content
stringlengths
0
129k
তুমি সুপারিশ করলে কাজ হবে
একজন মাযলূম বা নির্যাতিত ব্যক্তি তোমার কথায় রেহাই পাবে কিংবা তুমি কোন যুলুম রোধ করতে সক্ষম- এ জাতীয় কথায় কখনো বিভ্রান্ত হয়ো না
এসবই ইবলীসী ধোঁকা
জ্ঞানপাপীরা এগুলোকে তাদের উন্নতির সিঁড়ি বানায়
তোমার পক্ষে যদি মাসআলা ও ফৎওয়া জিজ্ঞাসার উত্তর না দিয়ে থাকা সম্ভব হয়, তাহ'লে তুমি সেটাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে কর
মুফতী আলেমদের সঙ্গে এ বিষয়ে প্রতিযোগিতা করতে যেয়ো না
আমার কথা মত কাজ হোক, আমার কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ুক, আমার কথা শোনা হোক- ইত্যাকার বাসনাকে মনে প্রশ্রয় দেওয়া থেকে খুব সাবধান থেকো
এমনটা যাদের ইচ্ছে, তাদের ইচ্ছের ব্যত্যয় ঘটলে তারা আর সুস্থির থাকে না
আর রাষ্ট্রক্ষমতা প্রীতি থেকে তুমি অবশ্যই দূরে থেকো
কেননা সোনা-রূপা থেকেও লোকদের নিকট রাষ্ট্রক্ষমতার মোহ অনেক বেশী প্রিয়
এ এক অদৃশ্যমান দরজা
শিক্ষিত অভিজ্ঞজনদের ছাড়া কেউ তা দেখতে পায় না
সুতরাং অন্তর দিয়ে সত্যকে তালাশ কর এবং নিয়ত বেঁধে কাজ কর
জেনে রাখ মানুষের সামনে অবস্থা এমন ঘনিয়ে আসছে যে, তাতে সে মরণ বরণ করতে চাইবে
সালাম জানিয়ে এখানেই শেষ করছি'
ওহাব বিন মুনাবিবহ বলেছেন, ধন-সম্পদ মজুদ করা এবং শাসকের সাথে উঠা-বসা মানুষের কোন পুণ্য অবশিষ্ট রাখে না
যেমন করে একটা ছাগলের খোয়াড়ে দু'টা ক্ষুধার্ত হিংস্র নেকড়েকে ছেড়ে দিলে তারা একটা ছাগলও আস্ত রাখে না
রাতারাতিই সব সাবাড় করে দেয়
আবু হাযেম (রহঃ) বলেছেন, এক সময় আলেমরা শাসকদের থেকে পালিয়ে থাকত, আর তারা তাদের খুঁজে নিত
কিন্তু বর্তমানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আলেমরা শাসকদের দরজায় ধর্ণা দিয়ে পড়ে থাকে আর শাসকরা তাদের দেখা দিতে চায় না
১২. খ্যাতির মোহ:
ইবনু রজব বলেছেন, বিদ্যা ও কর্মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল/লাভের চেষ্টা একটি অনভিপ্রেত বিষয়
ব্যক্তির বিদ্যাবুদ্ধি, সাধনা ও দ্বীন-ধার্মিকতা চর্চার মাধ্যমে প্রসিদ্ধি লাভের মোহ খুবই গর্হিত বিষয়
অনুরূপভাবে লোকেরা দো'আ, বরকত লাভের আশায় কিংবা হাতে চুমু খাওয়ার উদ্দেশ্যে দলে দলে তার সাক্ষাতপ্রার্থী হবে বলে সেই লক্ষ্যে কাজ করা, কথা-বার্তা বলা এবং কারামত যাহির করাও গর্হিত কাজ
কিন্তু খ্যাতির মোহে অন্ধজন এসব গর্হিত ও অবাঞ্ছিত কাজ করতে ভালবাসে
নিষ্ঠার সাথে এগুলো করে এবং এসবের উপকরণ যোগাতে চেষ্টা করে
এতেই তার যত আনন্দ
এ কারণেই সালাফে ছালেহীন (পূর্বসূরি সৎকর্মশীল বান্দাগণ) খ্যাতিকে ভীষণভাবে অপসন্দ করতেন
তাঁদের মাঝে রয়েছেন আইয়ূব সাখতিয়ানী, ইবরাহীম নাখঈ, সুফিয়ান ছাওরী, আহমাদ বিন হাম্বল প্রমুখ আল্লাহওয়ালা আলেম এবং ফুযাইল বিন আইয়ায, দাঊদ তাঈ প্রমুখ সাধক ও দরবেশ
তাঁরা খুব করে আত্মনিন্দা করতেন এবং নিজেদের আমল সমূহকে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে রাখতেন
১৩. জনতার মুখ থেকে প্রশংসা ও সুখ্যাতি শোনার বাসনা :
