content
stringlengths
0
129k
জ্ঞানার্জনের জগতে শিশু সাঈদী প্রবেশ করলেন । তিনি যেন জ্ঞানের কুঞ্জবনে বিচরণশীল এক মধুমক্ষিকা । মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জিত হবার পর তিনি একটানা পাঁচ বছর ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, মনোবিজ্ঞান সহ বিভিন্ন মতাদর্শ ও ভাষার উপর বিশ্লেষণধর্মী গবেষণা করে ১৯৬৭ সালে তাঁর গৌরবময় কর্ম জীবনে পদার্পণ করেন । তাঁর কর্মের ময়দান কুসুমাস্তীর্ণ নয়- কন্টকাকীর্ণ এই ময়দান । ফুল বিছানা পরিত্যাগ করে শাহাদতের উত্তপ্ত ময়দানে পা রাখেন ।
ডঃ আল্লামা ইকবালের ভাষায়, মুসলমান হবার অর্থই হল শাহাদতের উত্তপ্ত ময়দানে পা রাখা, আর মানুষ মনে করে যে, মুসলমান হওয়া এত সহজ ।
-পিতার ইন্তেকালে আল্লামা সাঈদী
"""""""""""""""""""""""'"""""""""""""""
সেদিন ছিল ১৯৮৬ সনের ৬ই ফেব্রুয়ারি । বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী । রাজধানী ঢাকার ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ছাত্র শিবির এক সেমিনারের আয়োজন করে । আল্লামা সাঈদী সেই সেমিনারের প্রধান অথিতি । এই সময় তাঁর কাছে পৌছে ভয়াবহ শোকের সংবাদ- তাঁর প্রিয় জনক আর নেই ।
স্নেহদাতা পিতার ইন্তেকালের মুহুর্তে তিনি তাঁর পাশে থাকতে পারেন নি । তাঁর পিতার ইন্তেকাল পূর্ব অবস্থার কথা তাঁর স্নেহময়ী মাতা এভাবে বর্ণনা করেছেনে, ' আমার সন্তানের পিতা প্রবল জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন । কখনো কখনো জ্ঞানহারা হয়ে যেতেন । জ্ঞান ফিরে আসতেই দেলওয়ার এসেছে কিনা জানতে চাইতেন । ইন্তেকালের পূর্বে মুমিনের মৃত্যুর সকল চিহ্ন তাঁর চেহারায় ফুটে উঠলো । আমি লক্ষ্য করলাম, দেলওয়ার বাইর থেকে বাড়িতে এলে ওকে দেখে তাঁর মুখে যেমন স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠতো, ইন্তেকালের পূর্ব মুহুর্তেও তাঁর মুখে ঠিক সেই হাসিই ফুটে উঠলো এবং তিনি এমনভাবে তাকালেন যে, মনে হচ্ছে যেন তিনি দেলওয়ারকে দেখছেন । এরপর তিনি শূন্যে হাত বাড়িয়ে দিলেন । মনে হলো যেন তিনি দেলওয়ারের হাত যেভাবে ধরতেন, ঠিক সেভাবেই কিছু একটা ধরলেন এবং বুকের ওপর রাখলেন। আমি তাকিয়ে রয়েছি তার মুখের দিকে, তিনি হাসছেন । এ অবস্থায় তিনি চোখ বন্ধ করলেন । আমি দেখলাম তার কপাল ঘেমে গেলো । তারপর অনুভব করলাম, দেলওয়ারের আব্বা আর নেই ।'
আল্লামা সাঈদী বলেন, ' সংবাদ পেয়ে আমি যখন পিরোজপুর বাড়িতে পৌছে আব্বাকে দেখলাম, তখন আমার কাছে মনে হলো আমি যেন জীবিত ঘুমন্ত আব্বাকে দেখছি । মুখে ফুটে রয়েছে মধুর হাসি । আব্বার শরীরে হাত দিয়ে দেখলাম, তখনও তাঁর শরীরে জীবিত মানুষের মতই উষ্ণ রয়েছে এবং কবরে নামানো পর্যন্ত তাঁর শরীর উষ্ণই ছিল ।
আল্লাহ তাঁর পিতা মাতাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুক । আমীন
কুরআনের ময়দানে বুলবুলি
"""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
আল্লামা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী- তমসাবৃত গগনে প্রদীপ্ত সূর্যের বিকশিত নাম ।
১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস- এর মাত্র দুই মাস সাতদিন পর ১৯৭২ সনের ২২শে ফেব্রুয়ারি আল্লামা সাঈদী তাঁর নিজ জেলা পিরোজপুর সরকারি স্কুলের মাঠে বিশাল তাফসীর মাহফিলে বলিষ্ঠ কন্ঠে বক্তব্য পেশ করেন ।
১৯৭৩ সনে রাজধানী ঢাকায় প্রথম বারের মতো ইসলামী পুষ্প কাননের বিরল ফুল আল্লামা সাঈদীর সুবাসে সুবাসিত হয় । আরমানীটোলার বিশাল ময়দানে আল্লামা সাঈদীর জন্য সময় বরাদ্ধ ছিল মাত্র ১৫ মিনিট । পবিত্র কুরআনের তাফসীর ছড়িয়ে পড়লো সাঈদীর কন্ঠে জান্নাতী সৌরভে ।
অসংখ্য শ্রোতা নীরব নিস্তব্ধ , কারো মনে সামান্যতম চঞ্চলতা নেই । সবাই এক দৃষ্টে অপলক নেত্রে তাকিয়ে রয়েছে আল কুরআনের বিপ্লবী সিপাহসালার আল্লামা সাঈদীর দিকে । মাহফিল পরিচালক ১৫ মিনিট অতিবাহিত হতেই প্রস্তুতি নিলেন বক্তৃতা শেষ করার জন্য আল্লামা সাঈদীর প্রতি ইশারা করবেন । সতর্ক শ্রোতাগণ তা অনুভব করে দাবি জানালো তারা সাঈদীর কন্ঠে আরো আলোচনা শুনতে চায় । শ্রোতাদের দাবীর মুখে আল্লামা সাঈদী একটানা আড়াই ঘন্টা কুরআন থেকে আলোচনা করেন । তবুও শ্রোতাদের মনে অতৃপ্তি রয়ে গেল- পুনরায় তাঁর মহামূল্যবান বক্তৃতা শোনার তীব্র আকাংখা তাদের হ্নদয়ে জেগে উঠলো ।
সেই ব্যক্তি আজ ছয় বৎসর থেকে কাফিরদের হাতে বন্দী । কুরআনের এই প্রেমিকের মুখে তাফসীর শোনা থেকে জাতি আজ বঞ্চিত ।
