content stringlengths 0 129k |
|---|
একটি খালের সাহায্যে এটিকে বন্দর উপযোগী করা হয়েছিল |
প্রাক-মুসলিম স্থাপত্যিক নিদর্শনের অস্তিত্ব না থাকায় এধারণা অবাস্তব বলে মনে হয় |
চৌদ্দ শতকের জিয়াউদ্দীন বরনী একটি দীর্ঘ বাজারের বর্ণনা দিয়েছেন যার উভয় পার্শ্বে ছিল দোকানের সারি |
এ সারি প্রায় দুমাইলব্যাপী সেন রাজাদের পুরনো প্রাসাদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল |
'ফুলওয়ারি' দুর্গ বর্তমান গৌড় দুর্গের ধ্বংসাবশেষের দুমাইল উত্তরে অবস্থিত যা কানিংহামের মতে একটি হিন্দু দুর্গ ছিল |
এটি বরনীর মতে, বলবনের পুত্র কর্তৃক ব্যবহূত হতো |
যাহোক, কিছু কালো কষ্টিপাথরের প্রস্তর খন্ড ছাড়া ওই স্থানে অন্য কোনো প্রাক-মুসলিম আমলের নিদর্শন পাওযা যায় নি |
অন্যদিকে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী দুর্গটি শাহ সুজা কর্তৃক ব্যবহূত হয় |
চক চকে ইট, কাদা-মাটির তৈরী পাইপের ভাঙ্গা অংশ, খোদিত চীনামাটির বাসনের টুকরা এবং অমসৃণ মৃৎপাত্রসমূহ দেওয়ালবেষ্টিত দুর্গের ভেতরে (সেখানে একটি পরিখা আছে) পাওয়া যায় |
এর থেকে বোঝা যায় যে, দুর্গটি পনেরো ও ষোল শতকে ব্যবহূত হতো |
পনেরো শতকের শুরু থেকে গৌড় ও পান্ডুয়া জনবহুল নগরে পরিণত হয় |
সম্ভবত জনসংখ্যার চাপে সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ রাজধানী গৌড় থেকে পান্ডুয়াতে স্থানান্তরিত করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন |
একই সময়ে সমুদ্র বন্দর হিসেবে সপ্তগ্রাম/সাতগাঁও-এর উত্থান আমরা লক্ষ করি যা স্পষ্টত চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিরাজমান নৈরাজ্যের কারণে ঘটেছিল |
এরপর থেকে গৌড় নগরে অভিবাসন দ্রুতগতিতে চলতে থাকে |
অন্যদিকে ভাগীরথীর তীরে অন্যান্য শহরগুলিও বিকশিত হচ্ছিল |
এ শহরগুলি সপ্তগ্রাম এবং গৌড়ে বস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করে |
এটি তাৎপর্যপূর্ণ যে, গৌড় নগরী দেওয়ালের পেছনে দক্ষিণ দিকে বিস্তার লাভ করছিল |
সম্প্রতি এর ধ্বংসাবশেষ বাংলাদেশী একটি প্রত্নতাত্ত্বিক দল কর্তৃক আবিষ্কৃত হয়েছে |
গৌড়ের সন্নিকটে বসবাসকারী নীলচাষী হেনরী ক্রেইটন ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে নগরের মোটামুটি একটি নকশা ও সৌধসমূহের চিত্রাঙ্কনসহ নগরের অঙ্গসংস্থানের একটি বিবরণ দেন |
তিনি গঙ্গা ও মহানন্দার মধ্যবর্তী অঞ্চলে দৈর্ঘ্যে দশ মাইল ও প্রস্থে দেড় মাইলব্যাপী নগরের ধ্বংসাবশেষের বিস্তার দেখেন |
কাস্তেনহাদা ডি লোপেজের বর্ণনায় দেখা যায় যে, মহানন্দা নদীটি পনেরো শতকের শেষার্ধে অগভীর খাড়িতে পরিণত হয় |
আবুল ফজল এটিকে 'চটিয়া পটিয়া' নামকরণ করেন |
