content stringlengths 0 129k |
|---|
রূপকের বিস্তার থেকে গানের বাইরের অর্থটি পাওয়া যায়, আর এর তফসিরের মধ্যে লুকিয়ে থাকে গানের ভিতরের অর্থ |
এহেন কৌশলটিকে অনেকেই 'প্রতিরোধী' বলে শনাক্ত করেছেন |
অর্থাৎ, তাদের মতে, রূপক আমদানি করার মাধ্যমে বাউল গান ধর্ম, বর্ণ ও সমাজ সম্পর্কে বাউলদের র্যাডিকাল মতাদর্শ প্রচার করতে পেরেছে |
৪ ফলত এটা একটা সফল কৌশল |
সফল বলেই এর পুনরাবৃত্তি দেখি আমরা আরবান ফোক গানে |
বিষয়টিকে ভেঙ্গে বলা যাক |
রূপকের দুইটি অংশ: সিগনিফায়ার এবং সিগনিফায়েড |
সিগনিফায়েড হল যাকে রূপকের মাধ্যমে বিবৃত করা হচ্ছে, আর সিগনিফায়ার হল সেই কৌশল যার দ্বারা সিগনিফায়েড বিবৃত হয় |
এখন এই নিবন্ধে আমরা দেখব কীভাবে আরবান ফোক গানে বাউল গানের জনপ্রিয় সিগনিফায়েডগুলো নতুন নতুন সিগনিফায়ারের আশ্রয়ে নতুন রূপক তৈরি করছে |
যেমন, আরবান ফোক গানে 'যৌবন' নামক সিগনিফায়েডখানা আর 'কচুপাতার পানি' নয়, বরং 'গোল্ডলিফ সিগারেট' |
একইভাবে, জীবন জিনিসটা ভবদরিয়ায় ভাসানো তরী বা নৌকা নয়, বরং হাইওয়েতে চলতে থাকা বাস; দুনিয়া আর দুইদিনের মঞ্চ নয়, বরং দুই মিনিটের বাসস্টপ |
লোকগানে যিনি ছিলেন 'প্রেমদরিয়ার মাঝি', আরবান ফোকে তিনি হয়ে যান 'তালার কারিগর', 'গাড়িয়াল ভাই' হয়ে উঠেন 'রিকশা ড্রাইভার', মানুষকে বিপথে নেয়া 'পঞ্চেন্দ্রিয়' আরবান ফোক গানে 'পাড়ার মাস্তান'-এর চেহারা পায় |
এই বদলে যাওয়াগুলো নিছক খেয়ালখুশির নয় |
বরং তাদের শহরমুখী গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় বিনির্মাণের কৌশল হিসাবে শনাক্ত করা সম্ভব |
স্টুয়ার্ট হল যেমন বলেন, শহরমুখী অভিভাসন অধিকাংশ সময়েই একতরফা, প্রত্যাবর্তনরহিত |
অর্থাৎ গ্রামে ফেরত যাওয়ার যে স্বপ্ন, সেটা একটা মিথ |
এডওয়ার্ড সাঈদ মনে করেন অভিবাসন জিনিসটা আসলে অভিবাসীকে একটি থমকানো দশায় ঠেলে দেয়, যার ফলে সে তার অতীতের সাথে বোঝাপড়া কখনই শেষ করে উঠতে পারে না |
ঘুরে ঘুরেই তাকে ফিরে আসতে হয় স্মৃতির ভেতর |
কিন্তু এই আসা-যাওয়ার ফাঁকে তাকে নতুন পরিস্থিতির ভাষাও আয়ত্ত করতে হচ্ছে |
সেখানেও সে থমকানো সত্তা |
৫ আধেক অতীতে আর আধেক বর্তমানে বিভক্ত হয়ে থাকা এই দশাকেই হোমি ভবা নাম দিয়েছেন "ইন-বিটুইন" দশা |
নিবন্ধের অন্তিমে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা থাকবে |
এই দশার প্রকাশ যে ভাষাব্যবহারের ওপর পড়বে তা বলাই বাহুল্য |
