, ঘরে , শিমূলের সোহাগে স্তম্ভিত
আমি পদপ্রান্ত থেকে সেই স্তম্ভ নিরীক্ষণ করি।
যেভাবে বৃক্ষের নিচে দাঁড়ায় পথিক, সেইভাবেএকা একা দেখি ঐ সুন্দরের সংশ্লিষ্ট পতাকা।ভালো হোক মন্দ হোক যায় মেঘ আকাশে ছড়িয়ে
আমাকে জড়িয়ে ধরে হাওয়া তার বন্ধনে বাহুর।
বুকে রাখে, মুখে রাখে – ‘না রাখিও সুখে প্রিয়সখি!
যদি পারো দুঃখ দাও আমি দুঃখ পেতে ভালোবাসি
দাও দুঃখ, দুঃখ দাও – আমি দুঃখ পেতে ভালোবাসি।
ভালোবাসি ফুলে কাঁটা, ভালোবাসি, ভুলে মনস্তাপ –
ভালোবাসি শুধু কূলে বসে থাকা পাথরের মতো
নদীতে অনেক জল, ভালোবাসা, নম্রনীল জল –
ভয় করে।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%af%e0%a6%a6%e0%a6%bf-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8b-%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%83%e0%a6%96-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%93-%e0%a6%b6%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf-%e0%a6%9a%e0%a6%9f/#respond
|
3990
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
স্তুতি নিন্দা
|
নীতিমূলক
|
স্তুতি নিন্দা বলে আসি, গুণ মহাশয়,
আমরা কে মিত্র তব? গুণ শুনি কয়,
দুজনেই মিত্র তোরা শত্রু দুজনেই—
তাই ভাবি শত্রু মিত্র কারে কাজ নেই। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/stuti-ninda/
|
4038
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
হিন্দুস্থান
|
স্বদেশমূলক
|
মোরে হিন্দুস্থান
বারবার করেছে আহ্বান
কোন্ শিশুকাল হতে পশ্চিমদিগন্ত-পানে
ভারতের ভাগ্য যেথা নৃত্যলীলা করেছে শ্মশানে,
কালে কালে
তাণ্ডবের তালে তালে,
দিল্লিতে আগ্রাতে
মঞ্জীরঝংকার আর দূর শকুনির ধ্বনি-সাথে;
কালের মন্থনদণ্ডঘাতে
উচ্ছলি উঠেছে যেথা পাথরের ফেনস্তূপে
অদৃষ্টের অট্টহাস্য অভ্রভেদী প্রাসাদের রূপে।
লক্ষ্মী-অলক্ষ্মীর দুই বিপরীত পথে
রথে প্রতিরথে
ধূলিতে ধূলিতে যেথা পাকে পাকে করেছে রচনা
জটিল রেখার জালে শুভ-অশুভের আল্পনা।
নব নব ধ্বজা হাতে নব নব সৈনিকবাহিনী
এক কাহিনীর সূত্র ছিন্ন করি আরেক কাহিনী
বারংবার গ্রন্থি দিয়ে করেছে যোজন।
প্রাঙ্গণপ্রাচীর যার অকস্মাৎ করেছে লঙ্ঘন
দস্যুদল,
অর্ধরাত্রে দ্বার ভেঙে জাগিয়েছে আর্ত কোলাহল,
করেছে আসন-কাড়াকাড়ি,
ক্ষুধিতের অন্নথালি নিয়েছে উজাড়ি।
রাত্রিরে ভুলিল তারা ঐশ্বর্যের মশাল-আলোয়--
পীড়িত পীড়নকারী দোঁহে মিলি সাদায় কালোয়
যেখানে রচিয়াছিল দ্যূতখেলাঘর,
অবশেষে সেথা আজ একমাত্র বিরাট কবর
প্রান্ত হতে প্রান্তে প্রসারিত;
সেথা জয়ী আর পরাজিত
একত্রে করেছে অবসান
বহু শতাব্দীর যত মান অসম্মান।
ভগ্নজানু প্রতাপের ছায়া সেথা শীর্ণ যমুনায়
প্রেতের আহ্বান বহি চলে যায়,
বলে যায়--
আরো ছায়া ঘনাইছে অস্তদিগন্তের
জীর্ণ যুগান্তের।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/hiduthan/
|
4281
|
শহীদ কাদরী
|
তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা
|
প্রেমমূলক
|
ভয় নেই
আমি এমন
ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী
গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে
মার্চপাস্ট করে চলে যাবে
এবং স্যালুট করবে
কেবল তোমাকে প্রিয়তমা।
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
বন-বাদাড় ডিঙ্গিয়ে
কাঁটা-তার, ব্যারিকেড পার হয়ে, অনেক
রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে
আর্মার্ড-কারগুলো এসে দাঁড়াবে
ভায়োলিন বোঝাই করে
কেবল তোমার দোরগোড়ায় প্রিয়তমা।
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো-
বি-৫২ আর মিগ-২১গুলো
মাথার ওপর গোঁ-গোঁ করবে
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
চকোলেট, টফি আর লজেন্সগুলো
প্যারাট্রুপারদের মতো ঝরে পড়বে
কেবল তোমার উঠোনে প্রিয়তমা।
ভয় নেই…আমি এমন ব্যবস্থা করবো
একজন কবি কমান্ড করবেন বঙ্গোপসাগরের
সবগুলো রণতরী
এবং আসন্ন নির্বাচনে সমরমন্ত্রীর
সঙ্গে প্রতিযোগিতায়
সবগুলো গণভোট পাবেন একজন প্রেমিক,
প্রিয়তমা!
সংঘর্ষের সব সম্ভাবনা, ঠিক জেনো, শেষ
হবে যাবে-
আমি এমন ব্যবস্থা করবো, একজন গায়ক
অনায়াসে বিরোধীদলের অধিনায়ক
হয়ে যাবেন
সীমান্তের ট্রেঞ্চগুলোয়
পাহারা দেবে সারাটা বৎসর
লাল নীল সোনালি মাছি-
ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু
নিষিদ্ধ হয়ে যাবে, প্রিয়তমা।
ভয় নেই আমি এমন
ব্যবস্থা করবো মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে বেড়ে যাবে
শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা প্রতিদিন
আমি এমন ব্যবস্থা করবো গণরোষের বদলে
গণচুম্বনের ভয়ে
হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাবে ছুরি,
প্রিয়তমা।
ভয় নেই,
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
শীতের পার্কের ওপর বসন্তের সংগোপন
আক্রমণের মতো
অ্যাকর্ডিয়ান বাজাতে-
বাজাতে বিপ্লবীরা দাঁড়াবে শহরে,
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
স্টেটব্যাংকে গিয়ে
গোলাপ
কিম্বা চন্দ্রমল্লিকা ভাঙালে অন্তত চার
লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে
একটি বেলফুল দিলে চারটি কার্ডিগান।
ভয় নেই, ভয় নেই
ভয় নেই,
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
নৌ, বিমান আর পদাতিক বাহিনী
কেবল তোমাকেই চতুর্দিক থেকে ঘিরে-
ঘিরে
নিশিদিন অভিবাদন করবে, প্রিয়তমা।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/4158.html
|
3650
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ভজনমন্দিরে তব
|
মানবতাবাদী
|
ভজনমন্দিরে তব
পূজা যেন নাহি রয় থেমে,
মানুষে কোরো না অপমান।
যে-ঈশ্বরে ভক্তি কর,
হে সাধক, মানুষের প্রেমে
তাঁরি প্রেম করো সপ্রমাণ। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/vojonmondire-tob/
|
4616
|
শামসুর রাহমান
|
কেন মানুষের মুখ
|
চিন্তামূলক
|
কেন মানুষের মুখ বারবার ম্লান হয়ে যাবে?
কেন আমাদের হাতে পায়রা পাথর হয়ে যাবে?
মুখের ভেতরে কেন অমাবস্যা ঊর্ণাজাল বুনে
যাবে ক্রমাগত? যোদ্ধবেশে শত শত
কংকাল সওয়ার হয়ে আসে
কেন রাতে ভৌতিক ঘোড়ায়?
কেন আমাদের
এত মৃত্যু দেখে যেতে হবে অসহায় ভঙ্গিমায়?অবেলায় একটি বিপুল উল্টে-যাওয়া দোয়াতের কালির ধরনে
রক্তধারা বয়ে যায়। রক্তভেজা চুলে শব্দহীন
গোঙানি; চোয়ালে, মেরুদণ্ডে, দুটি চোখে,
হাড়ের ভেতরে স্মশানের ধোঁয়াবিষ্ট
হাওয়ার মতোই কিছু বয়ে যায়, বয়ে যেতে থাকে।যে-হাত মুছিয়ে দিতো তার চির দুঃখিনী মায়ের
চোখ থেকে জলধারা, সেই হাত কেমন নিঃসাড়, শূন্য আজ।
যে-চোখ দেখতো প্রেমিকার মুখরেখা কনে-দেখা
আলোয় অথবা সূর্যোদয়ে,
সেই চোখ ডিমের ছড়ানো
কুসুমের মতো হয়ে গেছে,
যে-ঠোঁট স্ফুরিত হতো কবিতার পঙ্ক্তির চুম্বনে,
সে-ঠোঁটে ঘুমায় আজ স্তব্ধতার ভাস্কর্য নিধর।
একলা যে-কানে
বোনের সোনালি
চুড়ির শব্দের মতো আনন্দের ধ্বনি
হতো গুঞ্জরিত আজ সে-কানে স্থবির অন্ধকার
কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। কফিনের আলোড়নে
পাখিদের সংগীত পেরেক বিদ্ধ হয়।মারা গেল, কখনো তাদের কেউ দোর খুলবে না
বাজালে কলিং বেল। বন্ধু এলে ঘরে
হাত ধ’রে নিয়ে বসাবে না কিংবা নিজে
বসবে না চেয়ারে হেলান দিয়ে, বুলোবে না চোখ
টেবিলে-উল্টিয়ে-রাখা আধপড়া বইয়ের পাতায়,
অথবা ব্যথিত, ক্ষয়া চাঁদের নিকট
চাইবে না শৈশবের শিউলি-সকাল
আবার পাবার বর! সিঁড়ি ভেঙে ওঠার সময় ভাববে না
কাকে তার বড় প্রয়োজন ছিল। ‘কাল যাবো ঠিক
আমার গ্রামের বাড়ি, ট্রেন থেকে নামবো স্টেশনে
ঝুলিয়ে গেরুয়া ব্যাগ কাঁধে, দেবো সুখে
চুমুক চায়ের ঠুঁটো পেয়ালায় হাশমত আলির দোকানে’-
এই শব্দাবলি
জমাট রক্তের মতো লেগে থাকে শূন্যতার গালে।
যারা গেল, তাদের এখনোআঁকড়ে রাখতে চায় এ দেশের শেকড়-বাকড়,
আঁকড়ে রাখতে চায় লতাগুল্ম আর
গহীন নদীর বাঁক, আঁকড়ে রাখতে চায় শারদ রোদ্দুরে
ডানা মেলে-দেয়া কবুতরের ঝলক,
আঁকড়ে রাখতে চায় নিঝুম তুলসীতলা, জোনাকির ঝাঁক।এদেশের পতিটি গোলাপ আজ ভীষণ মলিন,
প্রতিটি সবুজ গাছ যেন অর্ধ-নমিত পতাকা,
আমাদের বর্ণমালা হয়ে গেছে শোকের অক্ষর,
আমার প্রতিটি শব্দ কবরের ঘাসের ভেতরে
হাওয়ার শীতল দীর্ঘশ্বাস;
আমার প্রতিটি চিত্রকল্প নিষ্প্রদীপ ঘর আর
আমার উপমাগুলি মৃতের মুঠোর শূন্যতায় ভরপুর,
আমার কবিতা আজ তুমুল বৃষ্টিতে অন্ধ পাখির বিলাপ। (অবিরল জলভ্রমি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/keno-manusher-mukh/
|
3289
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
নয়ন
|
ভক্তিমূলক
|
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে
রয়েছ নয়নে নয়নে,
হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে
হৃদয়ে রয়েছ গোপনে।বাসনা বসে মন অবিরত,
ধায় দশ দিশে পাগলের মতো।
স্থির আঁখি তুমি ক্ষরণে শতত
জাগিছ শয়নে স্বপনে।সবাই ছেড়েছে নাই যার কেহ
তুমি আছ তার আছে তব কেহ
নিরাশ্রয় জন পথ যার যেও
সেও আছে তব ভবনে।তুমি ছাড়া কেহ সাথি নাই আর
সমুখে অনন্ত জীবন বিস্তার,
কাল পারাপার করিতেছ পার
কেহ নাহি জানে কেমনে।জানি শুধু তুমি আছ তাই আছি
তুমি প্রাণময় তাই আমি বাঁচি,
যতো পাই তোমায় আরো ততো যাচি
যতো জানি ততো জানি নে।জানি আমি তোমায় পাবো নিরন্তন
লোক লোকান্তরে যুগ যুগান্তর
তুমি আর আমি, মাঝে কেহ নাই
কোনো বাঁধা নাই ভুবনে।নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে
রয়েছ নয়নে নয়নে।নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে
রয়েছ নয়নে নয়নে,
হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে
হৃদয়ে রয়েছ গোপনে।বাসনা বসে মন অবিরত,
ধায় দশ দিশে পাগলের মতো।
স্থির আঁখি তুমি ক্ষরণে শতত
জাগিছ শয়নে স্বপনে।সবাই ছেড়েছে নাই যার কেহ
তুমি আছ তার আছে তব কেহ
নিরাশ্রয় জন পথ যার যেও
সেও আছে তব ভবনে।তুমি ছাড়া কেহ সাথি নাই আর
সমুখে অনন্ত জীবন বিস্তার,
কাল পারাপার করিতেছ পার
কেহ নাহি জানে কেমনে।জানি শুধু তুমি আছ তাই আছি
তুমি প্রাণময় তাই আমি বাঁচি,
যতো পাই তোমায় আরো ততো যাচি
যতো জানি ততো জানি নে।জানি আমি তোমায় পাবো নিরন্তন
লোক লোকান্তরে যুগ যুগান্তর
তুমি আর আমি, মাঝে কেহ নাই
কোনো বাঁধা নাই ভুবনে।নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে
রয়েছ নয়নে নয়নে।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%a8%e0%a7%9f%e0%a6%a8-%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a7%9f-%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%96%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%87/
|
1785
|
পূর্ণেন্দু পত্রী
|
একমুঠো জোনাকী
|
রূপক
|
একমুঠো জোনাকীর আলো নিয়ে
ফাঁকা মাঠে ম্যাজিক দেখাচ্ছে অন্ধকার।
একমুঠো জোনাকীর আলো পেয়ে
এক একটা যুবক হয়ে যাচ্ছে জলটুঙি পাহাড়
যুবতীরা সুবর্ণরেখা।
সাপুড়ের ঝাঁপি খুলতেই বেরিয়ে পড়ল একমুঠো জোনাকী
পুজো সংখ্যা খুলতেই বেরিয়ে পড়ল একমুঠো জোনাকী।
একমুঠো জোনাকীর আলো নিয়ে
ফাঁকা মাঠে ম্যাজিক দেখাচ্ছে অন্ধকার।
ময়দানের মঞ্চে একমুঠো জোনাকী উড়িয়ে
জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল যেন কারা।
রবীন্দ্রসদনে তিরিশজন কবি তিরিশদিন ধরে আউড়ে গেল
একমুঠো জোনাকীর সঙ্গে তাদের ভাব-ভালোবাসা।
ইউনেসকোর গোল টেবিল ঘিরে বসে গেছে মহামান্যদের সভা
একমুঠো জোনাকীর আলোয়
আফ্রিকা থেকে আসমুদ্র হিমাচল সমস্ত হোগলা বন আর ফাটা দেয়ালে
সাজিয়ে দেবে কোনারক কিংবা এথেন্সের ভাস্কর্য।
সাত শতাব্দীর অন্ধকার এইভাবে
ফাঁকা মাঠে ম্যাজি দেখিয়ে চলেছে একমুঠো জোনাকীর আলোয়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1297
|
1238
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সূর্য নক্ষত্র নারী (3)-বেলা অবেলা কালবেলা -
|
প্রেমমূলক
|
তুমি আছো জেনে আমি অন্ধকার ভালো ভেবে যে-অতীত আর
যেই শীত ক্লান্তিহীন কাটায়েছিলাম;
তাই শুধু কাটায়েছি।
কাটায়ে জানেছি এই-ই শূন্যে, তবু হৃদয়ের কাছে ছিল অন্য-কোন নাম।
অন্তহীন অপেক্ষার চেয়ে তবে ভালো
দ্বীপাতীত লক্ষ্যে অবিরাম চ’লে যাওয়া
|
https://banglapoems.wordpress.com/2012/10/11/%e0%a6%b8%e0%a7%82%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%a8%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%80-3-%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%85/
|
5046
|
শামসুর রাহমান
|
বেলাশেষে কখনও হয় কি সাধ
|
চিন্তামূলক
|
আমি কি এভাবে বারবার
নিজের সঙ্গেই অভিনয় করে যাব?
এই যে এখন কালো পাখিটা আমার
মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল, ওর
উড়াল আমার সর্বনাশ ডেকে আনবে কি আজ?দেখছি আমার হাত কেমন অসাড় হয়ে যাচ্ছে,
খাতার পাতায় লেখা নয়া শব্দগুলো
কোন্ দুঃস্বপ্নের স্পর্শে কুষ্ঠরোগীর ক্ষতের মতো
হয়ে গেল? উড়ন্ত পাখির
চাঞ্চল্য কোথায় থেমে গেল?তাহ’লে আমি কি ক্রমান্বয়ে জবুথবু
মাংসপিণ্ড হয়ে এককোণে
প্রত্যহ থাকব প’ড়ে? যদি তাই হয়,
তা’হলে আমার বেঁচে থেকে
কী লাভ? কেবল জড়পিণ্ড হয়ে শুধু
ডান বাঁয়ে কিংবা সম্মুখে তাকিয়ে
দিনরাত কাটানো মাসের পর মাস,
বছরের পর ফের বছর কাটানো
নরক বাসের চেয়ে বেশি ছাড়া কিছু কম নয়।
কখনও চকিতে ভোরবেলা আমার ঘরের ঠিক
কাঁধ ঘেঁষে একটি সবুজ পাখি সৌন্দর্য বিলিয়ে
বসে থাকে। কিছুক্ষণ এদিক সেদিক
উৎসুক দৃষ্টির আভা ছড়িয়ে হঠাৎ পাখা মেলে
উড়ে চলে যায় দূরে অজানা কোথায়।বেলাশেষে জ্যোৎস্নাময় রাতে ওর কখনও হয় কি
সাধ উড়ে যেতে নক্ষত্রের
প্রোজ্জ্বল মেলায়? হয় না কি সাধ তার
চাঁদে গিয়ে বসতে কখনও? হয় না কি
সাধ তার ফোটাতে সুরের পুষ্পরাজি মায়ালোকে? (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/belasheshe-kokhono-hoy-ki-sadh/
|
5031
|
শামসুর রাহমান
|
বিপর্যস্ত গোলাপ বাগান
|
মানবতাবাদী
|
গোলাপ আমাকে দিয়েছে গোলাপ
বৃষ্টিসিক্ত তামস রাত্রিশেষে।
অথচ বিশ্ব বিষকালো আজ
হিংস্র ছোবলে, ভীষণ ব্যাপক দ্বেয়ে।কাল রাত্তিরে যার পদরেখা
পড়েছে আমার নিঝুম স্বপ্নপথে,
সেকি সক্ষম প্রলেপ বুলোতে
স্মৃতি সংকুল আমার পুরোনো ক্ষতে?কাজের গুহায় আমি ইদানীং
শুনি মাঝে মাঝে টেলিফোনে যার গলা,
মধ্য বয়সে ম্লান গোধূলিতে
তাকে প্রিয়তমা কখনো যাবে কি বলা?স্বরচুম্বনে শিহরণ জাগে
অভিজ্ঞ হাড়ে, শিরায় জোনাকি জ্বলে।
সভ্যতা দ্রুত ক্ষয়িষ্ণু হয়,
মানবতা ক্রমে চলেছে অস্তাচলে।গণবিভ্রমে ভ্রষ্ট জনতা
নতজানু কত মেকী দেবতার কাছে।
ঘোর মরীচিকা, কাঁপে দশদিক
নাৎসী প্রেতের বিকট ঘূর্ণি নাচে।ধর্মপসারী বুড়ো শকুনের
পাখসাটে আজ ইরান মধ্যভূমি।
ডাগর বর্ষা ডাকে নিরালায়-
স্মৃতির প্রতিমা, এখন কোথায় তুমি?বিপর্যস্ত গোলাপ বাগান,
পোড়-খাওয়া ডালে বুলবুল !
ভুল লক্ষ্যের দিকে সংকেত
দেখায় দিশারী, ডেকে আনে পিছুটান।তেহরানে নামে দুপুরে সন্ধ্যা,
যখন তখন ঘাতকের গুলি ছোটে;
হাফিজের আর সাদীর গোলাপ
কবি সুলতানপুরের হৃদয়ে ফোটে।এবং নাজিম হিকমত পচে
কারাকুঠুরিত পুনরায় দিনরাত
ফুচিক ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়ায়
তোলে গৌরবে মূষ্ঠিবদ্ধ হাত।নেরুদা আবার শিউরে ওঠেন,
এখনই পঙ্গু ঈগল সাম্যবাদ?
