content
stringlengths
0
129k
গোটা ইরানে ইমাম খোমেনি তখন ইরানের অবিসংবাদিত মুসলিম নেতা
ইরাকের সাথে ইরানের বর্ডার থাকায় সহজেই ইমামের লিখিত বক্তব্য গোপনে ইরানে পাঠানো সম্ভবপর হয়
গোপনে প্রিন্ট করা এসব বক্তব্য অতি সতর্কতায় বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে ইরানে পাঠানো হতো
এ ছাড়াও তিনি টেপ রেকর্ডারে বক্তব্য রেকর্ড করে ক্যাসেট পাঠিয়ে দিতেন
সেখান থেকে তার বক্তব্য লিখে প্রচার করা হতে থাকে
এর জন্য বিশেষায়িত টিম ছিলো
ইমামের বক্তব্য পাওয়ার সাথে সাথে তারা সেগুলোর অসংখ্য কপি করে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতেন
ইমাম তার নিজের ছেলে সাইয়্যেদ আহমাদ এর কাছে চিঠি লিখতেন এবং সাইয়্যেদ আহমাদও তার উত্তর পাঠাতেন
তবে এগুলো কোডেড () চিঠি ছিলো
অর্থাৎ চিঠির বক্তব্য ইমাম খোমেনি ও তাঁর ছেলে ছাড়া আর কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিলো না
শাহের হাতে পড়ে চিঠি গুম হবার ভয়ে সরাসরি ইরান-ইরাক কিংবা নাজাফ- তেহরান চিঠি না পাঠিয়ে প্রয়োজনে তাঁরা কুয়েত, লেবানন, সিরিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন দেশ হয়ে চিঠি নিয়ে যেতেন, কখনোবা ডাকযোগে এইসব দেশ হয়ে ইমামের কাছে পাঠাতেন
ইমামও সেই চ্যানেলেই জবাব পাঠাতেন
এভাবে নানান প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে ইমাম খোমেনি ইরানের গণ মুসলমানের জন্য কাজ করে যেতে থাকেন সুদূর নাজাফ থেকে
সেসময়ে ইরাকের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আব্দুল সালাম আরেফ
ইমাম নাজাফ থেকে ইরানে এত বেশি চিঠি ও অডিও টেপ পাঠাতেন যে, আব্দুল সালাম আরেফ ঘোষণা দিলেন ইমামের জন্য প্রাইভেট রেডিও স্টেশন প্রতিষ্ঠা করে দেয়ার
কৌশলগত কারণে ইমাম তা গ্রহণ করেন এই শর্তে যে, রেডিওর কার্যক্রমে ইরাক সরকার কোনো বাধা দেবে না কিংবা কোনো শর্তারোপ করতে পারবে না
কিন্তু ১৯৬৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্টি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এ স্বৈরশাসকের সাথে ইমামের কোনো সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হওয়ার সুযোগ থাকলো না
ইমামের বড় ছেলের শাহাদাত
সেপ্টেম্বর ১৯৭৮
ইমাম খোমেনির বড় ছেলে সাইয়্যেদ মুস্তাফার সাথে কয়েকজন দেখা করে রাত আড়াইটার দিকে ফিরে গেলো
সকালে সাইয়্যেদ মুস্তাফার বন্ধুরা এসে তাকে ডাকলেন
জবাব না পেয়ে তাদের একজন উনার কাঁধে নাড়া দিলেন
সাইয়্যেদ মুস্তাফা পড়ে গেলেন; মৃত
মাঝরাত থেকে ভোরের মাঝে তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো
হসপিটালে নেবার পর ডাক্তার বললেন বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে
ইমাম খোমেনি এর কিছুই জানতেন না
ইমামের ছোট ছেলে সাইয়্যেদ আহমাদ বাড়ি ফিরে উপরতলায় দরজা আটকে কান্না করছিলেন
আর অন্যরা যখন ইমামের সামনে বসলেন, তীব্র কষ্ট ও বেদনায় তারা মুখ দিয়ে কিছুই বলতে পারলেন না
ইমাম বুঝতে পারলেন কিছু একটা হয়েছে
জিজ্ঞাসা করলেন, আহমাদ কোথায়? এরপর তিনি দ্বিতীয়বার তাঁর ছোট ছেলের নাম ধরে ডাকেন
এরপর সবাইকে উদ্দেশ্যে করে বললেন, "আমি বুঝতে পারছি কী ঘটে থাকবে
তাই আমাকে বলো, মুস্তাফার কিছু হয়েছে?"
তখন উপস্থিত সবাই মাথা নিচু করলেন
ইমাম খোমেনি সবসময় মেঝেতে বসে বৈঠক করতেন
ইমাম তাঁর আঙুল মেঝেতে স্পর্শ করে কিছুক্ষণ হাতের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন
এরপর বললেন মৃতদেহকে ২৪ ঘণ্টা পরে দাফন করতে
উপস্থিত যাঁরা ইমামের অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁরা পরে বলেছিলেন যে ইমাম যখন মেঝেতে আঙুল স্পর্শ করে সেদিকে তাকিয়ে ছিলেন, তিনি যেনো তাঁর হৃদয় থেকে ছেলের প্রতি সমস্ত ভালোবাসা শূন্য করে দিচ্ছিলেন, আর সেটাকে আল্লাহর ইচ্ছা ও সন্তুষ্টি দিয়ে প্রতিস্থাপন করছিলেন
এরপর তিনি খুব শান্ত হয়ে গেলেন
ইমাম খোমেনি তাঁর বড় ছেলের মৃত্যুতে কান্না করেননি
এমনকি দাফনের সময়ও তাঁকে কাঁদতে দেখা যায়নি
কিন্তু যখন ইমাম হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতের ঘটনার বর্ণনা করা হয়, তখন ছাড়া
এমনকি যেদিন তাঁর বড় ছেলের মৃত্যু হলো, মসজিদের সবাই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলো, যখন ইমাম জামাতে নামাজ আদায় করলেন, অথচ তখনও তাঁর ছেলের দাফন হয়নি
এরপর তিনি নিয়মমাফিক মিম্বরে বসে লেকচারও দিলেন
এসব ঘটনা প্রতিটা মানুষের জীবনেই আসে
কিন্তু আল্লাহর সাথে আধ্যাত্মিক সম্পর্কের উচ্চতায় পৌঁছালে মানুষের জীবন দর্শন বদলে যায় এবং আপাত দুঃখ-কষ্টকে তখন মহান আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ হিসেবে উপলব্ধি হয়
এ জন্যই ইতিহাসে ইমাম খোমেনির মত মানুষকে দেখা যায় ছেলের শাহাদাতেও দৃঢ় থাকতে, বড় বড় আলেম-ওলামাকে দেখা যায় জালিমের ফাঁসিকাষ্ঠে প্রশান্তচিত্তে স্মিতহাস্যে দাঁড়িয়ে থাকতে
কারণ এটাকে তারা এক দুনিয়া থেকে আরেক দুনিয়ায় গমন মনে করেন মাত্র, আর সেই দুনিয়া হলো আল্লাহর একনিষ্ঠ খাদেমের পরম পাওয়া
ফ্রান্সে গমন : বিজয় অত্যাসন্ন
মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মুসলিম দেশ-ই ইমাম খোমেনিকে গ্রহণ করতে রাজি হলো না
বাধ্য হয়ে তিনি ফ্রান্সের টিকিট কাটলেন এই ভেবে যে, সেখানে কিছুদিন থাকার পর কোনো মুসলিম দেশে গিয়ে হয়তো থাকতে পারবেন
অথচ তার ফ্রান্সে অবস্থান-ই হয়ে উঠলো বিপ্লবকে সফল করার এক শক্তিশালী অস্ত্র
যাহোক, ফ্রান্স সরকার তাকে ওয়েলকাম করলো এই বলে যে, ইমাম খোমেনি শাহ বিরোধী কোনো কাজ করতে পারবেন না
কিন্তু ইমাম তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, "আমি ফ্রান্সকে কোনো বক্তব্য বা ইন্টারভিউ দেবো না, বরং আমি ইরানে বক্তব্য পাঠাবো এবং আমি বিপ্লব ও ইরানি জনগণের জাগরণের নেতৃত্ব দেবো
যেহেতু ইমাম কোন ইন্টারভিউ দেবেন না বলেছিলেন, সুতরাং সাংবাদিকেরা বাড়ির বাহির থেকে তার ছবি তুলে এই বলে প্রকাশ করলো যে, ইমাম খোমেনিকে বন্দী করে রাখা হয়েছে এবং তাকে কোনো পলিটিক্যাল বক্তব্য দিতে দেয়া হচ্ছে না
এর ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দাবিদার ফরাসি সরকার চাপের মুখে পড়লো
ইরানি জনগণ, বিশেষত তেহরানের মানুষেরাও ফরাসি সরকারের মত পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছিলো
অসংখ্য মানুষের মিছিল ফরাসি দূতাবাসের সামনে ফুল নিয়ে গেলো ইমামকে আশ্রয় দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে
ফরাসি সরকার দেখলো যে ইরানি জনগণের মাঝে তাদের জনপ্রিয়তা আছে, সুতরাং ইমামের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলো
শুরু হলো ইমামের নওফেল-এ-শাতুর সেই বাড়িতে সংবাদকর্মীদের মিছিল
বাড়িটা হয়ে উঠলো বিপ্লবের সাময়িক হেডকোয়ার্টার
সেইসাথে প্রবাসী ইরানিরাও এসে তাকে সমর্থন জানাতে শুরু করলো
ফ্রান্সে ইমামের অবস্থানের কয়েক মাসে গড়ে প্রতিদিন ৪-৫টি করে ইন্টারভিউ দিতেন তিনি
এসময়েই ইরান পরিচিত হয়ে উঠলো বিশ্ববাসীর কাছে এবং সারা দুনিয়ার সচেতন ব্যক্তিরা ভাবতে শুরু করলো 'কী ধরনের মানুষ এই ইমাম খোমেনি?'
শুরু হলো চূড়ান্ত আন্দোলন
ইমাম খোমেনিকে ১৯৬৪ সালে নির্বাসনে পাঠানোর পর শাহ মোটামুটি স্বস্তিতে ছিলো এই কারণে যে, ইমামের অনুপস্থিতিতে একদিকে যেমন সরকার উৎখাতের আশঙ্কা ছিলো না, অপরদিকে তেমনি বিপ্লবীদের ওপর সর্বাত্মক নজরদারি ও জেল-জুলুমের ফলে সরকারের প্রতি হুমকিও স্তিমিত হয়ে এসেছিলো
কিন্তু ইমামের ফ্রান্স গমনের পর সবকিছু যেনো আকস্মিকই বদলে গেলো
ইমাম খোমেনি পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি পরিমাণে বক্তব্য পাঠাতে লাগলেন ইরানে
আর গোটা বিশ্বও জেনে গেলো 'একটি বিপ্লব অত্যাসন্ন
শেষের দিকে ইমামের নাম উচ্চারণ করাও নিষিদ্ধ ছিলো
কোনো জনসভায় ইমামের নাম উচ্চারিত হতে পারতো না বর্বর সাভাক বাহিনীর ভয়ে
আর এই সাভাক বাহিনী তাদের নিষ্ঠুরতার প্রশিক্ষণ পেয়েছিলো মার্কিন ও ইহুদি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে
প্রসঙ্গত, আমাদের দেশেও বর্তমানে বিদেশী বাহিনীর হাতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী অনুরূপ জুলুম-নির্যাতনেই নিয়োজিত
যাহোক, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সেপ্টেম্বরে (১৯৭৮ সালে) ইমাম খোমেনির বড় ছেলেকে বিষ প্রয়োগে হত্যার ঘটনা ইরানে আবারও ইমাম খোমেনির নাম ধ্বনিত করলো
সাধারণ মানুষ ইমামের ছেলের শাহাদাতে শোকসভা করতে শুরু করলো
বর্বর সাভাক বাহিনীকে উপেক্ষা করে চারিদিকে উচ্চারিত হতে থাকলো বিপ্লবের নেতা ইমাম খোমেনির নাম
শাহ বিষয়টাকে ছাড় দিতে পারতো (এমনিতেই কিছুদিন পর মানুষের শোক স্তিমিত হয়ে আসতো)
কিন্তু শাহ উল্টা পথ বেছে নিলো; স্বৈরশাসকের চিরাচরিত নিপীড়নমূলক পথ
সিভিল গভর্নমেন্ট বাতিল করে সেনা শাসন নিয়ে এলো মুহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি
নিরস্ত্র শোকাচ্ছন্ন জনতার বিপরীতে রাস্তায় নেমে পড়লো সশস্ত্র সেনা, ট্যাংক, অস্ত্র, গোলাবারুদ
এযাবৎকাল পর্যন্ত ইরানে যত রাজা-ই শাসন করেছে, তারা ধর্মীয় নেতাগণকে সম্মান করতো
এর মূল কারণ ছিলো জনগণের মাঝে ধর্মীয় নেতাগণের শক্তিশালী প্রভাব
তবে যেহেতু ধর্মীয় নেতাগণ রাষ্ট্রক্ষমতায় হস্তক্ষেপ ও সরকার উৎখাতের কোনো চেষ্টা করতেন না, বরং শরিয়ত শিক্ষাদানের মাঝেই নিজেদের কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ রাখতেন, সেহেতু কোনো বড় ধরনের কনফ্লিক্টের সৃষ্টি হতো না
রেজা পাহলভি প্রথম চেষ্টা করে তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের অনুকরণে ইরানে সেক্যুলারিজম আমদানি করতে
অথচ ইসলামী চেতনায় দৃঢ় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় সেক্যুলারিজম কখনোই টিকবে না, ইন ফ্যাক্ট, সেক্যুলারিজম জিনিসটাই একটি দুর্বল ব্যবস্থা, যা ভেঙে পড়তে বাধ্য
এই ঐতিহাসিক এবং দার্শনিক সত্যটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিলো সে
ফলস্বরূপ আলেমগণের ওপর নির্যাতন শুরু করলো এবং আঘাত হানলো ইসলামের ওপর, যা চালিয়ে গিয়েছিলো তার ছেলে মুহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি
ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে
স্বৈরশাসকেরা সবসময়ই ভুল করে থাকে, আর সত্য স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয়
সুতরাং শোকাচ্ছন্ন জনগণের ওপর শাহের জালিম বাহিনীর নির্যাতন শোককে শক্তিতে পরিণত করলো
শুরু হলো রাজপথে সরাসরি আন্দোলন
পর্যায়ক্রমে সারা দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে এলো
আর বর্বর বাহিনীও চালিয়ে যেতে লাগলো প্রকাশ্য গণহত্যা
এলো সেই বিপ্লবী ডাক:
"জেগে উঠুন হে জনগণ! সাবধান হোন, কারণ আপনাদের শত্রু শক্তিশালী
সে ট্যাংক ও মেশিনগান নিয়ে রাস্তায় নেমেছে
কিন্তু এসব অস্ত্রকে ভয় পাবেন না
আপনারাই সঠিক পথে আছেন
হক আপনাদের সাথে আছে
আর সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা আপনাদের সাথে আছেন
ভয় পাবেন না, কারণ আপনারাই বিজয়ী হবেন ইনশাআল্লাহ