content
stringlengths
0
129k
সব বন্ধন মুক্ত জাগো হে বীর
নবীন রুদ্র আমাদের তনু মনে জাগে
সে প্রলয় শিখা রক্ত উদয়ারুণ রাগে
এই শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল,
এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিফল
আবার যদি না জন্মাত মৃত্যুতে সে হাসত না,
আসবে আবার―নৈলে ধরায় এমন ভালোবাসত না
এমনিভাবে চিরদিন নজরুল প্রেরণা যোগাবেন বাঙালির জাতীয় জীবনে
নজরুলের সৃষ্টি মানুষের জীবনের সঙ্গে এক নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করে
মানুষের জীবনে আনন্দ, বেদনা, হাসি, কান্না সবই তাঁর কবিতার মাঝে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে
জীবনকে সৌন্দর্য-সড়বাত করে তুলতে সমাজে নজরুলের কবিতা, কাব্য ও সাহিত্যের দান অপরিসীম
ঠিক তেমনি বলা যায় যে, নজরুলে সৃষ্টি সৌন্দর্যের সহায়কও বটে
তাঁর সৃষ্টি জীবনের বিচিত্র অভিব্যক্তিরূপে মানুষের অন্তরকে অনন্তের সন্ধান দেয়
এসবে নজরুলকে বিভিন্নরূপে আত্মপ্রকাশ করে; বক্তব্যে যেমনি আছে ভিন্নতা, তেমনি প্রকাশ ভঙ্গিমায় বৈচিত্র্যতা রয়েছে
তাই হিন্দু-মুসলিম, ধর্ম নির্বিশেষে, প্রতিটি বাঙালি মনে-প্রাণে তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসেন
তাঁরা সবাই তার কাব্যের সৌন্দর্যবোধ, রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গির গভীরতায় মুগ্ধ হন!
শৈশবে রুটির দোকানে চাকরি জীবনে ময়দা মাখতে মাখতে হয়তো তাঁর মনে উদয় হয়, দুনিয়াটকে দলেমলে মনের মতো করে গড়বেন
যত অনাচার, যত অন্ধ শাস্ত্রাচার সবারি মূল উৎপাদন করবেন
সর্বহারার গান গেয়ে সর্বজয়ী হবেন
এ বিশ্বাস শৈশব থেকে তাঁর মনে ঠাঁই নিয়েছিল, তাই তিনি পুরাতনকে বরদাশত করতে পারেননি
তাই সৃষ্টির নেশায় মেতে ছিলেন তিনি―
আজ সৃষ্টি সূখের উল্লাসে―
মোর মুখ হাসে, মোর চোখ হাসে
মোর টগ্বগিয়ে খুন হাসে
যেদিন প্রথম প্রকাশিত হল―
বল, চির উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি
নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির
সেদিন বঙ্গ সহিত্যাকাশের দিকে সাড়া পড়ে যায়―'কে এই মহা-বিদ্রোহী বীর?' আবারও বলা আবশ্যক যে, নজরুলের বিদ্রোহ ছিল উৎপীড়ক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, সংকীর্ণ ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে; অর্থাৎ মানুষের সর্বাঙ্গীন বিকাশের পথে যত সব পথের কাঁটা তাদের বিরুদ্ধে
পুঁতিগন্ধময় প্রাচীনকে ভেঙে নূতনের বন্যা আনার জন্যই নজরুলের সক্রিয় সংগ্রাম
যেখানে অসাম্য, শোষণ ও অত্যাচার সেখানেই তিনি বিদ্রোহী
শুধু এসবই নয়, আসলে তিনি বিদ্রোহী হয়ে উঠেন স্বয়ং বাংলা-সাহিত্যের মূল ধারা ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধেই
এর অজস্র প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর সৃষ্টি-জগতের বৈচিত্রে
কিন্তু তিনি শুধুমাত্র বিপ্লবী কবি ছিলেন না
তিনি গান রচনা করেছেন তিন হাজারেরও বেশি
বাংলা-সঙ্গীতের প্রায় সবকটি ধারার পরিচর্যা ও পরিপুষ্টি, বাংলা-সঙ্গীতকে উত্তর ভারতবর্ষের রাগসঙ্গীতের দৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপন এবং লোকসঙ্গীতাশ্রয়ী বাংলা সঙ্গীতকে মার্গসঙ্গীতের ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্তি নজরুলের মৌলিক সঙ্গীত-প্রতিভার পরিচায়ক
নজরুল-সঙ্গীত ভারতবর্ষের সঙ্গীতের অণুবিশ্ব, তদুপরি উত্তর ভারতবর্ষের রাগসঙ্গীতের বঙ্গীয় সংস্করণ
বাণী ও সুরের বৈচিত্র্যে নজরুল ভারতবর্ষের সঙ্গীতকে যথার্থ আধুনিক সঙ্গীতে রূপান্তরিত করেন
তাঁর প্রেমগীতি উচ্চ প্রশংসিত, বিশ্বসাহিত্যে স্থান পাওয়ার উপযুক্ত, যেমন―
নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল,
ফুল নেব না অশ্রু নেব ভেবে হই আকুল
সর্বোপরি নজরুল একজন প্রেমিকও বটে,
তুমি আমায় ভালোবাসো তাই তো আমি কবি
আমার এ রূপ―সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি
বাংলার পথে-প্রান্তরে, কৃষকের মুখে মুখে, পথিকের বাঁশের বাঁশিতে, নজরুলের গান ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়
উদাস বনের ধারে, উথাল-পাথাল নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে নজরুলের সুর ভেসে বেড়ায়
তিনি হাফিজ ও ওমর খৈয়ামের গজল অনুবাদ করে বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে এক নূতন ধারার সুচনা করেন
নূতন নূতন গজল লিখে তিনি বাংলা ভাষাকে চমৎকৃত করেন
ভাটিয়ালী, কীর্তন, বাউল, শ্যামা, ঝুমুর, জারীগানসহ অজস্র সঙ্গীত তাঁর কলম থেকে সৃষ্টি হয়
নজরুলই ভারতবর্ষের আধুনিক গানের জনক ও প্রথম পথ প্রদর্শক
সারা জীবন তিনি দুঃখ-দূর্দশা ও কঠোর সংগ্রামের মধ্য-দিয়ে কাটিয়েছেন বলেই দারিদ্রই তার একমাত্র বন্ধু―
হে দারিদ্র্য তুমি মোরে
করেছ মহান,
তুমি মোরে দানিয়াছ
খ্রিস্টের সম্মান
এজন্যেই তিনি দৃপ্তকণ্ঠে গেয়ে উঠেন―
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া
হাসি পুস্পের হাসি
নজরুল জীবনে রাজনীতির প্রভাব আরম্ভ হয় প্রথম মহাযুদ্ধের সর্বনাশী প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে
স্বাধীনতার প্রশ্নে বাংলাঞ্চলে তুমুল আন্দোলন দেখা দেয়
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন এ আন্দোলনে পুরোভাগে
বীর নজরুল অগ্নি পুরুষের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ধ্বনি তুলে, 'ইনক্লাব জিন্দাবাদ'
