content
stringlengths
0
129k
অর্থাৎ, পিতৃত্বের ব্যাপারটা শতভাগ নিশ্চিত না হলেও মাতৃত্বের ব্যাপারটা নিশ্চিত
এখন চিন্তা করে দেখি - আমাদের পূর্বপুরুষেরা যখন বনে জঙ্গলে ছিলো অর্থাৎ শিকারী-সংগ্রাহক হিসেবে জীবন চালাতো, তখন কোন সুনিয়ন্ত্রিত একগামী পরিবার ছিলো না
ফলে পুরুষদের আরো সমস্যা হত নিজেদের 'পিতৃত্ব' নিয়ে
পিতৃত্বের ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়, কারণ বিবর্তনের সার্থপর জিনের ( ) ধারকেরা স্বার্থপরভাবেই চাইবে কেবল তার দেহেরই প্রতিলিপি তৈরি হোক
কিন্তু চাইলেই যে নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে তা তো নয়
সম্পর্কে প্রতারণা হয়
তার স্ত্রী যে অন্য কারো সাথে সম্পর্ক তৈরি করে গর্ভ ধারণ করবে না, তা সে কিভাবে নিশ্চিত করবে? আদিম বন-জঙ্গলের কথা বাদ দেই, আধুনিক জীবনেও কিন্তু প্রতারণার ব্যাপারটা অজানা নয়
গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকায় শতকরা প্রায় ১৩ থেকে ২০ ভাগ পুরুষ অন্যের সন্তানকে 'নিজ সন্তান' ভেবে পরিবারে বড় করে
জার্মানীতে সেই সংখ্যা ৯ থেকে ১৭ ভাগ
সারা বিশ্বেই মোটামুটিভাবে নন-জেনেটিক সন্তানকে নিজ সন্তান হিসেবে বড় করার হার শতকরা ৯ থেকে ১৫ ভাগ বলে মনে করা হয়[2]
বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় অন্যের (অর্থাৎ নন- জেনেটিক) সন্তানকে নিজ সন্তান ভেবে বড় করার এই প্রতারণাকে বলা হয় কাকোল্ড্রি (), যার বাংলা আমরা করতে পারি - কোকিলাচরণ[3]
চিত্র: সারা বিশ্বেই মোটামুটিভাবে নন-জেনেটিক সন্তানকে নিজ সন্তান হিসেবে বড় করার হার (কোকালিচরণ) শতকরা ৪ থেকে ১৫ ভাগ বলে মনে করা হয়
যে সমস্ত পুরুষেরা নিজেদের পিতৃত্ব নিয়ে সন্দিহান ( উপরের গ্রাফে লো কনফিডেন্স গ্রুপ হিসেবে চিহ্নিত) , তাদের পরিবারে নন-জেনেটিক সন্তান বেশি পাওয়া গেছে, প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ[4]
এখন কথা হচ্ছে, জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকে এর প্রভাব কি? প্রভাব হচ্ছে, কাকোল্ড্রি বা কোকিলাচরণ ঘটলে সেটা পুরুষের জন্য এক ধরণের অপচয়
কারণ সে ভুল ভাবে অন্যের জিনের প্রতিলিপি নিজের প্রতিলিপি হিসেবে পালন করে শক্তি বিনষ্ট করবে
এর ফলে নিজের জিন জনপুঞ্জে না ছড়িয়ে সুবিধা করে দেয় অন্যের জিন সঞ্চালনের, যেটা 'সেলফিশ জিন' পরতপক্ষে চাইবে না ঘটতে দিতে
ফলাফল? ফলাফল হচ্ছে, পুরুষেরা মূলতঃ 'সেক্সুয়ালি জেলাস' হিসেবে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বেড়ে উঠে
তারা নিশ্চিত করতে চায় যে, তার যৌনসঙ্গী বা স্ত্রী, কেবল তার সাথেই সম্পর্ক রাখুক, অন্য পুরুষের সম্পর্ক এড়িয়ে কেবল তার সাথেই চলুক
এইটা বজায় রাখতে পারলেই সে শতভাগ না হোক, অন্ততঃ কিছুটা হলেও নিশ্চয়তা পাবে যে, তার এই সম্পর্কের মধ্যে কোকিলাচরণ ঘটার সম্ভাবনা কম
এজন্যই ইসলামিক দেশগুলোতে কিংবা অনুরূপ ট্রেডিশনাল সমাজগুলোতে মেয়েদের হিজাব পরানো হয়, বোরখা পরানো হয়, কিংবা গৃহে অবরুদ্ধ রাখা হয়, কিংবা বাইরে কাজ করতে দেয়া হয় না - এগুলো আসলে প্রকারন্তরে পুরুষতান্ত্রিক 'সেক্সুয়াল জেলাসি'-রই বহিঃপ্রকাশ
