id
stringlengths
1
4
poet
stringclasses
120 values
title
stringlengths
1
54
class
stringclasses
21 values
text
stringlengths
13
18.7k
source_url
stringlengths
40
246
17
অমিতাভ দাশগুপ্ত
গঙ্গা
চিন্তামূলক
কবি আজকাল ভোরবেলা ওঠে বাগবাজারের গঙ্গার ঘাঁটে যায় পাশে বাঁ হাতের মতো স্ত্রী কবির সারা শরীরে সার সার পিনিশ সালতি নৌকো লঞ্চের ছুঁচলো সিটি সমুদ্রগামী জাহাজের সুগ্মভীর ডাক অথচ পিত্তপ্রধান পায়ের পাতা সিঁড়ির প্রথম ধাপে পেতে সে চুপচাপ বসে থাকে আর সমস্ত গঙ্গা যখন একটি আভূমিপ্রণতা নারী হয়ে তাঁর রোগা পা ছুঁয়ে প্রণাম করে— রাগী বাবার মতো সে গোড়ালি সরিয়ে নেয়।সে জানে তাঁর রাতজাগা পিঠে বর্শা হয়ে বিঁধে আছে নিখাকি কলকাতার নিঃশ্বাস কাজল, মদ আর রুপোর গঁদের ভেতর আকন্ঠ ডুকে আছে মড়াপোড়ানো কলের চিমনি জোব চার্নকের থ্যাঁৎলানো অহঙ্কার।ওপারে বেলুড় মঠ দেখা যায় কবির পাশে সারদামণির মতো বসে থাকে কবির স্ত্রী কবির চোখের সামনে প্রতিদিন গলায় কলসি বেঁধে গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বারুইপুর হরিনাভি ভাটপাড়া জলে মিশে একাকার জোড়াসাঁকো হাড়কাটাবাজে বলিবাদ্য বানফোঁড়ার বাজনা জয়জোকার ডবকা দক্ষিণ থেকে হাজামজা উত্তরে উড়ে আসে কালো নোটের বান্ডিল কাগজের নৌকো স্ফুরিত পরিসংখ্যান অল-ক্লিয়ারের বিপ বিপআর কাশী মিত্তির নিমতলা রতনবাবুর ঘাটে ঘাটে শেষবারের মতো হাওয়ায় হাওয়ায় ডুক্রে ওঠে ভূপেন হাজারিকা— গঙ্গা আমার মা… গঙ্গা আমার মা… ।কবি আজকাল ভোরবেলা ওঠে বাগবাজারের গঙ্গার ঘাঁটে যায় পাশে বাঁ হাতের মতো স্ত্রী কবির সারা শরীরে সার সার পিনিশ সালতি নৌকো লঞ্চের ছুঁচলো সিটি সমুদ্রগামী জাহাজের সুগ্মভীর ডাক অথচ পিত্তপ্রধান পায়ের পাতা সিঁড়ির প্রথম ধাপে পেতে সে চুপচাপ বসে থাকে আর সমস্ত গঙ্গা যখন একটি আভূমিপ্রণতা নারী হয়ে তাঁর রোগা পা ছুঁয়ে প্রণাম করে— রাগী বাবার মতো সে গোড়ালি সরিয়ে নেয়।সে জানে তাঁর রাতজাগা পিঠে বর্শা হয়ে বিঁধে আছে নিখাকি কলকাতার নিঃশ্বাস কাজল, মদ আর রুপোর গঁদের ভেতর আকন্ঠ ডুকে আছে মড়াপোড়ানো কলের চিমনি জোব চার্নকের থ্যাঁৎলানো অহঙ্কার।ওপারে বেলুড় মঠ দেখা যায় কবির পাশে সারদামণির মতো বসে থাকে কবির স্ত্রী কবির চোখের সামনে প্রতিদিন গলায় কলসি বেঁধে গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বারুইপুর হরিনাভি ভাটপাড়া জলে মিশে একাকার জোড়াসাঁকো হাড়কাটাবাজে বলিবাদ্য বানফোঁড়ার বাজনা জয়জোকার ডবকা দক্ষিণ থেকে হাজামজা উত্তরে উড়ে আসে কালো নোটের বান্ডিল কাগজের নৌকো স্ফুরিত পরিসংখ্যান অল-ক্লিয়ারের বিপ বিপআর কাশী মিত্তির নিমতলা রতনবাবুর ঘাটে ঘাটে শেষবারের মতো হাওয়ায় হাওয়ায় ডুক্রে ওঠে ভূপেন হাজারিকা— গঙ্গা আমার মা… গঙ্গা আমার মা… ।
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%97%e0%a6%99%e0%a7%8d%e0%a6%97%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%be-%e0%a6%85%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%ad-%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b6/
3121
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ঝুলন
রূপক
আমি   পরানের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা নিশীথবেলা। সঘন বরষা, গগন আঁধার হেরো বারিধারে কাঁদে চারিধার--- ভীষণ রঙ্গে ভবতরঙ্গে ভাসাই ভেলা; বাহির হয়েছি স্বপ্নশয়ন করিয়া হেলা রাত্রিবেলা॥ওগো,   পবনে গগনে সাগরে আজিকে কী কল্লোল! দে দোল্ দোল্। পশ্চাত্‍‌ হতে হাহা ক'রে হাসি মত্ত ঝটিকা ঠেলা দেয় আসি, যেন এ লক্ষ যক্ষশিশুর অট্টরোল। আকাশে পাতালে পাগলে মাতালে হট্টগোল! দে দোল্ দোল্।আজি   জাগিয়া উঠিয়া পরান আমার বসিয়া আছে বুকের কাছে। থাকিয়া থাকিয়া উঠিছে কাঁপিয়া, ধরিছে আমার বক্ষ চাপিয়া, নিঠুর নিবিড় বন্ধনসুখে হৃদয় নাচে; ত্রাসে উল্লাসে পরান আমার ব্যাকুলিয়াছে বুকের কাছে॥হায়,   এতকাল আমি রেখেছিনু তারে যতনভরে শয়ন-'পরে। ব্যথা পাছে লাগে---- দুখ পাছে জাগে নিশিদিন তাই বহু অনুরাগে বাসরশয়ন করেছি রচন কুসুমথরে; দুয়ার রুধিয়া রেখেছিনু তারে গোপন ঘরে যতনভরে॥কত    সোহাগ করেছি চুম্বন করি নয়নপাতে স্নেহের সাথে। শুনায়েছি তারে মাথা রাখি পাশে কত প্রিয়নাম মৃদুমধুভাষে, গুঞ্জরতান করিয়াছি গান জ্যোত্‍‌স্নারাতে; যা-কিছু মধুর দিয়েছিনু তার দুখানি হাতে স্নেহের সাথে॥শেষে   সুখের শয়নে শ্রান্ত পরান আলসরসে আবেশবশে। পরশ করিলে জাগে না সে আর, কুসুমের হার লাগে গুরুভার, ঘুমে, জাগরণে মিশি একাকার নিশিদিবসে বেদনাবিহীন অসাড় বিরাগ মরমে পশে আবেশবশে॥ঢালি   মধুরে মধুর বধূরে আমার হারাই বুঝি, পাই নে খুঁজি। বাসরের দীপ নিবে নিবে আসে, ব্যাকুল নয়ন হেরি চারি পাশে শুধু রাশি রাশি শুষ্ক কুসুম হয়েছে পুঁজি; অতল স্বপ্নসাগরে ডুবিয়া মরি যে যুঝি কাহারে খুঁজি॥তাই   ভেবেছি আজিকে খেলিতে হইবে নূতন খেলা রাত্রিবেলা মরণদোলায় ধরি রশিগাছি বসিব দুজনে বড়ো কাছাকাছি, ঝঞ্ঝা আসিয়া অট্ট হাসিয়া মারিবে ঠেলা; আমাতে প্রাণেতে খেলিব দুজনে ঝুলনখেলা নিশীথবেলা॥           দে দোল্ দোল্। দে দোল্ দোল্। এ মহাসাগরে তুফান তোল্ বধূরে আমার পেয়েছি আবার, ভরেছে কোল। প্রিয়ারে আমার তুলেছে জাগায়ে প্রলয়রোল। বক্ষশোণিতে উঠেছে আবার কী হিল্লোল! ভিতরে বাহিরে জেগেছে আমার কী কল্লোল! উড়ে কুন্তল, উড়ে অঞ্চল, উড়ে বনমালা বায়ুচঞ্চল, বাজে কঙ্কণ বাজে কিঙ্কিণী--- মত্তরোল। দে দোল্ দোল্।      আয় রে ঝঞ্ঝা, পরানবধূর আবরণরাশি করিয়া দে দূর, করি লুণ্ঠন অবগুণ্ঠন-বসন খোল্। দে দোল্ দোল্।      প্রাণেতে আমাতে মুখোমুখি আজ চিনি লব দোঁহে ছাড়ি ভয়-লাজ, বক্ষে বক্ষে পরশিব দোঁহে ভাবে বিভোল। দে দোল্ দোল্। স্বপ্ন টুটিয়া বাহিরিছে আজ দুটি পাগল। দে দোল্ দোল্।রামপুর বোয়ালিয়া, ১৫ চৈত্র ১২৯৯ সূত্রঃ সোনার তরী
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jhulon/
6050
হেলাল হাফিজ
ফেরীঅলা
চিন্তামূলক
কষ্ট নেবে কষ্ট হরেক রকম কষ্ট আছে কষ্ট নেবে কষ্ট ! লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট, আলোর মাঝে কালোর কষ্ট ‘মালটি-কালার’ কষ্ট আছে কষ্ট নেবে কষ্ট । ঘরের কষ্ট পরেরর কষ্ট পাখি এবং পাতার কষ্ট দাড়ির কষ্ট চোখের বুকের নখের কষ্ট, একটি মানুষ খুব নীরবে নষ্ট হবার কষ্ট আছে কষ্ট নেবে কষ্ট । প্রেমের কষ্ট ঘৃণার কষ্ট নদী এবং নারীর কষ্ট অনাদর ও অবহেলার তুমুল কষ্ট, ভুল রমণী ভালোবাসার ভুল নেতাদের জনসভার হাইড্রোজনে দুইটি জোকার নষ্ট হবার কষ্ট আছে কষ্ট নেবে কষ্ট । দিনের কষ্ট রাতের কষ্ট পথের এবং পায়ের কষ্ট অসাধারণ করুণ চারু কষ্ট ফেরীঅলার কষ্ট কষ্ট নেবে কষ্ট । আর কে দেবে আমি ছাড়া আসল শোভন কষ্ট, কার পুড়েছে জন্ম থেকে কপাল এমন আমার মত ক’জনের আর সব হয়েছে নষ্ট, আর কে দেবে আমার মতো হৃষ্টপুষ্ট কষ্ট ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/122
4643
শামসুর রাহমান
ক্ষ্যাপার মতোই ঘুরি
সনেট
এখন প্রত্যূষ, ফিকে অন্ধকার, হৃদয়ে শ্রাবণ অবিরাম; বসে আছি, নির্ঘুম কেটেছে সারারাত, দু’চোখে মরিচ-গুঁড়ো, এই প্রভাতী হাওয়ার হাত বুলোয় প্রলেপ কিছু, তবু শুধু হু হু করে মন। যে আমার স্থৈর্য, নিদ্রা অগোচরে করেছে হরণ, তাকেই সঁপেছি মনপ্রাণ, তারই উদ্দেশে কবিতা লিখি নিত্য ভূতগ্রস্ততায়; সে-যে প্রজ্ঞাপারমিতা কষ্ট দেয়, তবু তারই কাছে চাই সর্বদা শরণ।ক্ষ্যাপার মতোই ঘুরি ফুটপাতে, পার্কে নদীতীরে তার টানে, যে আমাকে হাতছানি দেয় বারবার। আমিতো মুখশ্রী তার খুঁজে ফিরি এই ঘেমো ভিড়ে, কখনো মাতাল ক্লাবে, কখনো সিঁড়িতে সিনেমার ক্লান্তিতে ভীষণ ডুবে। দেখা দিয়ে চকিতে মিলায়, আমি অসহায় একা; শুয়ে আছে সে তার ভিলায়।
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/khapar-motoi-ghuri/
4755
শামসুর রাহমান
ঢের ঢের দিনরাত
চিন্তামূলক
এই যে এখন এই হাড়-কাঁপানো শীতের ভোরবেলা কাঠের চেয়ারে ব’সে একটি কবিতা রচনার কথা ভেবে কলম নিয়েছি হাতে, দেখছি বাইরে ধূসর কুয়াশা তার বিছিয়েছে জাল, যখন বাড়ির সবাই ঘুমের গাঢ় মখমলে ডুবে আছে, আমি কিছু শব্দ খুঁজে বেড়াচ্ছি, যেমন নাবিক তালাশ করে প্রকৃতির মায়াঘেরা দ্বীপপুঞ্জ দীপ্র আগ্রহ-উন্মুখ চোখে। প্রকৃত সন্ধান জেগে আছে আমার এখনও ঢের ঢের দিন রাত মানস ভ্রমণে মগ্ন থাকার পরেও। ডাঁই ডাঁই শাদা কাগজের বুকে হরফের ছবি আঁকা হয়ে গেছে, তবু সৃজনের ক্ষুধায় কাতর আজও আমি।কী হয়, কী হবে সারি সারি শব্দ সাজিয়ে কাগজে? আমি তো খুঁজি অমরতা কোনওকালে পঙ্‌ক্তিমালা কালের গলায় সাগ্রহে ঝুলিয়ে দিয়ে। বিনীত ভঙ্গিতে যতটুকু পেরেছি সঞ্চয় থেকে করেছি অর্পণ। বলা যায়, দিয়েছি উজাড় করে সব, জানি না কিছুর তার প্রকৃত গৃহীত হবে, নাকি, শুধু হেলার কলঙ্ক নিয়ে লুটোবে ধুলোয়! হোক যত অবহেলা, না পড়ার সপ্রশংস দৃষ্টি কাব্যনাম্নী রূপসীর এই অভাজজনের ওপর, তবু তার পলায়নপর কায়া কিংবা ছায়ার পেছনে যত পারি তত ষড়ঋতু অবিরাম ছুটব তুমুল লোকালয়ে কিংবা বিরানায় পর্বত চূড়ায় আর উদাস প্রান্তরে দেখব সে কতটা নিঠুরা উদাসীন হতে পারে।   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/dher-dher-dinrat/
816
জসীম উদ্‌দীন
নকশী কাঁথার মাঠ – ০৩
কাহিনীকাব্য
তিন চন্দনের বিন্দু বিন্দু কাজলের ফোঁটা কালিয়া মেঘের আড়ে বিজলীর ছটা — মুর্শিদা গান ওই গাঁখানি কালো কালো, তারি হেলান দিয়ে, ঘরখানি যে দাঁড়িয়ে হাসে ছোনের ছানি নিয়ে ; সেইখানে এক চাষীর মেয়ে নামটি তাহার সোনা, সাজু বলেই ডাকে সবে, নাম নিতে যে গোনা | লাল মোরগের পাখার মত ওড়ে তাহার শাড়ী, ভোরের হাওয়া যায় যেন গো প্রভাতী মেঘ নাড়ি | মুখখানি তার ঢলঢল ঢলেই যেত পড়ে, রাঙা ঠোঁটের লাল বাঁধনে না রাখলে তায় ধরে | ফুল-ঝর-ঝর জন্তি গাছে জড়িয়ে কেবা শাড়ী, আদর করে রেখেছে আজ চাষীদের ওই বাড়ি | যে ফুল ফোটে সোণের খেতে, ফোটে কদম গাছে, সকল ফুলের ঝলমল গা-ভরি তার নাচে | কচি কচি হাত পা সাজুর, সোনায় সোনার খেলা, তুলসী-তলায় প্রদীপ যেন জ্বলছে সাঁঝের বেলা | গাঁদাফুলের রঙ দেখেছি, আর যে চাঁপার কলি, চাষী মেয়ের রূপ দেখে আজ তাই কেমনে বলি ? রামধনুকে না দেখিলে কি-ই বা ছিল ক্ষোভ, পাটের বনের বউ টুবাণী, নাইক দেখার লোভ | দেখেছি এই চাষী মেয়ের সহজ গেঁয়ো রূপ, তুলসী-ফুলের মঞ্জরী কি দেব-দেউলের ধূপ! দু একখানা গয়না গায়ে, সোনার দেবালয়ে, জ্বলছে সোনার পঞ্চ প্রদীপ কার বা পূজা বয়ে! পড়শীরা কয়—মেয়ে ত নয়, হলদে পাখির ছা, ডানা পেলেই পালিয়ে যেত ছেড়ে তাদের গাঁ | এমন মেয়ে—বাবা ত নেই, কেবল আছেন মা ; গাঁওবাসীরা তাই বলে তায় কম জানিত না | তাহার মতন চেরন “সেওই” কে কাটিতে পারে, নক্সী করা পাকান পিঠায় সবাই তারে হারে | হাঁড়ির উপর চিত্র করা শিকেয় তোলা ফুল, এই গাঁয়েতে তাহার মত নাইক সমতুল | বিয়ের গানে ওরই সুরে সবারই সুর কাঁদে, “সাজু গাঁয়ের লক্ষ্মী মেয়ে” — বলে কি লোক সাধে? ***** সাজু = পূর্ববঙ্গের কোনো কোনো জেলায় বাপের বাড়িতে মুসলমান মেয়েদের নাম ধরে ডাকা হয় না | বড় মেয়েকে বড়ু, মেজ মেয়েকে মাজু, সেজ মেয়েকে সাজু এইভাবে ডাকা হয় | শ্বশুর-বাড়ির লোকে কিন্তু এ নামে ডাকতে পারে না | গোনা = পাপ বউ টুবাণী = মাঠের ফুল
https://banglarkobita.com/poem/famous/806
3068
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জটিল সংসার
চিন্তামূলক
জটিল সংসার, মোচন করিতে গ্রন্থি জড়াইয়া পড়ি বারংবার। গম্য নহে সোজা, দুর্গম পথের যাত্রা স্কন্ধে বহি দুশ্চিন্তার বোঝা। পথে পথে যথাতথা শত শত কৃত্রিম বক্রতা। অণুক্ষণ হতাশ্বাস হয়ে শেষে হার মানে মন। জীবনের ভাঙা ছন্দে ভ্রষ্ট হয় মিল, বাঁচিবার উৎসাহ ধূলিতলে লুটায়ে শিথিল। ওগো আশাহারা, শুষ্কতার 'পরে আনো নিখিলের রসবন্যাধারা। বিরাট আকাশে, বনে বনে, ধরণীর ঘাসে ঘাসে সুগভীর অবকাশ পূর্ণ হয়ে আছে গাছে গাছে, অন্তহীন শান্তি-উৎসস্রোতে। অন্তঃশীল যে রহস্য আঁধারে আলোতে তারে সদ্য করুক আহ্বান আদিম প্রাণের যজ্ঞে মর্মের সহজ সামগান। আত্মার মহিমা যাহা তুচ্ছতায় দিয়েছে জর্জরি ম্লান অবসাদে,তারে দাও দূর করি, লুপ্ত হয়ে যাক শূন্যতলে দ্যুলোকের ভূলোকের সন্মিলিত মন্ত্রণার বলে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jatel-sansar/
5799
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
নারী ও শিল্প
চিন্তামূলক
ঘুমন্ত নারীকে জাগাবার আগে আমি তাকে দেখি উদাসীন গ্রীবার ভঙ্গি, শ্লোকের মতন ভুরু ঠোঁটে স্বপ্ন বিংবা অসমাপ্ত কথা এ যেন এক নারীর মধ্যে বহু নারী, বিংবা দর্পণের ঘরে বস চিবুকের ওপরে এসে পড়েছে চুলের কালো ফিতে সরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে না, কেননা আবহমান কাল থেকে বেণীবন্ধনের বহু উপমা কয়েছে আঁচল ঈষৎ সরে গেছে বুক থেকে-এর নাম বিস্রস্ত, এ রকম হয় পেটের মসৃণ ত্বক, ক্ষীণ চাঁদ নাভি, সায়ার দড়ির গিট উরুতে শাড়ীর ভাঁজ, রেখার বিচিত্র কোলাহল পদতল-আল্পনার লক্ষ্মীর ছাপের মতো এই নারী নারী ও ঘুমন্ত নারী এক নয় এই নির্বাক চিত্রটি হতে পারে শিল্প, যদি আমি ব্যবধান টিক রেখে দৃষ্টিকে সন্ন্যাসী করি হাতে তুলে খুঁজে আনি মন্ত্রের অক্ষর তখন নারীকে দেখা নয়, নিজেকে দেখাই বড় হয়ে ওঠে বলে নিছক ভদ্রতাবশে নিভিয়ে দিই আলো তারপর শুরু হয় শিল্পকে ভাঙার এক বিপুল উৎসব আমি তার ওষ্ঠ ও উরুতে মুখ গুঁজে জানাই সেই খবর কালস্রোত সাঁতরে যা কোথাও যায় না।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1799
5601
সুকুমার রায়
গন্ধ বিচার
হাস্যরসাত্মক
সিংহাসনে বস্‌ল রাজা বাজল কাঁসর ঘন্টা, ছট্ফটিয়ে উঠল কেঁপে মন্ত্রীবুড়োর মনটা। বললে রাজা, 'মন্ত্রী, তোমার জামায় কেন গন্ধ?' মন্ত্রী বলে, 'এসেন্স দিছি- গন্ধ ত নয় মন্দ!' রাজা বলেন, 'মন্দ ভালো দেখুক শুঁকে বদ্যি,' বদ্যি বলে, 'আমার নাকে বেজায় হল সর্দি।' রাজা হাঁকেন , 'বোলাও তবে- রাম নারায়ণ পাত্র।' পাত্র বলে, 'নস্যি নিলাম এক্ষনি এইমাত্র- নস্যি দিয়ে বন্ধ যে নাক, গন্ধ কোথায় ঢুকবে?' রাজা বলেন, 'কোটাল তবে এগিয়ে এস শুক্‌বে।' কোটাল বলে, 'পান খেয়েছি মশলা তাহে কর্পূর, গন্ধে তারি মুন্ড আমার এক্কেবারে ভরপুর।' রাজা বলেন, 'আসুক তবে শের পালোয়ান ভীমসিং,' ভীম বলে, 'আজ কচ্ছে আমার সমস্ত গা ঝিম্ ঝিম্ রাত্রে আমার বোখার হল, বলছি হুজুর ঠিক বাৎ'- ব'লেই শুল রাজসভাতে চক্ষু বুজে চিৎপাত। রাজার শালা চন্দ্রকেতু তারেই ধ'রে শেষটা বল্ল রাজা, 'তুমিই না হয় কর না ভাই চেষ্টা।' চন্দ্র বলেন, 'মারতে চাও ত ডাকাও নাকো জল্লাদ, গন্ধ শুকে মর্‌তে হবে এ আবার কি আহ্লাদ?' ছিল হাজির বৃদ্ধ নাজির বয়সটি তার নব্বই, ভাব্‌ল মনে, 'ভয় কেন আর একদিন তো মরবই-' সাহস করে বল্লে বুড়ো, 'মিথ্যে সবাই বকছিস, শুঁকতে পারি হুকুম পেলে এবং পেলে বক্‌শিস।' রাজা বলেন, 'হাজার টাকা ইনাম পাবে সদ্য,' তাই না শুনে উৎসাহতে উঠ্ল বুড়ো মদ্দ। জামার পরে নাক ঠেকিয়ে- শুক্‌ল কত গন্ধ, রইল অটল, দেখ্ল লোকে বিস্ময়ে বাক্ বন্ধ। রাজ্য হল জয় জয়কার বাজ্‌ল কাঁসর ঢক্কা, বাপ্‌রে কি তেজ বুড়োর হাড়ে, পায় না সে যে অক্কা!