ইবনু রজব বলেছেন, ক্ষমতাবান ও প্রতিপত্তিশালীরা মানুষের মুখ থেকে প্রশংসা ও সুখ্যাতি শুনতে ভালবাসে
তারা জনগণের কাছে তা দাবীও করে
যারা তাদের প্রশংসা করে না তাদেরকে তারা নানাভাবে কষ্ট দেয়
অনেক সময় তারা একাজে এতটাই বাড়াবাড়ি করে বসে যে প্রশংসা থেকে নিন্দাই তাদের বেশী পাওনা হয়ে দাঁড়ায়
আবার কোন কোন সময় তারা তাদের দৃষ্টিতে ভাল কাজ করছে বলে যাহির করে
কিন্তু ভিতরে ভিতরে তাদের মন্দ অভিপ্রায় কাজ করে
এভাবে মিথ্যাকে সত্যের আবরণে আচ্ছাদিত করতে পেরে তারা উৎফুল্ল হয় এবং লোকদের থেকে প্রশংসা লাভ ও তাদের মাঝে তাদের নাম ছড়িয়ে পড়ার আকাঙ্খা পোষণ করে
এমন লোকদের প্রসঙ্গেই আল্লাহ বলেন,
لاَ تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَفْرَحُونَ بِمَا أَتَوْا وَيُحِبُّونَ أَنْ يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا فَلاَ تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَةٍ مِنَ الْعَذَابِ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ-
'যেসব লোকেরা তাদের মিথ্যাচারে খুশী হয় এবং তারা যা করেনি, এমন কাজে প্রশংসা পেতে চায়, তুমি ভাব না যে তারা শাস্তি থেকে বেঁচে যাবে
বস্ত্ততঃ তাদের জন্য রয়েছে মর্মান্তিক আযাব' (আলে ইমরান ৩/১৮৮)
এ আয়াত এরূপ বিনাকাজে প্রশংসার জন্য লালায়িতদের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে
অথচ মানবকুল থেকে প্রশংসা তলব করা, প্রশংসা পেয়ে খুশি হওয়া এবং প্রশংসা না করার দরুন শাস্তি দেওয়া কেবলমাত্র লা শরীক আল্লাহর জন্যই মানায়
এজন্যই সৎপথপ্রাপ্ত ইমামগণ তাদের কাজ-কর্মের দরুন তাদের প্রশংসা করতে নিষেধ করতেন
মানুষের কোন কল্যাণ করার জন্য তাদের স্বত-স্ত্ততি করতে দিতেন না; বরং সেজন্য অংশীদার শূন্য এক আল্লাহর প্রশংসা করতে তারা বেশী বেশী উদ্বুদ্ধ করতেন
কেননা সকল প্রকার নে'মত ও অনুগ্রহের মালিক তো তিনিই
খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয এ ব্যাপারে খুবই সংযত ছিলেন
একবার তিনি হজ্জে আগত লোকদের পড়ে শোনানোর জন্য একটি পত্র প্রেরণ করেন
তাতে তিনি তাদের উপকার করতে আদেশ দেন এবং তাদের উপর যে যুলুম-নিপীড়ন জারী ছিল তা বন্ধ করতে বলেন
ঐ পত্রে এও ছিল যে, এসব কল্যাণ প্রাপ্তির দরুন তোমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো প্রশংসা কর না
কেননা তিনি যদি আমাকে আমার নিজের হাতে সোপর্দ করতেন তাহ'লে আমি অন্যদের মতই হ'তাম
তাঁর সঙ্গে সেই মহিলার ঘটনা তো সুপ্রসিদ্ধ, যে তার ইয়াতীম মেয়েদের জন্য খলীফার নিকট ভাতা বরাদ্দের আবেদন জানিয়েছিল
মহিলাটির চারটি মেয়ে ছিল
খলীফা তাদের দু'জনের ভাতা বরাদ্দ করেছিলেন
ঐ মহিলা আল্লাহর প্রশংসা করে
কিছুকাল পর তিনি তৃতীয়জনের জন্য ভাতা নির্ধারণ করেন
এবারও মহিলা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে
তার শুকরিয়া প্রকাশের কথা জেনে খলীফা তাকে বলেন, আমরা তাদের জন্য ভাতা বরাদ্দ করতে পেরেছি
আপনার এভাবে প্রশংসার প্রকৃত হকদারের প্রশংসা করার জন্যেই
এখন আপনি ঐ তিনজনকে বলবেন, তারা যেন চতুর্থজনের প্রতি সহমর্মিতা দেখায়
