content stringlengths 0 129k |
|---|
এমদাদ বুঝিল : ইনিই পীর সাহেব |
'আসসালামু আলাইকুম' বলিয়া সুফী সাহেব সোজা পীর সাহেবের নিকট উপস্থিত হইয়া হাঁটু পাতিয়া বসিলেন |
পীর সাহেব সম্মুখস্থ তাকিয়ার উপর একটি পা তুলিয়া দিলেন |
সুফী সাহেব সেই পায়ে হাত ঘষিয়া নিজের চোখে মুখে ও বুকে লাগাইলেন |
তৎপর পীর সাহেব তাঁর হাত বাড়াইয়া দিলেন |
সুফী সাহেব তা চুম্বন করিয়া দাঁড়াইয়া উঠিলেন এবং পিছাইয়া-পিছাইয়া কিছু দূর গিয়া অন্যান্য সকলের ন্যায় জানু পাতিয়া বসিলেন |
পীর সাহেব এতক্ষণে কথা বলিলেন : কিরে বেটা,খবর কি? তুই কি এরই মধ্যে দায়েরায়ে হকিকতে মহব্বত ও জযবায়েযাতী-বনাম হোব্বে এশক হাসিল করিয়া ফেললি নাকি? |
পীর সাহেবের এই ঠাট্টায় লজ্জা পাইয়া সুফী সাহেব মাথা নিচু করিয়া মাজা ঈষৎ উঁচু করিয়া বলিলেন,হযরত,বান্দাকে লজ্জা দিতেছেন! |
পীর সাহেব তেমনি হাসিয়া বলিলেন : তা না হইলে নিজের চিন্তা ছাড়িয়া অপরের রুহের সুপারিশ করিতে আমার নিকট আসিলেন কেন? কই তোর সঙ্গী কোথায়? আহা! বেচারা বড়ই অশান্তিতে দিনপাত করিতেছে |
এই বলিয়া পীর সাহেব চক্ষু বুজিলেন এবং প্রায় এক মিনিট কাল ধ্যানস্থ থাকিয়া চক্ষু মেলিয়া বলিলেন: সে এই ঘরেই হাজির আছে দেখিতেছি |
উপস্থিত মুরিদগণের সকলে বিস্ময়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিল |
এমদাদ ভক্তি ও বিস্ময়ে স্তব্ধ হইয়া একদৃষ্টে পীর সাহেবের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল |
মেহেদি-রঞ্জিত দাড়ি-গোঁফের ভিতর দিয়া পীর সাহেবের মুখ হইতে এক প্রকার জ্যোতি বিকীর্ণ হইতে লাগিল |
সুফী সাহেব এমদাদকে আগাইয়া আসিতে ইশারা করিলেন |
সে ধীরে ধীরে পীর সাহেবের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া সুফী সাহেবের ইঙ্গিতে অনভ্যস্ত হাতে কদম-বুসি করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া রহিল |
পীর সাহেব "বস বেটা,তোর ভাল হইবে |
আহা,বড় গরীব!" বলিয়া আলবোলার নলে দম কষিলেন |
সুফী সাহেব আমতা-আমতা করিয়া বলিলেন : হযরত এর অবস্থা তত গরীব নয় |
বেশ ভাল তালুক সম্পত্তি- |
পীর সাহেব নলে খুব লম্বা টান কষিয়াছিলেন;কিন্তু মধ্যপথে দম ছাড়িয়া দিয়া মুখে ধোঁয়া লইয়াই বলিলেন : বেটা,তোরা আজিও দুনিয়ার ধন-দৌলত দিয়া ধনী-গরিব বিচার করিস |
এটা তোদের বুঝিবার ভুল |
আমি গরিব কথায় দুনিয়াবী গোরবৎ বুঝাই নাই |
