content
stringlengths
0
129k
তবে রুমের চারকোনায় চারটা টেবিল ল্যাম্প জ্বালানো রয়েছে যেগুলোর উজ্জ্বল হলুদাভ আলোতে রুমের সবকিছুই মোটামুটি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে
ছেলেগুলোর প্রত্যেকে মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে এবং একইসাথে কোমর সোজা রেখে 'নীল-ডাউন' ( ) ভঙ্গীতে এক লাইনে দাঁড়িয়ে আছে
লাইনের সবচেয়ে যে সামনে রয়েছে, তারও সামনে একটা চেয়ারের গায়ে লম্বা একটা লাঠিতে লাল-কালো রঙা একটা পতাকা জড়ানো রয়েছে এবং পতাকার দু'পাশে মাটিতে কতগুলো মোমবাতি জ্বলছে
প্রত্যেকেই 'নমষ্কার' ভঙ্গীতে দুইহাত একসাথে করে চোখ বুজে রয়েছে
ছেলেগুলোর সবার মুখ রুমের সামনের দিকের পতাকার দিকে ফেরানো কেবল একজন ছাড়া
এই ছেলেটা পতাকার অপর পাশে বাকি ছেলেগুলোর দিকে মুখ করে একইরকম 'নীল-ডাউন' ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে কি কি যেন বলছে এবং বাকিরাও প্রত্যুত্তরে কি কি যেন বলছে
আমি কৌতুহলী চোখে ব্যাপারটা লক্ষ্য করতে থাকলাম
একটু পরই তাদের 'রিচুয়াল' শেষ হলো
মোমবাতি নেভানো হলো; টেবিল ল্যাম্পগুলোও নেভানো হলো এবং প্রায় একইসাথে রুমের সাদা টিউব লাইটগুলো জ্বলে উঠলো
মাথা থেকে লাল ফিতা খুলে ফেলে ছেলেগুলো রুমের দরজা খুলে করিডরে বেরিয়ে আসতে শুরু করলো
সবচেয়ে আগে বেরুনো ছেলে দু'টো শ্যেন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো
ওদের চোখের দিকে তাকিয়ে কেন জানি অপার্থিব একটা অনুভূতি আমার মেরুদন্ড বেয়ে শির শির করে নীচে নেমে গেল
আমি অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নিলাম
তবে চোখ সরানোর আগে ওদের গায়ের কালো গেঞ্জিতে বড় বড় সাদা অক্ষরে লেখা ' ' শব্দটা আমার নজর এড়ালোনা
ব্যাপারটা তত্ত্বগতভাবে আমার কাছে খুব আশ্চর্যজনক কিছু মনে হওয়া কিন্তু উচিত নয়
কেননা, মসজিদে আমাদের মুসলমানদের নামাজ পড়ার সাথে এদের 'রিচুয়াল' পালনের খানিকটা মিল আছে, যেমনটা ইমাম সাহেব করেন এবং বাকি মুসল্লীরা তাকে অনুকরন করেন
কিন্তু এখানকার ব্যাপারটা অন্যরকম
আমি যদি কোনো হিন্দু টেম্পলে যেতাম এবং সেখানে একদল হিন্দু নারী-পুরুষকে অনুরূপ 'রিচুয়াল' পালন করার একটা দৃশ্য দেখতাম, তাহলে আমার কাছে সেটা সামান্যও অস্বাভাবিক লাগতো না
বরং ভালই লাগতো
কেননা, আমি বরাবর অন্যান্য ধর্মের 'রিচুয়াল'-এর ব্যাপার-স্যাপারগুলো জানতে আগ্রহ বোধ করি এবং তা করি শ্রদ্ধার সাথেই
কিন্তু ২০/২৫ বছর বয়সী ১০/১২ জন ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া যুবক ভিন্ন দেশে পড়তে এসে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে যখন এমন কট্টরভাবে কোনো 'রিচুয়াল' পালন করে, তখন কেন জানি খানিকটা খটকাই লাগে
হঠাৎ করেই আমার তখন বুয়েটের কথা মনে পড়ে যায়
বুয়েটের ক্লাস শুরুর তখন এক সপ্তাহও হয়নি
আমি থাকতাম আহসানউল্লাহ হলের নীচতলার একটা রুমে, যেটা 'রাজনৈতিক রুম' হিসেবে সেসময় বিখ্যাত ছিল
ছাত্র ইউনিয়নের আহসানউল্লাহ হল শাখার সভাপতি এবং ছাত্রলীগের আহসানউল্লাহ হল শাখার সহ-সভাপতি আমার দুই রুমমেট ছিলেন
আমিই ছিলাম ঐ রুমের একমাত্র অরাজনৈতিক ব্যক্তি
কামরুল ভাই আমার দেশী, মানে ঝিনাইদহের এবং উনি তখন ছাত্র শিবিরের বুয়েট শাখার সভাপতি কিম্বা সাধারন সম্পাদক ছিলেন
উনি থাকতেন আহসানউল্লাহ হলেরই চার তলায়
এক বিকেলে কামরুল ভাই ওনার রুমে আমাকে ডেকে পাঠালেন
ক্যাডেট কলেজে পড়ার কারনে রাজনীতিতে আমার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিলনা
কাজেই কামরুল ভাইয়ের সাথে স্বভাবতই আমার বৈরীতার কোনো কারন ছিলনা
ওনার রুমে পৌঁছে দেখি মিটিং হচ্ছে ওনাদের
আমাকে সবার সাথে একে একে পরিচয় করিয়ে দিলেন কামরুল ভাই
মুখে কেউ কিছু না বললেও বুঝলাম ওনারা সবাই শিবিরের
হাদিসের একটা বই থেকে ওনারা গোটা কয়েক হাদিস পড়লেন
এরপর পুরো সপ্তাহে কে কি কি আমল করেছেন বা করতে পারেননি, সে বিষয়ে হিসেব-নিকেশ নেয়া-দেয়া করলেন
এবং সবশেষে দলের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কার কি অগ্রগতি এবং কে কি ধরনের বাঁধার সম্মুখীন হয়েছেন, সে বিষয়ে আলোচনা করলেন ওনারা
আমি যদিও সেসময় ধর্ম-কর্মের একদম ধার ধারী না, কিন্তু ধর্ম পালন না করার কারনে এক ধরনের অপরাধবোধ মনে মনে খানিকটা ছিলই
সে হিসেবে কামরুল ভাইদের মিটিংটাকে আমার কাছে বরং ভাল লাগারই কথা ছিল
কিন্তু ওনাদের কথাবার্তায় এমন কিছু ছিল, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক এ্যারোগ্যান্স এবং সুপিরিয়রিটির এমন একটা টোন্‌ () ছিল, যা আমার কাছে কেন জানি মনে হয়েছিল পটেনশিয়াল 'রেড ফ্ল্যাগ' ( ) এবং এরপর থেকে শিবিরকে আমি আর কোনোদিন পছন্দ করিনি
' 'র ছেলেগুলোকে দেখে প্রথম নজরেই কেন জানি ছাত্র শিবিরের কথা মনে হয়েছিল আমার
এটাকেই বোধহয় বলে মানুষের 'সিক্সথ্‌ সেন্স', কেননা ' ' সম্পর্কে আমি তখনও পর্যন্ত কিছুই জানিনা
ঐ দিন বাসায় ফিরে রাতে গুগল সার্চ দিয়ে যা পেলাম তাতে মনটা খারাপই হলো
উইকিপিডিয়াতে 'হিন্দু ইউভা বাহিনী' সম্পর্কে নীচের ডেফিনিশন্‌টা পেলামঃ
() , , , . , .
' ' ' ' , , . , , - .
2005, , () . , , , . , .
26-31, 2007. , . - 30, 2007.
: ' ' , .
সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং এর পাশাপাশি অশিক্ষা, দারিদ্রতা ও বেকারত্ব কিভাবে ধর্মীয় রাজনীতির ছাঁয়াতলে একদল বঞ্চিত মানুষকে এক্সট্রিম একটা আইডিয়োলজির পেছনে সুসংহত করে, তা একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে না বুঝার কোনো কারন নেই
উত্তর প্রদেশের গোরাখপুরে যোগী আদিত্যনাথ কর্তৃক হিন্দু ইউভা বাহিনীর প্রতিষ্ঠা ও পরবর্তীতে এই বাহিনীর উত্থান অনেকটা আফগানস্থানে তালেবানদের উত্থানের মত যেখানে এক্সট্রিমিজিম মূলত অশিক্ষা, অর্থনৈতিক সমস্যা ও ধর্মীয় রাজনীতির বাই-প্রডাক্ট
গোরাখপুরের স্থানীয় কোনো কলেজে হিন্দু ইউভা বাহিনীর একদল যুবককে সংঘবদ্ধভাবে এমন 'রিচুয়াল' পালন করতে দেখলে আমি হয়ত সামান্যও অবাক হতাম না
কিন্তু আমেরিকার মত সুসভ্য, প্রগতিশীল একটা দেশে বসে ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া একদল ছেলে ভার্সিটির ক্যাম্পাসে ' ' মনোগ্রাম খঁচিত গেঞ্জি গায়ে এক্সট্রিম একটা আইডিয়োলজী অন্তরে লালন করছে এবং তার চর্চা করছে দেখে মনটা খারাপই হলো আমার
ইন্টারনেটে আরেকটু ঘেঁটেঘুঁটে দেখলাম, হিন্দু ইউভা বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা, যোগী আদিত্যনাথ ভারতের হিন্দু মৌলবাদী রাজনৈতিক দল, বিজেপি'র একজন সাংসদ এবং একইসাথে একজন চরম প্রতিক্রিয়াশীল মানুষ
ভারতের সংসদে দেয়া এক ভাষনে তিনি একবার বলেছিলেন, "মহাত্মা গান্ধীর বদলে জাতির জনকের সন্মান ভগবান রাম অথবা কৃষ্ণকে দেয়া উচিত"
চারদলীয় জোট সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রী, জামাতে ইসলামী'র নিজামী কিম্বা মুজাহিদ-এর সাথে যোগী আদিত্যনাথ-এর কি কোনো মৌলিক পার্থক্য আছে? নাকি সে অর্থে খুব বেশী মৌলিক পার্থক্য আছে শীর্ষস্থানীয় পাকিস্থানী তালেবান নেতা, ক্বারী হুসেইনের ধর্মশিষ্য, সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক সিটির টাইম্‌স্‌ স্কয়ারে গাড়ীভর্তি এক্সপ্লোসিভ বিস্ফোরণ ঘটা...
এতক্ষণে হিন্দু ইউভা বাহিনীর ছেলে দু'টোর আমার দিকে শ্যেন দৃষ্টিতে তাকানোর 'শানে নজুল' পরিষ্কার হলো
আমার গোঁফহীন লম্বা দাঁড়ি এবং গায়ে হাঁটু অব্দি লম্বা ফতোয়া দেখে যে কেউই বুঝে যাবে আমি একজন কট্টর মুসলমান এবং অমুসলিম কারো এধারনা হওয়াও নেহায়েত অমূলক নয় যে, আমি হয়ত 'বিন লাদেন' কিম্বা 'মোল্লা ওমর'-এর দূরসম্পর্কের জ্ঞাতি ভাই
মনে মনে ভাবলাম, "আচ্ছা! আজ আমি ধূতি পরা, গলায় পৈতে ঝুলানো একজন নিরীহ ধর্ম পালনকারী ভালমানুষ হলেও কি ঠিক একই চোখে আমার দিকে তাকাতো না এদেশের ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া একজন 'মুসলিম উম্মাহ' তথা প্রবাসী ছাত্রশিবির কর্মী? তাহলে হিন্দু ইউভা বাহিনীর ছেলেগুলোরই বা দোষ কতটুকু?"