তিনি এর দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন যে, রাষ্ট্রের নির্বাহী পদাধিকারী কেবলই আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নে নিযুক্ত
তিনি আল্লাহর বান্দাদেরকে তাঁর আনুগত্যের হুকুমদাতা এবং তাঁর নিষিদ্ধ জিনিসগুলো থেকে নিষেধকারী মাত্র
আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর দিকে আহবান জানানোর মাধ্যমে তিনি তাদের কল্যাণকামী
তার বিশেষ চাওয়া-পাওয়া যে, দ্বীন সর্বতোভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে থাক এবং ইয্যত-সম্মান সব আল্লাহর হোক
তারপরও তার সদাই ভয় হ'ত যে, তিনি আল্লাহর হক আদায়ে কতইনা ত্রুটি করে ফেলছেন
১৪. আল্লাহর নামে মিথ্যাচার ও মনগড়া কথা বলা :
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেছেন, যেসব শিক্ষিত লোক পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দেয় এবং দুনিয়াকে ভালবাসে তারা নিজেদের ফৎওয়া, আদেশ, বার্তা, বিধি-বিধান জারী করতে আল্লাহ তা'আলার নামে নাহক কথা বলে
কেননা মহান প্রভুর বিধি-বিধান বহুক্ষেত্রে মানুষের উদ্দেশ্য ও আকাঙ্খার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় না
বিশেষতঃ রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী এবং খেয়াল-খুশির অনুসারীদের তো তা মোটেই হয় না
তাদের আশা-উদ্দেশ্য তো সত্যের বিরোধিতা এবং তাকে বাধা না দেওয়া অবধি অধিকাংশ ক্ষেত্রে পূরণই হয় না
সুতরাং আলেম ও শাসক যখন ক্ষমতালিপ্সু ও খেয়াল-খুশির অনুসারী হবে, তখন তাদের সে আশা হক বা ন্যায়নীতিকে পদদলিত না করে করায়ত্ব হবে না
বিশেষতঃ যখন সে তার উদ্দেশ্যের পেছনে একটা প্যাঁচঘোচ দাঁড় করাতে পারে, তখন সে ঐ সন্দেহের পথে এগিয়ে যায় এবং খেয়াল-খুশিকে উষ্কে দেয়
ফলে যা ছিল সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত তা ঢাকা পড়ে যায়
আর যদি হক এতটাই স্পষ্ট হয় যে, তাতে কোন রকম কোন অস্পষ্টতা ও সন্দেহের অবকাশ নেই তাহ'লে সে তার বিরোধিতা শুরু করে
মুখে সে বলে, সময়কালে তওবা করলেই মুক্তির রাস্তা খুলে যাবে
এদেরই মত লোকদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেন,فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ فَسَوْفَ يَلْقَوْنَ غَيًّا 'তাদের পরে এলো তাদের অপদার্থ উত্তরসূরিরা
তারা ছালাত বিনষ্ট করল ও প্রবৃত্তির অনুসরণ করল
ফলে তারা অচিরেই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে' (মারিয়াম ১৯/৫৯)
তাদের প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন,
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ وَرِثُوا الْكِتَابَ يَأْخُذُونَ عَرَضَ هَذَا الْأَدْنَى وَيَقُولُونَ سَيُغْفَرُ لَنَا وَإِنْ يَأْتِهِمْ عَرَضٌ مِثْلُهُ يَأْخُذُوهُ أَلَمْ يُؤْخَذْ عَلَيْهِمْ مِيثَاقُ الْكِتَابِ أَنْ لَا يَقُولُوا عَلَى اللهِ إِلاَّ الْحَقَّ وَدَرَسُوا مَا فِيهِ وَالدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِينَ ي...