কুরআনের খাদিমদের সাথে যারা বেয়াদবি করে তাদের পরিনতি হবে ফিরাউন, নমরুদ, আবু জেহেলের মত । এটাই চিরন্তন সত্য কথা ।
কে রোধিবে এই জোয়ারের টান গগনে যখন উঠেছে চাঁদঃ
""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর দেশ ও জাতি চরম এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে ।ঠিক সেই মুহুর্তে জাতি অনুভব করলো যুদ্ধ চলাকালীন যে ভারত মিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল, সে ভারত এখন দস্যু তস্করের ভূমিকায় অত্যন্ত নগ্নভাবে বীর প্রসবিনী বাংলার মাটিতে অবতীর্ণ হয়েছে ।
গোটা দেশের মূল্যবান সামগ্রী তারা লুন্ঠন করে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাচ্ছে । সচেতন জনতা এই আত্মঘাতী দৃশ্য অবলোকন করে চমকে উঠলো, গোটা চেহারা জুরে পরিলক্ষিত হলো চাপা ক্ষোভ ।
বাংলার দামাল যুবক ঈমানদার মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে নীরব ভুমিকা পালন করা সম্ভব হলো না । তারা অনুভব করলো, ভারতীয় ব্রাক্ষণ্যবাদের গতিপথে অর্গল তুলে দিতে সক্ষম কেবলমাত্র মহান আল্লাহর কুরআন । ইসলামী চেতনায় জাগ্রত হ্নদয় পাবনার ঈমানদার মুক্তিযোদ্ধারা সিদ্ধান্ত নিলো, পবিত্র কুরআনের আলো তারা প্রজ্জিলিত করবে । পাবনার স্টেডিয়ামে বিশাল বিস্তীর্ণ অঙনে তারা সাতদিন ব্যাপী তাফসীর মাহফিল করবে আর এই মাহফিলে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করবেন মুসলমানের প্রাণ পুরুষ ইসলামের সিংহ আল্লামা সাঈদী ।
এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাথে সাথে আবু লাহাব আর আবু জেহেলের প্রেতাত্মারা সক্রিয় হয়ে উঠলো । প্রবল বাধা সৃষ্টি করলো তারা । কুরআনের প্রসার প্রচার তারা কোনক্রমেই অনুষ্ঠিত হতে দেবেনা বলে হুংকার ছাড়লো ।
কুরআনের প্রেমিক পাবনার মুক্তিযোদ্ধাগণ অস্ত্র হাতে রুখে দাড়ালেন । প্রয়োজনে বুকের শেষ রক্ত বিন্দু ঢেলে দিয়ে হলেও আল্লাহর কুরআনের মাহফিল বাস্তবায়ন করবো ।
তাঁদের শক্ত অবস্থানে নাস্তিক- মুরতাদ আর কমিউনিস্টদের ভীত কাঁপিয়ে দিলো । অবশেষে তারা তাদের চির পরিচিত ষড়যন্ত্রের পথই বেছে নিলো । গুপ্ত ঘাতক লেলিয়ে দিয়ে আল্লামা সাঈদীকে হত্যা করে কুরআনের মাহফিল বন্ধ করার ঘৃণ্য চক্রান্ত করা হলো । কুরআন প্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের অগোচরে রইলো না বাতিলের অশুভ চক্রান্তের কথা । তাঁরা দুর্জয় প্রতিরোধ গড়ে তুললো । আল্লামা সাঈদীকে যে পথে তাফসীরের মঞ্চে নিয়ে আসা হবে, সে পথের দু' ধারে অস্ত্র সজ্জিত মুক্তিযোদ্ধার দল সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেলেন । পাবনার অমুসলিম এসপির বাড়ির দিকে মেশিনগান স্থাপন করে মুক্তিযোদ্ধাগণ অবস্থান করে স্পষ্ট জানিয়ে দিলো, ' আল্লামা সাঈদীর শরীরে কাঁটার আঁচড় দেওয়ার চেষ্টা করা হলে মুহুর্তে ষড়যন্ত্রের হোতা এসপির বাড়ি ধুলিসাৎ করে দেওয়া হবে ।
মুসলমানদের প্রাণ পুরুষ আল্লামা সাঈদীকে মুক্তিযোদ্ধাগণ কুরআনের মাহফিলের মঞ্চের দিকে নিয়ে আসছেন । সামনে শতশত হোন্ডা পথের দুইপাশে দুই সারিতে বিভক্ত হয়ে ধীর গতিতে এগিয়ে আসছেন । প্রতিটি হোন্ডার চালকের পিছনে আরেকজন মোজাহিদ রয়েছেন । কয়েকজনের হাতে বিউগল, বিউগল বাজিয়ে তাঁরা সংকেত দিচ্ছেন, ' পবিত্র কুরআনের সৈনিক আল্লামা সাঈদী আসছেন ।'
মুক্তিযোদ্ধাদের হোন্ডা মিছিল, তাদের পিছনের গাড়িতেই অবস্থান করছেন মুসলমানদের নয়নমণি আল্লামা সাঈদী । তাঁর পিছনে রয়েছে বিশাল গাড়ি বহর । অস্ত্র হাতে প্রহরারত পথের দুই পাশে দেশ ও জাতির অতন্দ্র প্রহরী মুক্তিযোদ্ধার দল । তাদের পিছনে অবস্থান গ্রহণ করেছেন বাংলার অগনিত বিপ্লবী জনতা । দৃষ্টি তাদের খোঁজে ফিরছে আকাংখিত মেহমানকে । তাঁকে একনজর দেখার জন্য সমবেত জনতার অগনিত দৃষ্টি থেকে ঝড়ে পড়ছে অদম্য ব্যাকুলতা । গাড়ি তাঁকে বহন করে ধীর গতিতে মঞ্চের কাছে পৌছতেই মুক্তিযোদ্ধাদের হাতের অস্ত্র গর্জে উঠলো । একুশবার তোপধ্বনি দিয়ে আল্লামা সাঈদীকে বরণ করে নেওয়া হলো । সেই সাথে তোপধ্বনির মাধ্যমে কুরআন বিরোধীদের জানিয়ে দেওয়া হলো, ' বিশ্ব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর খালিদ ঘুমিয়ে পড়লেও তাঁর অস্ত্র ঘুমায় নি- এ অস্ত্র ঘুমাবার নয়- মুসলমানদের অস্ত্র কখনো ঘুমায় না ।
আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে অপবাদঃ
