content stringlengths 0 129k |
|---|
টর্চারিং সেলে নিয়ে সাধারণ মানুষ, বিশেষত ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টদের ওপর নিষ্ঠুরতম নির্যাতন চালানো হলো, যার চিহ্ন এখনও অনেকে বয়ে বেড়াচ্ছেন |
লোহার বিছানায় তরুণ ছেলেদের বেঁধে রেখে নিচে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করাসহ বর্ণনার অযোগ্য সব নির্যাতন চালিয়েছিলো শাহের জাহান্নামী বাহিনী |
ইরানের বেহেশতে যাহরা কবরস্থানে বিপ্লবের এই হাজার হাজার শহীদ ঘুমিয়ে আছেন |
ঈওঅ তাদের ধারণা অনেকটা এরকম ছিলো যে- "এসব মোল্লা-মৌলভি, এদের দৌড় মসজিদ পর্যন্ত, এরা আর কদ্দুর কী করতে পারবে |
আর যদি কিছু করেও, আমরা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আর আমাদের অস্ত্রশস্ত্র ও ইন্টেলিজেন্সকে ব্যবহার করে এদেরকে উৎখাত করতে পাবরো সহজেই |
" কিন্তু এ ছিলো এক চরম ভুল |
প্রকৃতপক্ষে, নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল অত্যন্ত দুর্বল |
বিপ্লবী জনসমুদ্র |
চূড়ান্ত আন্দোলনের সর্বশেষ ধাপ |
ইমাম খোমেনির এক ছাত্রের ইমামতিতে ঈদুল ফিতরের নামাজ শেষে লাখো মানুষ তাদের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়লো |
তেহরানের কসাই বলে পরিচিত এক জেনারেল আদেশ দিলো যেকোনো মিছিল দেখামাত্রই গুলি করতে |
পাশ্চাত্য মিডিয়াই সেদিনের মৃতের সংখ্যা ৪০ হাজার বলে প্রকাশ করে, প্রকৃত সংখ্যা হয়তো আরো অনেক বেশি |
আর্মির গুলির মুখে হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষ শহীদ হয়ে গেলেন |
এই হাজার হাজার শহীদ চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বেহেশতে যাহরা কবরস্থানে |
৭ লক্ষাধিক সদস্যের ইরানি আর্মি ছিলো তৎকালীন বিশ্বের পঞ্চম শক্তিশালী আর্মি |
এত বৃহৎ শক্তিশালী বাহিনীর সামনে মানুষ কী করবে? ইমামের স্ট্র্যাটেজি ছিলো অত্যন্ত প্রাজ্ঞ |
ইমাম বাণী পাঠালেন; |
"আর্মির বুকে আঘাত করো না, বরং তাদের হৃদয়ে পৌঁছানোর চেষ্টা করো |
সৈন্যদের হৃদয় তোমাদের কামনা করতে হবে |
এমনকি তারা তোমাদের গুলি করলেও |
তোমাদের বুক পেতে দাও |
কারণ যখন তোমরা আল্লাহর রাহে জীবন দিয়ে দিচ্ছো, তখন তোমাদের রক্ত এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা তাদেরকে প্রভাবিত করবে |
একজন শহীদের রক্ত হলো হাজার মানুষকে জাগিয়ে তোলার ঘন্টা |
বিক্ষোভকারীরা সৈন্যদের রাইফেলের মুখে গুঁজে দিলো ফুল, আর তাদের স্লোগান ছিলো- 'আর্মি আমাদের ভাই, তোমরা কেনো ভাইকে হত্যা করো !' বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী নারীগণ ফুল ছুঁড়ে দিলেন সেনাদের দিকে, আর বললেন- 'আমরা তোমাদেরকে ফুল ছুঁড়ে দিলাম, বিনিময়ে তোমরা আমাদেরকে গুলি করে শহীদ করে দাও |
' সৈন্যদের উদ্দেশে ইমামের আহবান ছিলো : |
'তোমরা শাহের কাজ আঞ্জাম দিও না, কারণ সে শয়তান |
আর তোমরা হলে আল্লাহর সৈন্য |
তোমাদের মুসলিম ভাইয়ের উদ্দেশে অস্ত্র চালিও না |
কারণ একজন মুসলিমের বুকে একটি বুলেট মানে কুরআনের বুকে একটি বুলেট |
তোমাদেরকে নিজেদের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে হবে |
নিজেদের বাড়িতে, শহরে |
তোমাদেরকে মসজিদে ফিরে যেতে হবে, ফিরে যেতে হবে আল্লাহর কাছে |
ইমামের সাথে ছিল আল্লাহর প্রতিশ্রুত সাহায্য |
দলে দলে সৈন্য যোগ দিলো বিপ্লবে |
ইমামের নেতৃত্ব মেনে নিলো |
বিপ্লবী কমিটি থেকে নির্দেশ দিয়ে দেয়া হলো যাদের যা পোশাক আছে নিয়ে আসতে |
বিপ্লবে যোগদানকারী সেনারা আর্মির পোশাক ছেড়ে ঐ পোশাক পরলেন |
তবুও তাদেরকে আর্মি ছাঁটের চুল দেখে নিপীড়ক বাহিনী শনাক্ত করছিলো |
এই দেশে বিপ্লবী কমিটি সব বিপ্লবী যুবককে আর্মি ছাঁটে চুল কাটাতে নির্দেশ দিলো |
সৈন্যেরা মিশে গেলো বিপ্লবীদের সাথে |
ইমামের আদেশ এলো- |
"ছোটো ছোটো দলে আর্মি ত্যাগ করো |
একা হোক, কিংবা দু'জন তিনজন করে |
তোমরা আল্লাহর সৈন্য |
তোমাদের অস্ত্র সাথে নাও, সেগুলো আল্লাহর অস্ত্র |
ইমামের সমর্থনে যখন বেশির ভাগ ব্যারাক খালি হয়ে গেলো, তখন ইমাম খোমেনি বাজারের দিকে মনোনিবেশ করলেন |
