content stringlengths 0 129k |
|---|
যৌবনে কানার চোখে স্বপ্ন করে ভিড় |
এই যৌবনে বোঁ বোঁ করে বোবায়ও প্রেমের গান ধরে |
হইয়া লাইলির ক্যান্ডিডেট |
যৌবনে গুজায়ও নাকি চিৎ হইয়া ঘুমায় |
যৌবনে এক কাউয়ায় আরেক কাউয়ারে চুমায় |
কোরবানির ঐ গরু-খাসি যৌবনে পায় মূল্য বেশি |
যৌবনে দামি গবেট |
যৌবনে লুলায়ও নাকি লাত্থি মারতে চায় |
যৌবনে ফুটবল খেলে একপায়ে ল্যাংড়ায় |
যৌবনে শাহ আলম সরকার বাঁধিয়াছে রঙের সংসার |
ভালবেসে রেডিমেড |
(সরকার ১৯৯৯) |
এই গানে সিগারেটের ধোঁয়া যৌবনের অস্থায়িত্ব পুনর্ব্যক্ত করে, আর 'গোল্ডলিফ' ব্রান্ড তার শহরমুখীনতা প্রতিপন্ন করে |
এর আগে, যৌবন যখন 'কচুপাতার পানি' ছিল, সেই তারল্য দিয়ে নাগরিক যৌবনকে পুরোপুরি ব্যক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না |
এই গান যাদের চরিত্র আকারে উপস্থাপন করছে, সেইসব শারীরিকভাবে অসক্ষম মানুষের যৌবনকে নেহাত তারল্যের রূপক দিয়ে আটকানো যাচ্ছে না যেন, এটা রীতিমত উদ্বায়ী, ধোঁয়া হয়ে রাতারাতি উবে যাওয়ার জিনিস |
বিষয়টাকে খোলাসা করা যাক |
সমাজতাত্ত্বিক বিবেচনায়, বাংলাদেশের শহর প্রেক্ষাপটে দারিদ্র, শারীরিক অসামর্থ ও ভিক্ষাবৃত্তির মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে |
প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের তরফে বলার মত কোনো সাহায্য নাই, যা দিয়ে সে তার জীবন নির্বাহ করতে পারে |
নাই কোনো পুনর্বাসন পরিকল্পনাও |
কিছু কিছু এনজিও এই সেক্টরে কাজ করে, কিন্তু চাহিদার তুলনায় সেটা সিন্ধুতে বিন্দু যোগ করার মতই |
এক সমীক্ষায় দেখা গেছে প্রতিবন্ধীদের প্রায় ২৬ শতাংশকে তাদের পরিবার জোর করে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামায় |
৯ মুষ্টিভিক্ষা বাউলদেরও চর্চার মধ্যে ছিল, কিন্তু বর্তমানের যে ভিক্ষা, তার মতাদর্শিক কোনো ভিত্তি নাই |
এটা নিছক দারিদ্রপ্রসূত, শাহরিক এবং বাণিজ্যিক |
ঢাকা শহরের ভিক্ষুকদের দিকে তাকালেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে উঠে |
বাণিজ্যিক এজন্য যে, যে যত বেশি প্রতিবন্ধী, তার রোজগার তত বেশি |
সঙ্গত কারণেই এর দুর্বৃত্তায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণ হতে বাধ্য |
ঢাকা শহরের ভিক্ষাবৃত্তির একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বহুদিন হল মুষ্টিমেয় কিছু চক্র দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে |
ফলে ভিক্ষা, অনেক ক্ষেত্রেই, এখন চাকরিবিশেষ |
দৈনিক বা সাপ্তাহিক নির্দিষ্ট বেতনের বিনিময়ে প্রতিবন্ধীরা ঐ চক্রের দ্বারা শহরের লোভনীয় লোকেশনগুলোতে নিয়োগপ্রাপ্ত হন |
