content stringlengths 0 129k |
|---|
খেলাম তাদের রেস্টহাউসে |
বাবুর্চিটার রান্নার হাত ছিলো দারুণ! রূপচাঁদার তরকারীটা পেয়াজ দিয়ে ঘন করে রান্না করা হয়েছিলো |
আমি পেল্লায় সাইজের দু'টো মাছ খেয়ে ফেললাম |
ঝাল ঝাল লইট্টা মাছের ভাজা টুকরাগুলোও জমজমাট হয়েছিলো |
সেগুলো মুখে পুরে দিতেই রন্ধ্রে রন্ধ্রে সামুদ্রিক ঝাল ছড়িয়ে গলে যাচ্ছিলো |
চোখ বন্ধ করে অনুভব করার মতো স্বাদ সে খাবারের |
পাহাড়ে ঘুরাঘুরির জন্যই সম্ভবত সেদিন খিদেটা চেপেছিলোও ভীষণ |
পাকস্থলীকে যতটা টাইট করে ফোলানো যায়, ফুলিয়ে নিলাম |
নিয়ে গাড়িতে উঠে চোখ বন্ধ করে দিয়ে ফেললাম ১০ মিনিটের একটা 'কুইকি' |
সোজা বাংলায় ভাতঘুম |
১০ মিনিটের মাথায় লামা শহরে পৌঁছে যাওয়ায় ঘুমটাকে টেনে লম্বা করা গেল না |
তাতে অবশ্য আমার কোনো আক্ষেপ ছিলো না |
একটা টং দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে সবাই মিলে হইচই করে চা খেলাম |
সেদিন হাটের দিন ছিলো |
মার্মা মেয়েরা ওদের হাতে বোনা ঝুড়ি নিয়ে এসে রাস্তার দুই ধারে বসেছিলো |
মুফতে ওদের তাঁতে বোনা থামি, ওড়না, বাঁশের চাটাইএর পাপোশ- এরকম আরো অনেক স্থানীয় সামগ্রীর প্রদর্শনী ঘুরে ঘুরে দেখার সুযোগ হয়ে গেল |
তারপর আবার পথচলা |
শহর ছাড়িয়ে মাতামুহুরী নদী পেরিয়ে আমরা এগোতে থাকলাম মিয়ানমার সীমান্তের দিকে |
গন্তব্য 'বোমের মুখ' নামের একটা গ্রাম |
আমার মাতামুহুরী নদীটাকে ভালো লেগে গেল |
নদীর দুই পাশে সমুদ্র সৈকতের মতো বিস্তৃত বালুচর |
আমরা যে ব্রীজটার ওপর দিয়ে পার হলাম, সেখান থেকে দু'দিকেই অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায় |
নদীতীরের বালুচরে জেলেরা জাল শুকোতে দিয়েছে |
দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে বালুর রংই বুঝি অমন কালো |
কিন্তু পরে বুঝলাম বালুতে কালো রংএর জাল ফেলে রাখায় চোখ দু'টো ধোঁকা খেয়েছে |
নদীর পাড়ে বাশ পুঁতে বেঁধে রাখা হয়েছে ডিঙিনৌকা |
আমি ছবি-টবি আঁকতে পারি না তেমন |
আঁকতে বসলে আমার হাত দিয়ে একটি ছবিই বেরোয় শুধু |
সেটাতে দিগন্ত থেকে নেমে আসে একটা নদী |
শেষ হয় কাগজের শেষ প্রান্তে গিয়ে |
সেই নদীর দুই পাশে কিছু থাকে না |
কেবল, কোনো এক বাঁকের মুখে একটা লম্বা করে পুঁতে রাখা বাঁশ আর তার সঙ্গে বেঁধে রাখা একটা ডিঙিনৌকা ছাড়া |
মাতামুহুরী পেরোনোর সময় আমার কল্পনার সেই ছবিটাকে হঠাৎ জীবন্ত চোখের সামনে ফুটে উঠতে দেখে শরীরে শিহরণ জাগলো |
বাসের ভেতরে হই-চইরত পরিষদবর্গ সেটা টের পায় নি |
বোমের মুখে কিছু চাষী আমাদের জানালো তাদের স্বপ্নের কথা |
স্বপ্নজয়ের কথা |
কিভাবে দুর্গম পাহাড়ে বসতি স্থাপন করে আজ তারা স্বচ্ছল জীবনের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে- সেসবের বৃত্তান্ত |
