content
stringlengths
0
129k
মার্গারেট মীড তার চিন্তাধারা ব্যক্ত করে ১৯২৮ সালে ' ' নামের যে গ্রন্থ রচনা করেন সেটি 'সংস্কৃতিভিত্তিক প্রাসাদের' এক অগ্রগন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়[1]
ছবি - দুটি আলোচিত বই : উপরে মার্গারেট মীডের কামিং অফ এজ ইন সামোয়া, আর নীচে ডেরেক ফ্রিম্যানের দ্য ফেটফুল হোক্সিং অব মার্গারেট মীড
কিন্তু পরবর্তীতে ডেরেক ফ্রিম্যানসহ অন্যান্য গবেষকদের গবেষণায় প্রমানিত হয় যে, মীডের অনুকল্পগুলো স্রেফ 'উইশফুল থিংকিং' ছাড়া আর কিছু ছিলো না[2],[3]
গবেষকেরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, মীডের গবেষণা ছিলো একেবারেই সরল এবং মীড স্যামোয়ান মেয়েদের দ্বারা নিদারূণভাবে প্রতারিত হয়েছিলেন
ফ্রিম্যানের গবেষণা থেকে বেরিয়ে এলো, স্যামোয়ান্ জাতির মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ, রাগ, ঘৃণা, হত্যা লুন্ঠন- আর দশটা জাতির মতই প্রবলভাবে বিদ্যমান, সরলমনা মীড সেগুলো দেখতেই পাননি
ডেরেক ফ্রিম্যানের অনুমান এবং অভিযোগের একেবারে সরাসরি সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় মীডের গবেষণা প্রকাশের ষাট বছর পর
১৯৮৮ সালের মে মাসে ফাপুয়া (''), যখন তার বয়স ৮৬ বছর অফিশিয়ালি স্যামোয়ান সরকারের কাছে স্বীকার করে নেন যে, তিনি আর তার বন্ধু ফোফোয়া স্যামোয়ান নারীদের যৌনপ্রবৃত্তি নিয়ে যে তথ্য মীডকে ১৯২৬ সালে দিয়েছিলেন তার সবটুকুই ছিলো বানোয়াট
এ কম্পলিট হোক্স
সেজন্যই ম্যাট রীডলী তার 'এজাইল জিন' বইয়ে মীডের গবেষণা সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেন[4], 'তার মানব প্রকৃতির সাংস্কৃতিক ভিন্নতা খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা অনেকটা এমন কুকুর খুঁজে পাওয়ার মতোই - যে কুকুর ঘেউ ঘেউ না করে মিউ মিউ করে'
ছবি- মার্গারেট মীড কিভাবে স্যামোয়ান মেয়েদের দ্বারা নিদারূণভাবে প্রতারিত হয়েছিলেন তার একটি ব্যঙ্গচিত্র
মার্গারেট মীডের মতোই শান্তিপূর্ণ এক জাতির সন্ধান করতে গিয়ে সত্তুরের দশকে লেজে গোবরে করেছেন ম্যানুয়েল এলিজাল্ডে জুনিয়র ( )
তিনি দেখাতে গিয়েছিলেন ঢালাওভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে সহিংসতা, যুদ্ধবাজির কথা ঢালাওভাবে উল্লেখ করা থাকলেও ফিলিপাইনের এক জঙ্গলে টেসাডে () নামে এমন এক ট্রাইব আছে যারা নাকি আক্ষরিক অর্থেই এখনো সেই আদিম প্রস্তর যুগে বাস করছে
তারা ছাল বাকল পড়ে ঘুরে বেড়ায়, গুহায় বসবাস করে আর তারা নাকি এমনই শান্তিপ্রিয় যে তাদের ভাষাতে সহিংসতা, আগ্রাসন কিংবা সংঘর্ষসূচক কোন শব্দই নেই
তাদের সংস্কৃতি একেবারে শান্তিতে শান্তিময়
এই মহা ব্যতিক্রমী শান্তিপূর্ণ মানবপ্রজাতি নিয়ে ১৯৭৫ সালে একটি বইও বের হয়েছিল 'শান্ত টেসাডে' নামে[5]