চিত্র: ইসলামিক দেশগুলোতে কিংবা অনুরূপ সনাতন সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের যে হিজাব পরানো হয়, বোরখা পরানো হয়, কিংবা গৃহে অবরুদ্ধ রাখা হয় - এগুলো আসলে প্রকারন্তরে পুরুষতান্ত্রিক 'সেক্সুয়াল জেলাসি'-রই বহিঃপ্রকাশ (ছবির কৃতজ্ঞতা - ইন্টারনেট)
আসলে নারীকে অন্তরীণ করে, তাদের অধিকার এবং মেলামেশা সীমিত করার মাধ্যমে সে সব দেশে পুরুষেরা নিশ্চিত করতে চায় যে, কেবল তার জিনের প্রতিলিপিই তার স্ত্রীর শরীরে তৈরি হোক, অন্য কারো নয়
কারণ স্ত্রীর কোকিলাচরণ ঘটলে সেটা তার জন্য হয়ে উঠে 'সময় এবং অর্থের অপচয়'
পুরুষালী ঈর্ষার মূল উৎস এখানেই
ডেভিড বাস তার ' ' শীর্ষক গবেষণাপত্রে সেজন্যই লিখেছেন[5] -
'যেহেতু মানব শুক্রাণু দিয়ে ডিম্বানুর নিষেকের পুরো প্রক্রিয়াটিই নারীর দেহাভ্যন্তরে ঘটে, পুরুষের মধ্যে নিজের সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে
অপর পক্ষে মাতৃত্ব নিয়ে একটি নারীর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই, এখানে নিশ্চয়তা শতভাগ, তা সেটা যে শুক্রাণু দিয়েই নিষিক্ত হোক না কেন! কাজেই যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততা কেবল একটি পুরুষের (জেনেটিক) পিতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করতে পারে, নারীর মাতৃত্ব থেকে নয়
... এ সকল কারণে, বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, যৌনতার অবিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে কোন আলামত পাওয়া গেলে নারীদের চেয়ে পুরুষেরাই অধিকতর বেশি মণক্ষুন্ন হবে'
চিত্র: অধ্যাপক ডেভিড বাস সহ অন্যান্য গবেষকেরা তাদের গবেষণায় দেখেছেন পুরুষেরা নারীদের চেয়ে অনেক বেশি 'সেক্সুয়াল জেলাসি'তে ভোগে
যৌনতার অবিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে কোন আলামত পাওয়া গেলে নারীদের চেয়ে পুরুষেরাই অধিকতর বেশি মণক্ষুন্ন হয়
পুরুষেরা বেশি মনক্ষুন্ন হবে কারণ, বিবর্তনীয় পরিভাষায় প্রতারিত পুরুষের সঙ্গি গর্ভধারণ করলে তাকে অর্থনৈতিক এবং মানসিকভাবে অন্যের সন্তানের পেছনে অভিভাবকত্বীয় বিনিয়োগ করতে হবে, যার মুল্যমান জৈববৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন থেকে অনেক বলে মনে করা হয়
মূলতঃ তার অভিভাবকত্বের পুরোটুকুই বিনিয়োগ করতে হবে এমন সন্তানের পেছনে যার মধ্যে নিজের কোন বংশানুর ধারা বহমান নেই
স্বার্থপর জিনের দৃষ্টিকোন থেকে এটা এক ধরণের অপচয়ই বটে
নিজের পিতৃত্বের ব্যাপারে সংশয়ী থাকতে হওয়ায় বিবর্তনীয় যাত্রাপথে পুরুষের মানসপট যৌনতার ব্যাপারে ঈর্ষান্বিত হয়ে গড়ে উঠেছে, কিন্তু নারীরা মাতৃত্বের ব্যাপারে নিশ্চিত থাকায়, তা হয়নি[6]
অবশ্য স্বার্থপরভাবে নিজের জেনেটিক ধারা তার সঙ্গীর মাধ্যমে যেন বাহিত হয়, তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা মানুষ ছাড়া অন্য প্রানীর মধ্যেও দেখা যায়
যেমন, পুরুষ ভেলিড মাকড়শা ( ) তার সঙ্গিকে কব্জা করার পর কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত শুয়ে থাকে, যাতে সঙ্গম করুক আর নাই করুক, অন্ততঃ অন্য পুরুষ মাকড়শা যেন তার সঙ্গীর দখল নিতে চেষ্টা না পারে
নামের এক ধরণের পতঙ্গের (জনপ্রিয়ভাবে 'লাভ বাগ' হিসেবে পরিচিত) নিষেকের ক্ষেত্রেও পুরুষ পতঙ্গটি বেশ কয়েকদিন ধরে স্ত্রী পতঙ্গটিকে জড়িয়ে ধরে রাখে, যাতে অন্য কোন পতঙ্গ এসে এর নিষেক ঘটাতে না পারে
আবার, এক ধরণের ফলের মাছি আছে যাদের শুক্ররসের মধ্যে একধরণের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যা স্ত্রী-যোনিতে গিয়ে পূর্বাপর সকল শুক্রাণুকে ধ্বংস করে দেয়, এবং প্রকারান্তরে নিশ্চিত করতে চায় যে, কেবল তার শুক্রাণু দিয়েই নিষেক ঘটুক[7]
কিছু মথ এবং প্রজাপতির ক্ষেত্রে শুক্ররসের মধ্যে বিদ্যমান কিছু রাসায়নিক পদার্থ 'সঙ্গম রোধনী' ( ) হিসেবে কাজ করে
এর ফলে যোনির মধ্যে শুক্রাণু ঢুকে ডিম্বানুর প্রবেশপথে অনেকটা আঁঠার মত আটকে থাকে যেন পরে অন্য কোন কোন পুরুষের শুক্রাণু সেঁধিয়ে গিয়ে ঝোপ বুঝে কোপ মারতে না পারে! তবে সবচেয়ে চরম উদাহরণ আমি পেয়েছি নামের এক ধরণের মাছির ক্ষেত্রে , সঙ্গম শেষে যাদের পুরুষের লিঙ্গ ভেঙ্গে ভিতরে রয়ে যায়
এ যেন অনেকটা সঙ্গমান্তে নারীর যোনী ছিপি দিয়ে আটকে দেয়া - যেন অন্য প্রতিযোগীরা এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে না পারে
যদিও কীট পতঙ্গের সাথে মানুষের পার্থক্য উল্লেখ করার মতই বিশাল, কিন্তু তারপরেও সঙ্গীকে নিজের অধিকারে রাখার ব্যাপারে স্ট্র্যাটিজিগতভাবে মিল লক্ষ্যনীয়[8]
দুর্ভাগ্যবশতঃ অন্য পতঙ্গের মতো মানুষের শুক্রাণুতে সঙ্গম রোধনী আঁঠাও নেই, কিংবা পুরুষাঙ্গ ভেঙ্গে যোনীতেও থেকে যায় না, তবে বিভিন্ন সমাজে পর্দা, বোরখা আর হিজাবের বেপরোয়া প্রয়োগ দেখা যায় বৈকি
এগুলো তো এক ধরণের ছিপিই বলা চলে, কারণ এর মাধ্যমে পুরুষেরা নিশ্চিত করতে চায় যে, এ নারী অন্যের কামুক দৃষ্টি এড়িয়ে কেবল তারই অধিকারভুক্ত হয়ে থাকুক
পুরুষদের ঈর্ষার ব্যাপারটা না হয় বোঝা গেল
কিন্তু মেয়েদেরটা? মেয়েদেরও ঈর্ষা হয়, প্রবলভাবেই হয় - তবে, বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের অভিমত হল - সেটা ঠিক 'সেক্সুয়াল জেলাসি' নয়
মেয়েরা বিবর্তনীয় পটভুমিকায় একজন পুরুষকে রিসোর্স বা সম্পদ হিসেবে দেখে এসেছে
কাজেই একজন পুরুষ একজন দেহাপসারিনীর সাথে যৌনসম্পর্ক করলে মেয়েরা যত না ঈর্ষান্বিত হয়, তার চেয়ে বেশি হয় তার স্বামী বা পার্টনার কারো সাথে রোমান্টিক কিংবা 'ইমোশনাল' সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে
ডেভিড বাস, ওয়েসেন এবং লারসেনের নানা গবেষনায় এর সত্যতা মিলেছে [9]
এখানে আমি আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার উল্লেখ করব
প্রাথমিক একটি গবেষনার সন্ধান পাওয়া যায় ১৯৭৮ সালের একটি গবেষণাপত্রে[10]
