content
stringlengths
0
129k
নজরুলও ছিলেন এ ধরনের এক 'স্ফুলিঙ্গ'
তবে ক্ষণকালের ছন্দ ও আনন্দ দান করেই 'স্ফুলিঙ্গ'-এর ইতিকর্তব্য ফুরিয়ে যায়নি
পৃথিবীর ইতিহাসে যে ক'জনা চিরকালের কবি-সাহিত্যিক যুগান্তর সৃষ্টির প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন, নিঃসন্দেহে নজরুল তাঁদের অন্যতম
নজরুলের ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধগুলোও বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে
আমাদের দুর্ভাগ্য যে এই মহান কবিকে কর্মক্ষম অবস্থায় পাইনি; তাঁর জীবনের শেষ দিকে, তবু তিনি জাতিকে যা দিয়েছেন তা যেন শ্রদ্ধার সঙ্গে আমরা মনের মণিকোঠায় সঞ্চয় করে রাখি এবং কবির কামনা সফল করার জন্যে সচেষ্ট হই―
জয় নিপীড়িত জনগণ জয়! জয় নব উত্থান
জয় নিপীড়িত প্রাণ!
জয় নব অভিযান!
জয় সব উত্থান!
মহাকবির মহাবাণীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা যেন তাঁর সুরে সুর মিলিয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই―
আমি সেইদিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খক্ষ কৃপান ভীম রণ-ভূমে রণিবে না―
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেইদিন হব শান্ত
আমাদের মুক্তস্বাধীনচেতনা বৃদ্ধি করতে নজরুলচর্চা করতেই হবে
সত্যের অনুসন্ধান ও 'বিদ্রোহী' কবিতার 'আমি' শব্দটির সৃষ্টির ব্যাপক রহস্য উদ্ধার করতে হবে
বিদ্বেষ জর্জরিত কুৎসিত কলুষিত অসুন্দর নিপীড়িত পৃথিবীকে সুন্দর-সাম্য-অভেদ-শান্তি-আনন্দময় করার প্রেরণা যোগাতে; এবং মানুষের, মানবতার ও মনুষ্যত্বের জাগরণ-কল্যাণ-মঙ্গলের জন্যে নজরুলকে অবশ্যি চর্চা করা আবশ্যক, এছাড়া অন্যকোনো পথ বা পন্থা নেই
অজ্ঞানতা ও জাতিবর্ণধর্মের বৈষম্যের জঞ্জাল চূর্ণবিচূর্ণ করে সত্যের প্রকাশ ও বিকাশের পথোন্মুক্ত করতে নজরুলই হচ্ছেন আমাদের প্রতীক
২৪শে মে ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে, ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দে, পশ্চিম-বাংলার বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন নজরুল
চুরুলিয়া গ্রামটি আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া অংশে অবস্থিত
পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয় পত্নী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠসন্তান ছিলেন নজরুল
তার পিতা ছিলেন স্থানীয় এক মসজিদের ইমাম
নজরুলের ডাক নাম ছিল 'দুখু মিয়া'
তিনি স্থানীয় মক্তবে কুরআন, ইসলাম ধর্ম, দর্শন এবং ইসলামী ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন শুরু করেন
১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে, নজরুলের পিতার মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র নয় বৎসর
পারিবারিক অভাব-অনটনের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবন বাঁধাগ্রস্থ হয় এবং মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁকে জীবিকা অর্জ্জনে অগ্রসর হতে হয়
এই সময় নজরুল মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য হাজী পালোয়ানের মাযারের সেবক এবং মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেন
শৈশবের এই শিক্ষা ও শিক্ষকতার মধ্য-দিয়ে নজরুল অল্পবয়সেই ইসলাম-ধর্মের মৌলিক আচার-অনুষ্ঠান―পবিত্র কুরআন পাঠ, নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত প্রভৃতি―বিষয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ লাভ করেন; যা পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতে ইসলামি ঐতিহ্যের রূপায়ণে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে
মক্তব, মাজার ও মসজিদ-জীবনের পর, লোকশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নজরুল রাঢ় বাংলার―পশ্চিম-বাংলার বর্ধমান-বীরভূম অঞ্চলের কবিতা, গান আর নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক ভ্রাম্যমান লোকনাট্য লেটোদলে যোগদান করেন
তাঁর পিতৃব্য কাজী বজলে করিম চুরুলিয়া অঞ্চলের লেটো দলের বিশিষ্ট ওস্তাদ ছিলেন এবং আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় তাঁর দখল ছিল
এছাড়া বজলে করিম মিশ্র ভাষায় গান রচনা করতেন
বজলে করিমের প্রভাবেই নজরুল লেটোদলে যোগ দেন
এছাড়া এই অঞ্চলের জনপ্রিয় লেটোদলের কবি শেখ চকোর (গোদা কবি) এবং কবিয়া বাসুদেবের লেটোদল ও কবিগানের আসরে নজরুল নিয়মিত অংশ নিতেন
লোকনাট্য লেটোদলে বালক নজরুল ছিলেন একাধারে পালাগান রচয়িতা ও অভিনেতা
নজরুলের কবি ও শিল্পী জীবনের শুরু এই লেটোদল থেকেই