"""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
১৯৭১ সালের পর থেকে আল্লামা সাঈদীর জনপ্রিয়তা দিনদিন বৃদ্ধি পেতে থাকলো । প্রতিটি মানুষের কর্ণকুহরে পৌছে গেল একটি প্রিয় নাম, 'আল্লামা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী । '
কুরআন বিরোধী শক্তি আতংকিত হয়ে উঠলো । শুরু করলো সাঈদীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার । নাস্তিকদের দল সর্বপ্রথম তাঁর দিকে যে অস্ত্র ছুড়লো তাহলো, ' সাঈদী প্রচুর অর্থ না পেলে কোনো মাহফিল করেন না ।' আল্লামা সাঈদী এই অপবাদের তীব্র প্রতিবাদ করে চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করলেন,' গোটা বাংলাদেশে কোথাও এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই যে, তিনি চুক্তি করে মাহফিল করেছেন বা টাকা চেয়ে নিয়েছেন । ' আজ পর্যন্ত কারো সাহস হয়নি তাঁর এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা ।
তিনি টাকার গোলাম নন- টাকার পেছনে সাঈদী ছুটে না, বরং তাঁর পেছনেই অর্থ সম্পদের পাহাড় ছুটে বেড়ায় । অর্থের নেশা যদি তাঁর থাকতো তাহলে তিনি কন্টকাকীর্ণ পথে পা না বাড়িয়ে কুসুমাস্তীর্ণ পথে পা বাড়িয়ে দিতেন । তিনি যদি পীর-মুরিদী শুরু করতেন, তাহলে তাঁর পায়ের কাছে যে অর্থের স্তুব জমা হতো, তা বহন করতে ট্রাকের প্রয়োজন হতো ।
আল্লামা সাঈদীকে বারবার মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করার জন্য প্রস্তাব দেয়া হইছিল । তাঁর যদি অর্থের নেশা থাকতো, তাহলে তিনি মন্ত্রীত্ব গ্রহণ করে ক্ষমতার স্বাদ অস্বাদন করে অর্থ সম্পদের পাহাড় গড়তে পারতেন ।
নাস্তিকদের এই অস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো । এবার তারা প্রচার করলো, ' সাঈদী তাফসীর মাহফিলে যা বলে থাকেন, তা তিনি যেমন পালন করেন না, তেমনি তাঁর পরিবারেও ইসলামের নাম-গন্ধ নেই । তাঁর মেয়েটি ঢাকা ভার্সিটিতে পর্দাহীনভাবে ইউরোপীয় স্টাইলে চলাফেরা করে । এভাবে তাঁকে জনবিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চললো । কিন্তু তাদের এই অপপ্রচারেও হালে পানি পেলো না । গোটা জাতি অভাব বিষ্ময়ে দেখলো আল্লামা সাঈদীর কোনো কন্যা সন্তানই নেই- চারজন পুত্র সন্তান মাত্র । আর তাঁদের চরিত্র কেমন, তা বিশ্বের কারো অজানা নয় । তারপর বলা হলো তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছেন, নারী ধর্ষণ করেছেন এবং এই সব অভিযোগে আজ তাঁকে আমৃত্যু কারাদন্ড দিয়েছে আওয়ামী সরকার । কাফিরদের স্মরণ রাখা উচিত, সবার অগোচরে নীরবে নিভৃতে থেকে মহান আল্লাহ সব কিছুই অবলোকন করছেন । ঈর্ষার অন্ধ ব্যক্তিদের ওপরে যথা সময়ে নেমে আসবে তাঁর নির্মম নিষ্ঠুর দন্ড ।
বিশ্বনবীর হিজরতের রাত্রের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো চাপাইনবাবগঞ্জের মাটিতেঃ
"""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
১৯৭১ সনের পরে দেশের শাসন ক্ষমতায় যে সরকার অধিষ্ঠিত হয়েছিল, তারা এদেশ থেকে ইসলামের শেষচিহ্ন মুছে ফেলার যাবতীয় কর্মসূচী গ্রহণ করেছিল । ইসলামের পক্ষে যেসব কন্ঠ ময়দানে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতো, তাদেরকে পাঠানো হয়েছিলো কারান্তরালে । সে সময় একটিমাত্র কন্ঠই ইসলামের পক্ষে সোচ্চার ছিল- আর সে কন্ঠটি ছিল আল্লামা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর ।
তাই তাঁকে হত্যা করার জঘন্য ষড়যন্ত্র করা হলো । ইসলামের দুষমনেরা এই নিকৃষ্ট কাজের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটিকে বেছে নিলো । তারা সেখানে একটি কলেজের প্রিন্সিপালের মাধ্যমে আল্লামা সাঈদকে তাফসীরের দাওয়াত দিলো । কুরআনে সৈনিক আল্লামা সাঈদী সহজ সরল মনে তাদের দাওয়াত কবুল করে মরহুম বখস খানকে সাথে নিয়ে নির্দিষ্ট তারিখে চাঁপাইনবাবগঞ্জের তাফসীর মাহফিলে উপস্থিত হলেন ।
অগনিত জনতা আল্লামা সাঈদীর কন্ঠে পবিত্র কুরআনের তাফসীর শুনলেন । মাহফিল শেষে বিশ্বাসঘাতকদের দল তাঁকে থাকতে দিল সদ্য নির্মিত একটি নির্জন বাড়িতে । যে বাড়িটির কোন একটি রুমেও তখন পর্যন্ত দরজা জানালা লাগানো হয় নি । আল্লামা সাঈদী অপেক্ষা করছেন, তাঁকে আহারের ব্যবস্থা করবেন, আহার করে তিনি ঘুমিয়ে পড়বেন । রাত ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর হয়ে গেল । আহারের ব্যবস্থা তো দূরের কথা, দাওয়াত দাতাগণ তাঁর সাথে সৌজন্যতা প্রদর্শন করতে এলো না । কাফিররা তখন আল্লামা সাঈদীর উপর হামলা করে তাঁকে হত্যা করার যাবতীয় ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেছে । তাদের এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের কথা মহান আল্লাহ তায়ালার অদৃশ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কতিপয় ঈমানদারের গোচরীভূত হলো । তাঁরা দ্রুত এসে আল্লামা সাঈদীকে বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্রের কথা জানিয়ে দিলেন ।
