content
stringlengths
0
129k
২১শে নভেম্বর ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে, ভারতব্যাপী হরতাল অনুষ্ঠিত হয়
নজরুল পুনরায় রাজপথে নেমে আসেন এবং অসহযোগ মিছিলের সঙ্গে শহর প্রদক্ষিণ করেন
তখন তিনি পরিবেশন করেন 'ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও! ফিরে চাও ওগো পুরবাসী' গানটি
নজরুলের এই সময়ের কবিতা, গান ও প্রবন্ধের মধ্যে বিদ্রোহের ভাব প্রকাশিত হয়
এই সময় তুরস্কে মধ্যযুগীয় সামন্ত-শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতবর্ষের মুসলমানরা খিলাফৎ আন্দোলন করে
মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আর মওলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলীর নেতৃত্বে খিলাফৎ আন্দোলনের দর্শনে নজরুল আস্থাশীল না থাকলেও স্বদেশে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে স্বরাজ বা স্বাধীনতা অর্জন আর মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুরস্কের সালতানাত উচ্ছেদকারী নব্য-তুর্কি আন্দোলনের প্রতি নজরুলের সমথনে ভারতবর্ষের হিন্দু ও মুসলমান...
ডিসেম্বর ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে, কুমিল্লা থেকে কলকাতা এসে নজরুল তাঁর দুটো ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক সৃষ্টিকর্ম রচনা করেন
একটি 'বিদ্রোহী' কবিতা, আর অন্যটি 'ভাঙার গান' সঙ্গীত
এই দুটো রচনা বাংলা কবিতা ও গানের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়
'বিদ্রোহী' কবিতার জন্য নজরুল ভারতবর্ষের সাহিত্য সমাজে খ্যাতিলাভ ও জনপিয়তা অর্জন করেন
১৯২১ সালের শেষদিকে নজরুল আরেকটি বিখ্যাত কবিতা 'কামাল পাশা' রচনা করেন, যার মাধ্যমে তাঁর সমকালীন আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনা এবং ভারতবর্ষের মুসলমানদের খিলাফৎ আন্দোলনের অসারতার পরিচয় পাওয়া যায়
নজরুল তাঁর রাষ্ট্রীয় ধ্যান-ধারণাযয় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হন মোস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্ব দ্বারা, কারণ তিনি সামন্ততান্ত্রিক খিলাফৎ বা তুরস্কের সুলতানকে উচ্ছেদ করে তুরস্ককে একটি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করেছিলেন
তুরস্কের সমাজ-জীবন থেকে মোস্তফা কামাল যে মৌলবাদ ও পর্দাপ্রথা দূর করেন, তা নজরুলকে বেশি অনুপ্রাণিত করে
তিনি মনে করেন যে, তুরস্কে যা সম্ভব, ভারতবর্ষেও তা সম্ভবপর নয় কেন? বস্তুত, গোঁড়ামি, রক্ষণশীলতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও আচার সর্বস্বতা থেকে দেশবাসীর মুক্তির জন্য নজরুল আজীবন সংগ্রাম করেন
১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবও নজরুলকে নানাভাবে প্রভাবিত করে
নজরুলের 'লাঙল' ও 'গণবাণী' পত্রিকায় প্রকাশিত 'সাম্যবাদী' ও 'সর্বহারা' কবিতাগুচ্ছ এবং 'কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল'-এর অনুবাদ 'জাগ অনশন বন্দী ওঠ রে যত' এবং 'রেড ফ্লাগ' অবলম্বনে রক্তপতাকার গান এর প্রমাণ
১৯২২ খ্রিস্টাব্দে নজরুলের যেসব সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হয় সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গল্প-সংকলন 'ব্যথার দান', কবিতা-সংকলন 'অগ্নিবীণা' ও প্রবন্ধ-সংকলন 'যুগবাণী'
'অগ্নিবীণা' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এর প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে যায় এবং পরপর কয়েকটি নতুন সংস্করণ প্রকাশ করতে হয়; কারণ এ কাব্যে নজরুলের 'প্রলয়োল্লাস', 'আগমনী', 'খেয়াপারের তরণী', 'শাত-ইল্-আরব', 'বিদ্রোহী', 'কামাল পাশা' প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যে সাড়া জাগানো এবং বাংলা কবিতার মোড় ফেরানো কবিতা সংকলিত হয়
১২ই আগস্ট১৯২২ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল সপ্তাহে দুবার প্রকাশিত 'ধূমকেতু' পত্রিকা প্রকাশ করেন
স্বরাজ গঠনে যে সশস্ত্র বিপ্লববাদের আবির্ভাব ঘটে তাতে 'ধূমকেতু' পত্রিকার বিশেষ অবদান ছিল
এ পত্রিকা হয়ে ওঠে সশস্ত্র বিপ্লবীদের মুখপত্র
পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় 'কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু
আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এ দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন'―রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই আশীর্বাণী শীর্ষে ধারণ করে
'ধূমকেতু'র ২৬শে সেপ্টেম্বর ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের সংখ্যায় নজরুলের প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক কবিতা 'আনন্দময়ীর আগমনে' প্রকাশিত হয়
৮ই নভেম্বর ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে, পত্রিকার এই সংখ্যাটি নিষিদ্ধ করা হয়
২৩শে নভেম্বর ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে, নজরুলের প্রবন্ধগ্রন্থ 'যুগবাণী' বাজেয়াপ্ত হয়
একই দিনে নজরুলকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে কলকাতায় আনা হয়
৭ জানুয়ারি ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে, বিচারাধীন বন্দি হিসেবে নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থন করে চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে জবানবন্দি প্রদান করেন
এই জবানবন্দি, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে 'রাজবন্দীর জবানবন্দী' নামে সাহিত্য-মর্যাদা পায়
১৬ জানুয়ারি ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে, বিচারের রায়ে নজরুল এক বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন
নজরুল যখন আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর বসন্ত গীতিনাট্য তাঁকে উৎসর্গ করেন (২২শে জানুয়ারি ১৯২৩)
এ ঘটনায় উল্লসিত নজরুল জেলখানায় বসে তাঁর অনুপম কবিতা 'আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে' রচনা করেন
১৪ই এপ্রিল ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে, নজরুলকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করা হয়
রাজবন্দিদের প্রতি ইংরেজ জেল-সুপারের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে সেই দিন থেকেই তিনি অনশন ধর্মঘট শুরু করেন
রবীন্দ্রনাথ অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ জানিয়ে নজরুলকে টেলিগ্রাম করেন
অবশ্য জেল কর্তৃপক্ষের বিরূপ মনোভাবের কারণে নজরুল টেলিগ্রামটি পাননি
এদিকে ২২ মে ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে, জনমতের চাপে জেল-পরিদর্শক আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী হুগলি জেল পরিদর্শন করেন এবং তাঁর আশ্বাস ও অনুরোধে সেই দিনই নজরুল চল্লিশ দিনের অনশন ভঙ্গ করেন
১৮ই জুন ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ, নজরুলকে বহরমপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়
১৫ই ডিসেম্বর ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে, নজরুলকে মুক্তি দেওয়া হয়
হুগলি জেলে বসে নজরুল রচনা করেন 'এই শিকল-পরা ছল মোদের, এ শিকল-পরা ছল', আর বহরমপুর জেলে 'জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলেছ জুয়া' এ বিখ্যাত গান-দুটো
অক্টোবর ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে, নজরুলের প্রেম ও প্রকৃতির কবিতার প্রথম সংকলন 'দোলন-চাঁপা' প্রকাশিত হয়
এতে সংকলিত দীর্ঘ কবিতা 'পূজারিণী'তে নজরুলের রোমান্টিক প্রেম-চেতনার বহুমাত্রিক স্বরূপ প্রকাশ পায়
২৫শে এপ্রিল ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে, কলকাতায় নজরুল ও ব্রাহ্মসমাজভুক্ত প্রমীলার বিয়ে সম্পন্ন হয়
তাঁর মা গিরিবালা দেবী ছাড়া পরিবারের অন্যরা এই বিয়েকে সমর্থন করেননি
নজরুলও আত্মীয়-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন
হুগলির মহীয়সী মহিলা মিসেস মাসুমা রহমান এই বিয়েতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন
নজরুল হুগলিতেই সংসার-জীবন শুরু করেন
আগস্ট ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে নজরুলের গান ও কবিতা সংকলন 'বিষের বাঁশী' ও 'ভাঙার গান' প্রকাশিত হয়
এই গ্রন্থ-দুটোই একই বছর অক্টোবর ও নভেম্বরে সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়