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/gondho-bichar/
960
জীবনানন্দ দাশ
এই শতাব্দী-সন্ধীতে মৃত্যু
চিন্তামূলক
(অগণন সাধারণের)সে এক বিচ্ছিন্ন দিনে আমাদের জন্ম হয়েছিলো ততোধিক অসুস্থ সময়ে আমাদের মৃত্যু হয়ে যায়। দূরে কাছ শাদা উঁচু দেয়ালের ছায়া দেখে ভয়ে মনে করে গেছি তাকে- ভালোভাবে মনে ক'রে নিলে- এইখানে জ্ঞান হতে বেদনার সুরু- অথবা জ্ঞানের থেকে ছুটি নিয়ে সান্ত্বনার হিম হ্রদে একাকী লুকালে নির্জন স্ফটিকস্তম্ভ খুলে ফেলে মানুষের অভিভূত ঊরু ভেঙে যাবে কোনো এক রম্য যোদ্ধা এসে। নরকেও মৃত্যু নেই- প্রীতি নেই স্বর্গের ভিতরে; মর্ত্যে সেই স্বর্গ নরকের প্রতি সৎ অবিশ্বাস নিস্তেজ প্রতীতি নিয়ে মনীষীরা প্রচারিত করে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ei-shotabdii-shondhiitey-mrittu/
4894
শামসুর রাহমান
নিভিয়ে এক ফুঁয়ে
প্রেমমূলক
আকাশ যেন আজ ঠান্ডা ভারী কাঁথা, ময়লা ফুটো দিয়ে মারছে উঁকি তারা; পায় না মনে ঠাঁই ঘরে ফেরার টান, কলিংবেল দিলো ঝাঁকুনি সন্ধ্যাকে। পাশের ঘরে এই কবিকে তাড়াতাড়ি লুকিয়ে রেখে তুমি বিদায় চেয়ে নিলে। তোমার ব্যবহারে কেমন মায়া ছিলো, নিষ্ঠুরতা বলে তাকে পারিনি ধরে নিতে।বুকের ঝাড়বাতি নিভিয়ে এক ফুয়ে আমাকে ফেলে তুমি ক্ষিপ্র চলে গেলে। আমার স্বপ্নের পাপড়ি সমুদয় ছিড়েছো কুটি কুটি, হুতুশে তাই মন। অথচ কিছু আগে দুজনে হাতে হাত রেখেছি অনুরাগে, ওষ্ঠে নিয়ে ঠোঁট ভুলেছি লহমায় জগৎ সংসার। কার সে ঝট্‌কায় গিয়েছো দূরে সরে।তখন কাছ থেকে বুকের ওঠা নামা, ঠোঁটের নড়া আর চোখের ঝলকানি দেখেছি তন্ময় এবং তোমাকেই ব্যাকুল পান করে কেটেছে সারা বেলা।আমাকে রেখে গেছো এ শীতে অসহায়, একলা বসে দেখি অস্তাগামী চাঁদ, আড়ালে শুনি মৃদু পাখির ডানা ঝাড়া। হৃদয়ে ধূলিঝড় প্রহর গুণি শুধু।কখন তুমি ফিরে আসবে জানি না তা। কোথায় বসে আছো কেমন হুল্লোড়ে? কথার হাইফেনে, বিদ্রূপের তোড়ে পড়ে কি মনে তাকে, এসেছো ফেলে যাকে?তোমার সত্তায় পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হায় হলো না প্রিয়তমা। তোমার বরতনু আমার খর তাপে মাখন হয়ে আজো গলেনি একবারও। যখনই কাছে আসো, আলিঙ্গনে বাঁধো, হঠাৎ জেগে ওঠে তীব্র কোলাহল। নিষাদ তীর ছোঁড়ে আমার দিকে, তুমি আমাকে বারবার আড়াল করে রাখো।কিন্তু কতকাল থাকবে আবডাল? আমি কি তস্কর অথবা আততায়ী? নিজেকে মিছেমিছি অন্তরালে ঢাকি, হৃদয় ঘায়ে ঘায়ে রক্তজবা হয়।যখন পুনরায় আসবে তুমি আর আমার চোখে মুখে নামবে নিরিবিলি তোমার মসৃণ চুলের কালো ঢল, বক্ষে নেবো টেনে, কখনো ছাড়বো না।হন্তারক এই যুগের তমসায় আমাকে একা ফেলে যেও না তুমি ফের; না দাও যদি তুলে প্রেমের হাতে ফল, ইহজীবনে আর ছোঁবো না তণ্ডুল।(হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/nivie-ek-fue/
226
কাজী নজরুল ইসলাম
আমার কৈফিয়ৎ
মানবতাবাদী
বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’, কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি! কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে! যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’ দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে! বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে’। পড়ে না ক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা। কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা। কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে! কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা! প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’ আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’ অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি। সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা!’ যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘ মোল্‌-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’, ‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে! ফতোয়া দিলাম- কাফের কাজী ও, যদিও শহীদ হইতে রাজী ও! ‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে! হিন্দুরা ভাবে,‘ পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’আনকোরা যত নন্‌ভায়োলেন্ট নন্‌-কো’র দলও নন্‌ খুশী। ‘ভায়োরেন্সের ভায়োলিন্‌’ নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি! ‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে, ‘নয় চর্‌কার গান কেন গা’বে?’ গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্‌ফুসি! স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী! ‘বিলেত ফেরনি?’ প্রবাসী-বন্ধু ক’ন, ‘ এই তব বিদ্যে, ছি!’ ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি!’- যুগের না হই, হজুগের কবি বটি ত রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ক’ষে কষি হৃদ্‌-পেশী, দু’কানে চশ্‌মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিদ্‌ বেশী!কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুণ্ডু আমিই কি বুঝি তার কিছু? হাত উঁচু আর হ’ল না ত ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু! বন্ধু! তোমরা দিলে না ক’ দাম, রাজ-সরকার রেখেছেন মান! যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন! আর কিছু শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?বন্ধু! তুমি ত দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে, হাড় কালি হ’ল শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন-বন্দীরে! যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল, মেরে মেরে তা’রে করিনু বিকল, তবু যদি কথা শোনে সে পাগল! মানিল না ররি-গান্ধীরে। হঠাৎ জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে’!আমি বলি, ওরে কথা শোন্‌ ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস্‌ খোশ্‌-হালে! প্রায় ‘হাফ’-নেতা হ’য়ে উঠেছিস্‌, এবার এ দাঁও ফস্‌কালে ‘ফুল’-নেতা আর হবিনে যে হায়! বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায় গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে নিস্‌ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে।বোঝে না ক’ যে সে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে, গান শুন সবে ভাবে, ভাবনা কি! দিন যাবে এবে পান খেয়ে! রবে না ক’ ম্যালেরিয়া মহামারী, স্বরাজ আসিছে চ’ড়ে জুড়ি-গাড়ী, চাঁদা চাই, তারা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে। মাতা কয়, ওরে চুপ্‌ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ্‌ চেয়ে!ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন, বেলা ব’য়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন। কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়, স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়! কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছে কি? কালি ও চুন কেন ওঠে না ক’ তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস! কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ! টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ। মা’র বুক হ’তে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস! হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে! দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে। রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা, তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা, বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে! অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে, মাথায় উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে। প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/amar-koifiyot/
3355
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পদ্মা
প্রকৃতিমূলক
হে পদ্মা আমার, তোমায় আমায় দেখা শত শত বার। একদিন জনহীন তোমার পুলিনে, গোধূলির শুভলগ্নে হেমন্তের দিনে, সাক্ষী করি পশ্চিমের সূর্য অস্তমান তোমারে সঁপিয়াছিনু আমার পরান। অবসানসন্ধ্যালোকে আছিলে সেদিন নতমুখী বধূসম শান্ত বাক্যহীন; সন্ধ্যাতারা একাকিনী সস্নেহ কৌতুকে চেয়ে ছিল তোমাপানে হাসিভরা মুখে। সেদিনের পর হতে, হে পদ্মা আমার, তোমায় আমায় দেখা শত শত বার। নানা কর্মে মোর কাছে আসে নানা জন, নাহি জানে আমাদের পরানবন্ধন, নাহি জানে কেন আসি সন্ধ্যা-অভিসারে বালুকা শয়ন-পাতা নির্জন এ পারে। যখন মুখর তব চক্রবাকদল সুপ্ত থাকে জলাশয়ে ছাড়ি কোলাহল, যখন নিস্তব্ধ গ্রামে তব পূর্বতীরে রুদ্ধ হয়ে যায় দ্বার কুটিরে কুটিরে, তুমি কোন্‌ গান কর আমি কোন্‌ গান দুই তীরে কেহ তার পায় নি সন্ধান। নিভৃতে শরতে গ্রীষ্মে শীতে বরষায় শত বার দেখাশুনা তোমায় আমায়। কতদিন ভাবিয়াছি বসি তব তীরে পরজন্মে এ ধরায় যদি আসি ফিরে, যদি কোনো দূরতর জন্মভূমি হতে তরী বেয়ে ভেসে আসি তব খরস্রোতে— কত গ্রাম কত মাঠ কত ঝাউঝাড় কত বালুচর কত ভেঙে-পড়া পাড় পার হয়ে এই ঠাঁই আসিব যখন জেগে উঠিবে না কোনো গভীর চেতন? জন্মান্তরে শতবার যে নির্জন তীরে গোপন হৃদয় মোর আসিত বাহিরে, আর বার সেই তীরে সে সন্ধ্যাবেলায় হবে না কি দেখাশুনা তোমায় আমায়?   (চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/podma/
2486
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
তোমার চিঠি
প্রেমমূলক
সকালে তোমার চিঠি হাতে এলো আজ যার হাতে পাঠিয়েছো তার মুখ দেখিনি কারণ কুয়াশার দীর্ঘ হাত বাড়িয়ে সে পৌছে দিয়ে গেছে-- আমাদের পৃথিবীতে পত্র যোগাযোগ ক্রমেই অচল হতে চলেছে এখন চিঠির ঘ্রাণের কথা - স্বাদ ভুলে যাচ্ছে মানুষেরা অবলীলাক্রমে শোক দুঃখ প্রকাশের কান্না নেই - তাকে হজম করেছে এক লৌকিকতার নামে কালো ফিতা হৃদয়ের যত কথা আঙুলের অস্থির ডগায় অভিন্ন অক্ষর হয়ে নির্বোধের মত চেয়ে থাকেতোমার এ ভেজা চিঠি হাতে নিয়ে আমি তোমার ঘ্রাণের উষ্ণ ছোঁয়ার আহ্লাদে খুলেছি প্রতিটি ভাঁজ আদরের মত কোটিবার পড়ার আশায়--
https://www.bangla-kobita.com/rafiquzzaman/tomar-chithi/
563
কাজী নজরুল ইসলাম
হোঁদলকুতকুতের বিজ্ঞাপন
হাস্যরসাত্মক
মিচকে-মারা কয় না কথা মনটি বড়ো খুঁতখুঁতে। ‘ছিঁচকাঁদুনে’ ভ্যাবিয়ে ওঠেন একটু ছুঁতেই না ছুঁতে। ড্যাবরা ছেলে ড্যাবড্যাবিয়ে তাকিয়ে থেকে গাল ফুলান, সন্দেশ এবং মিষ্টি খেতে – বাসরে বাস – এক জাম্বুবান! নিম্নমুখো-যষ্টি ছেলে দশটি ছেলে লুকিয়ে খান, বদমায়েশির মাসি পিসি, আধখানা চোখ উঁচিয়ে চান! হাঁদারা হয় হদ্দ বোকার, সব কথাতেই হাঁ করে! ডেঁপো চতুর আধ-ইশারায় সব বুঝে নেয় ঝাঁ করে! ভোঁদা খোকার নামটি ভুঁদো বুদ্ধি বেজায় তার ভোঁতা। সব চেয়ে ভাই ইবলিশ হয় যে ছেলেদের ঘাড় কোঁতা। পুঁয়ে-লাগা সুঁটকো ছেলে মুখটা সদাই মুচকে রয়! পেটফুলো তার মস্ত পিলে, হাত-পাগুলোও কুঁচকে রয়! প্যাঁটরা ছেলের য়্যাব্বড়ো পেট, হাত নুলো আর পা সরু! চলেন যেন ব্যাংটি হো হো উ-র্ গজ-ঢাক গাল পুরু! গাবদা ছেলের মনটি সাদা একটুকুতেই হন খুশি, আদর করে মা তারে তাই নাম দিয়েছেন মনটুসি। ষাঁড়ের নাদ সে নাদুস নুদুস গোবর-গণেশ যে শ্রীমান, নাঁদার মতন য়্যাভ ভুঁড়ি তাঁর চলতে গিয়ে হুমড়ি খান! ছ্যাঁচড় ছেলে বেদড় ভারি ধুমসুনি খায় সব কথায়। উদমো ছেলে ছটফটে খুব একটুকুতেই উতপুতায়! ফটকে ছেলে ছটকে বেড়ায় আঁটি তারা বজ্জাতের, দুষ্টু এবং চুলবুলেরা সবখানে পায় লজ্জা ঢের। বোঁচা-নাকা খাঁদা যে হয় নাম রেখো তার চামচিকে, এসব ছেলে তেঁদড় ভারী ডরায় না দাঁত-খামচিকে! টুনিখুকির মুখটি ছোটো টুনটুনি তার মন সরল, ময়না-মানিক নাম যার ভাই মনটি তারও খুব তরল! গাল টেবো যাঁর নাম টেবি তাঁর একটুকুতেই যান রেগে। কান-খড়কে মায়ের লেঠা, রয় ঘুমুলেও কান জেগে। খুদে খুকির নামটি টেপু মা-দুলালি আবদেরে। ডর-পুকুনে আঁতকে ওঠে নাপতে দেখে আঁক করে! পুঁটুরানি বাপ-সোহাগি, নন্দদুলাল মানিক মা-র, দাদু বুড়োর ন্যাওটা যে ভাই মটরু ছাগল নামটি তার! ভুতো ছেলে ঠগ বড়ো হয়, ভয় করে না কাউকে সে, নাই পরোয়া যতই কেন কিল আর থাপড় দাও ঠেসে। দস্যি ছেলে ভয় করে না চোখ-রাঙানি ভূত-পেরেত, সতর-চোখি জুজুর খোঁজে বেড়িয়ে বেড়ায় রাত বিরেত! ডানপিটেরা ঝুলঝাপপুর গুলি-ডাণ্ডায় মদ্দ খুব! বাঁদরা-মুখোর ভ্যাংচিয়ে মুখ দাঁত খিঁচে বে-হদ্দ হুব! বীর বাদল সে – দেশের তরে প্রাণ দিতে ভাই যে শিখে, আনবে যে সাত-সাগর-পারের বন্দিনী দেশ-লক্ষ্মীকে! কেউ যদি ভাই হয় তোমজদের এমনিতরো মর্দ ফেরো, হো হো! তাকে পাঠিয়ে দেব বাচ্চা হোঁদল কুতকুতের!  (ঝিঙেফুল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/hodolkutkuter-biggyapon/
3437
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রবাসে
ছড়া
বিদেশমুখো মন যে আমার কোন্‌ বাউলের চেলা, গ্রাম-ছাড়ানো পথের বাতাস সর্বদা দেয় ঠেলা। তাই তো সেদিন ছুটির দিনে টাইমটেবিল প'ড়ে প্রাণটা উঠল নড়ে। বাক্সো নিলেম ভর্তি করে, নিলেম ঝুলি থলে, বাংলাদেশের বাইরে গেলেম গঙ্গাপারে চ'লে। লোকের মুখে গল্প শুনে গোলাপ-খেতের টানে মনটা গেল এক দৌড়ে গাজিপুরের পানে। সামনে চেয়ে চেয়ে দেখি, গম-জোয়ারির খেতে নবীন অঙ্কুরেতে বাতাস কখন হঠাৎ এসে সোহাগ করে যায় হাত বুলিয়ে কাঁচা শ্যামল কোমল কচি গায়। আটচালা ঘর, ডাহিন দিকে সবজি-বাগানখানা শুশ্রূষা পায় সারা দুপুর, জোড়া-বলদটানা আঁকাবাঁকা কল্‌কলানি করুণ জলের ধারায়-- চাকার শব্দে অলস প্রহর ঘুমের ভারে ভারায়। ইঁদারাটার কাছে বেগনি ফলে তুঁতের শাখা রঙিন হয়ে আছে। অনেক দূরে জলের রেখা চরের কূলে কূলে, ছবির মতো নৌকো চলে পাল-তোলা মাস্তুলে। সাদা ধুলো হাওয়ায় ওড়ে, পথের কিনারায় গ্রামটি দেখা যায়। খোলার চালের কুটীরগুলি লাগাও গায়ে গায়ে মাটির প্রাচীর দিয়ে ঘেরা আমকাঁঠালের ছায়ে। গোরুর গাড়ি পড়ে আছে মহানিমের তলে, ডোবার মধ্যে পাতা-পচা পাঁক-জমানো জলে গম্ভীর ঔদাস্যে অলস আছে মহিষগুলি এ ওর পিঠে আরামে ঘাড় তুলি। বিকেল-বেলায় একটুখানি কাজের অবকাশে খোলা দ্বারের পাশে দাঁড়িয়ে আছে পাড়ার তরুণ মেয়ে আপন-মনে অকারণে বাহির-পানে চেয়ে অশথতলায় বসে তাকাই ধেনুচারণ মাঠে, আকাশে মন পেতে দিয়ে সমস্ত দিন কাটে। মনে হ'ত, চতুর্দিকে হিন্দি ভাষায় গাঁথা একটা যেন সজীব পুঁথি, উলটিয়ে যাই পাতা-- কিছু বা তার ছবি-আঁকা কিছু বা তার লেখা, কিছু বা তার আগেই যেন ছিল কখন্‌ শেখা। ছন্দে তাহার রস পেয়েছি, আউড়িয়ে যায় মন। সকল কথার অর্থ বোঝার নাইকো প্রয়োজন।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/probasa/
1694
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
সভাকক্ষ থেকে কিছু দূরে
প্রেমমূলক
কী করলে হাততালি মেলে, বিলক্ষণ জানি; কিন্তু আমি হাততালির জন্য কোনোদিন প্রলুব্ধ হব না। তোমার চারদিকে বহু কিঙ্কর জুটেছে, মহারানি। ইঙ্গিত করলেই তারা ক্রিরিরিং ঘড়িতে বাজিয়ে ঘণ্টি অদ্ভুত উল্লাসে গান গায়! আমিও দু-একটা গান জানি, কিন্তু আমি কোরাসের ভিতরে যাব না। মহারানি, যেমন জেনেছি, ঠিক সেইরকম উচ্চারণে বাজাব তোমাকে। তুমি সিংহাসনে খুব চমৎকার ভঙ্গিতে বসেছ। দেখাচ্ছ ধবল গ্রীবা, বুকের খানিক; ধরেছ সুমিষ্ট ইচ্ছা চক্ষুর তারায়, বাঁ হাতে রেখেছ থুতনি, ডান হাতে খোঁপা থেকে দু-একটা নির্মল জুঁই খুঁটে নিচ্ছ, ছুড়ে দিচ্ছ সভার ভিতরে। কিন্তু, মহারানি, আমি তোমাকে আর-একটু বেশি জানি। ইঙ্গিত করলেই তার ক্রিরিরিং ঘড়িতে ঘণ্টির তাল বাজাতে পারি না। বাজিয়ে দেখেছি, তবু বুকের ভিতরে বহু জমিজমা অন্ধকার থাকে। সভাকক্ষ থেকে তাই কিছু দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। মহারানি, অন্তত একদিন তুমি অনুমতি দাও, যেমন জেনেছি, ঠিক সেইরকম উচ্চারণে বাজাব তোমাকে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1647
1046
জীবনানন্দ দাশ
তুমি
প্রেমমূলক
নক্ষত্রের চলাফেরা ইশারায় চারি দিকে উজ্জ্বল আকাশ; বাতাসে নীলাভ হয়ে আসে যেন প্রান্তরের ঘাস; কাঁচপোকা ঘুমিয়েছে — গঙ্গাফড়িং সেও ঘুমে; আম নিম হিজলের ব্যাপ্তিতে পড়ে আছ তুমি।‘মাটির অনেক নীচে চলে গেছ? কিংবা দূর আকাশের পারে তুমি আজ? কোন্‌ কথা ভাবছ আধারে? ওই যে ওকানে পায়রা একা ডাকে জমিরের বনে; মনে হয় তুমি যেন ওই পাখি-তুমি ছাড়া সময়ের এ-উদ্ভাবনেআমার এমন কাছে — আশ্বিনের এত বড় অকূল আকাশে আর কাকে পাব এই সহজ গভীর অনায়াসে –’ বলতেই নিখিলের অন্ধকার দরকারে পাখি গেল উড়ে প্রকৃতিস্থ প্রকৃতির মতো শব্দে — প্রেম অপ্রেম থেকে দূরে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/tumi/
3447
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রলাপ ১
প্রেমমূলক
১ গিরির উরসে নবীন নিঝর, ছুটে ছুটে অই হতেছে সারা। তলে তলে তলে নেচে নেচে চলে, পাগল তটিনী পাগলপারা।  ২ হৃদি প্রাণ খুলে ফুলে ফুলে ফুলে, মলয় কত কী করিছে গান। হেতা হোতা ছুটি ফুল-বাস লুটি, হেসে হেসে হেসে আকুল প্রাণ।৩ কামিনী পাপড়ি ছিঁড়ি ছিঁড়ি ছিঁড়ি, উড়িয়ে উড়িয়ে ছিঁড়িয়ে ফেলে। চুপি চুপি গিয়ে ঠেলে ঠেলে দিয়ে, জাগায়ে তুলিছে তটিনীজলে।৪ ফিরে ফিরে ফিরে ধীরে ধীরে ধীরে, হরষে মাতিয়া, খুলিয়া বুক। নলিনীর কোলে পড়ে ঢ'লে ঢ'লে, নলিনী সলিলে লুকায় মুখ।৫ হাসিয়া হাসিয়া কুসুমে আসিয়া, ঠেলিয়া উড়ায় মধুপ দলে। গুন্‌ গুন্‌ গুন্‌ রাগিয়া আগুন, অভিশাপ দিয়া কত কী বলে।৬ তপন কিরণ -- সোনার ছটায়, লুটায় খেলায় নদীর কোলে। ভাসি ভাসি ভাসি স্বর্ণ ফুলরাশি হাসি হাসি হাসি সলিলে দোলে।৭ প্রজাপতিগুলি পাখা দুটি তুলি উড়িয়া উড়িয়া বেড়ায় দলে। প্রসারিয়া ডানা করিতেছে মানা কিরণে পশিতে কুসুমদলে।৮ মাতিয়াছে গানে সুললিত তানে পাপিয়া ছড়ায় সুধার ধার। দিকে দিকে ছুটে বন জাগি উঠে কোকিল উতর দিতেছে তার।৯ তুই কে লো বালা! বন করি আলা, পাপিয়ার সাথে মিশায়ে তান! হৃদয়ে হৃদয়ে লহরী তুলিয়া, অমৃত ললিত করিস্‌ গান।১০ স্বর্গ ছায় গানে বিমানে বিমানে ছুটিয়া বেড়ায় মধুর তান। মধুর নিশায় ছাইয়া পরান, হৃদয় ছাপিয়া উঠেছে গান।১১ নীরব প্রকৃতি নীরব ধরা। নীরবে তটিনী বহিয়া যায়। তরুণী ছড়ায় অমৃতধারা, ভূধর, কানন, জগত ছায়।    ১২ মাতাল করিয়া হৃদয় প্রাণ, মাতাল করিয়া পাতাল ধরা। হৃদয়ের তল অমৃতে ডুবায়ে, ছড়ায় তরুণী অমৃতধারা।    ১৩ কে লো তুই বালা! বন করি আলা, ঘুমাইছে বীণা কোলের 'পরে। জ্যোতির্ম্ময়ী ছায়া স্বরগীয় মায়া, ঢল ঢল ঢল প্রমোদ-ভরে।১৪ বিভোর নয়নে বিভোর পরানে -- চারি দিক্‌ পানে চাহিস্‌ হেসে! হাসি উঠে দিক্‌! ডাকি উঠে পিক্‌! নদী ঢলে পড়ে পুলিন দেশে!!১৫ চারি দিক্‌ চেয়ে কে লো তুই মেয়ে, হাসি রাশি রাশি ছড়িয়ে দিস্‌? আঁধার ছুটিয়া জোছনা ফুটিয়া কিরণে উজলি উঠিছে দিশ্‌!১৬ কমলে কমলে এ ফুলে ও ফুলে, ছুটিয়া খেলিয়া বেড়াস্‌ বালা! ছুটে ছুটে ছুটে খেলায় যেমন মেঘে মেঘে মেঘে দামিনী-মালা।১৭ নয়নে করুণা অধরে হাসি, উছলি উছলি পড়িছে ছাপি। মাথায় গলায় কুসুমরাশি বাম করতলে কপোল চাপি।১৮ এতকাল তোরে দেখিনু সেবিনু -- হৃদয়-আসনে দেবতা বলি। নয়নে নয়নে, পরানে পরানে, হৃদয়ে হৃদয়ে রাখিনু তুলি।১৯ তবুও তবুও পূরিল না আশ, তবুও হৃদয় রহেছে খালি। তোরে প্রাণ মন করিয়া অর্পণ ভিখারি হইয়া যাইব চলি।২০ আয় কল্পনা মিলিয়া দুজনা, ভূধরে কাননে বেড়াব ছুটি। সরসী হইতে তুলিয়া কমল লতিকা হইতে কুসুম লুটি।২১ দেখিব ঊষার পূরব গগনে, মেঘের কোলেতে সোনার ছটা। তুষার-দর্পণে দেখিছে আনন সাঁজের লোহিত জলদ-ঘটা।২২ কনক-সোপানে উঠিছে তপন ধীরে ধীরে ধীরে উদয়াচলে। ছড়িয়ে ছড়িয়ে সোনার বরন, তুষারে শিশিরে নদীর জলে।২৩ শিলার আসনে দেখিব বসিয়ে, প্রদোষে যখন দেবের বালা পাহাড়ে লুকায়ে সোনার গোলা আঁখি মেলি মেলি করিবে খেলা।২৪ ঝর ঝর ঝর নদী যায় চলে, ঝুরু ঝুরু ঝুরু বহিছে বায়। চপল নিঝর ঠেলিয়া পাথর ছুটিয়া -- নাচিয়া -- বহিয়া যায়।২৫ বসিব দুজনে -- গাইব দুজনে, হৃদয় খুলিয়া, হৃদয়ব্যথা; তটিনী শুনিবে, ভূধর শুনিবে জগত শুনিবে সে-সব কথা।২৬ যেথায় যাইবি তুই কলপনা, আমিও সেথায় যাইব চলি। শ্মশানে, শ্মশানে -- মরু বালুকায়, মরীচিকা যথা বেড়ায় ছলি।২৭ আয় কলপনা আয় লো দুজনা, আকাশে আকাশে বেড়াই ছুটি। বাতাসে বাতাসে আকাশে আকাশে নবীন সুনীল নীরদে উঠি।২৮ বাজাইব বীণা আকাশ ভরিয়া, প্রমোদের গান হরষে গাহি, যাইব দুজনে উড়িয়া উড়িয়া, অবাক জগত রহিবে চাহি!২৯ জলধররাশি উঠিবে কাঁপিয়া, নব নীলিমায় আকাশ ছেয়ে। যাইব দুজনে উড়িয়া উড়িয়া, দেবতারা সব রহিবে চেয়ে।৩০ সুর-সুরধুনী আলোকময়ী, উজলি কনক বালুকারাশি। আলোকে আলোকে লহরী তুলিয়া, বহিয়া বহিয়া যাইছে হাসি।৩১ প্রদোষ তারায় বসিয়া বসিয়া, দেখিব তাহার লহরীলীলা। সোনার বালুকা করি রাশ রাশ, সুর-বালিকারা করিবে খেলা।৩২ আকাশ হইতে দেখিব পৃথিবী! অসীম গগনে কোথায় পড়ে। কোথায় একটি বালুকার রেণু বাতাসে আকাশে আকাশে ঘোরে।৩৩ কোথায় ভূধর কোথায় শিখর অসীম সাগর কোথায় পড়ে। কোথায় একটি বালুকার রেণু, বাতাসে আকাশে আকাশে ঘোরে।৩৪ আয় কল্পনা আয় লো দুজনা, এক সাথে সাথে বেড়াব মাতি। পৃথিবী ফিরিয়া জগত ফিরিয়া, হরষে পুলকে দিবস রাতি।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/prolap-1/