নেই মৃত্যু ভয় আর নৈরাশ্যের কোন চিহ্ন আল্লাহর সৈনিক আল্লামা সাঈদীর সদাহাস্যোজ্জ্বল চেহারায় । আল্লার সিদ্ধান্তের প্রতি রয়েছে তাঁর অটল বিশ্বাস । আগত ঈমানদারগণ বারবার অনুরোধ করেছেন আল্লামা সাঈদীকে আত্মগোপন করার জন্য । কিন্তু তিনি তাদেরকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন । অবশেষে তারা একপ্রকার জোর করেই তাঁকে সেই বাড়ি থেকে সরিয়ে নিলেন । তারা বললেন আপনার অবস্থানস্থলে আমরা থাকবো । বিশ্বাসঘাতকদের দল আপনাকে না পেয়ে আমাদের উপর আক্রমণ করবে কিন্তু এতে আমাদের কোন আফসোস নেই । বর্তমান সমাজে আপনার মত কুরআনের সৈনিকের বড় প্রয়োজন । আল্লাহ আপনাকে হেফাজত করুন ।
বিশ্বনবীর জীবনে হিজরত কালিন যে ঘটনা ঘটেছিলো, চাপাইনবাবগঞ্জের মাটিতে সেটার যেন পুনরাবৃত্তি ঘটলো । রাসুলকে হত্যা করার জন্য কাফিররা যখন তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিলো । আল্লাহর নির্দেশে নবী করীম সাঃ হযরত আলী রাঃ তাঁর বিছানায় ঘুমিয়ে থাকতে বললেন । হযরত আলী জানতেন, কাফিররা রাসুলকে না পেয়ে তাকে হত্যা করতে পারে কিন্তু এই নির্মম পরিনতির কথা জেনেও তিনি আল্লাহর নবী শয্যায় শয়ন করেছিলেন ।
এরই নাম নেতার প্রতি মমতা, এর নামই নেতার নির্দেশ পালন ।
মাওলানা খোদা বখস ( রহঃ) জানতেন, আল্লামা সাঈদী হলেন বাংলার মুসলমানদের কান্ডারী । তিনি অনুভব করলেন, ইসলামের শত্ৰুদের দল এতক্ষণ স্পষ্ট উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়ে গেল । তারা হন্যে কুকুরের মতো আল্লামা সাঈদীকে খুঁজে ফিরছে ।
সুতরাং এই পরিস্থিতিতে ইসলাম যে নির্দেশ দিয়েছে, সেই নির্দেশ বর্তমানে অনুসরণ করতে হবে । তিনি আল্লামা সাঈদীকে বাধ্য করলেন পোষাক পরিবর্তন করতে । মাথা থেকে টুপি ও গায়ে থেকে জামা খুলে নিলেন । অবশিষ্ট রইলো গায়ে গেঞ্জি আর পরনে সাধারণ একটি লুঙ্গি । আল্লাহর দ্বীনের এই সৈনিকের চিরপরিচিত চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেলে । এ অবস্থায় তাঁকে এখন দেখলে কেউ চিনতে পারবে না ।
গভীর রাত- চারদিকে অন্ধকার থমথম করছে । মাথার ওপরে তারা জ্বলা আকাশ । শ্বাপদ শংকুল অপরিচিত পায়ে চলা সংকীর্ণ মেটা পথ । আল্লাহর দ্বীনের দুই মুজাহিদ অজানার উদ্দেশ্যে ক্ষুধার্ত পেটে এগিয়ে যাচ্ছেন । অনাহার ক্লিষ্ট ক্লান্ত শ্রান্ত দেহ পা আর সামনের দিকে অগ্রসর হতে চায় না । পেছনে বিশ্বাসঘাতক হায়েনার দল তাদেরকে অনুসন্ধান করছে- চোখে তাদের রক্তের ঘৃণ্য নেশা ।
ক্লান্ত পা দুটোকে তাঁরা টেনে টেনে সামনের অপরিচিত গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন । কঠিন ঢিলা আর কাঁটার আঘাত পা দুটো ক্ষত- বিক্ষত রক্তাক্ত হয়ে যাচেছ । গোটা রাত তাঁরা চড়াই উৎরাই অতিক্রম করে অপরিচিত এক পল্লীতে এসে যখন উপনিত হলেন- পূর্ব গগনে তখন পূর্বাশার স্পষ্ট ইশারা । বনানী ঘেরা নিভৃত সেই পল্লীর এক বাড়ির কর্তার কাছে মাওলানা খোদা বখস আশ্রয় প্রার্থনা করলেন । মহান আল্লাহ সেখানে তাদের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করলেন ।
আল্লাহ তায়ালা সেদিন এভাবেই তাঁর কোরআনের সৈনিক আল্লামা সাঈদীকে হেফাজত করেছিলেন । ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন বাম- রামপন্থী, নাস্তিক- মুরতাদ আর কমিউনিস্টদের জঘন্য ষড়যন্ত্র ।
ওহুদের যুদ্ধের যেনো পুনরাবৃত্তি ঘটলো পাবনা শহরে ।
""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
১৯৭৪ সন । দেশ জুড়ে ধর্মনিরপেক্ষবাদের তান্ডব চলছে । ধর্মনিরপেক্ষ সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে আল্লামা সাঈদীকে গ্রেফতার করে তাঁর কন্ঠ স্তব্ধ করবে, অপরদিকে নাস্তিকরা সুযোগ খুঁজছে তাঁকে হত্যা করার । চারদিকে নাগিনীরা বিষ নিঃশ্বাস ফেলছে - আল্লামা সাঈদী তা অনুভব করছেন । যেকোন সময় তাকে হত্যা করা হতে পারে, এটা তাঁর অজানা নয় ।
