content
stringlengths
0
129k
বন্ধুদের আনা র‍্যাকেট দিয়ে খেলতে সংকোচ হতো খুব
কিছু বললেই আম্মা তখন বলতেন, বাবাহীন সন্তানের এত চাহিদা থাকতে নেই
বুঝেছিলাম, উচ্চাশার পালক শরীর থেকে ছেঁটে ফেললেই সুখী হওয়া যায়
আম্মার ঘর থেকে বেড়িয়ে এলাম
দরজা পেরোতেই কি মনে করে একবার পেছনে ফিরেছি
সেজদায় মাথা ছুঁইয়ে পড়ে আছেন
ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে তার শীর্ণ শরীর
আম্মা কাঁদছেন! ইরা উঠে পড়েছে
কিচেনে তার কাজের টুং টাং শব্দ পাচ্ছি
আজ সন্ধ্যায় ওর আবার গাইনোকলজিষ্টের কাছে এপয়ন্টমেন্ট আছে
সন্তান জন্মদানে আমার আংশিক ব্যার্থতার দায় নির্দ্বিধায় কাঁধে তুলে নিয়েছে সে
যদিও আমার অনুর্বরতাকে ইরা স্রষ্টার দেয়া পরীক্ষা হিসেবেই দেখছে
অথচ আমাদের আনুষ্ঠানিক বিয়ের দিন এই আমিই তার সব দ্বায়িত্ব নিবো বলো সগৌরবে মাথা তুলেছিলাম
কী সেলুকাস! গোসল সেরে একেবারে ধোপদুরস্থ হয়ে টেবিলে এসেছি
আম্মা নিজের ঘর থেকে আর বের হননি
থাকুক নাহয় আজ কিছুটা সময় নিজের মতো
ইরা প্লেটে রুটি দিয়ে বললো,
- বক্সে করে কিছু খাবার দিয়ে দিবো? যদি পথে তোমার খিদে পায়
- না থাক, তোমার শরীরটা ভালো নেই
কিছু দিতে হবেনা
শুধু সন্ধ্যায় ডাক্তারের কাছে যাবার সময় আম্মাকে বড় মামার বাসায় রেখে যেও
একা বাসায় যদি কোনও বিপদ আপদ হয়
আমি বড়মামাকে ফোনে বলে দিয়েছি
আমি যে ফরিদপুর যাচ্ছি সেকথা ওকে জানিয়েছি
কৌতুহল হলেও 'মাধবীলতায়' যাচ্ছি শুনে আর কথা বাড়ায়নি
বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে আছি দুজন
ইরা পানির বোতল ব্যাগে ঢুকিয়ে বললো,
- অনেক আশা নিয়ে আছি
যদি এবার পজিটিভ আসে
আমি কিছু না বলে শুধু ওর হাতটা ধরে বললাম,
আমি জানি ইরা আরো মিনিট দুয়েক দাঁড়িয়ে থাকবে
যতক্ষন আমাকে দেখা যাবে ঠিক ততক্ষন
এই সাত বছর নিঃসন্তান থেকেও মেয়েটা আমায় ছেড়ে যায়নি কেনো আমি জানিনা
এর নামই হয়তো মায়া
হেঁটে এসে বাস ধরলাম
এই বাস সোজা যাবে ফেরীঘাট
ফেরীতে উঠে আসিফ সাহেবকে কল করে জানাতে বলেছেন
নদীর ওপারে উনি স্বশরীরে আসবেন যাতে ওপারে গিয়ে আমাকে আর বিপাকে পড়তে না হয়
ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলো
এই জৈষ্ঠ মাসের গরমে জানলার পাশে সিট পেলাম
বাস ছেড়েছে এইমাত্র
সামনের সিটে ছোট ছেলে সহ এক দম্পতি উঠেছেন
একটু পর পরই অবান্তর প্রশ্নের জন্য বাচ্চাটাকে ধমকে যাচ্ছেন মা
তবুও মায়ের নিষেধ উপেক্ষা করে বেশ জোরে শোরেই চলছে বাবা ছেলের কথোপকথন
হয়তো এটা জগতের সুন্দরতম দৃশ্যের একটি
কিন্তু নিজের অপুর্ণতার কথা ভেবে মনটা বিষন্নতায় আচ্ছন্ন হয়ে গেলো
চোখ ফিরিয়ে নিলাম
আর কতদূর ফরিদপুর?
আমার মস্তিস্কে বাবাকে নিয়ে উল্ল্যেখযোগ্য কোনো স্মৃতি নেই
বড় হবার পর থেকে জেনেছি আমার ফ্যামিলি মানে শুধু মা
সেখানে বাবা নামক ব্যাক্তিটির অনুপ্রবেশ নেই
আরেকটু বড় হবার পর জানলাম, আমার মা ডিভোর্সী
অবশ্য ততদিনে অভিধান খুঁজে ডিভোর্স শব্দের আক্ষরিক অর্থ আমি জেনে গিয়েছিলাম
' বিবাহবিচ্ছেদ'
আম্মা সচেতন ভাবেই বাসায় আমার বাবার কোনোও ছবি রাখেননি
ছেলেবেলায় স্কুলপড়ুয়া আমি বন্ধুদের বাবাদের দেখে মনে মনে বাবার একটা স্থিরচিত্র তৈরী করতে চাইতাম
কিন্তু পারতাম না
বাবা মানেই মনে হতো ভারী কণ্ঠস্বরের দৃড়চেতা কিন্তু দরদী একজন মানুষ
যে পরীক্ষায় ফেল করলেও, পিঠ চাঁপড়ে উদ্যম দিয়ে হাসিমুখে বলবে, 'বেটার নেক্সট টাইম
' কিন্তু, জীবনের কোনও পরীক্ষার রেজাল্ট কার্ডই আমার বাবার হাতের সই দিয়ে ভরে ওঠেনি
বাস থেকে নেমেছি অনেকক্ষন
ফেরীতে নদী পার হতে দ্বিগুণ সময় নিলো
হাতে ছোট ব্যাগটা নিয়ে ডক পেড়িয়ে একটা টঙে এসে বসলাম
জার্নিতে শরীরটাতে কেমন যেন আড়ষ্টতা ভর করেছে
অচেনা জায়গা, চারিদিকে অপরিচিত লোকজন
আসিফ নামক ভদ্রলোক কিভাবে আমাকে খুঁজে বের করবেন এই নিয়েও আমি কিছুটা সন্দিহান
ফোনের মাধ্যমে আমার বর্তমান একটি ছবি তাকে পাঠিয়েছি
তবুও এতদূর এসে মনের ভেতর কেমন যেনো খচ খচ করছে
চা শেষ করে উনার বলে দেয়া একটা খাবারের হোটেলের সামনে দাড়ালাম
ফোন বাজছে
নিশ্চই উনি
- মেরুন শার্ট আর কালো প্যান্ট তাই তো? হাতে একটা ব্রাউন লেদারের ব্যাগ আছে
- এসেছেন আপনি? কই আমি তো দেখতে পাচ্ছিনা
- পেছনে ঘুরুন প্লিজ
সাদা পাঞ্জাবীর মানুষটাই আমি
আমি কান থেকে মোবাইল ফোন নামালাম
চোখে চশমা, গায়ে সাদা সুতি পাঞ্জাবীর সাথে রংচটা জিন্স
চেহারায় তারুণ্যের জেল্লা উথলে উঠছে
বয়স আন্দাজ করলে সাতাশ আটাশের বেশি কিছুতেই হবেনা
আমার চেয়ে দশ বারো বছরের ছোটই হবে হয়তো
আমি অস্বস্তি আড়াল করে হাত মেলালাম
উনিও অপ্রস্তুতভাবে মুখে হাসির রেখা টানতে চাইলেন
তারপর একবাক্যে বললেন,
- গাড়িতে উঠুন
যেতে যেতে বাকি কথা বলা যাবে
গাড়ি চলছে, ড্রাইভার আর অন্য একজন সহ আমরা চারজন গাড়িতে
কেউ কথা বলছেনা
আমিই নীরবতা ভাঙলাম
একপ্রকার বাতাসে প্রশ্ন ছুঁড়লাম
- উনি কি আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন?
- আসলে উনার ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছিলো দু' মাস আগে
ভালোই রিকভারি করেছিলেন
কিন্তু গত পরশু রাতে হঠাত বুকে প্রচন্ড পেইন শুরু হলো
তড়িঘড়ি হাসপাতালেও নিয়েছি
কিন্তু ধরে রাখতে পারলাম না
আসিফের গলা ধরে এসেছে
আমার ভীষন জানতে ইচ্ছে করে আতাহার সাহেব সম্পর্কে কি হন ছেলেটির
কিন্তু পরক্ষণেই মত বদলাই
এখন থাক নাহয়
মাধবী লতার ঝাড় লোহার গেইটটাকে আগাগোড়া মুড়িয়ে রেখেছে