মাদ্রিদ আর চরাচর জুড়ে
লোরকা করেন কৃষ্ণ আর্তনাদ।শিকারী কুকুর-তাড়িত একাকী
রুশ কবি মৃত তুষার-ধবল ত্রাসে;
নিরুদ্দিষ্ট তার ছায়া আজো
মৌন স্মৃতিতে বার বার ফিরে আসে।প্রতারিত চোখে দেখি অবিরাম
পথে-প্রান্তরে ছিন্ন মুন্ড দোলে।
নিষ্ফল আমি, কী ফল ফলবে
অবালেই গাছ বজ্রদগ্ধ হ’লে?ঋতু না ফুরাতে গোলাপ ফুরায়,
মৃত্যু নিয়ত জীবনের প্রতিবেশী।
প্রেত –সৈকতে অদীন ভেলায়
আসবে কি তুমি কান্তা মুক্তবেশী? (ইকারুসের আকাশ কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/biporjosto-golap-bagan/
|
4807
|
শামসুর রাহমান
|
তোমার গোলাপগুলি
|
প্রেমমূলক
|
তোমার গোলাপগুলি আমাকে দেখছে অপলক
অনুরাগে ফুলদানি থেকে। বুঝি ওরা প্রতিনিধি
তোমার; ফলত প্রতিক্ষণ অমন তাকিয়ে থাকে
কেবলি আমার দিকে। লক্ষ করে এই ঘরে বসে
কী করছি আমি, কোন্ বই পড়ি, কিছু লিখি কিনা,
বুঝে নিতে চায় আমি তোমার স্মরণে কতটুকু
মগ্ন আছি, তোমার সুন্দর মুখ আমার দু’ চোখে
পরিস্ফুট কতখানি, দেখে নেয় দর্জির দৃষ্টিতে।যখন ফিরবে তুমি ভ্রমণের শেষে এ শহরে,
তখন গোলাপগুলি থাকবে না। ওরা মরে যাবে,
ঝরে যাবে; সৌন্দর্য বড়োই ক্ষণজীবী, আমি এই
ক’টি দিন সুপ্রিয় তোমাকে ভুলে ছিলাম অথবা
ব্যাকুল ছিলাম খুব তোমার জন্যেই। তার কোনো
বিবরণ কখনো পাবে না তুমি প্রতিনিধিহীনা! (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/tomar-golapguli/
|
4920
|
শামসুর রাহমান
|
পার্কের নিঃসঙ্গ খঞ্জ
|
মানবতাবাদী
|
পার্কের নিঃসঙ্গ খঞ্জ চেয়েছে চাঁদের কাছে বুঝি
একটি অদ্ভুত স্বপ্ন তাই রাত্রি তাকে
দিল উপহারবিষাদের বিস্রস্ত তনিমা
যেন সে দুর্মর কাপালিক
চন্দ্রমার করোটিতে আকণ্ঠ করবে পান সুতীব্র মদিরাপৃথিবীতে সম্পন্ন গাছের পাতা ঝরে
হরিণের কানের মতন পাতা ঝরে ধ্বনি ঝরে
উজ্জ্বল মাছের
রুপালি আঁশের মতো ধ্বনি ঝরে ঝরে ধ্বনি
ঝরে পৃথিবীতে
সে ধ্বনির আকাঙ্ক্ষায় জ্ব’লে ততদিন সে-ও
থাকবে পথের প্রান্তে প্রতীক্ষার ঘাটে
যতদিন সহজে ভাসানো চলে সোনার কলসরৌদ্রের দস্যুতা জেনে বৃষ্টির আঁচড়ে
মুহ্যমান দুঃখের দর্পণে দেখে মুখ
বাসি রুটি
চিবোয় অভ্যাসবশে জ্যোৎস্নাজ্বলা দাঁতে
আর স্মৃতিগুলি একপাল কুকুরের মতো
খিঁচিয়ে ধারালো দাঁত মনের পিছনে করে তাড়া
ভাবেএকতাল শূন্যতায় ভাবে
বেহেস্তের ছবি যায় কশাই চামার
ছুতোর কামার আর
মুটে মজুরের ঘরে আর দরবেশের গুহায়
বাদশার হারেমে সুন্দরী বাঁদী যদি
বিলাসের কামনার খাদ্য হয় সোহাগ জোগায়
বিলোল অধরে
গড়ায় ক’ফোঁটা পানি ক্ষুধিত পাষাণে
অথবা নুলোর বউ কাঁদে ভাদ্রের দুপুরে
তবে যে লোকটা হেঁটে যায়
বিকেলের মোলায়েম রোদে
তার কীবা এসে যায়অন্যের দুঃখের নদী বয়ে যেতে দেখে
আমরা সবাই কম বেশি
স্বস্তির হাওয়ায় ভাসি নিজের ফাঁড়ার কথা ভেবে
একচ্ছত্র ক্ষুধার সাম্রাজ্যে ঘুরে ঘুরে
ধুলো ঘেঁটে ছাই ছেনে হৈ হৈ ছেলেদের
দৌরাত্ম্যে অস্থির
ফিরে আসে পার্কে এই নিরানন্দ বাদামের খোসা
ভবঘুরে কাগজের অভ্যস্ত জগতে
যেখানে অনামি
বাউণ্ডুলে ময়লা ভিখিরি আর লম্পট জোচ্চোর
গণ্ডমূর্খ আর ভণ্ড ফকির অথবা
অর্ধনগ্ন ভস্মমাখা উন্মাদিনী বেহেড মাতাল
এসে জোটে সন্ধ্যার আড়ালে
যখন কোথাও
রজনীগন্ধার ডালে কাগজের মতো চাঁদ বোনে
স্বপ্নের রুপালি পাড়অর্ধদগ্ধ বিড়িটাকে শুকনো ঠোঁটে চেপে
তাকায় রাস্তার ধারে চাঁদহীন মাঠে
অদ্ভুত বিকৃত মুখে যেন
পৃথিবীর কোনো সত্যে সৌন্দর্যে কল্যাণে
আস্থা নেই তার যেন একটি কর্কশ পাখি
আত্মাকে ঠুকরে বলে তোমার বাগান নেই বলে
রক্তিম গোলাপ আসবে না
বিকলাঙ্গ স্বপ্নের অলিন্দে কোনো দিন
জানে তার নেই ঠাঁই সুন্দরের কোলে
নুলোর বউটা তবে তাকে
থাক থাক
এসব কথার বুজরুকি
কখনো সাজে কি তার চালচুলো নেই যার এই
দুনিয়ার ঘরেরোঁয়াওঠা কুকুরের সাহচর্য্যে গ্রীষ্মের গোধূলি
হয়তো লাগবে ভালো রাত্রি এলে চাঁদ
হয়তো অদ্ভুত স্বপ্ন দেবে তার সত্তার মাটিতে
বিষাদের ঘরে
কেউ জাগাবে না তাকে
পার্কের নিঃসঙ্গ খঞ্জটাকে (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/parker-nisshongo-khonj/
|
5991
|
হুমায়ুন আজাদ
|
ব্যাধিকে রূপান্তরিত করছি মুক্তোয়
|
চিন্তামূলক
|
একপাশে শূন্যতার খোলা, অন্যপাশে মৃত্যুর ঢাকনা,
প’ড়ে আছে কালো জলে নিরর্থক ঝিনুক।
অন্ধ ঝিনুকের মধ্যে অনিচ্ছায় ঢুকে গেছি রক্তমাংসময়
আপাদমস্তক বন্দী ব্যাধিবীজ। তাৎপর্য নেই কোন দিকে-
না জলে না দেয়ালে-তাৎপর্যহীন অভ্যন্তরে ক্রমশ উঠছি বেড়ে
শোণিতপ্লাবিত ব্যাধি। কখনো হল্লা ক’রে হাঙ্গরকুমীরসহ
ঠেলে আসে হলদে পুঁজ, ছুটে আসে মরা রক্তের তুফান।
আকষ্মিক অগ্নি ঢেলে ধেয়ে আসে কালো বজ্রপাত।
যেহেতু কিছুই নেই করণীয় ব্যাধিরূপে বেড়ে ওঠা ছাড়া,
নিজেকে-ব্যাধিকে-যাদুরসায়নে রূপান্তরিত করছি শিল্পে-
একরত্তি নিটোল মুক্তোয়!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/508
|
2187
|
মহাদেব সাহা
|
দুঃখ আছে কতো রকম
|
চিন্তামূলক
|
হায় আমাদের দুঃখ আছে কতো রকম
বুকের ক্ষত, মনের বারো গাঢ় জখম
মা যেমন দুঃখ করেন হলো না তার ঘটিবাটি সোনার বাসন
ন্যায্য আসন
ছেলেরা তার দিলো না কেউ
রইলো পড়ে বাইরে যেমন উড়োনচন্ডী
জোয়ারে ঢেউ ;
ঘর হলো না, নিজের কোনো ঠাঁই হলো না পায়ে দাঁড়াবার
হত বাড়াবার
বিপদ আপদ কতোই আছে
মা রাখলেন মনেই চেপে মনের দুঃখ
মনের কাছে,
আমি যেমন দুঃখ করি
দুঃখ করি
অনেক কিছু
ঠিক য়ে আমি চুটলি কখন কিসের পিছু
তাই জানি না
শীতের দিনে হাত বাড়িয়েও ঘরে একটু রোদ আনি না
কেন যে ঠিক দুঃখ করি তাই জানি না ;
এই তো আমি ইচ্ছে করলে খেতে পারি, ঘুমোতে পাই যখন তখন
অসুখ হলে কিনতে পারি অ্যাসপ্রো কিংবা চোখের জন্যে
দামী লোশন
বাসে চড়ে ঘুরতে পারি এখান থেকে অনেক খানি,
কিংবা যেমন কারো কারো প্রেমের জন্য প্যানপ্যানানি
প্রেম হলো না, হলো না ঠিক আলাপ কোনো মেয়ের সাথে
দিনেরাতে
বাদশাজাদীর তসবী নিয়ে নরম বিলাস
ও-সব ছাই নেই কিছুরই কোনো আভাস
আমার মধ্যে, তবু আমি দুঃখ করি
কিসের জন্যে দুঃখ করি তাই জানি না
গাই বিয়োবার আশায় ঘরে ধান ভানি না
সবাই আমরা দুঃখ করি একটা কিছুর দুঃখ করি
ঘটিবাটি, বসতবাড়ি, ফুলদানি বা সোনার বাসন
নিজের জন্য হলো না ঠিক যোগ্য আসন
হাত বাড়াবার শক্ত লাঠি
পরিপাটি সোনার জীবন
হলো না ঠিক যেমনটি চাই দুঃখ করি
সবাই আমরা একটা কিছু দুঃখ করি
কেন যে ঠিক দুঃখ করি তাই জানি না
কেবল বুঝি বুকের নিচে সুনীল জখম।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1470
|
3525
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
বশীরহাটেতে বাড়ি
|
হাস্যরসাত্মক
|
বশীরহাটেতে বাড়ি
বশ-মানা ধাত তার,
ছেলে বুড়ো যে যা বলে
কথা শোনে যার-তার।
দিনরাত সর্বথা
সাধে নিজ খর্বতা,
মাথা আছে হেঁট-করা,
সদা জোড়-হাত তার,
সেই ফাঁকে কুকুরটা
চেটে যায় পাত তার। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/boshirhatete-bari/
|
909
|
জীবনানন্দ দাশ
|
অন্ধকার
|
চিন্তামূলক
|
গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার;
তাকিয়ে দেখলাম পান্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া
গুটিয়ে নিয়েছে যেন
কীর্তিনাশার দিকে।
ধারসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম- পউষের রাতে-
কোনোদিন আর জাগব না জেনে
কোনোদিন জাগব না আমি- কোনোদিন জাগব না আর-
হে নীল কস্তুরী আভার চাঁদ,
তুমি দিনের আলো নও, উদ্যম নও, স্বপ্ন নও,
হৃদয়ে যে মৃত্যুর শান্তি ও স্থিরতা রয়েছে
রয়েছে যে অগাধ ঘুম
সে-আস্বাদ নষ্ট করবার মতো শেলতীব্রতা তোমার নেই,
তুমি প্রদাহ প্রবহমান যন্ত্রণা নও-
জানো না কি চাঁদ,
নীল কস্তুরী আভার চাঁদ,
জানো না কি নিশীথ,
আমি অনেক দিন-
অনেক অনেক দিন
অন্ধকারের সারাৎসারে অন্তত মৃত্যুর মতো মিশে থেকে
হঠাৎ ভোরের আলোর মূর্খ উচ্ছ্বাসে নিজেকে পৃথিবীর জীব বলে
বুঝতে পেরেছি আবার;
ভয় পেয়েছি,
পেয়েছি অসীম দুর্নিবার বেদনা;
দেখেছি রক্তিম আকাশে সূর্য জেগে উঠে
মানুষিক সৈনিক সেজে পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াবার জন্য
আমাকে নির্দেশ দিয়েছে;
আমার সমস্ত হৃদয় ঘৃণায়- বেদনায়- আক্রোশে ভরে গিয়েছে;
সূর্যের রৌদ্রে আক্রান্ত এই পৃথিবী যেন কোটি কোটি শুয়োরের
আর্তনাদে উৎসব শুরু করেছে ।
হায়, উৎসব!
হৃদয়ের অবিরল অন্ধকারের ভিতর সূর্যকে ডুবিয়ে ফেলে
আবার ঘুমোতে চেয়েছি আমি,
অন্ধকারের স্তনের যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর মতো মিশে
থাকতে চেয়েছি।
কোনোদিন মানুষ ছিলাম না আমি।
হে নর, হে নারী,
তোমাদের পৃথিবীকে চিনিনি কোনোদিন;
আমি অন্য কোনো নক্ষত্রের জীব নই।
যেখানে স্পন্দন, সংঘর্ষ, গতি, যেখানে উদ্যম, চিন্তা, কাজ
সেখানেই সূর্য, পৃথিবী, বৃহস্পতি, কালপুরুষ, অনন্ত আকাশগ্রন্থি,
শত শত শূকরের চিৎকার সেখানে,
শত শত শূকরের প্রসববেদনার আড়ম্বর;
এই সব ভয়াবহ আরতি!
গভীর অন্ধকারের ঘুমের আস্বাদে আমার আত্মা লালিত;
আমাকে কেন জাগাতে চাও?
হে সময়গ্রন্থি, হে সূর্য, হে মাঘনিশীথের কোকিল, হে স্মৃতি,
হে হিম হাওয়া,
আমাকে জাগাতে চাও কেন।
অরব অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর চ্ছল চ্ছল শব্দে জেগে উঠব না আর;
তাকিয়ে দেখব না নির্জন বিমিশ্র চাঁদ বৈতরণীর থেকে
অর্ধেক ছায়া গুটিয়ে নিয়েছে
কীর্তিনাশার দিকে।
ধানসিড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়ে থাকব-ধীরে-পউষের রাতে।
কোনদিন জাগব না জেনে-
কোনোদিন জাগব না আমি-কোনোদিন আর।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/953
|
3784
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যাবার দিন
|
চিন্তামূলক
|
যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই -
যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই।
এই জ্যোতিসমুদ্র মাঝে যে শতদল পদ্ম রাজে
তারি মধু পান করেছি, ধন্য আমি তাই।
যাবার দিনে এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই।।বিশ্বরূপের খেলাঘরে কতই গেলেম খেলে,
অপরূপকে দেখে গেলেম দুটি নয়ন মেলে।
পরশ যাঁরে যায় না করা সকল দেহে দিলেন ধরা,
এইখানে শেষ করেন যদি শেষ করে দিন তাই -
যাবার বেলা এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই।।২০ শ্রাবণ ১৩১৭
(কাব্যগ্রন্থঃ সঞ্চয়িতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jabar-din/
|
1304
|
তসলিমা নাসরিন
|
এখন থেকে আর সত্য বোলো না
|
মানবতাবাদী
|
সত্য বললে কিছু লোক আছে খুব রাগ করে,
এখন থেকে আর সত্য বোলো না তসলিমা।
গ্যালিলিওর যুগ নয় এই যুগ, কিন্তু
এই একবিংশ শতাব্দীতেও
সত্য বললে একঘরে করে রাখে সমাজ,
দেশছাড়া করে দেশ।
গৃহবন্দী করে রাষ্ট্র,
রাষ্ট্র শাস্তি দেয়,
সত্য বোলো না।
তার চেয়ে মিথ্যে বলো,
বলো যে পৃথিবীর চারদিকে সূর্য ঘোরে,
বলো যে সূর্যের যেমন নিজের আলো আছে, চাঁদেরও আছে,
বলো যে পাহাড়গুলো পৃথিবীর গায়ে পেরেকের মতো পুঁতে দেওয়া,
বলো যে পুরুষের পাঁজরের হাড় থেকেনারীকে বানানো,
বলো যে নারীর ঘাড়ের কী যেন একটা খুব বাকা।
বলো যে শেষ-বিচারের দিনে মানুষেরা সব কবর থেকে,
ছাই থেকে, নষ্ট হাড়গোড় থেকে টাটকা যুবক যুবতী হয়ে
আচমকা জেগে উঠবে, স্বর্গ বা নরকে অনন্তকালের জন্য জীবন কাটাতে যাবে।
তুমি মিথ্যে বলো তসলিমা।
বলো যে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অগুণতি গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্ররাজি মিথ্যে,
মাধ্যাকর্ষণ শক্তি মিথ্যে, মানুষ চাঁদে গিয়েছিল, মিথ্যে।
মিথ্যে বললে তুমি নির্বাসন থেকে মুক্তি পাবে,
তুমি দেশ পাবে, প্রচুর বন্ধু পাবে,
হাত পায়ের শেকল খুলে দেওয়া হবে, তুমি আলো দেখবে, আকাশ দেখবে।
একা একা অন্ধকারে হাঁমুখো মৃত্যুর মুখে ছুড়ে দেবে না তোমাকে কেউ।
তুমি সত্য বলো না তসলিমা,
বাঁচো।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/1000.html
|
5664
|
সুকুমার রায়
|
বুড়ীর বাড়ী
|
ছড়া
|
গালভরা হাসিমুখে চালভাজা মুড়ি,
ঝুরঝুরে প'ড়ো ঘরে থুর্থুরে বুড়ী৷
কাঁথাভরা ঝুলকালি, মাথাভরা ধুলো,
মিট্মিটে ঘোলা চোখ, পিট খানা কুলো৷
কাঁটা দিয়ে আঁটা ঘর—আঠা দিয়ে সেঁটে,
সূতো দিয়ে বেঁধে রাখে থুতু দিয়ে চেটে৷
ভর দিতে ভয় হয় ঘর বুঝি পড়ে,
খক্ খক্ কাশি দিলে ঠক্ ঠক্ নড়ে৷
ডাকে যদি ফিরিওয়ালা, হাঁকে যদি গাড়ী,
খসে পড়ে কড়িকাঠ ধসে পড়ে বাড়ী৷
বাঁকাচোরা ঘরদোর ফাঁকা ফাঁকা কত,
ঝাঁট দিলে ঝরে প'ড়ে কাঠকুটো যত৷
ছাদগুলো ঝুলে পড়ে বাদ্লায় ভিজে,
একা বুড়ী কাঠি গুঁজে ঠেকা দেয় নিজে৷
মেরামত দিনরাত কেরামত ভারি,
থুর্থুরে বুড়ী তার ঝুর্ঝুরে বাড়ী৷৷
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/burir-bari/
|
1628
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
নিশান
|
চিন্তামূলক
|
মাঝে-মাঝে একটু জিরিয়ে নিতে হয়।
ঘুরে-দাঁড়িয়ে মাঝে-মাঝে একবার
দেখতে হয়
পিছনের মানুষজন, ঘরবাড়ি আর
খেতখামার।
মাঝে-মাঝে ভাবতে হয়
এই যে আমি পাথরের ধাপে
পা রেখে-রেখে
পাহাড়-চূড়ার ওই দেবালয়ের দিকে উঠে যাচ্ছি,
এর কি কোনও দরকার ছিল?
আমার মুঠোর মধ্যে খুব শক্ত করে আমি
ধরে রেখেছি সেই নিশান,
পাথরে পা রেখে-রেখে উপরে উঠে গিয়ে
মন্দিরের ওই চূড়ার যা আমি
উড়িয়ে দেব।
কিন্তু ঘুরে দাঁড়িয়ে এখন আমি
পাহাড়তলির
ঘরবাড়ি দেখছি,
খেতখামার দেখছি,
আর দেখছি মানুষজনের মেলা।
ঘুরে দাঁড়াবার এই হচ্ছে বিপদ।
মনে হচ্ছে,
কোথাও কিছু ভুল হয়ে গেল।
মানুষের ওই মেলার মধ্যেই এই
নিশানটা আমি রেখে আসতে পারতুম।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1536
|
1523
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো
|
স্বদেশমূলক
|
একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে
ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না,
এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না,
এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না৷
তা হলে কেমন ছিল সেদিনের সেই বিকেল বেলাটি?
তা হলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে, বৃক্ষে, ফুলের বাগানে
ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হদৃয় মাঠখানি?জানি, সেদিনের সব স্মৃতি ,মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত
কালো হাত৷ তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ
কবির বিরুদ্ধে কবি,
মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,
বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,
উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান,
মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ … ৷হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি,
শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি
একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে
লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প৷
সেই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর৷
না পার্ক না ফুলের বাগান, — এসবের কিছুই ছিল না,
শুধু একখন্ড অখন্ড আকাশ যেরকম, সেরকম দিগন্ত প্লাবিত
ধু ধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়৷
আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল
এই ধু ধু মাঠের সবুজে৷কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে
এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক,
লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক,
পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে এসেছিল প্রদীপ্ত যুবক৷
হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত,
নিম্ন মধ্যবিত্ত, করুণ কেরানী, নারী, বৃদ্ধ, বেশ্যা, ভবঘুরে
আর তোমাদের মত শিশু পাতা-কুড়ানীরা দল বেঁধে৷
একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্যে কী ব্যাকুল
প্রতীক্ষা মানুষের: “কখন আসবে কবি?’ “কখন আসবে কবি?’শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন৷
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হদৃয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা৷ কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি:
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম৷’সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের৷কাব্যগ্রন্থঃ -চাষাভুষার কাব্য
|
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/post20161130112340/
|
836
|
জসীম উদ্দীন
|
নক্সী কাঁথার মাঠ - দশ
|
কাহিনীকাব্য
|
(দশ)নতুন চাষা ও নতুন চাষাণী পাতিল নতুন ঘর,
বাবুই পাখিরা নীড় বাঁধে যথা তালের গাছের পর |
মাঠের কাজেতে ব্যস্ত রূপাই, নয়া বউ গেহ কাজে,
দুইখান হতে দুটি সুর যেন এ উহারে ডেকে বাজে |
ঘর চেয়ে থাকে কেন মাঠ পানে, মাঠ কেন ঘর পানে,
দুইখানে রহি দুইজন আজি বুঝিছে ইহার মানে |আশ্বিন গেল, কার্তিক মাসে পাকিল খেতের ধান,
সারা মাঠ ভরি গাহিতেছে কে যেন হল্ দি-কোটার গান |
ধানে ধান লাগি বাজিছে বাজনা, গন্ধ উড়িছে বায়,
কলমীলতায় দোলন লেগেছে, হেসে কূল নাহি পায় |
আজো এই গাঁও অঝোরে চাহিয়া ওই গাঁওটির পানে,
মাঝে মাঠখানি চাদর বিছায়ে হলুদ বরণ ধানে |আজকে রূপার বড় কাজ---কাজ---কোন অবসর নাই,
মাঠে যেই ধান ধরেনাক আজি ঘরে দেবে তারে ঠাঁই |
সারা মাঠে ধান, পথে ঘাটে ধান উঠানেতে ছড়াছড়ি,
সারা গাঁও ভরি চলেছে কে কবি ধানের কাব্য পড়ি |আজকে রূপার মনে পড়েনাক শাপলার লতা দিয়ে,
নয়া গৃহিনীর খোঁপা বেঁধে দিত চুলগুলি তার নিয়ে |
সিঁদুর লইয়া মান হয়নাক বাজে না বাঁশের বাঁশী,
শুধু কাজ---কাজ, কি যাদু-মন্ত্র ধানেরা পড়িছে আসি |সারাটি বরষা কে কবি বসিয়া বেঁধেছে ধানের গান,
কত সুদীর্ঘ দিবস রজনী করিয়া সে অবসান |
আজকে তাহার মাঠের কাব্য হইয়াছে বুঝি সারা,
ছুটে গেঁয়ো পাখি ফিঙে বুলবুল তারি গানে হয়ে হারা |কৃষাণীর গায়ে গহনা পরায় নতুন ধানের কুটো ;
এত কাজ তবু হাসি ধরেনাক, মুখে ফুল ফুটো ফুটো!
আজকে তাহার পাড়া-বেড়ানর অবসর মোটে নাই,
পার খাড়ুগাছি কোথা পড়ে আছে, কেবা খোঁজ রাখে ছাই!অর্ধেক রাত উঠোনেতে হয় ধানের মলন মলা,
বনের পশুরা মানুষের কাজে মিশায় গলায় গলা |
দাবায় শুইয়া কৃষাণ ঘুমায়, কৃষাণীর কাজ ভারি,
ঢেকির পারেতে মুখর করিছে একেলা সারাটি বাড়ি |
কোন দিন চাষী শুইয়া শুইয়া গাহে বিরহের গান,
কৃষাণের নারী ঘুমাইয়া পড়ে, ঝাড়িতে ঝাড়িতে ধান |
হেমন্ত চাঁদ অর্ধেক হেলি জ্যোত্স্নার জাল পাতি,
টেনে টেনে তারে হয়রান হয়ে ডুবে যায় রাতারাতি |এমনি করিয়া ধানের কাব্য হইয়া আসিল সারা,
গানের কাব্য আরম্ভ হল সারাটা কৃষাণ পাড়া!
রাতেরে উহারা মানিবে না যেন, নতুন গলার গানে,
বাঁশী বাজাইয়া আজকে রাতের করিবে নতুন মানে |আজিকে রূপার কোন কাজ নাই, ঘুম হতে যেন জাগি,
শিয়রে দেখিছে রাজার কুমারী তাহারই ব্যথার ভাগী |সাজুও দেখিছে কোথাকার যেন রাজার কুমার আজি,
ঘুম হতে তারে সবে জাগায়েছে অরুণ-আলোয় সাজি |নতুন করিয়া আজকে উহারা চাহিছে এ ওর পানে,
দীর্ঘ কাজের অবসর যেন কহিছে নতুন মানে!
নতুন চাষার নতুন চাষাণী নতুন বেঁধেছে ঘর,
সোহাগে আদরে দুটি প্রাণ যেন করিতেছে নড়নড়!
বাঁশের বাঁশীতে ঘুণ ধরেছিল, এতদিন পরে আজ,
তেলে জলে আর আদরে তাহার হইল নতুন সাজ |
সন্ধ্যার পরে দাবায় বসিয়া রূপাই বাজায় বাঁশী,
মহাশূণ্যের পথে সে ভাসায় শূণ্যের সুররাশি!
ক্রমে রাত বাড়ে, বউ বসে দূরে, দুটি চোখ ঘুমে ভার,
'পায়ে পড়ি ওগো চলো শুতে যাই, ভাল লাগে নাক আর |'
রূপা ত সে কথা শোনেই নি যেন, বাঁশী বাজে সুরে সুরে,
'ঘরে দেখে যারে সেই যেন আজি ফেরে ওই দূরে দূরে |'
বউ রাগ করে, 'দেখ, বলে রাখি, ভাল হবেনাক পরে,
কালকের মত কর যদি তবে দেখিও মজাটি করে |
ওমনি করিয়া সারারাত আজি বাজাইবে যদি বাঁশী,
সিঁদুর আজিকে পরিব না ভালে, কাজল হইবে বাসি |
দেখ, কথা শোন, নইলে এখনি খুলিব কানের দুল,
আজকে ত আমি খোঁপা বাঁধিব না, আলগা রহিবে চুল |'
বেচারী রূপাই বাঁশী বাজাইতে এমনি অত্যাচার,
কৃষাণের ছেলে! অত কিবা বোঝে, তখনই মানিল হার |কহে জোড় করে, 'শোন গো হুজুর, অধম বাঁশীর প্রতি,
মৌন থাকার কঠোর দণ্ড অন্যায় এ যে অতি |
আজকে ও-ভালে সিঁদুর দিবে না, খুলিবে কানের দুল,
সন্ধ্যে হবে না সিঁদুরে রঙের---ভোরে হাসিবে না ফুল!
এক বড় কথা! আচ্ছা দেখাই, ওরে ও অধম বাঁশী,
এই তরুণীর অধরের গানে তোমার হইবে ফাঁসী!'
হাতে লয়ে বাঁশী বাজাইল রূপা মাঠের চিকন সুরে,
কভু দোলাইয়া বউটির ঠোঁটে কভু তারে ঘুরে ঘুরে |
বউটি যেন গো হেসে হয়রান, কহে ঠোঁটে ঠোঁট চাপি,
'বাঁশীর দণ্ড হইল, কিন্তু যে বাজাল সে পাপী?'
পুনঃ জোর করে রূপা কহে, 'এই অধমের অপরাধ,
ভয়ানক যদি, দণ্ড তাহার কিছু কম নিতে সাধ!'
রূপার বলার এমনি ভঙ্গী বউ হেসে কুটি কুটি,
কখনও পড়িছে মাটিতে ঢলিয়া, কভু গায়ে পড়ে লুটি |
পরে কহে, 'দেখো, আরও কাছে এসো, বাঁশীটি লও তো হাতে,
এমনি করিয়া দোলাও ত দেখি নোলক দোলার সাথে!'বাঁশী বাজে আর নোলক যে দোলে, বউ কহে আর বার,
'আচ্ছা আমার বাহুটি নাকিগো সোনালী লতার হার?
এই ঘুরালেম, বাজাও ত দেখি এরি মত কোন সুর,'
তেমনি বাহুর পরশের মত বাজে বাঁশী সুমধুর!