২০ জন পুরুষ এবং ২০ জন নারীকে নিয়ে পরিচালিত সেই গবেষণায় ঈর্ষাপরায়ণ হওয়ার বিভিন্ন উপলক্ষ্য থেকে যে কোন একটি বেছে নিতে বলা হয়
অপশন গুলোর মধ্যে তার সঙ্গীর অন্য কারো সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন থেকে শুরু করে সঙ্গীর সময় এবং সম্পদ অন্য কারো জন্য বরাদ্দ করার মতো সব পথই খোলা ছিলো
দেখা গেলো বিশ জন নারীর মধ্যে সতের জনই সেই অপশন বাছাই করেছে - যেখানে তার সঙ্গী অন্য কারো জন্য নিজের সময় এবং সম্পদ ব্যয় করছে
কিন্তু অন্য দিকে বিশ জন পুরুষ সদস্যদের মধ্যে ষোল জনই অভিমত দিয়েছে তার সঙ্গী অন্য কারো সাথে যৌনসম্পর্ক গড়ে তুললে সেটা তাকে সবচেয়ে বেশি ঈর্ষাপরায়ণ করে তুলবে
এধরনের আরেকটি গবেষণা সত্তুরের দশকে চালানো হয়েছিলো পনেরটি দম্পতির মধ্যে[11]
সে গবেষণা থেকেও একই ভাবে উঠে এসেছিলো যে, পুরুষেরা ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠে যদি তার সঙ্গীর সাথে কোন তৃতীয়পক্ষের যৌনসম্পর্কের কোন আলামত পাওয়া যায়
কিন্তু মেয়েদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, তারা বেশি ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠে যদি তার সঙ্গী অন্য কোন মেয়ের সাথে আবেগী কিছু করলে - যেমন টাংকি মারা, রোমান্টিক সম্পর্কে জড়ানো, চুমু খাওয়া, এমনকি এগুলো কিছু না করে তার সঙ্গী পুরুষটি অন্য নারীর সাথে কেবল দীর্ঘক্ষণ ধরে কথাবার্তা বললেও সে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠে
এ গবেষণাগুলো থেকে বোঝা যায়, ছেলেরা তার সঙ্গী কার সাথে কতটুকু কথা বললো না বললো তা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকে না, যতটা থাকে সঙ্গীর যৌনতার বিশ্বস্ততার ব্যাপারে
কিন্তু অন্যদিকে মেয়েদেরটা একটু ভিন্ন
তাদের সঙ্গী অন্য কোন মেয়ের জন্য কতটুকু সময় এবং সম্পদ ব্যয় করলো, তা তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলে
এ ব্যাপারে বড় সড় গবেষণা করেছেন অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড বাস
৫১১ জন কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে চালানো এ গবেষণায় তাদের কল্পণা করতে বলা হয় যে, তার সঙ্গী কারো সাথে যৌনসঙ্গমে প্রবৃত্ত হয়েছে কিংবা কারো সাথে মানসিক আবেগময় এক ধরণের সম্পর্ক তৈরি করেছে
কোন ব্যাপারটা তাকে বেশি ঈর্ষাকাতর করে তুলবে? প্রায় ৮৩ শতাংস নারী মনে করেছে তার সঙ্গী তাকে না জানিয়ে অন্য কোন মেয়ের সাথে আবেগময় সম্পর্ক গড়ে তুললে সেটা তাকে ঈর্ষাপরায়ণ করে তুলবে, কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে সেটি মাত্র শতকরা ৪০ ভাগ
অন্যদিকে শতকরা ৬০ ভাগ ছেলে মত দিয়েছে তার সঙ্গী তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে অন্য কারো সাথে দৈহিক সম্পর্ক গড়ে তুললে সেটা তাকে চরম ঈর্ষাকাতর করে ফেলবে
মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা পাওয়া গেছে মাত্র ১৭ ভাগ[12]
বাসের এই ফলাফল কেবল আমেরিকার গবেষণা থেকে পাওয়া গেলেও পবর্তীতে কোরিয়া, জাপান, চীন, সুইডেন সহ অনেকে দেশেই একই ফলাফল পাওয়া গেছে বলে দাবী করা হয়েছে[13]
একই ধরণের ফলাফলের দাবী এসেছে হাঙ্গেরি, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, সোভিয়েত রাশিয়া এবং যুগোস্লাভিয়াতে চালানো সমীক্ষা থেকেও[14]
তাই বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীরা ধারনা করেন নারী-পুরুষে এই ঈর্ষাগত পার্থক্য সমগ্র মানব জাতির মধ্যেই পারিসাংখ্যিক পরিসীমায় বিস্তৃত
ধারণা করা হয় বিবর্তনের দীর্ঘদিনের যাত্রাপথে নিজের সঙ্গীকে ধরে রাখার অভিপ্রায়ে আমাদের পূর্বপুরুষরা যেভাবে ঈর্ষা প্রদর্শন করে প্রজননগত সফলতা পেয়েছিল, তার বিবিধ ছাপই দেখা যায় আজকের নারী পুরুষদের মানসপটে
বলা বাহুল্য নারী এবং পুরুষেরা ভিন্নভাবে সঙ্গি নিজেদের আয়ত্বে রাখার কৌশল করায়ত্ব করেছিলো, সেই পার্থক্যসূচক অভিব্যক্তিগুলোই স্পষ্ট হয় নারী পুরুষের ঈর্ষাকেন্দ্রিক মনোভাব ঠিকমতো বিশ্লেষণ করলে
তবে সবাই যে অধ্যাপক বাসের এ উপসংহারগুলোর সাথে একমত পোষণ করেছেন তা নয়
যেমন করেননি নর্দার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক ডেভিড বুলার
তিনি তার বই 'অভিযোজনরত মনন' ( ) বইয়ে[15] এবং বেশ কিছু প্রবন্ধে অধ্যাপক বাসের ঈর্ষা সংক্রান্ত গবেষণাগুলোর পদ্ধতিগত সমালোচনা হাজির করেছেন[16]
পুরুষেরা কেবল সঙ্গির যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার সন্ধান পেলেই কেবল ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেন, অন্য কিছুতে তেমন নয় বলে বাস যে অভিমত দিয়েছেন, তা সঠিক নয় বলে বুলার মনে করেন
আমরা জীবনানন্দ দাসের আকাশলীনা কবিতায় দেখেছি সুরঞ্জনা এক অচেনা যুবকের সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন নয়, কেবল কথা বলাতেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে
এ ধরণের অনেক পুরুষই আমাদের চারপাশে আছে
আবার যৌনতার ব্যাপারেও উদার পুরুষের সংখ্যাও কম নয়
যেমন, অধ্যাপক বাসের গবেষণা থেকেই উঠে এসেছে যে, জার্মানি কিংবা নেদারল্যণ্ডের মতো দেশে যেখানে যৌনতার ব্যাপারগুলো অনেক শিথিল, সেখানে পুরুষেরা সঙ্গির যৌনতার ব্যাপারে অনেক কম ঈর্ষাপরায়ণ থাকেন
কোরিয়া এবং চীনের মানুষদের উপর গবেষণা করেও দেখা গেছে সেখানকার পুরুষেরা সঙ্গির যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার আলামত পেলে অন্য অনেক দেশের পুরুষদের মতো খুব বেশি মনক্ষুন্ন হন না
আবার নারীদের ক্ষেত্রেও তারা কেবল সঙ্গির রোমান্টিক কিংবা 'ইমোশনাল' সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়, সঙ্গির রোমান্সবিহীন যৌন সম্পর্ককে নয় বলে ঢালাওভাবে উপসংহার টানা হয়েছে - সেটাও কতটুকু নিশ্চিত সে প্রশ্ন থেকেই যায়
আমরা কিছুদিন আগেই দেখেছি ক্যালিফোর্নিয়ার ভূতপূর্ব গভর্নর এবং খ্যাতিমান অভিনেতা আর্নল্ড শোয়ার্সনেগার এবং তার স্ত্রী মারিয়া শ্রাইভারের দীর্ঘ পঁচিশ বছরের বৈবাহিক সম্পর্ক ভেঙ্গে যেতে
