content stringlengths 0 129k |
|---|
মা বললেন, কোথায় যাবি ? বললাম, আমার এককালের সহপাঠী এবং এখন ক্লাসের ফার্স্টবয় মোজাম্মেলের বাড়িতে যাবো |
ওর মায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে |
যে ক'দিন কথা বলেছি, তাতে করে খুব ভালো মানুষ বলে মনে হয়েছে |
আমার বিশ্বাস, আমাকে উনি ফিরিয়ে দিতে পারবেন না |
দুরু দুরু মনে মোজাম্মেলের বাড়ি গেলাম |
সবকিছু খুলে বলতেই খালাম্মা সানন্দে রাজি হলেন |
আমার খাবার আর আশ্রয় জুটলো; শুরু হলো নতুন জীবন |
নতুন করে পড়াশোনা শুরু করলাম |
প্রতিক্ষণেই হেডস্যারের সেই অবজ্ঞাসূচক কথা মনে পড়ে যায়, জেদ কাজ করে মনে; আরো ভালো করে পড়াশোনা করি |
যথাসময়ে পরীক্ষা শুরু হলো |
আমি এক-একটি পরীক্ষা শেষ করছি আর ক্রমেই যেন উজ্জীবিত হচ্ছি |
আমার আত্মবিশ্বাসও বেড়ে যাচ্ছে |
ফল প্রকাশের দিন আমি স্কুলে গিয়ে প্রথম সারিতে বসলাম |
হেডস্যার ফলাফল নিয়ে এলেন |
আমি লক্ষ্য করলাম, পড়তে গিয়ে তিনি কেমন যেন দ্বিধান্বিত |
আড়চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছেন |
তারপর ফল ঘোষণা করলেন |
আমি প্রথম হয়েছি ! খবর শুনে বড় ভাই আনন্দে কেঁদে ফেললেন |
শুধু আমি নির্বিকার- যেন এটাই হওয়ার কথা ছিল |
বাড়ি ফেরার পথে সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য |
আমি আর আমার ভাই গর্বিত ভঙ্গিতে হেঁটে আসছি |
আর পিছনে এক দল ছেলেমেয়ে আমাকে নিয়ে হৈ চৈ করছে, স্লোগান দিচ্ছে |
সারা গাঁয়ে সাড়া পড়ে গেল ! আমার নিরক্ষর বাবা, যাঁর কাছে ফার্স্ট আর লাস্ট একই কথা- তিনিও আনন্দে আত্মহারা; শুধু এইটুকু বুঝলেন যে, ছেলে বিশেষ কিছু একটা করেছে |
যখন শুনলেন আমি ওপরের কাসে উঠেছি, নতুন বই লাগবে, পরদিনই ঘরের খাসিটা হাটে নিয়ে গিয়ে ১২ টাকায় বিক্রি করে দিলেন |
তারপর আমাকে সঙ্গে নিয়ে জামালপুর গেলেন |
সেখানকার নবনূর লাইব্রেরি থেকে নতুন বই কিনলাম |
আমার জীবনযাত্রা এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে |
আমি রোজ স্কুলে যাই |
অবসরে সংসারের কাজ করি |
ইতোমধ্যে স্যারদের সুনজরে পড়ে গেছি |
ফয়েজ মৌলভী স্যার আমাকে তাঁর সন্তানের মতো দেখাশুনা করতে লাগলেন |
সবার আদর, যত্ন, স্নেহে আমি ফার্স্ট হয়েই পঞ্চম শ্রেণীতে উঠলাম |
এতদিনে গ্রামের একমাত্র মেট্রিক পাস মফিজউদ্দিন চাচা আমার খোঁজ নিলেন |
তাঁর বাড়িতে আমার আশ্রয় জুটলো |
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে আমি দিঘপাইত জুনিয়র হাইস্কুলে ভর্তি হই |
চাচা ওই স্কুলের শিক্ষক |
অন্য শিক্ষকরাও আমার সংগ্রামের কথা জানতেন |
তাই সবার বাড়তি আদর-ভালোবাসা পেতাম |
আমি যখন সপ্তম শ্রেণী পেরিয়ে অষ্টম শ্রেণীতে উঠবো, তখন চাচা একদিন কোত্থেকে যেন একটা বিজ্ঞাপন কেটে নিয়ে এসে আমাকে দেখালেন |
ওইটা ছিল ক্যাডেট কলেজে ভর্তির বিজ্ঞাপন |
যথাসময়ে ফরম পুরণ করে পাঠালাম |
এখানে বলা দরকার, আমার নাম ছিল আতাউর রহমান |
কিন্তু ক্যাডেট কলেজের ভর্তি ফরমে স্কুলের হেডস্যার আমার নাম আতিউর রহমান লিখে চাচাকে বলেছিলেন, এই ছেলে একদিন অনেক বড় কিছু হবে |
দেশে অনেক আতাউর আছে |
ওর নামটা একটু আলাদা হওয়া দরকার; তাই আতিউর করে দিলাম |
আমি রাত জেগে পড়াশোনা করে প্রস্তুতি নিলাম |
নির্ধারিত দিনে চাচার সঙ্গে পরীক্ষা দিতে রওনা হলাম |
ওই আমার জীবনে প্রথম ময়মনসিংহ যাওয়া |
গিয়ে সবকিছু দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ ! এত এত ছেলের মধ্যে আমিই কেবল পায়জামা আর স্পঞ্জ পরে এসেছি ! আমার মনে হলো, না আসাটাই ভালো ছিল |
অহেতুক কষ্ট করলাম |
যাই হোক পরীক্ষা দিলাম; ভাবলাম হবে না |
কিন্তু দুই মাস পর চিঠি পেলাম, আমি নির্বাচিত হয়েছি |