মুসলমানদের জন্য দুনিয়ার ধন-দৌলত হারাম |
এই ধন-দৌলত এনসানের রুহানিয়ত হাসেলে বাধা জন্মায়,তার মধ্যে নফসানিয়ত পয়দা করে |
আল্লাহতালা বলিয়াছেন : (আরবী ও উর্দু) বেশক দুনিয়ার ধন-দৌলত শয়তানের ওয়াস-ওয়াসা,ইহা হইতে দূরে পলায়ন কর |
কিন্তু দুনিয়ার মায়া কাটান কি সহজ কথা? তোদের আমি দোষ দিই না |
তোদের অনেকেই এখন যেকেরের দরজাতেই পড়িয়া আছিস |
যেকরে জলী ও যেকরে খফী- এই দুই দরজার যেকের সারিয়া পরে ফেকেরের দরজায় পৌঁছিতে হয় |
ফেকের হইতে যহুর এবং যহুর হইতে মোরাকেবা-মোশাহেদার কাবেলিয়ত হাসেল হয় |
খোদার ফজলে আমি আরেফিন,সালেহীন ও সিদ্দিকিনের মোকামাতের বিভিন্ন দায়েরার ভিতর দিয়া যেভাবে এলমে-লাদুন্নির ফয়েজ হাসেল করিয়াছি,তোদের কলব অতটা কুশাদা হইতে অনেক দেরি অনেক- |
-বলিয়া তিনি হুক্কার নলটা ছাড়িয়া দিয়া সোজা হইয়া বসিলেন এবং চোখ বুজিয়া ধ্যানস্থ হইলেন |
কিছুক্ষণ চোখ বুজিয়া থাকিয়া হাসিয়া উঠিলেন এবং চিৎকার করিয়া বলিলেন : কুদরতে-ইয্দানী,কুদরতে-ইয্দানী |
মুরিদরা সব সে-চিৎকারে সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিলেন |
কিন্তু কেহ কোনও কথা জিজ্ঞাসা করিতে সাহস করিলেন না |
পীর সাহেব চিৎকার করিয়াই আবার চোখ বুজিয়াছিলেন |
তিনি এবার ঈষৎ হাসিয়া চোখ মেলিয়া বলিলেন : আমরা কত বৎসর হইল এখানে বসিয়া আছি? |
জনৈক মুরিদ বলিলেন : হযরত,বৎসর কোথায়? এই না কয়েক ঘণ্টা হইল |
পীর সাহেব হাসিলেন |
বলিলেন : অনেক দেরি- অনেক দেরি |
আহা বেচারারা চোখের বাহির আর কিছুই দেখিতে পায় না |
অপর মুরিদ বলিলেন : হুজুর কেবলা,আপনার কথা মোটেই বুঝিতে পারিলাম না |
পীর সাহেব মৃদু হাসিয়া বলিলেন : অত সহজে কি আর সব কথা বুঝা যায় রে বেটা? চেষ্টা কর,চেষ্টা কর |
মুরিদটি ছিলেন একটু আবদেরে রকমের |
তিনি বায়না ধরিলেন : না কেবলা,আমাদিগকে বলিতেই হইবে |
কেন আপনি বৎসরের কথা জিজ্ঞাসা করিলেন? |
পীর সাহেব বলিলেন : ও-কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করিস না |
তার চেয়ে অন্য কথা শোন |
এই যে সাদুল্লাহ (সুফী সাহেবের নাম) একটি ছেলেকে আমার নিকট মুরিদ করিতে লইয়া আসিল,আমি সে-কথা কি করিয়া জানিতে পারিলাম? আজ তোমরা তাজ্জব হইতেছ |
কিন্তু ইনশাআল্লাহ, যখন তোমরা মোরাকেবায়ে-নেসবতে-বায়নান্নাসে তালিম লইবে,তখন অপরের নেসবত সম্বন্ধে তোমাদের কলব আয়নার মতো রওশন হইয়া যাইবে |