'অতঃপর তাদের পরে তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় এমনসব অপদার্থ লোক, যারা কিতাবের (তাওরাতের) উত্তরাধিকারী হয়েছে
যার মাধ্যমে তারা তুচ্ছ পার্থিব উপকরণ হাছিল করে (অর্থাৎ ঘুষ খায়) আর বলে যে, আমাদের ক্ষমা করা হবে (কেননা আমরা নবীদের বংশধর ও আল্লাহর প্রিয়পাত্র)
এমনি ধরনের পার্থিব উপকরণ যদি তাদের নিকট পুনরায় আসে, তাহ'লে তারা তা নিয়ে নিবে (অর্থাৎ পুনরায় একই পাপ করবে)
তাদের নিকট থেকে কি তাদের কিতাবে এই অঙ্গীকার নেওয়া হয়নি যে, তারা আল্লাহর নামে সত্য ব্যতীত কিছুই বলবে না? আর সেখানে যা (প্রতিশ্রুতি) লিখিত আছে তাতো তারা পাঠ করেছে
বস্ত্ততঃ আললাহভীরুদের জন্য পরকালের গৃহ উত্তম, তোমরা কি তা বুঝ না'? (আ'রাফ ৭/১৬৯)
আল্লাহ তা'আলা উক্ত আয়াতে অবগত করছেন যে, প্রবৃত্তির পূজারীরা পার্থিব সম্পদ তাদের জন্য হারামের কথা জেনেও কুক্ষিগত করছে
আর বলছে, আমাদেরকে সামনের দিনে মাফ করে দেওয়া হবে
অনুরূপ হারাম সম্পদ হাতে পেলে তারা আবারও তা গ্রহণ করবে
এ ব্যাপারে তারা সব সময়ে চার হাত-পায়ে খাড়া
তারা বলে, আমাদের এ কথাই আল্লাহর বিধান, আল্লাহর শরী'আত এবং আল্লাহর দ্বীন
অথচ তারা খুব ভাল করেই জানে যে, আল্লাহর বিধান, শরী'আত ও দ্বীন-এর উল্টোটা
তারা কি জানে না কোনটা আল্লাহর হুকুম, শরী'আত ও দ্বীন? ফলত তারা কখনও না জেনে, না বুঝে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলে
আবার কখনও বাতিলের কথা জেনে-বুঝে তার নামে মিথ্যা বলে
কিন্তু যারা আল্লাহকে ভয় করে তারা জানে পরকাল ইহকাল থেকে শ্রেষ্ঠ
তাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাপ্রীতি ও পাশবিক লালসা তাদেরকে আখিরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিতে উৎসাহিত করে না
তাদের পন্থা এই যে, তারা কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরবে, ধৈর্য ও ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাইবে
দুনিয়ার নশ্বরতা ও নিকৃষ্টতা নিয়ে ভাববে এবং আখিরাতের সৌভাগ্য ও স্থায়িত্ব নিয়ে চিন্তা করবে
ঐ দুনিয়াপূজারীরা পাপাচারিতার সাথে সাথে দ্বীনের মধ্যে বিদ'আতও উদ্ভাবন করে
ফলে তাদের পাশে দু'টো জিনিস জমা হয়