এখন চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে যেতে হবে |
সবাই খুব খুশি; কেবল আমিই হতাশ |
আমার একটা প্যান্ট নেই, যেটা পরে যাবো |
শেষে স্কুলের কেরানি কানাই লাল বিশ্বাসের ফুলপ্যান্টটা ধার করলাম |
আর একটা শার্ট যোগাড় হলো |
আমি আর চাচা অচেনা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম |
চাচা শিখিয়ে দিলেন, মৌখিক পরীক্ষা দিতে গিয়ে আমি যেন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলি: ম্যা আই কাম ইন স্যার ? ঠিকমতোই বললাম |
তবে এত উচ্চস্বরে বললাম যে, উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসে উঠলো |
পরীক্ষকদের একজন মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ এম. ডাব্লিউ. পিট আমাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে সবকিছু আঁচ করে ফেললেন |
পরম স্নেহে তিনি আমাকে বসালেন |
মুহূর্তের মধ্যে তিনি আমার খুব আপন হয়ে গেলেন |
আমার মনে হলো, তিনি থাকলে আমার কোন ভয় নেই |
পিট স্যার আমার লিখিত পরীক্ষার খাতায় চোখ বুলিয়ে নিলেন |
তারপর অন্য পরীক্ষকদের সঙ্গে ইংরেজিতে কী-সব আলাপ করলেন |
আমি সবটা না বুঝলেও আঁচ করতে পারলাম যে, আমাকে তাঁদের পছন্দ হয়েছে |
তবে তাঁরা কিছুই বললেন না |
পরদিন ঢাকা শহর ঘুরে দেখে বাড়ি ফিরে এলাম |
যথারীতি পড়াশোনায় মনোনিবেশ করলাম |
কারণ আমি ধরেই নিয়েছি, আমার চান্স হবে না |
হঠাৎ তিন মাস পর চিঠি এলো |
আমি চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছি |
মাসে ১৫০ টাকা বেতন লাগবে |
এর মধ্যে ১০০ টাকা বৃত্তি দেওয়া হবে, বাকি ৫০ টাকা আমার পরিবারকে যোগান দিতে হবে |
চিঠি পড়ে মন ভেঙে গেল |
যেখানে আমার পরিবারের তিনবেলা খাওয়ার নিশ্চয়তা নেই, আমি চাচার বাড়িতে মানুষ হচ্ছি, সেখানে প্রতিমাসে ৫০ টাকা বেতন যোগানোর কথা চিন্তাও করা যায় না ! |
এই যখন অবস্থা, তখন প্রথমবারের মতো আমার দাদা সরব হলেন |
এত বছর পর নাতির (আমার) খোঁজ নিলেন |
আমাকে অন্য চাচাদের কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন, তোমরা থাকতে নাতি আমার এত ভালো সুযোগ পেয়েও পড়তে পারবে না ? কিন্তু তাঁদের অবস্থাও খুব বেশি ভালো ছিল না |
তাঁরা বললেন, একবার না হয় ৫০ টাকা যোগাড় করে দেবো, কিন্তু প্রতি মাসে তো সম্ভব নয় |
দাদাও বিষয়টা বুঝলেন |
আমি আর কোন আশার আলো দেখতে না পেয়ে সেই ফয়েজ মৌলভী স্যারের কাছে গেলাম |
তিনি বললেন, আমি থাকতে কোন চিন্তা করবে না |
পরদিন আরো দুইজন সহকর্মী আর আমাকে নিয়ে তিনি হাটে গেলেন |
সেখানে গামছা পেতে দোকানে দোকানে ঘুরলেন |
সবাইকে বিস্তারিত বলে সাহায্য চাইলেন |
সবাই সাধ্য মতো আট আনা, চার আনা, এক টাকা, দুই টাকা দিলেন |
সব মিলিয়ে ১৫০ টাকা হলো |
আর চাচারা দিলেন ৫০ টাকা |
এই সামান্য টাকা সম্বল করে আমি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলাম |
যাতায়াত খরচ বাদ দিয়ে আমি ১৫০ টাকায় তিন মাসের বেতন পরিশোধ করলাম |
শুরু হলো অন্য এক জীবন |
প্রথম দিনেই এম. ডাব্লিউ. পিট স্যার আমাকে দেখতে এলেন |
আমি সবকিছু খুলে বললাম |
আরো জানালাম যে, যেহেতু আমার আর বেতন দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাই তিন মাস পর ক্যাডেট কলেজ ছেড়ে চলে যেতে হবে |
সব শুনে স্যার আমার বিষয়টা বোর্ড মিটিঙে তুললেন এবং পুরো ১৫০ টাকাই বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিলেন |
সেই থেকে আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি |
এস.এস.সি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম স্থান অধিকার করলাম এবং আরো অনেক সাফল্যের মুকুট যোগ হলো |
আমার জীবনটা সাধারণ মানুষের অনুদানে ভরপুর |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.