content
stringlengths
0
129k
'এই বিষয়টাও আমাদের খেয়াল করা উচিত ছিলো,' প্রোকোপিচ মাথা দোলালো
'ও ওর বিছানার তলাতেই সেঁধিয়েছে, আর কোথাও নয়', স্লাভা পেন ফের টুপি ঘোরাতে ঘোরাতে জোর দিলো
'তবে আমরা এখানে খামাখা বসে আছি কী করতে? এখানে বসে থাকার তো কোন মানে নেই, না?,' ছোকরা ছারপোকাটার এবার আর তর সইছে না, 'চল যাই ওর খোঁজে'
'শোনো বাবা, দেখে মনে হচ্ছে তুমিই আমাদের মধ্যে দ্রুততম', প্রোকোপিচ যুক্তি টানলো, 'তুমিই বরং দেখে এসো! এই নাক বরাবর গেলেই পেয়ে যাবে কাঠামোটা আর ওটার গা বেয়ে উঠলেই সটান বিছানার ওপরে! যাও ছুট লাগাও!'
'ঠিক আছে, কিন্তু এমনি এমনি তো এ কাজ হবে না
কিছু একটা দাও ফুঁকতে, তবেই যাচ্ছি'
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অন্যেরা ওর হাতে দু'দুটো সিগারেট দিলো
ছোকরা অসীম দ্রুততায় তার একটা নিজের কানের পেছনে গুঁজে অন্যটি ঠোঁটের ফাঁকে আঁটকালো এবং উল্কার গতিতে হাওয়া হয়ে গেল
দূর থেকে কেবল ওর প্যান্টের আবছা আভাষ দেখা যাচ্ছিলো
'বাপরে বাপ,' প্রোকোপিচ বসতে বসতে দম ছাড়লো, 'ও কে?'
'পাম্পকিনের ছেলে', জানালো মিশা চুচিন
'মনে হয় না ওকে আমি চিনি,'
'অবশ্যই চেনো
ও পাম্পকিনের ছেলে
গত বছর ওর বউকে সুপারফসফেট দিয়ে খুন করা হয়েছিল'
'পাম্পকিনের বউকে?'
'না না পাম্পকিনের বউ নয়
কলিয়ার বউকে
ঐ যে যাকে আমরা 'লাল ওয়ান্ডা' বলে ডাকতাম
চড়া গলা, চওড়া পাছাবতী
গারিবল্ডি!'
'ও হো বুঝেছি, ও আফোনিয়া পাম্পকিনের ছেলে কলিয়া'
'বাব্বা কেমন ব্যায়ামবীরের মত শরীর পাকিয়েছে!'
'আমি যখন সেই ৯৭ নম্বর অ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম---' স্লাভা পেন ফের শুরু করলো
'সেখানে তো একটা পরিবারও থাকতো তাই না'---- প্রোকোপিচ দ্রুত মূল বিষয়ে আসতে চাইলো
'ঠিক - তো যখন ওখানে ছিলাম, ওরা মাঝেমধ্যেই বিছানার নিচে সেঁধিয়ে ঘুমাতো যেন ওদের খুঁজে না পাই
কিংবা ধ'র দেরাজের ভেতরে
আরে দাঁড়াও দাঁড়াও', জরুরী কিছু মনে পড়ে গেলো যেন স্লাভা'র
'বিছানার নিচে যদি ওকে পাওয়া না যায় তবে ও নির্ঘাত দেরাজের ভেতরে লুকিয়ে আছে'
'এই যে দেরাজপোকাগণ! শুনতে পাচ্ছেন? দেরাজবাসীদের কেউ আছেন এখানে?', প্রকোপিচ গলা উঁচু করে হাঁক দেয়
'এমনভাবে বলছো যেন ওরা থাকলেই স্বেচ্ছায় বেরিয়ে আসবে
ঠিক আছে তবে বসে থাকো এবং অপেক্ষা কর,' স্লাভা পেন বিরক্তি লুকালো না
'আমি নিশ্চিত; সে দেরাজেই আছে'
কোথাও যখন নেই তখন সেখানে থাকার সম্ভাবনা বাদ দেওয়া যায়না,' প্রোকোপিচ গা চুলকাতে চুলকাতে শান্ত ভাবে ব্যাখ্যা দিলো
এই দেরাজের ভেতর খোঁজার জন্যে ওকে আবার কত ক্রোশ যে ছুটতে হবে তা ভাবতেই ওর মেজাজের পারা চড়ে যাচ্ছে!