স্টিফেনস (১৯৯১) দেখিয়েছেন কিভাবে র্যাপ গানের চর্চার মাধ্যমে এই ঘরানার শিল্পী ও শ্রোতা মিলে মূলধারার সংস্কৃতির বিরূদ্ধে জাতির ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে |
বাখতিনের অনুসরণে স্টিফেনস (১৯৯১) দেখান কিভাবে র্যাপ সঙ্গীত একটা দ্বৈতস্বর হয়ে উঠছে, মূলত আফ্রিকান আত্মপরিচয়কে পশ্চিমা দুনিয়ায় ফিরে পাবার জন্য |
উপন্যাসে ভাষাব্যবহারের ক্ষেত্রে বাখতিন মনোলজিক ও ডায়ালজিক নামক দুটি ঘরানা শনাক্ত করেন যেখানে ডায়ালজিক ঘরানা অন্য-র স্বরকে ধারণ করে |
একে তিনি নাম দিয়েছেন 'হেটেরোগ্লসিয়া' - 'অন্যর ভাষায় অন্যর বক্তব্য' |
এই কৌশলটির উদ্দেশ্য দুটো: উপন্যাসের চরিত্রটির সোজা সরল অভিপ্রায় এবং লেখকের বাঁকাচোরা অভিপ্রায় |
৬ গানে এই কৌশলটি কার্যকর হয়েছে কিছুটা ভিন্নভাবে |
স্টিফেনস (১৯৯১) যেমন দেখিয়েছেন, দ্বৈতস্বর হয়ে উঠার মাধ্যমে র্যাপ মূলত আফ্রিকান ও আমেরিকান পরিচয়ের মধ্যে সেতুবন্ধ বানাতে চেয়েছে |
বাউল গানেও এই ঐতিহ্য ছিল, আগেই বলেছি |
আরবান ফোক এসে এই ঐতিহ্যকে একটু অন্যভাবে কাজে লাগিয়েছে |
সেখানে বাখতিন কথিত 'সোজা সরল অভিপ্রায়' বলতে আমরা যা পাই, তা হল গরিবের নির্জলা নাগরিক অভিজ্ঞতা |
'বাঁকাচোরা অভিপ্রায়' আবার যত না আধ্যাত্মিক, তারচে রাজনৈতিক |
বর্তমান প্রবন্ধের মূল অভিপ্রায় এই সাংস্কৃতিক রাজনীতিটুকু খোলাসা করা, মূলত তিনটি আরবান ফোক গানের লিরিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে |
গান তিনটি একে একে আলোচনা করা যাক |
'জীবন এক গাড়ি' |
বহু বছর ধরে লোকগানের পরিসরে জীবনের অবশ্যম্ভাবী রূপক হিসেবে আমরা 'নৌকা'কে জেনে এসেছি |
নৌকার বিভিন্ন অংশ জীবনের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমের রূপক হয়ে রয়েছে |
সেইসাথে 'নদী'ও কিন্তু জীবনের সহচর, কখনো কখনো জীবন নিজেই |
নদী বিক্ষত প্রাণের কথাসঙ্গী, যাবতীয় গোপনীয়তার কৌটা, জীবনের মতই ছন্দে ও ছন্দহীনতায় প্রবহমান |
এহেন শক্তিশালী রূপক আরবান ফোক গানের পরিসরে এসে গুরুত্ব হারিয়েছে, 'নদী' ও 'নৌকা'র পরিবর্তে 'গাড়ি' ও 'হাইওয়ে' হয়ে উঠেছে জীবনের সিগনিফায়ার |
নিচের গানখানি এর স্মারক: |
পাংচার হইয়া গেলে চলবে না আর গাড়ি |
হায়াতের তেল পাইবা না খুঁজলে জগত ভরি |
২০৬ আর ৭২০০০এ তার চতুর্পাশে দেয়ালে যার কইরাছে তৈয়ারি |
চলছে গাড়ি মন-গিয়ারে / ব্রেক দিছে বিবেক তারে |
জ্ঞানের ড্রাইভারি করে মাওলা যে মিস্তিরি! |
হেডলাইট করছ ইউজ /একদিন হইবে ফিউজ |
রাখছ নি তার নিউজ ডাউন যে ব্যাটারি |
চিন্তা করে দেখ বাপু/বন্ধ হলে মাউথ ভেঁপু |
সুইচ দিলে করবে না কভু .... (অস্পষ্ট) |