দুটি করে রাঙা ঠোঁটখানি টেনে কহে বউ, 'এরি মত,
তোমার বাঁশীতে সুর যদি থাকে বাজাইলে বেশ হত |'
চলে মেঠো বাঁশী দুটি ঠোঁট ছুঁয়ে কলমী ফুলের বুকে,
ছোট চুমু রাখি চলে যেন বাঁশী, চলে সে যে কোন লোকে |এমনি করিয়া রাত কেটে যায় ; হাসে রবি ধীরি ধীরি,
বেড়ার ফাঁকেতে উঁকি মেরে দেখি দুটি খেয়ালীর ছিরি |
সেদিন রাত্রে বাঁশী শুনে শুনে বউটি ঘুমায়ে পড়ে,
তারি রাঙা মুখে বাঁশী-সুরে রূপা বাঁকা চাঁদ এনে ধরে |
তারপরে খুলে চুলের বেণীটি বার বার করে দেখে,
বাহুখানি দেখে নাড়িয়া নাড়িয়া বুকের কাছেতে রেখে |
কুসুম-ফুলেতে রাঙা পাও দুটি দেখে আরো রাঙা করি,
মৃদু তালে তালে নিঃশ্বাস লয়, শুনে মুখে মুখ ধরি |
ভাবে রূপা, ও-যে দেহ ভরি যেন এনেছে ভোরের ফুল,
রোদ উঠিলেই শুকাইয়া যাবে, শুধু নিমিষের ভুল!
হায় রূপা, তুই চোখের কাজলে আঁকিলি মোহন ছবি,
এতটুকু ব্যথা না লাগিতে যেরে ধুয়ে যাবে তোর সবি!ওই বাহু আর ওই তনু-লতা ভাসিছে সোঁতের ফুল,
সোঁতে সোঁতে ও যে ভাসিয়া যাইবে ভাঙিয়া রূপার কূল!
বাঁশী লয়ে রূপা বাজাতে বসিল বড় ব্যথা তার মনে,
উদাসীয়া সুর মাথা কুটে মরে তাহার ব্যথার সনে |ধারায় ধারায় জল ছুটে যায় রূপার দুচোখ বেয়ে,
বইটি তখন জাগিয়া উঠিল তাহার পরশ পেয়ে |
'ওমা ওকি? তুমি এখনো শোওনি! খোলা কেন মোর চুল?
একি! দুই পায়ে কে দেছে ঘষিয়া রঙিন কুসুম ফুল?
ওকি! ওকি!! তুমি কাঁদছিলে বুঝি! কেন কাঁদছিলে বল?'
বলিতে বলিতে বউটির চোখ জলে করে ছল ছল!
বাহুখানা তার কাঁধ পরে রাখি রূপা কয় মৃদু সুরে,
'শোন শোন সই, কে যেন তোমায় নিয়ে যেতে চায় দূরে!''সে দূর কোথায়?' 'অনেক---অনেক---দেশ যেতে হয় ছেড়ে,
সেথা কেউ নাই শুধু আমি তুমি আর সেই সে অচেনা ফেরে |
তুমি ঘুমাইলে সে এসে আমায় কয়ে যায় কানে কানে,
যাই---যাই---ওরে নিয়ে যাই আমি আমার দেশের পানে |
বল, তুমি সেথা কখনও যাবে না, সত্যি করিয়া বল!'
'নয়! নয়! নয়!' বউ কহে তার চোখ দুটি ছল ছল |রূপা কয় 'শোন সোনার বরণি, আমার এ কুঁড়ে ঘর,
তোমার রূপের উপহাস শুধু করে সারা দিনভর |
তুমি ফুল! তব ফুলের গায়েতে বহে বিহানের বায়ু,
আমি কাঁদি সই রোদ উঠিলে যে ফুরাবে রঙের আয়ু |
আহা আহা সখি, তুমি যাহা কর, মোর মনে লয় তাই,
তোমার ফুলের পরাণে কেবল দিয়া যায় বেদনাই |'
এমন সময় বাহির হইতে বছির মামুর ডাকে,
ধড়মড় করি উঠিয়া রূপাই চাহিল বেড়ার ফাঁকে |
|
https://www.bangla-kobita.com/jasimuddin/nokshi-kathar-maath-10/
|
359
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
নব ভারতের হলদিঘাট
|
স্বদেশমূলক
|
বালাশোর – বুড়িবালামের তীর –
নব-ভারতের হলদিঘাট,
উদয়-গোধূলি-রঙে রাঙা হয়ে
উঠেছিল যথা অস্তপাট।
আ-নীল গগন-গম্বুজ-ছোঁয়া
কাঁপিয়া উঠিল নীল অচল,
অস্তরবিরে ঝুঁটি ধরে আনে
মধ্য গগনে কোন পাগল!
আপন বুকের রক্তঝলকে
পাংশু রবিরে করে লোহিত,
বিমানে বিমানে বাজে দুন্দুভি,
থরথর কাঁপে স্বর্গ-ভিত।
দেবকী মাতার বুকের পাথর
নড়িল কারায় অকস্মাৎ
বিনা মেঘে হল দৈত্যপুরীর
প্রাসাদে সেদিন বজ্রপাত।
নাচে ভৈরব, শিবানী, প্রমথ
জুড়িয়া শ্মশান মৃত্যুনাট, -
বালাশোর – বুড়িবালামের তীর –
নব ভারতের হলদিঘাট।অভিমন্যুর দেখেছিস রণ?
যদি দেখিসনি, দেখিবি আয়,
আধা-পৃথিবীর রাজার হাজার
সৈনিকে চারি তরুণ হটায়।
ভাবী ভারতের না-চাহিতে আসা
নবীন প্রতাপ, নেপোলিয়ন,
ওই ‘যতীন্দ্র’ রণোন্মত্ত –
শনির সহিত অশনি-রণ।
দুই বাহু আর পশ্চাতে তার
রুষিছে তিনটি বালক শের,
‘চিত্তপ্রিয়, ‘মনোরঞ্জন,
‘নীরেন’ – ত্রিশূল ভৈরবের!
বাঙালির রণ দেখে যা রে তোরা
রাজপুত, শিখ, মারাঠি, জাঠ!
বালাশোর – বুড়িবালামের তীর –
নব-ভারতের হলদিঘাট।
চার হাতিয়ারে – দেখে যা কেমনে
বধিতে হয় রে চার হাজার,
মহাকাল করে কেমনে নাকাল
নিতাই গোরার লালবাজার!
অস্ত্রের রণ দেখেছিস তোরা,
দেখ নিরস্ত্র প্রাণের রণ;
প্রাণ যদি থাকে – কেমনে সাহসী
করে সহস্র প্রাণ হরণ!হিংস-বুদ্ধ-মহিমা দেখিবি
আয় অহিংস-বুদ্ধগণ
হেসে যারা প্রাণ নিতে জানে, প্রাণ
দিতে পারে তারা হেসে কেমন!
অধীন ভারত করিল প্রথম
স্বাধীন-ভারত মন্ত্রপাঠ,
বালাশোর – বুড়িবালামের তীর –
নব-ভারতের হলদিঘাট।
সে মহিমা হেরি ঝুঁকিয়া পড়েছে
অসীম আকাশ, স্বর্গদ্বার,
ভারতের পূজা-অঞ্জলি যেন
দেয় শিরে খাড়া নীল পাহাড়!
গগনচুম্বী গিরিশের হতে
ইঙ্গিত দিল বীরের দল,
‘মোরা স্বর্গের পাইয়াছি পথ –
তোরা যাবি যদি, এ পথে চল!
স্বর্গ-সোপানে রাখিনু চিহ্ন
মোদের বুকের রক্ত-ছাপ,
ওই সে রক্ত-সোপানে আরোহি
মোছ রে পরাধীনতার পাপ!
তোরা ছুটে আয় অগণিত সেনা,
খুলে দিনু দুর্গের কবাট!’
বালাশোর – বুড়িবালামের তীর –
নব-ভারতের হলদিঘাট।
*********************কাব্যগ্রন্থ - প্রলয়শিখা
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/naba-bharater-haldighat/
|
139
|
আল মাহমুদ
|
মাতৃছায়া
|
সনেট
|
হারিয়ে কানের সোনা এ-বিপাকে কাঁদো কি কাতরা?
বাইরে দারুন ঝড়ে নুরে পড়ে আনাজের ডাল,
তস্করের হাত থেকে জেয়র কি পাওয়া যায় ত্বরা –
সে কানেট পরে আছে হয়তো বা চোরের ছিনাল !
পোকায় ধরেছে আজ এ দেশের ললিত বিবেকে
মগজ বিকিয়ে দিয়ে পরিতৃপ্ত পন্ডিত সমাজ।
ভদ্রতার আবরণে কতদিন রাখাযায় ঢেকে
যখন আত্মায় কাঁদে কোনো দ্রোহী কবিতার কাজ?
ভেঙ্গোনা কাঁচের চুড়ি, ভরে দেবো কানের ছেঁদুর
এখনো আমার ঘরে পাওয়া যাবে চন্দনের শলা,
ধ্রুপদের আলাপনে অকস্মাৎ ধরেছি খেউড়
ক্ষমা করো হে অবলা, ক্ষিপ্ত এই কোকিলের গলা।
তোমার দুধের বাটি খেয়ে যাবে সোনার মেকুর
না দেখার ভান করে কতকাল দেখবে, চঞ্চলা?
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/3717.html
|
300
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
চক্রবাক
|
প্রেমমূলক
|
এপার ওপার জুড়িয়া অন্ধকার
মধ্যে অকূল রহস্য-পারাবার,
তারই এই কূলে নিশি নিশি কাঁদে জাগি
চক্রবাক সে চক্রবাকীর লাগি।
ভুলে যাওয়া কোন জন্মান্তর পারে
কোন সুখ-দিনে এই সে নদীর ধারে
পেয়েছিল তারে সারা দিবসের সাথি,
তারপর এল বিরহের চির-রাতি, –
আজিও তাহার বুকের ব্যথার কাছে,
সেই সে স্মৃতি পালক পড়িয়া আছে!কেটে গেল দিন, রাত্রি কাটে না আর,
দেখা নাহি যায় অতি দূর ওই পার।
এপারে ওপারে জনম জনম বাধা,
অকূলে চাহিয়া কাঁদিছে কূলের রাধা।
এই বিরহের বিপুল শূন্য ভরি
কাঁদিছে বাঁশরি সুরের ছলনা করি!
আমরা শুনাই সেই বাঁশরির সুর,
কাঁদি – সাথে কাঁদে নিখিল ব্যথা-বিধুর।কত তেরো নদী সাত সমুদ্র পার
কোন লোকে কোন দেশে গ্রহ-তারকার
সৃজন-দিনের প্রিয়া কাঁদে বন্দিনী,
দশদিশি ঘিরি নিষেধের নিশীথিনী।
এ পারে বৃথাই বিস্মরণের কূলে
খোঁজে সাথি তার, কেবলই সে পথ ভুলে।
কত পায় বুকে কত সে হারায় তবু –
পায়নি যাহারে ভোলেনি তাহারে কভু।তাহারই লাগিয়া শত সুরে শত গানে
কাব্যে, কথায়, চিত্রে, জড় পাষাণে,
লিখিছে তাহার অমর অশ্রু-লেখা।
নীরন্ধ্র মেঘ বাদলে ডাকিছে কেকা !
আমাদের পটে তাহারই প্রতিচ্ছবি,
সে গান শুনাই – আমরা শিল্পী কবি।
এই বেদনার নিশীথ-তমসা-তীরে
বিরহী চক্রবাক খুঁজে খুঁজে ফিরে
কোথা প্রভাতের সূর্যোদয়ের সাথে
ডাকে সাথি তার মিলনের মোহানাতে।
আমরা শিশির, আমাদের আঁখি-জলে
সেই সে আশার রাঙা রামধনু ঝলে। (চক্রবাক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/chokrobak/
|
1557
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
এশিয়া
|
মানবতাবাদী
|
এখন অস্ফুট আলো । ফিকে ফিকে ছাড়া অন্ধকারে
অরণ্য সমুদ্র হ্রদ, রাত্রির শিশির-শিক্ত মাঠ
অস্থির আগ্রহে কাঁপে, আসে দিন, কঠিন কপাট
ভেঙে পড়ে । দুর্বিনীত দুরন্ত আদেশ শুনে কারো
দীর্ঘরাত্রি মরে যায়, ধসে পড়ে শীর্ণ রাজ্যপাট ;
নির্ভয়ে জনতা হাঁটে আলোর বলিষ্ঠ অভিসারে ।
হে এশিয়া, রাত্রিশেষ, “ভস্ম অপমান শয্যা” ছাড়,
উজ্জীবিত হও রূঢ় অসংকোচ রৌদ্রের প্রহারে ।
শহরে বন্দরে গঞ্জে, গ্রামাঞ্চলে, ক্ষেতে ও খামারে
জাগে প্রাণ, দ্বীপে দ্বীপে মুঠিবদ্ধ অহ্বান পাঠায় ;
অগণ্য মানবশিশু সেই ক্ষিপ্র অনিবার্য ডাক
দুর্জয় আশ্বাসে শোনে, দৃঢ় পায়ে হাঁটে । তারপরে
ভারতে, সিংহলে, ব্রহ্মে, ইন্দোচীনে, ইন্দোনেশিয়ায়
বীত-নিদ্র জনস্রোত বিদ্যুত্-উল্লাসে নেয় বাঁক ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1618
|
1004
|
জীবনানন্দ দাশ
|
ক্ষেতে প্রান্তরে
|
চিন্তামূলক
|
ঢের সম্রাটের রাজ্যে বাস ক'রে জীব
অবশেষে একদিন দেখেছে দু-তিন ধনু দূরে
কোথাও সম্রাট নেই, তবুও বিপ্লবী নেই, চাষা
বলদের নিঃশব্দতা ক্ষেতের দুপুরে।
বাংলার প্রান্তরের অপরাহ্ন এসে
নদীর খাড়িতে মিশে ধীরে
বেবিলন লণ্ডনের জন্ম, মৃত্যু হ'লে-
তবুও রয়েছে পিছু ফিরে।
বিকেল এমন ব'লে একটি কামিন এইখানে
দেখা দিতে এলো তার কামিনীর কাছে;
মানবের মরণের পরে তার মমির গহ্বর
এক মাইল রৌদ্রে প'ড়ে আছে।২
আবার বিকেলবেলা নিভে যায় নদীর খাড়িতে;
একটি কৃষক শুধু ক্ষেতের ভিতরে
তার বলদের সাথে সারাদিন কাজ ক'রে গেছে;
শতাব্দী তীক্ষ্ম হ'য়ে পড়ে।
সমস্ত গাছের দীর্ঘ ছায়া
বাংলার প্রান্তরে পড়েছে;
এ-দিকের দিনমান- এ যুগের মতো শেষ হ'য়ে গেছে,
না জেনে কৃষক চোত-বোশেখের সন্ধ্যার বিলম্বনে প'ড়ে
চেয়ে দেখে থেমে আছে তবুও বিকাল;
ঊনিশশো বেয়াল্লিশ ব'লে মনে হয়
তবুও কি ঊনিশশো বিয়াল্লিশ সাল।৩
কোথাও শান্তির কথা নেই তার, উদ্দীপ্তিও নেই
একদিন মৃত্যু হবে, জন্ম হয়েছে;
সূর্য উদয়ের সাথে এসেছিলো ক্ষেতে;
সূর্যাস্তের সাথে চ'লে গেছে।
সূর্য উঠবে জেনে স্থির হ'য়ে ঘুমায়ে রয়েছে।
আজ রাতে শিশিরের জল
প্রাগৈতিহাসিক স্মৃতি নিয়ে খেলা করে;
কৃষাণের বিবর্ণ লাঙ্গল,
ফালে ওপড়ানো সব অন্ধকার ঢিবি,
পোয়াটাক মাইলের মতন জগৎ
সারাদিন অন্তহীন কাজ ক'রে নিরুৎকীর্ণ মাঠে
প'ড়ে আছে সৎ কি অসৎ।৪
অনেক রক্তের ধ্বকে অন্ধ হ'য়ে তারপর জীব
এইখানে তবুও পায়নি কোনো ত্রাণ;
বৈশাখের মাঠের ফাটলে
এখানে পৃথিবী অসমান।
আর কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
কেবল খড়ের স্তুপ প'ড়ে আছে দুই- তিন মাইল,
তবু তা সোনার মতো নয়,
কেবল কাস্তের শব্দ পৃথিবীর কামানকে ভুলে
করুণ নিরীহ, নিরাশ্রয়।
আর কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
জলপিপি চ'লে গেলে বিকেলের নদী কান পেতে
নিজের জলের সুর শোনে;
জীবাণুর থেকে আজ কৃষক, মানুষ
জেগেছে কি হেতুহীন সম্প্রসারণে-
ভ্রান্তিবিলাসে নীল আচ্ছন্ন সাগরে?
চৈত্য, ক্রুশ, নাইন্টিথ্রি ও সোবিয়েট শ্রুতি প্রতিশ্রুতি
যুগান্তের ইতিহাস অর্থ দিয়ে কূলহীন সেই মহাসাগরে প্রাণ
চিনে-চিনে হয়তো বা নচিকেতা প্রচেতার চেয়ে অনিমেষে
প্রথম ও অন্তিম মানুষের প্রিয় প্রতিমান
হ'য়ে যায় স্বাভাবিক জনমানবের সূর্যালোকে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/khetey-prantorey/
|
383
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
পিছু-ডাক
|
প্রেমমূলক
|
সখি! নতুন ঘরে গিয়ে আমায় প’ড়বে কি আর মনে?
সেথা তোমার নতুন পূজা নতুন আয়োজনে!
প্রথম দেখা তোমায় আমায়
যে গৃহ-ছায় যে আঙিনায়,
যেথায় প্রতি ধূলিকণায়,
লতাপাতার সনে
নিত্য চেনার বিত্ত রাজে চিত্ত-আরাধনে,
শূন্য সে ঘর শূন্য এখন কাঁদছে নিরজনে।।সেথা তুমি যখন ভুল্তে আমায়, আস্ত অনেক কেহ,
তখন আমার হ’য়ে অভিমানে কাঁদত যে ঐ গেহ।
যেদিক পানে চাইতে সেথা
বাজ্তে আমার স্মৃতির ব্যথা,
সে গ্লানি আজ ভুলবে হেথা
নতুন আলাপনে।
আমিই শুধু হারিয়ে গেলেম হারিয়ে-যাওয়ার বনে।।আমার এত দিনের দূর ছিল না সত্যিকারের দুর,
ওগো আমার সুদুর ক’রত নিকট ঐ পুরাতন পুর।
এখন তোমার নতুন বাঁধন
নতুন হাসি, নতুন কাঁদন,
নতুন সাধন, গানের মাতন
নতুন আবাহনে।
আমারই সুর হারিয়ে গেল সুদুর পুরাতন।।সখি! আমার আশাই দুরাশা আজ, তোমার বিধির বর,
আজ মোর সমাধির বুকে তোমার উঠবে বাসর-ঘর!
শূণ্য ভ’রে শুনতে পেনু
ধেনু-চরা বনের বেণু-
হারিয়ে গেনু হারিয়ে গেনু
অন–দিগঙ্গনে।
বিদায় সখি, খেলা-শেষ এই বেলা-শেষের খনে!
এখন তুমি নতুন মানুষ নতুন গৃহকোণে।।
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/pichhu-daak/
|
2856
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কঠিন লোহা কঠিন ঘুমে
|
চিন্তামূলক
|
কঠিন লোহা কঠিন ঘুমে ছিল অচেতন, ও তার ঘুম ভাঙাইনু রে।
লক্ষ যুগের অন্ধকারে ছিল সঙ্গোপন, ওগো, তায় জাগাইনু রে॥
পোষ মেনেছে হাতের তলে যা বলাই সে তেমনি বলে--
দীর্ঘ দিনের মৌন তাহার আজ ভাগাইনু রে॥
অচল ছিল, সচল হয়ে ছুটেছে ওই জগৎ-জয়ে--
নির্ভয়ে আজ দুই হাতে তার রাশ বাগাইনু রে॥(রচনাকাল: 1911)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kothin-loha-kothin-ghume/
|
762
|
জয় গোস্বামী
|
হে অশ্ব, তোমার মুণ্ড
|
রূপক
|
হে অশ্ব, তোমার মুণ্ড
টেবিলে স্থাপিত। রাত্রিবেলা
হাঁ করা মুখ থেকে
ধোঁয়া ঝরে
আর সে-ধোঁয়ার মধ্যে চতুষ্পদ কবন্ধ তোমার
সারারাট ছুটোছুটি করে!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1773
|
3689
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মনে ভাবিতেছি যেন অসংখ্য ভাষার শব্দরাজি
|
চিন্তামূলক
|
মনে ভাবিতেছি, যেন অসংখ্য ভাষার শব্দরাজি
ছাড়া পেল আজি,
দীর্ঘকাল ব্যাকরণদুর্গে বন্দী রহি
অকস্মাৎ সারি সারি কুচকাওয়াজের পদক্ষেপে
উঠেছে অধীর হয়ে খেপে।
লঙ্ঘিয়াছে বাক্যের শাসন,
নিয়েছে অবুদ্ধিলোকে অবদ্ধ ভাষণ,
ছিন্ন করি অর্থের শৃঙ্খলপাশ
সাধুসাহিত্যের প্রতি ব্যঙ্গহাস্যে হানে পরিহাসল
সব ছেড়ে অধিকার করে শুধু শ্রুতি —
বিচিত্র তাদের ভঙ্গি, বিচিত্র আকূতি।
বলে তারা, আমরা যে এই ধরণীর
নিশ্বসিত পবনের আদিম ধ্বনির
জন্মেছি সন্তান,
যখনি মানবকন্ঠে মনোহীন প্রাণ
নাড়ীর দোলায় সদ্য জেগেছে নাচিয়া
উঠেছি বাঁচিয়া।
শিশুকন্ঠে আদিকাব্যে এনেছি উচ্ছলি
অস্তিত্বের প্রথম কাকলি।
গিরিশিরে যে পাগল-ঝোরা
শ্রাবণের দূত, তারি আত্মীয় আমরা
আসিয়াছি লোকালয়ে
সৃষ্টির ধ্বনির মন্ত্র লয়ে।
মর্মরমুখর বেগে
যে ধ্বনির কলোৎসব অরণ্যের পল্লবে পল্লবে,
যে ধ্বনি দিগন্তে করে ঝড়ের ছন্দের পরিমাপ,
নিশান্তের জাগায় যাহা প্রভাতের প্রকান্ড প্রলাপ,
সে ধ্বনির ক্ষেত্র হতে হরিয়া করেছে পদানত
বন্য ঘোটকের মতো
মানুষ শব্দেরে তার জটিল নিয়মসূত্রজালে
বার্তাবহনের লাগি অনাগত দূর দেশে কালে।
বল্গাবদ্ধ-শব্দ-অশ্বে চড়ি
মানুষ করেছে দ্রুত কালের মন্থর যত ঘড়ি।
জড়ের অচল বাধা তর্কবেগে করিয়া হরণ
অদৃশ্য রহস্যলোকে গহনে করেছে সঞ্চরণ,
ব্যূহে বঁধি শব্দ-অক্ষৌহিণী
প্রতি ক্ষণে মূঢ়তার আক্রমণ লইতেছি জিনি।
কখনো চোরের মতো পশে ওরা স্বপ্নরাজ্যতলে,
ঘুমের ভাটার জলে
নাহি পায় বাধা —
যাহা-তাহা নিয়ে আসে, ছন্দের বাঁধনে পড়ে বাঁধা,
তাই দিয়ে বুদ্ধি অন্যমনা
করে সেই শিল্পের রচনা
সূত্র যার অসংলগ্ন স্খলিত শিথিল,
বিধির সৃষ্টির সাথে নারাখে একান্ত তার মিল;
যেমন মাতিয়া উঠে দশ-বিশ কুকুরের ছানা —
এ ওর ঘাড়েতে চড়ে, কোনো উদ্দ্যেশ্যের নাই মানা,
কে কাহারে লাগায় কামড়,
জাগায় ভীষণ শব্দে গর্জনের ঝড়,
সে কামড়ে সে গর্জনে কোনো অর্থ নাই হিংস্রতার,
উদ্দাম হইয়া উঠে শুধু ধ্নি শুধু ভঙ্গি তার।
মনে মনে দেখিতেছি, সারা বেলা ধরি
দলে দলে শব্দ ছোটে অর্থ ছিন্ন করি —
আকাশে আকাশে যেন বাজে,
আগ্ডুম বাগ্ডুম ঘোড়াডুম সাজে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mana-bavitase-jan-asakh-basar-shabdaraji/
|
3019
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ঘরের খেয়া
|
ছড়া
|
সন্ধ্যা হয়ে আসে;
সোনা-মিশোল ধূসর আলো ঘিরল চারিপাশে।নৌকোখানা বাঁধা আমার মধ্যিখানের গাঙে
অস্তরবির কাছে নয়ন কী যেন ধন মাঙে।
আপন গাঁয়ে কুটীর আমার দূরের পটে লেখা,
ঝাপসা আভায় যাচ্ছে দেখা বেগনি রঙের রেখা।
যাব কোথায় কিনারা তার নাই,
পশ্চিমেতে মেঘের গায়ে একটু আভাস পাই।
হাঁসের দলে উড়ে চলে হিমালয়ের পানে,
পাখা তাদের চিহ্নবিহীন পথের খবর জানে।
শ্রাবণ গেল, ভাদ্র গেল, শেষ হল জল-ঢালা,
আকাশতলে শুরু হল শুভ্র আলোর পালা।
খেতের পরে খেত একাকার প্লাবনে রয় ডুবে,
লাগল জলের দোলযাত্রা পশ্চিমে আর পুবে।
আসন্ন এই আঁধার মুখে নৌকোখানি বেয়ে
যায় কারা ঐ, শুধাই, "ওগো নেয়ে,
চলেছ কোন্খানে।"
যেতে যেতে জবাব দিল, "যাব গাঁয়ের পানে।"
অচিন শূন্যে ওড়া পাখি চেনে আপন নীড়,
জানে বিজনমধ্যে কোথায় আপন জনের ভিড়।
অসীম আকাশ মিলেছে ওর বাসার সীমানাতে,
ঐ অজানা জড়িয়ে আছে জানাশোনার সাথে|
তেমনি ওরা ঘরের পথিক ঘরের দিকে চলে
যেথায় ওদের তুলসিতলায় সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলে। দাঁড়ের শব্দ ক্ষীণ হয়ে যায় ধীরে,
মিলায় সুদূর নীরে।
সেদিন দিনের অবসানে সজল মেঘের ছায়ে
আমার চলার ঠিকানা নাই, ওরা চলল গাঁয়ে।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/garar-khaya/
|
3716
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মানসলোক
|
সনেট
|
মানসকৈলাসশৃঙ্গে নির্জন ভুবনে
ছিলে তুমি মহেশের মন্দিরপ্রাঙ্গণে
তাঁহার আপন কবি, কবি কালিদাস।
নীলকণ্ঠদ্যুতিসম স্নিগ্ধনীলভাস
চিরস্থির আষাঢ়ের ঘনমেঘদলে,
জ্যোতির্ময় সপ্তর্ষির তপোলোকতলে।
আজিও মানসধামে করিছ বসতি;
চিরদিন রবে সেথা, ওহে কবিপতি,
শংকরচরিত গানে ভরিয়া ভুবন।—
মাঝে হতে উজ্জয়িনী-রাজনিকেতন,
নৃপতি বিক্রমাদিত্য, নবরত্নসভা,
কোথা হতে দেখা দিল স্বপ্ন ক্ষণপ্রভা।
সে স্বপ্ন মিলায়ে গেল, সে বিপুলচ্ছবি,
রহিলে মানসলোকে তুমি চিরকবি। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/manoslok/
|
4902
|
শামসুর রাহমান
|
নেকড়ের পালে একজন
|
চিন্তামূলক
|
অত্যস্ত নিঃসঙ্গ, নগ্ন; কম্পমান, কবচকুণ্ডল
হারিয়ে ফেলবে নাকি, দেখছে সে দন্ত-নখরের
অব্যাহত আঘাতে নিজের শরীরের খন্ডগুলি
এখানে সেখানে, দরদর রক্তপাত। শক্ত হাতে
মাটি আঁকড়ে রোখে ক্রমাগত হিংস্রতার স্বেচ্ছাচার,
দাঁড়বার জায়গা খোঁজে, উদ্ভাসিত নতুন স্ট্বাটেজি
অকস্মাৎ; নেকড়ের পাল যত পারে লাফ ঝাঁপ
দিক, দাঁত ভেঙে যাবে, চুর্ণ হবে সকল নখর।নশ্বরতা চোখে নিয়ে বর্মহীন কোথায় সে যায়
ক্লান্ত নয়; যন্ত্রণা কর্পূর, একরত্তি ভয় নেই
বুকে, শুধু একটি চিবুক, ছলছলে দু’টি চোখ
ধ্যান ক’রে পথ চলে। দ্যাখে ধুলি ওড়ে, ইতস্তত
ছাগ-খুরে নাচে কত প্রতিভাবানের খুলি আর
সে প্রত্যহ বৈঠা বায় খরশান গহন নদীতে। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nekrer-pale-ekjon/
|
4161
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
যে জন আসে নির্জনে
|
প্রেমমূলক
|
যে জন আসে নির্জনে
নিরবে কাছে টানে,
নিরবে ভালোবেসে আবার
নিরবেই যায় চলে।
সে জনের কথা
কে বা ভুলতে পারে?