4566
শামসুর রাহমান
কাঁদতে পারি না
প্রেমমূলক
‘এমন বিমর্ষ কেন তুমি’, আমাকে সওয়াল করে আমার ঘরের বাতি। জানলার পর্দা কাঁপা কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করে, ‘কবি তোমার নিষ্প্রভ চোখ দু’টি এমন কাতর কেন আজ?’ বারান্দার বুলবুলি বলে, ‘কোন্‌ কাঁটা এসে তোমার হৃদয় অবেলায় এমন জখম করে?’ ফ্লাওয়ার ভাসের ফুলগুলি প্রশ্নাকুল, ‘কোন্‌ কীট তোমার অন্তর কুরে কুরে খাচ্ছে আজ? আমার লেখার খাতা বড়ই নিশ্চুপ।এসব প্রশ্নের আমি কী দেবো জবাব? বলব কি একজন নারী, যে আমার দয়িতা, না বুঝে এই ছন্নছাড়া বেঢপ আমাকে নিজে খুব কষ্ট পেয়ে যন্ত্রণার ক্রূর তটে করেছে নিক্ষেপ তার প্রিয় কবিকে? বিষণ্ন কেন আমি আজ নিজেই বুঝি না; বুক ঠেলে কান্না আসতে চায়, কিন্তু কাঁদতে পারি না।  (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kadte-pari-na/
955
জীবনানন্দ দাশ
এই নিদ্রা
চিন্তামূলক
আমার জীবনে কোনো ঘুম নাই মৎস্যনারীদের মাঝে সবচেয়ে রূপসী সে নাকি এই নিদ্রা?গায় তার ক্ষান্ত সমুদ্রের ঘ্রাণ- অবসাদ সুখ চিন্তার পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন-বিমুখ প্রাণ তারএই দিন এই রাত্রি আসে যায়- বুঝিতে দেয় না তারে; কোনো ধ্বনি ঘ্রাণ কোনো ক্ষুধা- কোনো ইচ্ছা- পরীরো সোনার চুল হয় যাতে ম্লানঃ আমাদের পৃথিবীর পরীদের;- জানেনা সে; শোনেনা সে জীবনের লক্ষ্য মৃত নিঃশ্বাসের স্বর; তাহলে ঘুমাত কবে; সে শুধু সুন্দর, প্রশ্নহীন অভিজ্ঞতাহীন দূর নক্ষত্রের মতো সুন্দর অমর শুধু; দেবতারা করেনি বিক্ষত ইহাদের।এদের অপার রূপ শান্তি সচ্ছলতা তবুও জানিত যদি আমার এ-জীবনের মুহূর্তের কথা মানুষের জীবনের মুহূর্তের কথা।দেবতারা করেনি বিক্ষত ইহাদেরঃ (দেবতারা করেনি বিক্ষত নিজেদের কোনো অভিজ্ঞতা নাই দেবতার) ঘুঘুদের শাদা ডানা- নীল রাত্রি- কমলরঙের মেঘ- সমুদ্রের ফেনা রোদ- হরিণের বুকে বেদনার নীরব আঘাত; এরা প্রশ্ন করেনাকোঃ ইহারা সুন্দর শান্ত- জীবনের উদ্‌যাপনে সন্দেহের হাত ইহারা তোলে না কেউ আঁধারে আকাশে ইহাদের দ্বিধা নাই- ব্যথা নাই- চোখে ঘুম আসে। শুনেছে কে ইহাদের মুখে কোনো অন্ধকার কথা? সকল সংকল্প চিন্তা রক্ত আনে ব্যথা আনে- মানুষের জীবনের এই বীভৎসা ইহাদের ছোঁয় নাকো;- ব্যুবনিক প্লেগের মতন সকল আচ্ছন্ন শান্ত স্নিগ্ধতারে নষ্ট ক'রে ফেলিতেছে মানুষের মন!গোলাপী ধূসর মেঘে পশ্চিমের বিয়োগ সে দ্যাখে না কি? প্রজাপতি পাখি-মেয়ে করেনা কি মানুষের জীবনের ব্যথা আহরণ? তবু এরা ব্যথা নয়ঃ ইহারা আবৃত সব- বিচিত্র- নীরব অবিরল জাদুঘর এরা এক;- এরা রূপ ঘুম শান্তি স্থির এই মৃত পাখি কীট- প্রজাপতি রাঙা মেঘ- সাপের আঁধার মুখে ফরিঙের জোনাকির নীড় এইসব। আমি জানি, একদিন আমিও এমন পতঙ্গের হৃদয়ের ব্যথা হব- সমুদ্রের ফেনা শাদা ফেনায় যেমন ভেঙে পড়ে- ব্যথা পায়। মানুষের মন তবুও রক্তাক্ত হয় কেন এক অন্য বেদনায় কীট যাহা জানে নাকো- জানে নাকো নদী ফেনা ঘাসরোদ- শিশির কুয়াশা জ্যোৎস্নাঃ আম্লান হেলিওট্রোপ হায়! এ-সৃষ্টির জাদুঘরে রূপ তারা- শান্তি- ছবি- তাহারা ঘুমায় সৃষ্টি তাই চায়।ভুলে যাব যেই সাধ- যে-সাহস এনেছিলো মানুষ কেবল যাহা শুধু গ্লানি হলো- কৃপা হলো- নক্ষত্রের ঘৃণা হলো- অন্য কোনো স্থল পেল নাকো।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/ei-nidra/
6047
হেলাল হাফিজ
প্রতিমা
প্রেমমূলক
প্রেমের প্রতিমা তুমি, প্রণয়ের তীর্থ আমার। বেদনার করুণ কৈশোর থেকে তোমাকে সাজাবো বলে ভেঙেছি নিজেকে কী যে তুমুল উল্লাসে অবিরাম তুমি তার কিছু কি দেখেছো? একদিন এই পথে নির্লোভ ভ্রমণে মৌলিক নির্মাণ চেয়ে কী ব্যাকুল স্থপতি ছিলাম, কেন কালিমা না ছুঁয়ে শুধু তোমাকেই ছুঁলাম ওসবের কতোটা জেনেছো? শুনেছি সুখেই বেশ আছো, কিছু ভাঙচুর আর তোলপাড় নিয়ে আজ আমিও সচ্ছল, টলমল অনেক কষ্টের দামে জীবন গিয়েছে জেনে মূলতই ভালোবাসা মিলনে মলিন হয়, বিরহে উজ্জ্বল। এ আমার মোহ বলো, খেলা বলো অবৈধ মুদ্রার মতো অচল আকাঙ্ক্ষা কিংবা যা খুশী তা বলো, সে আমার সোনালি গৌরব নারী, সে আমার অনুপম প্রেম। তুমি জানো, পাড়া-প্রতিবেশী জানে পাইনি তোমাকে, অথচ রয়েছো তুমি এই কবি সন্নাসীর ভোগে আর ত্যাগে। ১১.৩.৭৩
https://banglarkobita.com/poem/famous/119
2736
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই
ভক্তিমূলক
আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে। এ কৃপা কঠোর সঞ্চিত মোর জীবন ভ'রে। না চাহিতে মোরে যা করেছ দান আকাশ আলোক তনু মন প্রাণ, দিনে দিনে তুমি নিতেছ আমায় সে মহাদানেরই যোগ্য করে অতি-ইচ্ছার সংকট হতে বাঁচায়ে মোরে। আমি কখনো বা ভুলি, কখনো বা চলি তোমার পথের লক্ষ্য ধরে- তুমি নিষ্ঠুর সম্মুখ হতে যাও যে সরে। এ যে তব দয়া জানি হায়, নিতে চাও ব'লে ফিরাও আমায়, পূর্ণ করিয়া লবে এ জীবন তব মিলনেরই যোগ্য করে আধা- ইচ্ছার সংকট হতে বাঁচায়ে মোরে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ami-bohu-bashonai-pranpone-chai/
5954
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
আজ
প্রেমমূলক
সারাদিন আজ বৃষ্টি আসুক পাখি ভেজা গাছেদের ডানায় বসুক ঘুম আমিও নাহয় তোমার দু চোখে রাখি মেঘ জমা কোনও পাহাড়ের মরসুমতুমিও কোথাও আলো ছায়া বেঁচে থাকো মেঘ পিঠে নিয়ে আমিও বেরই ট্রাম বড় গাছেদের গোপনে পালক রাখো শহরে ওড়াও নরম গোলাপি খামসাদা কাগজের মনমরা আলো ভাসে বুকের শহর বহুদিন ভাঙাচোরা প্যাস্টেল রঙে কারা যেন ফিরে আসে… বিগত জন্মে ছেড়ে গিয়েছিল ওরা!তুমিও আমায় ছেড়ে গেলে বৈশাখে এখন শ্রাবণ নির্জন পথে ঋণ গলাচেরা পাখি কাকে যে এমন ডাকে আজকে তোমার একলা থাকার দিন
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%86%e0%a6%9c-%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a6%a3%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a7%8e-%e0%a6%9a%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%80/
4736
শামসুর রাহমান
জুনের দুপুর
প্রেমমূলক
সেদিন জুনের দুপুর ছিল, একলা ছিলে তুমি। ঘরের দুপুর বাড়ায় গ্রীবা, হঠাৎ তোমার পায়ের, নিচে উঠলো কেঁপে ভূমি। তখন আমি কিসের ঘোরে নিজের ভেতর একা বাঁচছি, মরছি, মরছি, বাঁচছি। এমনি করেই দ্বন্দ্ব থেকে ফোটে দুঃখরেখা! ক্লান্ত মনে পড়ছি ধুধু দেয়াল-জোড়া লেখা। বুকের ভেতর মরুর জ্বালা, তোমার সঙ্গে ক’যুগ যেন হয়নি আমার দেখা।ঘরে-বাইরে সঙ্গে আমার নোংরা নরক ঘোরে। কোথাও কিছু নেইকো পাওয়ার, বাগান-ফাগান, কোঠাবাড়ি ধুলোর মতো ওড়ে।তোমার বুকে ওষ্ঠ চেপে ভুলি গেরস্থালি- শহর কালো বিন্দু হয়ে শূন্যে মিলায়, সত্তা জুড়ে ঝরে সময়-বালি।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/juner-dupur/
5844
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
মহারাজ, আমি তোমার
রূপক
মহারাজ, আমি তোমার সেই পুরনো বালক ভৃত্য মহারাজ, মনে পড়ে না? তোমার বুকে হোঁচট পথে চাঁদের আলোয় মোট বয়েছি, বেতের মতো গান সয়েছি দু’হাত নিচে, পা শূন্যে- আমার সেই উদোম নৃত্য মহারাজ, মনে পড়ে না? মহারাজ, মনে পড়ে না? মহারাজ, চাঁদের আলোয়? মহারাজ, আমি তোমার চোখের জলে মাছ ধরেছি মাছ না মাছি কাঁকরগাছি একলা শুয়েও বেঁচে তা আছি ইষ্টকুটুম টাকডুমাডুম, মহারাজ, কাঁদে না, ছিঃ! অমন তোমার ভালোবাসা, আমার বুকে পাখির বাসা মহারাজ, তোমার গালে আমি গোলাপ গাছ পুঁতেছি- প্রাণঠনাঠন ঝাড়লন্ঠন, মহারাজ, কাঁদে না, ছিঃ! মহারাজ, মা-বাপ তুমি, যত ইচ্ছে বকো মারো মুঠো ভরা হাওয়ার হাওয়া, তো কেবল তুমিই পারো। আমি তোমায় চিম্‌টি কাটি, মুখে দিই দুধের বাটি চোখ থেকে চোখ পড়ে যায়, কোমরে সুড়সুড়ি পায় তুমি খাও এঁটো থুতু, আমি তোমার রক্ত চাটি বিলিবিলি খান্ডাগুলু, বুম্‌ চাক ডবাং ডুলু হুড়মুড় তা ধিন্‌ না উসুখুস সাকিনা খিনা মহারাজ, মনে পড়ে না?
https://banglarkobita.com/poem/famous/1898
1219
জীবনানন্দ দাশ
সময়ের তীরে
মানবতাবাদী
নিচে হতাহত সৈন্যদের ভিড় পেরিয়ে, মাথার ওপর অগণন নক্ষত্রের আকাশের দিকে তাকিয়ে, কোনো দূর সমুদ্রের বাতাসের স্পর্শ মুখে রেখে, আমার শরীরের ভিতর অনাদি সৃষ্টির রক্তের গুঞ্জরণ শুনে, কোথায় শিবিরে গিয়ে পৌঁছলাম আমি। সেখানে মাতাল সেনানায়কেরা মদকে নারীর মতো ব্যবহার করছে, নারীকে জলের মতো; তাদের হৃদয়ের থেকে উত্থিত সৃষ্টিবিসারী গানে নতুন সমুদ্রের পারে নক্ষত্রের নগ্নলোক সৃষ্টি হচ্ছে যেন; কোথাও কোনো মানবিক নগর বন্দর মিনার খিলান নেই আর; এক দিকে বালিপ্রলেপী মরুভূমি হু-হু করছে; আর এক দিকে ঘাসের প্রান্তর ছড়িয়ে আছে- আন্তঃনাক্ষত্রিক শূন্যের মতো অপার অন্ধকারে মাইলের পর মাইল।শুধু বাতাস উড়ে আসছেঃ স্থলিত নিহত মনুষ্যত্বের শেষ সীমানাকে সময়সেতুগুলোকে বিলীন ক’রে দেবার জন্যে, উচ্ছ্রিত শববাহকের মূর্তিতে। শুধু বাতাসের প্রেতচারণ অমৃতলোকের অপস্রিয়মান নক্ষত্রযান-আলোর সন্ধানে। পাখি নেই,—সেই পাখির কঙ্কালের গুঞ্জরণ; কোনো গাছ নেই,—সেই তুঁতের পল্লবের ভিতর থেকে অন্ধ অন্ধকার তুষারপিচ্ছিল এক শোণ নদীর নির্দেশে।সেখানে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হলো, নারি, অবাক হলাম না। হতবাক হবার কী আছে? তুমি যে মর্ত্যনারকী ধাতুর সংঘর্ষ থেকে জেগে উঠেছ নীল স্বর্গীয় শিখার মতো; সকল সময় স্থান অনুভবলোক অধিকার ক’রে সে তো থাকবে এইখানেই, আজ আমাদের এই কঠিন পৃথিবীতে।কোথাও মিনারে তুমি নেই আজ আর জানালার সোনালি নীল কমলা সবুজ কাচের দিগন্তে; কোথাও বনচ্ছবির ভিতরে নেই; শাদা সাধারণ নিঃসঙ্কোচ রৌদ্রের ভিতরে তুমি নেই আজ। অথবা ঝর্ণার জলে মিশরী শঙ্খরেখাসর্পিল সাগরীয় সমুৎসুকতায় তুমি আজ সূর্যজলস্ফুলিঙ্গের আত্মা-মুখরিত নও আর। তোমাকে আমেরিকার কংগ্রেস-ভবনে দেখতে চেয়েছিলাম, কিংবা ভারতের; অথবা ক্রেমলিনে কি বেতসতম্বী সূর্যশিখার কোনো স্থানে আছে যার মানে পবিত্রতা শান্তি শক্তি শুভ্রতা—সকলের জন্যে! নিঃসীম শুন্যে শুন্যের সংঘর্ষে স্বতরুৎসারা নীলিমার মতো কোনো রাষ্ট্র কি নেই আজ আর কোনো নগরী নেই সৃষ্টির মরালীকে যা বহন ক’রে চলেছে মধু বাতাসে নক্ষত্রে—লোক থেকে সূর্যলোকান্তরে!ডানে বাঁয়ে ওপরে নিচে সময়ের জ্বলন্ত তিমিরের ভিতর তোমাকে পেয়েছি। শুনেছি বিরাট শ্বেতপক্ষিসূর্যের ডানার উড্ডীন কলরোল; আগুনের মহান পরিধি গান ক’রে উঠছে।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/shomoyer-tirey/
5255
শামসুর রাহমান
সত্যি-বলতে
মানবতাবাদী
সত্যি-বলতে আজকাল যে যার মর্জিমাফিক আমার কবিতার গালে ঠিক গুনে গুনে ঠাস ঠাস চড় চাপড় লাগিয়ে দ্যায়। কেউ পানের পিক ছোঁড়ে মুখে, গলা ধাক্কা, গুঁতো, পাক্কারদ্দা আছে লেগে। কেউ মোড়লী চালে কান মুচড়ে নিজের তপ্ত মেজাজে ঢালে ঠাণ্ডা পানি। কেউবা ফেউ লেলিয়ে পরখ করে, কান্না জুড়ে দ্যায় কিনা অভিমানী আমার পংক্তিমালা। মাতব্বর সেই লোক, হ্যাঁ, হ্যাঁ, যে রাষ্ট্বপতিকে নিজের বাপের চেয়েও কদর করে বেশি, ঘাসের সাপের ধরনের সেই লোক, আমার কবিতার একটি হাত খসিয়ে র্যা কেট বানিয়ে টেনিস খেলতে শুরুকরে। অন্যজন পাঁজরের হাড় খুলে নিয়ে পগার পার, পাঁড়মাতাল এক মুরগীচোর আমার নগ্ন কবিতার ঠ্যাঙ ধ’রে করে টানাটানি, মারে ল্যাঙ। এক লেজযুক্ত সজ্জন সাফ সাফ ব’লে দিলো আমার সদ্য-লেখা পংক্তিমালাকে, ‘এই যে শুনছিস, যার হাত থেকে উৎসারিত তোরা, সেই উজবুক খাসির গোশ্‌তের মতো মৃত এক দশক আগে। বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? দাঁড়া বেকুবের দল, কে আছিস তাড়াতাড়ি আলমারি থেকে বের ক’রে আন ওর ম্রিয়মাণ কংকাল।এরই ফাঁকে বেশ্যালয়-ফেরত এক মাস্তান বেলফুল জড়ানো হাতে আমার কবিতার মুণ্ডু লোফালুফি ক’রে চিবুতে থাকে, যেন কচকচ খাচ্ছে টোমাটো। পাড়ার পাঁচজনের এই কাণ্ড কারখানা দেখে কবিতা আমার বেদম হাসে, হেসেই খুন, যেন সার্কাসে কয়েকটি বেবুন জবর লাফাচ্ছে, দিচ্ছে সুড়সুড়ি, কাতুকুতু, থুতু ছিটোচ্ছে যেখানে সেখানে, ভেংচি কাটছে, ইত্যাদি। ব্যপারটা এরকম, দেখে-শুনে কিন্তু মনেই হয় না পিলে চমকে-দেওয়া এক জন্তু আমাদের গিলে খেতে এগিয়ে আসছে হেলে দুলে, লেজ আছড়ে কাঁপাচ্ছে মাটি।   (খন্ডিত গৌরব কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/sotti-bolte/
5512
সুকান্ত ভট্টাচার্য
ব্যর্থতা
মানবতাবাদী
আজকে হঠাৎ সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হ’তে সাধ জাগে, মনে হয় তবু যদি পক্ষপাতের বালাই না নিয়ে পক্ষীরাজ, চাষার ছেলের হাতে এসে যেত হঠাৎ আজ৷ তা হলে না হয় আকাশবিহার হ’ত সফল, টুকরো মেঘেরা যেতে-যেতে ছুঁয়ে যেত কপোল; জনারণ্যে কি রাজকন্যার নেইকো ঠাঁই? কাস্তেখানাকে বাগিয়ে আজকে ভাবছি তাই৷অসি নাই থাক, হাতে তো আমার কাস্তে আছে, চাষার ছেলের অসিকে কি ভালবাসাতে আছে? তাই আমি যেতে চাই সেখানেই যেখানে পীড়ন, যেখানে ঝলসে উঠবে কাস্তে দৃপ্ত-কিরণ৷ হে রাজকন্যা, দৈত্যপুরীতে বন্দী থেকে নিজেকে মুক্ত করতে আমায় নিয়েছ ডেকে৷ হেমন্তে পাকা ফসল সামনে, তবু দিলে ডাক; তোমাকে মুক্ত করব, আজকে ধান কাটা থাক৷রাজপুত্রের মতন যদিও নেই কৃপাণ, তবু মনে আশা, তাই কাস্তেতে দিচ্ছি শান, হে রাজকুমারী, আমাদের ঘরে আসতে তোমার মন চাইবে তো? হবে কষ্টের সমুদ্র পার? দৈত্যশালায় পাথরের ঘর, পালঙ্ক-খাট, আমাদের শুধু পর্ণ-কুটির, ফাঁকা ক্ষেত-মাঠ; সোনার শিকল নেই, আমাদের মুক্ত আকাশ, রাজার ঝিয়ারী! এখানে নিদ্রাহীন বারো মাস৷এখানে দিন ও রাত্রি পরিশ্রমেই কাটে সূর্য এখানে দ্রুত ওঠে, নামে দেরিতে পাটে৷ হে রাজকন্যা, চলো যাই, আজ এলাম পাশে, পক্ষীরাজের অভাবে পা দেব কোমল ঘাসে৷ হে রাজকন্যা সাড়া দাও, কেন মৌন পাষাণ? আমার সঙ্গে ক্ষেতে গিয়ে তুমি তুলবে না ধান? হে রাজকন্যা, ঘুম ভাঙলো না? সোনার কাঠি কোথা থেকে পাব, আমরা নিঃস্ব, ক্ষেতেই খাটি৷ সোনার কাঠির সোনা নেই, আছে ধানের সোনা, তাতে কি হবে না? তবে তো বৃথাই অনুশোচনা॥ব্যর্থতা’ কবিতাটি আষাঢ় ১৩৫৩-র কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়৷ কবিতাটি ‘মীমাংসা’ কবিতার প্রথম খসড়া বলে মনে হয়৷
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/byarthota/
1528
নির্মলেন্দু গুণ
“সুন্দরগঞ্জ বা বাঁশখালীর গল্প”
মানবতাবাদী
‘রাইতভর ঘুমুইতে পারি না, ওরা আবার কহন আয়ে, কহন আয়ে।’আর কাঁন্দিস না মা, আমার কথা শোন, তুই তোর হাতের শাঁখা খুলে ফেল, মুছে ফেল তোর সিঁথির সিঁদুর। মা-কালীর শেষকৃত্য দেখে-দেখে, শেষে আমাদের শেষকৃত্য ডেকে আনবি নাকি? চল মা, তোর ভগবান পুড়ছে, পুড়ুক।এই চন্দ্রমুগ্ধ মূর্খের উল্লাস থেমে গেলে একাত্তরের মতো আবারও আমরা ফিরে আসবো আমাদের অগ্নিশুদ্ধ ঘরে। তখন তিনিই তোরে ফিরিয়ে দেবেন তোর শাঁখা-সিঁদুর, তোর প্রতিমার ছিন্নভিন্ন দেহ। তোর ভগবান কি অথর্ব, অন্ধ নাকি?তবে তাই কর বাবা, এই যে আমি বন্ধ করলাম আমার চোখ, তুই ভেঙে দে আমার শাঁখা, মুছে দে আমার সিঁদুর, জ্বলে পুড়ে শুদ্ধ হোক আমার ঠাকুর।
https://banglapoems.wordpress.com/2013/03/14/%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a6%e0%a6%b0%e0%a6%97%e0%a6%9e%e0%a7%8d%e0%a6%9c-%e0%a6%ac%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%81%e0%a6%b6%e0%a6%96%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a7%80%e0%a6%b0/
3988
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্তন
স্বদেশমূলক
১ নারীর প্রাণের প্রেম মধুর কোমল , বিকশিত যৌবনের বসন্তসমীরে কুসুমিত হয়ে ওই ফুটেছে বাহিরে , সৌরভসুধায় করে পরান পাগল । মরমের কোমলতা তরঙ্গ তরল উথলি উঠেছে যেন হৃদয়ের তীরে । কী যেন বাঁশির ডাকে জগতের প্রেমে বাহিরিয়া আসিতেছে সলাজ হৃদয় , সহসা আলোতে এসে গেছে যেন থেমে — শরমে মরিতে চায় অঞ্চল – আড়ালে । প্রেমের সংগীত যেন বিকশিয়া রয় , উঠিছে পড়িছে ধীরে হৃদয়ের তালে । হেরো গো কমলাসন জননী লক্ষ্মীর — হেরো নারীহৃদয়ের পবিত্র মন্দির ।২ পবিত্র সুমেরু বটে এই সে হেথায় , দেবতা বিহারভূমি কনক – অচল । উন্নত সতীর স্তন স্বরগ প্রভায় মানবের মর্ত্যভূমি করেছে উজ্জ্বল । শিশু রবি হোথা হতে ওঠে সুপ্রভাতে , শ্রান্ত রবি সন্ধ্যাবেলা হোথা অস্ত যায় । দেবতার আঁখিতারা জেগে থাকে রাতে , বিমল পবিত্র দুটি বিজন শিখরে । চিরস্নেহ – উৎসধারে অমৃত নির্ঝরে সিক্ত করি তুলিতেছে বিশ্বের অধর । জাগে সদা সুখসুপ্ত ধরণীর’পরে , অসহায় জগতের অসীম নির্ভর । ধরণীর মাঝে থাকি স্বর্গ আছে চুমি , দেবশিশু মানবের ওই মাতৃভূমি ।  (কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ston/
5990
হুমায়ুন আজাদ
বাঙলাদেশের কথা (আমরা কি এই বাঙলাদেশ চেয়েছিলাম)
স্বদেশমূলক
যখন আমরা বসি মুখোমুখি, আমাদের দশটি আঙুল হৃৎপিন্ডের মতো কাঁপতে থাকে দশটি আঙুলে, আমাদের ঠোঁটের গোলাপ ভিজে ওঠে আরক্ত শিশিরে, যখন আমরা আশ্চর্য আঙুলে জ্বলি, যখন আমরাই পরষ্পরের স্বাধীন স্বদেশ, তখন ভুলেও কখনো আমাকে তুমি বাঙলাদেশের কথা জিজ্ঞেস করো না; আমি তা মূহূর্তেও সহ্য করতে পারি না, -তার অনেক কারণ রয়েছে। তোমাকে মিনতি করি কখনো আমাকে তুমি বাঙলাদেশের কথা তুলে কষ্ট দিয়ো না। জানতে চেয়ো না তুমি নষ্টভ্রষ্ট ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের কথা, তার রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্ম, পাপ, মিথ্যাচার, পালে পালে মনুষ্যমন্ডলি, জীবনযাপন, হত্যা, ধর্ষণ, মধ্যযুগের দিকে অন্ধের মতোন যাত্রা সম্পর্কে প্রশ্ন ক’রে আমাকে পীড়ন কোরো না; আমি তা মুহূর্তেও সহ্য করতে পারি না, – তার অনেক কারণ রয়েছে । তোমাকে মিনতি করি কখনো আমাকে তুমি বাঙলাদেশের কথা তুলে কষ্ট দিয়ো না। জানতে চেয়ো না তুমি নষ্ট ভ্রষ্ট ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ মাইলের কথা: তার রাজনীতি অর্থনীতি, ধর্ম, পাপ, মিথ্যাচার, পালে পালে মনুষ্যম-লী জীবনযাপন, হত্যা, ধর্ষণ মধ্যযুগের দিকে অন্ধের মতোন যাত্রা সম্পর্কে প্রশ্ন করে আমাকে পীড়ন কোরো না তার ধানক্ষেত এখনো সবুজ, নারীরা এখনো রমনীয়, গাভীরা এখনো দুগ্ধবতী, কিন্তু প্রিয়তমা, বাঙলাদেশের কথা তুমি কখনো আমার কাছে জানতে চেয়ো না; আমি তা মুহূর্তেও সহ্য করতে পারি না, তার অনেক কারণ রয়েছে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/397
1301
তসলিমা নাসরিন
আমেরিকা
মানবতাবাদী
কবে তোমার লজ্জা হবে আমেরিকা? কবে তোমার চেতন হবে আমেরিকা? কবে তোমার সন্ত্রাস বন্ধ করবে তুমি আমেরিকা? কবে তুমি পৃথিবীর মানুষকে বাঁচতে দেবে আমেরিকা? কবে তুমি মানুষকে মানুষ বলে মনে করবে আমেরিকা? কবে এই পৃথিবীটাকে টিকে থাকতে দেবে আমেরিকা? শক্তিমান আমেরিকা, তোমার বোমায় আজ নিহত মানুষ, তোমার বোমায় আজ ধ্বংস নগরী, তোমার বোমায় আজ চূর্ণ সভ্যতা, তোমার বোমায় আজ নষ্ট সম্ভাবনা, তোমার বোমায় আজ বিলুপ্ত স্বপ্ন। কবে তোমার হত্যাযজ্ঞের দিকে তাকাবে, কুৎসিত মনের দিকে, কলঙ্কের দিকে তাকাবে আমেরিকা, কবে তুমি অনুতপ্ত হবে আমেরিকা? কবে তুমি সত্য বলবে আমেরিকা? কবে তুমি মানুষ হবে আমেরিকা? কবে তুমি কাঁদবে আমেরিকা? কবে তুমি ক্ষমা চাইবে আমেরিকা? আমরা তোমার দিকে ঘৃণা ছুঁড়ে দিচ্ছি আমেরিকা, আমরা ঘৃণা ছুঁড়তে থাকবো ততদিন, যতদিন না তোমার মারণাস্ত্র ধ্বংস করে তুমি হাঁটু গেড়ে বসো, ঘৃণা ছুঁড়তেই থাকবো যতদিন না তুমি প্রায়শ্চিত্য করো, আমরা ঘৃণা ছুঁড়বো, আমাদের সন্তান ছুঁড়বে, সন্তানের সন্তান ছুঁড়বে, এই ঘৃণা থেকে তুমি পরিত্রাণ পাবে না আমেরিকা। তোমার কত সহস্র আদিবাসীকে তুমি খুন করেছো, কত খুন করেছো এল সালভাদরে, খুন করেছো নিকারাগুয়ায়, করেছো চিলিতে, কিউবায়, করেছো পানামায়, ইন্দোনেশিয়ায়, কোরিয়ায়, খুন করেছো ফিলিপিনে, করেছো ইরানে, ইরাকে, লিবিয়ায়, মিশরে, প্যালেস্তাইনে, ভিয়েতনামে, সুদানে, আফগানিস্তানে — মৃত্যুগুলো হিসেব করো, আমেরিকা তুমি হিসেব করো, নিজেকে ঘৃণা করো তুমি আমেরিকা। নিজেকে তুমি, এখনও সময় আছে, ঘৃণা করো। এখনও তুমি তোমার মুখখানা লুকোও দু হাতে, এখনও তুমি পালাও কোনও ঝাড় জঙ্গলে, তুমি গ্লানিতে কুঁকড়ে থাকো, কুঁচকে থাকো, তুমি আত্মহত্যা করো। থামো, একটু দাঁড়াও। আমেরিকা তুমি তো গণতন্ত্র, তুমি তো স্বাধীনতা! তুমি তো জেফারসনের আমেরিকা, লিংকনের আমেরিকা, তুমি মার্টিন লুথার কিংএর আমেরিকা, তুমি রুখে ওঠো, রুখে ওঠো একবার, শেষবার, মানবতার জন্য।
https://banglarkobita.com/poem/famous/2009
5939
সৈয়দ শামসুল হক
পরানের গহীন ভিতর-১২
সনেট
উঠানের সেই দিকে আন্ধারের ইয়া লম্বা লাশ, শিমের মাচার নিচে জোছনার সাপের ছলম, পরীরা সন্ধান করে যুবতীর ফুলের কলম, তারার ভিতরে এক ধুনকার ধুনায় কাপাশ, আকাশে দোলায় কার বিবাহের রুপার বাসন, গাবের বাবরি চুল আলখেল্লা পরা বয়াতির, গাভির ওলান দিয়া ক্ষীণ ধারে পড়তাছে ক্ষীর, দুই গাঙ্গ এক হয়া যাইতাছে- কান্দন, হাসন। একবার আসবা না?- তোমারেও ডাক দিতে আছে যে তুমি দুঃখের দিকে একা একা যোজন গিয়াছো? একবার দেখবা না তোমারেও ডাক দিতে আছে যে তুমি আঘাত নিয়া সারাদিন কি তফাত আছো? যে নাই সে নাই সই, তাই সই, যা আছে তা আছে, এমন পুন্নিমা আইজ, কোন দুঃখে দুয়ার দিয়াছো?
https://www.bangla-kobita.com/shamsulhaque/poraner-gohin-bhitor-12/
5700
সুকুমার রায়
হনহন পনপন
ছড়া
চলে হনহন ছোটে পনপনঘোরে বনবন কাজে ঠনঠনবায়ু শনশন শীতে কনকনকাশি খনখন ফোঁড়া টনটনমাছি ভনভন থালা ঝন ঝন।কাব্যগ্রন্থঃ- হ য ব র ল
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/post20160511123823/
161
আহসান হাবীব
দোতলার ল্যান্ডিং মুখোমুখি দুজন
প্রেমমূলক
মুখোমুখি ফ্ল্যাট একজন সিঁড়িতে, একজন দরজায় : আপনারা যাচ্ছেন বুঝি ? : চলে যাচ্ছি, মালপত্র উঠে গেছে সব । : বছর দুয়েক হল, তাই নয় ? : তারো বেশী । আপনার ডাক নাম শানু, ভালো নাম ? : শাহানা, আপনার ? : মাবু । : জানি । : মাহবুব হোসেন । আপনি খুব ভালো সেলাই জানেন । : কে বলেছে । আপনার তো অনার্স ফাইন্যাল, তাই নয় ? : এবার ফাইন্যাল । : ফিজিক্স-এ অনার্স । : কী আশ্চর্য ! আপনি কেন ছাড়লেন হঠাৎ ? : মা চান না । মানে ছেলেদের সঙ্গে বসে… : সে যাক গে, পা সেরেছে ? : কী করে জানলেন ? : এই আর কি ! সেরে গেছে ? : ও কিছুনা , প‌যাসেজটা পিছলে ছিল মানে… : সত্যি নয় । উচুঁ থেকে পড়ে গিয়ে… : ধ্যাৎ । খাবার টেবিলে রোজ মাকে অতো জ্বালানো কি ভালো ? : মা বলেছে ? : শুনতে পাই । বছর দুয়েক হল, তাই নয় ? : তারো বেশী । আপনার টবের গাছে ফুল এসেছে ? : নেবেন ? না থাক । রিকসা এল, মা এলেন , যাই । : আপনি সন্ধ্যে বেলা ওভাবে কখনও পড়বেননা, চোখ যাবে, যাই । : হলুদ শার্টের মাঝখানে বোতাম নেই, লাগিয়ে নেবেন, যাই । : যান, আপনার মা আসছেন । মা ডাকছেন, যাই।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3817.html
4068
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১৪০০ সাল
প্রকৃতিমূলক
আজি হতে শতবর্ষ পরে কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি কৌতূহলভরে-- আজি হতে শতবর্ষ পরে। আজি নববসন্তের প্রভাতের আনন্দের লেশমাত্র ভাগ-- আজিকার কোনো ফুল, বিহঙ্গের কোনো গান, আজিকার কোনো রক্তরাগ অনুরাগে সিক্ত করি পারিব না পাঠাইতে তোমাদের করে আজি হতে শতবর্ষ পরে।তবু তুমি একবার খুলিয়া দক্ষিণদ্বার বসি বাতায়নে সুদূর দিগন্তে চাহি কল্পনায় অবগাহি ভেবে দেখো মনে-- একদিন শতবর্ষ আগে চঞ্চল পুলকরাশি কোন্‌ স্বর্গ হতে ভাসি নিখিলের মর্মে আসি লাগে-- নবীন ফাল্গুনদিন সকল বন্ধনহীন উন্মত্ত অধীর-- উড়ায়ে চঞ্চল পাখা পুষ্পরেণুগন্ধমাখা দক্ষিণসমীর-- সহসা আসিয়া ত্বরা রাঙায়ে দিয়েছে ধরা যৌবনের রাগে তোমাদের শতবর্ষ আগে। সেদিন উতলা প্রাণে, হৃদয় মগন গানে, কবি এক জাগে-- কত কথা পুষ্পপ্রায় বিকশি তুলিতে চায় কত অনুরাগে একদিন শতবর্ষ আগে। আজি হতে শতবর্ষ পরে এখন করিছে গান সে কোন্‌ নূতন কবি তোমাদের ঘরে? আজিকার বসন্তের আনন্দ-অভিবাদন পাঠায়ে দিলাম তাঁর করে। আমার বসন্তগান তোমার বসন্তদিনে ধ্বনিত হউক ক্ষণতরে হৃদয়স্পন্দনে তব ভ্রমরগুঞ্জনে নব পল্লবমর্মরে আজি হতে শতবর্ষ পরে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/1400-shaal/
957
জীবনানন্দ দাশ
এই পৃথিবীতে আমি অবসর নিয়ে শুধু আসিয়াছি
সনেট
এই পৃথিবীতে আমি অবসর নিয়ে শুধু আসিয়াছি — আমি হৃষ্ট কবি আমি এক; — ধুয়েছি আমার দেহ অন্ধকারে একা একা সমুদ্রের জলে; ভালোবাসিয়াছি আমি রাঙা রোদ, ক্ষান্ত কার্তিকের মাঠে — ঘাসের আঁচলে ফড়িঙের মতো আমি বেড়ায়েছি — দেখেছি কিশোরী এস হলুদ করবী ছিঁড়ে নেয় — বুকে তার লাল পেড়ে ভিজে শাড়ি করুন শঙ্খের মতো ছবি ফুটাতেছে — ভোরের আকাশখানা রাজহাস ভরে গেছে নব কোলাহলে নব নব সূচনার: নদীর গোলাপী ঢেউ কথা বলে — তবু কথা বলে, তবু জানি তার কথা কুয়াশায় ফুরায় না — কেউ যেন শুনিতেছে সবিকোন্‌ রাঙা শাটিনের মেঘে বসে — অথবা শোনে না কেউ, শূণ্য কুয়াশায় মুছে যায় সব তার; একদিন বর্ণচ্ছটা মুছে যাবো আমিও এমন; তবু আজ সবুজ ঘাসের পরে বসে থাকি; ভালোবাসি; প্রেমের আশায় পায়ের ধ্বনির দিকে কান পেতে থাকি চুপে; কাঁটাবহরের ফল করি আহরণ কারে যেন এই গুলো দেবো আমি; মৃদু ঘাসে একা — একা বসে থাকা যায় এই সব সাধ নিয়ে; যখন আসিবে ঘুম তারপর, ঘুমাব তখন।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/eei-prithibitey-aami-oboshor-niye-shudhu-ashiachi/
3792
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যে যায় তাহারে অার
রূপক
যে যায় তাহারে অার ফিরে ডাকা বৃথা। অশ্রুজলে স্মৃতি তার হোক পল্লবিতা।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/je-jai-tahare-ar/
3235
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দুই বন্ধু
সনেট
মূঢ় পশু ভাষাহীন নির্বাক্‌হৃদয়, তার সাথে মানবের কোথা পরিচয়! কোন্‌ আদি স্বর্গলোকে সৃষ্টির প্রভাতে হৃদয়ে হৃদয়ে যেন নিত্য যাতায়াতে পথচিহ্ন পড়ে গেছে, আজো চিরদিনে লুপ্ত হয় নাই তাহা, তাই দোঁহে চিনে। সেদিনের আত্মীয়তা গেছে বহুদূরে; তবুও সহসা কোন্‌ কথাহীন সুরে পরানে জাগিয়া উঠে ক্ষীণ পূর্বস্মৃতি, অন্তরে উচ্ছলি উঠে সুধাময়ী প্রীতি, মুগ্ধ মূঢ় স্নিগ্ধ চোখে পশু চাহে মুখে— মানুষ তাহারে হেরে স্নেহের কৌতুকে। যেন দুই ছদ্মবেশে দু বন্ধুর মেলা— তার পরে দুই জীবে অপরূপ খেলা।(চৈতালি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/dui-bondhu/
2870
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কবি-কাহিনী (চতুর্থ সর্গ)
কাহিনীকাব্য
"এ তবে স্বপন শুধু, বিম্বের মতন আবার মিলায়ে গেল নিদ্রার সমুদ্রে! সারারাত নিদ্রার করিনু আরাধনা-- যদি বা আইল নিদ্রা এ শ্রান্ত নয়নে, মরীচিকা দেখাইয়া গেল গো মিলায়ে! হা স্বপ্ন, কি শক্তি তোর, এ হেন মূরতি মুহূর্ত্তের মধ্যে তুই ভাঙ্গিলি, গড়িলি? হা নিষ্ঠুর কাল, তোর এ কিরূপ খেলা-- সত্যের মতন গড়িলি প্রতিমা, স্বপ্নের মতন তাহা ফেলিলি ভাঙ্গিয়া? কালের সমুদ্রে এক বিম্বের মতন উঠিল, আবার গেল মিলায়ে তাহাতে? না না, তাহা নয় কভু, নলিনী, সে কি গো কালের সমুদ্রে শুধু বিম্বটির মত! যাহার মোহিনী মূর্ত্তি হৃদয়ে হৃদয়ে শিরায় শিরায় আঁকা শোণিতের সাথে, যত কাল রব বেঁচে যার ভালবাসা চিরকাল এ হৃদয়ে রহিবে অক্ষয়, সে বালিকা, সে নলিনী, সে স্বর্গপ্রতিমা, কালের সমুদ্রে শুধু বিম্বটির মত তরঙ্গের অভিঘাতে জন্মিল মিশিল? না না, তাহা নয় কভু, তা যেন না হয়! দেহকারাগারমুক্ত সে নলিনী এবে সুখে দুখে চিরকাল সম্পদে বিপদে আমারই সাথে সাথে করিছে ভ্রমণ। চিরহাস্যময় তার প্রেমদৃষ্টি মেলি আমারি মুখের পানে রয়েছে চাহিয়া। রক্ষক দেবতা সম আমারি উপরে প্রশান্ত প্রেমের ছায়া রেখেছে বিছায়ে। দেহকারাগারমুক্ত হইলে আমিও তাহার হৃদয়সাথে মিশাব হৃদয়। নলিনী, আছ কি তুমি, আছ কি হেথায়? একবার দেখা দেও, মিটাও সন্দেহ! চিরকাল তরে তোরে ভুলিতে কি হবে? তাই বল্ নলিনী লো, বল্ একবার! চিরকাল আর তোরে পাব না দেখিতে, চিরকাল আর তোর হৃদয়ে হৃদয় পাব না কি মিশাইতে, বল্ একবার। মরিলে কি পৃথিবীর সব যায় দূরে? তুই কি আমারে ভুলে গেছিস্ নলিনি? তা হোলে নলিনি, আমি চাই না মরিতে। তোর ভালবাসা যেন চিরকাল মোর হৃদয়ে অক্ষয় হোয়ে থাকে গো মুদ্রিত-- কষ্ট পাই পাব, তবু চাই না ভুলিতে! তুমি নাহি থাক যদি তোমার স্মৃতিও থাকে যেন এ হৃদয় করিয়া উজ্জ্বল! এই ভালবাসা যাহা হৃদয়ে মরমে অবশিষ্ট রাখে নাই এক তিল স্থান, একটি পার্থিব ক্ষুদ্র নিশ্বাসের সাথে মুহূর্ত্তে না পালটিতে আঁখির পলক ক্ষণস্থায়ী কুসুমের সুরভের মত শূন্য এই বায়ুস্রোতে যাইবে মিশায়ে? হিমাদ্রির এই স্তব্ধ আঁধার গহ্বরে সময়ের পদক্ষেপ গণিতেছি বসি, ভবিষ্যৎ ক্রমে হইতেছে বর্ত্তমান, বর্ত্তমান মিশিতেছে অতীতসমুদ্রে। অস্ত যাইতেছে নিশি, আসিছে দিবস, দিবস নিশার কোলে পড়িছে ঘুমায়ে। এই সময়ের চক্র ঘুরিয়া নীরবে পৃথিবীরে মানুষেরে অলক্ষিতভাবে পরিবর্ত্তনের পথে যেতেছে লইয়া, কিন্তু মনে হয় এই হিমাদ্রীর বুকে তাহার চরণ-চিহ্ন পড়িছে না যেন। কিন্তু মনে হয় যেন আমার হৃদয়ে দুর্দ্দাম সময়স্রোত অবিরামগতি, নূতন গড়ে নি কিছু, ভাঙ্গে নি পুরাণো। বাহিরের কত কি যে ভাঙ্গিল চূরিল, বাহিরের কত কি যে হইল নূতন, কিন্তু ভিতরের দিকে চেয়ে দেখ দেখি-- আগেও আছিল যাহা এখনো তা আছে, বোধ হয় চিরকাল থাকিবে তাহাই! বরষে বরষে দেহ যেতেছে ভাঙ্গিয়া, কিন্তু মন আছে তবু তেমনি অটল। নলিনী নাইকো বটে পৃথিবীতে আর, নলিনীরে ভালবাসি তবুও তেমনি। যখন নলিনী ছিল, তখন যেমন তার হৃদয়ের মূর্ত্তি ছিল এ হৃদয়ে, এখনো তেমনি তাহা রয়েছে স্থাপিত। এমন অন্তরে তারে রেখেছি লুকায়ে, মরমের মর্ম্মস্থলে করিতেছি পূজা, সময় পারে না সেথা কঠিন আঘাতে ভাঙ্গিবারে এ জনমে সে মোর প্রতিমা, হৃদয়ের আদরের লুকানো সে ধন! ভেবেছিনু এক বার এই-যে বিষাদ নিদারুণ তীব্র স্রোতে বহিছে হৃদয়ে এ বুঝি হৃদয় মোর ভাঙ্গিবে চূরিবে-- পারে নি ভাঙ্গিতে কিন্তু এক তিল তাহা, যেমন আছিল মন তেমনি রয়েছে! বিষাদ যুঝিয়াছিল প্রাণপণে বটে, কিন্তু এ হৃদয়ে মোর কি যে আছে বল, এ দারুণ সমরে সে হইয়াচে জয়ী। গাও গো বিহগ তব প্রমোদের গান, তেমনি হৃদয়ে তার রবে প্রতিধ্বনি! প্রকৃতি! মাতার মত সুপ্রসন্ন দৃষ্টি যেমন দেখিয়াছিনু ছেলেবেলা আমি, এখনো তেমনি যেন পেতেছি দেখিতে। যা কিছু সুন্দর, দেবি, তাহাই মঙ্গল, তোমার সুন্দর রাজ্যে হে প্রকৃতিদেবি তিল অমঙ্গল কভু পারে না ঘটিতে। অমন সুন্দর আহা নলিনীর মন, জীবন সৌন্দর্য্য, দেবি তোমার এ রাজ্যে অনন্ত কালের তরে হবে না বিলীন। যে আশা দিয়াছ হৃদে ফলিবে তা দেবি, এক দিন মিলিবেক হৃদয়ে হৃদয়। তোমার আশ্বাসবাক্যে হে প্রকৃতিদেবি, সংশয় কখনো আমি করি না স্বপনে! বাজাও রাখাল তব সরল বাঁশরী! গাও গো মনের সাধে প্রমোদের গান! পাখীরা মেলিয়া যবে গাইতেছে গীত, কানন ঘেরিয়া যবে বহিতেছে বায়ু, উপত্যকাময় যবে ফুটিয়াছে ফুল, তখন তোদের আর কিসের ভাবনা? দেখি চিরহাস্যময় প্রকৃতির মুখ, দিবানিশি হাসিবারে শিখেছিস্ তোরা! সমস্ত প্রকৃতি যবে থাকে গো হাসিতে, সমস্ত জগৎ যবে গাহে গো সঙ্গীত, তখন ত তোরা নিজ বিজন কুটীরে ক্ষুদ্রতম আপনার মনের বিষাদে সমস্ত জগৎ ভুলি কাঁদিস না বসি! জগতের, প্রকৃতির ফুল্ল মুখ হেরি আপনার ক্ষুদ্র দুঃখ রহে কি গো আর? ধীরে ধীরে দূর হোতে আসিছে কেমন বসন্তের সুরভিত বাতাসের সাথে মিশিয়া মিশিয়া এই সরল রাগিণী। একেক রাগিণী আছে করিলে শ্রবণ মনে হয় আমারি তা প্রাণের রাগিণী-- সেই রাগিণীর মত আমার এ প্রাণ, আমার প্রাণের মত যেন সে রাগিণী! কখন বা মনে হয় পুরাতন কাল এই রাগিণীর মত আছিল মধুর, এমনি স্বপনময় এমনি অস্ফুট-- পাই শুনি ধীরি ধীরি পুরাতন স্মৃতি প্রাণের ভিতরে যেন উথলিয়া উঠে!" ক্রমে কবি যৌবনের ছাড়াইয়া সীমা, গম্ভীর বার্দ্ধক্যে আসি হোলো উপনীত! সুগম্ভীর বৃদ্ধ কবি, স্কন্ধে আসি তার পড়েছে ধবল জটা অযত্নে লুটায়ে! মনে হোতো দেখিলে সে গম্ভীর মুখশ্রী হিমাদ্রি হোতেও বুঝি সমুচ্চ মহান্! নেত্র তাঁর বিকীরিত কি স্বর্গীয় জ্যোতি, যেন তাঁর নয়নের শান্ত সে কিরণ সমস্ত পৃথিবীময় শান্তি বরষিবে। বিস্তীর্ণ হইয়া গেল কবির সে দৃষ্টি, দৃষ্টির সম্মুখে তার, দিগন্তও যেন খুলিয়া দিত গো নিজ অভেদ্য দুয়ার। যেন কোন দেববালা কবিরে লইয়া অনন্ত নক্ষত্রলোকে কোরেছে স্থাপিত-- সামান্য মানুষ যেথা করিলে গমন কহিত কাতর স্বরে ঢাকিয়া নয়ন, "এ কি রে অনন্ত কাণ্ড, পারি না সহিতে!" সন্ধ্যার আঁধারে হোথা বসিয়া বসিয়া, কি গান গাইছে কবি, শুন কলপনা। কি "সুন্দর সাজিয়াছে ওগো হিমালয় তোমার বিশালতম শিখরের শিরে একটি সন্ধ্যার তারা! সুনীল গগন ভেদিয়া, তুষারশুভ্র মস্তক তোমার! সরল পাদপরাজি আঁধার করিয়া উঠেছে তাহার পরে; সে ঘোর অরণ্য ঘেরিয়া হুহুহু করি তীব্র শীতবায়ু দিবানিশি ফেলিতেছে বিষণ্ণ নিশ্বাস! শিখরে শিখরে ক্রমে নিভিয়া আসিল অস্তমান তপনের আরক্ত কিরণে প্রদীপ্ত জলদচূর্ণ। শিখরে শিখরে মলিন হইয়া এল উজ্জ্বল তুষার, শিখরে শিখরে ক্রমে নামিয়া আসিল আঁধারের যবনিকা ধীরে ধীরে ধীরে! পর্ব্বতের বনে বনে গাঢ়তর হোলো ঘুমময় অন্ধকার। গভীর নীরব! সাড়াশব্দ নাই মুখে, অতি ধীরে ধীরে অতি ভয়ে ভয়ে যেন চলেছে তটিনী সুগম্ভীর পর্ব্বতের পদতল দিয়া! কি মহান্! কি প্রশান্ত! কি গম্ভীর ভাব! ধরার সকল হোতে উপরে উঠিয়া স্বর্গের সীমায় রাখি ধবল জটায় জড়িত মস্তক তব ওগো হিমালয় নীরব ভাষায় তুমি কি যেন একটি গম্ভীর আদেশ ধীরে করিছ প্রচার! সমস্ত পৃথিবী তাই নীরব হইয়া শুনিছে অনন্যমনে সভয়ে বিস্ময়ে। আমিও একাকী হেথা রয়েছি পড়িয়া, আঁধার মহা-সমুদ্রে গিয়াছি মিশায়ে, ক্ষুদ্র হোতে ক্ষুদ্র নর আমি, শৈলরাজ! অকূল সমুদ্রে ক্ষুদ্র তৃণটির মত হারাইয়া দিগ্বিদিক্, হারাইয়া পথ, সভয়ে বিস্ময়ে, হোয়ে হতজ্ঞানপ্রায় তোমার চরণতলে রয়েছি পড়িয়া। ঊর্দ্ধ্বমুখে চেয়ে দেখি ভেদিয়া আঁধার শূন্যে শূন্যে শত শত উজ্জ্বল তারকা, অনিমিষ নেত্রগুলি মেলিয়া যেন রে আমারি মুখের পানে রয়েছে চাহিয়া। ওগো হিমালয়, তুমি কি গম্ভীর ভাবে দাঁড়ায়ে রয়েছ হেথা অচল অটল, দেখিছ কালের লীলা, করিছ গননা, কালচক্র কত বার আইল ফিরিয়া! সিন্ধুর বেলার বক্ষে গড়ায় যেমন অযুত তরঙ্গ, কিছু লক্ষ্য না করিয়া কত কাল আইল রে, গেল কত কাল হিমাদ্রি তোমার ওই চক্ষের উপরি। মাথার উপর দিয়া কত দিবাকর উলটি কালের পৃষ্ঠা গিয়াছে চলিয়া। গম্ভীর আঁধারে ঢাকি তোমার ও দেহ কত রাত্রি আসিয়াছে গিয়াছে পোহায়ে। কিন্তু বল দেখি ওগো হিমালয়গিরি মানুষসৃষ্টির অতি আরম্ভ হইতে কি দেখিছ এইখানে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে? যা দেখিছ যা দেখেছ তাতে কি এখনো সর্ব্বাঙ্গ তোমার গিরি উঠে নি শিহরি? কি দারুণ অশান্তি এই মনুষ্যজগতে-- রক্তপাত, অত্যাচার , পাপ কোলাহল দিতেছে মানবমনে বিষ মিশাইয়া! কত কোটি কোটি লোক, অন্ধকারাগারে অধীনতাশৃঙ্খলেতে আবদ্ধ হইয়া ভরিছে স্বর্গের কর্ণ কাতর ক্রন্দনে, অবশেষে মন এত হোয়েছে নিস্তেজ, কলঙ্কশৃঙ্খল তার অলঙ্কাররূপে আলিঙ্গন ক'রে তারে রেখেছে গলায়! দাসত্বের পদধূলি অহঙ্কার কোরে মাথায় বহন করে পরপ্রত্যাশীরা! যে পদ মাথায় করে ঘৃণার আঘাত সেই পদ ভক্তিভরে করে গো চুম্বন! যে হস্ত ভ্রাতারে তার পরায় শৃঙ্খল, সেই হস্ত পরশিলে স্বর্গ পায় করে। স্বাধীন, সে অধীনেরে দলিবার তরে, অধীন, সে স্বাধীনেরে পূজিবারে শুধু! সবল, সে দুর্ব্বলেরে পীড়িতে কেবল—দুর্ব্বল, বলের পদে আত্ম বিসর্জ্জিতে! স্বাধীনতা কারে বলে জানে সেই জন কোথায় সেই অসহায় অধীন জনের কঠিন শৃঙ্খলরাশি দিবে গো ভাঙ্গিয়া, না, তার স্বাধীন হস্ত হোয়েছে কেবল অধীনের লৌহপাশ দৃঢ় করিবারে। সবল দুর্ব্বলে কোথা সাহায্য করিবে-- দুর্ব্বলে অধিকতর করিতে দুর্ব্বল বল তার-- হিমগিরি, দেখিছ কি তাহা? সামান্য নিজের স্বার্থ করিতে সাধন কত দেশ করিতেছে শ্মশান অরণ্য, কোটি কোটি মানবের শান্তি স্বাধীনতা রক্তময়পদাঘাতে দিতেছে ভাঙ্গিয়া, তবুও মানুষ বলি গর্ব্ব করে তারা, তবু তারা সভ্য বলি করে অহঙ্কার! কত রক্তমাখা ছুরি হাসিছে হরষে, কত জিহ্বা হৃদয়েরে ছিঁড়িছে বিঁধিছে! বিষাদের অশ্রুপূর্ণ নয়ন হে গিরি অভিশাপ দেয় সদা পরের হরষে, উপেক্ষা ঘৃণায় মাখা কুঞ্চিত অধর পরঅশ্রুজলে ঢালে হাসিমাখা বিষ! পৃথিবী জানে না গিরি হেরিয়া পরের জ্বালা, হেরিয়া পরের মর্ম্মদুখের উচ্ছ্বাস, পরের নয়নজলে মিশাতে নয়নজল—পরের দুখের শ্বাসে মিশাতে নিশ্বাস! প্রেম? প্রেম কোথা হেথা এ অশান্তিধামে? প্রণয়ের ছদ্মবেশ পরিয়া যেথায় বিচরে ইন্দ্রিয়সেবা, প্রেম সেথা আছে? প্রেমে পাপ বলে যারা, প্রেম তারা চিনে? মানুষে মানুষে যেথা আকাশ পাতাল, হৃদয়ে হৃদয়ে যেথা আত্ম-অভিমান, যে ধরায় মন দিয়া ভাল বাসে যারা উপেক্ষা বিদ্বেষ ঘৃণা মিথ্যা অপবাদে তারাই অধিক সহে বিষাদ যন্ত্রণা, সেথা যদি প্রেম থাকে তবে কোথা নাই-- তবে প্রেম কলুষিত নরকেও আছে! কেহ বা রতনময় কনকভবনে ঘুমায়ে রয়েছে সুখে বিলাসের কোলে, অথচ সুমুখ দিয়া দীন নিরালয় পথে পথে করিতেছে ভিক্ষান্নসন্ধান! সহস্র পীড়িতদের অভিশাপ লোয়ে সহস্রের রক্তধারে ক্ষালিত আসনে সমস্ত পৃথিবী রাজা করিছে শাসন, বাঁধিয়া গলায় সেই শাসনের রজ্জু সমস্ত পৃথিবী তাহার রহিয়াছে দাস! সহস্র পীড়ন সহি আনত মাথায় একের দাসত্বে রত অযুত মানব! ভাবিয়া দেখিলে মন উঠে গো শিহরি-- ভ্রমান্ধ দাসের জাতি সমস্ত মানুষ। এ অশান্তি কবে দেব হবে দূরীভূত! অত্যাচার-গুরুভারে হোয়ে নিপীড়িত সমস্ত পৃথিবী, দেব, করিছে ক্রন্দন! সুখ শান্তি সেথা হোতে লয়েছে বিদায়! কবে, দেব, এ রজনী হবে অবসান? স্নান করি প্রভাতের শিশিরসলিলে তরুণ রবির করে হাসিবে পৃথিবী! অযুত মানবগণ এক কণ্ঠে, দেব, এক গান গাইবেক স্বর্গ পূর্ণ করি! নাইক দরিদ্র ধনী অধিপতি প্রজা-- কেহ কারো কুটীরেতে করিলে গমন মর্য্যাদার অপমান করিবে না মনে, সকলেই সকলের করিতেছে সেবা, কেহ কারো প্রভু নয়, নহে কারো দাস! নাই ভিন্ন জাতি আর নাই ভিন্ন ভাষা নাই ভিন্ন দেশ, ভিন্ন আচার ব্যাভার! সকলেই আপনার আপনার লোয়ে পরিশ্রম করিতেছে প্রফুল্ল-অন্তরে। কেহ কারো সুখে নাহি দেয় গো কণ্টক, কেহ কারো দুখে নাহি করে উপহাস! দ্বেষ নিন্দা ক্রূরতার জঘন্য আসন ধর্ম্ম-আবরণে নাহি করে গো সজ্জিত! হিমাদ্রি, মানুষসৃষ্টি-আরম্ভ হইতে অতীতের ইতিহাস পড়েছ সকলি, অতীতের দীপশিখা যদি হিমালয় ভবিষ্যৎ অন্ধকারে পারে গো ভেদিতে তবে বল কবে, গিরি, হবে সেই দিন যে দিন স্বর্গই হবে পৃথ্বীর আদর্শ! সে দিন আসিবে গিরি, এখনিই যেন দূর ভবিষ্যৎ সেই পেতেছি দেখিতে যেই দিন এক প্রেমে হইয়া নিবদ্ধ মিলিবেক কোটি কোটি মানবহৃদয়। প্রকৃতির সব কার্য্য অতি ধীরে ধীরে, এক এক শতাব্দীর সোপানে সোপানে-- পৃথ্বী সে শান্তির পথে চলিতেছে ক্রমে, পৃথিবীর সে অবস্থা আসে নি এখনো কিন্তু এক দিন তাহা আসিবে নিশ্চয়। আবার বলি গো আমি হে প্রকৃতিদেবি যে আশা দিয়াছ হৃদে ফলিবেক তাহা, এক দিন মিলিবেক হৃদয়ে হৃদয়। এ যে সুখময় আশা দিয়াছ হৃদয়ে ইহার সঙ্গীত, দেবি, শুনিতে শুনিতে পারিব হরষচিতে ত্যজিতে জীবন!" সমস্ত ধরার তরে নয়নের জল বৃদ্ধ সে কবির নেত্র করিল পূর্ণিত! যথা সে হিমাদ্রি হোতে ঝরিয়া ঝরিয়া কত নদী শত দেশ করয়ে উর্ব্বরা। উচ্ছ্বসিত করি দিয়া কবির হৃদয় অসীম করুণা সিন্ধু পোড়েছে ছড়ায়ে সমস্ত পৃথিবীময়। মিলি তাঁর সাথে জীবনের একমাত্র সঙ্গিনী ভারতী কাঁদিলেন আর্দ্র হোয়ে পৃথিবীর দুখে, ব্যাধশরে নিপতিত পাখীর মরণে বাল্মীকির সাথে যিনি করেন রোদন! কবির প্রাচীননেত্রে পৃথিবীর শোভা এখনও কিছু মাত্র হয় নি পুরাণো? এখনো সে হিমাদ্রির শিখরে শিখরে একেলা আপন মনে করিত ভ্রমণ। বিশাল ধবল জটা, বিশাল ধবল শ্মশ্রু, নেত্রের স্বর্গীয় জ্যোতি, গম্ভীর মূরতি, প্রশস্ত ললাটদেশ, প্রশান্ত আকৃতি তার মনে হোত হিমাদ্রির অধিষ্ঠাতৃদেব! জীবনের দিন ক্রমে ফুরায় কবির! সঙ্গীত যেমন ধীরে আইসে মিলায়ে, কবিতা যেমন ধীরে আইসে ফুরায়ে, প্রভাতের শুকতারা ধীরে ধীরে যথা ক্রমশঃ মিশায়ে আসে রবির কিরণে, তেমনি ফুরায়ে এল কবির জীবন। প্রতিরাত্রে গিরিশিরে জোছনায় বসি আনন্দে গাইত কবি সুখের সঙ্গীত। দেখিতে পেয়েছে যেন স্বর্গের কিরণ, শুনিতে পেয়েছে যেন দূর স্বর্গ হোতে, নলিনীর সুমধুর আহ্বানের গান। প্রবাসী যেমন আহা দূর হোতে যদি সহসা শুনিতে পায় স্বদেশ-সঙ্গীত, ধায় হরষিত চিতে সেই দিক্ পানে, একদিন দুইদিন যেতেছে যেমন চলেছে হরষে কবি সেই দেশ হোতে স্বদেশসঙ্গীতধ্বনি পেতেছে শুনিতে। এক দিন হিমাদ্রির নিশীথ বায়ুতে কবির অন্তিম শ্বাস গেল মিশাইয়া! হিমাদ্রি হইল তার সমাধিমন্দির, একটি মানুষ সেথা ফেলে নি নিশ্বাস! প্রত্যহ প্রভাত শুধু শিশিরাশ্রুজলে হরিত পল্লব তার করিত প্লাবিত! শুধু সে বনের মাঝে বনের বাতাস, হুহু করি মাঝে মাঝে ফেলিত নিশ্বাস! সমাধি উপরে তার তরুলতাকুল প্রতিদিন বরষিত কত শত ফুল! কাছে বসি বিহগেরা গাইত গো গান, তটিনী তাহার সাথে মিশাইত তান। (কবি-কাহিনী কাব্যোপন্যাস)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kobi-kahini-choturtho-sorgo/
3778
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
যাও তবে প্রিয়তম সুদূর সেথায়
প্রেমমূলক
১ যাও তবে প্রিয়তম সুদূর সেথায়, লভিবে সুযশ কীর্তি গৌরব যেথায়, কিন্তু গো একটি কথা, কহিতেও লাগে ব্যথা, উঠিবে যশের যবে সমুচ্চ সীমায়, তখন স্মরিয়ো নাথ স্মরিয়ো আমায়– সুখ্যাতি অমৃত রবে, উৎফুল্ল হইবে যবে, তখন স্মরিয়ো নাথ স্মরিয়ো আমায়। ২ কত যে মমতা-মাখা, আলিঙ্গন পাবে সখা, পাবে প্রিয় বান্ধবের প্রণয় যতন, এ হতে গভীরতর, কতই উল্লাসকর, কতই আমোদে দিন করিবে যাপন, কিন্তু গো অভাগী আজি এই ভিক্ষা চায়, যখন বান্ধব-সাথ, আমোদে মাতিবে নাথ, তখন অভাগী বলে স্মরিয়ো আমায়। ৩ সুচারু সায়াহ্নে যবে ভ্রমিতে ভ্রমিতে, তোমার সে মনোহরা, সুদীপ্ত সাঁজের তারা, সেখানে সখা গো তুমি পাইবে দেখিতে– মনে কি পড়িবে নাথ, এক দিন আমা সাথ, বনভ্রমি ফিরে যবে আসিতে ভবনে– ওই সেই সন্ধ্যাতারা, দুজনে দেখেছি মোরা, আরো যেন জ্বল জ্বল জ্বলিত গগনে। ৪ নিদাঘের শেষাশেষি, মলিনা গোলাপরাশি, নিরখি বা কত সুখী হইতে অন্তরে, দেখি কি স্মরিবে তায়, সেই অভাগিনী হায় গাঁথিত যতনে তার মালা তোমা তরে! যে-হস্ত গ্রথিত বলে তোমার নয়নে হত তা সৌন্দর্য-মাখা, ক্রমেতে শিখিলে সখা গোলাপে বাসিত ভালো যাহারি কারণে– তখন সে দুঃখিনীকে কোরো নাথ মনে। ৫ বিষণ্ণ হেমন্তে যবে, বৃক্ষের পল্লব সবে শুকায়ে পড়িবে খসে খসে চারি ধারে, তখন স্মরিয়ো নাথ স্মরিয়ো আমারে। নিদারুণ শীত কালে, সুখদ আগুন জ্বেলে, নিশীথে বসিবে যবে অনলের ধারে, তখন স্মরিয়ো নাথ স্মরিয়ো আমারে। সেই সে কল্পনাময়ী সুখের নিশায়, বিমল সংগীত তান, তোমার হৃদয় প্রাণ। নীরবে সুধীরে ধীরে যদি গো জাগায়– আলোড়ি হৃদয়-তল, এক বিন্দু অশ্রুজল, যদি আঁখি হতে পড়ে সে তান শুনিলে, তখন করিয়ো মনে, এক দিন তোমা সনে, যে যে গান গাহিয়াছি হৃদি প্রাণ খুলে, তখন স্মরিয়ো হায় অভাগিনী বলে।Thomas Moore, Moore’s Irish Melodies (অনুবাদ কবিতা)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jao-tobe-priyotomo-sudur-sethai/
4434
শামসুর রাহমান
উপেক্ষার পর্দার আড়ালে
চিন্তামূলক
জমে নি আমার পুণ্য এক রত্তি ভেবে নিয়ে পাড়াপড়শিরা জনান্তিকে আমাকে হাবিয়া দোজখের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেন দশবার। আল্লা-অলা একজন আমাকে গাফেল আখ্যা দিয়ে মনে-মনে এশার নামায শেষে কিছু নসিহতের আহত সাগ্রহে ছিটিয়ে দেন আমার ওপর।একজন বাউল ঘুঙুর পায়ে দোতারা বাজিয়ে আমাকে মনের মানুষের নিগূঢ় সন্ধান দিতে গান গেয়ে রহেস্যের টানেন। নিয়মিত নিশীথে জিকির-করা মারফতী একজন জপেন আমার কানে কানে, ‘আখেরাতে তোমার কী হাল হবে বেখবর তুমি মুর্শিদ খোঁজো না’!একজন প্রচণ্ড পণ্ডিত খুব আড়চোখে পর্বত প্রমাণ আমার অজ্ঞতা দেখে অট্রহাসি হয়ে যান আমার কতিপয় মেরুদণ্ডহীন লোক, ‘দেখি তোর শিরদাঁড়া কই’ বলে এক ঝটকায় বিকেল বেলায় আমার চায়ের পেয়ালাটা কেড়ে নেয়, তরল পানীয় আর নিষ্ঠীবন একাকার। আমি সব কিছু উপেক্ষার পর্দার আড়ালে রেখে দেখি হাঁটি হাঁটি পা পা আমার নাতনী আমারই উদ্দেশে ছুতে আসে। কবিতার খাতা আপাতত দূরে সরিয়ে ক্ষণিক শিশুঘ্রাণ বুকে নিয়ে পেয়ারা গাছের নিচে পড়ন্ত বেলায় পুণ্যস্নান করি।   (আকাশ আসবে নেমে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/upekkhar-pordar-arale/
4974
শামসুর রাহমান
ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯
স্বদেশমূলক
এখানে এসেছি কেন? এখানে কী কাজ আমাদের? এখানেতো বোনাস ভাউচারের খেলা নেই কিংবা নেই মায়া কোনো গোল টেবিলের, শাসনতন্ত্রের ভেল্‌কিবাজি, নেই, নেই সার্কাসের নিরীহ অসুস্থ বাঘ, কসর দেখানো তরুণীর শরীরের ঝলকানি নেই কিংবা ফানুস ওড়ানো তা-ও নেই, তবু কেন এখানে জমাই ভিড় আমরা সবাই?আমি দুর পলাশতলীর হাড্ডিসার ক্লান্ত এক ফতুর কৃষক আমি মেঘনার মাঝি, ঝড়-বাদলের আমি চটকলের শ্রমিক, আমি মৃত রমাকান্ত-কামারের নয়ন পুত্তলি, আমি মাটিলেপা উঠোনের উদাস কুমোর, প্রায় ক্ষ্যাপা, গ্রাম উজাড়ের সাক্ষী, আমি তাঁতী সঙ্গীহীন, কখনো পড়িনি ফার্সি, বুনেছি কাপড় মোটা-মিহি সিনেমার রঙিন টিকিট মধ্যযুগী বিবর্ণ পটের মতো ধু-ধু, নিত্য সহচর, মিশিয়ে মৈত্রীর ধ্যান তাঁতে, আমিরাজস্ব দফতরের করুণ কেরানি, মাছি-মারা তাড়া-খাওয়া, আমি ছাত্র, উজ্জ্বল তরুণ, আমি নব্য কালের লেখক, আমার হৃদয়ে চর্যাপদের হরিণী নিত্য করে আসা-যাওয়া, আমার মননে রাবীন্দ্রিক ধ্যান জাগে নতুন বিন্যাসে এবং মেলাই তাকে বাস্তবের তুমুল রোদ্দুরে আর চৈতন্যের নীলে কত স্বপ্ন-হাঁস ভাসে নাক্ষত্রিক স্পন্দনে সর্বদা।আমরা সবাই এখানে এসেছি কেন? এখানে কী কাজ আমাদের? কোন্‌ সে জোয়ার করেছে নিক্ষেপ আমাদের এখন এখানে এই ফাল্গুনের রোদে? বুঝি জীবনেরই ডাকে বাহিরকে আমরা করেছি ঘর, ঘরকে বাহির।জীবন মানেই মাথলা মাথায় মাঠে ঝঁ ঝাঁ রোদে লাঙল চালানো,জীবন মানেই ফসলের গুচ্ছ বুকে নিবিড় জড়ানো,জীবন মানেই মেঘনার ঢেউয়ে দাঁড় বাওয়া পাল খাটানো হাওয়ায়,জীবন মানেই পৌষের শীতার্ত রাতে আগুন পোহানো নিরিবিলি।জীবন মানেই মুখ থেকে কারখানার কালি মুছে বাড়ী ফেরা একা শিস দিয়ে,জীবন মানেই টেপির মায়ের জন্যে হাট থেকে ডুরে শাড়ি কেনা,জীবন মানেই বইয়ের পাতায় মগ্ন হওয়া, সহপাঠিনীর চুলেজীবন মানেই তালে তালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলা, নিশান ওড়ানো,জীবন মানেই অন্যায়ের প্রতিবাদে শূন্যে মুঠি তোলা, অন্তরঙ্গ আলো তরঙ্গের খেলা দেখা,জীবন মানেই মায়ের প্রসন্ন কোলে মাথা রেখে শৈশবের নানা কথা ভাবা,জীবন মানেই খুকির নতুন ফ্রকে নক্সা তোলা, চারু লেস্‌ বোনা,জীবন মানেই ভায়ের মুখের হাসি, বোনের নিপুণ চুল আঁচড়ানো,জীবন মানেই প্রিয়ার খোঁপায় ফুল গোঁজা;জীবন মানেই হাসপাতালের বেডে শুয়ে একা আরোগ্য ভাবনা,জীবন মানেই গলির মোড়ের কলে মুখ দিয়ে চুমুকে চুমুকে জলপান,জীবন মানেই রেশনের দোকানের লাইনে দাঁড়ানো,জীবন মানেই স্ফুলিঙ্গের মতো সব ইস্তাহার বিলি করা আনাচে কানাচেজীবন মানেই ... ... ... ... আবার ফুটেছে দেখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে কেমন নিবিড় হ’য়ে। কখনো মিছিলে কখনো-বা একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয় – ফুল নয়, ওরা শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর। একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রঙ। এ-রঙের বিপরীত আছে অন্য রঙ, যে-রঙ লাগে না ভালো চোখে, যে-রঙ সন্ত্রাস আনে প্রাত্যহিকতায় আমাদের মনে-সকাল সন্ধ্যায়- এখন সে রঙে ছেয়ে গেছে পথ-ঘাট, সারা দেশ ঘাতকের অশুভ আস্তানা।আমি আর আমার মতোই বহু লোক রাত্রি-দিন ভূলুন্ঠিত ঘাতকের আস্তানায়, কেউ মরা, আধমরা কেউ, কেউ বা ভীষণ জেদী, দারুণ বিপ্লবে ফেটে পড়া। চতুর্দিকে মানবিক বাগান, কমলবন হচ্ছে তছনছ। বুঝি তাই উনিশশো ঊনসত্তরেও আবার সালাম নামে রাজপথে, শূন্যে তোলে ফ্ল্যাগ, বরকত বুক পাতে ঘাতকের থাবার সম্মুখে। সালামের চোখ আজ আলোকিত ঢাকা, সালামের মুখ আজ তরুণ শ্যামল পূর্ব বাংলা। দেখলাম রাজপথে, দেখলাম আমরা সবাই জনসাধারণ দেখলাম সালামের হাত থেকে নক্ষত্রের মতো ঝরে অবিরত অবিনাশী বর্ণমালা আর বরকত বলে গাঢ় উচ্চারণে এখনো বীরের রক্তে দুঃখিনী মাতার অশ্রুজলে ফোটে ফুল বাস্তবের বিশাল চত্বরে হৃদয়ের হরি উপত্যকায়। সেই ফুল আমাদেরই প্রাণ, শিহরিত ক্ষণে ক্ষণে আনন্দের রৌদ্রে আর দুঃখের ছায়ায়।
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/february-1969/
2962
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খবর পেলেম কল্য
ছড়া
খবর পেলেম কল্য, তাঞ্জামেতে চ’ড়ে রাজা গাঞ্জামেতে চলল। সময়টা তার জলদি কাটে; পৌঁছল যেই হলদিঘাটে একটা ঘোড়া রইল বাকি, তিনটে ঘোড়া মরল। গরানহাটায় পৌঁছে সেটা মুটের ঘাড়ে চড়ল।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/khobor-pelem-kolyo/
2201
মহাদেব সাহা
পৃথিবী আমার খুব প্রিয়
স্বদেশমূলক
ঢাকা আমার খুব প্রিয়, কিন্ত আমি থাকি আজিমপুর নামক একটি গ্রামে; খুবই ছোটোখাটো একটি গ্রাম, বলা চলে শান্ত-স্নিগ্ধ ছোট্ট একটি পাড়া এখানেই এই কবরের পাশে আমি আছি; বস্তুত এখান থেকে ঢাকা বহুদুরে, আমি সেই ঢকা শহরের কিছুই জানি না আমাকে সবাই জানে আমি ঢাকার মানুষ, কিন্তু আমি বাস করি খুবই ছোট্ট নিরিবিলি গ্রামে আমি এই ঢাকার খুব সামান্যই চিনি, সামান্যই জানি। এখনো আমার কাছে ঢাকার দূরত্ব ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে, এখনো ঢাকায় যেতে বাসে চেপে, ট্রেন ধরে, ফেরি পার হতে হয় রোজ, এমনকি তারপরও ঢাকা গিয়ে পৌঁছতে পারি না; ঢাকার মানুষ তবু বিশটি বছর এই একখানি গ্রামেই রয়েছি, খুব চুপচাপ, নিরিবিলি, একখানি অভিভূত গ্রাম। ঢাকা আমার খুব প্রিয় শহর, কিন্তু আমি পছন্দ করি গ্রাম আজিমপুরের এই খোলা মাঠ, এই সরু গলি, ঢাকার মানুষ তবু আজিমপুরের এই ছোট্ট গ্রামেই থাকতে ভালোবাসি পৃথিবী আমার খুব প্রিয়, কিন্তু আমি বাংলাদেশ ছেড়ে কোথাও যাবো না।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1443
99
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ
মাগো, ওরা বলে
স্বদেশমূলক
‘কুমড়ো ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা, সজনে ডাঁটায় ভরে গেছে গাছটা, আর, আমি ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি— খোকা তুই কবে আসবি! কবে ছুটি?’চিঠিটা তার পকেটে ছিল, ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।‘মাগো, ওরা বলে, সবার কথা কেড়ে নেবে তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না। বলো, মা, তাই কি হয়? তাইতো আমার দেরী হচ্ছে। তোমার জন্য কথার ঝুড়ি নিয়ে তবেই না বাড়ী ফিরবো। লক্ষ্মী মা রাগ ক’রো না, মাত্রতো আর কটা দিন।’‘পাগল ছেলে’ , মা পড়ে আর হাসে, ‘তোর ওপরে রাগ করতে পারি!’নারকেলের চিঁড়ে কোটে, উড়কি ধানের মুড়কি ভাজে এটা সেটা আরো কত কি! তার খোকা যে বাড়ী ফিরবে! ক্লান্ত খোকা!কুমড়ো ফুল শুকিয়ে গেছে, ঝ’রে প’ড়েছে ডাঁটা; পুঁইলতাটা নেতানো,— ‘খোকা এলি?’ঝাপসা চোখে মা তাকায় উঠোনে, উঠোনে যেখানে খোকার শব শকুনিরা ব্যবচ্ছেদ করে।এখন, মা’র চোখে চৈত্রের রোদ পুড়িয়ে দেয় শকুনিদের। তারপর, দাওয়ায় ব’সে মা আবার ধান ভানে, বিন্নি ধানের খই ভাজে, খোকা তার কখন আসে! কখন আসে!এখন, মা’র চোখে শিশির ভোর, স্নেহের রোদে ভিটে ভরেছে।
https://banglapoems.wordpress.com/2015/11/11/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%97%e0%a7%8b-%e0%a6%93%e0%a6%b0%e0%a6%be-%e0%a6%ac%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a7%81-%e0%a6%9c%e0%a6%be%e0%a6%ab%e0%a6%b0-%e0%a6%93%e0%a6%ac%e0%a6%be/
5903
সুবোধ সরকার
রূপম
মানবতাবাদী
রূপমকে একটা চাকরি দিন—এম. এ পাস, বাবা নেই আছে প্রেমিকা সে আর দু’-এক মাস দেখবে, তারপর নদীর এপার থেকে নদীর ওপারে গিয়ে বলবে, রূপম আজ চলি তোমাকে মনে থাকবে চিরদিন রূপমকে একটা চাকরি দিন, যে কোন কাজ পিওনের কাজ হলেও চলবে |তমালবাবু ফোন তুললেন, ফোনের অন্য প্রান্তে যারা কথা বলেন তাদের যেহেতু দেখা যায় না, সুতরাং তারা দুর্জ্ঞেয় | তমালবাবু মামাকে বললেন কূপমের একটা চাকরি দরকার মামা বললেন কাকাকে, কাকা বললেন জ্যাঠাকে, জ্যাঠা বললেন বাতাসকে | মানুষ জানলে একরকম, কিন্তু বাতাস জানলে প্রথমেই ছুটে যাবে দক্ষিণে, সে বলবে দক্ষিণের অরণ্যকে অরণ্য বলবে আগুনকে, আগুন গেল আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে আলিমুদ্দিন ছুটল নদীকে বলার জন্য নদী এসে আছড়ে পড়ল উপকূলে, আসমুদ্র হিমাচল বলে উঠল রূপমকে একটা চাকরি দাও, এম. এ. পাশ করে বসে আছে ছেলেটা |কয়েক মাস বাদের ঘটনা, আমি বাড়িফিরছিলাম সন্ধেবেলায় গলির মোড়ে সাত-আটজনের জটলা দেখে থমকে দাঁড়ালাম জল থেকে সদ্য তুলে আনা রূপমের ডেডবডি সারা গায়ে ঘাস, খরকুটো, হাতের মুঠোয় ধরে থাকা একটা এক টাকার কয়েন | পাবলিক বুথ থেকে কাউকে ফোন করতে চেয়েছিল, রূপম? ভারত সরকারের এক টাকা কয়েনের দিকে আমার চোখ |সারা গায়ে সবুজ ঘাস, ঘাস নয়, অক্ষর এম. এ. পাস করতে একটা ছেলেকে যত অক্ষর পড়তে হয় সেই সমস্ত ব্যর্থ অক্ষর ওর গায়ে লেগে আছে |একটা ছেলেকে কেন আপনারা এম. এ. পড়ান, কোন আহ্লাদে আটখানা বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছেন? তুলে দিন এই কথাগুলো বলব বলে ফোন তুললাম পবিত্র সরকারের ফোন বেজে উঠল, ফোন বেজে চলল, ফোন বেজেই চলল ২০ বছর ধরে ওই ফোন বেজে চলেছে, আরো কুড়ি বছর বাজবে |বাতাস বলছে অরণ্যকে, অরণ্য চলেছে নদীর দিকে নদী উপকূল থেকে আছড়ে পড়ে বলল : রূপমকে একটা চাকরি দিন | কে রূপম? রূপম আচার্য, বয়স ২৬, এম. এ. পাস বাঁ দিকের গালে একটা কাটা দাগ আছে |
https://banglapoems.wordpress.com/2013/10/04/%e0%a6%b0%e0%a7%82%e0%a6%aa%e0%a6%ae-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a7%8b%e0%a6%a7-%e0%a6%b8%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0/
2558
রফিক আজাদ
নগর ধ্বংসের আগে
চিন্তামূলক
নগর বিধ্বস্ত হ’লে, ভেঙ্গে গেলে শেষতম ঘড়ি উলঙ্গ ও মৃতদের সুখে শুধু ঈর্ষা করা চলে। ‘জাহাজ, জাহাজ’ – ব’লে আর্তনাদ সকলেই করি - তবুও জাহাজ কোনো ভাসবে না এই পচা জলে। সমুদ্র অনেক দূর, নগরের ধারে-কাছে নেই : চারপাশে অগভীর অস্বচ্ছ মলিন জলরাশি। রক্ত-পুঁজে মাখামাখি আমাদের ভালবাসাবাসি; এখন পাবো না আর সুস্থতার আকাঙ্খার খেই। যেখানে রয়েছো স্থির – মূল্যবান আসবাব, বাড়ি; কিছুতে প্রশান্তি তুমি এ-জীবনে কখনো পাবে না। শব্দহীন চ’লে যাবে জীবনের দরকারী গাড়ি - কেননা, ধ্বংসের আগে সাইরেন কেউ বাজাবে না। প্রোথিত বৃক্ষের মতো বদ্ধমূল আমার প্রতিভা - সাধ ছিল বেঁচে থেকে দেখে যাবো জিরাফের গ্রীবা।
https://banglarkobita.com/poem/famous/364
3184
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমার সোনার থালায় সাজাব আজ
ভক্তিমূলক
তোমার সোনার থালায় সাজাব আজ দুখের অশ্রুধার। জননী গো, গাঁথব তোমার গলার মুক্তাহার। চন্দ্র সূর্য পায়ের কাছে মালা হয়ে জড়িয়ে আছে, তোমার বুকে শোভা পাবে আমার দুখের অলংকার।ধন ধান্য তোমারি ধন, দিতে চাও তো দিয়ো আমায়, নিতে চাও তো লও। দুঃখ আমার ঘরের জিনিস, খাঁটি রতন তুই তো চিনিস– তোর প্রসাদ দিয়ে তারে কিনিস, এ মোর অহংকার।১৩১৫ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tomar-sonar-thalay-sajabo-aj/
254
কাজী নজরুল ইসলাম
উৎসর্গ (অগ্নিবীণা)
স্তোত্রমূলক
ভাঙা বাংলার রাঙা যুগের আদি পুরোহিত, সাগ্নিক বীর শ্রীবারীন্দ্রকুমার ঘোষ শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু অগ্নি-ঋষি! অগ্নি-বীণা তোমায় শুধু সাজে। তাই তো তোমার বহ্নি-রাগেও বেদন-বেহাগ বাজে॥ দহন-বনের গহন-চারী– হায় ঋষি– কোন্ বংশীধারী নিঙ্‌ড়ে আগুন আন্‌লে বারি অগ্নি-মরুর মাঝে। সর্বনাশা কোন্ বাঁশি সে বুঝ্‌তে পারি না যে॥ দুর্বাসা হে! রুদ্র তড়িৎ হান্‌ছিলে বৈশাখে, হঠাৎ সে কার শুন্‌লে বেণু কদম্বের ঐ শাখে। বজ্রে তোমার বাজ্‌ল বাঁশি, বহ্নি হলো কান্না হাসি. সুরের ব্যথায় প্রাণ উদাসী– মন সরে না কাজে। তোমার নয়ন-ঝুরা অগ্নি-সুরেও রক্ত-শিখা বাজে॥কাব্যগ্রন্থঃ-অগ্নিবীণা
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/ognibina/
3924
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সভাতলে ভুঁয়ে কাৎ হয়ে শুয়ে
হাস্যরসাত্মক
সভাতলে ভুঁয়ে কাৎ হয়ে শুয়ে নাক ডাকাইছে সুল্‌তান, পাকা দাড়ি নেড়ে গলা দিয়ে ছেড়ে মন্ত্রী গাহিছে মূলতান। এত উৎসাহ দেখি গায়কের জেদ হল মনে সেনানায়কের– কোমরেতে এক ওড়না জড়িয়ে নেচে করে সভা গুলতান। ফেলে সব কাজ বরকন্দাজ বাঁশিতে লাগায় ভুল তান।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/sovatole-vuye-kat-hoye-suye/
4200
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
আমি একা, বড়ো একা
প্রেমমূলক
চন্দনের ধূপ আমি কবে পুড়িয়েছি মনে নেই। মন আর স্মৃতিগুলি ধরে না আদরে। সংশ্লিষ্ট চন্দন এই অবহেলা সহ্য করে গেছে। কখনো বলেনি কিছু, বলেনি বলেই পরিত্রাণ পেয়েছে সহজে, নয়তো অসহ্য কুঠারে ধ্বংস হতো।আমার সংহারমূর্তি দেখেছে চন্দন একদিন কিশোর বয়সে, সেই অভিপ্রেত সুকালে, সময়ে। দেখেছে এবং একা-একা ভয়ে-রহস্যে কেঁপেছে– বলেছে, আমার দুটি সুগন্ধি কৌটায় হাত রাখো, পায়ের নখর থেকে জ্বালিও না শিখর অবধি আমি একা, বড়ো একা, চন্দনের গন্ধে উতরোল।।
https://www.bangla-kobita.com/shaktichattopadhyay/ami-eka-boro-eka/
1446
নবারুণ ভট্টাচার্য
একটা
মানবতাবাদী
একটা কথায় ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়বে কবে সারা শহর উথাল পাথাল, ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে কাটবে চিবুক                     চিড় খাবে বুক লাগাম কেড়ে ছুটবে নাটক শুকনো কুয়োয়                 ঝাঁপ দেবে সুখ জেলখানাতে স্বপ্ন আটক একটা ব্যথা বর্শা হয়ে মৌচাকেতে বিঁধবে কবে ছিঁড়বে মুখোশ         আগ্নেয় রোষ জুলবে আগুন           পুতুল নাচে ভাঙবে গরাদ              তীব্র সাহস অনেক ছবি             টুকরো কাচে একটা কুঁড়ি বারুদগন্ধে মাতাল করে ফুটবে কবে সারা শহর উথাল পাথাল ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে। (adsbygoogle=window.adsbygoogle||[]).push({});
