content
stringlengths
0
129k
নদীর সৌন্দর্য, নদীপারের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এমদাদের কাছে বেশ লাগিল
পীর সাহেব গন্তব্যস্থানে উপস্থিত হইলেন
তিনি মুরিদগণের নিকট যে অভ্যর্থনা পাইলেন,তাহা দেখিলে অনেক রাজা-বাদশাহ রাজত্ব ছাড়িয়া মোরাকেবা-মোশাহেদায় বসিতেন
পীর সাহেব গ্রামের মোড়লের বাড়িতে আস্তানা করিলেন
বিভিন্ন দিন বিভিন্ন মুরিদের বাড়িতে বিরাট ভোজ চলিতে লাগিল
পীর সাহেবের একটু দূরে বসিয়া গুরুভোজ করিয়া এমদাদ এত দিনের কৃচ্ছ সাধনার প্রতিশোধ লইতে লাগিল
ইহাতে প্রথম প্রথম তার একটু পেটে পীড়া দেখা দিলেও শীঘ্রই সে সামলাইয়া উঠিল এবং তার শরীর হৃষ্টপুষ্ট ও চেহারা বেশ চিকনাই হইয়া উঠিতে লাগিল
পীর সাহেবের ভাত ভাঙিবার কসরত দেখার সুযোগ ইতিপূর্বে এমদাদের হয় নাই
এইবার সে ভাগ্য লাভ করিয়া এমদাদ বুঝিল : পীর সাহেবের রুহানীশক্তি যত বেশিই থাকুক না কেন,তাঁর হজমশক্তি নিশ্চয়ই তার চেয়ে বেশি
সন্ধ্যায় পুরুষদের জন্য মজলিশ বসিত
রাতে এশার নামাজের পর অন্দর মহলে মেয়েদের জন্য ওয়াজ হইত
কারণ অন্য সময় মেয়েদের কাজে ব্যস্ত থাকিতে হয়
সেখানে পুরুষদের প্রবেশ নিষেধ ছিল
স্ত্রীলোকদিগকে ধর্মকথা বুঝাইতে একটু দেরি হইত
কারণ মেয়েলোকের বুদ্ধিসুদ্ধি বড় কম- তারা নাকেস-আকেল
কিন্তু বাড়িওয়ালার ছেলে রজবের সুন্দরী স্ত্রী কলিমন সম্বন্ধে পীর সাহেবের ধারণা ছিল অন্যরকম
মেয়ে-মজলিশে ওয়াজ করিবার সময় তিনি ইহারই দিকে ঘন-ঘন দৃষ্টিপাত করিতেন
তিনি অনেক সময় বলিতেন : তাসাউওয়াফের বাতেনী কথা বুঝিবার ক্ষমতা এই মেয়েটার মধ্যেই কিছু আছে
ভাল করিয়া তাওয়াজ্জোহ দিলে তাকে আবেদা রাবেয়ার দরজায় পৌঁছাইয়া দেওয়া যাইতে পারে
এশার নামাজের পর দাঁড়িয়ে চিরুনি ও কাপড়ে আতর লাগান সুন্নত এবং পীর সাহেব সুন্নাতের একজন বড় মো'তেকাদ ছিলেন
ওয়াজ করিবার সময় পীর সাহেবের প্রায়ই জযবা আসিত
সে জযবাকে মুরিদগণ 'ফানাফিল্লাহ' বলিত
এই ফানাফিল্লাহ্র সময় পীর সাহেব 'জ্বলিয়া গেলাম' 'পুড়িয়া গেলাম' বলিয়া চিৎকার করিয়া চিৎ হইয়া শুইয়া পড়িতেন
এই সময় পীর সাহেবের রুহ আলমে-খালক হইতে আলমে-আমরে পৌঁছিয়া রুহে ইযদানির সঙ্গে ফানা হইয়া যাইত এবং নূরে ইয়াদানি তাঁর চোখের উপর আসিয়া পড়িত
কিন্তু সে নূরের জলওয়া পীর সাহেবের চক্ষে সহ্য হইত না বলিয়া তিনি এইরূপ চিৎকার করিতেন
তাই জযবার সময় একখণ্ড কাল মখমল দিয়া পীর সাহেবের চোখ-মুখ ঢাকিয়া দিয়া তাঁর হাত-পা টিপিয়া দিবার ওসিয়ত ছিল
এইরূপ জযবা পীর সাহেবের প্রায়ই হইত
-এবং মেয়েদের সামনে ওয়াজ করিবার সময়েই একটু বেশি হইত
এই সব ব্যাপারে এমদাদের মনে একটু খট্কার সৃষ্টি হইল
কিন্তু সে জোর করিয়া মনকে ভক্তিমান রাখিবার চেষ্টা করিতে লাগিল
সে চেষ্টায় সফল হইবার আগেই কিন্তু ও-পথে বাধা পড়িল
প্রধান খলিফা সুফী বদরুদ্দীন সাহেবের সঙ্গে পীর সাহেবকে প্রায়ই কানাকানি করিতে দেখিয়া এমদাদের মনের খট্কা বাড়িয়া গেল