কে বা থাকতে পারে
কাছে থকে দূরে
দূর থেকে সমুদ্দুরে?
পারিনি তোমার থেকে
দূরে সরে যেতে।
আজো আছি আমি
নির্জনে নিভৃতে
তোমার হৃদয়ের অতল তলে
ভালোবেসে কাছে টেনে
সমুদ্দুর থেকে আমার
অশ্রুভেজা চোখের জলে।
|
http://kobita.banglakosh.com/archives/2143.html
|
1403
|
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
|
অভিমানী দূরের স্টেশনে
|
প্রেমমূলক
|
পড়ে আছো দূরের স্টেশনে
ভয়ঙ্কর অভিমান বুকে
কাছেপিঠে কৃষ্ণচূড়া নেই
কত বেশি প্রিয় ছিলো তোমার দু’চোখে !
স্টেশনের পুবে নীল ডোবা
রাশি রাশি জলফল রোদ্দুরে উন্মুখ
দুলে উঠতো ফ্রকের হাওয়ায়।
ঠিক সাড়ে দশটা বেজে গেলে
হুইসেল বাজিয়ে গ্রিনএরো
ছুটে যেতো দক্ষিণ দিগন্তে ।
রোদে ভিজে যেতে যেতে শৈশবের স্কুলে
বড় বড় চোখ মেলে দেখতে তুমি
ফুলেদের মাতামাতি
সে ডোবা অদৃশ্য আজ
আছে মাটি প্রস্তরের ফুল ।
কিছুই তো অবশিষ্ট নেই
বড় বড় চোখ দুটি ছাড়া
পেছনে তাকালে মনে পড়ে
মানুষের নির্মমতা স্বপ্নের সমাধি ।
এখনো কি হোস্টেলের উঠোনে শীতের রোদ
পিঠে নিয়ে আড্ডা দেয় পাঁচ জন তরুণী
এখনো কি মহিলা কলেজে আসে ঘুরে ঘুরে শুক্রবার
অপরাহ্ণ দুলে ওঠে ভুল প্রেমিকের স্পর্শে
সিলেটের পাহাড়ি সড়কে ।
পড়ে আছো দূরেরে স্টেশনে
কখন ঘনাবে রাত চাপচাপ অন্ধকার
তার প্রতীক্ষায় ।
গোধূলির বিমর্ষ আলোয়
অবাধ্য শিশুটি খুব ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে
রেশমি চুলে ঝরে পড়ে
বাতাসের হিম সম্ভাষণ ।
মনে পড়ে কত রাত জেগে থাকতে ঘুমচোখে
পিতার পায়ের প্রিয় শব্দের আশায়
মাথায় ঝুলিয়ে লাল আলো
মেলট্রেন থামতো এসে পাহাড়ি স্টেশনে
একটি কিশোরীর খুব প্রিয় স্বপ্ন সুটকেসে ঢুকিয়ে
জোসনাময় পথ তিনি পেরুতেন
বুকে নিয়ে অপার বাৎসল্য ।
উঠোনে পৌষের চাঁদ
বারান্দায় বাগানবিলাস
আশ্চর্য গহিন কণ্ঠ ডেকে উঠতো
তাহেরা তাহেরা
তার বড় আদরের কনিষ্ঠ মেয়েটি
জেগে উঠে খুলে দিতো রাত্রির দরোজা
আজ সেই পিতা নেই
মমতামাখানো বুকে নিবিড় আশ্রয় চলে গেছে
কোন দূরলোকে
আজ তুমি দাঁড়াবে কোথায় ?
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1049
|
2967
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
খেলা
|
ছড়া
|
এই জগতের শক্ত মনিব সয় না একটু ত্রুটি,
যেমন নিত্য কাজের পালা তেমনি নিত্য ছুটি।
বাতাসে তার ছেলেখেলা, আকাশে তার হাসি,
সাগর জুড়ে গদ্গদ ভাষ বুদ্বুদে যায় ভাসি।
ঝরনা ছোটে দূরের ডাকে পাথরগুলো ঠেলে--
কাজের সঙ্গে নাচের খেয়াল কোথার থেকে পেলে।
ঐ হোথা শাল, পাঁচশো বছর মজ্জাতে ওর ঢাকা--
গম্ভীরতায় অটল যেমন, চঞ্চলতায় পাকা।
মজ্জাতে ওর কঠোর শক্তি, বকুনি ওর পাতায়--
ঝড়ের দিনে কী পাগলামি চাপে যে ওর মাথায়।
ফুলের দিনে গন্ধের ভোজ অবাধ সারাক্ষণ,
ডালে ডালে দখিন হাওয়ার বাঁধা নিমন্ত্রণ।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khala/
|
5202
|
শামসুর রাহমান
|
লোকটা বুড়োই বটে
|
সনেট
|
লোকটা বুড়োই বটে, অতিশয় স্মৃতিভারাতুর।
স্মৃতিমোহে সে একাকী সন্ধ্যায় কবরে দীপ জ্বালে
কোনো কোনো দিন খামখেয়ালের আঁকাবাঁকা খালে
প্রায়শ ভ্রমণ করে কাটে তার বেলা। মদে চুর
(খাঁটি দেশী) প্রতিরাতে, ক্লান্ত মনে তার দেয় হানা
বোমারু বিমান ঝাঁক ঝাঁক, দ্যাখে গ্রামে কি শহরে
লোক মরে লক্ষ লক্ষ, ইউরোপ আর্তনাদ করে
চকচকে হিটলারী বটের তলায়। লাশটানাগাড়ি খুব এঁটেল কাঁদায় ডুবে যায়। কানে আসে
বন্ধ গ্যাস ঘরে দগ্ধ মানুষের বিকট চিৎকার।
শোনে সে এখনো মরু শেয়ালের হাঁক, পোড়া ঘাসে
বুট ঘষে জেনারেল। ট্যাঙ্ক চলে, ক্ষেত ছারখার।
লোকটা বুড়োই বটে, তবু আজ স্বপ্ন দ্যাখে, সুখে
সে ঘুমায় একা জলপাই বনে তরুণীর বুকে। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/lokta-buroi-bote/
|
1933
|
ফয়জুল আলম পাপপু
|
বোধ
|
প্রেমমূলক
|
তুমি তো জল-ছবি নও,তবে-মৃদু বাতাসেই কেন এলামেলো হও?
|
https://banglapoems.wordpress.com/2008/05/18/%e0%a6%ac%e0%a7%8b%e0%a6%a7-%e0%a6%ab%e0%a7%9f%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%b2-%e0%a6%86%e0%a6%b2%e0%a6%ae-%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%aa%e0%a7%81/
|
4951
|
শামসুর রাহমান
|
প্রতিদ্বন্দ্বী
|
মানবতাবাদী
|
এই যে প্রায়শ রাত্রির ঘুম মাটি করে বসে
কবিতা লেখার সাধনা করছি টেবিলে ঝুঁকে,
পরিণামে তার কী ফল জুটবে ভাবি মাঝে মাঝে;
তবে শেষ তক ভুলে গিয়ে সব সৃষ্টির মোহে বন্দি থাকি।অনেক খাতার শূন্য পাতায় শব্দ-মিছিল
সাজিয়ে চলেছি বহুকাল ধরে। মাথার কালো
চুল সবগুলো শুভ্র হয়েছে অনেক আগেই। এখন ফেরার
পথ খোলা নেই, পথে যত কাঁটা থাকুক, তবুও এগোতে হবে।আমার শরীরে দগদগে ক্ষত হয়েছে অনেক,
হঠাৎ কখনও হিংস্র ঈগল হামলা করে।
শরীরের তিন টুকরো মাংস ঈগলের ঠোঁটে
ঝুলতে ঝুলতে কখন কোথায় পড়ে যায় দূরে, পাই না টের।
ঈগল আমাকে নিয়েছে কি ভেবে আসমানচারী
জাঁহাবাজ আর হিংসুটে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী?
নইলে কেন সে ডানা ঝাপ্টিয়ে আসছে আমার
দিকে পুনরায়? জানে নাকি পাখি সকল ক্ষেত্রে ব্যর্থ আমি? (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/protidondi/
|
2961
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
খড়দয়ে যেতে যদি সোজা এস খুল্না
|
ছড়া
|
খড়দয়ে যেতে যদি সোজা এস খুল্না
যত কেন রাগ কর, কে বলে তা ভুল না।
মালা গাঁথা পণ ক’রে আন যদি আমড়া,
রাগ করে বেত মেরে ফাটাও-না চামড়া,
তবুও বলতে হবে– ও জিনিস ফুল না।
বেঞ্চিতে বসে তুমি বল যদি “দোল দাও’,
চটে-মটে শেষে যদি কড়া কড়া বোল দাও,
পষ্ট বুঝিয়ে দেব– ওটা নয় ঝুল্না।
যদি বা মাথার গোলে ঘরে এসে বসবার
হাঁটুতে বুরুষ করো একমনে দশবার,
কী করি, বলতে হবে– ওখানে তো চুল না। (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khordoye-jete-soja-eso-khulna/
|
4828
|
শামসুর রাহমান
|
দাঁড়াও
|
রূপক
|
দাঁড়াও এখনই তাকে সাজানো মঞ্চের মাঝখান
থেকে দূরে সরিয়ে দিও না। আরো কিছুকাল তার
পার্ট বলে যেতে দাও। খানিক থমকে যাওয়া মানে
বেবাক বিস্মৃতি নয়, যদি তুমি লোভী বেড়ালের
মতো এরকম ঘুর ঘুর করো সারাক্ষণ, তবে
কীভাবে সে সামলে সুমলে নিয়ে আবার বাগানে
যাবে স্মিত ভোরবেলা, চারা গাছটাকে মমতায়
ঈষৎ নাড়িয়ে দেবে? দেখে নেবে রাঙা পাখিটাকে
এক ফাঁকে? এখনো কাপড়ে তার গোলাপ তোলার
কিছু কাজ বাকি, নাতনির সঙ্গে খেলবার
সাধ নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে। দূরে স’রে
দাঁড়াও, ফেলো না তার বুকে মুখে শীতল নিঃশ্বাস। (হরিণের হাড় কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/darao/
|
5177
|
শামসুর রাহমান
|
রক্ষাকবচ
|
সনেট
|
এতদিনে জেনে গেছি সুসময় ভীষণ অস্থির।
এখন তো বারংবার শবযাত্রা, কবরখানায়
একা একা ব’সে থাকা মৃত্যুগন্ধময় নিরালায়;
এখন পাবো না আর একটিও মুহূর্ত স্বস্তির।
ক্রূর অন্ধকারে আছি তুমিহীন অত্যন্ত একেলা।
কর্কশ গজায় দাড়ি, নখ বড়ো বেশি বেড়ে যায়,
গেন্থেও অমনোযোগী, প্রিয় বন্ধুবর্গের ডেরায়
প্রায়শ অনুপস্থিত আমি, দেখি মকরের খেলা।এ-খেলায় ছিন্নভিন্ন হতে থাকি সকল সময়।
থামের আড়ালেও শক্রু চতুষ্পার্শ্বে জন্মান্ধ জল্লাদ,
কী করে বাঁচবো তবে? বেদনার্ত আমার হৃদয়।
জন্তুর বিষাক্ত দাঁতে বিদ্ধ, তবু হবো না উন্মাদ;
এখনো তো জীবনের প্রতি আমি কী দীপ্র উৎসুক,
সহায় তোমার স্মৃতি, ভোরস্মিত কবিতার মুখ। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/rokkhakoboch/
|
3241
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
দুরন্ত আশা
|
ব্যঙ্গাত্মক
|
মর্মে যবে মত্ত আশা
সর্পসম ফোঁষে
অদৃষ্টের বন্ধনেতে
দাপিয়া বৃথা রোষে
তখনো ভালোমানুষ সেজে
বাঁধানো হুঁকা যতনে মেজে
মলিন তাস সজোরে ভেঁজে
খেলিতে হবে কষে!
অন্নপায়ী বঙ্গবাসী
স্তন্যপায়ী জীব
জন-দশেকে জটলা করি
তক্তপোষে ব’সে।
ভদ্র মোরা, শান্ত বড়ো,
পোষ-মানা এ প্রাণ
বোতাম-আঁটা জামার নীচে
শান্তিতে শয়ান।
দেখা হলেই মিষ্ট অতি
মুখের ভাব শিষ্ট অতি,
অসল দেহ ক্লিষ্টগতি–
গৃহের প্রতি টান।
তৈল-ঢালা স্নিগ্ধ তনু
নিদ্রারসে ভরা,
মাথায় ছোটো বহরে বড়ো
বাঙালি সন্তান।
ইহার চেয়ে হতেম যদি
আরব বেদুয়িন!
চরণতলে বিশাল মরু
দিগন্তে বিলীন।
ছুটেছে ঘোড়া, উড়েছে বালি,
জীবনস্রোত আকাশে ঢালি
হৃদয়তলে বহ্নি জ্বালি
চলেছি নিশিদিন।
বর্শা হাতে, ভর্সা প্রাণে,
সদাই নিরুদ্দেশ
মরুর ঝড় যেমন বহে
সকল বাধাহীন।
বিপদ-মাঝে ঝাঁপায়ে প’ড়ে
শোণিত উঠে ফুটে,
সকল দেহে সকল মনে
জীবন জেগে উঠে–
অন্ধকারে সূর্যালোতে
সন্তরিয়া মৃত্যুস্রোতে
নৃত্যময় চিত্ত হতে
মত্ত হাসি টুটে।
বিশ্বমাঝে মহান যাহা
সঙ্গী পরানের,
ঝঞ্ঝামাঝে ধায় সে প্রাণ
সিন্ধুমাঝে লুটে।
নিমেষতরে ইচ্ছা করে
বিকট উল্লাসে
সকল টুটে যাইতে ছুটে
জীবন-উচ্ছ্বাসে–
শূন্য ব্যোম অপরিমাণ
মদ্যসম করিতে পান
মুক্ত করি রুদ্ধ প্রাণ
ঊর্ধ্ব নীলাকাশে।
থাকিতে নারি ক্ষুদ্র কোণে
আম্রবনছায়ে
সুপ্ত হয়ে লুপ্ত হয়ে
গুপ্ত গৃহবাসে।
বেহালাখানা বাঁকায়ে ধরি
বাজাও ওকি সুর–
তবলা-বাঁয়া কোলেতে টেনে
বাদ্যে ভরপুর!
কাগজ নেড়ে উচ্চ স্বরে
পোলিটিকাল তর্ক করে,
জানলা দিয়ে পশিছে ঘরে
বাতাস ঝুরুঝুর।
পানের বাটা, ফুলের মালা,
তবলা-বাঁয়া দুটো,
দম্ভ-ভরা কাগজগুলো
করিয়া দাও দূর!
কিসের এত অহংকার!
দম্ভ নাহি সাজে–
বরং থাকো মৌন হয়ে
সসংকোচ লাজে।
অত্যাচারে মত্ত-পারা
কভু কি হও আত্মহারা?
তপ্ত হয়ে রক্তধারা
ফুটে কি দেহমাঝে?
অহর্নিশি হেলার হাসি
তীব্র অপমান
মর্মতল বিদ্ধ করি
বজ্রসম বাজে?
দাস্যসুখে হাস্যমুখ,
বিনীত জোড়-কর,
প্রভুর পদে সোহাগ-মদে
দোদুল কলেবর!
পাদুকাতলে পড়িয়া লুটি
ঘৃণায় মাখা অন্ন খুঁটি
ব্যগ্র হয়ে ভরিয়া মুঠি
যেতেছ ফিরি ঘর।
ঘরেতে ব’সে গর্ব কর
পূর্বপুরুষের,
আর্যতেজ-দর্প-ভরে
পৃথ্বী থরথর।
হেলায়ে মাথা, দাঁতের আগে
মিষ্ট হাসি টানি
বলিতে আমি পারিব না তো
ভদ্রতার বাণী।
উচ্ছ্বসিত রক্ত আসি
বক্ষতল ফেলিছে গ্রাসি,
প্রকাশহীন চিন্তারাশি
করিছে হানাহানি।
কোথাও যদি ছুটিতে পাই
বাঁচিয়া যাই তবে–
ভব্যতার গণ্ডিমাঝে
শান্তি নাহি মানি।
|
https://banglapoems.wordpress.com/2011/11/30/%e0%a6%a6%e0%a7%81%e0%a6%b0%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4-%e0%a6%86%e0%a6%b6%e0%a6%be/
|
3956
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
সিন্ধুগর্ভ
|
সনেট
|
উপরে স্রোতের ভরে ভাসে চরাচর
নীল সমুদ্রের’পরে নৃত্য ক’রে সারা ।
কোথা হতে ঝরে যেন অনন্ত নির্ঝর ,
ঝরে আলোকের কণা রবি শশী তারা ।
ঝরে প্রাণ , ঝরে গান , ঝরে প্রেমধারা —
পূর্ণ করিবারে চায় আকাশ সাগর ।
সহসা কে ডুবে যায় জলবিম্বপারা —
দু – একটি আলো – রেখা যায় মিলাইয়া ,
তখন ভাবিতে বসি কোথায় কিনারা —
কোন্ অতলের পানে ধাই তলাইয়া !
নিম্নে জাগে সিন্ধুগর্ভ স্তব্ধ অন্ধকার ।
কোথা নিবে যায় আলো , থেমে যায় গীত —
কোথা চিরদিন তরে অসীম আড়াল !
কোথায় ডুবিয়া গেছে অনন্ত অতীত ! (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sindhugorvo/
|
5573
|
সুকুমার রায়
|
আবোল তাবোল - ৩
|
ছড়া
|
এক যে ছিল রাজা- (থুড়ি,
রাজা নয় সে ডাইনি বুড়ি) !
তার যে ছিল ময়ূর- (না না,
ময়ূর কিসের ? ছাগল ছানা) ।
উঠানে তার থাক্ত পোঁতা-
-(বাড়িই নেই, তার উঠান কোথা) ?
শুনেছি তার পিশতুতো ভাই-
-(ভাই নয়ত, মামা-গোঁসাই ) ।
বল্ত সে তার শিষ্যটিরে-
-(জন্ম-বোবা বলবে কিরে) ।
যা হোক, তারা তিনটি প্রানী-
-(পাঁচটি তারা, সবাই জানি !)
থও না বাপু খ্যাঁচাখেচি
-(আচ্ছা বল, চুপ করেছি) ।।
তারপরে যেই সন্ধ্যাবেলা,
যেম্নি না তার ওষুধ গেলা,
অম্নি তেড়ে জটায় ধরা-
-(কোথায় জটা ? টাক যে ভরা !)
হোক্ না টেকো তোর তাতে কি ?
গোমরামুখো মুখ্যু ঢেঁকি !
ধরব ঠেসে টুটির পরে
পিট্ব তোমার মুণ্ডু ধরে ।
এখন বাপু পালাও কোথা ?
গল্প বলা সহজ কথা ?
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/abol-tabol-3/
|
59
|
আবিদ আনোয়ার
|
অ্যাকুরিয়াম
|
রূপক
|
জলেই থাকি কিন্তু তবু মাছের থেকে দূরে
ঘর বেঁধেছি স্বচ্ছ বালি, জলজ ক্যাকটাসে;
রুই-কাতল ও টাকির মেকি ফেনানো বুদ্বুদে
মন মজেনি, ঘুচাতে চাই মীনের পরিচয়।আমার ঘরে নৈশব্দ্যও শব্দ থেকে দামী:
ফ্রাই উপমা, সিদ্ধ ধ্বনি, কল্পনা চচ্চরি,
প্রতীক-পরাস্বপ্নে চলে অলীক খাওয়া-দাওয়া;
যুগান্তরের পোশাক প’রে ঢুকছে যুগের হাওয়া!আমার ঘরে আসলে তুমি পেরিয়ে কাচের বাধা
দেখতে পাবে তেজস্ক্রিয় শাশ্বত এক নুড়ি,
সান্দ্র আলোর ফিনকি দিয়ে সত্য করে ফেরি,
একটু ছুঁ’লেই ছলকে ওঠে সমুদ্র-কল্লোলও।যুগের তালে কানকো নাড়ে তিন-পাখার এক মাছ
পটভূমি স্বচ্ছ বালি, জলজ ক্যাকটাস...
|
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/aquarium/
|
77
|
আবিদ আনোয়ার
|
ডুবে যেতে যেতে
|
চিন্তামূলক
|
জলমগ্ন বাঙলাদেশ: নাকি এক ল্যাগব্যাগে তরল ড্রাগন
হিমালয় থেকে নেমে গিলেছে শস্যের মাঠ, বন-উপবন;
নিঝুম দ্বীপের মতো ভাসমান শুধু কিছু ক্লিন্ন লোকালয়
তাকেও জুজুর মতো লেলিহান জিহ্বা নেড়ে সে দেখায় ভয়,
তবুও জীবনছন্দে মুখরিত ব্যস্ত জনপদ
উজিয়ে সকল বাধা, পায়ে-পায়ে সমূহ বিপদ
যে-যার কর্তব্যে যায়; অজানা আতঙ্কে কাঁপে দুরু দুরু জননীর প্রাণ
কোমরে ঘুঙুর বেঁধে ছেড়ে দিয়ে হাঁটি-হাঁটি কোলের সন্তান:
শব্দ শুনে বুঝে নেয় নানা কাজে ব্যস্ত প্রিয়জন
কতদূর হেঁটে গেলো দুষ্টুমতি তাদের খোকন।
* * *
নুনুর কাছে ঘণ্টি নড়ে,
সাধ্যি কী যে খোকনসোনা খন্দে পড়ে!
ভুবন জুড়ে বাজছে যেন একটিই সুর, একটি শুধু গান,
ধ্যানীর মতো সারাটা বাড়ি শুনছে পেতে কান।
* * *
তাহলে কি উৎকন্ঠিত আমারও জননী কিংবা বুবু ও দাদীমা
এভাবেই এঁকে দিতো এ আমার গন্তব্যের সীমা?