আলগরজ ইহাও খোদার এক শানে-আজিম |
সাদুল্লাহ যখন আমার দস্ত-বুসি করে,তখন তার মুখের দিকে আমার নজর পড়িল এবং সঙ্গে সঙ্গে আমার রুহ সাদুল্লাহর রুহের দিকে মোতাওয়াজ্জাহ হইয়া গেল |
সেখানে আমি দেখিলাম,সাদুল্লার রুহ আর একটা নূতন রুহের সঙ্গে আলাপ করিতেছে |
উহাতেই আমি সব বুঝিয়া লইলাম |
আল্লাহু আজিমুশশান |
বলিয়া পীর সাহেব একজন মুরিদকে হুক্কার দিকে ইঙ্গিত করিলেন |
মুরিদ হুক্কার মাথা হইতে চিলিম লইয়া তামাক সাজিতে বাহির হইয়া গেল |
পীর সাহেব বলিলেন : তোমরা আমার নিজের নুৎফার ছেলের মতো |
তথাপি তোদের নিকট হইতে আমাকে অনেক গায়েবের কথা গোপন রাখিতে হয় |
কারণ তোমরা সে-সমস্ত বাতেনি কথা বরদাশত করিতে পারিবে না |
যেকের ও ফেকের দ্বারা কলব কুশাদা করিবার আগেই কোনও বড় রকমের নূরে তজল্লী তাতে ঢালিয়া দিলে তাতে কলব অনেক সময় ফাটিয়া যায় |
এলমে-লাদুন্নি হাসেল করিবার আগেই আমি একবার লওহে-মাওফুযে উপস্থিত হইয়াছিলাম |
তখন আমি মাত্র দায়েরায়ে-হকিকতে-লাতা আইউনে তালিম লইতেছিলাম |
সায়েরে-নাযাবীর ফয়েজ তখনও আমার হাসেল হয় নাই |
কাজেই আরশে-মওয়াল্লার পরদা আমার চোখের সামনে হইতে উঠিয়া যাইতেই আমি নূরে-ইয্দানী দেখিয়া বেহুশ হইয়া পড়িলাম |
তারপর আমার জেসমের মধ্যে আমার রুহের সন্ধান না পাইয়া আমার মুর্শেদ-কেবলা- তোরা তো জানিস আমার ওয়ালেদ সাহেবই আমার মুর্শেদ -লওহে মাহফুজ হইতে আমার রুহ্ আনিয়া আমার জেসমের মধ্যে ভরিয়া দেন,এবং নিজের দায়রার বাহিরে যাওয়ার জন্য আমাকে বহুৎ তম্বিহু করেন |
কাজেই দেখিতেছিস,কাবেলিয়ত হাসেল না করিয়া কোনও কাজে হাত দিতে নাই |
খানিকক্ষণ আগে আমি জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম : আমরা কত বৎসর যাবত এখানে বসিয়া আছি? শুনিয়া তোরা অবাক হইয়াছিলি |
কিন্তু এর মধ্যে যে ঘটনা ঘটিয়াছে,তা শুনিলে তো আরো তাজ্জব হইয়া যাইবি |
সে জন্যই সে কথা বলিতে চাই না |
কিন্তু কিছু কিছু না বলিলে তোরা শিখবি কোথা হইতে? তাই সে কথা বলাই উচিত,মনে করিতেছি |
সাদুল্লাহ এখানে আসিবার পর আমি আমার রুহকে ছাড়িয়া দিয়াছিলাম |
সে তামাম দুনিয়া ঘুরিয়া সাত হাজার বৎসর কাটাইয়া তারপর আমার জেসমে পুনরায় প্রবেশ করিয়াছে |
এই সাত হাজার বৎসরে কত বাদশাহ ওফাত করিয়াছে,কত সুলতানাৎ মেসমার হইয়াছে,কত লড়াই হইয়াছে;সব আমার সাফ-সাফ মনে আছে |
সেরেফ এইটুকুই বলিলাম; ইহার বেশি শুনিলে তোদের কলব ফাটিয়া যাইবে |