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a6%be-%e0%a6%ab%e0%a7%81%e0%a6%b2%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%a8%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a3/
5540
সুকান্ত ভট্টাচার্য
সহসা
চিন্তামূলক
আমার গোপন সূর্য হল অস্তগামী এপারে মর্মরধ্বনি শুনি, নিস্পন্দ শবের রাজ্য হতে ক্লান্ত চোখে তাকাল শকুনি।গোদূলি আকাশ ব’লে দিল তোমার মরণ অতি কাছে, তোমার বিশাল পৃথিবীতে এখনো বসন্ত বেঁচে আছে।অদূরে নিবিড় ঝাউবনে যে কালো ঘিরেছে নীরবতা, চোখ তারই দীর্ঘায়িত পথে অস্পষ্ট ভাষায় কয় কথা।আমার দিনান্ত নামে ধীরে আমি তো সুদূর পরাহত, অশত্থশাখায় কালো পাখি দুশ্চিন্তা ছড়ায় অবিরত।সন্ধ্যাবেলা, আজ সন্ধ্যাবেলা নিষ্ঠুর তমিস্রা ঘনাল কী! মরণ পশ্চাতে বুঝি ছিল সহসা উদার চোখাচোখি।।   (পূর্বাভাস কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/sohosa/
1649
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
বার্মিংহামের বুড়ো
চিন্তামূলক
“ফুলেও সুগন্ধ নেই। অন্ততঃ আমার যৌবনবয়সে ছিল যতখানি, আজ তার অর্ধেক পাই না। এখন আকাশ পাংশু, পায়ের তলায় ঘাস অর্ধেক সবুজ, নদী নীল নয়। তা ছাড়া দেখুন, স্ট্রবেরি বিস্বাদ, মাংস রবারের মতো শক্ত। ভীষণ সেয়ানা গোরুগুলি। বালতি ভরে দুধ দেয় বটে, কিন্তু খুব জোলো দুধ। নির্বোধ পশুও দুগ্ধের ঘনতা আজ চুরি করে কী অবলীলায়। এদিকে মদ্যও প্রায় জলবৎ। আগে দু-তিনটে বিয়ার টেনে অক্লেশে মাতাল হওয়া যেত। ইদানিং কম করেও পাঁচ বোতল লাগে।” বার্মিংহামের সেই বুড়োটার লাগে। যে সেদিন ফুল নদী ঘাস মেঘ আকাশ স্ট্রবেরি মাংস দুধ ইত্যাদির বিরুদ্ধে ভীষণ অভিযোগ তুলেছিল। যার বিধ্বস্ত মুখের ভাঁজে তিলমাত্র করুণা ছিল না, উদরে সক্রিয় ছিল পাঁচ বোতল ঘোলাটে বিয়ার।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1665
4683
শামসুর রাহমান
গুন খুন
মানবতাবাদী
এখনো আমার নামে কোনো গেরেপ্‌তারী পরোয়ানা নেই, আমি অপরাধী তার কোনো সাক্ষী-সাবুদ কোথাও কখনো পাবে না খুঁজে কেউ। তবু কেন হাতকড়া, কয়েদখানার কালো শিক চোখে ভেসে ওঠে বারবার। চারপাশে শুনি কত চোখে ভেসে ওঠে বারবার। চারপাশে শুনি কত গুঞ্জরণ, মনে হয় যেন সবাই আমাকে নিয়ে নানা কথা বলাবলি করে আমার আড়ালে-আবডালে। তাহলে কি হাড়কাঠে গলা দিয়ে বসে আছি? নইলে কেন আজ খামকা নিজের ছায়া দেখে ভয় পাই? কথা বলি ঘুমের ভেতরে? সেদিন রাস্তার ধারে একটি কাফেতে নিরিবিলি কফি খেতে লাগছিল ভালো; অকস্মাৎ খালি সিটগুলো ফিটফাট যুবকেরা নিমিষে দখল ক’রে নিয়ে মেতে ওঠে গালগল্পে। কান পেতে থাকি,- একটি যুবক সিগারেট নিখুঁত ধরিয়ে, ধোঁয়া ছেড়ে আড়চোখে তাকায় আমার দিকে। তার নজর সরিয়ে কাঠের টেবিলে ঠোকে তাল; একজন সুরূপা তরুণী ঠোঁট থেকে ঠোঁটান্তরে ভাসমান মর্গে-শুয়ে থাকা কোনো তন্বীর মতন। তরুণীর একা-একা পথ হাঁটা, বই পড়ার ধরন আর দেহের গড়ন, চুলের কী রঙ দৈর্ঘ্য কীরকম, কণ্ঠস্বর সুরেলা বাঁশির প্রতিধ্বনি কিনা, ওর দুটি চোখে হরিণীর চোখের আদল আছে কিনা, মুখের লাবণ্য আর স্বভাবের নম্রতা অথবা বন্যতার চর্চা হলো বেশ কিছুক্ষণ।সে নাকি হঠাৎ নিরুদ্দেশ কিছুকাল থেকে, না যায়নি সে বিদেশে; এই শহরেই আছে, যদিও সম্প্রতি কাউকে কিছু না বলে দিয়েছে গা ঢাকা। সকলেই জানে তার খেয়ালীপনার পরিচয় কম-বেশি, যুবকেরা বলাবলি করে তাকিয়ে আমার দিকে।যুবাদের বাক্যালাপ শুনে আমার হৃৎপিণ্ড শুধু খাঁচার পাখির মতো ডানা ঝাপটায় ঘন ঘন। কী করে সবাই ওরা চেনে তাকে, যাকে উন্মত্ততাবশে খুন ক’রে দিয়েছি কবর আমার খাটের নিচে। কখনো কখনো মধ্যরাতে সে হেঁটে বেড়ায় স্বপ্নচারিতায় ঝুল বারান্দায়, ছাদের কার্নিশে।   (না বাস্তব না দুঃস্বপ্ন কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/gun-khun/
4724
শামসুর রাহমান
জয়ঢাক বাজাতে আগ্রহী আজও
মানবতাবাদী
ফাঁদ তো পাতাই থাকে নানাদিকে, পা হড়কে আটকে পড়াটা অসম্ভব কিছু নয়। চৌদিকে ইঁদুর-দৌড় খুব জমেছে দেখতে পাচ্ছি, কে কাকে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে আচানক নিজের জবর গলা সম্মুখে এগিয়ে দিয়ে বাজি জিতে নেয়া, হৈ-হুল্লোড়ে মেতে ওঠা কেল্লা ফতে বটে।কথাগুলো কোথায় কখন ঠিক কে যে শুনিয়েছিলেন, মনে পড়ছে না। উচ্চারিত কথামালা কোন্‌ সন্ধ্যাবেলা দুলেছিল, খুঁটিনাটি সবই বিস্মৃতির ডোবায় পচছে। আজকাল মগজ বেবাক ফাঁকা, উপরন্তু অসংখ্য কাকের হাঁকডাকে একান্ত নিভৃতচারী কোকিলের গান ডুবে যায়। কে যে কোন্‌দিন মুখে চৌকশ মুখোশ এঁটে নিয়ে দাঁড়াবে সম্মুখে এসে নিশ্চয়তা নেই, সেই মূর্তি দৃষ্টি পথে পড়লেই নির্ঘাৎ ভড়কে উঠে মূর্চ্ছা যাব আর প্রেতদের হাসি আঁধারকে অধিক আঁধার করে তুলবে চৌদিক, দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে ওরা আর মনুষ্যত্ব সম্ভবত দু’হাতে ঢাকবে মুখ অসহায় বালকের মতো।রাত সাড়ে তিনটায় বুড়িগঙ্গা নদীটির নিদ্রিত যৌবন অকস্মাৎ জেগে উঠে তীর ছাপিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পথে, বেপরোয়া আবেগে রাস্তার পর রাস্তা বেয়ে ঠিক প্রবল চুম্বন করে লালবাগের কেল্লাকে আর ছুটে গিয়ে একুশের শহীদ মিনারে মাথা ঘষে, আসমান নেমে এসে খুব নিচে মিনারকে করে আলিঙ্গন।অপরূপ এই দৃশ্য কেউ দেখল কি দেখল না, এই সত্য জানলো কি জানালো না-বুড়িগঙ্গা, কেল্লা অথবা শহীদ মিনারের কাছে শাদা কাগজের মতো অবিকল। আলোকিত এই দিন নয়তো নির্বাক; কল্যাণ, প্রগতি আর চিরসুন্দরের জয়ঢাক সবদিকে বাজাতে আগ্রহী আজও পঁচিশে বৈশাখ।   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/joydhak-bajate-agrohi-ajo/
3992
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্থির জেনেছিলাম পেয়েছি তোমাকে
প্রেমমূলক
স্থির জেনেছিলেম, পেয়েছি তোমাকে, মনেও হয়নি তোমার দানের মূল্য যাচাই করার কথা। তুমিও মূল্য করনি দাবি। দিনের পর দিন গেল, রাতের পর রাত, দিলে ডালি উজাড় ক'রে। আড়চোখে চেয়ে আনমনে নিলেম তা ভাণ্ডারে; পরদিনে মনে রইল না। নববসন্তের মাধবী যোগ দিয়েছিল তোমার দানের সঙ্গে, শরতের পূর্ণিমা দিয়েছিল তারে স্পর্শ। তোমার কালো চুলের বন্যায় আমার দুই পা ঢেকে দিয়ে বলেছিলে "তোমাকে যা দিই তোমার রাজকর তার চেয়ে অনেক বেশি; আরো দেওয়া হল না আরো যে আমার নেই।" বলতে বলতে তোমার চোখ এল ছলছলিয়ে। আজ তুমি গেছ চলে, দিনের পর দিন আসে, রাতের পর রাত, তুমি আস না। এতদিন পরে ভাণ্ডার খুলে দেখছি তোমার রত্নমালা, নিয়েছি তুলে বুকে। যে গর্ব আমার ছিল উদাসীন সে নুয়ে পড়েছে সেই মাটিতে যেখানে তোমার দুটি পায়ের চিহ্ন আছে আঁকা। তোমার প্রেমের দাম দেওয়া হল বেদনায়, হারিয়ে তাই পেলেম তোমায় পূর্ণ ক'রে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/ther-janaselam-payase-tumaka/
1697
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
সাংকেতিক তারবার্তা
চিন্তামূলক
সারাদিন আলোর তরঙ্গ থেকে ধ্বনি জাগে : দূরে যাও। সারারাত্রি অন্ধকার কানে-কানে মন্ত্র দেয় : দূরে যাও! বাল্যবয়সের বন্ধু, পরবর্তী জীবনে তোমরা কে কোথায় কর্মসূত্রে জড়িয়ে রয়েছ, আমি খবর রাখি না। কেউ কি অনেক দূরে রয়ে গেলে? কৈশোর-দিন্র সঙ্গী, তোমরা কেউ কি দূর-ভুবনের মৃত্তিকায় সংসার পেতেছ, তবু কৈশোর-দিনের কথা ভুলতে পারোনি? কিংবা যারা প্রথম-যৌবনে কাছে এসেছিলে, তারাই কেউ কি অজ্ঞাত বিদেশে আজ অবেলায় পর্বতচূড়ায় উঠে অকস্মাৎ পূর্বাস্য হয়েছ? তোমরা কেউ কি উন্মাদের মতো ঢিল ছুঁড়ে যাচ্ছ স্মৃতির অতলে? আলোর অক্লান্ত ধ্বনি প্রাণে বাজে : দূরে যাও। কেন বাজে? অন্ধকার কানে-কানে মন্ত্র দেয় : দূরে যাও। কেন দেয়? অন্য জীবনের মধ্যে ডুব দিয়ে তবুও কেউ কি পরিপূর্ণ ডুবতে পারোনি? কেউ কি নিঃসঙ্গ দূর দ্বীপ থেকে উদ্ধার চাইছ? বুঝতে পারি, স্মরণ করছ কেউ রাত্রিদিন। বুঝতে পারি, নিরুপায় সংকেত পাঠাচ্ছ কেউ আলোর তরঙ্গে, অন্ধকারে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1648
3192
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দরিদ্রা
সনেট
দরিদ্রা বলিয়া তোরে বেশি ভালোবাসি হে ধরিত্রী, স্নেহ তোর বেশি ভালো লাগে, বেদনাকাতর মুখে সকরুণ হাসি, দেখে মোর মর্ম-মাঝে বড়ো ব্যথা জাগে। আপনার বক্ষ হতে রস-রক্ত নিয়ে প্রাণটুকু দিয়েছিস সন্তানের দেহে, অহর্নিশি মুখে তার আছিস তাকিয়ে, অমৃত নারিস দিতে প্রাণপণ স্নেহে। কত যুগ হতে তুই বর্ণগন্ধগীতে সৃজন করিতেছিস আনন্দ-আবাস, আজো শেষ নাহি হল দিবসে নিশীথে– স্বর্গ নাই, রচেছিস স্বর্গের আভাস। তাই তোর মুখখানি বিষাদ-কোমল, সকল সৌন্দর্যে তোর ভরা অশ্রুজল।
http://kobita.banglakosh.com/archives/414.html
4500
শামসুর রাহমান
এখন তোমাকে ছাড়া
সনেট
আসে না দু’চোখে ঘুম কিছুতেই কোনো কোনো রাতে তোমাকে প্রবল ভেবে। কত হিজিবিজি, ছায়াবাজী প্রহরে প্রহরে দেখি, দেখি অস্থিচর্মসার মাঝি নৌকোর কংকাল নিয়ে বুকে ঝোড়ো জলের আঘাতে ছিন্নভিন্ন কালো চরে। নয় সবুজ পাতার ভিড়ে, ভাঙা কবরের পাশে একটি কোকিল করে বাস, স্মৃতিপোষ্য, আর গানে তার শিহরিত বুনো ঘাস ঘন ঘন, মহাকায় কৃকলাস ঘোরে নদীতীরে।নির্ঘুম রাত্তিরে জ্বলি শূন্য ঘরে অত্যন্ত একাকী, কী বলতে কী বলে ফেলি নিজেকেই। একটি প্রতিমা, সে তোমারই অবয়ব, জেগে ওঠে বাস্তবের সীমা ছিঁড়ে খুঁড়ে, পুনরায় স্বপ্নস্মৃতিময় সে বৈভব সরে যায় দূরে, ভগ্ন কণ্ঠে ডাকি, তোমাকে ডাকি, এখন তোমাকে ছাড়া সুনিশ্চিত বাঁচা অসম্ভব।   (প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/ekhon-tomake-chara/
1155
জীবনানন্দ দাশ
মহাত্মা গান্ধী
ভক্তিমূলক
অনেক রাত্রির শেষে তারপর এই পৃথিবীকে ভালো ব’লে মনে হয়;—সময়ের অমেয় আঁধারে জ্যোতির তারণকণা আসে, গভীর নারীর চেয়ে অধিক গভীরতর ভাবে পৃথিবীর পতিতকে ভালোবাসে, তাই সকলেরই হৃদয়ের ’পরে এসে নগ্ন হাত রাখে; আমরাও আলো পাই—প্রশান্ত অমল অন্ধকার মনে হয় আমাদের সময়ের রাত্রিকেও।একদিন আমাদের মর্মরিত এই পৃথিবীর নক্ষত্র শিশির রোদ ধূলিকণা মানুষের মন অধিক সহজ ছিল—শ্বেতাশ্বতর যম নচিকেতা বুদ্ধদেবের। কেমন সফল এক পর্বতের সানুদেশ থেকে ঈশা এসে কথা ব’লে চ’লে গেল—মনে হল প্রভাতের জল কমনীয় শুশ্রূষার মতো বেগে এসেছে এ পৃথিবীতে মানুষের প্রাণ আশা ক’রে আছে ব’লে—চায় ব’লে,- নিরাময় হ’তে চায় ব’লে।পৃথিবীর সেই সব সত্য অনুসন্ধানের দিনে বিশ্বের কারণশিল্পের অপরূপ আভার মতন আমাদের পৃথিবীর হে আদিম ঊষাপুরুষেরা, তোমারা দাঁড়িয়েছিলে, মনে আছে, মহাত্মার ঢের দিন আগে; কোথাও বিজ্ঞান নেই, বেশি নেই, জ্ঞান আছে তবু; কোথাও দর্শন নেই, বেশি নেই; তবুও নিবিড় অন্তভের্দী দৃষ্টিশক্তি র’য়ে গেছেঃ মানুষকে মানুষের কাছে ভালো স্নিগ্ধ আন্তরিক হিত মানুষের মতো এনে দাঁড় করাবার; তোমাদের সে-রকম প্রেম ছিল,বহ্নি ছিল, সফলতা ছিল। তোমাদের চারপাশে সাম্রাজ্য রাজ্যের কোটি দীন সাধারণ পীড়িত এবং রক্তাক্ত হয়ে টের পেত কোথাও হৃদয়বত্তা নিজে নক্ষত্রের অনুপম পরিসরে হেমন্তের রাত্রির আকাশ ভ’রে ফেলে তারপর আত্মঘাতী মানুষের নিকটে নিজের দয়ার দানের মতো একজন মানবীয় মহানুভবকে পাঠাতেছে,—প্রেম শান্তি আলো এনে দিতে,—মানুষের ভয়াবহ লৌকিক পৃথিবী ভেদ ক’রে অন্তঃশীলা করুণার প্রসারিত হাতের মতন।তারপর ঢের দিন কেটে গেছে;- আজকের পৃথিবীর অবদান আরেক রকম হয়ে গেছে; যেই সব বড়-বড় মানবেরা আগেকার পৃথিবীতে ছিল তাদের অন্তর্দান সবিশেষ সমুজ্জ্বল ছিল, তবু আজ আমাদের পৃথিবী এখন ঢের বহিরাশ্রয়ী। যে সব বৃহৎ আত্মিক কাজ অতীতে হয়েছে- সহিষ্ণুতায় ভেবে সে-সবের যা দাম তা সিয়ে তবু আজ মহাত্মা গান্ধীর মতো আলোকিত মন মুমুক্ষার মাধুরীর চেয়ে এই আশ্রিত আহত পৃথিবীর কল্যাণের ভাবনায় বেশি রত; কেমন কঠিন ব্যাপক কাজের দিনে নিজেকে নিয়োগ ক’রে রাখে আলো অন্ধকারে রক্তে—কেমন শান্ত দৃঢ়তায়।এই অন্ধ বাত্যাহত পৃথিবীকে কোনো দূর স্নিগ্ধ অলৌকিক তনুবাত শিখরের অপরূপ ঈশ্বরের কাছে টেনে নিয়ে নয়—ইহলোক মিথ্যা প্রমাণিত ক’রে পরকাল দীনত্মা বিশ্বাসীদের নিধান স্বর্গের দেশ ব’লে সম্ভাষণ ক’রে নয়- কিন্তু তার শেষ বিদায়ের আগে নিজেকে মহাত্মা জীবনের ঢের পরিসর ভ’রে ক্লান্তিহীন নিয়োজনে চালায়ে নিয়েছে পৃথিবীরই সুধা সূর্য নীড় জল স্বাধীনতা সমবেদনাকে সকলকে—সকলের নিচে যারা সকলকে সকলকে দিতে।আজ এই শতাব্দীতে মহাত্মা গান্ধীর সচ্ছলতা এ-রকম প্রিয় এক প্রতিভাদীপন এনে সকলের প্রাণ শতকের আঁধারের মাঝখানে কোনো স্থিরতর নির্দেশের দিকে রেখে গেছে; রেখে চ’লে গেছে-ব’লে গেছেঃ শান্তি এই, সত্য এই।হয়তো-বা অন্ধকারই সৃষ্টির অন্তিমতম কথা; হয়তো-বা রক্তেরই পিপাসা ঠিক, স্বাভাবিক- মানুষও রক্তাক্ত হতে চায়;- হয়তো-বা বিপ্লবের মানে শুধু পরিচিত অন্ধ সমাজের নিজেকে নবীন ব’লে—অগ্রগামী(অন্ধ) উত্তেজের ব্যাপ্তি ব’লে প্রচারিত করার ভিতর; হয়তো-বা শুভ পৃথিবীর কয়েকটি ভালো ভাবে লালিত জাতির কয়েকটি মানুষের ভালো থাকা—সুখে থাকা—রিরংসারক্তিম হয়ে থাকা; হয়তো-বা বিজ্ঞানের, অগ্রসর, অগ্রস্মৃতির মানে এই শুধু, এই!চারিদিকে অন্ধকার বেড়ে গেছে—মানুষের হৃদয় কঠিনতর হয়ে গেছে; বিজ্ঞান নিজেকে এসে শোকাবহ প্রতারণা ক’রেই ক্ষমতাশালী দেখ; কবেকার সরলতা আজ এই বেশি শীত পৃথিবীতে—শীত; বিশ্বাসের পরম সাগররোল ঢের দূরে স’রে চ’লে গেছে; প্রীতি প্রেম মনের আবহমান বহতার পথে যেই সব অভিজ্ঞতা বস্তুত শান্তির কল্যাণের সত্যিই আনন্দসৃষ্টির সে-সব গভীর জ্ঞান উপেক্ষিত মৃত আজ, মৃত, জ্ঞানপাপ এখন গভীরতর ব’লে; আমরা অজ্ঞান নই—প্রতিদিনই শিখি, জানি, নিঃশেষে প্রচার করি, তবু কেমন দুরপনেয় স্খলনের রক্তাক্তের বিয়োগের পৃথিবী পেয়েছি।তবু এই বিলম্বিত শতাব্দীর মুখে যখন জ্ঞানের চেয়ে জ্ঞানের প্রশ্রয় ঢের বেড়ে গিয়েছিল, যখন পৃথিবী পেয়ে মানুষ তবুও তার পৃথিবীকে হারিয়ে ফেলেছে, আকাশে নক্ষত্র সূর্য নীলিমার সফলতা আছে,- আছে, তবু মানুষের প্রাণে কোনো উজ্জ্বলতা নেই, শক্তি আছে, শান্তি নেই, প্রতিভা রয়েছে, তার ব্যবহার নেই।প্রেম নেই, রক্তাক্ততা অবিরল, তখন তো পৃথিবীতে আবার ঈশার পুনরুদয়ের দিন প্রার্থনা করার মতো বিশ্বাসের গভীরতা কোনো দিকে নেই; তবুও উদয় হয়—ঈশা নয়—ঈশার মতন নয়—আজ এই নতুন দিনের আর-এক জনের মতো; মানুষের প্রাণ থেকে পৃথিবীর মানুষের প্রতি যেই আস্থা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, ফিরে আসে, মহাত্মা গান্ধীকে আস্থা করা যায় ব’লে; হয়তো-বা মানবের সমাজের শেষ পরিণতি গ্লানি নয়; হয়তো-বা মৃত্যু নেই, প্রেম আছে, শান্তি আছে—মানুষের অগ্রসর আছে; একজন স্থবির মানুষ দেখ অগ্রসর হয়ে যায় পথ থেকে পথান্তরে—সময়ের কিনারার থেকে সময়ের দূরতর অন্তঃস্থলে;—সত্য আছে, আলো আছে; তবুও সত্যের আবিষ্কারে। আমরা আজকে এই বড় শতকের মানুষেরা সে-আলোর পরিধির ভিতরে পড়েছি। আমাদের মৃত্যু হয়ে গেলে এই অনিমেষ আলোর বলয় মানবীয় সময়কে হৃদয়ে সফলকাম সত্য হতে ব’লে জেগে র’বে; জয়, আলো সহিষ্ণুতা স্থিরতার জয়।
https://www.bangla-kobita.com/jibanananda/mohatma-gaandhi/
2256
মহাদেব সাহা
লিরিকগুচ্ছ - ১৩
প্রেমমূলক
তোমার চোখে যে এতো জল আর এতো ব্যাকুলতা- সব বুঝি তবু বুঝি নাই এই সামান্য কথা!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1393
1683
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
লালদিঘিতে বৃষ্টি
প্রকৃতিমূলক
স্নানের পাট চুকিয়ে মেঘের শাড়িখানাকে খুলে রেখে আশ্বিনের খটখটে রোদ্দুরে নিজেকে শুকিয়ে নিচ্ছিল আকাশ। হঠাৎ চোখে পড়লে যে, লালদিঘির মধ্যে তার ছবি দুটেছে, আর হাঁ করে সেই বেআব্রু ছবির দিকে তাকিয়ে আছে বেহায়া একদল মানুষ। কী ঘেন্না! কী ঘেন্না! রাগে, অপমানে নিমেষে আবার কালো হয়ে গেল আকাশের মুখ। চড়চড় করে বৃষ্টি নামল তক্ষুনি। আর মাথা বাঁচাবার জন্যে পালাতে-পালাতেই লোকগুলো দেখতে পেল যে, বৃষ্টি ছর্‌রায় জলের স্থির আয়নাখানা ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1543
3171
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর
ভক্তিমূলক
তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর, যবে আমার জনম হবে ভোর। চলে যাব নবজীবন-লোকে, নূতন দেখা জাগবে আমার চোখে, নবীন হয়ে নূতন সে আলোকে পরব তব নবমিলন-ডোর। তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর।তোমার অন্ত নাই গো অন্ত নাই, বারে বারে নূতন লীলা তাই। আবার তুমি জানি নে কোন্‌ বেশে পথের মাঝে দাঁড়াবে, নাথ, হেসে, আমার এ হাত ধরবে কাছে এসে, লাগবে প্রাণে নূতন ভাবের ঘোর। তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর।১০ শ্রাবণ, ১৩১৭ (গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/tomay-khoja-shesh-hobe-na-mor/
2057
মহাদেব সাহা
আমার কবিতার জন্যে
প্রকৃতিমূলক
আমি কবিতা লিখবো বলে এই আকাশ পরেছে নক্ষত্রমালা, পরেছে রঙধনু-পাড় শাড়ি, অপরূপ চন্দ্রহার নদীর গহনা পরে আছে গ্রামগুলি, শুধু আমি কবিতা লিখবো তাই এই প্রকৃতি পরেছে পুষ্পশোভা, কানে পরেছে ফুলের দুল, হাতে ঝিনুকের চুড়ি। মন হুহু-করা এমন উদাস বাতাস, এমন স্নিগ্ধ বৃষ্টিধারা এই ঝর্নার মুখর গান, ফুলের সৌরভ কেবল আমার কবিতার মধ্যে, আমি কবিতা লিখবো তাই। আমি কবিতা লিখবো বলে ঘাসে এমন শিশির মুক্তো গাছের পাতায় এই ঘন সবুজ রঙ- রাজহাঁসগুলির এমন আলতা-পরা পা, শাদা বকের পাখার মতে এই নদীর জল ফাল্গুনে এমন অগ্নিবর্ণ পলাশ-শিমুল; আমি কবিতা লিখবো বলে মাছের দুচোখ এমন রহস্যময়, জলের শুভ্রতা এমন হৃদয়গ্রাহী। আমি কবিতা লিখবো তাই শূন্যতার নাম আকাশ জলের বিস্তারের নাম সমুদ্র, গাছপালা, জঙ্গলের নাম অরণ্য জলরেখার ভালো নাম নদী; আমি কবিতা লিখবো বলে এই আকাশ ও প্রকৃতি জুড়ে এতো সাজসজ্জা, এতো আয়োজন, চিরবসন্তোৎসব।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1398
4091
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
উল্টো
প্রেমমূলক
এতো সহজেই ভালোবেসে ফেলি কেন! বুঝি না আমার রক্তে কি আছে নেশা-দেবদারু-চুলে উদাসী বাতাস মেখে স্বপ্নের চোখে অনিদ্রা লিখি আমি, কোন বেদনার বেনোজলে ভাসি সারাটি স্নিগ্ধ রাত?সহজেই আমি ভালোবেসে ফেলি, সহজে ভুলিনা কিছু- না-বলা কথায় তন্ত্রে তনুতে পুড়ি, যেন লাল ঘুড়ি একটু বাতাস পেয়ে উড়াই নিজেকে আকাশের পাশাপাশি।সহজে যদিও ভালোবেসে ফেলি সহজে থাকি না কাছে, পাছে বাঁধা পড়ে যাই। বিস্মিত তুমি যতোবার টানো বন্ধন- সুতো ধ’রে, আমি শুধু যাই দূরে।আমি দূরে যাই- স্বপ্নের চোখে তুমি মেখে নাও ব্যথা- চন্দন চুয়া, সারাটি রাত্রি ভাসো উদাসীন বেদনার বেনোজলে…এতো সহজেই ভালোবেসে ফ্যালো কেন?