* * *
হয়তো সে শব্দময় অস্তিত্বের সীমানা পেরিয়ে নিঃশব্দেই জানি না কখন প’ড়ে গেছি বিকট পাতালে; চারপাশে খানাখন্দ:
উপদংশ-কবলিত স্বৈরিণীর সুবর্ণ ব-দ্বীপে কাদা, আমাকে লোভায় তার সুগভীর ব্যক্তিগত খাড়ি; বিষম হা-করে থাকে পানপাত্র;
বন্ধুর বাড়িয়ে-দেয়া অমসৃণ বাঁকা করতল, দ্রাবিড়ীয় কিশোরীর গালে-পড়া টোল আর চটুল হাসিতে খুব ফেটে-পড়া প্রেমিকার
মুখের ব্যাদানকেও আজকাল বড় কোনো গর্ত মনে হয়--ক্রুর জল পাক খায় লাভার দাপটে; উন্মাতাল ঘূর্ণিজলে সুবোধ কুটোর
মতো ভাসি-ডুবি বিবিধ মুদ্রায়...চুমুকে চুমুকে ডুবি...চুমুতে চুমুতে; নগরীর নানাস্থানে বিপদ-সরণি, মেয়রের পেতে-রাখা
অ্যাশফল্টের চোরাবালি আমাকে ডোবায়।‘
আপদে ভরসা প্রাপ্তি’ এমন অভয়বাণী লেখেনি ঠিকুজি
অতল পাতালে তবু ডুবে যেতে যেতে প্রায়শ কী যেন খুঁজি;
পরাস্বপ্নে কেঁদে ওঠে আজও কিছু প্রত্যাশার ক্ষীয়মাণ রেশ.
ঘুঙুর বাজাবো বলে হাতড়ে ফিরি কোমরের বিভিন্ন প্রদেশ!
|
https://www.bangla-kobita.com/abid50anwar/in-the-proceess-of-drowning/
|
797
|
জসীম উদ্দীন
|
খানদান
|
মানবতাবাদী
|
ওধারের বেডে আসিল বালক, মটরের ধাক্কায়,
ক্ষতবিক্ষত, রক্তমাখান কচি তার দেহটায়।
চিৎকার করি কাঁদিত কেবল, আম্মাগো কোথা গেলে,
একেলা যে আমি থাকিতে পারি না তোমারে কাছে না পেলে?
কাঁচা মুখখানি মমতা জড়ানো, জননী স্নেহের ভরে,
যে-চুমায় তারে জাগায়েছে ভোরে আছে তা অধর ভরে।
ঘায়েতে তাহার ওষুধ মাখাতে, চীৎকারি কেঁদে ওঠে,
মায়ের আগেতে নালিশ জানায়, বোঝে না কিছুই মোটে।
আম্মাগো, তুই কোথা গেলি আজ, ওরা যে আমারে মারে,
ক্ষতবিক্ষত অঙ্গে আমার ব্যথা দেয় বারে বারে।
আমি বাড়ি যাব- আমি বাড়ি যাব, তোরে শুধু কাছে পেলে,
সব যন্ত্রণা জুড়াইবে মাগো তোর বুকে বুকে মেলে।
সারাদিন ভরি কতই সে কাঁদে, বড় ভাই তার আসে,
অশ্রুসিক্ত নয়নে বসিয়া রহে বিছানার পাশে।
ডাকিয়া সেদিন বলিলাম তারে, মায়েরে সঙ্গে করে,
আনেন না কেন? সারাদিন খোকা কাঁদে যে তাহার তরে।
ম্লান হাসি হেসে কহিল ভাইটি, আমরা যে খানদান,
আমাদের মেয়ে হেথায় আসিলে ভীষণ অসম্মান।
রাতের বেলায় সকল বেডের রোগীরা ঘুমায়ে পড়ে,
খোকাটি কেবল চীৎকারি কাঁদে মায়েরে তাহার স্মরে।
প্রহরের পর প্রহর চলেছে, আম্মাগো কাছে আয়,
এত ডাক ডাকি তবু না আসিস আমার যে জান যায়।
প্রহরের পর প্রহর চলেছে, আম্মাগো, মোর ঘুড়ি,
পূবের ঘরেতে রেখে দিস যেন কেউ নাহি করে চুরি।
মারবল আর পেন্সিল দুটো, কখানা টুকরো কাঁচ,
সাবধানে তুই রাখিস যেন না কেউ পায় তার আঁচ।
প্রহরের পর প্রহর চলেছে, আম্মাগো, কাছে আয়,
কে যেন আমারে ধরিতে আসিছে ভীষণ চেহারা হায়,
আম্মাগো কারা আমারে মারিছে। প্রহর চলেছে বেয়ে,
কাঁদিছে উতল রাতের পবন বড় যেন ব্যথা পেয়ে।
আমি দেখিতেছি বেঘুম শয়নে, সুদূর হেরেম কোণে,
জাগিছে জননী, নিশির প্রদীপ জাগিছে তাহার সনে।
জাগিছে জননী, রাত-জাগা পাখি, রহিয়া রহিয়া জাগে,
রাত কুসুমের উদাস গন্ধ চিরিতেছে বুকটাকে।
জাগিছে জননী, দুই হাতে যদি পারিত ছিড়িয়া দিতে,
ছেলে হতে তার কোন ব্যবধান রাখিত না ধরনীতে।
পরদা প্রথার যে মিথ্যা আজি দুলালের তার হায়,
এমনি করিয়া করেছে পৃথক ভাঙিত সে আজি তায়।
আহারে মায়ের দীরঘ নিশাস কোথায় নাহিক লাগে,
ঘুরিয়া ঘুরিয়া আপনারি বুকে আরও ব্যথা হয়ে দাগে।
ধীরে ধীরে দীপ নিবিয়া আসিল ম্লান হয়ে এল আলো,
নিবিড় নীরব নিথর পাথারে জড়ালো রাতের কালো।
সব অভিযোগ ব্যথাতুর সেই বালকের মুখ হতে,
ধীরে ধীরে ধীরে ভেসে গেল কোন মহানীরবতা স্রোতে।
কোথা সেই স্বর থামিল যাইয়া, বহু বহুযুগ আগে-
যারা মরিয়াছে কঠিন পীড়নে সমাজনীতির দাগে;
যারা সহিয়াছে সহস্র ব্যথা ভাষাহীন বেদনায়,
মূক বালকের বেদনা মিলিল সে মহা নীরবতায়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/784
|
2417
|
মাকিদ হায়দার
|
জুতা
|
স্বদেশমূলক
|
বাবা হরিপদ,
চিঠি পাইবামাত্র জুতা কিনিবা,
আমি জানি তোমার পদযুগলে কোন জুতা নাই
জুতা ছাড়া ঢাকা শহরে তুমি চলাফেরা
করিতেও পারিবেনা।
শুনিলাম জুতার দাম আগের মত নাই
আরো শুনিলাম ঢাকা শহরের
একদল লোক
সারা বছরই
রাস্তায়, খাল-খন্দক কাটিতে পছন্দ করে
তাই ভয় হয় তুমি যদি
সেই খানা-খন্দকে একবার পড়িয়া যাও
তোমাকে ডাঙ্গায় তুলিবার মতো লোকজন আজকাল
নাই বলিলেই চলে
তাই তোমাকে বলিতেছি তুমি দুই জোড়া জুতা কিনিবা।
একজোড়া তোমার জন্য
আরেক জোড়া মুক্তিযুদ্ধের নামে।
মুক্তিযুদ্ধ যেন সেই জুতা পায়ে দিয়া তোমার সাথেই
আমাদের দোহার পাড়ার বাড়ীতে একবার আসিয়া
বেড়াইয়া যায়।
ইতি
তোমার মা।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a7%9f%e0%a6%95-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%a6-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a7%9f%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b0/
|
3050
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
চুম্বন
|
সনেট
|
অধরের কানে যেন অধরের ভাষা,
দোঁহার হৃদয় যেন দোঁহে পান করে-
গৃহ ছেড়ে নিরুদ্দেশ দুটি ভালোবাসা
তীর্থযাত্রা করিয়াছে অধরসংগমে।
দুইটি তরঙ্গ উঠি প্রেমের নিয়মে
ভাঙিয়া মিলিয়া যায় দুইটি অধরে।
ব্যাকুল বাসনা দুটি চাহে পরস্পরে-
দেহের সীমায় আসি দুজনের দেখা।
প্রেম লিখিতেছে গান কোমল আখরে-
অধরেতে থরে থরে চুম্বনের খেলা।
দুখানি অধর হতে কুসুমচয়ম-
মালিকা গাঁথিবে বুঝি ফিরে গিয়ে ঘরে !
দুটি অধরের এই মধুর মিলন
দুইটি হাসির রাঙা বাসরশয়ন।
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chumbon/
|
4432
|
শামসুর রাহমান
|
উদ্ধার
|
মানবতাবাদী
|
কখনো বারান্দা থেকে চমত্কার ডাগর গোলাপ
দেখে, কখনো বা
ছায়ার প্রলেপ দেখে চৈত্রের দুপুরে
কিংবা দারুমূর্তি দেখে সিদ্ধার্থের শেল্ ফ-এর ওপর
মনে করতুম,
যুদ্ধের বিপক্ষে আমি, আজীবন বড়ো শান্তিপ্রিয় |
যখন আমার ছোট্ট মেয়ে
এই কোণে ব’সে
পুতুলকে সাজায় যতনে, হেসে ওঠে
ভালুকের নাচ দেখে, চালায় মোটর, রেলগাড়ি
ঘরময়, ভাবি,
যুদ্ধের বিপক্ষে আমি, আজীবন বড়ো শান্তিপ্রিয় |
যখন গৃহিণী সংসারের কাজ সেরে
অন্য সাজে রাত্রিবেলা পাশে এসে এলিয়ে পড়েন,
অতীতকে উসকে দেন কেমন মাধুর্যে
অরব বচনাতীত, ভাবি—–
যুদ্ধের বিপক্ষে আমি, আজীবন শান্তিপ্রিয় |
আজন্ম যুদ্ধকে করি ঘৃণা |
অস্ত্রের ঝনঝনা
ধমনীর রক্তের ধারায়
ধরায় নি নেশা কোনোদিন
যদিও ছিলেন পিতা সুদক্ষ শিকারী
নদীর কিনারে আর হাঁসময় বিলে,
মারিনি কখনো পাখি একটিও বাগিয়ে বন্দুক
নৌকোর গলুই থেকে অথবা দাঁড়িয়ে
একগলা জলে | বাস্তবিক
কস্মিনকালেও আমি ছুঁই নি কার্তুজ |গান্ধিবাদী নই, তবু হিংসাকে ডরাই
চিরদিন ; বাধলে লড়াই কোনোখানে
বিষাদে নিমগ্ন হই | আজন্ম যুদ্ধকে করি ঘৃণা |
মারী আর মন্বন্তর লোক শ্রুত ঘোড়সওয়ারের
মতোই যুদ্ধের অনুগামী | আবালবৃদ্ধবনিতা
মৃত্যুর কন্দরে পড়ে গড়িয়ে গড়িয়ে
অবিরাম | মূল্যবোধ নামক বৃক্ষের
প্রাচীন শিকড় যায় ছিঁড়ে, ধ্বংস
চতুর্দিকে বাজায় দুন্দুভি |
আজন্ম যুদ্ধকে করি ঘৃণা |বিষম দখলীকৃত এ ছিন্ন শহরে
পুত্রহীন বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিকে জিগ্যেস করুন,
সৈনিক ধর্সিতা তরুণীকে
জিগ্যেস করুন,
কান্নাক্লান্ত সদ্য-
বিধবাকে জিগ্যেস করুন,
যন্ত্রণাজর্জর ঐ বাণীহীন বিমর্ষ কবিকে
জিগ্যেস করুন,
বাঙালি শবের স্তূপ দেখে দেখে যিনি
বিড়বিড় করছেন সারাক্ষণ, কখনো হাসিতে
কখনো কান্নায় পড়েছেন ভেঙে—-তাকে
জিগ্যেস করুন,
দগ্ধ, স্তব্ধ পাড়ার নিঃসঙ্গ যে-ছেলেটা
বুলেটের ঝড়ে
জননীকে হারিয়ে সম্প্রতি খাপছাড়া
ঘোড়ে ইতস্তত, তাকে জিগ্যেস করুন,
হায়, শান্তিপ্রিয় ভদ্রজন,
এখন বলবে তারা সমস্বরে যুদ্ধই উদ্ধার |
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%89%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%bf-%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8/
|
786
|
জসীম উদ্দীন
|
কবর
|
শোকমূলক
|
এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে,
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।
এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,
পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।
এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা,
সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা।
সোনালী ঊষায় সোনামুখে তার আমার নয়ন ভরি,
লাঙ্গল লইয়া ক্ষেতে ছুটিতাম গাঁয়ের ও-পথ ধরি।
যাইবার কালে ফিরে ফিরে তারে দেখে লইতাম কত,
এ কথা লইয়া ভাবি-সাব মোর তামাশা করিত শত।
এমন করিয়া জানিনা কখন জীবনের সাথে মিশে,
ছোট-খাট তার হাসি-ব্যথা মাঝে হারা হয়ে গেনু দিশে।
বাপের বাড়িতে যাইবার কালে কহিত ধরিয়া পা,
আমারে দেখিতে যাইও কিন্তু উজান-তলীর গাঁ।
শাপলার হাটে তরমুজ বেচি দু পয়সা করি দেড়ী,
পুঁতির মালা এক ছড়া নিতে কখনও হতনা দেরি।
দেড় পয়সার তামাক এবং মাজন লইয়া গাঁটে,
সন্ধ্যাবেলায় ছুটে যাইতাম শ্বশুর বাড়ির বাটে !
হেস না–হেস না–শোন দাদু সেই তামাক মাজন পেয়ে,
দাদী যে তোমার কত খুশি হোত দেখিতিস যদি চেয়ে।
নথ নেড়ে নেড়ে কহিত হাসিয়া, ‘এতদিন পরে এলে,
পথপানে চেয়ে আমি যে হেথায় কেঁদে মরি আঁখি জলে।’
আমারে ছাড়িয়া এত ব্যথা যার কেমন করিয়া হায়,
কবর দেশেতে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝ্ঝুম নিরালায়।
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ্ দাদু, ‘আয় খোদা, দয়াময়,
আমার দাদীর তরেতে যেন গো ভেস্ত নাজেল হয়।’
তার পরে এই শুন্য জীবনে যত কাটিয়াছি পাড়ি,
যেখানে যাহারে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি।
শত কাফনের শত কবরের অঙ্ক হৃদয়ে আঁকি
গনিয়া গনিয়া ভুল করে গনি সারা দিনরাত জাগি।
এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে,
গাড়িয়া দিয়াছি কতসোনা মুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে।
মাটিরে আমি যে বড় ভালবাসি, মাটিতে লাগায়ে বুক,
আয় আয় দাদু, গলাগলি ধরে কেঁদে যদি হয় সুখ।
এইখানে তোর বাপ্জী ঘুমায়, এইখানে তোর মা,
কাঁদছিস তুই ? কি করিব দাদু, পরান যে মানে না !
সেই ফাল্গুনে বাপ তোর এসে কহিল আমারে ডাকি,
বা-জান, আমার শরীর আজিকে কি যে করে থাকি থাকি।
ঘরের মেঝেতে সপ্ টি বিছায়ে কহিলাম, বাছা শোও,
সেই শোওয়া তার শেষ শোওয়া হবে তাহা কি জানিত কেউ ?
গোরের কাফনে সাজায়ে তাহারে চলিলাম যবে বয়ে,
তুমি যে কহিলা–বা-জানেরে মোর কোথা যাও দাদু লয়ে?
তোমার কথার উত্তর দিতে কথা থেমে গেল মুখে,
সারা দুনিয়ার যত ভাষা আছে কেঁদে ফিরে গেল দুখে।
তোমার বাপের লাঙল-জোয়াল দু হাতে জড়ায়ে ধরি,
তোমার মায়ে যে কতই কাঁদিত সারা দিন-মান ভরি।
গাছের পাতারা সেই বেদনায় বুনো পথে যেত ঝরে,
ফাল্গুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো মাঠখানি ভরে।
পথ দিয়ে যেতে গেঁয়ো-পথিকেরা মুছিয়া যাইতো চোখ,
চরণে তাদের কাঁদিয়া উঠিত গাছের পাতার শোক।
আথালে দুইটি জোয়ান বলদ সারা মাঠ পানে চাহি,
হাম্বা রবেতে বুক ফাটাইত নয়নের জলে নাহি।
গলাটি তাদের জড়ায়ে ধরিয়া কাঁদিত তোমার মা,
চোখের জলের গহীন সায়রে ডুবায়ে সকল গাঁ।
উদাসিনী সেই পল্লীবালার নয়নের জল বুঝি,
কবর দেশের আন্ধার ঘরে পথ পেয়েছিল খুঁজি।
তাই জীবনের প্রথম বেলায় ডাকিয়া আনিল সাঁঝ,
হায় অভাগিনী আপনি পরিল মরণ-বীষের তাজ।
মরিবার কালে তোরে কাছে ডেকে কহিল, ‘বাছারে যাই,
বড় ব্যথা রল দুনিয়াতে তোর মা বলিতে কেহ নাই;
দুলাল আমার, দাদু রে আমার, লক্ষ্মী আমার ওরে,
কত ব্যথা মোর আমি জানি বাছা ছাড়িয়া যাইতে তোরে।’
ফোঁটায় ফোঁটায় দুইটি গণ্ড ভিজায়ে নয়ন-জলে,
কি জানি আশিস্ করি গেল তোরে মরণ-ব্যথার ছলে।
ক্ষণ পরে মোরে ডাকিয়া কহিল, ‘আমার কবর গায়,
স্বামীর মাথার ‘মাথাল’ খানিরে ঝুলাইয়া দিও বায়।’
সেই সে মাথাল পচিয়া গলিয়া মিশেছে মাটির সনে,
পরানের ব্যথা মরে না কো সে যে কেঁদে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে।
জোড়-মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এইখানে তরু-ছায়,
গাছের শাখারা স্নেহের মায়ায় লুটায়ে পড়েছে গায়ে।
জোনাকি মেয়েরা সারা রাত জাগি জ্বালাইয়া দেয় আলো,
ঝিঁঝিরা বাজায় ঘুমের নুপুর কত যেন বেসে ভাল।
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু,’রহমান খোদা, আয়,
ভেস্ত নাজেল করিও আজিকে আমার বাপ ও মায়ে।’
এইখানে তোর বু-জীর কবর, পরীর মতন মেয়ে,
বিয়ে দিয়েছিনু কাজীদের ঘরে বনিয়াদী ঘর পেয়ে।
এত আদরের বু-জীরে তাহারা ভালবাসিত না মোটে।
হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে।
খবরের পর খবর পাঠাত, ‘দাদু যেন কাল এসে,
দু দিনের তরে নিয়ে যায় মোরে বাপের বাড়ির দেশে।
শ্বশুর তাহার কসাই চামার, চাহে কি ছাড়িয়া দিতে,
অনেক কহিয়া সেবার তাহারে আনিলাম এক শীতে।
সেই সোনামুখ মলিন হয়েছে, ফোটে না সেথায় হাসি,
কালো দুটি চোখে রহিয়া রহিয়া অশ্রু উঠিত ভাসি।
বাপের মায়ের কবরে বসিয়া কাঁদিয়া কাটাত দিন,
কে জানিত হায়, তাহারও পরানে বাজিবে মরণ-বীণ!
কি জানি পচানো জ্বরেতে ধরিল আর উঠিল না ফিরে,
এইখানে তারে কবর দিয়াছি দেখে যাও দাদু ধীরে।
ব্যথাতুরা সেই হতভাগিনীরে বাসে নাই কেউ ভাল,
কবরে তাহার জড়ায়ে রয়েছে বুনো ঘাসগুলি কালো।
বনের ঘুঘুরা উহু উহু করি কেঁদে মরে রাতদিন,
পাতায় পাতায় কেঁপে ওঠে যেন তারি বেদনার বীণ।
হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু,’আয় খোদা দয়াময়!।
আমার বু-জীর তরেতে যেন গো ভেস্ত নাজেল হয়।’
হেথায় ঘুমায় তোর ছোট ফুপু সাত বছরের মেয়ে,
রামধনু বুঝি নেমে এসেছিল ভেস্তের দ্বার বেয়ে।
ছোট বয়সেই মায়েরে হারায়ে কি জানি ভাবিত সদা,
অতটুকু বুকে লুকাইয়াছিল কে জানিত কত ব্যথা।
ফুলের মতন মুখখানি তার দেখিতাম যবে চেয়ে,
তোমার দাদীর মুখখানি মোর হৃদয়ে উঠিত ছেয়ে।
বুকেতে তাহারে জড়ায়ে ধরিয়া কেঁদে হইতাম সারা,
রঙিন সাঁঝেরে ধুয়ে মুছে দিত মোদের চোখের ধারা।
একদিন গেনু গজ্নার হাটে তাহারে রাখিয়া ঘরে,
ফিরে এসে দেখি সোনার প্রতিমা লুটায় পথের পরে।
সেই সোনামুখ গোলগাল হাত সকলি তেমন আছে,
কি জেনি সাপের দংশন পেয়ে মা আমার চলে গ্যাছে।
আপন হসেতে সোনার প্রতিমা কবরে দিলাম গাড়ি–
দাদু ধর–ধর–বুক ফেটে যায়, আর বুঝি নাহি পারি।
এইখানে এই কবরের পাশে, আরও কাছে আয় দাদু,
কথা ক’সনাক, জাগিয়া উঠিবে ঘুম-ভোলা মোর যাদু।
আস্তে আস্তে খুড়ে দেখ্ দেখি কঠিন মাটির তলে,
দীন দুনিয়ার ভেস্ত আমার ঘুমায় কিসের ছলে।
ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিছে ঘন আবিরের রাগে,
এমনি করিয়া লুটায়ে পড়িতে বড় সাধ আজ জাগে।
মজীদ হইছে আজান হাঁকিছে বড় সকরুণ সুর,
মোর জীবনের রোজকেয়ামত ভাবিতেছি কত দুর!
জোড়হাতে দাদু মোনাজাত কর্, ‘আয় খোদা, রহমান,
ভেস্ত নাজেল করিও সকল মৃত্যু-ব্যথিত প্রাণ!’
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/763
|
5773
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
ছায়ার জন্য
|
ভক্তিমূলক
|
গাছের ছায়ায় বসে বহুদিন, কাটিয়েছি
কোনোদিন ধন্যবাদ দিইনি বৃক্ষকে
এখন একটা কোনো প্রতিনিধি বৃক্ষ চাই
যাঁর কাছে সব কৃতজ্ঞতা
সমীপেষু করা যায়।
ভেবেছি অরণ্যে যাব-সমগ্র সমাজ থেকে প্রতিভূ বৃক্ষকে খুঁজে নিতে
সেখানে সমস্তক্ষণ ছায়া
সেখানে ছায়ার জন্য কৃতজ্ঞতা নেই
সেখানে রক্তিম আলো নির্জনতা ভেদ করে খুঁজে নেয় পথ
মুহূর্তে আড়াল থেকে ছুঠে আসে কপিশ হিংস্রতা
গাঢ় অন্ধকার হলে আমি অসতর্ক অসহায়
জানু পেতে বসে বলবো
বহুদিন ছায়ায় কেটেছে এ জীবন-
হে ছায়া, আমারই হাতে তোমার ধ্বংসের মন্ত্র
বুকের ভিতরে ছিল শ্বাস- তার পরিক্রমা ঘূর্ণি দুনিয়ায়
ভূতলে অশুভ শব্দ, আঁচের মতন লাগে পাতার বীজন-
তবু শেষবার
পুরোনো কালের মতো বন্ধু বলে ডাকো
বল্কল বসন দাও, দাও রসসিক্ত ফল, দ্ধিধাহীন হয়ে একটু শুয়ে থাকি
শেষ প্রহরের আগে
এই হত্যাকারী হাতে শেষবার প্রণাম জানাই।।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1859
|
3048
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
চিরনবীনতা
|
চিন্তামূলক
|
দিনান্তের মুখ চুম্বি রাত্রি ধীরে কয়—
আমি মৃত্যু তোর মাতা, নাহি মোরে ভয়।
নব নব জন্মদানে পুরাতন দিন
আমি তোরে ক’রে দিই প্রত্যহ নবীন। (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/chironobinota/
|
2218
|
মহাদেব সাহা
|
ভালোবাসা
|
প্রেমমূলক
|
ভালোবাসা তুমি এমনি সুদূর
স্বপ্নের চে’ও দূরে,
সুনীল সাগরে তোমাকে পাবে না
আকাশে ক্লান্ত উড়ে!
ভালোবাসা তুমি এমনি উধাও
এমনি কি অগোচর
তোমার ঠিকানা মানচিত্রের
উড়ন্ত ডাকঘর
সেও কি জানে না? এমনি নিখোঁজ
এমনি নিরুদ্দেশ
পাবে না তোমাকে মেধা ও মনন
কিংবা অভিনিবেশ?
তুমি কি তাহলে অদৃশ্য এতো
এতোই লোকোত্তর,
সব প্রশ্নের সম্মুখে তুমি
স্থবির এবং জড়?
ভালোবাসা তবে এমনি সুদূর
এমনি অলীক তুমি
এমনি স্বপ্ন? ছোঁওনি কি কভু
বাস্তবতার ভূমি?
তাই বা কীভাবে ভালোবাসা আমি
দেখেছি পরস্পর
ধুলো ও মাটিতে বেঁধেছো তোমার
নশ্বরতার ঘর!
ভালোবাসা, বলো, দেখিনি তোমাকে
সলজ্জ চঞ্চল,
মুগ্ধ মেঘের মতোই কখনো
কারো তৃষ্ণার জল।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1526
|
2846
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ওড়ার আনন্দে পাখি
|
চিন্তামূলক
|
ওড়ার আনন্দে পাখি
শূন্যে দিকে দিকে
বিনা অক্ষরের বাণী
যায় লিখে লিখে।
মন মোর ওড়ে যবে
জাগে তার ধ্বনি,
পাখার আনন্দ সেই
বহিল লেখনী। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/orar-anonde-pakhi/
|
2695
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আবার আবার কেন রে আমার
|
চিন্তামূলক
|
আবার আবার কেন রে আমার
সেই ছেলেবেলা আসে নি ফিরে,
হরষে কেমন আবার তা হলে,
সাঁতারিয়ে ভাসি সাগরের জলে,
খেলিয়ে বেড়াই শিখরী শিরে!