আর্নল্ড শোয়ার্সনেগার বিবাহিত সম্পর্কের বাইরে তার বাসার গৃহপরিচারিকার সাথে যৌনসম্পর্ক রেখেছিলেন
এমন নয় যে, শোয়ার্সনেগার পরিচিকার সাথে কোন 'রোমান্টিক সম্পর্কে' জড়িয়েছিলেন
যৌনতার ক্ষেত্রে অবিশ্বস্ততার আলামত পাওয়াতেই মারিয়া শ্রাইভার শোয়ার্সনেগারকে ছেড়ে চলে গেছেন
অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নারীরা সঙ্গির যৌন-অবিশ্বস্ততাকে খুব গুরুত্ব দিয়েই গ্রহণ করে, অধিকাংশ পুরুষের মতোই
তাই অধ্যাপক বুলারের মতে বিবর্তন পুরুষ নারীতে ঈর্ষার কোন 'আলাদা মেকানিজম' তৈরি করেনি, বরং নারী পুরুষ উভইয়ই ঈর্ষাকেন্দ্রিক একই মেকানিজমের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, কেবল এর পরিস্ফুটন পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হয়
ঈর্ষার পরিনাম
এখন কথা হচ্ছে ঈর্ষার পরিণাম কীরকম হতে পারে? ছোট খাট সন্দেহ, ঝগরাঝাটি, দাম্পত্য কলহ, ডিভোর্স থেকে শুরু করে গায়ে হাত তোলা, মার ধোর থেকে শুরু করে হত্যা পর্যন্ত গড়াতে পারে, তা সবাই মোটামুটি জানেন
যেহেতু অধিকাংশ বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে, 'সেক্সুয়াল জেলাসি' জৈবিক কারণে পুরুষদেরই বেশি, তারাই পরকীয়া কিংবা কোকিলাচরণের কোন আলামত সঙ্গির মধ্যে পেলে গড়পরতা বেশি সহিংস আচরণ করে
সঙ্গি 'অযাচিত' সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে এই সন্দেহ একজন ঈর্ষাপরায়ণ পুরুষের মনে দানা বাঁধলে তিনি কি করবেন? অনেক কিছুই করতে পারেন
হয়ত স্ত্রী বা সঙ্গি একা বাড়ি থেকে বেরুলে গোপনে তার পিছু নেবেন, হয়তো অফিসে গিয়ে হঠাৎ করেই ফোন করে ব্সবেন জানতে তার স্ত্রী বা সঙ্গি এখন কি ঠিক করছেন, খোঁজ খবর নেবেন মার্কেটে যাবার কথা বলে স্ত্রী আসলেই মার্কেটে গিয়েছে নাকি ঢুকে গিয়েছে তার গোপন প্রেমিকের ঘরে
তিনি চোখে চোখে রাখবেন তার সঙ্গি কোন পার্টিতে, বিয়ে বাড়িতে কিংবা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গেলে কি করেন, কোথায় কার সাথে আড্ডা মারেন
সঙ্গির অবর্তমানে গোপনে তার ইমেইল পড়বেন, কিংবা সেলফোনের টেক্সটে নজর বুলাবেন, ইত্যাদি
এই আচরণগুলোর সমন্বিত একটি নাম আছে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের অভিধানে - ভিজিলেন্স (), এর বাংলা আমরা করতে পারি 'শকুনাচরণ'
শকুন যেমন উপর থেকে নজর রাখে তার শিকারের প্রতি, ঈর্ষাপরায়ণ পুরুষের আচরণও হয়ে দাঁড়ায় তার সঙ্গির প্রতি ঠিক সেরকমের
ভিজিলেন্সের পরবর্তী কিংবা ভিন্ন একটি ধাপ হতে পারে ভায়োলেন্স () বা সহিংসতা
সহিংসতার প্রকোপ অবশ্য ক্ষেত্র বিশেষে ভিন্ন হয়
কখনো সঙ্গির গায়ে হাত তোলা, কখনো বা সন্দেহের তালিকাভুক্ত গোপন প্রেমিককে খুঁজে বের করে করে থ্রেট করা, বাড়ি আক্রমণ করা, বেনামে ফোনে হুমকি ধামকি দেয়া, কিংবা নিজে গিয়ে কিংবা গুণ্ডা লেলিয়ে পিটানো, প্রকাশ্যে হত্যা, গুম খুন ইত্যাদি
রাষ্ট্রিয় আইনে ভিজিলেন্স বা শকুনাচরণ অপরাধ না হলেও ভায়োলেন্স বা সহিংসতা অবশ্যই অপরাধ