আর দেড় কোটি মানুষের মেগাসিটিতে লোভনীয় লোকেশনের সংখ্যা নেহাত কম নয় |
ফলে শহরে প্রতিবন্ধী ভিক্ষুকদের চাহিদাও প্রচুর |
যোগান সবসময় চাহিদার সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যদি পাল্লা নাও দিতে সক্ষম হয়, সমস্যা নাই |
যেকোন গরিবকে ধরে নিয়ে কৃত্রিম উপায়ে হাত-পা কেটে বা চোখ উপড়ে প্রতিবন্ধী বানিয়ে দেয়ার চর্চাও রয়েছে ঐ দুর্বৃত্তচক্রের |
দক্ষিণ এশিয়ার অনেক গল্প-উপন্যাস-চলচ্চিত্রে এই বাস্তবতার সন্ধান মেলে |
সেদিক থেকে বিচার করলে, এই গানটি মূলত প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর শহরায়নের অভিজ্ঞতাকে আশ্রয় করেছে |
এটা করতে গিয়ে 'যৌবন' নামক ধারণাটিকে সিগনিফাই করার জন্য অত্যন্ত বিরল একটি সিগনিফায়ার উপস্থাপন করেছে |
তারুণ্য বা যৌবনের গতিময়তাকে দাগিয়ে দিতে গিয়ে এই গান প্রতিবন্ধী দশাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যাতে তুলনার বোধ থেকে আমরা যৌবনের গতিময়তার আস্বাদটুকু পাই |
এই বিশ্লেষণটিকে যদি আমরা নগরগরিবির প্রেক্ষিতে বিবেচনা করি, তাহলে এই গান যেমন যৌবনের সেলিব্রেশন, আবার তা একইসঙ্গে যৌবনের প্রত্যাখ্যানও |
যৌবনের ক্ষণস্থায়িত্বকে সিগনিফাই করার জন্য এখানে এমন একটি কুশলী সিগনিফায়ার (সিগারেটের ধোঁয়া) ব্যবহার করা হয়েছে, যা গরিবের যৌবন বিবেচনায় নতুন মাত্রা আনে |
যৌবন এমন একটি সমৃদ্ধির ইনডিকেটর, যা আমরা প্রায়শই গরিবের ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে প্রস্তুত থাকি না |
তার ওপর, সেই গরিব যদি হয় প্রতিবন্ধী, তাহলে সেখানে যৌবনের ধারণাটি রীতিমত অ্যাবসার্ড পর্যায়ে পৌঁছায় |
সেরকম একটি বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে যৌবনের সেলিব্রেশন শুধু আরবান ফোক গানে নয়, বরং সব ধরনের গানের বিবেচনায় একটি বিরল নান্দনিক অর্জন |
এর তুলনা বাংলা গানে খুঁজে পাওয়া মুশকিল |
'প্রেম একটা ক্রিকেট ম্যাচ' |
এই ডুয়েট গানটি নারীপুরুষের প্রেমমূলক যোগাযোগ নিয়ে, একইসঙ্গে তা ক্রিকেট নিয়েও |
এখানে নারীকণ্ঠ ও পুরুষকণ্ঠ পরস্পরকে পরস্পরের প্রেমে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে, কিন্তু সেজন্য তারা ব্যবহার করে ক্রিকেটীয় পরিভাষা |
নারীর ভূমিকা এখানে বোলারের, আর পুরুষ হল ব্যাটসম্যান |
পুরুষটি বলে যে, সে যদি এই নারীর 'মন চুরি' করতে সমর্থ হয়, তবে তাতে তার 'ভালবাসার সেঞ্চুরি' পূর্ণ হবে |
নারীটিই বা পিছিয়ে রইবে কেন? সে পাল্টা জবাবে বলে যে, তার দিক থেকে সেটা হবে প্রেমের 'ডাবল সেঞ্চুরি' |
পুরুষটি জানায় সে 'একদিনের ক্রিকেটে' অর্থাৎ স্বল্পকালীন প্রেমে আগ্রহী, অন্যদিকে নারীর পছন্দ 'টেস্ট' অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী অ্যাফেয়ার |