স্বাধীন হৃদয়ে ভালো নাহি লাগে,
ঘোরঘটাময় সমাজধারা,
না, না, আমি রে যাব সেই স্থানে,
ভীষণ ভূধর বিরাজে যেখানে,
তরঙ্গ মাতিছে পাগল পারা!
অয়ি লক্ষ্মী, তুমি লহো লহো ফিরে,
ধন ধান্য তুমি যাদেছ মোরে,
জাঁকালো উপাধি নাহি আমি চাই,
ক্রীতদাসে মম কোনো সুখ নাই,
সেবকের দল যাক-না সোরে!
তুলে দাও মোরে সেই শৈল-‘পরে,
গরজি ওঠে যা সাগর-নাদে,
অন্য সাধ নাই, এই মাত্র চাই,
ভ্রমিব সেথায় স্বাধীন হৃদে!
অধিক বয়স হয় নে তো মম,
এখনি বুঝিতে পেরেছি হায়,
এ ধরা নহে তো আমার কারণে,
আর মম সুখ নাহি এ জীবনে,
কবে রে এড়াব এ দেহ দায়!
একদা স্বপনে হেরেছিনু আমি,
সুবিমল এক সুখের স্থান,
কেন রে আমার সে ঘুম ভাঙিল
কেন রে আমার নয়ন মেলিল,
দেখিতে নীরস এ ধরা খান!
এক কালে আমি বেসেছিনু ভালো,
ভালোবাসা-ধন কোথায় এবে,
বাল্যসখা সব কোথায় এখন–
হায় কী বিষাদে ডুবেছে এ মন,
আশারও আলোক গিয়েছে নিবে!
অমোদ-আসরে আমোদ-সাথীরা,
মাতায় ক্ষণেক আমোদ রসে,
কিন্তু এ হৃদয়, আমোদের নয়,
বিরলে কাঁদি যে একেলা বসে!
উঃ কী কঠোর, বিষম কঠোর,
সেই সকলের আমোদ-রব,
শত্রু কিম্বা সখা নহে যারা মনে,
অথচ পদ বা বিভব কারণে,
দাও ফিরে মোরে সেই সখাগুলি,
বয়সে হৃদয়ে সমান যারা,
এখনি যে আমি ত্যেজিব তা হলে,
গভীর নিশীথ-আমোদীর দলে,
হৃদয়ের ধার কি ধারে তারা!
সর্বস্ব রতন, প্রিয়তমা ওরে,
তোরেও সুধাই একটি কথা,
বল দেখি কিসে আর মম সুখ,
হেরিয়েও যবে তোর হাসি-মুখ,
কমে না হৃদয়ে একটি ব্যথা!
যাক তবে সব, দুঃখ নাহি তায়,
শোকের সমাজ নাহিকো চাই,
গভীর বিজনে মনের বিরাগে,
স্বাধীন হৃদয়ে ভালো যাহা লাগে,
সুখে উপভোগ করিব তাই!
মানব-মন্ডলী ছেড়ে যাব যাব,
বিরাগে কেবল, ঘৃণাতে নয়,
অন্ধকারময় নিবিড় কাননে,
থাকিব তবুও নিশ্চিন্ত মনে,
আমারও হৃদয় আঁধারময়!
কেন রে কেন রে হল না আমার,
কপোতের মতো বায়ুর পাখা,
তা হলে ত্যেজিয়ে মানব-সমাজ,
গগনের ছাদ ভেদ করি আজ,
থাকিতাম সুখে জলদে ঢাকা!George Gordon Byron
(অনুবাদ কবিতা)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/abar-abar-keno-re-amar/
|
5837
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
ব্যর্থ প্রেম
|
প্রেমমূলক
|
প্রতিটি ব্যর্থ প্রেমই আমাকে নতুন অহঙ্কার দেয়
আমি মানুষ হিসেবে একটু লম্বা হয়ে উঠি
দুঃখ আমার মাথার চুল থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত
ছড়িয়ে যায়
আমি সমস্ত মানুষের থেকে আলাদা হয়ে এক
অচেনা রাস্তা দিয়ে ধীরে পায়ে
হেঁটে যাই
সার্থক মানুষদের আরো-চাই মুখ আমার সহ্য হয় না
আমি পথের কুকুরকে বিস্কুট কিনে দিই
রিক্সাওয়ালাকে দিই সিগারেট
অন্ধ মানুষের শাদা লাঠি আমার পায়ের কাছে
খসে পড়ে
আমার দু‘হাত ভর্তি অঢেল দয়া, আমাকে কেউ
ফিরিয়ে দিয়েছে বলে গোটা দুনিয়াটাকে
মনে হয় খুব আপন
আমি বাড়ি থেকে বেরুই নতুন কাচা
প্যান্ট শার্ট পরে
আমার সদ্য দাড়ি কামানো নরম মুখখানিকে
আমি নিজেই আদর করি
খুব গোপনে
আমি একজন পরিচ্ছন্ন মানুষ
আমার সর্বাঙ্গে কোথাও
একটুও ময়লা নেই
অহঙ্কারের প্রতিভা জ্যোতির্বলয় হয়ে থাকে আমার
মাথার পেছনে
আর কেউ দেখুক বা না দেখুক
আমি ঠিক টের পাই
অভিমান আমার ওষ্ঠে এনে দেয় স্মিত হাস্য
আমি এমনভাবে পা ফেলি যেন মাটির বুকেও
আঘাত না লাগে
আমার তো কারুকে দুঃখ দেবার কথা নয়।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1816
|
4887
|
শামসুর রাহমান
|
নিজের ছায়ার দিকে
|
চিন্তামূলক
|
আমার ভেতরে আছে এক ছায়া সুনসান; তার
ধরন বেখাপ্পা খুব, অন্তরালে থাকে।
সামাজিত তাকে বলা যাবে না, যদিও ভ্রমণের
অভিলাষ আছে তার এখানে-সখানে অবিরাম।কখনও-সখনও
নিজের ছায়ার দিকে স্নেহার্দ্র দৃষ্টিতে
তাকাই রহস্যবাদী মানুষের মতো। সদিচ্ছার
অনটন নেই,
অথচ আমার ছায়া বাড়ালে উদগ্রীব হাত, আমার নিকট
নয়, অন্য কারো দিকে প্রসারিত হয়।সকল সময়
আমার সমান্তরাল বসে, হেঁটে যায়,
নিদ্রায় আমার সঙ্গে দিব্যি মিশে থাকে হরিহর।
যখন সে দ্যাখে ধুরন্ধর বুদ্ধিজীবী
আর গোমূর্খের দল খাচ্ছে জল একঘাটে
তুখোড় কৃপায় কারো, মর্মমূলে তার
পরিহাস ফণিমনসার রূপ ধরে। নিজস্ব ভূমিকা নিয়ে
খানিক বিব্রত হয়, ফাঁদে-পড়া
পাখির মতোই
ডানা ঝাপটাতে থাকে প্রহরে-প্রহরে। আর ভাবে
মাঝে-সাজে- কখনও প্রকৃত মানুষের চেয়ে তার
ছায়া বড় হয়ে যায়।কলহাস্য-সংকলিত সজীব বাসরঘরে মরুর বিস্তার,
গেরস্ত ঘরের উর্বশীর প্রতি যযাতি-দৃষ্টির
লোলুপতা দেখে চমকে ওঠে আর
একটি যুগের অস্তরাগে
রঙিন বিহ্বল হয়ে আমার ভেতর থেকে তীব্র
বেরিয়ে পড়তে চায়, যেন
কোনো দূর হ্রদের কিনারে গিয়ে খানিক দাঁড়াবে,
নিমেষে ফেলবে ধুয়ে অস্তিত্বের ক্লান্তিময় ধূলো।কখনও-কখনও বড় বেশি অস্থিরতা
পেয়ে বসে তাকে; আমি নিজে
যতোই ঘরের খুঁটি শক্ত হাতে ধরি,
আমার নিজস্ব ছায়া হতে চায় ততোই বিবাগী। (হোমারের স্বপ্নময় হাত কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nijer-chayar-dike/
|
3427
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
প্রত্যক্ষ প্রমাণ
|
নীতিমূলক
|
বজ্র কহে, দূরে আমি থাকি যতক্ষণ
আমার গর্জনে বলে মেঘের গর্জন,
বিদ্যুতের জ্যোতি বলি মোর জ্যোতি রটে,
মাথায় পড়িলে তবে বলে—বজ্র বটে! (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prottokkho-proman/
|
4677
|
শামসুর রাহমান
|
গলে-যাওয়া দীর্ঘকায় লোক
|
মানবতাবাদী
|
একজন দীর্ঘকায় লোক গলি থেকে
বেরিয়ে প্রধান পথে মাথা উঁচু ক’রে
হেঁটে হেঁটে সামনে এগোতে থাকে। অকস্মাৎ এ কি!
লোকটা মোমের মতো ধীরে
গলে যেতে থাকে আর পথচারী অনেকেই তার
দিকে অতিশয় বিচলিত দৃষ্টি গেঁথে দেয় যেন।কারও দিকে দৃষ্টি নেই চলন্ত, গলন্ত লোকটার। পথে জমে
ক্রমাগত পথচারীদের ভিড়। কোন্
কে যে তীক্ষ্ণ খঞ্জর বসিয়ে দেয় বুকে,
এমন দুশ্চিন্তা নড়ে চড়ে মাঝে মাঝে,
যেমন ইঁদুর কোনও ক্রিয়াপ্রিয় বিড়ালের মতো।
আসমানে কৃষ্ণ মেঘমালা চন্দ্রমাকে গ্রাস করে!শহরে পড়েছে ঢুকে জাঁহাবাজ ডাকাতের দল
চারদিক থেকে, ভীত-সন্ত্রস্ত শহরবাসীদের
চোখ থেকে গায়েব হয়েছে ঘুম। নারীদের সম্ভ্রম হানির
আশঙ্কা এবং পুরুষের শোণিতের বন্যা বয়ে
যাওয়ার শিউরে-ওঠা রক্তিম প্রহর কাটাবার
চেতনা, সাহস আর বিজয়ের ধ্বনি কখন তুলবে কারা?
যখন শহরবাসী হতাশার হিম-অন্ধকারে
হাবুডুবু খাচ্ছিল, হঠাৎ চৌদিক থেকে আলো
জেগে ওঠে আর কিয়দ্দূর থেকে অপরূপ গীত
ভেসে আসে। কী আশ্চর্য! গলিত মোমের
স্তূপ থেকে দীর্ঘদেহী রূপবান পুরুষেরা জেগে
উঠে শক্র-তাড়ানোর যুদ্ধে জয়ী হতে ছুটে যায়। (গোরস্থানে কোকিলের করুণ আহবান কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/gole-jawa-dirghokai-lok/
|
911
|
জীবনানন্দ দাশ
|
অন্ধকারে জলের কোলাহল
|
চিন্তামূলক
|
বিকেলবেলা গড়িয়ে গেলে অনেক মেঘের ভিড়
কয়েক ফলা দীর্ঘতম সূর্যকিরণ বুকে
জাগিয়ে তুলে হলুদ নীল কমলা রঙের আলোয়
জ্বলে উঠে ঝরে গেল অন্ধকারের মুখে।
যুবারা সব যে যার ঢেউয়ে-
মেয়েরা সব যে যার প্রিয়ের সাথে
কোথায় আছে জানি না তোঃ
কোথায় সমাজ, অর্থনীতি?- স্বর্গগামী সিঁড়ি
ভেঙ্গে গিয়ে পায়ের নিচে রক্তনদীর মতো
মানব ক্রমপরিণতির পথে লিঙ্গশরীরী
হয়ে কি আজ চারি দিকে গণনাহীন ধূসর দেয়ালে
ছড়িয়ে আছে যে যার দ্বৈপসাগর দখল করে’?
পুরাণপুরুষ, গনমানুষ, নারীপুরুষ,্মানবতা, অসংখ্য বিপ্লব
অর্থবিহীন হয়ে গেলে-তবুও আরেক নবীনতর ভোরে
সার্থকতা পাওয়া যাবে, ভেবে মানুষ সঞ্চারিত হয়ে
পথে পথে সবের শুভ নিকেতনের সমাজ বানিয়ে
তবুও কেবল দ্বীপ বানালো যে যার অবক্ষয়ের জলে।
প্রাচীন কথা নতুন করে’ এই পৃথিবীর বোন-ভায়ে
ভাবছে একাএকা বসে’
যুদ্ধ রক্ত রিরংসা ভয় কলরোলের ফাঁকেঃ
আমাদের এই আকাশ সাগর আধাঁর আলোয় আজ
যে দৌড় কঠিন; নেই মনে হয়- সে দ্বার খুলে দিয়ে যেতে হবে
আবার আলোয়, অসাড় আলোর ব্যাসন ছাড়িয়ে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ondhokar-joler-kolahol/
|
2173
|
মহাদেব সাহা
|
তোমাকে লিখবো বলে একখানি চিঠি
|
প্রেমমূলক
|
তোমাকে লিখবো বলে একখানি চিঠি
কতোবার দ্বারস্ত হয়েছি আমি
গীতিকবিতার,
কতোদিন মুখস্ত করেছি এই নদীর কল্লোল
কান পেতে শুনেছি ঝর্ণার গান,
বনে বনে ঘুরে আহরণ করেছি পাখির শিস্
উদ্ভিদের কাছে নিয়েছি শব্দের পাঠ;
তোমাকে লিখবো বলে একখানি চিঠি
সংগ্রহ করেছি আমি ভোরের শিশির,
তোমাকে লেখার মতো প্রাঞ্জল ভাষার জন্য
সবুজ বৃক্ষের কাছে জোড়হাতে দাঁড়িয়েছি আমি-
ঘুরে ঘুরে গুহাগাত্র থেকে নিবিড় উদ্ধৃতি সব
করেছি চয়ন;
তোমাকে লিখবো বলে জীবনের গূঢ়তম চিঠি
হাজার বছর দেখো কেমন রেখেছি খুলে বুক।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1405
|
5182
|
শামসুর রাহমান
|
রবীন্দ্রনাথের প্রতি
|
চিন্তামূলক
|
লোকে বলে বাংলাদেশে কবিতার আকাল এখন,
বিশেষত তোমার মৃত্যুর পরে কাব্যের প্রতিমা
ললিতল্যাবণ্যচ্ছটা হারিয়ে ফেলেছে-পরিবর্তে রুক্ষতার
কাঠিন্য লেগেছে শুধু, আর চারদিকে পোড়োজমি,
করোটিতে জ্যোৎস্না দেখে ক্ষুধার্ত ইঁদুর কী আশ্বাসে
চম্কে ওঠে কিছুতে বোঝে না ফণিমনসার ফুল।সুধীন্দ্র জীবনানন্দ নেই, বুদ্ধদেব অনুবাদে
খোঁজেন নিভৃতি আর অতীতের মৃত পদধ্বনি
সমর-সুভাষ আজ। অন্যপক্ষে আর ক’টি নাম
ঝড়জল বাঁচিয়ে আসীন নিরাপদ সিংহাসনে,
এবং সম্প্রতি যারা ধরে হাল বহতা নদীতে
তাদের সাধের নৌকো অবেলায় হয় বানচাল
হঠাৎ চড়ায় ঠেকে। অথবা কুসুমপ্রিয় যারা
তারা পচা ফুলে ব’সে করে বসন্তের স্তব।যেমন নতুন চারা পেতে চায় রোদবৃষ্টি তেমনি
আমাদেরও অমর্ত্যের ছিল প্রয়োজন আজীবন।
তোমার প্রশান্ত রূপ ঝরেছিল তাই সূর্যমুখী
চেতনার সৌরলোকে রাজনীতি প্রেমের সংলাপে।
যেন তুমি রাজসিক একাকিত্বে-মধ্যদিনে যবে
গান বন্ধ করে পাখি-কখনো ফেলোনি দীর্ঘশ্বাস,
যেন গ্রীষ্মে বোলপুরে হওনি কাতর কিংবা শুকনো
গলায় চাওনি জল-অথবা শমীর তিরোধানে
তোমার প্রোজ্জ্বল বুক হয়নিকো দীর্ণ কিংবা যেন
মোহন ছন্দের মায়ামৃগ করেনি ছলনা কোনো-
এমন মূর্তিতে ছিলে অধিষ্ঠিত সংখ্যাহীন প্রাণে।
গোলাপের তীক্ষ্ণ কাঁটা রিলকের সত্তার নীলিমাকে
ছিঁড়েছিল, তবু তাও ছিল স্নানাহার, চিরুণির
স্পর্শ ছিল চুলে, ছিল মহিলাকে নিবেদিতপ্রাণ।আমার দিনকে তুমি দিয়েছ কাব্যের বর্ণচ্ছটা
রাত্রিকে রেখেছ ভরে গানের স্ফুলিঙ্গে, সপ্তরথী
কুৎসিতের ব্যূহ ভেদ করবার মন্ত্র আজীবন
পেয়েছি তোমার কাছে। ঘৃণার করাতে জর্জরিত
করেছি উন্মত্ত বর্বরের অট্রহাসি কী আশ্বাসে।প্রতীকের মুক্ত পথে হেঁটে চলে গেছি আনন্দের
মাঠে আর ছড়িয়ে পড়েছি বিশ্বে তোমারই সাহসে।
অকপট নাস্তিকের সুরক্ষিত হৃদয় চকিতে
নিয়েছ ভাসিয়ে কত অমলিন গীতসুধারসে।
ব্যাঙডাকা ডোবা নয়, বিশাল সমুদ্র হতে চাই
এখনও তোমারই মতো উড়তে চেয়ে কাদায় লুটিয়ে
পড়ি বারবার, ভাবি অন্তত পাঁকের কোকিলের
ভূমিকায় সফলতা এলে কিছু সার্থক জনম। (রৌদ্র করোটিতে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/robindonather-proti/
|
2310
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
কাশীরাম দাস
|
সনেট
|
চন্দ্রচূড় জটাজালে আছিলা যেমতি
জাহ্নবী, ভারত-রস ঋষি দ্বৈপায়ন,
ঢালি সংস্কৃত-হ্রদে রাখিলা তেমতি; —
তৃষ্ণায় আকুল বঙ্গ করিত রোদন।
কঠোরে গঙ্গায় পূজি ভগীরথ ব্রতী,
(সুধন্য তাপস ভবে, নর-কুল-ধন! )
সগর-বংশের যথা সাধিলা মুকতি,
পবিত্ৰিলা আনি মায়ে, এ তিন ভুবন;
সেই রূপে ভাষা-পথ খননি স্ববলে,
ভারত-রসের স্রোতঃ আনিয়াছ তুমি
জুড়াতে গৌড়ের তৃষা সে বিমল জলে।
নারিবে শোধিতে ধার কভু গৌড়ভূমি।
মহাভারতের কথা অমৃত-সমান।
হে কাশি, কবীশদলে তুমি পুণ্যবান্॥(চতুদ্দর্শপদী কবিতাবলী)
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/kashiram-das/
|
5682
|
সুকুমার রায়
|
লক্ষ্মী
|
ছড়া
|
হাত -পা- ভাঙ্গা নোংরা পুতুল মুখটি ধুলোয় মাখা,
গাল দুটি তার খাবলা মতন চোখ দুটি তার ফাঁকা-
কোথায় বা তার চুল বিনুনি, কোথায় বা তার মাথা,
আধখানি তার ছিন্ন জামা,গায় দিয়েছে কাঁথা।
পুতুলের মা ব্যস্ত কেবল তার সেবাতেই রত,
খাওয়ান শোয়ান আদর করেন ঘুম ডেকে দেন কত।
বলতে গেলাম "বিশ্রী পুতুল" অমনি বলেন রেগে -
"লক্ষ্মী পুতুল জ্বর হয়েছে তাইত এখন জেগে।"
দ্বিগুন জোরে চাপড়ে দিল "আয় আয় আয়" ব'লে-
নোংরা পুতুল লক্ষ্মী হ'য়ে পড়ল ঘুমে ঢুলে!
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/lokshmi/
|
1258
|
জীবনানন্দ দাশ
|
সোনালি অগ্নির মতো
|
চিন্তামূলক
|
সোনালি অগ্নির মতো আকাশ জ্বলছে স্থির নীল পিলসুজে;
পৃথিবীর শেষ রৌদ্র খুঁজে
কেউ কি পেয়েছে কিছু কোনো দিকে? পায় নি তো কেউ।
তারপর বাদুড়ের কালো কালো ঢেউ
উড়ায়ে শঙ্খচিল কোথায় ডুবল চোখ বুজে।
অনেক রক্তাক্ত সোনা লুফে নিয়ে চ’লে গেছে নগরীর পানে
মানুষেরা রক্তের সন্ধানে।
বাদুড়েরা তারপর ছক কেটে আঁধার আকাশে
জীবনের অন্য-এক মানে ভালবাসেঃ
হয় তো-বা সূর্যের ও-পিঠের মানে।
চিন্তার-ইচ্ছার শান্তি চারদিকে নামছে নীরবেঃ
যত কাল লাল সূর্য পিছু ফিরে রবে।
বাদূড় যেখানে দূর- আরো দূর আকাস কালোয় গিয়ে মেশে
সে-গাহনে একদিন মানুষও নিঃশেষে
নিভে গেলে বুঝি তার শেষ হিরোশিমা শান্ত হবে।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shonalii-ogniir-moto/
|
2496
|
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
|
নিজেকে দেখা
|
চিন্তামূলক
|
তোমাকে দেখিনি আলোয় ছিলাম বলে কি
আঁধারে তোমার এতো রূপ ওঠে জ্বলে কি !!আলোয় কি এই আলো মিশে থাকে ?
তাই দেখে ভুলি, দেখিনা তোমাকে।
নিজের ভিতর তাকালেই তবে তোমার দুয়ার খোলে কি ?।এতো কাছে থাকো এতোটা নিবিড় বাঁধনে
সুখে দুখে হাসি কাঁদনে
এতোটা নিবিড় বাঁধনে ?তোমার এ রূপ, এ-কি ভালোবাসা ?
তাই হলে যেন মেটেনা পিপাসা ।
রূপের অরূপ পেয়ালার নেশা দিয়েই আমার হলে কি ?।
|
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/nijeke-dekha/
|
4568
|
শামসুর রাহমান
|
কাউকে দেখতে পেলাম না
|
প্রেমমূলক
|
মজুরের ঘামের ফোঁটার মতো সকালবেলার আলো
চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে আমার ঘরে। টেবিলে
আর কে, নারায়ণের আত্মকথা ‘আমার দিনগুলি’
যেটি গত রাতে পড়ে শেষ করেছি।
আমার কবিতা খাতা
একটি অসমাপ্ত কবিতা
বুকে ধারণ করে
প্রতীক্ষায় আছে আমার কলমের
আঁচড়ের। কবিতাটি লতিয়ে উঠেছে
তোমাকে ঘিরে। কি আশ্চর্য, আজকাল
আমার প্রায় প্রতিটি কবিতা জুড়ে
তোমারই আসা-যাওয়া।মেঝেতে যমজ স্যান্ডেল অপেক্ষমাণ
আমার পায়ের জন্যে। জানলার লাগোয়া
নারকেল গাছে একটি কি দুটি পাখি,
মাঝে মাঝে গানে সাজায় প্রতিবেশ।
রাস্তার ওপারে হতে চলেছে একটি বাড়ির
ইট, বালি, কুপিয়ে-তোলা মাটি, লোহার শিকময়
উঠোনে কয়েকজন নারী পুরুষ, যারা
একটু পরেই পুরোদমে লেগে যাবে ইট ভাঙার কাজে।
তিনটি গাছ এখনো দাঁড়ানো সেখানে,
কে জানে কখন পড়বে মুখ থুবড়ে
বৃক্ষ ঘাতকের কুঠারের দাপটে।
কয়েকজন ছেলেমেয়ে ইউনিফর্ম পরে
রওয়ানা হয়েছে মর্নিং ইস্কুলে,
যেন ভাসমান এক বাহারি বাগান।পাড়ার সেই মেয়েমানুষ, যার মাথায় ছিট,
গান গায়, ওর গানে নদীর ঢেউ, শূন্য নৌকা,
আর ধানের শীষের দুলুনি, কখনো কখনো
ওর সুরে সর্বস্ব-হারানো বিলাপ। গ্রীষ্মের সকালে
হাওয়া, হঠাৎ কিছু পাওয়ার খুশি চায়ের চুমুকে,
গত রাতের স্বপ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া। মনে পড়ে,
কাল রাতে স্বপ্নে দেখেছিলাম, দাঁড়িয়ে আছি
সামন্ত যুগের গোধূলিকালীন এক রাজবাড়ির সিংদরজায়।
জানতাম তুমি আছো সেই বাড়ির রহস্যময়
কোনো প্রকোষ্ঠে। কণ্ঠস্বর যদ্দূর সম্ভব
উচ্চগ্রামে চড়িয়ে ডাকলাম তোমাকে,
তুমি এলে না। ভিক্ষুক এলেও তো মানুষ
একবার দরজা খুলে দ্যাখে।
স্বপ্নের ভেতরেই আমার ভীষণ মন খারাপ।
আমি কি পাগলা মেহের আলীর মতো
সেই আধভাঙা রাজবাড়ির
চারপাশে ক্রমাগত চক্কর কাটতে লাগলাম?
নাকি দীর্ঘশ্বাস হয়ে মিলিয়ে গেলাম নিশান্তের
হাওয়ায়?
সকালবেলা আমার ভারি ভালো লাগার কথা,
অথচ আমার মন আজ সীসার মতো ভারী।
এক ধরনের দার্শনিকতা আমাকে খামচে-খুমচে,
ঘাড় ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিধ্বনিময়
প্রকাণ্ড সব গুহায়। রাতের স্বপ্নটিকে
তুড়ি মেরে উড়িয়ে মনোভার কমাবার
চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হলাম।
ভাবনার হার ধরে অন্য মোড়ে
নিয়ে গেলাম ভুলিয়ে ভালিয়ে।
সেই মুহূর্তে নিজেকে ভাবতে দিলাম,
তুমি বসে আছো শুধু আমারই প্রতীক্ষায়,
কায়মনোবাক্যে আমারই কথা ভাবছো, একথা ভাবতেই
আমার সমগ্র সত্তা কদম ফুল,
ভাবতে ভালো লাগছে, তুমি আমার জন্যে
ফুঃ বলে তুচ্ছ করতে পারো যা কিছু কাঙ্ক্ষণীয়।
আর আনন্দে ডগমগ সারা ঘর।
এই বিভ্রান্ত যুগে তোমার অনুপস্থিতিকেই
উপস্থিতি বলে জেনেছি!