হিন্দু-পুরাণের সঙ্গে নজরুলের পরিচয়ও ঘটে এই লেটোদল থেকে
তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা ও গান রচনার কৌশল নজরুল লেটো বা কবিগানের দলেই রপ্ত করেন
এই সময় লেটোদলের জন্য কিশোর কবি নজরুলের সৃষ্টি 'চাষার সঙ', 'শকুনিবধ', 'রাজা যুধি'িরের সঙ', 'দাতা কর্ণ', 'আকবর বাদশাহ', 'কবি কালিদাস', 'বিদ্যাভূতুম', 'রাজপুত্রের সঙ', 'বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ', 'মেঘনাদ বধ' প্রভৃতি
১৯১০ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল পুনরায় ছাত্রজীবনে ফিরে যান
প্রথমে তিনি রানীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজ স্কুল এবং পরে মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে (পরবর্তীতে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন) ভর্তি হন
মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলের হেড-মাস্টার ছিলেন কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিক; তাঁর সান্নিধ্য নজরুলের অনুপ্রেরণার একটি উৎস
কুমুদ রঞ্জন মল্লিক নজরুল-স্মৃতিচারণে লিখেছেন, 'ছোট সুন্দর ছনমনে ছেলেটি, আমি ক্লাশ পরিদর্শন করিতে গেলে সে আগেই প্রণাম করিত
আমি হাসিয়া তাহাকে আদর করিতাম
সে বড় লাজুক ছিল
' দুর্ভাগ্যক্রমে আর্থিক অনটনের কারণে ষষ্ঠ শ্রেণীর পর নজরুলের ছাত্রজীবনে আবার শিক্ষাক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটে
১৯১১ খ্রিস্টাব্দে, মাথরুন স্কুল ছেড়ে তিনি প্রথমে বাসুদেবের কবিদলে, ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে, এক খ্রিস্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা পদে এবং শেষে আসানসোলে চা-রুটির দোকানে কাজ নেন
এভাবে কিশোর শ্রমিক নজরুল তাঁর বাল্যজীবনেই রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে সম্যকভাবে পরিচিত হন
চা-রুটির দোকানে চাকরি করার সময় আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লার সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয় এবং তাঁর সুবাদেই নজরুল, ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে, ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন
১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে, তিনি পুনরায় নিজের গ্রামে ফিরে আসেন এবং ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দেই রানীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজস্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন
এই স্কুলে তিনি দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করেন
প্রিটেস্ট পরীক্ষার সময়, ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে, নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন
ছাত্রজীবনে নজরুল সিয়ারসোল স্কুলের চারজন শিক্ষক দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত হন
তাঁরা হলেন উচ্চাঙ্গ-সঙ্গীতে সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, বিপ্লবী ভাবধারায় নিবারণ চন্দ্র ঘটক, ফারসি সাহিত্যে হাফিজ নুরুন্নবী এবং সাহিত্যচর্চায় নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
১৯১৭ (শেষদিক) থেকে ১৯২০ (এপ্রিল) খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত নজরুলের ছিল সৈনিক জীবন
প্রথমে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত প্রদেশের নওশেরায় যান
প্রশিক্ষণ শেষে করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন কাটাতে শুরু করেন
প্রায় আড়াই বছর, তিনি ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্টের একজন সাধারণ সৈনিক কর্পোরাল , ব্যাটেলিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদা প্রভৃতি ছিলেন
রেজিমেন্টের পাঞ্জাবি মৌলবির নিকট তিনি ফারসি ভাষা শেখেন, সঙ্গীতানুরাগী সহসৈনিকদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি বাদ্যযন্ত্র সহযোগে সঙ্গীতচর্চা করেন
একই সঙ্গে গদ্যে-পদ্যে সাহিত্যচর্চা করেন
করাচি সেনানিবাসে বসে নজরুল যে রচনাগুলো সম্পন্ন করেন এবং কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তার মধ্যে রয়েছে, প্রথম গদ্য রচনা 'বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী' ('সওগাত', মে ১৯১৯), প্রথম প্রকাশিত কবিতা 'মুক্তি' ('বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা', জুলাই ১৯১৯); গল্প: 'হেনা', 'ব্যথার দান', 'মেহের নেগার', 'ঘুমের ঘোরে'; কবিতা: 'আশ...
