content
stringlengths
0
129k
যাওয়া স্থগিত রেখে মেসে ফিরে আসার প্ল্যান করছি
এমন সময় বার্তা এল মেদিনীপুর গামী ট্রেনের
প্ল্যাটফর্ম নম্বর পনেরো
দৌড় লাগালাম প্ল্যাটফর্মের দিকে
__ হাঁফিয়ে উঠেছি রীতিমতো
লেডিস কম্পার্টমেন্টে উঠে জানালার ধারে একটা সীট দখল নিয়ে বসেছি
এক এক করে মহিলা সহযাত্রীরা উঠছেন
ভর্তি হচ্ছে কামরা
আমারও ধড়ে যেন একটু প্রাণ ফিরল
ভাবছিলাম, এই সন্ধ্যায় এতটা পথ একলা যাব কিভাবে!
__ লোকাল ট্রেন গ্যালোপিন হয়ে ছুটছে ঝমঝমিয়ে
একের পর এক স্টেশান অতিক্রম করে চলেছে নিমেষে
ভাবলাম একবার, রক্তিমকে ফোন করি
থেমে গেলাম, ওকে সারপ্রাইজ দেবার জন্য
ইয়ারফোন লাগিয়ে গানে মননিবেশ করলাম
__ পাঁশকুড়া আসার আগে আগেই অনেক যাত্রী নেমে গেলেন
আমি সহ আর বাকি চার জন কামরা দখল করে আছি
ঘড়ির কাঁটা তখন সাতের ঘর ছুঁয়ি ছুঁয়ি
__ আরও মিনিট পনেরো পর পাঁশকুড়া স্টেশানে ট্রেন পৌঁছালো
বাকি মহিলা যাত্রীরা সব নেমে গেছেন কখন
যা একজন ছিলেন, উনিও আমাকে হতাশ করে দিয়ে নেমে গেলেন
দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলাম ট্রেন ছাড়ার পূর্ব মুহুর্ত অবধি
যদি কোনো সঙ্গী পাই
ট্রেন যখন হুইশেল দিয়ে স্টেশান ত্যাগ করল, আশাহত হয়ে জানলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইলাম
অন্ধকারময় রাস্তায় যেটুকু চোখে পড়ে ফাঁকা একটা রাস্তা ছুটছে
ছুটছে তীব্র গতিতে, অজানা গন্তব্যস্থলে
- "এখানে একটু বসতে পারি"?
__ চেনা গলা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে তাকালাম
- "কাকিমা"!
-"আপনি কখন উঠলেন"?
__ কাকিমা উত্তর দিলেন,
- "তুমি যখন অন্যমনা হয়ে জানালায় তাকিয়ে ছিলে তখন উঠেছি"
__ আমি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম নিঃশব্দে
কাকিমার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়লাম,
- "এখানে কোনো দরকারে এসেছিলেন"?
-"হুম... হ্যাঁ " বলে কাকিমা অন্য প্রসঙ্গ টানলেন
-"জানো তিথি, রক্তিমের তোমাকে খুব দরকার এই মুহুর্তে
একমাত্র তোমার কাছেই ওসব কথা মন খুলে বলে
দেখলে না কলসেন্টারের ঘটনাটা"
__ আমি অবাক হয়ে কাকিমাকে জিজ্ঞেস করলাম,
-"কেন কাকিমা? কি এমন হল আবার? সবই তো ঠিক ছিল"
__কাকিমা আবার শুরু করলেন,
- "সব ঠিকঠাক চলছিল
মেদিনীপুর শহরে ও একটা সফ্টওয়ারের দোকানও শুরু করেছিল
বেশ রমরমিয়ে চলছিল
হঠাৎই একদিন হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে ঢুকল
জিজ্ঞেস করাতে উত্তর দিল, কোথায় কোন সাইটে রঞ্জনাকে দেখেছে"
- "কি যা তা বলছে"!