https://www.kobitacocktail.com/%e0%a6%89%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a7%8b-%e0%a6%98%e0%a7%81%e0%a7%9c%e0%a6%bf-%e0%a6%b0%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%ae/
5923
সুভাষ মুখোপাধ্যায়
সকলের গান
মানবতাবাদী
কমরেড, আজ নতুন নবযুগ আনবে না? কুয়াশাকঠিন বাসর যে সম্মুখে। লাল উল্কিতে পরস্পরকে চেনা- দলে টানো হতবুদ্ধি ত্রিশঙ্কুকে, কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না? আকাশের চাঁদ দেয় বুঝি হাতছানি? ওসব কেবল বুর্জোয়াদের মায়া- আমরা তো নই প্রজাপতি- সন্ধানী! অন্তত, আজ মাড়াই না তার ছায়া। কুঁজো হয়ে যারা ফুলের মূর্ছা দেখে পৌঁছোয় না কি হাতুড়ি তাদের পিঠে? কিংবা পাঠিয়ো বনে সে-মহাত্মাকে নিশ্চয় নিঃসঙ্গ লাগবে মিঠে! আমাদের থাক মিলিত অগ্রগতি; একাকী চলতে চাই না এরোপ্লেনে; আপাতত চোখ থাক পৃথিবীর প্রতি, শেষে নেওয়া যাবে শেষকার পথ জেনে।।
http://kobita.banglakosh.com/archives/4468.html
3109
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনের আশি বর্ষে প্রবেশিনু যবে
চিন্তামূলক
জীবনের আশি বর্ষে প্রবেশিনু যবে এ বিস্ময় মনে আজ জাগে-- লক্ষকোটি নক্ষত্রের অগ্নিনির্ঝরের যেথা নিঃশব্দ জ্যোতির বন্যাধারা ছুটেছে অচিন্ত্য বেগে নিরুদ্দেশ শূন্যতা প্লাবিয়া দিকে দিকে, তমোঘন অন্তহীন সেই আকাশের বক্ষস্তলে অকস্মাৎ করেছি উত্থান অসীম সৃষ্টির যজ্ঞে মুহূর্তের স্ফুলিঙ্গের মতো ধারাবাহী শতাব্দীর ইতিহাসে। এসেছি সে পৃথিবীতে যেথা কল্প কল্প ধরি প্রাণপঙ্ক সমুদ্রের গর্ভ হতে উঠি জড়ের বিরাট অঙ্কতলে উদ্‌ঘাটিল আপনার নিগূঢ় আশ্চর্য পরিচয় শাখায়িত রূপে রূপান্তরে। অসম্পূর্ণ অস্তিত্বের মোহাবিষ্ট প্রদোষের ছায়া আচ্ছন্ন করিয়া ছিল পশুলোক দীর্ঘ যুগ ধরি; কাহার একাগ্র প্রতীক্ষায় অসংখ্য দিবসরাত্রি-অবসানে মন্থরগমনে এল মানুষ প্রাণের রঙ্গভূমে; নূতন নূতন দীপ একে একে উঠিতেছে জ্বলে, নূতন নূতন অর্থ লভিতেছে বাণী; অপূর্ব আলোকে মানুষ দেখিছে তার অপরূপ ভবিষ্যের রূপ, পৃথিবীর নাট্যমঞ্চে অঙ্কে অঙ্কে চৈতন্যের ধীরে ধীরে প্রকাশের পালা-- আমি সে নাট্যের পাত্রদলে পরিয়াছি সাজ। আমারো আহ্বান ছিল যবনিকা সরাবার কাজে, এ আমার পরম বিস্ময়। সাবিত্রী পৃথিবী এই, আত্মার এ মর্তনিকেতন, আপনার চতুর্দিকে আকাশে আলোকে সমীরণে ভূমিতলে সমুদ্রে পর্বতে কী গূঢ় সংকল্প বহি করিতেছে সূর্যপ্রদক্ষিণ-- সে রহস্যসূত্রে গাঁথা এসেছিনু আশি বর্ষ আগে, চলে যাব কয় বর্ষ পরে।
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/jebana-ashe-basha-probaseno-jaba/
4549
শামসুর রাহমান
কবিতার আসা না-আসা
চিন্তামূলক
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, বসে আছি পুরানো চেয়ারে নিশ্চুপ, নিঝুম খুব, যদিও অন্তরে আঁধিঝড় বইছে অনেকক্ষণ। মাঝে-মাঝে এদিক ওদিক চেয়ে দেখি, চোখ পড়ে সারি সারি বই, জানলার পর্দায়, সোফায় আর টেলিফোন সেটে। যেন আমি কারো মৃদু পদধ্বনি শোনার আশায় কান পেতে রয়েছি কখন থেকে। এখানে সে পা রাখে কিনা এ সন্ধ্যেবেলা আমার দৃষ্টির গালিচায়, দেখা যাক।সম্ভবত আসবে সে যে-কোনো মুহূর্তে, ঘরে ঢুকে তাকাবে আমার দিকে কিছুক্ষণ, ধরবে জড়িয়ে, পায়েল উঠবে বেজে তার পায়ে, চোখ থেকে তার ঝরবে নানান চিত্রকল্প, চুল দেবে প্রতীকের ঘন ছায়া; কবিতা আসবে এভাবেই অকস্মাৎ আমার সান্নিধ্যে কিংবা ব্যর্থ হবে ব্যাকুল প্রতীক্ষা।  (তোমাকেই ডেকে ডেকে রক্তচক্ষু কোকিল হয়েছি কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/kobitar-asa-na-asa/
3724
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মিলন-সুলগনে
রূপক
মিলন-সুলগনে, কেন বল্‌, নয়ন করে তোর ছল্‌ছল্‌। বিদায়দিনে যবে ফাটে বুক সেদিনও দেখেছি তো হাসিমুখ।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/milon-sulogone/
5424
সুকান্ত ভট্টাচার্য
অনন্যোপায়
মানবতাবাদী
অনেক গড়ার চেষ্টা ব্যর্থ হল, ব্যর্থ বহু উদ্যম আমার, নদীতে জেলেরা ব্যর্থ, তাঁতী ঘরে, নিঃশব্দ কামার, অর্ধেক প্রাসাদ তৈরী, বন্ধ ছাদ-পেটানোর গান, চাষীর লাঙল ব্যর্থ, মাঠে নেই পরিপূর্ণ ধান। যতবার গড়ে তুলি, ততবার চকিত বন্যায়। উদ্যত সৃষ্টিকে ভাঙে পৃথিবীতে অবাধ অন্যায়। বার বার ব্যর্থ, তাই আজ মনে এসেছে বিদ্রোহ, নির্বিঘ্নে গড়ার স্বপ্ন ভেঙে গেছে; ছিন্নভিন্ন মোহ। আজকে ভাঙার স্বপ্ন- অন্যায়ের দম্ভকে ভাঙার, বিপদ ধ্বংসেই মুক্তি, অন্য পথ দেখি নাকো আর। তাইতো তন্দ্রাকে ভাঙি, ভাঙি জীর্ণ সংস্কারের খিল, রুদ্ধ বন্দীকক্ষ ভেঙে মেলে দিই আকাশের নীল। নির্বিঘ্নে সৃষ্টিকে চাও? তবে ভাঙো বিঘ্নের বেদীকে, উদ্দাম ভাঙার অস্ত্র ছুঁড়ে দাও চারিদিকে।।(কাব্যগ্রন্থঃ ঘুমনেই)
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/ononyopay/
2050
মহাদেব সাহা
আজীবন একই চিঠি
ভক্তিমূলক
নখরে জ্বালিয়ে রাখি লক্ষ্যের দীপ্র ধনুক যেন এক শব্দের নিষাদ এই নির্মল নিসর্গে বসে কাঁদি, তবু সেই নির্মম শব্দাবলী ছিঁড়ে আনতে পারি না বলে সুতীক্ষ্ণ অনুযোগ হতে অব্যাহতি দিন; এই শোকের শহরে আমি যার কাছে চাই ফুল, কিছু মনোরম শোভা, যেসবের বিসতৃত বর্ণনা আমি আপনাকে লিখতে পারি, সে আমার হাতে শুধু তুলে দেয় দুঃখের বিভিন্ন টিকিট। আমি চাই প্রত্যহ আপনাকে লিখতে চিঠি, আমি চাই প্রতিদিন লিখতে এই রক্তের গভীর ইচ্ছে, মর্তান্তিক অনুভবগুলি আমার সবুজ সুখ, কোমল আনন্দ, নির্জন কান্নার স্বর একাকী হাঁটতে পথে যেসব দুঃখ দিয়ে ভরে নিই যমজ পকেট ঢাকার এইসব রঙিন দোকান হতে কিনতে পারিনে আমি একেকটি সুখের সংসার, কাঠের ঘোড়া, সোনালি চাবুক, তাই কাঁদি শৈশবের শ্যামল নদীর উপাখ্যান ভেবে, যে স্বরে কাঁদি আমি সঙ্গিহীন মধ্যরাতে সরকারী গোরস্থানে কিংবা আমার গোপন ঘরে ফিরে এসে জ্বালাই দিব্যমোম, শোকের গর্তে শুয়ে কাঁদি, কিংবা যখন পার্কের বেঞ্চে বসে ফেরেববাজ আড্ডা দিই, ফালতু ফক্কর মিলে অনেকক্ষণ অযথা হাসি, টিটকিরি দিই, অনগৃল বিদ্রূপের থুথু ছুঁড়ে উল্লসিত হই, তবু কিছুতেই পারিনে আমি এইসব সুখদুঃখে আপনাকে লিখতে চিঠি ; শুনুন জনক, আমি চিরদিন শব্দের কাঙাল। আজীবন তাই আপনাকে লিখি শুধু একই চিঠি, ভালো আছি, ইত্যাকার কুশল সংবাদ অথচ প্রতিদিন ভুগি শিরপীড়া, বুকে কাশি, অবিরাম জ্বর- আমার রুক্ষ চুলে বিলি কাটে দুঃস্বপ্নের হাত, এসব খবর কি দৈনন্দিন লেখা যায়! কী করে লিখবো বলুন, ঘরে একা দুঃসংবাদে কাঁদবে জননী। আজীবন লিখেছি তাই একই চিঠি, সেই মিথ্যে মর্মহীন একই চিঠি! হে জনক, সেই নির্র্মম শব্দ নেই এখানে, যা দিয়ে বাজাতে পারি কান্নার করুণ কণ্ঠ, নক্ষত্রবীথির সুদূর নীলিমা হতে আমি তুলে আনতে পারিনে অমল শব্দের বিভা, অন-রঙ্গ ধ্বনি আত্মার নিঃসঙ্গ স্বর তাই আমি বোঝাতে পারিনে, হে জনক, পূজনীয় জনক আমার, ইচ্ছের একটি চিঠি আজো আমি লিখতে পারিনি।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1463
4977
শামসুর রাহমান
ফ্ল্যাশব্যাক এবং …
চিন্তামূলক
শৈলাবাস, যা স্যানাটরিয়ামও বটে, ভিড়াক্রান্ত। এখন সেখানে প্রজ্ঞা ভীষণ শ্বাসকষ্টে ভুগছে। তপ্ত শলাকা দিয়ে উপড়ে ফেলা হয়েছে বিবেকের চোখ; উপরন্তু ওর হাতে ভারী শেকল, পায়ে বেড়ি। বোধি নির্বাসিত। মিথ্যার বারফট্রাই আর মাস্তানিতে সত্য গা ঢাকা দিয়েছে। আমাদের কোনও কোনও স্বপ্ন বিশ্বাসঘাতকতায় মেতে আমাদের বিদ্রূপ করে যখন তখন। এখানে অনেকে একজনের নাম বলতে গিয়ে দিব্যি অন্যজনের নাম উচ্চারণ করে সগৌরবে। সেজন্যে কারও বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ নেই। অনুশোচনা তো অনেক আগেই বেপাত্তা। পাড়াপড়শিরা শরমের মাথা খেয়ে বরং কোমরে ঘুনসি এঁটে হাসির গিটকিরি ছড়ায় চৌরাস্তায়। ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ঢের হ্যাপা আছে জেনে বড় মেজো সেজো অনেকেই দল বদলের রঙে মাতোয়ারা, অনেক জাঁকালো চণ্ডীমণ্ডপের ফরাসে বসে ফরাসি টানে। কেউ কেউ দেশ অ্যাকোরিয়াম হোক, এই মতো স্বপ্ন দ্যাখে ভয়ে ভয়ে।কয়েকটি কলহংস-শব্দ বাড়িটার পাছদুয়ার দিয়ে ভেতরে আস্তেসুস্থে প্রবেশ করে। কলহংসগুলোর শরীরে রৌদ্র-জ্যোৎস্না, জল-হাওয়ার দাগ, দীর্ঘশ্বাসের ছায়া কম্পমান। শেষ রাতের প্রহরকে চমকে দিয়ে মীরা বাঈ-এর ভজনস্নিগ্ধ হাতের কঙ্কন নগ্ন মেঝেতে গড়ায়। ছাদ, দেয়াল, সিঁড়ি মেঝে ফুঁড়ে রক্তের ফোয়ারা। আলাওলের পুঁথি আর রবীন্দ্র রচনাবলী রক্তবমনে অচেতন। আলাওলের পদ্মাবতী রক্তস্নান সেরে ওঠে গভীর গভীরতর বেদনায়। সারা গায়ে আনারের দানার মতো রক্তফোঁটা নিয়ে হু হু বুকে লেকের কিনারে ছুটে যায় ‘পদ্মাবতী’র কবির রাজহাঁসের পালকে বানানো লেখনীর সঙ্গে জলে সহমরণের অভিলাষে। রক্তভেজা অচিন পাখিকে দেখে ছেঁউড়িয়াতে আচমকা ছিঁড়ে যায় লালনের একতারার স্তব্ধ অথচ সপ্রাণ তার। অতিকায় এক সোনালি দেয়ালের পিঠ থেকে নেমে আসেন তিনি। তাঁর চোখে যুগপৎ বেদনা আর কৃতজ্ঞতার অশ্রুকণা চিক চিক করে শ্রাবণের শেষ রোদে। ক্ষতবিক্ষত মানচিত্রের মতো বুক চেপে তিনি দেখছেন কি দ্রুত তাঁর প্রাণের বাংলাকে এক প্রকাণ্ড পাগলা গারদে রূপান্তরিত করা হয়েচে। এখানে সবাই বড় বেশি স্বাভাবিক সুস্থতার নাটুকে ঢঙ দেখিয়ে চলেছে। একটা বদ হাওয়া এতকাল আচ্ছন্ন করে রেখেছে স্বদেশভূমিকে। দেখা যাক, মনে মনে বলেন তিনি, আমার উত্তরাধিকার অতীতাশ্রয়ী না হয়ে সুবাতাস বইয়ে দিতে পারে কিনা। সারাক্ষণ শুধু অতীতের দিকে মুখ রেখে চললে প্রগতির চাকা ডোবে পিছল কাদায়। আমার উত্তরাধিকার পেছনে কিংবা সামনের চোরাবালিতে পা রাখলে আমার দ্বিতীয় মৃত্যু হবেই হবে স্বজনেরই হাতে।অনন্তর তিনি অপেক্ষমাণ সোনালি দোয়েলটির দিকে খানিক তাকালেন, তাঁর চোখে একটি প্রশ্ন নক্ষত্রমালা হয়ে দুলতে থাকে।     (মেঘলোকে মনোজ নিবাস কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/flashbak-ebong/
3644
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ব্রিজটার প্ল্যান দিল
ছড়া
ব্রিজটার প্ল্যান দিল বড়ো এন্‌জিনিয়ার ডিস্ট্রিক্‌ট্‌ বোর্ডের সবচেয়ে সীনিয়ার। নতুন রকম প্ল্যান দেখে সবে অজ্ঞান, বলে, “এই চাই, এটা চিনি নাই-চিনি আর।’ব্রিজখানা গেল শেষে কোন্‌ অঘটন দেশে, তার সাথে গেছে ভেসে ন হাজার গিনি আর।   (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/btijtar-plan-dilo/
5985
হুমায়ুন আজাদ
তোমার দিকে আসছি
প্রেমমূলক
অজস্র জন্ম ধরে আমি তোমার দিকে আসছি কিন্তু পৌঁছুতে পারছি না। তোমার দিকে আসতে আসতে আমার এক একটা দীর্ঘ জীবন ক্ষয় হয়ে যায় পাঁচ পঁয়সার মোম বাতির মত। আমার প্রথম জন্মটা কেটে গিয়েছিলো শুধু তোমার স্বপ্ন দেখে দেখে, এক জন্ম আমি শুধু তোমার স্বপ্ন দেখেছি। আমার দুঃখ, তোমার স্বপ্ন দেখার জন্যে আমি মাত্র একটি জন্ম পেয়েছিলাম। আরেক জন্মে আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পরেছিলাম তোমার উদ্দেশ্য। পথে বেরিয়েই আমি পলি মাটির উপর আকাঁ দেখি তোমার পায়ের দাগ তার প্রতিটি রেখা আমাকে পাগল করে তোলে। ঐ আলতার দাগ,আমার চোখ,আর বুক আর স্বপ্নকে এতো লাল করে তুলে, যে আমি তোমাকে সম্পূর্ন ভুলে যাই ঐ রঙ্গীন পায়ের দাগ প্রদক্ষীন করতে করতে আমার ঐ জন্মটা কেটে যায়। আমার দুঃখ ! মাত্র একটি জন্ম আমি পেয়েছিলাম সুন্দর কে প্রদক্ষীন করার। আরেক জন্মে তোমার কথা ভাবতেই- আমার বুকের ভিতর থেকে সবচে দীর্ঘ আর কোমল,আর ঠাণ্ডা নদীর মত কি যেন প্রবাহিত হতে শুরু করে। সেই দীর্ঘশ্বাসে তুমি কেঁপে উঠতে পারো ভেবে আমি একটা মর্মান্তিক দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে কাটিয়ে দেই সম্পুর্ন জন্মটা। আমার দুঃখ ,আমার কোমলতম দীর্ঘশ্বাসটি ছিল মাত্র এক জন্মের সমান দীর্ঘ আমার ষোঁড়শ জন্মে একটি গোলাপ আমার পথ রোধ করে, আমি গোলাপের সিঁড়ি বেয়ে তোমার দিকে উঠতে থাকি- উঁচুতে ! উঁচুতে !! আরো উঁচুতে !!! আর এক সময় ঝড়ে যাই চৈত্রের বাতাসে। আমার দু:খ মাত্র একটি জন্ম আমি গোলাপের পাপঁড়ি হয়ে তোমার উদ্দেশ্য ছড়িয়ে পরতে পেরেছিলাম। এখন আমার সমস্ত পথ জুড়ে টলমল করছে একটি অশ্রু বিন্দু। ঐ অশ্রু বিন্দু পেরিয়ে এ জন্মে হয়তো আমি তোমার কাছে পৌঁছুতে পারবনা; তাহলে ,আগামী জন্ম গুলো আমি কার দিকে আসবো ?
https://banglarkobita.com/poem/famous/503
624
জয় গোস্বামী
আমাকে প্রত্যেকবার কেটে
রূপক
আমাকে প্রত্যেকবার কেটে পশুরক্ত পাওয়া যাবে–পর্বতচূড়ায় পা থেকে আমার ধড় উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখলেই পাখিরা চিৎকার করবে–লাল হবে আকাশ সমুদ্রের জলে আমার মহিষমুণ্ড, বেঁকে যাওয়া শিঙ দেখা দেবে সূর্যের বদলে!
