content stringlengths 0 129k |
|---|
মাইয়া চায় পুরা বোতল তার সংসারই সকল |
না পাইলে মাল ডবল ডবল মুখখানা তার করে ভার |
আমার মস্ত লোভী ভাইভাবী ওরা দেখায় শুধু দেখায় জোর |
হিতাহিত জ্ঞানছাড়া ওরা মস্ত গাঁজাখোর |
তার ওপরে লোভ লালসা আছি বড় কোণঠাসা |
ভ্যান ভ্যান করে মাছিমশা এই দুর্গন্ধ সয় না আর |
এই দেহের দশ ইন্দ্রিয় অতি প্রিয় থাকে নেশার চোটে বেসামাল |
চিরদিনের অভ্যাসে খাইতে আসে বাকি মাল |
ওরা দেয় গালাগালি পড়ে নিশাতে ঢলি |
আমার সাধ্য নাই কিছু বলি সব শালায় দুরাচার |
করলাম একটানা চল্লিশ বছর মাইনা ছাড়া চাকুরি |
আসল ঘরে মশাল খাইয়া পাকাইলাম চুলদাড়ি |
মাতাল রাজ্জাকেরই কপালদোষে পাড়ঘাটাতে কান্দি বসে |
সকাল সকাল চললাম দেশে সংসারপদে নমস্কার |
(রাজ্জাক, তারিখ অজ্ঞাত) |
এই গানে মদের দোকান পার্থিব জীবনের যাবতীয় আকর্ষণের রূপক হয়ে উঠেছে |
দোকানের বিভিন্ন আইটেম, যথা,অ্যালকোহল, হেরোয়িন, গাঁজা ইত্যাদি নেশাদ্রব্য ব্যক্তিকে বেঁধে রাখছে সংসার নামক মদের দোকানে |
এই গানের যে প্রোটাগনিস্ট, দোকান কিন্তু তার নিজের নয় |
সে চাকরি করে মাত্র |
তাও নিতান্ত অনিচ্ছায় |
অনিচ্ছায় বেদনায় দোকানের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে তাকে নেশাদ্রব্য সরবরাহ করতে হয় আপনজনদের কাছে |
এমন কি নিজের কাছেও |
অর্থাৎ গানের ন্যারেটর আর নেশাখোর ব্যক্তিসত্তা আদতে একজন হলেও বিভাজিত সত্তা |
সত্তার একাংশ সংসার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পেরেছে বলেই মদের দোকানের চাকরি এত অসহ্য হয়ে উঠেছে তার কাছে |
এর থেকে মুক্তি চায় সে |
এই গানের মূল অভিপ্রায় নিশ্চয়ই বাউলচর্চিত আত্মার মুক্তি বা মোক্ষ, কিন্তু বাঁকাচোরা অভিপ্রায় অন্য |
তৃতীয় বিশ্বের বস্তিগুলো মাদকব্যবসার আখড়া বলে অনেকেই জানেন |
অনেকেরই ধারণা বস্তিবাসীরা মাদকের ব্যবসা করে, কিন্তু আদতে জিনিসটা ঘটে ভিন্নভাবে |
মাদক ব্যবসার যে সিন্ডিকেট তা অনেক বড় এবং এর সাথে সমাজের উপরতলার মানুষেরাই যুক্ত |
এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট মূলত খুচরা বিক্রির আউটলেট হিসাবে বস্তিকে বেছে নেয় এবং বস্তিবাসীকে এই ব্যবসায় নিয়োগ করে |
এভাবে মাদক ব্যবসা পরিচালনার জন্য একটা জটিল নেটওয়ার্ক প্রয়োজন হয় যেখানে পুলিশবাহিনিসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোক অংশ নিয়ে থাকে |
বস্তিবাসী এই শৃঙ্খলের শেষ মালা এবং এই পর্যায়ে এসে বিক্রেতা ও ভোক্তার পার্থক্য ঘুচে যায় |
বা ঘুচিয়ে দেয়া হয়, ব্যবসায়িক স্ট্র্যাটেজির অংশ হিসেবে |
এভাবে, মাদক নেটওয়ার্কে যোগদানের ফলে গরিবের আয়-রোজগারের সুরাহা হলেও চূড়ান্ত বিচারে সেইই এই ব্যবসার সবচে দুর্ভাগা শিকার |
কারণ, গোপনীয় ব্যবসা চালাতে পারিবারিক ব্যুহ দরকার পড়ে |
অর্থাৎ পরিবারের সবার অংশগ্রহণেই এই ব্যবসা চালাতে হয় তাকে |
এভাবে ক্রমে ক্রমে বিক্রেতা ও ভোক্তার পার্থক্য ঘুচে যায় অনেকেরই |
আগেই বলেছি, মাদক সিন্ডিকেটের জন্য এটা সুখবর, কারণ এতে করে তার ব্যবসা টেকসই হয় |
ফলে এই ঘুচে যাওয়া কতটা স্বতঃস্ফূর্ত আর কতটা পরিকল্পিত এটা ঠাহর করা মুশকিল |
আগেই বলেছি, এই গানটির মূল অভিপ্রায় ইন্দ্রিয়ানুভূতির খপ্পর থেকে আত্মাকে পুনরুদ্ধার করা |
কিন্তু সেটা করতে হচ্ছে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, যখন নৌকা কিংবা মাঝিমাল্লা আর তার জীবনে নতুন কোনো অর্থ উৎপাদন করে না |
পাশাপাশি, নতুন অভিজ্ঞতাগুলোকে গানে পুনরুৎপাদন করার চাপ আছে |
প্রয়োজন আছে শহরবাসীর ঢালাও অভিযোগের (বস্তি মাদকের আখড়া) |
জবাব দেয়ার |
মেটাফোরের এই যে বদল, তা থেকে কিন্তু নগর গরিবির এই বাস্তবতাটুকুকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব |
দেশান্তর ও মেটাফর: সাংস্কৃতিক যোগাযোগ |
গানের বাস্তবতাকে সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করার বিপদ কিছু আছে |
এতে মনে হতে পারে যেন একটা অন্যটার উপজাত, বা এদের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক আছে |
প্রকৃতপক্ষে, সেরকম কিছু কার্যকারণ খুঁজে বের করা এবং গানের বাস্তবতাকে সামাজিক বাস্তবতা দিয়ে ঐতিহাসিকভাবে সমর্থন করার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য জোগাড় করা মুশকিল |
ফলে, বাস্তবতা এরকম ছিল বলেই এমন গান লেখা হয়েছে, এটা বলা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয় |
এই লেখা মূলত কিছু গানের বিষয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে এমন কিছু বাস্তবতার হদিস করতে চেয়েছে, যা দিয়ে বিদ্যমান সামাজিক বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করা যায় |
গানের বাস্তবতা আর সমাজ বাস্তবতার যেখানে মেলবন্ধন হয়, তা কার্যকারণপ্রসূত হোক বা না হোক, আমাদের বিরল কিছু মুহূর্ত উপহার দেয় |
এই ডিসকার্সিভ মুহূর্তগুলোকে আমরা হোমি ভবার অনুসরণে হাইব্রিড মুহূর্ত বলে শনাক্ত করতে পারি |
হোমি ভবা (১৯৯৬) বলছেন, দুটি সাংস্কৃতিক চর্চার এরকম মিলনমুহূর্তগুলোতে এক ধরনের অন্তর্বর্তীসংস্কৃতি (- ) তৈরি হয়, যার সাথে তার উৎস ও গন্তব্য-সংস্কৃতির বিস্ময়কর মিল ও অমিল রয়েছে |
এই পাটাতনে ফেলে আমরা যদি আরবান ফোক গানকে বিবেচনা করতে যাই, তাহলে দেখবো যে এই গান কোনোভাবেই আর লোকসঙ্গীত নয়, আবার মূলধারার পপ বলেও তাকে শনাক্ত করা যায় না |
সে কিন্তু এই দুয়ের মধ্যেই আছে, তবু কেউ তার নয় |
নগরগরিবের আত্মপরিচয়ের রাজনীতিও একইরকম ব্যাকরণ অনুসরণ করে: না সে গ্রামের, না শহরের, যে জন আছে মাঝখানে! শহর তার পরিচয় নির্মাণের দায়িত্ব নিরঙ্কুশভাবে নিতে পারে না, যেহেতু প্রত্যাবর্তনের বাসনা তার অন্তরের অন্তঃস্থলে চিরকাল বিরাজ করতে থাকে |
আবার তার যত গ্রামীণ স্মৃতি ও মুহূর্ত, সেসবের পুনর্নির্মাণে শহরের অভিধান নানান গলিঘুপচি দিয়ে ঢুকে পড়ে |
যার ফলে শহরে অভিবাসনের মুহূর্তটি তার জীবনের সবচে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে দাঁড়ায় |
এটিই তার পরবর্তী জীবনের গতিধারাকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে |
বস্তিবাসীদের সাথে বিভিন্ন সময়ে আমার নিবিড় আলাপচারিতা থেকেও এমন ধারণার সপক্ষে আমি স্পষ্ট সমর্থন পেয়েছি |
যদিও অভিবাসন নগরগরিবের জীবনে নির্ণায়ক মুহূর্ত, সে বিষয়ে তারা সোজাসাপ্টাভাবে কথা বলে কম |
আমার গবেষণার অংশ হিসেবে যখনি আমি এদের জীবন-ইতিহাস সমীক্ষা করতে গেছি, দেখেছি জীবনকে এরা স্পষ্টভাবে দুইভাগে ভাগ করে: অভিবাসন-পূর্ব এবং অভিবাসনোত্তর |
তবে তারা গল্পটা শুরু করে শহরে পা দেয়ার মুহূর্ত থেকে |
কিন্তু যখনি আমি তাদের অভিবাসন-পূর্ব জীবনের খোঁজ করতে যাই, তখন থেকেই তাদের গোটা আলাপটা দুই পর্বে বিভক্ত হয়ে যায় |
এই বিভাগ কখনো কখনো রীতিমত জ্ঞানতাত্ত্বিক, এই অর্থে যে, তারা তাদের অভিবাসন-পূর্ব জীবনকে বিবৃত করতে গিয়ে প্রায়শই পরিভাষা হাতড়াতে থাকে, এবং খুঁজে খুঁজে শহরসংশ্লিষ্ট শব্দাবলী দিয়ে বর্ণনা করতে চায় তাদের ফেলে আসা গ্রামীণ জীবনের |
হঠাৎ করে দেখলে মনে হবে যেন তারা শহুরে গবেষকের কাছে বোধগম্য করে গ্রামীণ জীবনকে বর্ণনা করতে গিয়ে এমনটা করছে |
কিন্তু এই খোঁজ আশলে তার নিজের জন্যই |
বর্তমানের শাহরিক অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে অভিবাসন-পূর্ব স্মৃতিগুলোকে যাচাই করার প্রক্রিয়া এটি, ঘটনাচক্রে কোনো শহুরে গবেষকের সামনে ঘটছে মাত্র |
আরবান ফোক গানে রূপকের যে পুনর্বিন্যাস, তাকেও এই যাচাই প্রক্রিয়ার অংশ ভাবার ন্যায্য কারণ আছে |
গানকে যেমন এরা কর্মময় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ভাববার রেওয়াজ লোকগানের ঐতিহ্য থেকে পেয়েছে, তেমনি আবার অতীতের খোড়লে ঢুকে লোকগানের রামরাজ্যে অবিচ্ছিন্নভাবে বিরাজ করবার বিলাসিতাও নগরগরিবকে মানায় না |
ফলে এই সংকরদশা, যা দিয়ে তারা তাদের দুই জীবনকেই (অভিবাসন-পূর্ব এবং অভিবাসনোত্তর) একইসঙ্গে স্বীকার ও অস্বীকার করতে পারে |
এই কৌশল একইসঙ্গে আবার প্রতিরোধীও |
গণসঙ্গীতের মত বিপ্লবী খোয়াব আরবান ফোকে নেই, সরাসরি প্রতিবাদও বিরল জিনিস এই ঘরানার গানে |
কিন্তু রূপকের ভেতর কসমেটিক সার্জারি করার মাধ্যমে এই গান এক ধরনের প্রতিরোধী অবস্থা জারি রাখতে চায় |
লক্ষণীয় যে, যেসব রূপকগুলোতে এই সার্জারি চলেছে সেগুলো সুপরিচিত |
এরকম প্রতিষ্ঠিত রূপককে যখন এই গান ভিন্নভাবে পরিবেশন করে, তখন তা শিক্ষিত শ্রোতার গানশোনার অভ্যাসের মধ্যে এক ধরনের অস্বাচ্ছন্দ্য তৈরি করে |
একই সঙ্গে চেনা ও অচেনা লাগে এই গানকে |
ফলে, মূলধারার এত নৈকট্যে থাকার পরেও এই গানের চর্চা, হোমি ভবার ভাষায়, একটা 'আংশিক সংস্কৃতি' হয়ে বিরাজ করে; জাতীয় সংস্কৃতির হেজিমনিক বাতাবরণে বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্যকে লুকিয়ে থাকতে দেয় না |
লেখক-পরিচিতি: |
সুমন রহমান |
কবি, গল্পকার |
জন্ম ৩০ মার্চ ১৯৭০, ভৈরব |
ফিলসফি ও ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ-এ স্নাতকোত্তর, যথাক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে |
ডক্টোরাল গবেষণা করছেন সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল কালচারাল স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ায় |
বিষয়: পপুলার মিউজিক |
টীকা ও তথ্যসূত্র |
১ মাকসুদ, ব্যক্তিগত কথোপকথন |
২ রহমান (২০১১) |
3 2006: 172 |
4 1990: 39 |
5 1990, 357-63 |
6 1981: 324 |
7 1970: 194 |
8 1996: 156 |
9 ://..//-.?=145472 |
১০ ২০১০ সালের অস্কার পাওয়া ভারতীয় মুভি ' ̄স্লামডগ মিলিওনিয়র' এ এরকম একটি উপকাহিনির সন্ধান পাওয়া যায় |
তার আগে, বাংলা |
ভাষার গল্প উপন্যাসেও এর হদিস মেলে |
১৯৭০ সালে প্রথম প্রকাশিত মাহমুদুল হকের গল্প 'সপুরা ও পরাগল' এর কাহিনিটি মূলত এরকম |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.