কিন্তু থলের বেড়াল বেরিয়ে যেতে সময় লাগেনি
আশির দশকের শেষদিকে বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসলো যে ম্যানুয়েল এলিজাল্ডের আগেকার কাজকর্ম আসলে ছিলো পুরোটাই সাজানো[6]
আশে পাশের গ্রাম থেকে জিন্স আর টিশার্ট পরা সুশিক্ষিত ছেলেপিলেদের ছাল বাকল পরিয়ে 'শান্ত টেসাডে' সাজানো হয়েছিল
টেসাডের শান্তিময় ধরণের কোন ট্রাইবই আসলে ফিলিপাইনে নেই
সত্তুরের দশকে ফিলিপাইনের একনায়ক ক্ষমতাশীন মার্কোস সরকারের পরিকল্পনায় ম্যানুয়েল এলিজাল্ডের কুকর্মে ইন্ধন যোগানো হয়েছিল
উদ্দেশ্য ছিলো 'শান্ত টেসাডেকে পুঁজি করে বহির্বিশ্বে ফিলিপাইনের ইমেজ বাড়ানো
ছবি -মার্কোস সরকারের পরিকল্পনায় সভ্য মানুষকে অর্ধনগ্ন করে ছাল বাকল পড়িয়ে শান্তিপূর্ণ টেসাডের মিথ সুপরিকল্পিত ভাবে তৈরি করা হয়
আসলে সংস্কৃতির বিভাজনের কথা ঢালাও ভাবে সাহিত্য, সংস্কৃতিতে আর নৃতত্ত্বে উল্লিখিত হয় বটে, কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায় এই বিভাজন মোটেই বস্তুনিষ্ঠতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হয় না
ব্যাপারটা নৃতত্ত্ববিদ আর সমাজবিদদের জন্য এক নিদারূন লজ্জার ব্যাপার
একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, সংস্কৃতির যত বিভাজনই থাকুক না কেন, প্রত্যেক সংস্কৃতিতেই দেখা যায়, মানুষেরা একইভাবে রাগ অনুরাগ, হিংসা, ক্রোধ প্রকাশ করে থাকে
পশ্চিমা বিশ্বের আলো ঝলমলে তথাকথিত 'আধুনিক' সভ্যতা থেকে শুরু করে পৃথিবীর আনাচে কানাচে যত গহীন অরন্যের যত নাম না জানা গোত্রের মধ্যেই অনুসন্ধান করা হোক না কেন - দেখা যাবে নাচ, গান, ছবি আঁকার ব্যাপারগুলো সব সংস্কৃতিতেই কম বেশি বিদ্যমান
কেউ হয়ত গুহার পাথরে হরিণ শিকারের ছবি আঁকছে, কেউ পাথরে খোদাই করে মূর্তি বানাচ্ছে, কেউ নদীর ধারে বসে পাল তোলা নৌকাকে ক্যানভাসে উঠিয়ে আনছে, কেউবা আবার মাটির পটে গড়ে তুলছে অনবদ্য শিল্পকর্ম
সংস্কৃতির বিবিধ উপাদান যোগ হবার কারণে ব্যক্তি কিংবা সংস্কৃতিভেদে চিত্রকল্পের প্রকাশ ভঙ্গিতে হয়ত পার্থক্য আছে কিন্তু চিত্র প্রকাশের বিমূর্ত স্পৃহাটি সেই একই রকম থেকে যাচ্ছে
শুধু ছবি আঁকা নয়, নাচ-গানের ক্ষেত্রেও আমরা তাই দেখব
এক দেশে কেউ একতারা হাতে বাউল গান গেয়ে চলছে তো আরেকজন অন্য দেশে নিবিষ্ট মনে পিয়ানো বাজিয়ে চলছে
কেউবা চোখ মুদে সেতার বাজাচ্ছে তো কেউবা গিটার কিংবা কেউ সন্তুর
যে একেবারেই আলসে সে হয়ত পড়াশুনা করার টেবিকেই ঢোল বানিয়ে তাল ঠুকছে রবীন্দ্র সঙ্গীতের সাথে
এক সংস্কৃতিতে কেউ হয়ত ডিস্কো নাচ নাচছে, অন্য জায়গায় সেরকমই একজন কেউ ভরত নাট্যম, আরেক জায়গায় কেউ ল্যাটিন ফিউশন, কেউবা কোন অচেনা ট্রাইবাল ড্যান্স