দুইপাশে দুই ইনডিকেটার / সার্ভিস দিতেছে বেটার |
দুইজন কন্ডাক্টর করে গবমেন্টের চাকুরি |
পাইয়াছ পিচ ঢালা রোড / করে চলছ ওভারলোড |
সামনে তোমার মোবাইল কোর্ট ট্যাক্স আদায়কারী |
কামগঞ্জ ত্রিবেণীর মোড়ে / বিবেকের ব্রেক ফেল করে |
একসিডেন্টে রইল পড়ে শাহালমের গাড়ি |
আজরাইল ট্রাফিক সার্জেন্ট / নিযুক্ত করেছে গবমেন্ট |
ছাড়তে হবে ওয়ান্ডারল্যান্ড অতি তাড়াতাড়ি |
(সরকার ১৯৯৯; মমতাজ ২০০০) |
এই গানের 'সোজা সরল' অর্থ অতি পরিষ্কার: এক বাস ড্রাইভারের গল্প এটি, যে ওভারলোড যাত্রীভরা বাস নিয়ে হাইওয়েতে গিয়ে ব্রেকফেল করে পড়ে আছে |
তার লোভ আর অবিচক্ষণতার গল্প |
গভীরতর দ্যোতনা খুঁজলে বাস চালানোকে আমরা শনাক্ত করতে পারি জীবন চালানোর সাথে, যেখানে বিভিন্ন রকমের গিয়ার হল মনের নানান রঙ, ব্রেক হল বিবেক, টায়ার পাংচার মানে আয়ু ফুরানো, ইত্যাদি ইত্যাদি |
আবার, পেট্রোল বা ডিজেলকেও আয়ুর সাথে তুলনা করা হয়েছে এই গানে |
সেইসাথে হেডলাইট তার দেখার ক্ষমতা, হর্ণ হল তার নিজেকে জানান দেওয়ার ক্ষমতা |
গভীরতর যে অর্থ, তাতে বলা হচ্ছে যে আমরা যখন বিবেকচালিত না হয়ে ইন্দ্রিয়চালিত হই, তখনই দুর্ঘটনা ঘটে |
জীবনের ইতি হয়, নয়তো সম্ভাবনার |
ইসলাম ধর্মীয় পরিভাষায় আজরাইল সেই অবসানের দূত, আর হাইওয়ের ভোকাবলারিতে ট্রাফিক সার্জেন্ট |
ফলে, সঙ্গত কারণেই এই গানে সার্জেন্ট আজরাইলের সিগনিফায়ার হয়ে এসেছে |
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই গানে নৌকার বদলে বাস সিগনিফায়ার হয়ে এল? সমসাময়িক ঢাকার প্রেক্ষিতে এই বদল কেন অনিবার্য হয়ে উঠল? প্রকৃতপক্ষে, শহরে ভাগ্যবদল করতে আসা গ্রামীণ গরিবের পক্ষে সবচে সহজে কাজ খুঁজে পাওয়ার জায়গা হল এই পরিবহন সেক্টর |
এখানে যেমন কম মজুরিতে বিভিন্ন ধরনের অদক্ষ শ্রমিকের (টিকেট কন্ডাক্টর, হেল্পার, কুলি, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ইত্যাদি) প্রয়োজন, তেমনি অল্প নোটিশে বিভিন্ন রকম আধাদক্ষ জনশক্তিও (টিকেট বিক্রেতা, বিভিন্নরকম দোকানদার, ভ্রাম্যমান বিক্রয়কর্মী ইত্যাদি) এখানে কাজ খুঁজে নিতে পারে |
প্রতিটি বাসের নিজস্ব মিউজিক সিস্টেম আছে, ছোট ছোট দোকানদারেরও আছে সিডি কিংবা ক্যাসেটপ্লেয়ার - ফলে এখানে বিপুল পরিমাণ সঙ্গীত শ্রুত হয় বলাই বাহুল্য |
বাস যখন চলে তখন গান বাজে, আবার বাস যখন সিরিয়ালে অলস সময় পার করে তখনও গান বাজে |
আবার, আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলোতে শুধু যাত্রীই থাকে এমন না, বহুরকমের অযাত্রীও মিলে মিশে থাকে |