'ধুমকেতু'-নাম দিয়ে অর্ধ-সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে সাহিত্যাঙ্গনে এক নূতনরূপে আত্মপ্রকাশ করেন
'ধুমকেতু' দৃপ্তকণ্ঠে প্রকাশ করে―'স্বরাজ টরাজ বুঝিনে
ভারতবর্ষের এক কণা পরিমাণ অংশও বিদেশীদের হাতে থাকবে না
এ দেশের রাষ্ট্র চালনার দায়িত্ব―সম্পূর্ণ শাসনভার―সমস্তই থাকবে এ দেশীয়দের হাতে
' ধুমকেতুর অগ্নিময়বাণী ব্রিটিশ সরকারকে অতিষ্ঠ করে তুলে
তারা তাঁকে কারাগারে পুরেন
কিন্তু সেখানে গিয়েও নিস্তার নেই―
এ শিকল পরা ছল,
মোদের এ শিকল পরা ছল
এ শিকল পরেই শিকল তোদের
গান গেয়ে গেয়ে তিনি জেলখানার কয়েদীদেরও জাগিয়ে তুলেন
কারাগারের লোহার গরাদ ধরে ফুলের মতো আলিঙ্গন করেন
তারপর শুরু করেন জেলখানার মধ্যেই অনশন ধর্মঘট
সারাদেশ ব্যাকুল হয়ে ওঠে
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও শঙ্কিত হন
তিনি অনশন ধর্মঘটের খবর পেয়ে তার-যোগে জানান, ' , .' এ থেকে সহজেই অনুমেয় নজরুল রবীন্দ্রনাথের অন্তরে কতটুকু স্থান জুড়ে অবস্থান করতেন
অবশ্য অবশেষে সরকার জেল থেকে তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়
শিশুসাহিত্যেও নজরুলের অবদান কম নয়
শিশুহৃদয়ের যে-ছবি তিনি এঁকে গিয়েছেন তাও যেন শিশুর মতোই সহজ, সরল ও প্রাণবন্ত হয়ে ফুটে উঠেছে
কোনো কৃত্রিমতা নেই, আড়ম্বর নেই, ছেলেমানুষের মতোই তিনি শিশুদের সঙ্গে একান্ত হয়ে যান! বাল্যকালে দুরন্তপনা করেই যার দিন কাটতো, পাখীর বাসা, খেতের ফসল, পুকুরের মাছ সন্ধানে যিনি সকাল-বিকাল র্ঘু র্ঘু করে ঘুরেন―সাধে কি তাঁর 'কাঠ বেড়ালী', 'লিচু চোর'―এ যুগের শিশুদের মন জয় করেছে? 'লিচু চোর' কবিতাটি আজকালের ছেলেদের মন ষোলআনা ...
'কাঠ বেড়ালী, তুমি মর, তুমি কচু খাও
' কবিতায় 'ঝগড়া', 'অভিমান' এসব যেন সত্যিকারের শিশু-জগতের বাস্তব ঝগড়ার প্রতিচ্ছবি
শিশু মন না হলে এমন কাব্য সৃষ্টি করা সম্ভব হত না! এক কথায়, তিনি ছোটদের জন্য যা লিখেছেন তাও অনবদ্য
সকাল বেলা ঘুম থেকে জেগে ওঠে শিশুরা শুনতে পায় পাখির কিচির-মিচির শব্দ―এ দেখে কার না আকাশে উড়তে মনে ইচ্ছে জাগে? কবির ভাষায়―
আমি হব সকাল বেলার পাখী
সবার আগে কুসুম বাগে,
উঠব আমি জাগি
ভোর হলো দোর খোলে
খুকুমণি উঠরে
ঐ ডাকে জুঁই শাখে
ফুল খুকী ছোটরে
খুকুমণি উঠরে
নজরুলকে 'গানের পাখি' বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না
কিন্তু পরিতাপের বিষয় তিনি সবাইকে গান শুনিয়ে, শিখিয়ে, পড়িয়ে অবশেষে শেষ জীবনে 'গানের পাখি' নিজেই যেন গান ভুলে গেলেন! নজরুলের কণ্ঠ হয়ে যায় চীর স্তব্ধ! রবীন্দ্রনাথ একবার লেখেন―
স্ফুলিঙ্গ তার পাখায় পেল
ক্ষণকালের ছন্দ,
উড়ে গিয়ে ফুরিয়ে গেল
সেই তারি আনন্দ