তার মনে পীর সাহেবের প্রতি একটা দুর্নিবার সন্দেহের ছায়াপাত হইল
এমন সময় পীর সাহেব অত্যন্ত অকস্মাৎ একদিন ঘোষণা করিলেন : তিনি আর দু-এক দিনের বেশি সে অঞ্চলে তশরিফ রাখিবেন না
এই গভীর শোক সংবাদে শাগরেদ-মুরিদগণের সকলেই নিতান্ত গমগিন হইয়া পড়িল
জনৈক শাগরেদ সুফী সাহেবের ইশারায় বলিলেন : হুজুর কেবলা আপনি একদিন বলিয়াছিলেন;এবার এ-অঞ্চলের মুসলমানগণকে কেরামতে-নেসবতে বায়নান্নাস দেখাইবেন? তা না দেখাইয়াই কি হুজুর এখান হইতে তশরিফ লইয়া যাইবেন? এখানকার মুরিদগণের অনেকেই বলিতেছেন : হুজুর মাঝে মাঝে কেরামত দেখান না বলিয়া উম্মী মুরিদগণের অনেকেই গোমরাহ হইয়া যাইতেছে
মওলানা লকবধারী ঐ ভণ্ডটা ও-পাড়ার অনেক মুরিদকে ভাগাইয়া নিতেছে; সে নাকি বৎসর বৎসর একবার আসিয়া কেরামত দেখাইয়া যান
পীর সাহেব গম্ভীর মুখে বলিলেন : (আরবী ও উর্দু) আল্লাহ্ই কেরামতের একমাত্র মালিক,মানুষের সাধ্য কি কেরামত দেখায়? ও-সব শয়তানের চেলাদের কথা আমার সামনে বলিও না
তবে হ্যাঁ,মোরাকেবায়ে-নেসবতে বায়নান্নাস-এর তরকিব দেখাইব বলিয়াছিলাম বটে, কিন্তু তার আর সময় কোথায়?
সমস্ত সাগরেদ ও মুরিদগণ সমস্বরে বলিয়া উঠিলেন : না হুজুর,সময় করিতেই হইবে,এবার উহা না দেখিয়া ছাড়িব না
অগত্যা পীর সাহেব রাজি হইলেন
স্থির হইল,সেই রাত্রেই মোরাকেবা বসিবে
সারাদিন আয়োজন চলিল
রাত্রে মৌলুদের মহফেল বসিল
হযরত পয়গম্বর সাহেবের অনেক অনেক মোওয়াজেযাত বর্ণিত হইল
মৌলুদ শেষে খাওয়া-দাওয়া হইল এবং তৎপর মোরাকেবার বৈঠক বসিল
পীর সাহেব বলিলেন : আজ তোমাদের আমি যে মোরাকেবার তরকিব দেখাইব,ইহা দ্বারা যে-কোনও লোকের রুহের সঙ্গে কথা বলিতে পারি
আমি যদি নিজে মোরাকেবায় বসি,তবে সেই রুহ গোপনে আমার সঙ্গে কথা বলিয়া চলিয়া যাইবে
তোমরা কিছুই দেখিতে পাইবে না
তোমাদের মধ্যে একজন মোরাকেবায় বস,আমি তার রুহের দিকে তোমরা যার কথা বলিবে তার রুহের তাওয়াজ্জোহ দেখাইয়া তারই রুহের ফয়েজ হাসিল করিব
তৎপর তোমরা যে-কেহ তার সঙ্গে কথা বলিতে পারিবে
সকলে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিল
কেহই কোন কথা বলিল না, মোরাকেবায় বসিতে কেহই অগ্রসর হইল না
এমদাদ দাঁড়াইয়া বলিল : আমি বসিব
পীর সাহেব একটু হাসিলেন
বলিলেন : বাবা,মোরাকেবা অত সোজা নয়,তুই আজিও যেকরে খফী আমল করিস নাই,মোরাকেবায় বসিতে চাস?
বলিয়া তিনি হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন
দেখাদেখি উপস্থিত সকলেই হাসিয়া উঠিল
লজ্জায় এমদাদের রাগ হইল
সে বসিয়া পড়িল
পীর সাহেব আবার বললেন : কি,আমরে মুরিদগণের মধ্যে আজও কারও এতদূর রুহানী তরক্কী হাসেল হয় নাই, যে মোরাকেবায় বসিতে পারে? আমার খলিফাদের মধ্যেও কেহ নাই?
বলিয়া তিনি শাগরেদদের দিকে দৃষ্টি ফিরাইলেন
প্রধান খলিফা সুফী সাহেব উঠিয়া বলিলেন : হুজুর কেবলা কি তবে বান্দাকে হুকুম করিতেছেন? আমি ত আপনার আদেশে কতবার মোরাকেবায়-নেসবতে-বায়নান্নাসে বসিয়াছি
কোনও নূতন লোককে বসাইলে হইত না?