নগরীতে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর নদীর সমান্তরাল দুটি বড় পাকা রাস্তা ছিল যা ছোট ছোট আঁকাবাঁকা গলি ও খাল দ্বারা যুক্ত ছিল |
এগুলির কয়েকটি এখনও বিদ্যমান আছে |
ক্রেইটনের বর্ণনা সংশোধন করেছেন জেমস রেনেল, আলেকজান্ডার কানিংহাম এবং জে.এইচ র্যাভেনশ' |
এরা ধ্বংসাবশেষের বিস্তার দৈর্ঘ্যে বিশ মাইল ও প্রস্থে চার মাইল দেখেছেন (পরবর্তীকালে আকাশ থেকে নেয়া জরিপ ও আবিষ্কারের দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে) এবং এভাবে দক্ষিণ দিকে সীমানা দেওয়ালের পেছনে নগর বিস্তার লাভ করে |
উত্তর দিকের প্রধান ফটকসহ দুর্গ ও প্রাসাদের নকশা তৈরি করা ছিল ক্রেইটনের বড় কৃতিত্ব |
উত্তর দিকের ফটকটিকে দাখিল দরওয়াজা বলা হতো এবং এটি সম্ভবত পনেরো শতকের প্রথম দিকে নির্মিত হয়েছিল |
পরবর্তী সময়ে ষোল শতকের প্রথম দিকে নুসরত শাহ পর্যন্ত বিভিন্ন শাসক পর্যায়ক্রমে এর পরিবর্ধন করেছেন |
এ ফটক থেকে ১৫২১ খ্রিস্টাব্দে নাম না জানা এক পর্তুগিজ দোভাষী সোজাসুজি নুসরত শাহের দরবার হলে চলে যান |
এ সময় সুলতান নিচের সমভূমিতে পোলো খেলা দেখছিলেন |
এ দোভাষী মূল্যবান একটি আত্মজীবনীও রেখে গেছেন |
ক্রেইটন ও ফ্রাংকলিনের লেখার ওপর ভিত্তি করে র্যাভেনশ' প্রাসাদটিকে তিনটি অংশে বিভক্ত করেন |
প্রাসাদটি একটি উচু দেওয়াল দ্বারা বেষ্টিত ছিল |
এটিকে বাইশগজী দেওয়াল বলা হতো |
প্রাসাদের তিন দিক একটি পরিখা দ্বারা বেষ্টিত ছিল এবং গঙ্গা নদীর সঙ্গে এটির সংযোগ ছিল |
নদীটি দুর্গের পশ্চিম দিক রক্ষা করত |
আমরা যদি সমসাময়িক বৈষ্ণব কবিকে বিশ্বাস করি তাহলে দেখা যায় যে, এখান থেকেই আলাউদ্দীন হোসেন শাহ নদীর অপর তীরে চৈতন্য-এর নেতৃত্বে মিছিলটি দেখেন |
এটি স্পষ্ট যে, উত্তর দিক থেকে প্রথম কামরাটি ছিল দরবার |
পর্তুগিজ দোভাষী ১৫২১ খ্রিস্টাব্দে এর বর্ণনা সুস্পষ্টভাবে দিয়েছেন |
দাখিল দরওয়াজা থেকে মাঝপথে একটি ফটক ছিল |
এর নিচ দিয়ে ঝর্ণার জন্য পানি সরবরাহের একটি খাল প্রবাহিত ছিল যা সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহ-এর (১৪৬৬ খ্রি.) শিলালিপিতে উল্লিখিত আছে |
যদি আমরা পর্তুগিজ দোভাষী ও খ্যাতনামা বাঙালি কবি কৃত্তিবাসের বিবরণ বিশ্বাস করি তাহলে দেখা যাবে যে, দাখিল দরওয়াজা থেকে দরবার পর্যন্ত রাস্তায় নয়টি সুরক্ষিত ফটক ছিল |
এগুলির মধ্যে কমপক্ষে দুটি অদ্যাবধি চিহ্নিত করা যায় |
উত্তর দিক থেকে দ্বিতীয় কামরাটি সুলতানের বাসকক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় |
হুমায়ুনের সহচর কর্তৃক প্রশংসিত এ কক্ষের বহুবর্ণের টালিখচিত মেঝে আমাদেরকে প্রাক-মুগল সুলতানদের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাত্রার কথা মনে করিয়ে দেয় |
তৃতীয় কামরাটিকে হারেম সরা বা জেনানা মহল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় |