হঠাৎ একটা বিকট অট্রহাসিতে আমার ঘর থরথর,
যেমন ভূমিকম্পে হয়। কিন্তু সেই ঠা ঠা হাসিকে
অনুসরণ করে টাল সামলে
কাছে পিঠে কাউকে দেখতে পেলাম না। (হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kauke-dekhte-pelam-na/
|
3652
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
ভবিষ্যতের রঙ্গভূমি
|
চিন্তামূলক
|
সম্মুখে রয়েছে পড়ি যুগ - যুগান্তর ।
অসীম নীলিমে লুটে ধরণী ধাইবে ছুটে ,
প্রতিদিন আসিবে , যাইবে রবিকর ।
প্রতিদিন প্রভাতে জাগিবে নরনারী ,
প্রতিসন্ধ্যা শ্রান্তদেহে ফিরিয়া আসিবে গেহে ,
প্রতিরাত্রে তারকা ফুটিবে সারি সারি ।
কত আনন্দের ছবি , কত সুখ আশা
আসিবে যাইবে হায় , সুখ - স্বপনের প্রায়
কত প্রাণে জাগিবে , মিলাবে ভালোবাসা ।
তখনো ফুটিবে হেসে কুসুম - কানন ,
তখনো রে কত লোকে কত স্নিগ্ধ চন্দ্রালোকে
আঁকিবে আকাশ - পটে সুখের স্বপন ।
নিবিলে দিনের আলো , সন্ধ্যা হলে , নিতি
বিরহী নদীর ধারে না জানি ভাবিবে কারে ,
না - জানি সে কী কাহিনী , কী সুখ , কী স্মৃতি ।
দূর হতে আসিতেছে , শুন কান পেতে —
কত গান , সেই মহা - রঙ্গভূমি হতে
কত যৌবনের হাসি , কত উৎসবের বাঁশি ,
তরঙ্গের কলধ্বনি প্রমোদের স্রোতে ।
কত মিলনের গীত , বিরহের শ্বাস ,
তুলেছে মর্মর তান বসন্ত - বাতাস ,
সংসারের কোলাহল ভেদ করি অবিরল
লক্ষ নব কবি ঢালে প্রাণের উচ্ছ্বাস ।
ওই দূর খেলাঘরে খেলাইছ কারা !
উঠেছে মাথার'পরে আমাদেরি তারা ।
আমাদেরি ফুলগুলি সেথাও নাচিছে দুলি ,
আমাদেরি পাখিগুলি গেয়ে হল সারা ।
ওই দূর খেলাঘরে করে আনাগোনা
হাসে কাঁদে কত কে যে নাহি যায় গণা ।
আমাদের পানে হায় ভুলেও তো নাহি চায় ,
মোদের ওরা তো কেউ ভাই বলিবে না
ওই - সব মধুমুখ অমৃত - সদন ,
না জানি রে আর কারা করিবে চুম্বন ।
শরমময়ীর পাশে বিজড়িত আধ - ভাষে
আমরা তো শুনাব না প্রাণের বেদন ।
আমাদের খেলাঘরে কারা খেলাইছ !
সাঙ্গ না হইতে খেলা চলে এনু সন্ধেবেলা ,
ধূলির সে ঘর ভেঙে কোথা ফেলাইছ ।
হোথা , যেথা বসিতাম মোরা দুই জন ,
হাসিয়া কাঁদিয়া হত মধুর মিলন ,
মাটিতে কাটিয়া রেখা কত লিখিতাম লেখা ,
কে তোরা মুছিলি সেই সাধের লিখন ।
সুধাময়ী মেয়েটি সে হোথায় লুটিত ,
চুমো খেলে হাসিটুকু ফুটিয়া উঠিত ।
তাই রে মাধবীলতা মাথা তুলেছিল হোথা ,
ভেবেছিনু চিরদিন রবে মুকুলিত ।
কোথায় রে , কে তাহারে করিলি দলিত ।
ওই যে শুকানো ফুল ছুঁড়ে ফেলে দিলে
উহার মরম - কথা বুঝিতে নারিলে ।
ও যেদিন ফুটেছিল নব রবি উঠেছিল ,
কানন মাতিয়াছিল বসন্ত - অনিলে ।
ওই যে শুকায় চাঁপা পড়ে একাকিনী ,
তোমরা তো জানিবে না উহার কাহিনী ।
কবে কোন্ সন্ধেবেলা ওরে তুলেছিল বালা
ওরি মাঝে বাজে কোন্ পূরবীরাগিণী ।
যারে দিয়েছিল ওই ফুল উপহার
কোথায় সে গেছে চলে , সে তো নেই আর ।
একটু কুসুমকণা তাও নিতে পারিল না ,
ফেলে রেখে যেতে হল মরণের পার ;
কত সুখ , কত ব্যথা , সুখের দুখের কথা
মিশিছে ধূলির সাথে ফুলের মাঝার ।
মিছে শোক , মিছে এই বিলাপ কাতর ,
সম্মুখে রয়েছে পড়ে যুগ - যুগান্তর । (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/vobishyoter-ronggovumi/
|
1179
|
জীবনানন্দ দাশ
|
যে শালিখ মরে যায় কুয়াশায়
|
সনেট
|
যে শালিখ মরে যায় কুয়াশায়-সে তো আর ফিরে নাহি আসে:
কাঞ্চনমালা যে কবে ঝরে গেছে;-বনে আজো কলমীর ফুল
ফুটে যায়-সে তবু ফেরে না, হায়;-বিশালাক্ষ্মী: সেও তো রাতুল
চরণ মুছিয়া নিয়া চলে গেছে;-মাঝপথে জলের উচ্ছ্বাসে
বাধা পেয়ে নদীরা মজিয়া গেছে দিকে দিকে-শ্মশানের পাশে
আর তারা আসে নাকো; সুন্দরীর বনে বাঘ ভিজে জুল-জুল
চোখ তুলে চেয়ে থাকে-কতো পাটরানীদের গাঢ় এলোচুল
এই গৌড় বাংলায়-পড়ে আছে তাহার পায়ের তলে ঘাসেজানে সে কি! দেখে নাকি তারাবনে পড়ে আছে বিচূর্ণ দেউল,
বিশুষ্ক পদ্মের দীঘি-ফোঁপড়া মহলা ঘাট, হাজার মহাল
মৃত সব রূপসীরা; বুকে আজ ভেরেন্ডার ফুলে ভীমরুল
গান গায়-পাশ দিয়ে খল্ খল্ খল্ খল্ বয়ে যায় খাল,
তবু ঘুম ভাঙে নাকো-একবার ঘুমালে কে উঠে আসে আর
যদিও ডুকারি যায় শঙ্খচিল-মর্মরিয়া মরে গো মাদার।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/je-shaliks-morey-jai-kuashai/
|
4561
|
শামসুর রাহমান
|
করোনি কসুর
|
সনেট
|
করোনি কসুর দিতে রক্তাক্ত গঞ্জনা খামোকাই
নিত্যদিন; এ শহরে বসবাস হয়েছে কঠিন
আজকাল, গায়ে এসে পড়ে কত বেহুদা কমিন
ক্রমাগত; যেদিকেই যাই ইট পাটকেল খাই
অহর্নিশ, তুমিও বলোনি ছেড়ে কথা বেরহম।
তোমার রসনা থেকে বয়ে যায় শহদের ধারা,
এরকম ধারণার রঙধনু ছিলো চমৎকারা;
ভাবতে অবাক লাগে, এতটুকু পাওনি শরম।সম্প্রতি কী এক আলো সিনায় বেড়ায় নেচে, ফলে
লানতের ভাষা আর অঙ্গারের মতো ধ্বক ধ্বক
করে না আমার ঠোঁটে। খ্যাপা, পোড়া আত্মা ধুয়ে জলে
ধারণ করেছি মুদ্রা ক্ষমার; কুঠার আহাম্মক,
এরকম আচরণে তূণ শূন্য ক’রে দুলদুল
বানালে আমাকে, তবু শ্রীচরণে রেখে যাই ফুল। (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/koroni-kosur/
|
4953
|
শামসুর রাহমান
|
প্রতীক্ষায়
|
প্রেমমূলক
|
তোমার ফেরার দিন আসন্ন বলেই প্রিয়তমা
আমার আকাঙ্ক্ষাগুলি পলাশ-মঞ্জরি হয়ে রোদ
জ্যোৎস্না মেখে নেয়। ভাবি, এ মুহূর্তে নির্জনতাবোধ,
যা বিরহ, তোমাকে দখল করে দূর রমরমা
হোটেলের লাউঞ্জে অথবা কামরায়। ঘন অমা
তোমাকে ধরে কি ঘিরে? না কি হাস্যে লাস্যে পরিবার
পরিজন নিয়ে কাটে বেলা? আমি বেদনার ভার
বয়ে চলি, করোটিতে আশঙ্কার ছায়া হয় জমা।তোমার প্রহর কাটে, অনুমান করি, স্বপ্ন ঘোরে
দোকানে, মোটরকারে কখনো বা হাঁটো রাজপথে
যাও কোনো বিখ্যাত উদ্যানে, আর তোমার শরীর
মনোমুগ্ধকর ছন্দে দুলে ওঠে সমুদ্র সৈকতে
যেখানে দুপুরবেলা দলে দলে স্নানার্থীরা ভিড়
জমায়, এখানে প্রতীক্ষায় আমার অন্তর পোড়ে। (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/protikkhay/
|
443
|
কাজী নজরুল ইসলাম
|
ভূত-ভাগানোর গান
|
ব্যঙ্গাত্মক
|
১
ওই তেত্রিশ কোটি দেবতাকে তোর তেত্রিশ কোটি ভূতে
আজ নাচ বুড্ঢি নাচায় বাবা উঠতে বসতে শুতে!
ও ভূত যেই দেখেছে মন্দির তোর
নাই দেবতা নাচছে ইতর,
আর মন্ত্র শুধু দন্ত-বিকাশ, অমনি ভূতের পুতে,
তোর ভগবানকে ভূত বানালে ঘানি-চক্রে জুতে॥২
ও ভূত যেই জেনেছে তোদের ওঝা
আজ নকলের বইছে বোঝা,
ওরে অমনি সোজা তোদের কাঁধে খুঁটো তাদের পুঁতে,
আজ ভূত-ভাগানোর মজা দেখায় বোম-ভোলা বম্বুতে!৩ও ভূত সর্ষে-পড়া অনেক ধুনো
দেখে শুনে হল ঝুনো,
তাই তুলো-ধুনো করছে ততই যতই মরিস কুঁথে,
ও ভূত নাচছে রে তোর নাকের ডগায় পারিসনে তুই ছুঁতে!৪ আগে বোঝেনিকো তোদের ওঝা
তোরা গোঁজামিলের মন্ত্র-ভজা।
(শিখলি শুধু চক্ষু-বোঁজা)
শিখলি শুধু কানার বোঝা কুঁজোর ঘাড়ে থুতে,
তাই আপনাকে তুই হেলা করে ডাকিস স্বর্গদূতে॥৫ ওরে জীবন-হারা, ভূতে-খাওয়া!
ভূতের হাতে মুক্তি পাওয়া
সে কি সোজা? – ভূত কি ভাগে ফুসমন্তর ফুঁতে?
তোরা ফাঁকির ‘কিন্তু’ এড়িয়ে – পড়বি কূলহারা ‘কিন্তু’তে!৬ ওরে ভূত তো ভূত – ওই মারের চোটে
ভূতের বাবাও উধাও ছোটে!
ভূতের বাপ ওই ভয়টাকে মার, ভূত যাবে তোর ছুটে।
তখন ভূতে-পাওয়া এই দেশই ফের ভরবে দেবতা দূতে॥(বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/vut-vaganor-gan/
|
1400
|
তারাপদ রায়
|
স্মাইল
|
চিন্তামূলক
|
স্মাইল প্লিজ, আপনারা প্রত্যেকেই একটু হাসুন,
দয়া করে তাড়াতাড়ি, তা না হলে রোদ পড়ে গেলে
আপনারা যে রকম চাইছেন তেমন হবে না,
তেমন উঠবে না ছবি। আপনার ঘড়িটা ডানদিকে
আর একটু, একটু সোজা করে প্লিজ, আপনি কি বলছেন
ঘাড়-টাড় সোজা করে দাঁড়ানো হ্যাবিট নেই, তবে,
কি বলছেন অনেকদিন, অনেকদিন হাসার অভ্যাস,
হাসার-ও অভ্যাস নেই? এদিকে যে রোদ পড়ে এলো
এ রকম ঘাড়গোঁজা বিমর্ষ মুখের একদল
মানুষের গ্রুপফটো, ফটো অনেকদিন থেকে যায়,
ব্রমাইড জ্বলে যেতে প্রায় বিশ-পঁচিশ বছর।
বিশ-পঁচিশ বছর পরে যদি কোনো পুরোনো দেয়ালে
কিংবা কোনো অ্যালবামে এরকম ফটো কেউ দেখে,
কি বলবেন, বলবেন, ক্যামেরাম্যানের ত্রুটি ছিলো,
ঘাড় ঠিকই সোজা ছিলো, সব শালা ক্যামেরাম্যানের
সেই এক বোকার শাটারে এই রকম ঘটেছে।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%b2-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a6%9c-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%a6-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a7%9f/
|
3103
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জীবনযাত্রার পথে
|
চিন্তামূলক
|
জীবনযাত্রার পথে
ক্লান্তি ভুলি, তরুণ পথিক,
চলো নির্ভীক।
আপন অন্তরে তব
আপন যাত্রার দীপালোক
অনির্বাণ হোক। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jibonjatrar-pothe/
|
5260
|
শামসুর রাহমান
|
সপ্তাহ
|
সনেট
|
গোলাপ পায়রা আর প্রজাপতিদের ভিড়ে ছিলে
তুমি সোমবার সুখী, এবং মঙ্গলবার ঘাসে
শুয়েছিলে একাকিনী পুরাতন কবরের পাশে,
বুধবার, কী আশ্চর্য, বহুদূরে আকাশের নীলে
তোমার দোলনা দুলছিলো; তুমি আর আমি মিলে
কটেজে খেয়েছি চুমো বারংবার বৃহস্পতিবার।
শুক্রবার দেখেছি তোমার চোখ, শ্রোণী, স্তনভার
স্তব্ধ ব্যাঙ্ক-কারিডরে, শনিবার হাঁসময় ঝিলে।রবিবার? তোমার সান্নিধ্য, হায় যায় বনবাসে
রবিবারে বারে বারে। তবে কি দেখি না প্রিয়তনা
তোমাকে তখন? রাজহাঁসের মতন স্পীডবোটে
তুমি, হল্দে-কালো শাড়ি-পরা; দেখি, চুল সুবাতাসে
ওড়ে কী উদ্দাম, মাছের ঝিলিক মনে হয় জমা;
সত্তাতটে নিয়ত তোমার দীপ্র উপস্থিতি ফোটে। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/soptaho/
|
5784
|
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
|
ডাকবাংলোতে
|
প্রেমমূলক
|
ফুটে উঠলো একটি দুটি টগর
কন্ঠে মুক্তো- মালা
মরি মরি
তোমরা আজ সকালবেলার প্রসণ্নতা
এক মুহূর্তে শিশির ভেজা আলো
নর্মছলে তোমরা অন্সীরী।
‘কী সুন্দর ঐ টগর ফুল দুটো-
খোঁপায় গুঁজবো আমি!’
প্রাক-যুবতী বারান্দার প্রান্তে এসে আঁখি তুললো-
সদ্য ভোর, বিরল হওয়া, ঠান্ডা রোদ
সাংকেতিক পাখির ডাক, উপত্যকায় নির্জনতা
আমি বেতের ইজিচেয়ারে অলস।
ফুলের থেকে চোখ ফিরিয়ে নারীর দিকে
চোখই জানে চোখের মায়া দৃষ্টি জানে সৃষ্টির পূর্ণতা
একটি চাবি যেমন বহু বন্দী মুক্তি,
চাবির মতন
একপলকের চেয়ে দেখা
কললো আমায়ঃ
নারী যতই রূপসী হোক, এই মুহূর্তে মুকুটহীনা।
চেয়ার ছেড়ে উঠে, বারান্দা থেকে নেমে
টগর গছের পাশে দাঁড়িয়ে
আমি হাত বড়িয়েছি
হাত থেমে রইলো শূন্যে
পৃথিবী কাঁপে না, তবু কখনো কখনো মানুষের
ভূমিকম্পন হয়
এত বাতাস, তবু দীর্ঘশ্বাস নিতে ইচ্ছা হয় না
ভূবনময় এই মোহিনী আলোর মধ্যে দুলে ওঠে বিষণ্নতা
হাত থেমে রইলো শূন্যে
টগর গাছের পাশে হলুদ সাপ
চোখে চোখ, হিম সম্ভাষণ
কী তথ্য এনেছো তুমি, প্রহরী?
হলুদ সাপ সকালের মূর্তিমতী স্তব্ধতাকে ভেঙে
সেই ভাঙা গলায়
বলে উঠলো;
ঘূর্ণী জলের পাশে একদিন দেখে নিও
মুকের ছায়ায় রোদ্র-ভ্রমরীর খেলা!
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1863
|
1055
|
জীবনানন্দ দাশ
|
তোমার বুকের থেকে একদিন চলে যাবে
|
সনেট
|
তোমার বুকের থেকে একদিন চলে যাবে তোমার সন্তান
বাংলার বুক ছেড়ে চলে যাবে; যে ইঙ্গিতে নক্ষত্রও ঝরে,
আকাশের নীলাভ নরম বুক ছেড়ে দিয়ে হিমের ভিতরে
ডুবে যায়, – কুয়াশায় ঝ’রে পড়ে দিকে-দিকে রপশালী ধান
একদিন; – হয়তো বা নিমপেঁচা অন্ধকারে গা’বে তার গান,
আমারে কুড়ায়ে নেবে মেঠো ইঁদুরের মতো মরণের ঘরে –
হ্নদয়ে ক্ষদের গন্ধ লেগে আছে আকাঙ্খার তবু ও তো চোখের উপরে
নীল, মৃত্যু উজাগর – বাঁকা চাঁদ, শূন্য মাঠ, শিশিরের ঘ্রাণ -কখন মরণ আসে কে বা জানে – কালীদহে কখন যে ঝড়
কমলের নাম ভাঙে – ছিঁড়ে ফেলে গাংচিল শালিকের প্রাণ
জানি নাকো;- তবু যেন মরি আমি এই মাঠ – ঘাটের ভিতর,
কৃষ্ণা যমুনায় নয় – যেন এই গাঙুড়ের ডেউয়ের আঘ্রাণ
লেগে থাকে চোখে মুখে – রুপসী বাংলা যেন বুকের উপর
জেগে থাকে; তারি নিচে শুয়ে থাকি যেন আমি অর্ধনারীশ্বর।
|
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/tomar-buker-theke-akdin-chole-jabo/
|
2729
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
আমারে যদি জাগালে আজি নাথ
|
ভক্তিমূলক
|
আমারে যদি জাগালে আজি নাথ,
ফিরো না তবে ফিরো না, করো
করুণ আঁখিপাত।
নিবিড় বন-শাখার ‘পরে
আষাঢ়-মেঘে বৃষ্টি ঝরে,
বাদলভরা আলসভরে
ঘুমায়ে আছে রাত।
ফিরো না তুমি ফিরো না, করো
করুণ আঁখিপাত।বিরামহীন বিজুলিঘাতে
নিদ্রাহারা প্রাণ
বরষা-জলধারার সাথে
গাহিতে চাহে গান।
হৃদয় মোর চোখের জলে
বাহির হল তিমিরতলে,
আকাশ খোঁজে ব্যাকুল বলে
বাড়ায়ে দুই হাত।
ফিরো না তুমি ফিরো না, করো
করুণ আঁখিপাত।৩ আষাঢ়, ১৩১৭
(গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/amare-jodi-jagale-aji-nath/
|
4645
|
শামসুর রাহমান
|
খণ্ডিত গৌরব
|
চিন্তামূলক
|
মেঘের কাঁথায় মুখ লুকায় দুঃখী চাঁদ,
মধ্যরাতের নির্বাক রাস্তায়
অভাজনের কাতর প্রার্থনা;
ভাঙা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে
রুটির টুকরোর মতো সৃষ্টিকণা
ভিক্ষা চাইছি নিয়ত।সঙ্গীতচিহ্নিত জ্বলজ্বলে আকাশ থেকে
হঠাৎ কে আমাকে ছুঁড়ে দিলো
স্তব্ধ ধূসরতায়?
ঝর্ণা আমার আঙুলে,
এই বিশ্বাসের শেকড় ছিলো মজবুত,
অথচ সম্প্রতি তুষারিত সেই প্রস্রবণ।আমার হাতে একলব্যের রিক্ততার হাহাকার;
কে আমাকে বলে দেবে
কোন দ্রোণাচার্যের পায়ের তলায়
লুটোচ্ছে আমার খণ্ডিত গৌরব? (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/khondito-gourob/
|
3110
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
জীবনের দীপে তব
|
চিন্তামূলক
|
জীবনের দীপে তব
আলোকের আশীর্বচন
আঁধারের অচৈতন্যে
সঞ্চিত করুক জাগরণ। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jiboner-dipe-tobo/
|
1416
|
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
|
দরোজা
|
প্রেমমূলক
|
শীতের শহর ঘুরে প্রতিটি শীতার্ত দরোজায়
কড়া নেড়ে যাই
দরোজা খোলে না ।
একটি কুৎসিত হাত যদি খুলে দিতো
আবদ্ধ কপাট
একজোড়া অন্ধ চোখও নীমিলিত বিপন্ন পাতায়
সহানুভূতির নম্র কেশর ওড়াতো
একজোড়া বোবা ঠোঁটও যদি
কাঁপতো না বলা কিছু শব্দের তাড়ায়!
তবু জানি এই পোড়া গ্রহে
মোহন বন্দিত্ব নিয়ে একটি বাড়ানো হাত
হোক সে বিষণ্ণ ম্লান বিশীর্ণ পাণ্ডুর
খুব ক্লান্ত একজোড়া চোখ থাকে নিত্য পথ চেয়ে
না হোক ভ্রমরকৃষ্ণ কালো
তবু তার সজল উঠোনে জ্বলে প্রতিদিন মঙ্গল প্রদীপ
একজোড়া ঠোঁট আছে অপেক্ষায় তৃষ্ণার্ত তবুও
যেন এক শান্ত ছায়া অন্তহীন রোদের হাওরে
তালাবদ্ধ সন্ত্রস্ত এ দেশে আছে একটি দরোজা
সর্বদাই খোলা ।
|
https://banglarkobita.com/poem/famous/1024
|
2373
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
মেঘনাদবধ কাব্য (চতুর্থ সর্গ)
|
মহাকাব্য
|
নমি আমি,কবি-গুরু তব পদাম্বুজে,
বাল্মীকি;হে ভারতের শিরঃচূড়ামণি,
তব অনুগামী দাস,রাজেন্দ্র-সঙ্গমে
দিন যথা যায় দূর তীর্থ দরশনে;
তব পদ-চিহ্ন ধ্যান করি দিবানিশি,
পশিয়াছে কত যাত্রী যশের মন্দিরে,
দমনিয়া ভব-দম দুরন্ত শমনে—
অমর; শ্রীভর্ত্তৃহরি; সূরী ভবভূতি
শ্রীকন্ঠ;ভারতে খ্যাত বরপুত্র যিনি
ভারতীর, কালিদাস–সুমধুর-ভাষী;
মুরারী-মূরলীধ্বনি-সদৃশ মুরারি
মনোহর;কীর্ত্তিবাস,কীর্ত্তিবাস কবি,
এ বঙ্গের অলঙকার;–হে পিতঃ, কেমনে,
কবিতা-রসের সরে রাজহংস-কুলে
মিলি করি কেলি আমি, না শিখালে তুমি?
গাঁথিব নূতন মালা ,তুলি সযতনে
তব কাব্যদানে ফুল; ইচ্ছা সাজাইতে
বিবিধ ভূষনে ভাষা; কিন্তু কোথা পাব
(দীন আমি;) রত্নরাজী,তুমি নাহি দিলে,
রত্নাকর? কৃপা,প্রভু কর আকিন্চনে।
একাকিনি শোকাকুলা, অশোক-কাননে
কাঁদেন রাঘব-বান্ছা আঁধার কুটিরে
নীরবে;দুরন্ত চেড়ী,সতীরে ছাড়িয়া,
ফেরে দূরে মত্ত সবে উৎসব-কৌতুকে–
হীন-প্রাণা হরিণীরে রাখিয়া বাঘিনী
নির্ভয় হৃদয়ে যথা ফেরে দূর বনে
মলিন-বদনা দেবী,হায় রে যেমতি
খনির তিমির গর্ভে (না পারে পশিতে
সৌর-কর-রাশি যথা) সূর্য্যকান্ত-মণি;
কিম্বা বিম্বাধরা রমা অম্বুরাশি-তলে;
স্বনিছে পবন, দূরে রহিয়া রহিয়া
উছ্বাসে বিলাপী যথা; লড়িছে বিষাদে
মর্মরিয়া পাতাকুল; বসেছে অরবে
শাখে পাখী; রাশি রাশি কুসুম পড়েছে
তরুমূলে; যেন তরু, তাপি মনস্তাপে,
ফেলিয়াছে খুলি সাজ; দূরে প্রবাহিণী,
উচ্চ বিচী-রবে কাঁদি, চলিছে সাগরে,
কহিতে বারীশে যেন এ দুঃখ-কাহিনী;
না পশে সুধাংশু-অংশু সে ঘোর বিপিনে
ফোটে কি কমল কভু সমল সলিলে?