সুফী সাহেব আরও অনেকবার বসিয়াছেন শুনিয়া মুরিদগণের অন্তরে একটু সাহসের উদ্রেক হইল
তারা সকলে সমস্বরে বলিল : আপনিই বসুন,আপনিই বসুন
অগত্যা পীর সাহেবের আদেশে সুফী সাহেব মোরাকেবায় বসিলেন
পীর সাহেব উপস্থিত দর্শকদের দিকে চাহিয়া বলিলেন : কার রুহের ফয়েজ হাসিল করিব?
মুরিদগণের মুখের কথা যোগাইবার আগেই জনৈক সাগরেদ বলিলেন : এই মাত্র মৌলুদ-শরীফ হইয়াছে;হযরত পয়গম্বর সাহেবের মোয়াজেযা বয়ান হইয়াছে
তাঁরই রুহ আনা হোক
সকলেই খুশী হইয়া বলিলেন : তাই হউক,তাই হউক
সুফী সাহেব আতর-সিক্ত মুখমলের গালিচায় তাকিয়া হেলান দিয়া বসিলেন
চারিদিকে আগরবাতি জ্বালাইয়া দেওয়া হইল
মেশক্ যাফরান ও আতরের গন্ধে ঘর ভরিয়া গেল
পীর সাহেব তাঁর প্রধান খলিফার রুহে শেষ পয়গম্বর হযরত মোহাম্মদের রুহ-মোবারক নাযেল করিবার জন্যে ঠিক তাঁর সামনে বসিলেন
শাগরেদরা চারিদিক ঘিরিয়া বসিয়া মিলিত-কণ্ঠে সুর করিয়া দরুদ পাঠ করিতে লাগলেন
পীর সাহেব কখনও জোরে কখনও বা আস্তে নানা প্রকার দোওয়া কালাম পড়িয়া সুফী সাহেবের চোখে-মুখে ফুঁকিতে লাগিলেন
কিছুক্ষণ ফুঁকিবার পর শাগরেদগণকে চুপ করিতে ইঙ্গিত করিয়া পীর সাহেব বুকে হাত বাঁধিয়া একদৃষ্টে সুফী সাহেবের বুকের দিকে চাহিয়া রহিলেন
সুফী সাহেবের বুকের দুইটা বোতাম খুলিয়া তাঁর বুকের খানিকটা অংশ ফাঁক করিয়া দেওয়া হইয়াছিল
পীর সাহেব তাঁর দৃষ্টি সেইখানেই নিবদ্ধ করিলেন
অল্পক্ষণ মধ্যেই সুফী সাহেবের শরীর কাঁপিতে লাগিল
কম্পন ক্রমেই বাড়িয়া গেল
সুফী সাহেব ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলিতে লাগিলেন এবং হাত পা ছুঁড়িতে ছুঁড়িতে মূর্ছিতের ন্যায় বিছানায় লুটাইয়া পড়িলেন
পীর সাহেব মুরিদগণের দিকে চাহিয়া বলিলেন : বদর বাবাজীর একটু তকলিফ হইল!
কি করিব? পরের রুহের উপর অন্য রুহের ফয়েজ হাসেল আসানির সঙ্গে করে বেলকুল না-মোমকেন
যা হউক,হযরতের রুহ তশরিফ আনিয়াছেন
তোমরা সকলে উঠিয়া কেয়াম কর
-বলিয়া তিনি স্বয়ং উঠিয়া পড়িলেন
সকলেই দাঁড়াইয়া সমন্বরে পড়িতে লাগিল : ইয়া নবী সালাম আলায় কা ইত্যাদি
কেয়াম ও দরুদ শেষ হইলে অভ্যাসমত অনেকেই বসিয়া পড়িল
পীর সাহেব ধমক দিয়া বলিলেন : হযরতের রুহে পাক এখনও এই মজলিশে হাজির আছেন,তোমরা কেহ বসিতে পারিবে না
কার কি সওয়াল করিবার আছে করিতে পার
এমদাদ একটা বিষয় ধাঁধায় পড়িয়া গেল
সে ইহাকে কিছুতেই সত্য বলিয়া মানিয়া লইতে পারিল না
-মাথায় এক ফন্দি আঁটিয়া অগ্রসর হইয়া বলিল : কেবলা আমি কোন সওয়াল করিতে পারি?
পীর সাহেব চোখ গরম করিয়া বলিলেন : যাও না,জিজ্ঞাসা কর না গিয়া!
-বলিয়া কণ্ঠস্বর অপেক্ষাকৃত মোলায়েম করিয়া আবার বলিলেন : বাবা সকলের কথাই যদি রুহে পাকের কাছে পৌঁছিত,তবে দুনিয়ার সব মানুষই ওলি-আল্লাহ হইয়া যাইত
এমদাদ তথাপি সুফী সাহেবের দিকে চাহিয়া বলিল : আপনি যদি হযরত পয়গম্বর সাহেবের রুহ হন,তবে আমার দরুদ-সালাম জানিবেন
হযরতের রুহ কোন জবাব দিলো না
পীর সাহেব এমদাদের কাঁধে হাত দিয়ে তাকে একদিকে ঠেলিয়া দিয়া বলিলেন : অধিকক্ষণ রুহে পাককে রাখা বে-আদবি হইবে