১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল-সঙ্গীতের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয় হিজ মাস্টার্স ভয়েস (এইচ.এম.ভি) কোম্পানি থেকে
শিল্পী হরেন্দ্রনাথ দত্তের কণ্ঠে 'জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলেছ জুয়া' ও 'যাক পুড়ে যাক বিধির বিধান সত্য হোক' গান-দুটো রেকর্ড করা হয়
এই সময় নজরুল বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে যোগ দিতে থাকেন এবং স্বরচিত স্বদেশী গান পরিবেশন করে পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন
মে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল তাঁর একটি জনপ্রিয় স্বদেশী গান 'ঘোর্ রে ঘোর্ রে আমার সাধের চর্কা ঘোর' ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধী ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের উপস্থিতিতে পরিবেশন করেন
১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যোগদান করেন
তিনি কুমিল্লা, মেদিনীপুর, হুগলি, ফরিদপুর, বাঁকুড়া এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে অংশগ্রহণ করেন
নজরুল এ সময় বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সদস্য হওয়া ছাড়াও শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের জন্য 'শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দল' গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন
রাজনীতিক নজরুলের একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল সাপ্তাহিক 'লাঙল' পত্রিকা প্রকাশ
তিনি এ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিলেন
এর প্রথম সংখ্যাতেই নজরুলের 'সাম্যবাদী' কবিতাসমষ্টি মুদ্রিত হয়
'লাঙল' ছিল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম শ্রেণী-সচেতন সাপ্তাহিক পত্রিকা
এতে প্রকাশিত 'শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দল'-এর ম্যানিফেস্টোতে প্রথম ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপিত হয়
এই সময় নজরুল পেশাজীবী শ্রমিক-কৃষক সংগঠনের উপযোগী সাম্যবাদী ও সর্বহারা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন
১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে, নজরুলের গল্প-সংকলন 'রিক্তের বেদন', কবিতা ও গানের সংকলন 'চিত্তনামা', 'ছায়ানট', 'সাম্যবাদী' ও 'পূবের হাওয়া' প্রকাশিত হয়
হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের অগ্রদূত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অকাল মৃত্যুতে (১৬ই জুন ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে) শোকাহত নজরুল কর্তৃক রচিত গান ও কবিতা নিয়ে 'চিত্তনামা' গ্রন্থটি সংকলিত হয়
১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল কৃষ্ণনগরে বসবাস শুরু করেন
১১ই ও ১২ই মার্চ ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎসজীবী সম্মেলনে (মাদীরীপুর) যোগদান করেন
এই সম্মেলনের উদ্বোধনী সঙ্গীত ছিল নজরুলের 'জেলেদের গান'টি
নজরুল বাংলা গানে এক নতুন ধারার সংযোজন করেন
তিনি স্বদেশী গানকে স্বাধীনতা ও দেশাত্মবোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বহারা শ্রেণীর গণসঙ্গীতে রূপান্তরিত করেন
এপ্রিল ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল কলকাতার প্রথম বামপন্থী সাপ্তাহিক 'গণবাণী' র জন্য রচনা করেন 'কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল' ও 'রেড ফ্লাগ' অবলম্বনে 'জাগো অনশন বন্দী', 'রক্তপতাকার গান' ইত্যাদি
অক্টোবর ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে, হরেন্দ্রকুমার চৌধুরীর আমন্ত্রণে সিলেট ভ্রমণ করেন
নভেম্বর ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে, অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় আইনসভার উচ্চ পরিষদের সদস্যপদের জন্য পূর্ব-বঙ্গ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নজরুলের রাজনৈতিক জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা
এ উপলক্ষে তিনি পূর্ব-বঙ্গে, বিশেষ করে ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল ও ময়মনসিংহে ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেন
স্কুলজীবনে ত্রিশাল-দরিরামপুরে থাকাকালে এ অঞ্চল সম্পর্কে তাঁর যে অভিজ্ঞতার সূত্রপাত হয়, রাজনৈতিক ও বৈবাহিক কারণে তা আরো গভীর হয়
নজরুল ছিলেন বাংলা গজল গানের স্রষ্টা
গণসঙ্গীত ও গজলে যৌবনের দুটো বিশিষ্ট দিক সংগ্রাম ও প্রেমের পরিচর্যাই ছিল মুখ্য
নজরুল গজল আঙ্গিক সংযোজনের মাধ্যমে বাংলা গানের প্রচলিত ধারায় বৈচিত্র্য আনয়ন করেন
তাঁর অধিকাংশ গজলের বাণীই উৎকৃষ্ট কবিতা এবং তার সুর রাগভিত্তিক
আঙ্গিকের দিক থেকে সেগুলি উর্দু গজলের মতো তালযুক্ত ও তালছাড়া গীত
নজরুলের বাংলা গজল গানের জনপ্রিয়তা সমকালীন বাংলা গানের ইতিহাসে ছিল তুলনাহীন
১৯২৬-১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে, কৃষ্ণনগর জীবনে নজরুল উভয় ধারায় বহুসংখ্যক গান রচনা করেন
এই সময়ে তিনি স্বরচিত গানের স্বরলিপি প্রকাশ করতে থাকেন
নজরুলের সৃজনশীল মৌলিক সঙ্গীত প্রতিভার প্রথম স্ফুরণ ঘটে ১৯২৬-১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে, কৃষ্ণনগরে; অথচ নজরুলের কৃষ্ণনগর জীবন ছিল অভাব-অনটন, রোগ-শোক ও দুঃখ-দারিদ্র্যক্লিষ্ট
তখনও পর্যন্ত নজরুল কোনো প্রচার মাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হননি, তবে দিলীপকুমার রায় ও সাহানা দেবীর মতো বড় মাপের শিল্পী ও সঙ্গীতজ্ঞ নজরুলের গানকে বিভিন্ন আসরে ও অনুষ্ঠানে পরিবেশন করে জনপ্রিয় করে তুলেন
১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে, একদিকে, সাপ্তাহিক 'শনিবারের চিঠি'তে রক্ষণশীল হিন্দু বিশেষত ব্রাহ্মণসমাজের একটি অংশ থেকে, অন্যদিকে, মৌলবাদী মুসলমান সমাজের 'ইসলাম দর্শন', 'মোসলেম দর্পণ' প্রভৃতি পত্রিকায় নজরুল-সাহিত্যের বিরূপ সমালোচনার ঝড় ওঠে
'শনিবারের চিঠি'তে নজরুলের বিভিন্ন রচনার প্যারডি প্রকাশিত হতে থাকে
তবে নজরুলের সমর্থনে 'কল্লোল', 'কালি-কলম' প্রভৃতি প্রগতিশীল পত্রিকা এগিয়ে আসে
১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে, নজরুলের কবিতা ও গানের সংকলন 'ফণি-মনসা' এবং পত্রোপন্যাস 'বাঁধন হারা' প্রকাশিত হয়
২৮শে ফেব্রুয়ারি ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের উদ্যোক্তা 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ'-এর প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে যোগদান করেন
ফেব্রুয়ারি ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে, দ্বিতীয় সপ্তাহে নজরুল 'মুসলিম সাহিত্য সমাজ'-এর দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য পুনরায় ঢাকা আসেন
তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন, ছাত্র বুদ্ধদেব বসু, অজিত দত্ত এবং গণিতের ছাত্রী ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে পরিচিয় হন
একই বছর জুন মাসে পুনরায় ঢাকা এলে সঙ্গীত চর্চাকেন্দ্রের রানু সোম (প্রতিভা বসু) ও উমা মৈত্রের (লোটন) সঙ্গে কবির ঘনিষ্ঠতা হয়
অর্থাৎ এ সময় পরপর তিনবার ঢাকায় এসে নজরুল ঢাকার প্রগতিশীল অধ্যাপক, ছাত্র ও শিল্পীদের সঙ্গে পরিচিত হন
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল আবার সিলেট ভ্রমণে আসেন
একই সালে, কলকাতায় আকরম খাঁ-র মাসিক 'মোহাম্মদী পত্রিকা'য় নজরুল-বিরোধিতা শুরু হয়, কিন্তু মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের 'সওগাত' পত্রিকা বলিষ্ঠভাবে নজরুলকে সমর্থন করে
নজরুল 'সওগাত'-এ যোগদান করে একটি রম্য বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন
'সওগাত'-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে আবুল কালাম শামসুদ্দীন নজরুলকে যুগপ্রবর্তক কবি ও বাংলার জাতীয় কবি হিসেবে আখ্যায়িত করেন
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল উত্তর-বঙ্গ ভ্রমণ করেন
২১শে ও ২২শে ডিসেম্বর ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল 'নিখিল ভারত কৃষক ও শ্রমিক দল'-এর সম্মেলনে যোগদান করেন
২৮শে ডিসেম্বর ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল 'নিখিল ভারত সোসিয়ালিস্ট যুবক কংগ্রেস'-এর অধিবেশনে উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন