content
stringlengths
0
129k
সাম্প্রতিক সময়গুলোতে রুমানার মেটিং ভ্যালুর পারদ ছিলো সাইদের চেয়ে অনেক উর্ধগামী
সত্য হোক মিথ্যে হোক সাথে যোগ হয়েছিল ইরানী যুবক তাহের বিন নাভিদ কেন্দ্রিক কিছু 'রসালো' উপাখ্যান
সঙ্গি হারানোর ভয়ে ভীত এবং ঈর্ষান্বিত সাইদ ঝগড়া বিবাদ কলহের স্তর পার হয়ে একদিন নরপশুর মতোই ঝাপিয়ে পড়েছে রুমানার উপর
হত্যা করতে ব্যর্থ হয়ে তার দেহ করে ফেলেছে ক্ষতবিক্ষত
মুক্তমনায় লীন রহমান 'রুমানা মঞ্জুর ও নরকদর্শন' শীর্ষক একটি চমৎকার লেখা লিখেছেন[20]
লেখাটিতে সামাজিক বিভিন্ন অসঙ্গতির প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় বিধি নিষেধ যেগুলো নারীকে অবদমনের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হয় সেগুলো নিয়েও প্রাণবন্ত আলোচনা ছিলো
কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়
বস্তুত লীনার লেখাটির সাথে সামগ্রিকভাবে একমত হয়েও লেখাটির মন্তব্যে বলতে বাধ্য হয়েছিলাম -
"রুমানার উপর অত্যাচারের পেছনে ধর্মের ব্যাপারটা কতটুকু জড়িত তা নিয়ে সন্দেহ আছে আমার
ধর্মের কারণে যে অত্যাচার হয় না তা নয়, অনেকই হয়, তবে রুমানার ক্ষেত্রে ধর্মের চেয়েও প্রবলতর ব্যাপারটি হচ্ছে পুরুষালী জিঘাংসা
নারী যখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠে, শিক্ষা দীক্ষা, সংস্কৃতি এবং আর্থিক দিক দিয়ে তার সঙ্গিকে ছাড়িয়ে যায়, বহু পুরুষই তা মেনে নিতে পারে না
উচ্চশিক্ষায় রুমানার সফলতা সাঈদের ক্ষেত্রে তৈরি করেছে এক ধরনের হীনমন্যতা, ঈর্ষা আর জিঘাংসা
তারই শিকার রুমানা"
আমার বিশ্লেষণ যে ভুল ছিলো না, তা দেখা গিয়েছে জনকন্ঠে (১৮ই জুন ২০১১) প্রকাশিত প্রাথমিক রিপোর্টে
রিমান্ডের প্রথম দিনেই সাইদ স্বীকারোক্তি দিয়েছিলো - 'নিজ হীনম্মন্যতা থেকেই রুমানার চোখ উপড়ে ফেলতে চেয়েছি'
রুমানা এপিসোডের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এই আলোচনায় আসবে
পুলিশের হাতে দশদিন পর্যন্ত ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা এই তথাকথিত স্বামী রত্নটি রুমানার চরিত্র হননে নেমেছিল
ফাঁদা হয়েছিলো মিথ্যে প্রেমিকের সাথে এক রসালো গল্প
বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাগুলো এগুলো রসালো চাটনির মতোই পরিবেশন করেছে
রাতারাতি কিছু মানুষের সমর্থনও কুড়াতে সক্ষম হলেন সাইদ
অনেকেই ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে শুরু করলেন 'এক হাতে তালি বাজে না'
নিশ্চয়ই কোন গড়বড় ছিলো
পরে অবশ্য সাইদ নিজেই স্বীকার করেছিল যে, রুমানার পরকীয়ার গল্পগুলো বানানো, মিথ্যা