'না এই লোক একটা ছুঁচোই', সমবেত ছারপোকাদের ওপর চোখ বুলিয়ে রায় দিলো ইভান বুরাকভ
'আর এই পৃথিবী চিরকাল এই সমস্ত ছুঁচোদের সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে চলেছে
এরা আমাদের প্যাঁচে ফেলবার জন্যে করতে পারেনা হেন কাজ নাই!'
'দাঁড়াও!' মিশা চুচিন ওর ভ্রূর ওপর হাত ছুঁয়ে দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা বাড়ালো, 'তোমাদের এই তর্কাতর্কির অবসান করছি শিগগীরই
হুম, ঐ তো আমি একজন দেরাজপোকাকে দেখতে পাচ্ছি!' গলা চড়িয়ে হাঁক দিলো মিশা চুচিন, 'আরে ওহে কাযলাভস্কি! শেষ পর্যন্ত ঘুম ভাঙলো? ইদিকে এসো
একটা সিগারেট খাও'
সবাই দেখল বেড়ার কাছেই ঘুরঘুর করছে পাগলা কিসিমের এক ছারপোকা
মিশার ডাক শুনে দুই কব্জি দিয়ে চোখ রগড়াতে রগড়াতে তাকালো সে
মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি, জামাকাপড় অবিন্যস্ত কিন্তু গলায় তার পরিপাটি টাই বাঁধা
লাজুক গলায় সে সকলকে সম্ভাষণ জানিয়ে জুতো দিয়ে অবিরাম মাটি পিষতে লাগলো
'দেখো কাণ্ড! আবার টাই ঝুলিয়েছে গলায়,' মিশা চুচিন গলা নামিয়ে টিপ্পনী কাটলো
'মনে হচ্ছে আজকের অনুষ্ঠানের সঞ্চালক তিনি!,শালা!', এরপর গলা চড়িয়ে ফের জানতে চাইলো, 'তো জনাব কাযলাভস্কি আজ ঠিক কীসের উদযাপন করছেন আপনি? জুয়াতে বড় দাও জিতেছেন?'
'মানে? ওহ্‌! না না ওসব কিছু নয় - এই আর কি, সব সময়ের মত,' বিব্রত কাযলাভস্কি হাত নেড়ে সহজ হতে চাইলো এবং সকলের মুখের দিকে তীব্র দৃষ্টি বুলিয়ে অস্থিরভাবে পায়চারী করতে লাগলো
'তার মানে সে তোমার ওখানেও নেই?'
'কী?----', কাযলাভস্কি কথা না বাড়িয়ে পেছনে সরে গেল
'মাদারচোত', বিভ্রান্ত মিশা মেজাজ সামলাতে পারলো না এবং গাল দেয়ার জন্যে মুখ খুলতেই ওর মুখের সিগারেট খসে পড়লো নিচে
দীর্ঘক্ষণ সবকিছু কেমন নিঝুম হয়ে রইলো
এই গহীন নিরবতায় কেবল মিশা চুচিনের খসে পড়া সিগারেটটি অদ্ভুত আওয়াজ তুলে ফুলকি ফোটাচ্ছিলো
মনে হচ্ছিলো যেন সিগারেট নয় কাঠের ছিলকা জ্বলছে - হায়, ওদের এই ছারজীবনও এমনই প্রহসনে ভরা
'কিছু একটা সমস্যা হয়েছে,' অবশেষে নীরবতা ভাঙলো প্রকোপিচ, 'কলিয়া এখনও ফিরলো না!'