নাচের রকম ফেরে কিংবা মূদ্রায় পার্থক্য থাকলেও সংস্কৃতি নির্বিশেষে নাচ-গানের অদম্য স্পৃহাটি কিন্তু এক সার্বজনীন মানব প্রকৃতিকেই উর্ধ্বে তুলে ধরছে
এই ব্যাপারটির তাৎপর্য উপলব্ধি করেই ডোনাল্ড ব্রাউন তার ' ' গ্রন্থে বলেছেন[7] - ' '
নৃপেনদাও সেটা জানেন
তিনি হিন্দুদের কান্নার উদাহরণ দিয়েছেন
দিয়েছেন মুসলমানদের কান্নারও
কান্নার রকমফেরে পার্থক্য থাকলেও সবাই কিন্তু কাঁদে প্রিয়জনের মৃত্যুতে
কেউ চল্লিশা করতে করতে কাঁদে, কেউ বা শ্রাদ্ধশান্তি করতে করতে কাঁদে
কিন্তু কাঁদে তো
এটাই হিউম্যান ইউনিভার্সাল
এ পর্যন্ত ঠিক আছে
কিন্তু তারপরেই নৃপেনদা বড় একটা ভুল করে ফেলেছেন
তিনি বোধ হয় মীডের মতই উইশফুল থিঙ্কিং থেকে ভেবেছেন, অনেক জনগোষ্টি আছে যাদের চোখ একেবারে শুষ্ক - মরুভূমি
তারা প্রিয়জনের মৃত্যুতে নাকি কাঁদে না
উদাহরণ হিসেবে হাজির করেছেন এরিক ভ্যালির একটি মুভির উদাহরণ
মুভির উদাহরণ কোন ভাল উদাহরণ নয়
অতিরঞ্জনের সুযোগ থাকে পুরোমাত্রায়
মার্গারেট মীড বা ম্যানুয়েল এলিজাল্ডের গবেষণাতেই আছে, আর মুভি তো কোন ছাড়! আমি নিশ্চিত, যদি সঠিকভাবে অনুসন্ধান করা হয় তবে তিব্বতিদের চোখ একেবারে শুষ্ক - মরুভূমি - ব্যাপারটাও হোক্স হিসেবেই প্রতিপন্ন হবে
যা হোক, বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সংস্কৃতি ব্যাপারটা মানব সমাজের অনন্য বৈশিষ্ট হিসেবে গন্য হলেও এটি কোন গায়েবী পথে নয়, বরং অন্য সব কিছুর মতো জৈব বিবর্তনের বন্ধুর পথ ধরেই উদ্ভুত হয়েছে ( )[8]
আমরা উপরে যে নাচ, গান, ছবি আঁকা, যুদ্ধসহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছি (যেগুলো মানব সভ্যতার যে কোন সংস্কৃতিতেই খুঁজে পাওয়া যাবে ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশভঙ্গির মাধ্যমে), সেরকম অন্ততঃ ৪০০টি বৈশিষ্ট্য স্টিভেন পিঙ্কার লিপিবদ্ধ করেছেন তার ব্ল্যাঙ্ক স্লেট বইয়ের পরিশিষ্টে[9]
হ্যা তার মধ্যে কান্না বা ক্রায়িং ব্যাপারটিও তালিকায় আছে
বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন এগুলো সবগুলোই অভিন্ন মানব প্রকৃতির দিকেই ইঙ্গিত করে
লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাতোশি কানাজাওয়া তার ' ' প্রবন্ধে সেজন্যই বলেন[10],
বাহ্যিকভাবে যত পার্থক্যই আমরা দেখি না কেন, আসলে আমরা মানুষেরা এক অভিন্ন সংস্কৃতির অংশ
কারণ, আমাদের দেহ কাঠামোর মতো সংস্কৃতিও মোটা দাগে মানব বিবর্তনের অভিযোজনগত ফসল
ঠিক যেমন আমাদের হাত পা কিংবা অগ্ন্যাশয় তৈরি হয়েছে বংশানু বা জিনের নিয়ন্ত্রণে, ঠিক তেমনি মানব সংস্কৃতিও তৈরি হয়েছে বংশানুর দ্বারাই (বংশানুর দ্বারা বলা হচ্ছে কারণ, দীর্ঘকালের বিবর্তনীয় প্রক্রিয়াতেই তৈরি হয়েছে মানব বংশানু যা আবার মস্তিস্কের গঠনের অবিচ্ছেদ্য নিয়ামক, আর সংস্কৃতি হচ্ছে সেই মানব মস্তিস্কেরই সম্মিলিত অ...