আমরা আগেও দেখেছি এ ধরণের ক্ষেত্রে পুরুষদের একটাই অস্ত্র থাকে নির্যাতিত মেয়েটিকে যে কোন ভাবে 'খারাপ মেয়ে' হিসেবে প্রতিপন্ন করা
সেই যে - ইয়াসমিনকে ধর্ষণ করেছিলো পুলিশেরা
এর পরদিন পুলিশেরা যুক্তির জাল বুনে বলেছিলো - ইয়াসমিন বেশ্যা, খারাপ মেয়ে
যেন খারাপ মেয়ে প্রমাণ করতে পারলে খুন ধর্ষণ, চোখ খুবলে নেয়া - সব জায়েজ হয়ে যায়! আসলে সত্য কথা হল সাইদ বুঝতে পেরেছিলো খারাপ মেয়ে প্রমাণ করতে পারলে 'পুরুষতন্ত্র'কে সহজেই হাতে রাখা যায়
ওটাই ছিলো সাইদের 'সারভাইভাল স্ট্র্যাটিজি'
সেজন্যই আমরা দেখলাম যে, রুমানাকে নিয়ে আগে বলা পরকীয়ার ব্যাপারগুলো সাইদ নিজ মুখে অস্বীকার করার আগ পর্যন্ত বেশ কিছু মানুষের সহানুভূতি আদায় করে নিতে পেরেছিলেন সাইদ
বাজারী পত্রিকা পড়ে তৈরি হওয়া জনমতের একটি বড়ো অংশ সাঈদ দোষ স্বীকারের আগ পর্যন্ত ক্রমাগত সন্দেহের তীর হেনেছে রুমানা মঞ্জুরের দিকে
শুধু পুরুষেরা নয়, এমনকি অনেক নারীও রুমানার প্রতি সন্দেহের 'অনেক আলামত' পেয়ে গিয়েছিলেন
এ থেকে কিন্তু বোঝা যায় পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা কেবল পুরুষদেরই আচ্ছন্ন করেনি, দীর্ঘদিনের কালীক পরিক্রমায় এটি অসংখ্য নারীর মানসপটেও রাজত্ব করেছে এবং এখনো করছে
হ্যা পরুষতন্ত্রকে কষে গালি দেয়া সহজ, কিন্তু কেন পুরুষতন্ত্রের মানসপট এভাবে বিবর্তিত হয়েছে তা বিশ্লেষণ করা তেমন সহজ নয়
সহজ নয় এটি বিশ্লেষণে আনা যে পরকীয়া শুনলেই কেন জনচেতনার সহানুভূতিতে আঘাত লেগে যায়, সবাই মরিয়া হয়ে উঠে তার বিপরীতটা প্রমাণ করতে
রুমানার কলঙ্কের কাউন্টার হিসেবে রুমানা কত নিষ্কলঙ্ক আর সতী সাধবী মেয়ে সেটা প্রমাণ করতে আবার কিছু পত্রিকা ফলাও করে প্রচার করতে শুরু করল - রুমানা কত মৃদুভাষী ছিলেন, তিনি দিনে পাঁচবেলা নামাজ পড়তেন, মাথায় কাপড় দিয়ে কানাডার প্রতিবেশীদের সাথে দেখা করতেন, সেখানে প্রতিবেশীদের সাথে কত মিষ্টি ব্যবহার তিনি করতেন, কত ভাল রান্না করে তাদের খাওয়াতেন, বিদেশ বিভূইয়ে কত ভালভাবে ইসলামী মতাদর্শ অনুযায়ী জীবন যাপন করতেন, অন্য ছেলেদের সাথে তেমন মিশতেন না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষেই কানাডা থেকে স্বামী সন্তানকে ফোন করার জন্য ছুটে আসতেন, বাইরে একদমই বেরুতেন না ইত্যাদি
এ সবকিছুই আসলে সেই চীরচেনা মানসপটকে তুলে ধরে - নারীকে গড়ে উঠতে হবে পুরুষদের বানানো ছকে -কথায় বার্তায় হয়ে হবে মৃদুভাষী, চলনে বলনে শান্ত সৌম, মাথায় কাপড় টেনে চলতে হবে, স্বামী হীনমন্য কিংবা নপুংশক যাই হোক না কেন, তাকে নিয়েই থাকতে হবে, তার প্রতি থাকতে হবে সদা অনুগত
অনেকটা বাংলা সিনেমার এই গানটার মতো -
'আমি তোমার বধু, তুমি আমার স্বামী
খোদার পরে তোমার আসন, বড় বলে জানি ...