আমি একটু তফাতে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, বিস্তীর্ণ পাহাড় কেটে বের করা হয়েছে আবাদী জমি |
মানুষ প্রকৃতিকে সবসময় নিজের মতো ব্যবহার করেছে |
প্রকৃতিও মা হয়ে সন্তানদের জন্য বিলিয়ে দিয়েছে নিজের সবকিছু |
অথচ আমরা কয়জন তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে পেরেছি? অন্যদের কথা বাদ দিই |
আমি নিজেই বা কতটুকু পেরেছি, প্রকৃতির প্রতি আমি কতখানি কৃতজ্ঞ তা বোঝাতে? মাঝে মাঝে মনে হয়, নিজের মা'কেও তো জানাতে পারি নি তাকে কতটা ভালবাসি; সারা পৃথিবীর মা'কে কিভাবে জানাবো? নিজের সীমিত ক্ষমতা আবারো আমাকে পীড়িত করে তোলে |
ঠিক সেই সময় পাশে এসে ফস করে একটা বেনসন লাইট ধরালেন খান ভাই |
আমার দিকে ছুঁড়ে দিলেন একটা তীর্যক মন্তব্য, 'এতক্ষণ এমন একটা জায়গায় দাঁড়ায় আছেন আর একটাও বিড়ি জ্বালান নাই? হে ভগবান |
হাউ আনরোম্যান্টিক!' |
গ্রাম পরিদর্শন শেষে আবারো সেই সকালের রাস্তাগুলো ধরে ধরে ফিরে আসা |
আবারো নিবিড় প্রকৃতির কোলের ভেতর ঢুকে যাওয়া |
আশ্রয় নেয়া চিরশান্তির পরশবলয়ে |
তবে খুব বেশি সময়ের জন্য না |
যাওয়ার সময় একবেলা আর আসার সময় একবেলা- সেই দফায় সাকুল্যে আমার প্রকৃতির কোলে আশ্রয় নেয়া হয়েছিলো মাত্র এই দুই বেলা |
কক্সবাজার শহরে ফিরে আসতে আসতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলো |
লম্বা-সৈকতের আরামদায়ক বিছানা দেহ-মনকে টানছিলো খুব করে |
কিন্তু খান ভাই ফরমান জারি করলেন, দ্রুত কাপড়-চোপড় ছেড়ে একটু হালকা হয়েই বের হয়ে আসার |
বিছানায় গা এলিয়ে না দেয়ার |
কেন সেটা খুলে বললেন না |
চটজলদি হালকা হয়ে বেরিয়ে এসে দেখি খান-আলী দুই ভাই ছাড়া দলের অন্যরা কেউ আশপাশে নেই |
তারা গেছেন শুঁটকি কিনতে |
অগত্যা কি আর করা! তিনজনে হোটেলের লবিতে বসে বসে মেয়ে দেখতে থাকলাম |
সুন্দরী মেয়েদের আনাগোনা আমাদের মুগ্ধ করছিলো |
ফাইভ স্টার হোটেল বলে কথা |
সুন্দরী মেয়ে তো এ ধরনের হোটেলের একটা জরুরি অনুষঙ্গ |
আমি আর খান ভাই একটা মেয়েকে বেশ ক্ষাণিকক্ষণ চোখে চোখে রেখেছিলাম |
পরে দেখলাম হোটেলের এক বিদেশি বোর্ডার তাকে টুপ করে পটিয়ে ধুমধাড়াক্কা আওয়াজ সম্বলিত ডিসকো সেন্টারের দিকে নিয়ে গেলো |
'ধুর ভেতো বাঙালির আসলে কোনো কালেই কিছু হবে না'- এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে আমরা দু'জন মেয়ে দেখা বাদ দিলাম |
অতিশয় সজ্জন আলী ভাই তখন লবি'র টেবিলে রাখা কোনো এক বিদেশি ম্যাগাজিন কোলে তুলে নিয়ে সেটার পাতায় ডুবে আছেন |
আমাদের কীর্তি-কলাপের দিকে মনোযোগ নেই তার |
অপেক্ষার প্রলম্বিত প্রহর পার হলো শুঁটকি খাতকেরা ফিরে এলে |