উল্লেখযোগ্য যে, করাচি সেনানিবাসে থেকেও তিনি কলকাতার বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা―'প্রবাসী', 'ভারতবর্ষ', 'ভারতী', 'মানসী', 'মর্মবাণী', 'সবুজপত্র', 'সওগাত' ও 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'র গ্রাহক ছিলেন
তাছাড়া তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং ফারসি কবি হাফিজের কিছু গ্রন্থ ছিল
প্রকৃতপক্ষে, নজরুলের সাহিত্য চর্চার হাতেখড়ি এই করাচি সেনানিবাসেই
সৈনিক থাকা অবস্থায় তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন
এই সময় নজরুলের বাহিনীর ইরাক যাওয়ার কথা ছিল
কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ায় তাঁর আর যাওয়া হয়নি
১৯২০ খ্রিস্টাব্দে, প্রথম মহাযুদ্ধ শেষে ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়
মার্চ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন
এখানেই শুরু হয় তাঁর সাহিত্যিক-সাংবাদিক জীবন
কলকাতায় তাঁর প্রথম আশ্রয় ছিল ৩২নং কলেজ স্ট্রীটে 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'র অফিসে, অন্যতম কর্মকর্তা মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে
প্রথম দিকেই 'মোসলেম ভারত', 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা', 'উপাসনা' প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর কিছু লেখা প্রকাশিত হয়
এর মধ্যে রয়েছে উপন্যাস 'বাঁধন হারা' এবং কবিতা 'বোধন', 'শাত-ইল-আরব', 'বাদল প্রাতের শরাব', 'আগমনী', খেয়া-পারের তরণী', 'কোরবানী', 'মোহররম', 'ফাতেহা-ই-দোয়াজ্দম্'
এই লেখাগুলো সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়
এর প্রেক্ষিতে কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার 'মোসলেম ভারত পত্রিকা'য় প্রকাশিত এক পত্রের মাধ্যমে নজরুলে 'খেয়া-পারের তরণী' এবং 'বাদল প্রাতের শরাব' কবিতা-দুটোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে একটি সমালোচনা প্রবন্ধ লিখেন
এ থেকেই দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সমালোচকদের সঙ্গে নজরুলের ঘনিষ্ঠ পরিচয় শুরু হয়
নজরুল 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'র অফিসে মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, আফজালুল হক, কাজী আবদুল ওদুদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ সমকালীন মুসলমান সাহিত্যিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন
অন্যদিকে, কলকাতার তৎকালীন জমজমাট দুটো সাহিত্যিক আসর 'গজেনদার আড্ডা' ও 'ভারতীয় আড্ডা'য় অতুলপ্রসাদ সেন, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ওস্তাদ করমতুল্লা খাঁ, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, শিশিরকুমার ভাদুড়ী, হেমেন্দ্রকুমার রায়, শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু লাহিড়...