://../?=19
পরকীয়া তো দূরের কথা, কোন ধরণের অবিশ্বস্ততার আলামত পেলে খুন জখম কিংবা চোখ খুবলে নেয়ার শাস্তিও সামাজিকভাবে লঘু হয়ে যায়
কারণ পুরুষেরা স্ত্রীদের অবিশ্বস্ততাকে প্রজননগতভাবে অধিকতর মূল্যবান বলে মনে করে
যেহেতু পিতৃতন্ত্রের মূল লক্ষ্য থাকে 'সুনিশ্চিত পিতৃত্বে সন্তান উৎপাদন' সেজন্য, পিতৃতান্ত্রিক সমাজে জৈবিক এবং সামাজিক কারণেই স্ত্রীর পরকীয়াকে 'হুমকি' হিসেবে দেখা হয়
স্ত্রী পরকীয়ার ঘটনা প্রকাশিত হয়ে গেলে স্বামী ক্ষতিগ্রস্থ হয় মান সম্মান, সামাজিক পদপর্যাদা সহ বহু কিছুতেই
তিনি সমাজে পরিণত হন ইয়ার্কি ফাজলামোর বিষয়ে
এটা শুধু আমাদের দেশে নয়, অনেক দেশের জন্যই সত্য
এমনকি পাঠকেরা জেনে অবাক হবেন যে, ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত আমেরিকার টেক্সাসে এমন আইন চালু ছিল যে, অবিশ্বস্ততার আলামত পেয়ে স্বামী যদি স্ত্রীকে হত্যা করে তবে সেটি কোন অপরাধ হিসেবে গন্য করা হবে না
প্রাচীন রোমে এমন আইন চালু ছিল যে, যদি স্বামীর নিজ গৃহে পরকীয়া বা ব্যাভিচারের ঘটনা ঘটে, তবে স্বামী তার অবিশ্বস্ত স্ত্রী এবং তার প্রেমিকাকে হত্যা করতে পারবেন; ইউরোপের অনেক দেশে এখনো সেসব আইনের কিছু প্রতিফলন দেখা যায়[21]
তিভ, সোগা, গিসু, নয়োরো, লুয়িয়া, লুয়ো প্রভৃতি আফ্রিকান রাজ্যে হত্যাকান্ডের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে যে, সেখানে ৪৬ শতাংশ হত্যাকাণ্ডই সংগঠিত হয় যৌনতার প্রতারণা, অবিশ্বস্ততা প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে
একইভাবে, সুদান উগান্ডা এবং ভারতেও যৌন ঈর্ষা বা 'সেক্সুয়াল জেলাসি' হত্যাকান্ড সংগঠিত হবার মূল কারণ বলে জানা গেছে
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, যখনই স্বামী কোন পরকীয়ার আলামত পেয়েছে, কিংবা স্ত্রী যখন স্বামীকে ত্যাগ করার হুমকি দিয়েছে তখনই সেই হত্যাকাণ্ডগুলো সংগঠিত হয়েছে
সাইদের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি স্বামীর সাথে বেশ কিছুদিন ধরেই রুমানার ঝগড়াঝাটি চলছিলে
কলহের এক পর্যায়ে রুমানা উত্তেজিত হয়ে স্বামীর সঙ্গে সংসার করতে অপারগতাও প্রকাশ করেছিলেন
এরপর থেকেই মুলতঃ রুমানাকে হত্যার পরিকল্পনা করে সাইদ
২১শে মে বেধরক মারধোরের পর গলা টিপে রুমানাকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়
এ সময় রুমানার চিৎকারে বাড়ির সবাই এগিয়ে গেলে সে যাত্রা পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়
পরে পরিবারের হস্তক্ষেপে তা মিটমাট হয়
তারপর কিছুদিন পরে রুমানার মা মেহেরপুরে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গেলে ৫ ই জুন আবারো হত্যার চেষ্টা চালায়
সে দিন সাইদ রুমানাকে ঘরে ডেকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়
এ সময় উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে রুমানার গলা টিপে ধরে
রুমানা সজোরে আঘাত করে নিজেকে মুক্ত করে ফেলেন
এ সময় সাইদের চোখের চশমা পড়ে যায়
এমন পরিস্থিতিতে রুমানাকে বীভৎসভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে তার গাল, নাক, মুখসহ স্পর্শকাতর স্থানে কামড়াতে থাকে
সাইদ রুমানার নাকে কামড় দিয়ে ছিড়ে ফেলে
চোখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা করে ...