আমরা সবাই মিলে শহরের একমাত্র নিবন্ধিত বিদেশী পানীয়ের দোকানটিতে গেলাম |
এটা স্থানীয় একটি বড় হোটেলের মধ্যেই অবস্থিত |
দেখা গেল আমি আর খান ভাই ছাড়া আরেকজন আছেন যিনি কড়া পানীয় পানে আগ্রহী |
অন্যরা মুখে কুলুপ এঁটেছেন |
আমরা তিনজনে বাকীদের প্রচুর জবরদস্তি করলাম |
কিন্তু খুব বেশি লাভ হলো না |
তারা কেবলই খানিকটা করে ভাল্লুক পান করলেন |
আমরা নিজেদের প্রসিদ্ধ ইওরোপীয়ান হুইস্কির পেগগুলো শেষ করে তাদের অবশিষ্টাংশগুলোও নষ্ট করা উচিত হবে না মনে করে, সেগুলো গলধঃকরণ করে ফেললাম |
এই পানাহার যজ্ঞের নেতৃত্বেও ছিলেন যথারীতি ম্যান অন ফায়ার-ওয়ান'ন ওনলি খান ভাই |
আমরা পান শেষে পউষী নামের এক ভাতের হোটেলে গিয়ে হামলা চালালাম |
সেখানে মেন্যু ছিলো অজস্র রকমে সামুদ্রিক মাছ, শুঁটকি, ঝাল ঝাল সালাদ এবং আরো অনেক কিছু |
আমরা কে যে কত পরিমাণে খেলাম তার কোনো ইয়ত্তা ছিলো না |
আমি অবশ্য ভাত খেলাম না |
কেন যেন পান করার পর ভাত খেতে ইচ্ছে করে না |
তারপরে গেলাম সমুদ্র সৈকতে |
আটচল্লিশ ঘন্টার টানা দৌঁড়-ঝাপ সেরে আমরা তখন কেবল একটু নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পেয়েছি |
আগের দিন রাতেও বার্মিজ মার্কেট থেকে ফিরে বসেছিলাম তিন তাসের জুয়ায় |
সারারাত তাস পিটিয়ে ভোরে বিছানায় গিয়ে শোয়ার পর, যেই না ঝিমুনিটা একটু ভালোমতো ধরেছে; অমনি সারারাত দান মেরে যাওয়া খান ভাই সবাইকে টেনে টেনে মাইক্রোতে পুরেছিলেন, পাহাড়ে যাবেন বলে |
তার বোধহয় পাঁচ অংকের লাভ হয়ে গিয়েছিলো ওই এক রাতের জুয়াতেই |
সৈকতে ফেলে রাখা ছাউনিগুলোতে শরীর এলিয়ে দিয়ে নিজেকে খানিকটা পরিশ্রান্ত মনে হচ্ছিলো |
আমরা তখন শুরু করলাম সবাই মিলে হেঁড়ে গলায় গান গেয়ে যাওয়া |
আর সঙ্গে ছিলো অফুরন্ত সিগারেট |
একের পর এক ধরাচ্ছিলাম |
বার থেকে বের হয়ে আসার আগে কেনা স্কচের বোতলটা হাতে হাতে ঘুরছিলো |
যারা বারে বসে এ জিনিস মুখে তোলেন নি, তারাও দেখলাম লাজুক লাজুকভাবে দু'এক চুমুক দিচ্ছিলেন |
প্রথম দিকে বোধহয় জন ডেনভার, কনওয়ে টুইটি, হুটার, ব্রায়ান অ্যাডামস্ ইত্যাদির কলি আওড়ানো হচ্ছিলো |
শেষে দেখা গেলো তাতে সবার কমন পড়ে না |
বরং সুমন-অঞ্জন-নচিকেতা শুরু হওয়ায় সবাই প্রাণখুলে গাইতে শুরু করলো ভুল সুরে ভুল কথায় নানা জাতের গান |
রুনা লায়লা, আলমগীর, কনকচাঁপাদের গানও খুব গাইলাম |
কেউ কেউ নিজের স্টক থেকে স্পেশাল গান শোনালো |
খান ভাই গোটা দুই শ্লীলতা পরিপন্থী আঞ্চলিক গান পরিবেশন করে যখন পুরো এলাকাটাকে গরম করে তুললেন, তখন রাত বেজেছে আড়াইটা |
আস্তে আস্তে কমে আসতে থাকলো প্রত্যেকের গলার জোর |
হাঁটি হাঁটি পা পা করে কেউ কেউ এগিয়ে গেলেন হোটেলের পথে |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.