অক্টোবর ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন; তখন থেকে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত (১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ) তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক, যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা অক্ষুণ্ন থাকে
১২ই জুলাই ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে, 'নবযুগ' নামক একটি সান্ধ্য দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হওয়া শুরু করে
অসহযোগ ও খিলাফৎ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শেরে-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক
এই পত্রিকার মাধ্যমেই নজরুলের সাংবাদিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে
নজরুলের লেখা 'মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে?' প্রবন্ধের জন্য এই বছরেরই আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত হয় এবং নজরুলের উপর পুলিশের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে
'নবযুগ' পত্রিকার সাংবাদিকরূপে নজরুল যেমন একদিকে স্বদেশ ও আন্তর্জাতিক জগতের রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থা নিয়ে লিখেতে শুরু করেন, তেমনি মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে উপস্থিত থেকে সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান
একাধারে বিভিন্ন ঘরোয়া আসর ও অনুষ্ঠানে যোগদান এবং সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য-দিয়ে নজরুলের সংস্কৃতিচর্চাও অগ্রসর হতে থাকে
বিভিন্ন ছোটখাটো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কবিতা ও সঙ্গীতের চর্চাও চলছিল
নজরুল তখনও স্বরচিত গানে সুরারোপ করতে শুরু করেননি, তবে তাঁর কয়েকটি কবিতায় সুরারোপ করে স্বরলিপিসহ পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করেন ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গীতজ্ঞ মোহিনী সেনগুপ্তা, উদাহরণস্বর, 'হয়তো তোমার পাব দেখা', 'ওরে এ কোন্ স্নেহ-সুরধুনী' প্রভৃতি
বৈশাখ ১৩২৭ খ্রিস্টাব্দে, নজরুলের গান 'বাজাও প্রভু বাজাও ঘন' প্রথম প্রকাশিত হয় 'সওগাত' পত্রিকায়
১৯২১ খ্রিস্টাব্দে নজরুল 'মুসলিম সাহিত্য সমিতি'র অফিসে পরিচিত হন প্রকাশক আলী আকবর খানের সঙ্গে এবং তাঁর সঙ্গেই নজরুল প্রথম কুমিল্লায় বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন
এখানে তিনি আলী আকবর খানের ভগ্নী নার্গিস আসার খানম ও প্রমীলার সঙ্গে পরিচিত হন
নজরুলের বিয়ে ঠিক হয় নার্গিস আসার খানমের সঙ্গে, তবে 'ঘর জামাই' থাকার শর্ত নিয়ে বিরোধ বাধে
নজরুল 'ঘর জামাই' থাকতে অস্বীকার করেন এবং বিয়ের অনুষ্ঠান ত্যাগ করে কুমিল্লা শহরে বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়ি চলে আসেন
তখন নজরুল খুব অসুস্থ ছিলেন এবং প্রমিলা দেবী নজরুলের পরিচর্যা করেন; এই পরিচয়ের সূত্র ধরেই পরবর্তীতে তাঁরা পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন
সেই সময় অসহযোগ আন্দোলনে কুমিল্লা উদ্বেলিত
একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নজরুল বিভিন্ন শোভাযাত্রা ও সভায় যোগ দেন
তাঁর মূল কাজ ছিল শোভাযাত্রা ও সভায় যোগ দিয়ে গান গাওয়া
সেই সময়ের তাঁর রচিত ও সুরারোপিত স্বদেশী গানগুলো হচ্ছে, 'এ কোনো পাগল পথিক ছুটে এলো বন্দিনী মার আঙ্গিনায়', 'আজি রক্ত-নিশি ভোরে/ একি এ শুনি ওরে/ মুক্তি-কোলাহল বন্দী-শৃঙ্খলে' প্রভৃতি
এভাবেই কলকাতার সৌখিন গীতিকার ও গায়ক নজরুল কুমিল্লায় অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান এবং পরাধীনতার বিরুদ্ধে জাগরণী গান রচনা ও পরিবেশনার মধ্য দিয়ে স্বদেশী গান রচয়িতা ও রাজনৈতিক কর্মীতে পরিণত হন
এখানে ১৭ দিন থেকে তিনি স্থান পরিবর্তন করেন
নভেম্বর ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে, নজরুল আবার কুমিল্লা আসেন