content stringlengths 0 129k |
|---|
সে সময়কার কথা তিনি এভাবে স্মরণ রেখেছেন,"...জার্মানিতে যখন উপস্থিত হলাম, তখন দেখি প্রায় সকলেই আমার প্রবন্ধ পড়ছেন ও আলোচনা করছেন |
স্বয়ং আইনস্টাইন আমার নতুন সংখ্যায়ন রীতিতে বস্তুকণার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে এর প্রয়োগক্ষেত্র অনেক বাড়িয়ে দিয়েছেন |
মুল কথা হলো পদার্থবিজ্ঞানে সত্যেন বোসের অনন্যসাধারণ অবদান আছে, এবং সেই অবদানের স্বীকৃতি তিনি পেয়ছেন, গুরুত্বপূর্ণ একটা কণা-পরিবার তার নাম ধারণ করে আছে |
কিন্তু তার মানে এই নয় যে সম্প্রতি লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে যে হিগ্স কণা আবিষ্কৃত হয়েছে সেটা তার মাথা থেকেই বেরিয়েছিল, কিংবা সত্যেন বোসের আইডিয়া ইউরোপিয়ানরা মেরে দিয়েছে |
কী নিদারুণ অজ্ঞতা |
পলির মতই বলতে হয় ' ' |
একটা উদাহরণ দেই |
নাসায় 'চন্দ্রশেখর টেলিস্কোপ' বলে একটা টেলিস্কোপ আছে যেটা পদার্থবিজ্ঞানে চন্দ্রশেখরের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নামাঙ্কিত করা হয়েছে |
কেউ যদি বলেন এই টেলিস্কোপের আইডিয়াটা চন্দ্রশেখরের মাথা থেকেই বেরিয়েছিল, আর নাসার বিজ্ঞানীরা তা মেরে দিয়ে একটা বড় সড় টেলিস্কোপ বানিয়ে নিজেদের করে রেখেছেন - এটা যেমন শোনাবে, সত্যেন বোসকে 'ঈশ্বর কণার' জনক বলে জাহির করার চেষ্টাটাও সেরকমই |
পথের পাঁচালী সিনেমাটার সাথে সত্যজিত রায়ের সম্পর্ক থাকলেও পরিচালকের নামের সাথে অভিজিৎ রায়ের সাথে কেবল নামের শেষাংশের কাকতালীয় মিল ছাড়া আর কিছু নেই |
কিন্তু এই মিলের সূত্র ধরে যদি আমি সিনেমাটির জনক সাজার চেষ্টা করি, তাহলে যেমন দেখাবে, হিগ্স বোসন কণায় বোসন দেখেই সত্যেন বোসকে জনক বানানোর প্রচেষ্টাটাও সেরকমই |
অবশ্য যারা রাম বললেই রামছাগল বোঝেন তাদের পদবী থেকে রাম শব্দটা কেটে ফেলাই বাঞ্ছনীয় ঠিক যেমন বাঞ্ছনীয় গড পার্টিকেল থেকে গড শব্দটা ছেঁটে ফেলার |
ঈশ্বর কণা নিয়ে অযথা বিতর্ক |
এ ব্যাপারটা নিয়ে অপার্থিব ইতোমধ্যেই চমৎকার একটা লেখা লিখেছেন |
হিগ্স বোসনের নাম ঈশ্বর কণা মোটেই ছিলো না প্রথমে |
এমনকি এখনো পদার্থবিজ্ঞানের সরকারী পরিভাষায় এটা নেই |
এটা 'ঈশ্বর কণা' হিসেবে পরিচিতি পায় নোবেল প্রাইজ বিজয়ী বিজ্ঞানী লিওন ল্যাডারম্যানের একটি বইয়ের প্রকাশনার পর |
বইটার শিরোনাম ছিলো - : , ? বলা হয় কণাটির গুরুত্ব বোঝাতে নাকি ঈশ্বর শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছিল |
তবে মজার ব্যাপার হল, লেখক নাকি নিজেই বইটির নাম ঈশ্বর কণা না রেখে 'ঈশ্বর-নিকুচি' কণা ( ) হিসেবে রাখতে চেয়েছিলেন |
ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার উৎস উল্লেখ করে লেখা হয়েছে এখানে - |
...অনাবিষ্কৃত কণাটির গুরুত্ব সাধারণ মানুষকে বোঝাতে ১৯৯৩ সালে কলম ধরেছেন লিও লেডারম্যান |
বইয়ের নাম কী হবে? লেডারম্যান বললেন, "নাম হোক হিগ্স বোসন |
" ঘোর আপত্তি প্রকাশকের |
, "এমন নামের বই বিক্রি হবে না |
ভাবা হোক জুতসই কোনও নাম |
" বিরক্ত লেডারম্যান বললেন, "তা হলে নাম থাক গডড্যাম পার্টিক্যাল |
" অর্থাৎ, দূর-ছাই কণা |