১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে সফররত ফরাসি নাগরিক ভিনসেন্ট ল্য বঁলা জেনানা মহলের বিষয়টি সমর্থন করেছেন |
তৃতীয় কামরা হতে উল্লেখ করার মতো তেমন কিছু পাওয়া যায় নি |
কিন্তু অন্য দুটি কামরায় আছে শোভন ও মূল্যবান অনেক নিদর্শন |
এগুলির মধ্যে রয়েছে বহু বর্ণের ইট এবং চৈনিক লিপি উৎকীর্ণ চীনামাটির বাসনের টুকরাসমূহ যা সে যুগের বাংলায় প্রথম পাওয়া যায় |
প্রথম কামরার উত্তর-পূর্বাংশে একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষকে কোষাগার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে |
কিন্তু এ কথা দৃঢ়ভাবে প্রতিপন্ন করা যায় না |
দুর্গের পূর্ব দিকের দেওয়ালে রয়েছে দুটি ফটক |
প্রথমটির নাম গোমতি ফটক যা আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলের বলে নির্ধারিত হয়েছে এবং পরেরটির নাম লুকোচুরি দরওয়াজা |
এ ফটকটি সাধারণভাবে শাহ সুজার বলে বর্ণনা করা হলেও সম্ভবত এটি ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দে দাউদ খান কররানীর বিরুদ্ধে বিজয়ের পর মুনিম খান নির্মাণ করেছিলেন |
এ ফটকের উত্তর দিকে বেশ কিছু ইমারতের মধ্যে প্রথমটি বাংলা নমুনার একটি নিচু ইমারত |
লোককাহিনী অনুযায়ী এটি দিলির খানের পুত্র ফতেহ খানের সমাধিসৌধ |
ফতেহ খান শাহ সুজার পশ্চাদ্ধাবন করতে গিয়ে মুত্যুবরণ করেন বলে কথিত আছে |
পরবর্তী ভবন কদম রসুলে রক্ষিত আছে মহানবী (স.)এর পদচিহ্ন |
পূর্বে এ ইমারতটিকে একটি মসজিদ হিসেবে ধরা হয়েছিল |
এ ইমারতটির সন্নিকটে রয়েছে চাতালসহ অনেক ধ্বংসাবশেষ |
এটি হলো গৌড়ের সুলতানদের কবরস্থান |
হেনরী ক্রেইটন কাল পাথরের তৈরী আলাউদ্দীন হোসেন শাহ এবং নুসরত শাহের সমাধিসৌধ দেখেছিলেন |
পরবর্তীসময়ে এটি বিলুপ্ত হয়ে যায় |
বলা হয় যে, ইংরেজগণ পরে এগুলি সরিয়ে নিয়েছিল |
আরও উত্তর দিকে দুর্গের বাইরে রয়েছে একটি উচ্চ ইমারত (টাওয়ার) |
সম্ভবত এটি ছিল একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার |
মালদহের বিপরীতে এ ধরনের আরও একটি টাওয়ার আছে |
১৫২১ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ দোভাষী দাখিল দরওয়াজার দিকের প্রবেশপথ মোটা লোহার শিকল টেনে সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ দেখতে পান |
তিনি মোড়ের একটি বড় মসজিদের কথাও উল্লেখ করেছেন |
এটি সুস্পষ্টভাবেই ছিল বড় সোনা মসজিদ |
শিলালিপির সাক্ষ্যে মসজিদটি শনাক্ত করা হয়েছে |
এ শিলালিপি অনুসারে মসজিদটি ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয় |
পর্তুগিজ সূত্রে সুস্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, এটি ১৫২১ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে নির্মিত হয় |
সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ কোতোয়ালী দরওয়াজার পেছনে দক্ষিণ পার্শ্বে একই ধরনের একটি মসজিদ (ছোট সোনা মসজিদ) নির্মাণ করেন |
নগরদুর্গের ভেতরে গোমতি ফটকের পশ্চিম দিকে সোজা পথে একটি ইমারত আছে |
এটি সাধারণভাবে চিকা ইমারত নামে অভিহিত |
এর ভূমিনকশা পান্ডুয়ার একলাখী সমাধিসৌধ-এর মতো হলেও এটি সমাধি ছিল না |
কারণ এখানে কোনো কবরের সন্ধান পাওয়া যায় নি |
এটি একটি মসজিদও ছিল না |
এখানে ইমারতের ভেতরে উত্তোলিত হিন্দু দেবতার মূর্তিসমূহ লিন্টেলের উপরে ব্যবহার করা হয়েছিল |
পর্তুগিজ বিবরণী পর্যালোচনা করলে এটিকে দীউয়ান-ই-মজালিম বলে মনে হয় যেখানে পর্তুগিজদেরকে গোয়েন্দা হিসেবে বিচার করা হতো |
আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে সনাতন নামে জনৈক বন্দির পালিয়ে যাওয়ার পরে এটি আর কারাগার হিসেবে ব্যবহূত হয় নি |
সনাতন প্রহরীদেরকে উৎকোচ প্রদান করে পলায়নের জন্য গঙ্গানদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল |
এখান থেকে নদীতে সরাসরি প্রবেশের কোনো পথ ছিল না |
নগরদুর্গ চত্বরে কালো কষ্টিপাথরের প্রস্তর খন্ডসমূহ ছড়িয়ে ছিল |
দক্ষিণ দিকের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে এগুলির কিছু এখনও দাঁড়িয়ে আছে যেগুলি অফিস ছিল বলে অনুমিত হয় |
দৃঢ়ভাবে স্থাপিত বড় কষ্টিপাথরের প্রস্তর খন্ডগুলি এধারণা দেয় যে, এলাকাটি ছিল প্রাচীন লক্ষ্মণাবতীর অংশ |
স্থানীয় লোককাহিনী গৌড়ের বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে দুর্গের দক্ষিণাংশের উঁচু ভূমিকে শনাক্ত করে |
এখানে বৌদ্ধ ও হিন্দু মূর্তি পাওয়া গেছে |
ঐতিহ্যগতভাবে এটিকে 'লাল বাজার' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং এর একটি অংশকে 'মহাজন টোলা' বলা হয় |
দুর্গ সংলগ্ন এবং এক বর্গমাইল এলাকায় প্রচুর পরিমাণে কড়ি ও অমসৃণ মৃৎপাত্রসমূহ পাওয়া যায় |
ধ্বংসাবশেষসমূহ বেশ কিছু 'মহল্লা' নির্দেশ করে যেগুলির অস্তিত্ব প্রাক-ইসলামি যুগ থেকে ছিল |
পর্তুগিজরা রাস্তাসমূহ সুপরিকল্পিত ও বিন্যস্ত অবস্থায় দেখেন |
ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য বড় শহরের ন্যায় এখানেও বিশেষ ধরনের দ্রব্যাদি যেমন, অস্ত্রাদি অথবা মিষ্টি বা খাদ্যদ্রব্য বিভিন্ন রাস্তায় বিক্রি করা হতো |
পর্তুগিজরা লিসবনের সঙ্গে এ শহরের তুলনা করেন |
নগরটি ঘনবসতিপূর্ণ ছিল বলে প্রতীয়মান হয় |
১৫২১ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ দোভাষী জনসংখ্যার অত্যধিক ঘনত্বের কথা বলেছেন |
জনাকীর্ণ রাস্তাসমূহে চলাফেরার অসুবিধা তিনি লক্ষ করেন |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.