'ঐ তো কলিয়া!' প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পেছনে পাহারায় থাকা ছারপোকাদের একজন জানান দিল
'ভাইয়েরা আমার,' তরুণ কলিয়ার গলায় খুশি উপচে পড়ছে, 'দারুণ সুখবর! বেলাগ্রুদভ বিছানার নিচে নেই!'
'ধুত্তোরি'! প্রোপোপিচ সজোরে হাঁটুতে চাপড় মারলো এবং হতাশায় এক থোক থুথু ছুড়ে দিলো মাটিতে
আবারও সেই অনিশ্চিয়তা
সেই দুশ্চিন্তা!
'আরে শোনো!' কলিয়া চেঁচিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিলো
ওর ঘামে ভেজা, ধুলো মাখা মুখটি প্রাণপণে উঁচুতে তুলে সমবেত ছারপোকাদের উদ্দেশ্যে বললো, 'তোমরা স্বপ্নেও ভাবতে পারবেনা কী ঘটেছে!' এইটুকু বলেই ও অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো
সবাই অবাক হয়ে দেখলো কলিয়া নিজেকে জড়িয়ে হাসতে হাসতে প্রায় দুই ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে! বিহ্বলতা কাটিয়ে এবার ক্ষেপে গেলো ছারপোকারা, 'আশ্চর্য! এত হাসির কী হ'লো! আচ্ছা ফাজিল তো!' হাসি সামলে এবার কলিয়া রীতিমত চেঁচিয়ে জানালো, 'ঈশ্বরের দোহাই আমি নিজের চোখে দেখেছি
চিড়িয়াটা ঘরের ছাদে বসে আছে! ভাবতে পারো?'
কী বলছে কলিয়া! ছারপোকাদের গুঞ্জন তীব্র হ'ল
প্রোকোপিচ ওর গা চুলকানো শেষ করে একপাশে দাঁড়িয়ে কলিয়াকে গভীর মনোযোগ দিয়ে নিরীক্ষণ করছিল
হঠাৎ বিদ্যুৎ খেলে গেল ওর চোখেমুখে, সঙ্গে সঙ্গে জোরে ধমকে উঠলো, 'এই ছেলে কী বলছো এসব! ও ছাদে বসতে গেলেই তো নিচে পড়ে যাবে
সমবেত ছারপোকাদের গুঞ্জন থেমে গেল তৎক্ষণাৎ
-'উফ্‌!', মিশা চুচিন মাথা ঝাঁকিয়ে হাতের সিগারেটটা দূরে ছুঁড়ে এগিয়ে এলো, 'কেন বোঝো না, কিছু মানুষের মেধা আমাদের বোধের অতীত!'
'ইনি কিছু মানুষ নন মিশা, ইনি বেলাগ্রুদভ', প্রোকোপিচ রাগে ফেটে পড়লো, 'তুমি যখন পেট টিমটিম করে রক্ত চোষ তখন থাকতে পারো অমন সিলিঙে ঝুলে? টুপ করে খসে প'ড় না? কারণ কী? কারণ হলো অভিকর্ষ
এই অভিকর্ষ ব্যাপারটা তোমাকে অমন অনায়াসে উল্টো হয়ে ঝুলে চলতে দেয়না
আর বেলাগ্রুদভ তো মানুষ নয় চর্বির বস্তা
বিছানাতে শুলেই ওর ভারে বিছানা ঝুলে প্রায় মেঝেতে লেগে যায় আর সে কিনা মাথা নিচে ঠ্যাঙ উপরে তুলে বসে আছে! ইয়ার্কি?'