তবুও উজ্বল বন ও অপূর্ব্ব রূপে;
একাকিনী বসি দেবী, প্রভা আভাময়ী,
তমোময় ধামে যেন; হেন কালে তথা
সরমা সুন্দরী আসি বসিলা কাঁদিয়া
সতীর চরণ-তলে,সরমা সুন্দরী–
রক্ষঃকুল-রাজলক্ষী রক্ষোবধূ-বেশে;
কতক্ষনে চক্ষু-জল মুছি সুলোচনা
কহিলা মধুর স্বরে; ”দুরন্ত চেড়ীরা,
তোমারে ছাড়িয়া, দেবি ফিরিছে নগরে,
মহোৎসবে রত সবে আজি নিশা-কালে;
এই কথা শুনি আমি আইনু পূজিতে
পা-দুখানি। আনিয়াছি কৌটায় ভরিয়া
সিন্দুর; করিলে আজ্ঞা,সুন্দর ললাটে
দিব ফোঁটা। এয়ো তুমি, তোমার কি সাজে
এ বেশ? নিষ্ঠুর,হায়, দুষ্ট লঙ্কাপতি;
কে ছেঁড়ে পদ্মের পর্ণ? কেমনে হরিল
ও বরাঙ্গ-অলঙ্কার, বুঝিতে না পারি?
কৌটা খুলি,রক্ষো বধূ যত্নে দিলা ফোঁটা।
সীমন্তে ; সিন্দুর বিন্দু শোভিল ললাটে,
গোধূলি-ললাটে, আহা; তারা-রত্ন-যথা;
দিয়া ফোঁটা, পদ-ধূলি লইলা সরমা ।
”ক্ষম লক্ষি, ছুইনু ও দেব-আকাঙ্খিত
তনু;কিন্তু চির-দাসী দাসী ও চরণে;”
এতেক কহিয়া পুনঃ বসিলা যুবতী
পদতলে;আহা মরি সুবর্ণ-দেউটি
তুলসীর মূলে যেন জ্বলিল, উজলি
দশ দিশ; মৃদু-স্বরে কহিলা মৈথিলী;—
”বৃথা গন্জ দশাননে তুমি, বিধুমুখী;
আপনি খুলিয়া আমি ফেলাইনু দূরে
আভরণ,যবে পাপী আমারে ধরিল
বনাশ্রমে। ছড়াইনু পথে সে সকলে,
চিহ্ন হেতু। সেই হেতু আনিয়াছে হেথা–
এ কনক-লঙ্কাপুরে—-ধীর রঘুনাথে;
মণি,মুক্তা, রতন, কি আছে লো জগতে,
যাহে নাহি অবহেলি লভিতে সে ধনে?
যথা গোমুখীর মুখ হইতে সুস্বনে
ঝরে পূত বারি-ধারা, কহিলা জানকী,
মধুর ভাষিণী সতী, আদরে সম্ভাষি
সরমারে,—“হিতৈষিণী সীতার পরমা
তুমি,সখি; পূর্ব্ব-কথা শুনিবারে যদি
ইচ্ছা তব,কহি আমি, শুন মনঃ দিয়া।—
ছিনু মোরা, সুলোচনে, গোদাবরী-তীরে,
কপোত কপোতী যথা উচ্চ বৃক্ষ-চূড়ে
বাঁধি নীড়,থাকে সুখে;ছিনু ঘোর বনে,
নাম পঞ্চবটী,মর্ত্ত্যে সুর-বন-সম।
সদা করিতেন সেবা লক্ষণ সুমতি।
দন্ডক ভান্ডার যার, ভাবি দেখ মনে,
কিসের অভাব তার? যোগাতেন আনি
নিত্য ফল-মূল বীর সৌমিত্রি; মৃগয়া
করিতেন কভু প্রভু; কিন্তু জীব নাশে
সতত বিরত,সখি রাঘবেন্দ্র বলী,—
দয়ার সাগর নাথ ,বিদিত জগতে;
“ভুলিনু পূর্ব্বের সুখ। রাজার নন্দিনী
রঘু-কুল-বধু আমি; কিন্তু এ কাননে,
পাইনু, সরমা সই,পরম পিরীতি ;
কুটীরের চারিদিকে কত যে ফুটিত
ফুলকুল নিত্য নিত্য,কহিব কেমনে?
পঞ্চবটী-বন-চর মধু নিরবধি;
জাগাত প্রভাতে মোরে কহরি সুস্বরে
পিকরাজ;কোন রাণী,কহ; শশিুমুখি,
হেন চিত্ত-বিনোদন বৈতালিক-গীতে
খোলে আঁখি? শিখী সহ । শিখীনি সুখিনী
নাচিত দুয়ারে মোর; নর্ত্তক,নর্ত্তকী,
এ দোঁহার সম, রামা,আছে কি জগতে?
অতিথি আসিত নিত্য করভ,করভী,
মৃগ- শিশু, বিহঙ্গম,স্বর্ণ-অঙ্গ কেহ,
কেহ, শুভ্র,কেহ কাল,কেহ বা চিত্রিত,
যথা বাসবের ধনুঃ ঘন-বন-শিরে;
অহিংসক জীব যত। সেবিতাম সবে,
মহাদরে; পালিতাম পরম যতনে,
মরুভূমে স্রতোস্বতী তৃষাতুরে যথা,
আপনি সুজলবতী বারিদ-প্রসাদে।
সরসী আরসি মোর; তুলি কুবলয়ে,
(অতুল রতন-সম) পরিতাম কেশে;
সাজিতাম ফুল-সাজে; হাসিতেন প্রভু,
বনদেবী বলি মোরে সম্ভাষি কৌতুকে;
হায়, সখি, আর কি লো পাব প্রাণনাথে?
আর কি এ পোড়া আঁখি এ ছার জনমে
দেখিবে সে পা-দুখানি—আশার সরসে
রাজীব; নয়ন মণি? হে দারুণ বিধি,
কি পাপে পাপী এ দাসী তোমার সমীপে?
এতেক কহিয়া দেবী কাঁদিলা নীরবে।
কাঁদিলা সরমা সতী তিতি অশ্রু-নীরে।
কতক্ষনে চক্ষু-জল মুছি রক্ষোবধূ
সরমা, কহিলা সতী সীতার চরণে;—
”স্মরিলে পূর্ব্বের কথা ব্যাথা মনে যদি
পাও, দেবী, থাক তবে ; কি কাজ স্মরিয়া?—
হেরি তব অশ্রু-বারি ইচ্ছি মরিবারে;”
উত্তরিলা প্রিয়ম্বদা ( কাদম্বা যেমতি
মধু-স্বরা);–“এ অভাগী,হায়, লো সুভগে,
যদি না কাঁদিবে, তবে কে আর কাঁদিবে
এ জগতে? কহি, শুন পূর্ব্বের কাহিনী।
বরিষার কালে,সখি,প্লাবন-পীড়নে
কাতর,প্রবাহ,ঢালে,তীর অতিক্রমি,
বারি-রাশি দুই পাশে; তেমতি যে মনঃ
দুঃখিত,দুঃখের কথা কহে সে অপরে।
তেঁই আমি কহি,তুমি শুন,লো সরমে;
কে আছে সীতার আর এ অবরু-পুরে?
”পঞ্চবটী-বনে মোরা গোদাবরী-তটে
ছিনু সুখে। হায়, সখি,কেমনে বর্ণিব
সে কান্তার-কান্তি আমি? সতত স্বপনে
শুনিতাম মন-বীণা বন-দেবী-করে;
সরসীর তীরে বসি, দেখিতাম কভু
সৌর-কর-রাশি-বেশে সুরবালা-কেলি
পদ্মবনে; কভু সাধ্ধী ঋষিবংশ-বধূ
সুহাসিনী আসিতেন দাসীর কুটীরে,
সুধাংশুর অংশু যেন অন্ধকার ধামে;
অজিন (রন্জিত, আহা, কত শত রঙে;)
পাতি বসিতাম কভু দীর্ঘ তরুমূলে,
সখী-ভাবে সম্ভাষিয়া ছায়ায়,কভু বা
কুরঙ্গিনী-সঙ্গে রঙ্গে নাচিতাম বনে,
গাইতাম গীত শুনি কোকিলের ধ্বনি;
নব-লতিকার,সতি দিতাম বিবাহ
তরু-সহ; চুম্বিতাম মন্জরিত যবে
দম্পতী, মন্জরীবৃন্দে আনন্দে সম্ভাষি
নাতিনী বলিয়া সবে; গুন্জরিলে অলি,
নাতিনী-জামাই বলি বরিতাম তারে;
কভু বা প্রভুরর সহ ভ্রমিতাম সুখে
নদী-তটে; দেখিতাম তরল সলিলে
নূতন গগন যেন,নব তারাবলী,
নব নিশাকান্ত-কান্তি ; কভু বা উঠিয়া
পর্ব্বত-উপরে ,সখি বসিতাম আমি
নাথের চরণ-তলে, ব্রততী যেমতি
বিশাল রসাল-মূলে; কত যে আদরে
তুষিতেন প্রভু মোরে, বরষি বচন-
সুধা, হায়, কব কারে ? কব বা কেমনে?
শুনেছি কৈলাস-পুরে কৈলাস-নিবাসী
ব্যোমকেশ,স্বর্ণাসনে বসি গৌরী-সনে,
আগম,পুরাণ, বেদ, পঞ্চতন্ত্র-কথা
পঞ্চমুখে পঞ্চমুখ কহেন উমারে;
শুনিতাম সেইরূপে আমিও,রূপি,
নানাকথা ; এখনও, এ বিজন বনে,
ভাবি আমি শুনি যেন সে মধুর বাণী;—
সাঙ্গ কি দাসীর পক্ষে, হে নিষ্ঠুর বিধি,
সে সঙ্গীত ?”—নীরবিলা আয়ত-লোচনা
বিষাদে। কহিলা তবে সরমা সুন্দরী;—
“শুনিলে তোমার কথা, রাঘব-রমণি,
ঘৃণা জন্মে রাজ-ভোগে ; ইচ্ছা করে,ত্যজি
রাজ্য-সুখ, যাই চলি হেন বনবাসে;
কিন্তু ভেবে দেখি যদি,ভয় হয় মনে।
রবিকর যবে, দেবি, পশে বনস্থলে
তমোময়,নিজগুনে আলো করে বনে
সে কিরণ; নিশি যবে যায় কোন দেশে,
মলিন-বদন সবে তার সমাগমে;
যথা পদার্পণ তুমি কর, মধুমতি,
কেন না হইবে সুখী সর্ব্ব জন তথা,
জগৎ-আনন্দ তুমি, ভুবন-মোহিনী;
কহ, দেবি, কি কৌশলে হরিল তোমারে
রক্ষঃপতি? শুনিয়াছে বীণা-ধ্বনি দাসী,
পিকবর-রব নব পল্লব-মাঝারে
সরষ মধুর মাসে ; কিন্তু নাহি শুনি
হেন মধুমাখা কথা কভু এ জগতে;” ===========
|
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/meghnadbodh-kabya-fourth-section/
|
4328
|
শামসুর রাহমান
|
অসুস্থ ঈগল নীলিমায়
|
প্রেমমূলক
|
অসুস্থ ঈগল নীলিমায় তার পক্ষ বিস্তারের
স্মৃতি নিয়ে যেমন অনেক নিচে সময়ের ভার
ব’য়ে চলে, ক্ষীণ দৃষ্টি মেলে দূর নীলিমায়র
দিকে দ্যাখে মাঝে মাঝে, কখনোর পাহাড়ের
চড়ার সৌন্দর্য ভাবে, তেমনি আমিও হাহাকারের
প্রতিমৃর্তি হয়ে রুক্ষ ধুলায় ছিলাম পড়ে ধার
ছিলোনা অস্তিত্বে প্রায়, আতংকিত বিধ্বস্ত ডানার
প্রতিটি পালকে চিহ্ন নিষাদের ক্রূর প্রহারের।সহসা ধুলায় কী সুন্দর ফুলের সম্ভার জাগে,
আর রুক্ষ কৃষ্ণপথে বসন্তবাহার মুখরিত,
তোমাকে দেখেই রোগা ঈগলের আর্ত চক্ষুদ্বয়
যৌবনের মতো জ্বলজ্বলে হয়, দীপ্র অনুরাগে
বুকের ভেতর হ্রদ দুলে ওঠে, পুনরায় ভীত
সন্ত্রস্ত সত্তায় তার উদ্ভাসিত বাঁচার বিস্ময়। (মাতাল ঋত্বিক কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/osustho-igol-nilimay/
|
5672
|
সুকুমার রায়
|
ভালরে ভাল
|
ছড়া
|
দাদা গো! দেখছি ভেবে অনেক দূর
এই দুনিয়ার সকল ভাল,
আসল ভাল নকল ভাল,
সস্তা ভাল দামীও ভাল,
তুমিও ভাল আমিও ভাল,
হেথায় গানের ছন্দ ভাল,
হেথায় ফুলের গন্ধ ভাল,
মেঘ-মাখানো আকাশ ভাল,
ঢেউ- জাগানো বাতাস ভাল,
গ্রীষ্ম ভাল বর্ষা ভাল,
ময়লা ভাল ফরসা ভাল,
পোলাও ভাল কোর্মা ভাল,
মাছপটোলের দোলমা ভাল,
কাঁচাও ভাল পাকাও ভাল,
সোজাও ভাল বাঁকাও ভাল,
কাঁসিও ভাল ঢাকও ভাল,
টিকিও ভাল টাক্ও ভাল,
ঠেলার গাড়ী ঠেলতে ভাল,
খাস্তা লুচি বেলতে ভাল,
গিট্কিরি গান শুনতে ভাল,
শিমুল তুলো ধুনতে ভাল,
ঠান্ডা জলে নাইতে ভাল।
কিন্তু সবার চাইতে ভাল-
পাঁউরুটি আর ঝোলা গুড়।
|
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/bhalore-bhalo/
|
4258
|
শঙ্খ ঘোষ
|
জন্মদিন
|
চিন্তামূলক
|
তোমার জন্মদিনে কী আর দেব এই কথাটুকু ছাড়া
আবার আমাদের দেখা হবে কখনো
দেখা হবে তুলসীতলায় দেখা হবে বাঁশের সাঁকোয়
দেখা হবে সুপুরি বনের কিনারে
আমরা ঘুরে বেড়াবো শহরের ভাঙা অ্যাসফল্টে অ্যাসফল্টে
গনগনে দুপুরে কিংবা অবিশ্বাসের রাতে
কিন্তু আমাদের ঘিরে থাকবে অদৃশ্য কত সুতনুকা হাওয়া
ওই তুলসী কিংবা সাঁকোর কিংবা সুপুরির
হাত তুলে নিয়ে বলব, এই তো, এইরকমই, শুধু
দু-একটা ব্যথা বাকি রয়ে গেল আজও
যাবার সময় হলে চোখের চাওয়ায় ভিজিয়ে নেবো চোখ
বুকের ওপর ছুঁয়ে যাবো আঙুলের একটি পালক
যেন আমাদের সামনে কোথাও কোনো অপঘাত নেই আর
মৃত্যু নেই দিগন্ত অবধি
তোমার জন্মদিনে কী আর দেবো শুধু এই কথাটুকু ছাড়া যে
কাল থেকে রোজই আমার জন্মদিন।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%b6%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%96-%e0%a6%98%e0%a7%8b%e0%a6%b7/
|
3743
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
মৃত্যুমাধুরী
|
সনেট
|
পরান কহিছে ধীরে—হে মৃত্যু মধুর,
এই নীলাম্বর, এ কি তব অন্তঃপুর!
আজি মোর মনে হয়, এ শ্যামলা ভূমি
বিস্তীর্ণ কোমল শয্যা পাতিয়াছ তুমি।
জলে স্থলে লীলা আজি এই বরষার,
এই শান্তি, এ লাবণ্য, সকলই তোমার।
মনে হয়, যেন তব মিলন-বিহনে
অতিশয় ক্ষুদ্র আমি এ বিশ্বভুবনে।
প্রশান্ত করুণচক্ষে, প্রসন্ন অধরে,
তুমি মোরে ডাকিতেছ সর্ব চরাচরে।
প্রথমমিলনভীতি ভেঙেছে বধূর
তোমার বিরাট মূর্তি নিরখি মধুর।
সর্বত্র বিবাহবাঁশি উঠিতেছে বাজি,
সর্বত্র তোমার ক্রোড় হেরিতেছি আজি। (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/mrittyumadhuri/
|
4247
|
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
|
শিশিরভেজা শুকনো খর
|
চিন্তামূলক
|
শিশিরভেজা শুকনো খর শিকড়বাকড় টানছে
মিছুবাড়ির জনলা দোর ভিতের দিকে টানছে
প্রশাখাছাড় হৃদয় আজ মূলের দিকে টানছেভাল ছিলুম জীর্ণ দিন আলোর ছিল তৃষ্ণা
শ্বেতবিধুর পাথর কুঁদে গড়েছিলুম কৃষ্ণা
নিরবয়ব মূর্তি তার, নদীর কোলে জলাপাহার …
বনতলের মাটির ঘরে জাতক ধান ভানছে
শুভশাঁখের আওয়াজ মেলে জাতক ধান ভানছে
করুণাময় ঊষার কোলে জাতক ধান ভানছে
অপরিসীম দুঃখসুখ ফিরিয়েছিলো তার মুখ
প্রসারণের উদাসীনতা কোথাও ব’সে কাঁদছে
প্রশাখাছাড় হৃদয় আজ মূলের দিকে টানছে
|
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/shishirbheja-shukno-khor/
|
1503
|
নির্মলেন্দু গুণ
|
বহুগামীর স্বীকারোক্তি
|
চিন্তামূলক
|
কতো নারী-সরোবরে থেমেছে আমার রথ;
কতো ফুলে-ফলে পল্লবিত হয়েছে জীবন।
যখন পড়েছি প্রেমে পাগলের মত পড়েছি।
বহু-জীবনের বহু-বাসনায় আমি বহুগামী।তবে আমি একা বহুমাগিতার ভূতে-পাওয়া
এক কামতুর কবি, একথা বিশ্বাস করি না;
জানি জীবমাত্রই বহুগামী স্বভাবে, স্বজ্ঞায়
এই কথা কেউ ভোলে না, কেউ ভুলে যায়।পরমহংসদেব বা ঋষি বিবেকানন্দের মতোন
আত্মপীড়ন রণে পারদর্শিতা করিনি অর্জন।
মন স্থির করা হয়তো সম্ভব অদৃশ্য ঈশ্বরে,
কিন্তু অসম্ভব জীববংশে, নারী কিংবা নরে।
|
https://www.bangla-kobita.com/nirmalendugoon/bahugamir-sikarokti/
|
3183
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
|
চিন্তামূলক
|
তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনা-জালে,
হে ছলনাময়ী।
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে
সরল জীবনে।
এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত;
তার তরে রাখ নি গোপন রাত্রি।
তোমার জ্যোতিষ্ক তারে
যে পথ দেখায়
সে যে তার অন্তরের পথ,
সে যে চিরস্বচ্ছ ,
সহজ বিশ্বাসে সে যে
করে তারে চিরসমুজ্জল।
বাহিরে কুটিল হোক অন্তরে সে ঋজু,
এই নিয়ে তাহার গৌরব।
লোকে তারে বলে বিড়ম্বিত।
সত্যেরে সে পায়
আপন আলোকে ধৌত অন্তরে অন্তরে।কিছুতে পারে না তারে প্রবঞ্চিতে,
শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে
আপন ভাণ্ডারে।
অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে
শান্তির অক্ষয় অধিকার। (শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tomar-srishtir-poth-rekhecho-akirno-kori/
|
5258
|
শামসুর রাহমান
|
সন্দেহপ্রবণ নই
|
সনেট
|
এখন নতুন নয় আর আমাদের পরিচয়।
বেশ কিছুদিন, বলা যায়, কী মধুর এক সাথে
কাটিয়েছি আমরা দু’জন কথা বলে কত, হাতে
হাত রেখে, পথ চলে শস্যক্ষেত, সাঁকো, জলাশয়
বনানীর ধার ঘেঁসে। তোমার সান্নিধ্যে প্রতিবার
গিয়েছি, যেমন ছুটে যায় দ্রুতপায়ে একা একা
পুণ্যার্থী তীর্থের দিকে আর যখনই হয়েছে দেখা
তোমার দৃষ্টিতে শূচি হয়েছে তো সমগ্র আমার।যতই প্রগাঢ় আর দীর্ঘ হোক পরিচয় আমাদের,
যতই বলো না কেন ভালোবাসি তোমাকেই আমি,
তবু এক অস্থিরতা বারে বারে ক্রুর বৃশ্চিকের
মতোন দংশন করে আমাকে এবং অন্তর্যামী
সাক্ষী আমি স্বভাবত সন্দেহপ্রবণ নই মোটে;
তবুও সন্দেহ-কীট তোমার সত্তায় মাথা কোটে। (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
|
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sondeho-probon-noi/
|
2012
|
বুদ্ধদেব বসু
|
শিরোনামহীন
|
প্রেমমূলক
|
ওগো চপল-নয়না সুন্দরী
তোলো মোর পানে তব দুই আঁখি,
মম শিয়রের কাছে গুঞ্জরি’
গাও সকল অগীত সঙ্গীতে
মোর দেহমন রও ঢাকি
তব স্বপন-আবেশ-হিল্লোলে,
চির- নিত্য-নূতন ভঙ্গীতে
ঢেউ তোলো মোর প্রাণ-সিন্ধুতে,
সুখে উচ্ছসিয়া ওঠে কল্লোলে
ছোটে দুই তট দেশ লঙ্ঘিয়া,
চাহে গ্রাসিতে পূর্ণ ইন্দুকে
মহা আকাশের দ্যায় রঙ্গিয়া
ওগো মোর পিপাসিত যৌবনে
কর শান্ত একটি চুম্বনে।
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%b9%e0%a7%80%e0%a6%a8-%e0%a6%ac%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%ac-%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a7%81/
|
5566
|
সুকুমার রায়
|
আজব খেলা
|
ছড়া
|
সোনার মেঘে আল্তা ঢেলে সিঁদুর মেখে গায়
সকাল সাঁঝে সূর্যি মামা নিত্যি আসে যায় ।
নিত্যি খেলে রঙের খেলা আকাশ ভ’রে ভ’রে
আপন ছবি আপনি মুছে আঁকে নূতন ক’রে ।
ভোরের ছবি মিলিয়ে দিল দিনের আল জ্বেলে
সাঁঝের আঁকা রঙিন ছবি রাতের কালি ঢেলে ।
আবার আঁকে আবার মোছে দিনের পরে দিন
আপন সাথে আপন খেলা চলে বিরামহীন ।
ফুরায় নাকি সোনার খেলা ? রঙের নাহি পার ?
কেউ কি জানে কাহার সাথে এমন খেলা তার ?
সেই খেলা, যে ধরার বুকে আলোর গানে গানে
উঠ্ছে জেগে- সেই কথা কি সুর্যিমামা জানে ?
|
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%9c%e0%a6%ac-%e0%a6%96%e0%a7%87%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a7%9f/
|
3791
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
যে ফুল এখনো কুঁড়ি
|
রূপক
|
যে ফুল এখনো কুঁড়ি
তারি জন্মশাখে
রবি নিজ আশীর্বাদ
প্রতিদিন রাখে। (স্ফুলিঙ্গ)
|
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/je-ful-ekhono-kuri/
|
2922
|
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
|
কৃপণ -খেয়া
|
রূপক
|
আমি ভিক্ষা করে ফিরতেছিলেমগ্রামের পথে পথে,তুমি তখন চলেছিলেতোমার স্বর্ণরথে।
অপূর্ব এক স্বপ্ন-সমলাগতেছিল চক্ষে মম–কী বিচিত্র শোভা তোমার,কী বিচিত্র সাজ।
আমি মনে ভাবেতেছিলেম,এ কোন্ মহারাজ।
আজি শুভক্ষণে রাত পোহালোভেবেছিলেম তবে,আজ আমারে দ্বারে দ্বারেফিরতে নাহি হবে।
বাহির হতে নাহি হতেকাহার দেখা পেলেম পথে,চলিতে রথ ধনধান্যছড়াবে দুই ধারে–মুঠা মুঠা কুড়িয়ে নেব,নেব ভারে ভারে।
দেখি সহসা রথ থেমে গেলআমার কাছে এসে,আমার মুখপানে চেয়েনামলে তুমি হেসে।
দেখে মুখের প্রসন্নতাজুড়িয়ে গেল সকল ব্যথা,হেনকালে কিসের লাগিতুমি অকস্মাৎ“আমায় কিছু দাও গো’ বলেবাড়িয়ে দিলে হাত।
মরি, এ কী কথা রাজাধিরাজ,“আমায় দাও গো কিছু’!শুনে ক্ষণকালের তরেরইনু মাথা-নিচু।
তোমার কী-বা অভাব আছেভিখারী ভিক্ষুকের কাছে।
এ কেবল কৌতুকের বশেআমায় প্রবঞ্চনা।
ঝুলি হতে দিলেম তুলেএকটি ছোটো কণা।
যবে পাত্রখানি ঘরে এনেউজাড় করি– এ কী!ভিক্ষামাঝে একটি ছোটোসোনার কণা দেখি।
দিলেম যা রাজ-ভিখারীরেস্বর্ণ হয়ে এল ফিরে,তখন কাঁদি চোখের জলেদুটি নয়ন ভরে–তোমায় কেন দিই নি আমারসকল শূন্য করে।
|
https://banglapoems.wordpress.com/2011/11/30/%e0%a6%95%e0%a7%83%e0%a6%aa%e0%a6%a3-%e0%a6%96%e0%a7%87%e0%a6%af%e0%a6%bc%e0%a6%be/
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.