পুরুষ তখন তাকে প্রলুব্ধ করতে চায় এই বলে যে, একদিনের ম্যাচ খেলে খেলেই টেস্টেও যোগ্যতা অর্জন করতে হবে |
নারী তখন বলে যে, এ ধরনের 'টাউট ব্যাটসম্যান' সে অনেক দেখেছে এবং তাদেরও উইকেট নিতে তার অতীতে কোনো সমস্যাই হয়নি |
পুরুষ বলে, সে বলে বলে বাউন্ডারি মারতে সক্ষম |
নারী তাকে বরং উইকেটে মনোযোগী হতে পরামর্শ দেয় |
পুরুষ বলে যে, সে নো-বল পেলে ছক্কা মারতে মোটেও ভুল করে না |
নারী জানিয়ে দেয় যে, সে ওয়াইড বা নো-বল করেই না |
এভাবে এগোতে এগোতে এই গানটি শেষ হয় এমন এক জায়গায় যেখানে এই প্রতিদ্বন্দ্বী নারী ও পুরুষ প্রেম জিনিসটাকে একটা সমবায়ী প্রক্রিয়া হিসেবে মেনে নেয় |
(মমতাজ ও সহশিল্পী, প্রকাশসাল অজ্ঞাত) |
প্রথমত, এই গানটি কবিগানগোত্রীয়, যেখানে দুইজন শিল্পী তাদের যন্ত্রীদলসহ মঞ্চে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে হাজির হয় এবং দর্শন, খোদা, ইচ্ছার স্বাধীনতা, নৈতিকতা ইত্যাদি গুরুভার দার্শনিক তত্ত্ব নিয়ে গানে গানে বাহাস করে |
এখানেও সেটা করা হয়েছে, কিন্তু বিষয় মোটেও গুরুভার নয় |
প্রেমের খেলা জিনিসটা অতীতে নানাভাবে সিগনিফায়েড হয়েছে, কিন্তু ক্রিকেটীয় পরিভাষায় এবারই প্রথম |
গানের সুরটাও নেয়া হয়েছে একটা পুরনো বাংলা গানের সুর থেকে |
এখন কথা হচ্ছে, নারী পুরুষের এই প্রেম প্রেম খেলায় ক্রিকেটীয় পরিভাষা ব্যবহারের সাংস্কৃতিক রাজনীতি কী? |
ক্রিকেট নিয়ে আপ্পাদুরাই (১৯৯৬) এর বিশ্লেষণটি আমাদের এক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে |
তিনি বলছেন, বৃটিশ-শাসিত ভারতে ক্রিকেট ছিল শাদা প্রভুদের সামাজিকীকরনের হাতিয়ার |
আদতে এই জিনিসটাই একসময় ভারতীয় জাতীয়তাবোধের স্মারক হয়ে দাঁড়ায় |
ক্রিকেটের লোকায়তকরণ হয় নানাভাবে: ভারতীয় ভাষায় ধারাবর্ণনা, বেসরকারি খাতের বিজ্ঞাপন এবং দর্শকের মনোযোগ ঘনীভূত রাখার যাবতীয় কৌশলগুলো একজোট হয়েই এক সময় ক্রিকেটকে একটা জাতীয়তাবাদী আদলে নিয়ে আসে |
১১ বিভিন্ন শ্রেণীতে ও বয়েসে ক্রিকেটের গ্রহণযোগ্যতা কী ধরনের অর্থ উৎপাদন করেছে তা নিয়ে আপ্পাদুরাইয়ের বক্তব্য নিম্নরূপ: |
১. উচ্চমধ্যবিত্তের কাছে ক্রিকেট হল তারকা উৎপাদন এবং উপভোগের ক্ষেত্রবিশেষ, সেইসাথে জাতীয়তাবোধেরও জায়গা, তবে সবই তাদের লিভিংরুমের টেলিভিশন স্ক্রীণের সাপেক্ষে |
২. শ্রমিক শ্রেণী ও নিম্নবর্গের তারুণ্যের কাছে ক্রিকেট হল দল গঠন ও দলভূক্তির হাতিয়ার; বিপুল আনন্দ ও সম্ভাব্য সহিংসতা এর উপজাত |
৩. গ্রামীণ দর্শকের কাছে ক্রিকেট হল তারকাদের জীবনে, জাতির নিয়তিতে এবং শহরের সামর্থে সামান্যতম হস্তক্ষেপ করার উছিলাবিশেষ |