চরম এই পরিবেশে পাবনা শহরের অদূরে পুষ্পপাড়া আলিয়া মাদ্রাসায় তাফসীর মাহফিলের আয়োজন করা হলো । সেখানে প্রধান অথিতি থাকবেন আল্লামা সাঈদী । একদিকে মহান আল্লাহর কুরআন প্রেমিক বান্দারা তাফসীরের আয়োজন করছেন, অপরদিকে ধর্মনিরপেক্ষ ঘাতকদের দল আল্লামা সাঈদীকে হত্যা করার ঘৃণ্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে ।
যথা সময় তাফসীর মাহফিল অনুষ্ঠিত হলো । অগনিত মানুষের ঢল নামলো তাফসীর মাহফিলে । সিন্ধান্ত হলো, মাহফিল শেষ করে করে আল্লামা সাঈদী পাবনা শহরে চলে যাবেন এবং সেখানে রাত যাপন করবেন । কিন্তু মাহফিল কর্তৃপক্ষের অনুরোধে তিনি আহার এখানে করলেন এবং মাদ্রাসার প্রধান মুহাদ্দিসের কক্ষে আহারে বসলেন । তাঁর সাথে মাদ্রাসার প্রধান মুহাদ্দিস নুরুল্লাহ সাহেবসহ আরো অনেকেই রয়েছেন । কিছু লোক গেলেন গাড়ি আনতে । গাড়ি আসলেই তিনি পাবনা শহরের দিকে রওয়ানা দিবেন ।
আহার শেষে হতেই হঠাত বিদ্যুৎ চলে গেলো । চারদিকে নিকষ অন্ধকার নেমে এলো । ইতিমধ্যেই আল্লামা সাঈদীকে জানানো হলো গাড়ি এসে গেছে । তিনি অন্ধকারেই অনুমানে দরজার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন আর ধর্মহীন ঘাতকদের দল তাঁকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে দরজার কাছে এগিয়ে আসছে । চারদিকে গাঢ় অন্ধকার । নিজের শরীর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না । আল্লামা সাঈদী অনুভব করলেন, কয়েকজন লোক তাঁকে ধাক্কা দিয়েই দরজার দিকে এগুচ্ছে । তারপর অনুভব করলেন, তাঁর পাশ থেকেই গুলি ছোড়া হচ্ছে । তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে গাড়ীতে উঠলেন এবং পাবনায় চলে গেলেন ।
পূর্ব থেকেই ঘাতকদের দল লক্ষ্য করছিলো যে, আল্লামা সাঈদী কোথায় বসে আহার করছেন এবং সেদিকেই তারা মারণাস্ত্রের লক্ষ্য স্থির করছিলো । আল্লামা সাঈদী যে স্থানে বসে আহার করেছিলেন তার পাশেই ছিলেন মাদ্রাসার প্রধান মুহাদ্দিস মাওলানা নুরুল্লাহ সাহেব ।
ঘাতকদের ছুড়ে দেওয়া এক ঝাঁক তপ্ত বুলেট গিয়ে তাঁকে ঝাঁঝরা করে ফেলল । ঘটনার স্থলের শাহাদাত বরণ করলেন তিনি ।
ওদিকে সারা পাবনা শহরে সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো যে, আল্লামা সাঈদী আর নেই ।
পাবনা শহরে যেন কারবালার মাতম শুরু হলো । নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ সবাই রাস্তায় নেমে এলো । ওহুদের ময়দানে আল্লাহর রাসুল নিহত হয়েছেন, কাফিরদের ছড়িয়ে দেওয়া এই মিথ্যা সংবাদে মদীনায় যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, সেই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটলো পাবনা শহরে । সারা শহর স্থবির অচল হয়ে গেল । অগনিত মানুষ যেন ক্রোধে ফেটে পড়তে চাইছে ।
মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করার জন্য সচেতন মহল মাইকের মাধ্যমে সারা শহরে জানিয়ে দিলেন যে, আল্লামা সাঈদী জীবিত আছেন এবং ভালোই আছেন । মাইকে ঘোষকের মুখ থেকে এই শুভ সংবাদ জানার পর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত হলো ।
মহান আল্লাহ তাঁর কুরআনের এই খাদিমকে এভাবেই সেদিন মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন ।
রাসুল সাঃ এর তায়েফ সফরের যেনো পুনরাবৃত্তি ঘটলো বীর চট্টলায় ।
"""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
ইসলামের শত্রুরা এমন কোন পথ অবশিষ্ট রাখেনি, যে পথে এগিয়ে গেলে তারা আল্লামা সাঈদীর কন্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করতে সক্ষম হবে । কিন্তু সবার উপরে যে আল্লাহ আছেন, তিনি ষড়যন্ত্রের যাবতীয় বেড়াজাল ছিন্ন করে তাঁকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, এটাই ছিল তাঁর সিদ্ধান্ত ।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এলাকার কতিপয় মুসলমান কুরআন তাফসীর মাহফিলের আয়োজন করে আল্লামা সাঈদীকে প্রধান মেহমান হিসেবে দাওয়াত দেন । কিন্তু আবু জেহেলের উত্তরসুরীরা বসে থাকেনি । তারা জনগণের মধ্যে প্রচার করে যে, আল্লামা সাঈদী কুরআন হাদীসের অপব্যাখ্যা দেন এবং তিনি বেদআতী । সুতরাং তাঁকে হত্যা করা সওয়াবের কাজ ।
তাদের ভিত্তিহীন প্রচারে জনগণ বিভ্রান্ত হয় । তিনি আসার পথে রাস্তাই তারা তাঁকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় । ওদিকে আল্লামা সাঈদীও নির্দিষ্ট দিনে তাফসীর মাহফিলের দিকে যাত্রা করেন ।
কুরআন প্রেমিক জনতা নাস্তিকদের ষড়যন্ত্র আঁচ করতে পেরে তাঁরা পথিমধ্যে তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে একটি বাড়িতে উঠিয়ে নেন ।
আল্লাহর কুরআনের সৈনিককে হত্যা করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে, এই ঘৃণ্য দৃশ্য সেদিনের সূর্যও বুঝি দেখতে চায়নি । গোটা আকাশ জুড়ে মেঘ ছেয়ে গিয়েছিল,বাতিলদের এই ঘৃণ্য তৎপরতায় মেঘমালাও নিজেকে স্থির রাখতে পারেনি । ফোটায় ফোটায় অশ্রু ঝরিয়ে ছিল সেদিনের বিস্তীর্ণ আকাশ জোড়া মেঘমালা । মুহুর্তেই আল্লাহর দুশমনেরা সেই বাড়িটিকে অস্ত্র হাতে ঘিরে ফেলল, যে বাড়িতে অবস্থান করছেন আল্লামা সাঈদী ।
আল্লামা সাঈদী ওজু করে প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন, তাঁর চির আকাংখিত শাহাদাতের, কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ভিন্ন । কোন একজন ব্যক্তি এই ভয়াবহ ঘটনার সংবাদ স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল । সেখান থেকে সংবাদ চলে যায় চট্টগ্রাম শহরে । চট্টগ্রাম শহরের একজন কুরআন প্রেমিক উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার আল্লামা সাঈদীকে খুব ভালোবাসতেন । তিনি তাঁকে ' আব্বা ' বলে সম্বোধন করতেন । তিনি দুই ট্রাক পুলিশ নিয়ে উল্কার গতিতে ঘটনাস্থলের দিকে ছুটলেন । দ্রুত তিনি পৌঁছে গেলেন আল্লামা সাঈদীর কাছে । তিনি তাঁর অধিনস্থ বাহিনীকে আদেশ দিলেন, ' গোটা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ো এবং যাকে যেখানে পাবে পিটিয়ে হাড় হাড্ডি ভেঙ্গে দাও । পুলিশ অফিসারের আদেশ আল্লামা সাঈদীর কর্ণে প্রবেশ করা মাত্রই তিনি প্রবল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলেন । তিনি বললেন, ' আমার জন্য আপনি এই এলাকার জনগণের উপর নির্যাতন করবেন না প্লিজ । ওরা বুঝতে পারেনি, ওরা ইসলামের দুশমনদের ষড়যন্ত্রের শিকার । আল্লাহর দিকে তাকিয়ে ওদেরকে ক্ষমা করে দিন । ক্রদ্ধ পুলিশ তাঁর অনুরোধে মত পরিবর্তন করে অধিনস্থদের আদেশ দিলেন, ' ঠিক আছে, গণপিটুনি দেওয়ার প্রয়োজন নেই, শুধু দোষীদের খুঁজে বের করে পিটিয়ে হাত পা ভেঙ্গে দাও ।'
চমকে উঠলেন আল্লামা সাঈদী - ভুলে গেলেন নাস্তিকদের নিষ্ঠুরতার কথা । তিনি করুণ কন্ঠে আবেদন জানালেন, আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, এই লোকগুলোর একটি পশমের ক্ষতিও আপনি করবেন না । বরং আপনি ওদেরকে কুরআনের কথা শোনার ব্যবস্থা করে দিন । পুলিশ অফিসার এবার নমনীয় হলেন, তিনি তাফসীর মাহফিলের আয়োজন করলেন । আল্লামা সাঈদী পবিত্র কুরআন থেকে তাফসীর শুরু করলেন ।
আল্লামা সাঈদীকে হত্যার নেশায় যাদের চোখগুলো ক্ষণিক আগে অগ্নি গোলকের মতই জ্বলে উঠেছিল, তাঁর কন্ঠ নিঃসৃত পবিত্র কুরআনের বাণী তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করা মাত্রই সেই চোখ থেকে অনুশোচনার অশ্রু গড়িয়ে পড়লো ।
আল্লামা সাঈদী বিশ্বনবীর আদর্শের একনিষ্ঠ অনুসারী । বিশ্বনবীকে তায়েফের ময়দানে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করা হয়েছে । তাঁর পবিত্র রক্তধারায় সেই শুষ্ক বালুকা মিশ্রিত মাটি শিক্ত হয়েছে । তিনি জ্ঞান হারা হয়ে পড়েছিলেন কিন্তু তাদেরকে কোন অভিশাপ দেন বরং ফিরেস্তারা এসে তায়েফ ধ্বংস করতে চাইলে তিনি বাধা দিয়ে বললেন, ওদেরকে ধ্বংস করা যাবে না, ওদেরকে ধ্বংস করে দিলে আমি কার কাছে কালেমার দাওয়াত নিয়ে যাবো ! ।
মক্কা বিজয়ের সময় তিনি মক্কাবাসীদের প্রতি ক্ষমার যে অপূর্ব দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক মানুষের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে ।
সেই নবীর অনুসারী আল্লামা সাঈদী - প্রেম ভালোবাসায় পরিপূর্ণ তাঁর হ্নদয় । তিনি কি পারেন সেই লোকগুলোর উপর প্রতিশোধ নিতে, যারা না বুঝে তাঁকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল ।
তাফসীর মাহফিলের শ্রোতাগণ যখন অনুভব করলো, তাদেরকে আল্লামা সাঈদী সম্পর্কে ভুল বুঝানো হয়েছে, তখন বেদনা আর অনুশোচনায় তাদের ভেতর কাঁন্নার রোল সৃষ্টি হলো । তাঁরা সেদিন শপথ গ্রহণ করেছিল, যতদিন তারা এই পৃথিবীতে জীবিত থাকবে, ততদিন তারা আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য জান মাল দিয়ে সংগ্রাম করবে । মহান আল্লাহর অসীম রহমতে আজ সেই সাতকানিয়া ইসলামী আন্দোলনের দূর্গে পরিণত হয়েছে ।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া এবং আল্লামা সাঈদী