__ আমার বলা কথায় কাকিমাও সমর্থন জানিয়ে বললেন,
- "আমরাও প্রথমত তাই ভেবেছিলাম
ওকে অনেক বোঝালাম, রঞ্জনার আত্মা মুক্তি পেয়েছে
ও আমাদের কথা গ্রাহ্য না করে নিজেকে সব কিছু থেকে দূরে করে ঘর বন্দি করে নিল"
- "এটা ওর মনের ভুল বা হতে পারে ওর মনের অন্দরে কোথাও রঞ্জনার জন্য জায়গা তৈরী হয়েছিল
তার জন্য ও এইসব ভাবছে"
__ আমার বলা কথাগুলো, কাকিমা আগের মতোই সমর্থন জানিয়ে বললেন,
- "এর জন্য ওকে এস.এস.কে.এম এ সাইকোলজিস্ট দেখাতে নিয়ে যেতাম
ডাক্তারের ওপিনিয়ন ও এরকমই ছিল"
__ একটু থেমে কাকিমা আবারও শুরু করলেন,
- "ছেলেটা আমার পাগল হতে বসেছে, তিথি"
- "তুমি ওর সবথেকে কাছের বন্ধু "
__কাকিমার জল ভরা চোখ দেখে আমারও চোখে জল এল
কি বলব বুঝতে পারলাম না
কাকিমাকে জানালাম, রক্তিমের মেসেজের কথা
এটাও জানালাম মেসেজের কারণেই আমি মেদিনীপুর এসেছি
___ কাকিমা সব দেখে চোখ মুছে বললেন,
- "কি দরকার ছিল ওই ভুতুড়ে কলসেন্টারে চাকরি করার"?
- "তাহলে আজ এই দিনটা আর দেখতে হত না"!
__ আমি সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বললাম,
-"এত কিছু হয়ে গেল, আমাকে একবার জানালেন না"?
-"আমি কত চেষ্টা করেছি, রক্তিমের সাথে যোগাযোগ করার"
-"ফোন করলেই একটা কি বিশ্রী ঘড়ঘড় শব্দ হত
তারপর তো একদিন সে আওয়াজও বন্ধ হয়ে গেল
যোগাযোগ ও বিচ্ছিন্ন হল"
- "রাগ কোরো না, তিথি"
-"ছেলেটার ওই অবস্থায় মাথার ঠিক ছিল না"
-" ওকে নিয়ে এই এত দূর থেকে এস.এস.কে.এম এ যেতাম"
-"শুধু ওকে আগের মতো অবস্থায় ফেরানোর জন্য"
__ কাকিমার বলা কথা গুলোর কোনো উত্তর ছিল না আমার কাছে
পরিস্থিতির অবস্থা বুঝে চুপ করে রইলাম
গল্প করতে করতে কখন মেদিনীপুর স্টেশানে ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি
ভাগ্য ক্রমে এটাই শেষ স্টপ ছিল
ট্রেন থেকে আমি আর কাকিমা নেমে, রিক্সা স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটা দিলাম
আজ আর রক্তিম নিতে আসেনি আমাকে
ও তো জানেই না আমি আসছি
___ রিক্সা স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি
কোথাও কিছু নেই আকাশ কালো করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল
সাথে মেঘের গর্জন
বিদ্যুতের ঝিলিক
ওদিকে ঘড়ির কাঁটা ন'টার ঘর ছুঁয়েছে
আমি আর কাকিমা দাঁড়িয়ে রইলাম
_"কি করে এবার যাব, কাকিমা"?
- "এ তো বিনা মেঘে বজ্রপাত "
__ এই পরিস্থিতিতে কাকিমা পরিশ্রান্ত না হয়ে একদম শান্ত এবং নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে উঠলেন,
-"ঠিক পৌঁছে যাবে"
-"পৌঁছতে তোমাকে যে হবেই, তিথি"
-"রক্তিমের যে বড্ড দরকার, তোমাকে "
__ কাকিমার সব কথার মানে বুঝতে পারিনি তখনও
তখন একটাই চিন্তা রক্তিমের বাড়ি যাব কি করে
রাত ও বাড়ছে
সাথে পেটের মধ্যে ছুঁচো গুলোও ডন দেওয়া শুরু করেছে