'তো? কী করতে চাও তোমরা', কলিয়ার খুশি উবে গেছে
রাগে ফুঁসছিল ও
ওর চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে যেন, 'এ্যাঁ? ব'ল কী করতে চাও?', তেড়েফুঁড়ে ফের সামনে এগুতে গিয়েই ওর পা ফাঁসলো জ্বলন্ত সিগারেটের খোসায়
তাতেও ওর কথায় ছেদ পড়লো না
ছ্যাঁকা খাওয়া পাটা এক হাতে আল্‌গে অন্য পায়ে লাফাতে লাফাতে চেঁচিয়ে চলেছিল কলিয়া, 'এ্যাঁ? বল! তোমাদের যখন এতই সন্দেহ তবে চল আমার সঙ্গে
নিজের চোখেই দেখে এসো, আমি ঠিক কি ভুল?'
'ঠিক আছে, চ'ল', গম্ভীর প্রোকোপিচ উঠে দাঁড়ালো
ওর দেখাদেখি অন্য ছারপোকারাও বিনাবাক্যে ল্যাংচানো কলিয়ার পিছু নিলো
'আমি আসলেই ব্যাপারটার একটা সুষ্ঠু সমাধান চাই, প্রোকোপিচ', ভাসিয়া গুবা ওর বিশাল জুতো জোড়ায় আওয়াজ তুলে চলছিল, 'যদি ওকে পাওয়া না যায় তবে আজ আমাকে নিজের বাড়ির রাস্তাই ভুলে যেতে হবে
বউ এবং পাঁচ পাঁচটা বাচ্চা! আমার অবস্থাটা বুঝতে পারছো ?' 'হুম
বড়ই কঠিন পরিস্থিতি,' প্রোকোপিচও গতি না থামিয়েই সাঁয় দিলো
পকেটে হাত পুরে অসীম দ্রুততায় ছুটছিলো সেও
ছারপোকাদের শত শত পায়ের চাপে এক অদ্ভুত গমগম আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ছিল চার পাশে
যেন পৃথিবী কাঁপিয়ে যুদ্ধে চলেছে ছারপোকার দল! উত্তেজনায় এ ওর গায়ে ধাক্কা খাচ্ছে, ও তার পা মাড়িয়ে দিচ্ছে সে এক বিতিকিচ্ছিরী অবস্থা! তারটার কাছে পৌঁছুতেই চুড়ান্ত বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো
আবছা আলোয় বিভ্রম হ'ল মিশা চুচিনেরও; পা ফসকে খিস্তি তুলতে তুলতেই অধোমুখে পড়ে গেলো নিচে!
'আমরা এসে গেছি,' প্রোকোপিচ বিষণ্ণ গলায় ঘোষণা দিল
'ঈশ্বরের দিব্যি করে বলছি, আমি এক বর্ণও মিথ্যে বলিনি,' কৈফিয়ত দিতে শুরু করেছিল কলিয়া
একই সংগে রাগান্বিত এবং সন্ত্রস্ত লাগছিল ওকে
কিন্তু ছারপোকাদের তুমুল গর্জনে ওর কোনো কথাই শোনা যাচ্ছিলো না
বিক্ষুব্ধ ছারপোকারা পশুর পালের মতই ধুলো উড়িয়ে ছুটছিল
কিন্তু অকুস্থলে পৌঁছানো মাত্রই আশ্চর্যজনকভাবে ওদের গতি রহিত হ'ল; যেন কেউ পেছন থেকে রাশ টেনে জোর করে থামিয়ে দিয়েছে ওদের! এক অদৃশ্য নিরবতার চাদর নিমেষে সমস্ত শব্দ শুষে নিয়েছে যেন
ঠিক তখনই কলিয়া পাম্পকিন, মল্লবীরের মত গড়িয়ে সকলের সামনে চলে এলো
বিশ্রীভাবে খোড়াচ্ছিলো ও
এবং সেভাবেই সামনে পেছনে অবিরাম মাথা ঝাঁকিয়ে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করলো -'দেখ এবার
নিজের চোখেই দেখো
যদিও আক্ষরিক অর্থে সাধারণ মানুষ যেভাবে বসে থাকে ঠিক সেইভাবে বসে নেই ও
বরং বলা যেতে পারে ছাদে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে