content
stringlengths
0
129k
গেইট সংলগ্ন দেয়ালে, শ্বেতপাথরের ফলকে বড় করে লেখা 'মাধবীলতা'
নানান রকম মানুষের ভীড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ছিমছাম ডিজাইনের দোতলা বাড়ি চোখে পড়লো
আসিফ আমাকে সোজা নিয়ে গেলো দোতলায়
আমি চারপাশে সরু চোখে তাকালাম
টের পাচ্ছিলাম, আমাকে সবাই ভীষন রকমভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে
বাতাসে একটা চাপা গুঞ্জন ভাসছে
এই সেই আতিক!
দোতলার কোণার একটা ঘরে বসার ব্যাবস্থা হলো
কিছুক্ষন পর পর একেকজন উঁকি মারছে ঘরে
তবে কেউই ভেতরে ঢুকছে না
মিনিট পনেরো অপেক্ষার পর একজন ভদ্রমহিলা এসে পাশের সোফায় বসলেন
ধীরস্থির গলায় বললেন,
- তোমার সাথে দেখা হবে আমি জানতাম
তুমি করেই বলছি
আমার ছেলের বয়েসি তুমি
- আপনার পরিচয় জানলে আমার কথা বলতে সুবিধা হতো
- আমি আতাহার আহমেদের স্ত্রী
আর কিছুক্ষন পর যার জানাজা হবে
এবার আমি ভালোভাবে তাকালাম
ভদ্রমহিলার পরনে সাদা কাপড়
বড় ঘোমটার জন্য চেহারা দেখা যাচ্ছেনা
- তোমাকে একটা চিঠি দেবার ছিলো
আসলে চিঠিটা ঠিক তোমাকে নয়, তোমার মাকে উদ্দ্যেশ্য করে লেখা
- আমার আম্মাকে?
- হ্যাঁ, আমি চাই তুমি তাকে চিঠিটা দাও
আমি হাত পেতে নিলাম
চিঠিটা নতুন
তবে খাম নেই
ক' দিন আগেই হয়তো লেখা হয়েছে
কালির ঘ্রান এখনো তাজা
উনি উঠে পড়লেন দ্রুত
- মরা বাড়ি
কাজের শেষ নেই
যাই,তোমার জন্য কিছু খাবারের ব্যাবস্থা করি
- ব্যস্ত হবেন না
আমি কিছু খাবোনা এখন
- তাহলে এক গ্লাস শরবত অন্তত পাঠাই
গলা ভিজিয়ে নাও
এতদূর থেকে এলে
অন্যের চিঠি পড়া অন্যায় জেনেও চিঠির ভাঁজ খুললাম
কে আম্মাকে লিখেছে চিঠিটা? কি হন তিনি আম্মার? না জেনে কি করে থাকি
আজ থেকে এক সপ্তাহ আগের তারিখ দেয়া
মধু, কেমন আছো তুমি? আতিক কেমন আছে? তোমাদের পুরোনো বাসার ল্যান্ড নাম্বারে আর কল যায়না
যদিও প্রতিবারই রিসিভ করে তোমাদের চাইলে, কেউ না কেউ লাইন কেটে দিতো
আমি জানতাম এ জীবনে আর তোমার সাথে কথা হবেনা
আটত্রিশ বছর আগে পাঠানো চিঠিতে তুমি লিখেছিলে, 'যদি আমার কান্না তোমাকে না ছোঁয়
তবে তুমি আমার কাগজের সহধর্মী, সহমর্মি নও!'
তার মাস ছয়েক পরেই আমাদের কাগজের সম্পর্কেরও ইতি টেনে দিলে
সহমর্মি হবার দ্বিতীয় সুযোগটুকু দিলেনা
সাত মাসের আতিককে নিয়ে চলে গেলে নারায়ণগঞ্জ
ছেলে দেখতে কেমন হয়েছে জানতে ইচ্ছে হতো খুব
লোক মারফত খোঁজ খবর নিতাম
ছবিও যোগাড় করেছি কিছু
প্রতিবছর ছেলের জন্মদিনে মসজিদে মিসকিন খাওয়াতাম
অথছ সেই ছেলের মুখে বাবা ডাক শোনার সাধ আর মিটলোনা
এই অপ্রাপ্তিটুকু নিয়েই বেঁচে রইলাম
তাই নিজেকে এই বলে স্বান্তনা দেই
সব পেলে তাকে কী জীবন বলে, সে তো জান্নাত
বরং অভাব থাকলে পাওয়ার সুখটা আরো গাঢ় হয়
তখন সত্যিকারের জান্নাতে যাওয়ার লোভটা বাড়ে
এই অভাব আমার শেষ হলোনা আর
আমার অপারগতা, আমার অপরাধ ক্ষমা করো মধু
নিজের মতপার্থক্য,আত্ন অহং থেকে সরে দাঁড়াইনি
তোমার ওপর মত মর্জির মস্ত বোঝা চাপিয়ে দিয়েছিলাম
তবুও আজ করজোড়ে ক্ষমা চাই
আমার ছেলেকেও বলো, তার এই ব্যার্থ বাবাটিকে ক্ষমা করে দিতে
ক্ষমা করে দেয়া কঠিন, অসম্ভব নয়
আর একটি অনুরোধ, আমার জানাজায় যেনো সে সামিল হয়
শেষশয়নে সন্তানের স্পর্শ থেকে বঞ্চিত করো না আমাকে
ভালো থেকো মাধবীলতা
আতিকের বাবা চিঠি শেষ করে বসে আছি
এর মাঝে ঠিক কতক্ষন সময় গিয়েছি জানিনা
আম্মাকে উনি মাধবীলতা বলে ডাকতেন, একথা আমার জানার কথা নয়
এ বাড়ির নামও আম্মারই নামে
সম্পর্কের ওপর দিয়ে এত ঝড় ঝঞ্জা গেলো
কিন্তু নামফলকে 'মাধবীলতা' অম্লান হয়ে ঠিকই টিকে রইলো
আসলে, আমরা সম্পর্কের নাম দেই শুধু
অনুভূতির নাম দেবার সাধ্য আমাদের নেই
সেই ভদ্রমহিলা আবার ঘরে এলেন
এসেই প্রশ্ন করলেন
-চিঠি পড়েছো?
- জ্বী পড়েছি
আপনিও নিশ্চই পড়েছেন? আসলে, খোলা ছিলো, তাই বললাম
- হ্যাঁ পড়েছি
- আপনার খারাপ লাগেনি? আপনি তো উনার বর্তমান ছিলেন
- না লাগেনি
এক মুহুর্তের জন্যও লাগেনি
ভালোবাসা অভ্যেস হয়ে দাড়ালে তাকে অস্বীকার করা কঠিন
আমার অভ্যেস ছিলেন উনি
এটুকু বলেই ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি
তারপর ঝটপট নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
-তুমি কি উনাকে শেষ একটিবার দেখতে চাও? আমি দৃড় কন্ঠে উত্তর দিলাম,
আমার কাছ থেকে হয়তো এমন উত্তর আশা করেননি তিনি
কিন্তু আমার জীবনে পাওয়া শত শত তিরস্কার, অপমান আর বঞ্চনার কালশিটে দাগ, কি করে শুধুমাত্র একটি চিঠির জলফেনায় ধুয়ে ফেলি! জানাজার আয়োজন করা হয়েছে বাড়ির আঙিনায়
মানুষের উপচে পড়া ঢল
অজু করে দাড়ালাম
ভাবতে পারছিনা খাঁটিয়ার কাফনে জড়ানো মৃত মানুষটি আমার জন্মদাতা
এখনো বুকে সেই পাথরচাপা কষ্টটা ঘাটি গেঁড়ে আছে
আসিফ ডাকছেন আমাকে
- খাঁটিয়া তুলতে হবে, আপনি সামনে দাড়ান