দক্ষিণ এশিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ক্রিকেটের এই লোকায়তকরণ শুরু হয়েছে ভারতের থেকে কম করে হলেও এক দশক দেরিতে |
আদিতে এটা ছিল শহরবাসীর খেলা, ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে গ্রামান্তরে |
শহরাগত তারুণ্যের কাছে ক্রিকেট শুধুই দলগঠনের হাতিয়ার নয়, বরং তা এমন কৌশল যা গ্রামাগত তরুণের চারপাশে একটা পরিচিতির বাতাবরণ তৈরি করে, তার পরিচয়পত্র হিসাবে কাজ করে |
এমন একটা শাহরিক খেলার পরিভাষায় দখল প্রদর্শন করার মাধ্যমে গরিব তার শাহরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও যোগ্যতা ব্যক্ত করতে সমর্থ হয় |
অন্যান্য গানের মত এই গানেরও রূপকায়ন প্রক্রিয়া দুইস্তরবিশিষ্ট |
প্রথমত, এই গান প্রেমকে একটা হালকা ও চিরস্থায়ী নয় এমন একটা ডিসকোর্স হিসেবে দাঁড় করায় |
এর ফলে লোকগানে প্রেমের যে সিরিয়াস ও পাথরে-খোদাই ডিসকোর্স - তা থেকে নগরগরিবের প্রস্থান নিশ্চিত হয় |
দ্বিতীয়ত, এই গান আরো বলে যে, প্রেম একটা নাগরিক খেলা তার পরিষ্কার বিধিবিধান আছে |
এই 'ভিন্ন' প্রেমকে শহরে উদযাপন করতে গেলে তার পরিভাষায় অভ্যস্ত হতে হবে, সে কারণে ক্রিকেটের বিধিবিধান ও তার সৃজনশীল ভাষ্য এই গানে সিগনিফায়ার হয়ে এসেছে |
মদের দোকানদার ও খরিদদার |
পরিবারপ্রথা ও সামাজিক বিধিনিষেধের বেড়াজালে ব্যক্তির মুক্তি সুদূরপরাহত হয়ে ওঠে, বাউল সমাজে এটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা |
ফলে, সংসার কিংবা পরিবারের কারাগার থেকে মুক্তি বাউলচর্চার আরাধ্য জিনিস |
সংসারজীবনকে সে কল্পনা করে এসেছে এমন এক নৌকা হিসাবে যার ছয়জন মাঝিমাল্লা |
এই ছয় মাঝিমাল্লা ছয় ইন্দ্রিয়ের রূপক |
তারা ছয় দিক থেকে ছয়রকম অজুহাতে ব্যক্তিকে বেঁধে রাখে সংসারের ফাঁদে, ফলে তার আত্মার মুক্তি আর হয় না |
আবদুল আলীমের বিখ্যাত গানে: |
"একে আমার ভাঙা তরী |
মাল্লা ছয়জন সল্লা করি' |
আমার নায়ে দিল কুড়াল মারি" |
এই জনপ্রিয় রূপকটি দেশান্তরী গরিবের নগরজীবনে বদলে যায় |
ছয় মাঝিমাল্লার অন্য চেহারা আমরা দেখি মাতাল রাজ্জাকের |
"যত মাতাল বৈতাল চিরকাল করে ওরা আমার ওপর অত্যাচার |
মদ বেচা দোকানের চাকরি চাই না আর |
আমার ঘরে স্ত্রী কালবাঘিনী রাত্রভরা হিরোয়িন খায় |
তাতে কিছু কম পড়িলে বারে বারে চোখ রাঙ্গায় |
যদি কই আবগারি মাল অমনি মারে ভাল |
আমি হই কত নাজেহাল সামান্য এক দোকানদার |
আমার কপাল দোষে ছেলে হাসে বাংলা খায় বেশি বেশি |
তারে উচিত কিছু কইতে গেলে মারতে আসে কিলঘুষি |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.