বাঘের যেমন নখর বিশিষ্ট থাবা আছে, ক্যাঙ্গারুর পেটে আছে থলি, ঠিক তেমনি মেরুভল্লুকের গায়ে আছে পুরু পশম
এই বৈশিষ্ট্যগুলো যেমন স্ব স্ব প্রজাতির ক্ষেত্রে অনন্য বৈশিষ্টের দিকে নির্দেশ করে; ঠিক তেমনি মানব সমাজের জন্য অনন্য বৈশিষ্টের নিয়ামক হয়ে আছে মানব সংস্কৃতি
বাঘে বাঘে নখরের আকার আকৃতিতে পার্থক্য থাকলেও সেটা যেমন শেষ পর্যন্ত বাঘের নখরই, ঠিক তেমনি সংস্কৃতিতে কিছু বাহ্যিক ছোটখাট ভেদাভেদ থাকলেও সেটা শেষ পর্যন্ত অভিন্ন মানব সংস্কৃতিই
হ্যা,শতধা বিভক্তি সত্ত্বেও মানব কালচারগুলো আসলে সম্মিলিতভাবে সার্বজনীন সংস্কৃতি বা কালচারাল ইনিভার্সাল ( )কেই উর্ধ্বে তুলে ধরে, অন্ততঃ বিবর্তন মনোবিজ্ঞানীদের তাই অভিমত
- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -
[1] মুক্তান্বেষার প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যায় মার্গারেট মীডকে নিয়ে ফরিদ আহমেদের একটি চমৎকার প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে মার্গারেট মিড : নৃতত্ত্বের রাণী' শিরোনামে
[2] , : , , 1983.
[3] , : , 1999
[4] ম্যাট রিডলীর মূল উক্তিটি ছিলো - ' '
[5] , : , , 1975
[6] , , 9, 1988.
[7] , , - / /, 1991
[8] , , ,
, . . , .
[9] , : , , 2002, 435-9,
[10] , : , ://..//--/200805/-----
পোস্ট শেয়ার করুন
: অভিজিৎ
অভিজিৎ রায়
লেখক এবং প্রকৌশলী
মুক্তমনার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক
আগ্রহ বিজ্ঞান এবং দর্শন বিষয়ে
নিউটনীয় মহাবিশ্ব ও জড়তার উৎস
নিউটনীয় মহাবিশ্ব ও জড়তার উৎস
নভেম্বর 27, 2021 | 1
মিসিং লিংক কি সত্যিই মিসিং?
মিসিং লিংক কি সত্যিই মিসিং?
নভেম্বর 17, 2021 | 2
এক মানবিক পৃথিবীর পথ
এক মানবিক পৃথিবীর পথ
সেপ্টেম্বর 23, 2021 | 1
ধর্ষণ কি আদৌ কোনো অপরাধ?
ধর্ষণ কি আদৌ কোনো অপরাধ?
সেপ্টেম্বর 14, 2021 | 2
মানব প্রজনন ও যৌনতাঃ পাঠ্যবইয়ে কী পড়ছি?
মানব প্রজনন ও যৌনতাঃ পাঠ্যবইয়ে কী পড়ছি?
জুলাই 29, 2021 | 3
50
বিপ্লব পাল আগস্ট 17, 2010 1:05 পূর্বাহ্ন -
এখন দেখা যাচ্ছে এর অনেককিছুতেই আরো ভাল ব্যাখ্যা পাওয়া যায় বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের সাহায্যে