content
stringlengths
0
129k
সেখানে হঠাৎ আর্মির গাড়ির শব্দ শুনলাম
জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, আমি যে বাসায় আছি ঠিক উল্টাপাশের বাসায় দুটি আর্মির গাড়ি দাঁড়ানো
পরে জানতে পারলাম, ওটা মেজর ডালিমের শ্বশুরবাড়ি
ভয় পেয়ে সেখান থেকে ভোর রাতে বেরিয়ে গেলাম
তোপখানা রোডে আরেকজনের বাসায় এলাম
ওখানে দুই রাত্রি ছিলাম
এখানে মুসলিম লীগের এক এমপির ছেলে থাকে শুনে নিরাপদ মনে হলো না
ওখান থেকে চলে এলাম তোপখানা রোডে আমাদের আজিজ কন্ট্রাক্টর ছিল, তার বাসায়
ফাঁকে আমি সবার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি
এর মধ্যে খবর পেলাম আবদুর রাজ্জাক, ডা. সেলিম এরা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ওখানে বসে
আমি সেখানে দেখা করতে যাব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম
কিন্তু ওদের নাকি সন্দেহ করা শুরু করেছে
তাই সেখান থেকে ওইদিনই ওরা সরে যায়
এরপর ফণী দার বাসায় গেলাম একদিন
সেখানে জানাশোনা কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হলো
আমি মূলত ওই পারে যাওয়ার কী ব্যবস্থা সেই বিষয়ে জানতে গিয়েছিলাম
ফণী দা বললেন, এখন আমার কাছে কোনো খবর নেই
তোমরা আপাতত গা ঢাকা দিয়ে থাক
যদি কোনো খবর হয়, আমি জানাব
এখান থেকে চলে এলাম
এরপর আমার এক দুলাভাইয়ের বাসায় গেলাম
সেখান থেকেই আমি গ্রেপ্তার হলাম
গ্রেপ্তার করেই আমাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে গেল
সেখানে তারা ৬ জনে মিলে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করল সারারাত
আর্মস আছে কার কার কাছে? আমাদের কার কার কাছে কী পরিমাণ আর্মস আছে? বিভিন্ন জনের সম্পর্কে তারা জানতে চাইল
আমি বলেছি, দেখেন আমি মফস্বলে রাজনীতি করি, পার্লামেন্ট যখন থাকে আসি
আমি এত সব ঢাকার খবর জানি না
সকালে আমাকে কন্ট্রোলরুমে হ্যান্ডওভার করা হলো
কন্ট্রোলরুমে ঢুকেই কেঁপে গেলাম
দেয়ালে রক্তের দাগ
একটি ইলেকট্রিক চেয়ার
কন্ট্রোলরুমে আমার নাম লিস্ট করে দিয়ে ওরা চলে যায়
এর মধ্যে ওখানে যে পুলিশের ইন্সপেক্টর ছিলেন, তার শ^শুর বাড়ি ছিল পটুয়াখালী
সে হয়তো আমাকে দেখে চিনেছে
তাই তাড়াতাড়ি করে আমার কাছে এসে বলল, 'স্যার, যদি আপনার কোনো সোর্স থাকে তাহলে আপনি ফোন করেন
এখান থেকে বের করে নিয়ে যেতে বলেন
আপনার আয়ু বিকাল পর্যন্ত
বিকালের পরে আপনাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না
তাই, আমার এখান থেকে টেলিফোন করেন
আমি রিস্ক নিয়ে আমার টেলিফোন ব্যবহার করতে দিলাম
লোকটার কথা শুনে কিছুটা ভড়কে গেলাম
তাড়াতাড়ি আইজি নুরুল ইসলামকে ফোন দিলাম
উনি বললেন, আমি জানি
রাত থেকে আমার কাছে খবর আছে
আমরা চেষ্টা করছি, যাতে আপনাকে নিরাপদে জেলখানায় নেয়া যায়
এরপর গোলাম মোর্শেদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম
সেও একই কথা বললো- আমরা সতর্ক আছি
আমরা এনএসআইয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি
তবে আপনাকে যদি জেলখানায় পাঠাতে পারি তাহলে বের হতে অনেক সময় লাগবে
তখন আমাদের গালাগালি করবেন না
আমি বললাম, সমস্যা নেই, আমাকে জেলখানায় দেন
এরপর বরিশালের এসপি, কিছু আর্মির লোকজনের কাছে সে সময় ফোন দিয়ে বিষয়টা জানলাম
ফোন শেষ করে এসে একটানা নামাজ পড়লাম
জোহরের নামাজ শেষ করে আসর নামাজে যখন সিজদায় গেলাম, তখন খসখস শব্দ শুনতে পেলাম
আমি ভয় পেয়ে আর সিজদা থেকে উঠছি না
এমন সময় পেছন থেকে স্যার, স্যার বলে কেউ ডাকল
আমি সিজদা থেকে উঠতেই রমনা থানার ওসি আনোয়ার বলল, স্যার তাড়াতাড়ি ওঠেন
আপনি তাড়াতাড়ি ওঠেন
আপনার সময় বিকাল ৪টা পর্যন্ত
৪টার মধ্যে আপনাকে থানায় হ্যান্ডওভার করতে হবে
এটা আমাদের নির্দেশ
আমি কিছুটা আশ্বস্ত হলাম যে, আমাকে সেফ করার চেষ্টা চলছে
এরপর আমাকে তার গাড়িতে করে রমনা থানায় নিয়ে গিয়ে পরে গেল সেন্ট্রাল জেলে
সেদিন ছিল প্রথম রোজা
ইফতার শেষে কাগজপত্র সব ঠিকঠাক করে আমাকে নিয়ে গেল তিন নম্বর রুমে
এক নম্বর রুমে ছিলেন নজরুল ইসলাম সাহেব, তাজউদ্দীন সাহেব, দুই নম্বর রুমে ছিলেন কামারুজ্জামান, শেখ আজিজ ওনারা
তিন নম্বর রুমে ছিলাম ইউনুস আলী সাহেব, সামাদ সাহেব, আমি
বঙ্গবন্ধু হত্যার আগে এবং পরে বেশ কিছু রিউমার ছড়ানো হয়
বঙ্গবন্ধুর পরিবার অনেক সম্পদের মালিক
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, দেশ বিকিয়ে যাচ্ছে, দুর্ভিক্ষ নিয়ে নানা নেগেটিভ আলোচনা হয়েছে
এই সময়ে জাসদের 'গণকণ্ঠ' নামে পত্রিকা সবচেয়ে বেশি এই বিষয়গুলো হাইলাইট করেছে
তবে এটা মূলত একটা আন্তর্জাতিক প্রচারণা ছিল
পাকিস্তান-আমেরিকা মিলিতভাবে চেষ্টা করেছে বঙ্গবন্ধুর সুনামহানি করতে, এ দেশকে আবার তাদের করায়ত্ত করতে
এটা তারা বহুবার করার চেষ্টা করেছে
এরপর ১৯৭৪- তারা খাদ্যের জাহাজ ঘুরিয়ে দিয়েছে
দেশে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করেছে
এগুলো ছিল মূলত একটা প্লট তৈরি করা '১৫ আগস্ট' সংঘটিত করার জন্য
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে দেখা গেল, এসব কোনো কিছুই সত্য ছিল না
ব্যাংকেও কোনো টাকা ছিল না, সোনা-দানাও ছিল না, এমনকি তার বাসায় সার্চ করেও তেমন কিছু পাওয়া গেল না
ফলে এগুলো যে তার বিরুদ্ধে এক ধরনের অপপ্রচার ছিল তা প্রমাণিত হয়
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার বিষয়টি সে সময় আওয়ামী লীগ প্রতিরোধ করতে পারল না
কারণ, বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবরে সবাই একটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়
বজ্রপাতের মতোই ঘটনা ঘটেছে
কল্পনাতীত
তাছাড়া জেলাগুলো তো খালি ছিল
না হলে জেলাগুলো থেকে দুয়েকজন নেতাও যদি আওয়াজ দিত তাহলেই কিন্তু সারাদেশে আগুন লেগে যেত
এছাড়া রক্ষীবাহিনী যারা জেলায় জেলায় ছিলেন তারা কিন্তু চেষ্টা করেছেন অন্য নেতাদের দিয়ে কিছু করানোর জন্য
কিন্তু কেউ কোনো জেলায় উপস্থিত ছিলেন না
রক্ষীবাহিনীর লিডার বিদেশে
সুতরাং এটা যে, একটি সুপরিকল্পিত ঘটনা, তা স্পষ্ট
একটা হত্যাকাণ্ড যখন সংঘটিত হয়, তখন বিচার্যের বিষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় যে, এতে লাভবান হয়েছে কারা? এটা বের করতে পারলেই হত্যাকারীদের বের করা সম্ভব হয় এবং তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বোঝা যায়
আমরা যদি দেখি ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে খুনিরা লাভবান ছিল কীভাবে? একটা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী যিনি, একটি দেশকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, যে কিনা এ দেশকে স্বাধীন করেছেন, সে জাতির জনককে হত্যা করা হলো
বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্য দিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা দেশকে আবার পঞ্চাশের দশকে নিয়ে যায়
অর্থাৎ যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছিল সেটা আবার ছড়িয়ে দেয়
কারণ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল
সেটা আবার চালু করা হয়েছে
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যা করা হয়েছে
এছাড়া প্রধান আরো কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়
যেমন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড যখন সংঘটিত হয়, তখন জাতীয় সংবিধান যে মূলনীতির ওপর ভিত্তি করেছিল হত্যার পরে সে চার মূলনীতি ছুড়ে ফেলা হয়
দ্বিতীয়ত, যে বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে সারা দুনিয়ার মানুষ মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের খবর শুনেছিল, সে বাংলাদেশ বেতারের নাম পরিবর্তন করে রেডিও পাকিস্তানের মতো রেডিও বাংলাদেশ করা হয়