https://banglarkobita.com/poem/famous/1717
263
কাজী নজরুল ইসলাম
ওগো প্রিয় তব গান
প্রেমমূলক
ওগো প্রিয় তব গান আকাশ গাঙের জোয়ারে উজান বাহিয়া যায়। মোর কথাগুলি কাঁদিছে বুকের মাঝারে, পথ খুঁজে নাহি পায়।ওগো দখিনা বাতাস, ফুলের সুরভি বহ ওরি সাথে মোর না বলা বাণী লহ। ওগো মেঘ, তুমি মোর হয়ে গিয়ে কহ বন্দিনী গিরি-ঝরণা পাষাণতলে যে কথা কহিতে চায়।ওরে ও সুরমা, পদ্মা, কর্ণফুলি তোদের ভাটির স্রোতে নিয়ে যা আমার না বলা কথাগুলি ধুয়ে মোর বুক হতে।ওরে ‘চোখ গেল’ ‘বৌ কথা কও’ পাখি তোদের কণ্ঠে মোর সুর যাই রাখি। ওরে মাঠের মুরলি কহিও তাহারে ডাকি আমার এ কলি, না-ফোটা বুলি, ঝরে গেল নিরাশায়।।
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/ogo-prio-tobo-gaan/
5731
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আমার খানিকটা দেরি হয়ে যায়
চিন্তামূলক
যে পান্থনিবাসে যাই দ্বার বন্ধ, বলে, ‘ঐ যে রুগ্ন ফুলগুলি বাগানে রয়েছে শুধু, এখন বসবেন?’ কেউ মুমূর্ষু অঙ্গুলি আপন উরসে রেখে হেসে ওঠে, পাতা ঝরানোর হাসি, 'এই অবেলায় কেন এসেছেন আপনি, কী আছে এখন? গত বসন্তমেলায় সব ফুরিয়েছে, আর আলো নেই, দেখুন না তার ছিঁড়ে গেছে, সব ঘরে ধুলো, তালা খুলবে না এ জন্মে; পরিচারিকার হাতে কুষ্ঠ!' ভগ্ন কণ্ঠস্বরে নেবানো চুল্লীর জন্য কারো খেদ, কেউ আসবাববিহীন বুকের শীতের মধ্যে শুয়ে আছে, মৃত্যু বহুদূর জেনে, চৈত্র রুক্ষ দিন চিবুক ত্রিভাঁজ করে, প্রতিটি সরাইখানা উচ্ছিষ্ট পাঁজর ও রক্তে ক্লিন্ন হয়ে আছে বাগানে কুসুমগুলি মৃত, গন্ধহীন, ওরা বাতাসে প্রেতের মতো নাচে। আমার আগের যাত্রী রূপচোর, তাতার দস্যুর মতো বেপরোয়া, কব্জি শক্তিধর অমোঘ মৃত্যুর চেয়ে কিছু ছোটো, জীবনের প্রশাখার মতো ভয়ঙ্কর সেই গুপ্তচর পান্থ আগে এসে ছেঁচে নিল শেষ রূপ রস- ক্ষণিক সরাইগুলি, হায়! এখন গ্রীবায় ছিন্ন ইতিহাস, ওষ্ঠে, চোখে, মসীলিপ্ত পুঁথির বয়স। আমার খানিকটা দেরি হয়ে যায়, জুতোয় পেরেক ছিল, পথে বড় কষ্ট, তবু ছুটে এসেও পারি না ধরতে, ততক্ষণে লুট শেষ, দাঁড়িয়ে রয়েছে সব ম্লান ওষ্ঠপুটে।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1882
3370
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
পলাশ আনন্দমূর্তি জীবনের ফাগুনদিনের
চিন্তামূলক
পলাশ আনন্দমূর্তি জীবনের ফাগুনদিনের, আজ এই সম্মানহীনের দরিদ্র বেলায় দিলে দেখা যেথা আমি সাথিহীন একা উৎসবের প্রাঙ্গণ-বাহিরে শস্যহীন মরুময় তীরে। যেখানে এ ধরণীর প্রফুল্ল প্রাণের কুঞ্জ হতে অনাদৃত দিন মোর নিরুদ্দেশ স্রোতে ছিন্নবৃন্ত চলিয়াছে ভেসে বসন্তের শেষে। তবুও তো কৃপণতা নাই তব দানে, যৌবনের পূর্ণ মূল্য দিলে মোর দীপ্তিহীন প্রাণে, অদৃষ্টের অবজ্ঞারে কর নি স্বীকার — ঘুচাইলে অবসাদ তার; জানাইলে চিত্তে মোর লভি অনুক্ষণ সুন্দরের অভ্যর্থনা, নবীনের আসে নিমন্ত্রণ।   (আরোগ্য কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/polash-anondomurti-jiboner-fagundiner/
4062
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
হে রাজন তুমি আমারে
ভক্তিমূলক
হে রাজন্‌, তুমি আমারে বাঁশি বাজাবার দিয়েছ যে ভার তোমার সিংহদুয়ারে– ভুলি নাই তাহা ভুলি নাই, মাঝে মাঝে তবু ভুলে যাই, চেয়ে চেয়ে দেখি কে আসে কে যায় কোথা হতে যায় কোথা রে।কেহ নাহি চায় থামিতে। শিরে লয়ে বোঝা চলে যায় সোজা, না চাহে দখিনে বামেতে। বকুলের শাখে পাখি গায়, ফুল ফুটে তব আঙিনায়– না দেখিতে পায়,না শুনিতে চায়, কোথা যায় কোন্‌ গ্রামেতে।বাঁশি লই আমি তুলিয়া। তারা ক্ষণতরে পথের উপরে বোঝা ফেলে বসে ভুলিয়া। আছে যাহা চিরপুরাতন তারে পায় যেন হারাধন, বলে, “ফুল এ কী ফুটিয়াছে দেখি। পাখি গায় প্রাণ খুলিয়া।’হে রাজন্‌,তুমি আমারে রেখো চিরদিন বিরামবিহীন তোমার সিংহদুয়ারে। যারা কিছু নাহি কহে যায়, সুখদুখভার বহে যায়, তারা ক্ষণতরে বিস্ময়ভরে দাঁড়াবে পথের মাঝারে তোমার সিংহদুয়ারে।   (উৎসর্গ কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/he-rajon-tumi-amare/
5535
সুকান্ত ভট্টাচার্য
রোম
মানবতাবাদী
ভেঙ্গেছে সাম্রাজ্যস্বপ্ন, ছত্রপতি হয়েছে উধাও; শৃঙ্খল গড়ার দুর্গ ভূমিসাৎ বহু শতাব্দীর। 'সাথী আজ দৃঢ় হাতে হাতিয়ার নাও' - রোমের প্রত্যেক পথে ওঠে ডাক ক্রমশ অস্থির। উদ্ধত ক্ষমতালোভী দস্যুতার ব্যর্থ পরাক্রম মুক্তির উত্তপ্ত স্পর্শে প্রকম্পিত যুগ যুগ অন্ধকার রোম। হাজার বছর ধ'রে দাসত্ব বেঁদেছে বাসা রোমের দেউলে, দিয়েছে অনেক রক্ত রোমের শ্রমিক- তাদের শক্তির হাওয়া মুক্তির দুয়ার দিল খুলে, আজকে রক্তাক্ত পথ; উদ্ভাসিত দিক। শিল্পী আর মজুরের বহু পরিশ্রম একদিন গড়েছিল রোম, তারা আজ একে একে ভেঙে দেয় রোমের সে সৌন্দর্যসম্ভার, ভগ্নস্তূপে ভবিষ্যৎ মুক্তির প্রচার। রেমের বিপ্লবী হৃৎস্পন্দনে ধ্বনিত মুক্তির সশস্ত্র ফৌজ আসে অগণিত, দুচোখে সংহার স্বপ্ন, বুকে তীব্র ঘৃণা শত্রুকে বিধ্বস্ত করা যেতে পারে কিনা রাইফেলের মুখে এই সংক্ষিপ্ত জিজ্ঞাসা। যদিও উদ্বেগ মনে, তবু দীপ্ত আশা; পথে পথে জনতার রক্তাক্ত উত্থান, বিস্ফোরণে বিস্ফোরণে ডেকে ওঠে বান।ভেঙে পড়ে দস্যুতার, পশুতার প্রথম প্রাসাদ বিক্ষুব্ধ অগ্ন্যুৎপাতে উচ্চারিত শোষণের বিরুদ্ধে জেহাদ। যে উদ্ধত একদিন দেশে দেশে দিয়েছে শৃঙ্খল আবিসিনিয়ার চোখে আজ তার সে দম্ভ নিষ্ফল।এদিকে ত্বরিত সূর্য রোমের আকাশে যদিও কুয়াশাঢাকা আকাশের নীল, তবুও বিপ্লবী জানে, সোভিয়েট পাশে।।
https://www.bangla-kobita.com/sukanta/rome/
1803
পূর্ণেন্দু পত্রী
কেবল আমি হাত বাড়ালেই
প্রেমমূলক
হাওয়া তোমার আঁচল নিয়ে ধিঙ্গীনাচন করলো খেলা সকাল বিকেল সন্ধেবেলা চোখের খিদের আশ মেটালো লস্পটে রোদ রাস্তা ঘাটে যখন হাঁটো সঙ্গে হাঁটে বনের পথে হাঁটলে যখন কাঁটাগাছে টানলে কাপড় চ্যাংড়া ছোঁড়ার ফাজলামিকে ভেবেছিলাম মারবে থাপড়। একটা নদীর লক্ষটা হাত, ভাসিয়ে দিলে সর্বশরীর লুটপাটেতে ছিনিয়ে নিলে ওষ্ঠপুটের হাসির জরির জেল্লাজলুস। কেবল আমি হাত বাড়ালেই, মাত্র আমার পাঁচটা আঙুল, তোমার মহাভারত কলুষ। রক্তে মাংসে মনুষ্যজীব, সেই দোষেতেই এমন কাঙাল। কিন্তু তোমার খবর নিতে আমার কাছেই আসবে ছুটে অনন্তকাল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1229
4737
শামসুর রাহমান
জুয়েলের জাদু
মানবতাবাদী
সন্ধ্যারাতে জুয়েল আইচ বহুদিন পর ফের আমাকে মোটরকালে নিয়ে আমাদের শ্যামলীর বাসায় এলেন নক্ষত্রের পানে চেয়ে বেদনার পানে বড় বেশি ঝুঁকে গিয়ে। তাকে দেখে আমাদের দীপিতা ত্বরিত এল ছুটে। ছোট্র এই মেয়ে আগে জুয়েলের জাদু দেখেছিল এক সন্ধ্যারাতে। সেই স্মৃতি নিয়ে এল টেনে তাকে আমাদের আলাপের কাছে।অনেকের মতো দীপিতাও জেনে গেছে মজাদার গায়েবি ক্ষমতা-কত কিছু হাত থেকে আচানক হয় যে উধাও, উহাদের খোঁজ পায় না ত কেউ, যদি না জুয়েল তার কেরামতি খাটিয়ে সেগুলি ফের নিয়ে আসে হাতে। জাদুকর জুয়েল পায়রা কিংবা অন্য কিছু হাওয়ায় বিলীন ক’রে আমাদের তাক লাগানোয় ছিলেন না উৎসাহী তেমন, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন নিজের কিছু কথা জানালেন গল্পচ্ছলে কৃতী কথকের মতো আর আমরা ক’জন শ্রোতা মন্ত্রমুগ্ধ যেন আগাগোড়া।জুয়েলকে সে-রাতে বিদায় দিতে গিয়ে দীপিতার বাবা নিচে নেমে যায় অন্ধকারে। দীপিতার জন্মদাত্রী টিয়া ঠাট্রাচ্ছলে বলে তার মেয়েকে, ‘তোমার বাবা হওয়ায় মিলিয়ে গেছে জুয়েলের ম্যাজিকের ছোঁয়ায় কোথায় যেন।‘দীপিতা মায়ের কথা শুনে কেঁদে ফেলে। আমি তাকে সান্ত্বানার কথা ব’লে থামাই ফোঁপানি ওর। ভাবি- একদিন যখন আমার ক্ষয়া শরীর হঠাৎ ভীষণ নিস্পন্দ শৈত্যে ছেয়ে যাবে, প্রাণপাখি উড়ে অজানায় হবে লুপ্ত, চিহ্নহীন, সেই ক্ষণে জুয়েল অথবা প্রবাদপ্রতিম হুডিনির চেয়েও অধিক খ্যাতিমান কোনও জাদুকরও ব্যর্থ হবে ফেরাতে আমাকে এই সুন্দর ভুবনে।   (ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছেকাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/shamsurrahman/jeweler-jadu/
6057
হেলাল হাফিজ
যাতায়াত
প্রেমমূলক
কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো। কেন আমার দিন কাটে না রাত কাটে না রাত কাটে তো ভোর দেখি না কেন আমার হাতের মাঝে হাত থাকে না কেউ জানেনা। নষ্ট রাখীর কষ্ট নিয়ে অতোটা পথ একলা এলাম পেছন থেকে কেউ বলেনি করুণ পথিক দুপুর রোদে গাছের নিচে একটু বসে জিরিয়ে নিও, কেই বলেনি ভালো থেকো সুখেই থেকো যুগল চোখে জলের ভাষায় আসার সময় কেউ বলেনি মাথার কসম আবার এসো জন্মাবধি ভেতরে এক রঙিন পাখি কেঁদেই গেলো শুনলো না কেউ ধ্রুপদী ডাক, চৈত্রাগুনে জ্বলে গেলো আমার বুকের গেরস্থালি বললো না কেউ তরুন তাপস এই নে চারু শীতল কলস। লন্ডভন্ড হয়ে গেলাম তবু এলাম। ক্যাঙ্গারু তার শাবক নিয়ে যেমন করে বিপদ পেরোয় আমিও ঠিক তেমনি করে সভ্যতা আর শুভ্রতাকে বুকে নিয়েই দুঃসময়ে এতোটা পথ একলা এলাম শুশ্রূষাহীন। কেউ ডাকেনি তবু এলাম, বলতে এলাম ভালোবাসি। ১০.৪.৮১
https://banglarkobita.com/poem/famous/128
2386
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
শকুন্তলা
সনেট
মেনকা অপ্সরারূপী, ব্যাসের ভারতী প্রসবি, ত্যজিলা ব্যস্তে, ভারত-কাননে, শকুন্তলা সুন্দরীরে, তুমি, মহামতি, কণ্বরূপে পেয়ে তারে পালিলা যতনে, কালিদাস ! ধন্য কবি, কবি-কুল-পতি ! তব কাব্যাশ্রমে হেরি এ নারী-রতনে কে না ভাল বাসে তারে, দুষ্মন্ত যেমতি প্রেমে অন্ধ?কে না পড়ে মদন-বন্ধনে? নন্দনের পিক-ধ্বনি সুমধুর গলে; পারিজাত-কুসুমের পরিমল শ্বাসে; মানস-কমল-রুচি বদন-কমলে; অধরে অমৃত-সুধা;সৌদামিনী হাসে; কিন্তু ও মৃগাক্ষি হতে যবে গলি,ঝলে অশ্রুধারা,ধৈর্য্য ধরে কে মর্ত্ত্যে,আকাশে?
https://www.bangla-kobita.com/madhusudan/shakuntala/
5760
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
গদ্যছন্দে মনোবেদনা
মানবতাবাদী
ভেবেছিলাম নিচু করবো না মাথা, তবুও ভেতরের এক কুত্তার বাচ্চা মাঝে মাঝে মসৃণ পায়ের কাছে ঘষতে চায় মুখ, জানি তো অসীমে ভাসিয়েছি আমার আত্মার শাদা পায়রা দূত, বলেছি মৃত্যুর চেয়েও সাচ্চা মানুষের মতো বেঁচে থঅকা- তবু তার দু’একটা পালক খসে জ্যোস্নায় মনখারাপ হিমে। মাঝে মাঝে গদি মোড়া চেয়ারে বসলেও ব্যথা করে পশ্চাৎদেশে, আমি জানি আচম্বিতে পেয়ালা পিরীচ ভেঙে উঠে দাঁড়ানো উচিত ছিল আমার জানলার বাইরে থেকে নিয়তি চোখ মারে, শীর্ণ হাতে দেয় হাতছানি আমি মনকে চোখ ঠেরে অন্যমনস্ক হই, ইস্ত্রি ঠিক রাখি জামার। এ-সব ইয়ার্কি আর কদ্দিন হে? শুধু বেঁচে থাকতেই হালুয়া টাইট করে দিচ্ছে অথচ কথা ছিল, সব মানুষের জন্য এই পৃথিবী সুসহ দেখে যাবো, ঠিক যে-রকম প্রত্যেক মৌমাছির আছে নিজস্ব খুপরি, কিন্তু যার যখন ইচ্ছে উড়ে যাবার স্বাধীনতা : ফুলের ভেতরে মধু সে জেনেছে, তবু সঙ্গসভ্যতার জন্য তার শ্রম।।
https://banglarkobita.com/poem/famous/1823
1960
বিনয় মজুমদার
একটি উজ্জ্বল মাছ
প্রেমমূলক
একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত পস্তাবে স্বচ্ছ জলে পুনরায় ডুবে গেলো — এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে বেগনার গাঢ় রসে আপক্ক রক্তিম হ’লো ফল | বিপন্ন মরাল ওড়ে, অবিরাম পলায়ন করে, যেহেতু সকলে জানে তার শাদা পালকের নিচে রয়েছে উদগ্র উষ্ণ মাংস আর মেদ ; স্বল্পায়ু বিশ্রাম নেয় পরিশ্রান্ত পাহাড়ে পাহাড়ে ; সমস্ত জলীয় গান বাষ্পিভূত হ’য়ে যায়, তবু এমন সময়ে তুমি, হে সমুদ্রমত্স্য, তুমি…তুমি… কিংবা, দ্যাখো, ইতস্তত অসুস্থ বৃক্ষেরা পৃথিবীর পল্লবিত ব্যাপ্ত বনস্থলী দীর্ঘ-দীর্ঘ ক্লান্তশ্বাসে আলোড়িত করে ; তবু সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে যার ভূমিতে দূরে দূরে চিরকাল থেকে ভাবে মিলনের শ্বাসরোধী কথা |
http://kobita.banglakosh.com/archives/4040.html
2977
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গত দিবসের ব্যর্থ প্রাণের
প্রকৃতিমূলক
গত দিবসের ব্যর্থ প্রাণের যত ধুলা, যত কালি, প্রতি উষা দেয় নবীন আশার আলো দিয়ে প্রক্ষালি।   (স্ফুলিঙ্গ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/goto-diboser-bartho-praner/
489
কাজী নজরুল ইসলাম
রুবাইয়াত-ই- হাফিজ- ৩
ভক্তিমূলক
পরান ভরে পিয়ে শরাব, জীবন যাহা চিরকালের। মৃত্যু-জরা-ভরা জগৎ ফিরে কেহ আসবেনা ফের। ফুলের বাহার, গোলাব- কপোল, গেলাস- সাথী মস্ত-ইয়ার, এক লহমার খুশির তুফান, এইতো জীবন!- ভাবনা কিসের!!
https://www.bangla-kobita.com/nazrulislam/rubaiyat-e-hafiz-3/
1844
পূর্ণেন্দু পত্রী
পরিণয় উপলক্ষে
প্রেমমূলক
এইখানে সব আছে। স্তব্ধতার মুখে শুনতে পাবে অবিরল সলজ্জ সংলাপ দৃষ্টি যদি ডুবে যায় তরল আঁধারে তবু কারো নিংশ্বাসের উজ্জল উত্তাপ। তোমাকে রঙিন করে দেবে স্পর্শ সুখে। নিয়ে এসো দিনাস্তের অসংখ্য বিলাপ কে তাকে উড়িয়ে দেবে গানের পাখির পাখনায় বেঁধে ব্যাপ্ত অসীমের বুকে। যেখানেই হাত ছোঁবে সে নদী-গিরির অজ্ঞাত শিল্পীর আঁকা দৃশ্যের বিস্ময় মেঘলোকে উঠে গেছে সিঁড়ি ধাপে ধাপ। এইখানে নব আছে। যাকে বলো ক্ষয় সেও তো ফোটাবে মুক্তি রক্তের কিংশুকে। আমাকে অমৃত দেবে অন্তর্গত পাপ।
https://banglarkobita.com/poem/famous/479
1735
পাবলো নেরুদা
যদি আমায় তুমি ভুলে যাও
প্রেমমূলক
অনুবাদ:ইমন জুবায়েরএকটি কথা আমি তোমাকে জানিয়ে দিতে চাই । তুমি কি জান আমি যখন আমার জানালার বাইরে মন্থর হেমন্তের লাল ডালে স্ফটিক চাঁদটির দিকে তাকাই, যদি ছুঁয়ে দিই আগুনের কাছটিতে অবোধগম্য কিছু ছাই কিংবা কাটা গুঁড়ির বৃত্তাকার শরীর- এসবই তোমার নিকটে আমায় বহন করে নিয়ে যায়, যেনবা- যা কিছু অস্তিত্বশীল, সুগন্ধ, আলো, কিংবা ধাতুসমূহ, যেনবা ছোট্ট নৌকা যা বইছে আমার জন্য অপেক্ষমান তোমার দ্বীপ অভিমূখে ঠিক আছে, এখন, যদি অল্প অল্প করে আমায় ভালোবাসাকমিয়ে দাও আমিও অল্প অল্প করে তোমায় ভালোবাসা কমিয়ে দেব। সহসা তুমি আমায় ভুলে গিয়ে আমার দিয়ে চেও না, কেননা, এরই মধ্যে আমি তোমায় ভুলতে বসেছি। যদি তুমি অনেকক্ষণ ধরে এসব ভাব আর পাগল হয়ে যাও- পতাকার বাতাস যা বয় আমার জীবনের মধ্য দিয়ে, আর তুমি সিদ্ধান্ত নাও আমায় ছেড়ে যাবে হৃদয়ের পাড়ে যেখানে আমার শিকড়, মনে রেখ যে: ঐ দিনে, ঐ মুহূর্তে, আমি আমার হাত তুলব আর আমার শিকড় যাত্রা করবে অন্য কোনও ভূমির সন্ধানে। কিন্তু, প্রতি দিনে প্রতি প্রহরে তুমি অনুভব করবে আমিই তোমার নিষ্ঠুর মধুর নিয়তি … যদি প্রতিদিন একটি ফুল আমায় খুঁজতে বেড়ে ওঠে তোমার ঠোঁটের দিকে- আহ্ আমার প্রেম, আহ্ আমার আমি, আমার ভিতরে সমস্ত আগুন পুর্নবার হয় আবর্তিত আমার ভিতরে নিভে যায়নি কিছুই, কিংবা হয়নি বিস্মৃত আমার প্রেম তোমার প্রেম পেয়ে বাঁচে, প্রিয়তম, আর আমাকে পরিত্যাগ না করে যতদিন বাঁচবে তোমার আলিঙ্গনে রবে আমার প্রেম।
http://kobita.banglakosh.com/archives/3949.html
2912
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কুঁজো তিনকড়ি ঘোরে
ছড়া
কুঁজো তিনকড়ি ঘোরে পাড়া চারিদিককার, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে নিয়ে ঝুলি ভিক্ষার। বলে সিধু গড়গড়ি রাগে দাঁত কড়মড়ি, “ভিখ্‌ মেগে ফের’, মনে হয় না কি ধিক্কার?’ ঝুলি নিজে কেড়ে বলে, “মাহিনা এ শিক্ষার।’  (খাপছাড়া কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/kujo-tinkori-ghore/
3220
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দীনের দান
নীতিমূলক
মরু কহে, অধমেরে এত দাও জল, ফিরে কিছু দিব হেন কী আছে সম্বল? মেঘ কহে, কিছু নাহি চাই, মরুভূমি, আমারে দানের সুখ দান করো তুমি।   (কণিকা কাব্যগ্রন্থ)
https://www.bangla-kobita.com/rabindranath/diner-dan/
147
আসাদ চৌধুরী
তখন সত্যি মানুষ ছিলাম
স্বদেশমূলক
নদীর জলে আগুন ছিলো আগুন ছিলো বৃষ্টিতে আগুন ছিলো বীরাঙ্গনার উদাস-করা দৃষ্টিতে। আগুন ছিলো গানের সুরে আগুন ছিলো কাব্যে, মরার চোখে আগুন ছিলো এ-কথা কে ভাববে? কুকুর-বেড়াল থাবা হাঁকায় ফোসে সাপের ফণা শিং কৈ মাছ রুখে দাঁড়ায় জ্বলে বালির কণা। আগুন ছিলো মুক্তি সেনার স্বপ্ন-ঢলের বন্যায়- প্রতিবাদের প্রবল ঝড়ে কাঁপছিলো সব-অন্যায়। এখন এ-সব স্বপ্নকথা দূরের শোনা গল্প, তখন সত্যি মানুষ ছিলাম এখন আছি অল্প।
https://banglarkobita.com/poem/famous/381
5631
সুকুমার রায়
নাচন
ছড়া
নাচ্ছি মোরা মনের সাধে গাচ্ছি তেড়ে গান হুলো মেনী যে যার গলার কালোয়াতীর তান। নাচ্ছি দেখে চাঁদা মামা হাস্‌ছে ভরে গাল চোখটি ঠেরে ঠাট্টা করে দেখ্‌না বুড়োর চাল।
https://www.bangla-kobita.com/sukumar/nachon/
1987
বিষ্ণু দে
গার্হাস্থ্যাশ্রম (পূর্বরঙ্গ)
সনেট
তোমায় লেগেছে ভালো – সে-কথা তো জানো ? তোমার ও কটা চোখ – যদিচ বাঙালি, বুধবার থেকে কেন মনে পড়ে খালি ! লোকে যাকে প্রেম বলে – সে কি তুমি মানো ? জেনে-শুনে চোখ দিয়ে আমাকে কি টানো ? না কি তুমি অজানিতে ভরে যাও ডালি ? না কি আমি সংস্কৃত, প্রাকৃত ও পালি পড়েছি প্যারিসে গিয়ে, তাই চোখে আনো কৌতুহল নামে বস্তু ? অলকা, বলো তো। আমাকে বলতে কিছু ভয় পেয়ো নাকো; একাধিক ওষ্ঠাধর ঠেকেছে এ-কানে; তা ছাড়া প্রেমের ফুলও বিবেচনা-মতো তুলি আমি। তবু কেন চুপ ক’রে থাকো? ক্ষমা কোরো, হেসেছি কি সে-দিনের গানে?
http://kobita.banglakosh.com/archives/4109.html
1370
তসলিমা নাসরিন
লজ্জা, ২০০২
মানবতাবাদী
প্রথমে মেয়েটির পেটের বাচ্চাটি বের করে নিল পেট কেটে, খুব ধারালো ছুরিতে কেটে, এরপর বাচ্চাটির গলা কাটল তারা, মাথাটি ছুঁড়ে ফেললো মেয়েটির পায়ের কাছে, ধড়টি মাথার কাছে। ছুঁড়ে ফেলে বেদম হাসতে লাগল তারা। কারা তারা? তারা হিন্দু, সম্ভাব্য হিন্দুরাজ্যের দেশপ্রেমিক নাগরিক। মেয়েটি যখন চিৎকার করছে বাঁচার জন্য, মেয়েটির শরীরে তারা আগুন লাগিয়ে দিল, মেয়েটি পুড়তে থাকলো, পুড়তে থাকলো, পুড়তে পুড়তে কয়লা হচ্ছে মেয়েটি তার ত্বক পুড়ে মাংস পুড়ে হাড় পুড়ে কয়লা হচ্ছে, তার হৃদপিণ্ড, তার ফুসফুস, তার জরায়ু পুড়ে কয়লা হচ্ছে, ছাই হচ্ছে। কীদোষ ছিল মেয়েটির? কী অন্যায় সে করেছিল? –সে মুসলমানের ঘরে জন্মেছিল। তার মুসলমান একটি নাম ছিল।
https://banglarkobita.com/poem/famous/2011
2812
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
এইক্ষণে
ভক্তিমূলক
এইক্ষণে মোর হৃদয়ের প্রান্তে আমার নয়ন-বাতায়নে যে-তুমি রয়েছ চেয়ে প্রভাত-আলোতে সে-তোমার দৃষ্টি যেন নানা দিন নানা রাত্রি হতে রহিয়া রহিয়া চিত্তে মোর আনিছে বহিয়া নীলিমার অপার সংগীত, নিঃশব্দের উদার ইঙ্গিত। আজি মনে হয় বারে বারে যে মোর স্মরণের দূর পরপারে দেখিয়াছ কত দেখা কত যুগে, কত লোকে, কত জনতায়, কত একা। সেই-সব দেখা আজি শিহরিছে দিকে দিকে ঘাসে ঘাসে নিমিখে নিমিখে, বেণুবনে ঝিলিমিলি পাতার ঝলক-ঝিকিমিকে। কত নব নব অবগুণ্ঠনের তলে দেখিয়াছ কত ছলে চুপে চুপে এক প্রেয়সীর মুখ কত রূপে রূপে জন্মে জন্মে, নামহারা নক্ষত্রের গোধূলি-লগনে। তাই আজি নিখিল গগনে অনাদি মিলন তব অনন্ত বিরহ এক পূর্ণ বেদনায় ঝংকারি উঠিছে অহরহ। তাই যা দেখিছ তারে ঘিরেছে নিবিড় যাহা দেখিছ না তারি ভিড়। তাই আজি দক্ষিণ পবনে ফাল্গুনের ফুলগন্ধে ভরিয়া উঠিছে বনে বনে ব্যাপ্ত ব্যাকুলতা, বহুশত জনমের চোখে-চোখে কানে-কানে কথা। শিলাইদা, ৭ ফাল্গুন, ১৩২২
https://banglarkobita.com/poem/famous/1952