প্রকাশক একটু ছেঁটে নিলেন সেটা |
বইয়ের নাম হল 'দ্য গড পার্টিকল' |
নামের মধ্যে ঈশ্বর! বই বিক্রি হল হু হু করে |
ব্যাপারটা ঠিক এরকমভাবেই ঘটেছিল কিনা তা পুরোপুরি নিশ্চয়তা দিয়ে না বলা গেলেও লেখক আসলে তার বইয়ের জন্য গড পার্টিকেলের বদলে গডড্যামন পার্টিকেল ( ) প্রস্তাব করেছিলেন,আর প্রকাশক শেষ সময়ে সেটা পরিবর্তন করেন, তার উল্লেখ আছে এখানে, এখানে কিংবা এখানে |
অপার্থিব তার প্রবন্ধে লিখেছেন - |
হিগ্স্ কণা কে ঈশ্বর কণা বলা হয় কেন? ঈশ্বর কণা পদার্থবিজ্ঞানের সরকারী পরিভাষায় নেই |
নোবেল পদাথবিজ্ঞানী লীয়ন লেডারময়ান তাঁর ১৯৯৩ এর বই " : , ?" তে হিগ্স্ কণা কে ঈশ্বর কণা বলে উল্লেখ করায় সাধারণ্যের ভাষায় এই নামকরণ স্থান পেয়ে গেছে |
বিজ্ঞানে কম সচেতন বা অজ্ঞদের অনেকেই এই কারণে হিগ্স্ কণা আবিস্কারকে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ বলে ভুল করছে |
যেমনটা স্টিফেন হকিং এর " " এর উপসংহারে "ঈশ্বরের মন জানার" কথা বলায় এটাকে অনেকে হকিংএর ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসের সাক্ষ্য হিসেবে দেখেছিল |
কিন্তু হকিং, লেডারম্যান এরা কেউ আস্তিক নন |
হিগ্স্ কণার প্রবক্তা হিগ্স্ একজন নাস্তিক |
হকিং, লেডারম্যান উভয়ই রূপক অর্থে বা আলঙ্কারিকভাবে "ঈশ্বর" শব্দ ব্যবহার করেছিলেন |
ঈশ্বর কণার আবিষ্কারের সাথে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সম্পর্ক একটা কমলার সাথে বুধবারের যে সম্পর্ক সেরকম |
তার কথা অত্যুক্তি নয় |
পিটার হিগ্স যে নাস্তিক এবং নিজেই হিগ্স কণাকে 'ঈশ্বর কণা' বলার সাথে একদমই একমত নন, তার প্রমাণ মেলে এখানে |
তার ভাষ্যেই - |
, ' , . |
হিগসের মতেও পদার্থবিজ্ঞানী লিওন ল্যাডারম্যান আসলে বইটার নাম 'গডড্যামন পার্টকেল' বা ঈশ্বর-নিকুচি কণা রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রকাশকের অপারগতায় পারেননি |
লিওন ল্যাডারম্যানের 'গড পার্টিকেল' শিরোনামের বইটা আমার কাছে আছে, সেটা ২০০৬ সালে পুনর্মুদ্রিত |
সেটার জন্য আলাদা করে ভূমিকাও লিখেছেন তিনি |
বইটা এমনিতে খুবই দুর্দান্ত, সহজ সরল এবং সাবলীল ভাষায় রসিকতা করে বইটা লেখা |
আমি জানিনা পাঠকেরা বইটি পড়েছেন কিনা, বইটা কিন্তু খুব মজাদার একটা বই |
এমন নয় যে ঈশ্বর কিংবা ঈশ্বর কণা সম্বন্ধে শ্রদ্ধায় মরে গিয়ে কিংবা ভাবে বিগলিত হয়ে বইটি লিখেছেন, বরং বইটি পড়লে বোঝা যায়, এগুলো নিয়ে ঠাট্টা তামাসাই করেছেন বেশি |
যেমন একটা জায়গায় (পৃষ্ঠা ২২) তথাকথিত ঈশ্বর কণাকে 'সবচেয়ে বড় শয়তান/খলনায়ক' আখ্যায়িত করে লিখেছেন ... |
. ' - , . |
! !.... |
এ ধরণের রসিকতা আছে সাড়া বইটা জুড়েই |
সেখানেও থেমে থাকলে অসুবিধার কিছু ছিলো না |
একে তো বিশ্বাসীরা লিওন ল্যাডারম্যানের রসিকতা বোঝেননি, তার উপর এখন সার্নে ঈশ্বর কণার অস্তিত্বের প্রমাণকে ধরে নিলেন ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে (কৃতজ্ঞতা কৌস্তুভ)- |
আবার কেউ কেউ এর মধ্যেই করতে শুরু করেছেন ধর্মগ্রন্থের মধ্যে আয়াতের সন্ধান |
এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোতে সংবাদটি পরিবেশনের পর 'বিজ্ঞ' কিছু পাঠকের মতামত ( অপার্থিবের লেখায় আকাশ মালিকের একটি মন্তব্য দ্রঃ) - |
বোঝাই যাচ্ছে রামছাগল থেকে রাম ছেঁটে ফেললেও প্রকৃতির পরিবর্তন সামান্যই হয় |
অনেকে মনে করেন, এই ঈশ্বর কণা নামকরণের পেছনে নাকি গবেষণায় সরকারী ফান্ড পাওয়ার সম্ভাবনার ব্যাপারটা কাজ করেছিল |
সেসময় রক্ষণশীলদের দখলে থাকা কংগ্রেস "গড" এর টোপ গিলে অর্থায়নে রাজী হবে, এমন ভাবনাও হয়তো কাজ করে থাকবে এর পেছনে |
তবে পেছনে উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি হিগ্স বোসন কণাকে ঈশ্বর কণা হিসেবে উপস্থাপন করার মধ্যে লাভের চেয়ে ক্ষতিই হয়েছে বেশি |
বৈজ্ঞানিকভাবেও ব্যাপারটা অর্থহীন |
হিগ্স কণা যত গুরুত্বপূর্ণ কণাই হোক না কেন, শেষ বিচারে একটা কণাই |
আর সবচেয়ে বড় কথা হিগসের চেয়েও প্রাথমিক কিছুর সন্ধান যদি কখনো বিজ্ঞানীরা পান - যেমন স্ট্রিং - তখন তাদের কী হিসেবে চিহ্নিত করা হবে? 'মাদার অব গড পার্টিকেল? নাকি খোদার বাপ? |
আর তাছাড়া হিগ্স সম্বন্ধে জেনে ফেলা মানেই সব জ্ঞান অর্জিত হয়ে যাওয়া নয় |
মহাকর্ষ, গুপ্ত পদার্থ, গুপ্ত শক্তি, স্ট্রিং তত্ত্বের অতিরিক্ত মাত্রা সহ অনেক অমীমাংসিত বিষয়ের সমাধান হিগ্স দিতে পারেনি, সেজন্যই সার্নের মেনুতে আরো অসংখ্য খাবারের অর্ডার আছে |
সেগুলো খেয়ে শেষ না করা পর্যন্ত কাউকে ঈশ্বর বানানো অনেকটা বালখিল্যই |
তবে আশার ব্যাপার হল, আমরা জেনেছি - সার্নের পুরো কনফারেন্সে বিজ্ঞানী ও সাংবাদিক সবাই এই নামটা সচেতনভাবে এড়িয়ে চলেছেন |
এমনকি সাংবাদিক সম্মেলনেও সতর্ক করে দেয়া হয়েছে এই নাম উচ্চারণ না করতে |
চলুন আমরাও সার্ণের বিজ্ঞানীদের মতো সচেতনভাবে এটিকে ঈশ্বর কণা হিসেবে আখ্যায়িত করা থেকে বিরত থাকি, আর ডঃ ডেভ গোল্ডবার্গের মতো অন্যদেরও আহবান জানাই - |
স্টপ কলিং ইট গড পার্টিকেল |
*বিদ্রঃ ও হ্যা, এটা বোধ হয় না বললেও চলে যে লেখাটির শিরোনামের শেষাংশ (প্রলয়-নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে) রবীন্দ্রনাথের একটি সুপরিচিত গানের বানী থেকে ধার করা 🙂 |
প্রলয়-নাচন নাচলে যখন আপন ভুলে |
হে নটরাজ, জটার বাঁধন পড়ল খুলে॥ |
জাহ্নবী তাই মুক্তধারায় উন্মাদিনী দিশা হারায়, |
সঙ্গীতে তার তরঙ্গদল উঠল দুলে॥ |
রবির আলো সাড়া দিল আকাশ-পারে |
শুনিয়ে দিল অভয়বাণী ঘর-ছাড়ারে |
আপন স্রোতে আপনি মাতে, সাথি হল আপন-সাথে, |
সব-হারা সে সব পেল তার কূলে কূলে॥ |
পোস্ট শেয়ার করুন |
: অভিজিৎ |
অভিজিৎ রায় |
লেখক এবং প্রকৌশলী |
মুক্তমনার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক |
আগ্রহ বিজ্ঞান এবং দর্শন বিষয়ে |
নিউটনীয় মহাবিশ্ব ও জড়তার উৎস |
নিউটনীয় মহাবিশ্ব ও জড়তার উৎস |
নভেম্বর 27, 2021 | 1 |
এক মানবিক পৃথিবীর পথ |
এক মানবিক পৃথিবীর পথ |
সেপ্টেম্বর 23, 2021 | 1 |
মাটি- মহাকাশের সঙ্গে জীবনের যোগ খুজতে |
মাটি- মহাকাশের সঙ্গে জীবনের যোগ খুজতে |
জুলাই 6, 2021 | 3 |
"আত্মীয়তার প্রমাণাদি" |
"আত্মীয়তার প্রমাণাদি" |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.