হ্যা, আমরা সবাই সাইদের কৃতকর্মের শাস্তি চাই
কোন সুস্থ মাথার মানুষই প্রত্যাশা করবেন না যে, এ ধরণের নৃশংস ঘটনা ঘটিয়ে সাইদ অবলীলায় মুক্তি পেয়ে যাক, আর তৈরি করুক আরেকটি ভবিষ্যৎ-অপরাধের সুস্থিত ক্ষেত্র
বরং, তার দৃষ্টান্তমুলক শাস্তিই কাম্য
কিন্তু সমাজে যখন নারী নির্যাতন প্রকট আকার ধারন করে, যখন নৃশংসভাবে একটি নারীর গাল নাক কামড়ে জখম করা হয়, রাতারাতি চোখ খুবলে নেয়া হয়, এর পেছনের মনস্তাত্বিক কারণগুলোও আমাদের খুঁজে বের করা জরুরী
আমাদের বোঝা দরকার কোন পরিস্থিতিতে সাইদের মত লোকজনের আচরণ এরকম বিপজ্জনক এবং নৃশংস হয়ে উঠতে পারে
আমাদের অস্তিত্বের জন্যই কিন্তু সেগুলো জেনে রাখা প্রয়োজন
ভবিষ্যতে একটি সুন্দর পৃথিবী তৈরির প্রত্যাশাতেই এটা দরকার
চলবে মনে হচ্ছে...
তথ্যসূত্র :
[1] . , : , , 2000
[2] ' ? 10-15% ? ://..///2730/--; - ., . ., - . 338:869-871, 1991; .. & .. , : , , ,1999
[3] কাকোল্ড্রি বা কোকিলাচরণ শব্দটি এসেছে কোকিলের অন্য পাখির বাসায় ডিম পেড়ে ন্য পাখিদের সাথে প্রতারণা করার উপমা থেকে
কোকিলেরা এভাবে অন্য পাখির সাথে প্রতারণা করে ডিমে তা দেয়া কিংবা সন্তান লালন পালনের হাত থেকে অব্যহতি পায়
মানুষের ক্ষেত্রে কোকিলাচরণের মাধ্যমে অন্য পুরুষের প্রণয়াসক্ত স্ত্রীটি স্বামীর নিজের সন্তান হিসবে প্রতারিত করে সন্তান লালন পালনে প্রলুব্ধ করে
[4] . , : ? , 48(3):511-518.
[5] , . , 4, 47-58, 2002.
[6] . , : , , - , ; , 2008
[7] .. , .. , . . 5:48-52,1990.
[8] . , - 4 , , 2003
[9] , .., , .., , ., & , . (1992). : , , . , 3:251-5 দ্রষ্টব্য
[10] , , , . 1978 ;42(3 2):1211-6
[11] . . , , , 10, 61-69, 1977
[12] . , : , , 2000
[13] উদাহরণ হিসেবে দ্রষ্টব্য নীচের গবেষণাপত্রগুলো -
.. , . , .. -, & , .. : . , 16, 355-383, 1995
. ,., & . , , , : . , 20, 121-128, 1999.
[14] . , - 4 , , 2003
[15] . , : , ; 2005.
[16] . , , & : , , 12 1, : ://../_/---/
[17] এ ব্যাপারটি সঙ্গী নির্বাচনের মেটিং স্ট্র্যাটিজির সাথে জড়িত
বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের সমীক্ষায় দেখা গেছে সঙ্গী নির্বাচনের সময় সময় ছেলেরা সঙ্গীর দয়া, সততা, বুদ্ধিমত্তা প্রভৃতির গুণাবলীর পাশাপাশি প্রত্যাশা করে তারুন্য এবং সৌন্দর্য
অন্যদিকে মেয়ারাও গড়পরতা ছেলেদের কাছ থেকে দয়া, বুদ্ধিমত্তা আশা করে ঠিকই, পাশাপাশি সঙ্গীর কাছ থেকে আশা করে ধন সম্পদ আর স্ট্যাটাস
এনিয়ে আলোচনা করা হয়েছে পরবর্তী অধ্যায়ে
[18] . . , , & , . . , : , , . : & ,1995.
[19] . , : , , 1993.