হতে পারে সে বেকার, ভিক্ষুক, ঘরহারা কিংবা দেহজীবী - আশপাশের দোকান থেকে ভেসে আসা গান তাদের চারপাশে একটা স্বস্তির বলয় তৈরি করে |
গানের ভেতরেই যেন তারা নিজেদের একটুকরো ব্যক্তিগত স্পেস খুঁজে নেয় এই জনপরিসরে |
ওপরে বিবৃত গানটি বাউল দেহতত্ত্বের একটা ক্লাসিক নমুনা |
দেহতত্ত্ব মানবদেহকে তার আধ্যাত্মিক গুরুত্বের জায়গা থেকে ব্যাখ্যা করে |
বাউলতত্ত্বে দেহ হল যাবতীয় জাগতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রবিন্দু |
এই গানে দেহ প্রথমে জগতকে সিগনিফাই করেছে, দেহতত্ত্বের সব গানই যেমন করে |
সেই সাথে, গাড়ির রূপকটি দেহকে সিগনিফাই করার মাধ্যমে পুরো জগত-তুলনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে |
জগতকে সিগনিফাই করার জন্য এভাবে এই গান একটি দ্বিস্তরবিশিষ্ট রূপকব্যবস্থা প্রস্তাব করে |
একেই লাকাঁ বলেছেন ' ' |
7 প্রথম স্তরে, যেখানে দেহ জগতের রূপক হয়ে আসছে, সেটা পরিষ্কারভাবেই বাউল ঐতিহ্য |
দ্বিতীয় স্তরে, যেখানে গাড়ি মানবদেহের সিগনিফায়ার হয়ে উঠল, সেটাই এই গানে আরবান ফোক ঘরানার সিগনেচার |
নৌকাবদল করে গাড়ি এল, আর এটুকু অবকাশেই বলা হয়ে গেল গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি দেয়ার ঐতিহাসিক বৃত্তান্তটুকু |
স্টুয়ার্ট হল যেমন বলেন, আত্মপরিচয় জিনিসটা কোনো সাদামাটা নিস্তরঙ্গ পুষ্করিণী নয়, বরং বিপুল সংগ্রামের জায়গা, ঐতিহাসিকভাবে হয়ে উঠার জায়গা |
৮ এই গান যে কাহিনি বুনেছে 'বাঁকাচোরা' অভিপ্রায়ে, যাবতীয় আধ্যাত্মিকতা কিংবা দেহতাত্ত্বিকতার সাথে, সেটি নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবিকা হারানোর কাহিনি |
'যৌবন একটা গোল্ডলিফ সিগারেট' |
বাংলা গানের জনপ্রিয় বিষয়গুলোর তালিকা যদি করা যায়, তবে যৌবনের উদযাপন নিঃসন্দেহে উপরের দিকেই থাকবে |
যৌবনের বিভিন্ন স্তর বিভিন্নভাবে রূপকায়িত হয়েছে গানে |
লোক ঐতিহ্যে যৌবন হল 'কচু পাতার পানি' |
কচু পাতা যেমন পানি ধরে রাখতে পারে না, পানির ছাপ যেমন পাতার গায়ে চিরস্থায়ী হয় না, তেমনি জীবনের গায়ে যৌবনের ছাপ ক্ষণস্থায়ী |
দারিদ্রপীড়িত গ্রামীণ যৌবনের জন্য এটাই মোক্ষম উপমা |
কিন্তু আরবান ফোক গানে এই কচুপাতার পানি গোল্ডলিফ সিগারেটের ধোঁয়ায় বদল হয়ে গেছে |
যৌবন একটা গোল্ডলীফ সিগারেট |
যৌবনের আগুনের ধোঁয়া নিভে গেলে সবই ভুয়া |
জীবন হয় খালি প্যাকেট |
যৌবনে বিহ্বলও নাকি হয়ে উঠে বীর |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.