আব্দুর রহমান আবিদ
রচনাকালঃ মে, ২০১০
পোস্ট শেয়ার করুন
: আব্দুর রহমান আবিদ
আমেরিকা প্রবাসী লেখক
৯০ আন্দোলনের তিনদশকঃ ফিরে দেখা আমাদের আকাঙ্খা ও অর্জন
৯০ আন্দোলনের তিনদশকঃ ফিরে দেখা আমাদের আকাঙ্খা ও অর্জন
ডিসেম্বর 6, 2021 | 0
পুণরাবৃত্ত ল্যারেঞ্জিয়াল স্নায়ু: একটি বিবর্তনীয় ও ঐতিহাসিক লিগ্যাসি
পুণরাবৃত্ত ল্যারেঞ্জিয়াল স্নায়ু: একটি বিবর্তনীয় ও ঐতিহাসিক লিগ্যাসি
নভেম্বর 28, 2021 | 0
বাংলাদেশের সাবওয়ালটন বিল্পবঃ রুহানি প্রজন্মের উত্থান
বাংলাদেশের সাবওয়ালটন বিল্পবঃ রুহানি প্রজন্মের উত্থান
অক্টোবর 23, 2021 | 2
হিন্দুদের ভবিষ্যৎ কী
হিন্দুদের ভবিষ্যৎ কী
অক্টোবর 18, 2021 | 4
অক্টোবর 17, 2021 | 0
62
আতিক রাঢ়ী মে 11, 2010 5:32 অপরাহ্ন -
জনাব আব্দুর রহমান আবিদ,
আপনার লেখাতে সুন্দর বিশ্লেষন আছে, যা ভাল লেগেছে
ভাবছি, আপনি যদি নীজের সম্পর্কে নীরব থাকতেন তবে এই লেখাটি হয়তো ভিন্ন ভাবে নেয়া যেত
একটা লেখা পড়ার সময় লেখকের ব্যাপারে কি আসলেই পুরোপুরি উদাসীন থাকা যায় ? ধরুন সাকা চধুরি যাদি বলে -৭১ এর শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না, তবে আমরা কিন্তু এর মধ্যে অবশ্যই ভিন্ন মানে খুঁজব
ধর্মশ্রয়ী আস্তি্কদের মধ্যে ধর্ম উন্মাদনার প্রবনতা দেখা দেয়ার সম্ভাবনা সব সময়ই থাকে, যা আপনিও বলেছেন
কিন্তু এটার কারন কি হতে পারে বলে আপনি মনে করেন ?
আমার ধারনা, প্রতিটি ধার্মিক ব্যাক্তি নীজের ধর্মকে অন্য ধর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে
এটা যে সে নীজে থেকে পছন্দ করেনি সে কথা এক বারো না ভেবে
এই মনোভাবের মধ্যেই রয়েছে ফ্যাসিজমের বীজ
উপযুক্ত পরিবেশ পেলেই তা অঙ্কুরিত হয়
অপনি একজন ধার্মিক ব্যাক্তি
যে কোন ফ্যাসিজমকেই আমি অন্যায় মনে করি
ধার্মিক ব্যাক্তিরা প্রত্যেকেই ফ্যাসিস্ট মনোবৃত্তি সম্পন্ন
আপনি কি নীজেকে অন্য ধার্মিকদের থেকে আলাদা মনে করেন ? করলে কেন করেন, দয়াকরে জানাবেন
আব্দুর রহমান আবিদ মে 11, 2010 7:32 অপরাহ্ন -
@আতিক রাঢ়ী,
"একটা লেখা পড়ার সময় লেখকের ব্যাপারে কি আসলেই পুরোপুরি উদাসীন থাকা যায়?"
ঠিক বলেছেন, আসলেই যায়না
তবে এও সত্যি, অনেক সময় বক্তব্যের বিষয়বস্তু লেখকের ব্যক্তিগত পরিচয়ের চেয়েও প্রাধান্যতা পেতে পারে