""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
আল্লামা সাঈদী যাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন তাঁদের একজন ইমাম ইবনে তাইমিয়া । আল কুরআনের এই সৈনিককে কারারুদ্ধ করে, তাঁর কাছ থেকে লেখার উপকরণ ছিনিয়ে নিয়েও বাতিল শক্তি তাঁর গতিস্তব্ধ করতে পারেনি । তিনি কয়লা দিয়ে কারা প্রাচীরের গায়ে বাতিলের বিরুদ্ধে মহাসত্যের বাণী লিখতে থাকেন । কয়লা যখন শেষ হয়ে গেল তখন তিনি মহাসত্যের বিপ্লবী বাণী মহাগ্রন্থ আল কুরআন উচ্চ কন্ঠে তিলাওয়াত করে ইসলাম বিরোধী শক্তিকে জানিয়ে দেন, 'দুঃসহ নির্যাতন করে মুমিনদের কন্ঠ স্তব্ধ করা যায় না ।
এভাবেই ইসলামী আন্দোলনের সিপাহসালার ইবনে তাইমিয়া ( রহঃ) কারাগারে শাহাদাত বরণ করেন ।
ইবনে তাইমিয়া নামক শহীদি ফুল আল্লামা সাঈদীকে শুধু নয়- ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে শাহাদাতের সৌরভে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাতোয়ারা করে তুলছে ।
পৃথিবীতে বাতিল শক্তি নির্যাতন চালিয়ে সত্যকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে পেরেছে এমন দৃষ্টান্ত একটিও নেই । বরং বাতিলই নিশ্চিহ্ন হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত অগনিত । এই বিংশ শতাব্দীতেও সত্যের পতাকাবাহীগণ এধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন । বাতিল শক্তি সত্যের জাগরণে আতংকগ্রস্থ হয়ে আল্লামা মওদূদী, সাইয়েদ কুতুব, মাওলানা আব্দুর রহীম, আব্বাস আলী খাঁন ও বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের নেতা অধ্যাপক গোলাম ( রহঃ) কে কারারুদ্ধ করেও তাঁদের কন্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি ।
২০১০ সাল থেকে ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী ভয়াবহ নির্যাতন শুরু করেছে এদেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মীদের উপর । নির্যাতনের ফলে ইসলামী আন্দোলন সংকুচিত না হয়ে বরং আরো প্রসারিত হচ্ছে । বাতিল শক্তি আল্লামা সাঈদীকে গ্রেফতার করে তাঁর কন্ঠও স্তব্ধ করে রাখতে ব্যার্থ হয়েছে । লেখনীর সাহায্যে তিনি কারাগারে আবদ্ধ থেকেও সত্যের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার ' দায়ী ইলাল্লাহর' দায়ীত্ব পালন করে যাচ্ছেন ।
নির্যাতনের লোমহর্ষক তান্ডবের ঘৃণ্য ইতিহাস সৃষ্টি করেও বাতিল বিজয়ী হয়নি- কখনো হবেও না ইনশাল্লাহ ।
ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না
""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
ইতিহাস সাক্ষী, সত্যের বাহককে যারা সহ্য করেনি, তারাই জাহান্নামের যন্ত্রণাময় জীবনকে স্বাগত জানাতে বাধ্য হয়েছে । সত্যের বাহককে যারা বরদাশত করতে পারেনি, ঘৃণা ও লাঞ্ছনার বোঝা মাথায় নিয়ে তাদেরকে এ পৃথিবী ত্যাগ করতে হয়েছে ।
মিশরের হাছান আল বান্নাকে যারা সহ্য করতে পারেনি, তারা ঘৃণিত জীবন গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে । জামাল উদ্দিন আফগানীকে যারা সহ্য করতে পারেনি, তারা কেউ সম্মানের সাথে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারেনি । বদীউজ্জামান সাঈদ নুরসীকে যারা দুশমন মনে করছে, তারাও অত্যন্ত করুন পরিনতি বরণ করতে বাধ্য হয়েছে । আল্লামা মওদূদী রহঃ কে ফাঁসীর কুঠুরিতে নিয়েও বাতিল তাঁকে মাথানত করাতে ব্যার্থ হয়েছে । অবশেষে বাতিল শক্তিই তাঁর সামনে শির নোয়াতে বাধ্য হয়েছে । আল্লামা সাঈদীর কন্ঠ স্তব্ধ করার লক্ষ্যে প্রথমবারের মত যারা তাঁকে গ্রেফতার করেছিল, তাদের পিতা শেখ মুজিব লাঞ্ছিত, অপমানিত হয়ে মানুষের অভিশাপ কুড়িয়ে ধ্বসে পড়তে বাধ্য হয়েছে । ইসলামের বিপ্লবী মুজাহিদ আল্লামা সাঈদীর দিকে একটি আঙ্গুল উঁচু করে অশুভ ইংগিত করার অর্থ হলো হাতের আরো কয়েকটি আঙ্গুল অশুভ ইশারাদাতাকে সতর্ক সংকেত দেওয়া । ইসলামী আন্দোলনকে শত্রুদল হিসেবে চিহ্নিত করে যারাই এই মহান আন্দোলনের বিরোধীতা করেছে, তাদেরকে ইতিহাস ক্ষমা করেনি ।
দ্বিতীয়বারের মত কালের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের দিয়ে কারাগার পরিপূর্ণ করা হলো । ইসলামী আন্দোলনের সিপাহসালার আল্লামা সাঈদীকে গ্রেফতার করে কারাগারে আবদ্ধ করা হলো । বিশ্ব নন্দিত নেতৃবৃন্দের নাগরিকত্ব বাতিল করা হলো । মহান আল্লাহ সেই জালিম যুগের ফিরাউনের পৃথিবীর নাগরিকত্ব বাতিল করে দিলেন । ইতিহাস নির্মম প্রতিশোধ গ্রহণ করলো ।