ইতিমধ্যে তামাক আসিয়াছিল |
পীর সাহেব নল হাতে লইয়া ধীরে ধীরে টানিতে লাগিলেন |
সভা নিস্তব্ধ রহিল |
কলব ফাটিয়া যাইবার ভয়ে কেহ কোনও কথা জিজ্ঞাসা করিল না |
এমদাদ পীর সাহেবের কথা কান পাতিয়া শুনিতেছিল |
কৌতূহল ও বিস্ময়ে সে অস্থিরতা বোধ করিতে লাগিল |
সে স্থির করিল,ইহার কাছে মুরিদ হইবে |
পীর সাহেব অনেক নিষেধ করিলেন |
বলিলেন : বাবা,সংসার ছাড়িয়া থাকিতে পারবে না,তাসউওয়াফ বড় কঠিন জিনিস ইত্যাদি |
কিন্তু এমদাদ তাওয়াজ্জোহ লইল |
পীর সাহেব নিজের লতিফায় যেকের জারি করিয়া সেই যেকের এমদাদের লতিফায় নিক্ষেপ করিলেন |
এমদাদ প্রথম লতিফা যেকরে-জলী আরম্ভ করিল |
সে দিবানিশি দুই চোখ বুজিয়া পীর সাহেবের নির্দেশমত 'এলহু' 'এলহু' করিতে লাগিল |
পীর সাহেব বলিয়াছিলেন : খেলওয়াৎ-দর-অঞ্জুমান দ্বারা নিজের কলবকে স্বীয় লতিফার দিকে মুতাওয়াজ্জাহ করিতে পারিলে তার কলবে যাতে আহাদিয়াতের ফয়েজ হাসেল হইবে এবং তার রুহ ঘড়ির কাঁটার ন্যায় কাঁপিতে থাকিবে |
কিন্তু এমদাদ অনেক চেষ্টা করিয়াও তার কলবকে লতিফায় মুতাওয়াজ্জাহ করিতে পারিল না |
তৎপরিবর্তে তার চোখের সামনে পীর সাহেবের মেহেদি-রঞ্জিত দাঁড়ি ও তার রূপা-বাঁধানো গড়গড়ার ছবি ভাসিয়া উঠিতে লাগিল |
ফলে তার কলবে যাতে-আহাদিয়তের ফয়েজ হাসেল হইয়া তার রুহকে ঘড়ির কাঁটার মতো কাঁপাইবার পরিবর্তে ফুফু-আম্মার স্মৃতি বাড়ি যাইবার জন্য তার মনকে উচাটন করিয়া তুলিতে লাগিল |
দিন যাইতে লাগিল |
অনাহারে অনিদ্রায় এমদাদের চোখ দুটি মস্তকের মধ্যে প্রবেশ করিল |
তার শরীর নিতান্ত দুর্বল ও মন অত্যন্ত অস্থির হইয়া পড়িল |
সে বুঝিল,এইভাবে আরও কিছুদিন গেলে তার রুহু বস্তুতই জেসম হইতে আযাদ হইয়া আলমে-আমরে চলিয়া যাইবে |
সে স্থির করিল : পীর সাহেবের কাছে নিজের অক্ষমতার কথা নিবেদন করিয়া সে একদিন বিদায় হইবে |
কিন্তু বলি বলি করিয়াও কথাটা বলিতে পারিল না |
একটা নূতন ঘটনায় সে বিদায়ের কথাটা আপাতত চাপিয়া গেল! দূরবর্তী একস্থানে মুরিদগণ পীর সাহেবকে দাওয়াত করিল |
প্রকাণ্ড বজরায় একমণ ঘি,আড়াই মণ তেল,দশ মণ সরু চাউল,তিনশত মুরগী,সাত সের অম্বুরি তামাক এবং তেরজন শাগরেদ লইয়া পীর সাহেব 'মুরিদানে' রওয়ানা হইলেন |
পীর সাহেবের ভ্রমণ বৃত্তান্ত ইংরেজিতে লিখিয়া কলিকাতার সংবাদপত্রে পাঠাইবার জন্য এমদাদকেও সঙ্গে লওয়া হইল |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.