আজ আল্লামা সাঈদীকে যারা জেলে বন্দী রেখে তাঁর উপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাচ্ছে, ওদেরকেও ইতিহাস ছাড়বে না । ফেরাউন, নমরুদ, আবু জেহেল, ওতবা, শায়বা এবং শেখ মুজিবের মত করুন পরিণতি ভোগ করে তাদেরকেও দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করতে হবে ।
আল্লামা সাঈদীর প্রথম কারাবরণ
""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
২৯ শে জুলাই - ১৯৭৫ সন- ইতিহাসের সেই কালো দিন, যেদিন ইসলামের এই সিপাহ্সালারকে খুলনা থেকে বাড়ি ফেরার পথে ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের নির্দেশে পুলিশবাহিনী তাঁকে গ্রেফতার করে । খুলনা থেকে বন্দী সাঈদীকে ঢাকার রাজারবাগ অফিসে নেওয়া হয় । সেখানে যখন তাঁকে হস্তান্তর করা হলো তখন তাঁকে খুলনা থেকে যে পুলিশ দল ঢাকায় নিয়ে এলো তাঁদের হাবিলদার পরম শ্রদ্ধাভরে আল্লামা সাঈদীর হাতে বিশটি টাকা তুলে দিয়ে আবেগ কম্পিত কন্ঠে বললেন, ' এটা আমার কষ্টার্জিত উপার্জনের টাকা, আপনি রাখুন প্রয়োজনে কাজে আসতে পারে ।'
হাবিলদারের আবেগের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তিনি তা গ্রহণ করলেন । সিআইডি অফিসে নেওয়া হলো আল্লামা সাঈদীকে, উদ্দেশ্য তাঁকে লাঞ্ছিত অপমানিত করা । কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, যুগে যুগে আল কুরআনের সৈনিকদের প্রতি যারা অসম্মান প্রদর্শন করেছে, তারা কেউ সম্মান নিয়ে দুনিয়া থেকে যেতে পারেনি । আল্লাহর রাসুলকে অসম্মান করার চেষ্টা করেছিল মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই । তার পরিনতিও শুভ হয়নি ।
রাজারবাগ সিআইডি অফিসে একজন ইসলাম বিদ্বেষী অফিসার আল্লামা সাঈদীর দাড়ি, টুপি দেখে কটাক্ষ করে আপত্তিকর মন্তব্য করেছিল, যার দায়ী ছিল তৎকালিন ধর্মনিরপেক্ষ সরকার ।
ইসলামী সাংস্কৃতির বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য শুনে আল্লামা সাঈদীর কন্ঠচিরে যে হাহাকার বেরিয়ে এসেছিল, তাঁর বুক চিরে যে দীর্ঘ নিঃশ্বাস আকাশ- বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছিল, তা দুলোক ভূলোক ভেদ করে মহান আল্লাহর আরশে গিয়ে পৌছেছিল । অভিশাপের যে ছায়াতলে আওয়ামী সরকার কালযাপন করছিল, সে অভিশাপ তাদের ওপরে ঘূর্ণির বেগে নেমে এলো । আল্লাহ তাঁর ফয়সালা গ্রহণ করলেন । এঘটনার মাত্র সতের দিন পরেই সংঘটিত হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক ১৫ই আগষ্ট ।
আজও যারা দ্বিতীয় বারের মত আল্লামা সাঈদীকে কারারুদ্ধ করে রেখেছেন । তাদের জন্য আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে ।
ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় অগনিত মানুষ নিহত- আল্লামা সাঈদী সম্পূর্ণ অক্ষতঃ
""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""""
বাংলাদেশ রেলওয়ের খুলনা মেইল চুয়াডাঙ্গার কাছে একবার ভয়াবহ দুর্ঘটনা কবলিত হয়েছিল । আল্লামা সাঈদী সেই ট্রেনের যাত্রী ছিলেন । প্রথম শ্রেনীর কামরায় তিনি নিজের আসনে বসে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন । হঠাত তাঁর কানে প্রবেশ করলো ভয়ংকর শব্দ আর বিপন্ন মানুষের মরণ আর্তনাদ । প্রচন্ড ঝাকুনি দিয়ে ট্রেনটি থেমে গেল ।
তিনি ঘটনা জানার জন্য কামরা থেকে বাহিরে এসে দেখলেন তিনি যে কামরায় অবস্থান করছেন, তার সামনের প্রায় সবগুলো কামরা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে রেল লাইনের দুই পাশে পড়ে আছে । অগনিত মানুষ ঘটনার স্থলেই মর্মান্তিক মৃত্যুর মুখে পতিত হয় । মানুষের হাত, পা, মাথা তথা গোটা শরীর ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে এদিক সেদিক পড়ে আছে । অত্যন্ত হ্নদয় বিদারক ভয়াবহ সে দৃশ্য । সাংবাদিকগণ সে সময় আল্লামা সাঈদীর কাছ থেকে ঘটনার বিবরণ নিয়েছিল । পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হয়েছিল, 'ভয়াবহ দুর্ঘটনা-অগনিত নিহত- মাওলানা সাঈদী সম্পূর্ণ অক্ষত' ।
মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর কুরআনের সৈনিহ আল্লামা সাঈদীকে সেইদিন সম্পূর্ণ অক্ষত রেখেছিলেন ।
যে আল্লাহ সেইদিন তাঁর এই প্রিয় বান্দাকে হেফাজতে রেখেছিলেন সেই আল্লাহ এখনো আছেন, ভবিষ্যতেও থাকবেন ।
যারা আল্লামা সাঈদীকে শেষ করতে চাইবে তারাই একদিন শেষ হয়ে যাবে । আল্লামা সাঈদীর কিছুই করতে পারবে না ইনশাল্লাহ ।