'বাজার' হলো আমাদের এখানকার মতিঝিল এলাকার মতো, যা কয়েকদিন বন্ধ থাকলে গোটা অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে |
ইমামের আহবানে সাড়া দিয়ে বাজার স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘটে গেলো, ইরানের অর্থনীতি হয়ে পড়লো স্থবির |
এরপর তেলকূপগুলোর কর্মীদেরকে সম্বোধন করলেন ইমাম |
নির্দেশ দিলেন দেশের চাহিদার অতিরিক্ত উৎপাদন বন্ধ করে দিতে |
শাহ বললো, যদি তেলকূপের কর্মচারীরা ধর্মঘট বন্ধ করে কাজে ফিরে না যায়, তবে তাদের সবাইকে গুলি করা হবে এবং ইসরাইল থেকে শ্রমিক ও টেকনিশিয়ান এনে তেলকূপ চালানো হবে |
ইরানের তেলকূপে ধর্মঘটের সুযোগে কাজ করতে আসা যেকোনো বিদেশী, হোক সে ইসরাইলি বা অন্য যেকোনো দেশের, তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়ে ফতোয়া জারি করলেন ইমাম খোমেনি |
এ ছাড়াও ধর্মঘটের কারণে ক্ষতিগ্রস্তদেরকে ধর্মীয় অথরিটির ফান্ড থেকে টাকা দিতে বলা হলো |
সাথে সাথে ইমামের ছাত্ররা তেলকূপের কর্মচারীদের মাঝে টাকা বণ্টন করে দিলেন, আর এদিকে ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা মার্কিন ও পশ্চিমা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা চালাতে লাগলো |
ব্যাংক, হোটেল, এয়ারলাইনস... |
গোটা তেহরান তখন জ্বলছিলো, কিন্তু শাহের কিছুই করার ছিলো না |
শাহের পলায়ন |
এরপর ইমাম খোমেনি আশুরা উপলক্ষে মানুষকে রাস্তায় নেমে আসতে নির্দেশ দিলেন |
সর্বোচ্চ জনশক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রমাণ করার জন্য যে, এদেশের মানুষ আর শাহকে চায় না |
তারা এই রাজতন্ত্র চায় না |
সামরিক সরকার সকাল-সন্ধ্যা কারফিউ জারি করলো, এমনকি মসজিদের অভ্যন্তরে পর্যন্ত |
ইমাম খোমেনি আদেশ দিলেন বাড়ির ছাদে বিক্ষোভ প্রদর্শনের |
সেরাতে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর ছিলো এমন- 'সারা তেহরানের বাড়িগুলোর ছাদ থেকে ভেসে আসা আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে তেহরানের মাটি কাঁপছে |
শাহ ষড়যন্ত্র করলো এক ব্যাপক গণহত্যার |
এর মূল টার্গেট ছিলো বিপ্লবের নেতৃস্থানীয় আলেমগণ |
আজাদি স্কয়ারে সমবেত বিপ্লবের মূল আয়োজকদের হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ করে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হলো |
কিন্তু আল্লাহর কী ইচ্ছা- সেই বিকেলেই লাভিযান এর ক্যাম্প থেকে বিপ্লবে যোগ দেয়া এক তরুণ সেনা এসে শাহের ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনাকারীদের গুপ্তহত্যা করলো |
এ সময়ে শাহ বুঝতে পারলো দেশ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে এবং ইরানে তার আর কোনো স্থান নেই |
আর্মি সরকার কারফিউ তুলে নিলো এবং সাথে সাথে তেহরানের রাস্তা পরিণত হলো জনসমুদ্রে |
দেশবাসীর উদ্দেশে এক অস্পষ্ট, বিভ্রান্তিকর ভাষণ দিলো শাহ |
মিলিটারি সরকারকে প্রতিস্থাপিত করলো শাপুর বখতিয়ারের নেতৃত্বে নতুন এক সরকার দিয়ে |
আর এসব পরিকল্পনা তাকে দেয়া হচ্ছিলো ওয়াশিংন থেকে |
জনগণের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টির জন্য তারা ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালালো যে, শাপুর বখতিয়ার হলো শাহের দীর্ঘদিনের শত্রু, একজন মানবতাবাদী কর্মী ইত্যাদি |
দশ দিন পর... |
তেহরানের মেহরাবাদ এয়ারপোর্ট মুহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি ও তার স্ত্রী রানী ফারাহ দিবা পৌঁছে গেলো |
প্রেসের কাছে নিতান্ত হাস্যকরভাবে বললো- "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক'দিন বেড়িয়ে আসি |
১৬ জানুয়ারি, ১৯৭৯ |
প্লেনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ইরানের দিকে একবার ফিরে তাকালো এককালের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শাহ এবং তার রানী |
সারা দুনিয়া তখন সঙ্কুচিত হয়ে আসছিলো তার জন্য |
প্লেনের উড্ডয়নের সাথে সাথে ইরানের ২৫০০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটলো |
পরবর্তীতে নানান দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করে ক্যান্সারে ভুগে এ যুগের ফেরাউনের শেষশয্যা রচিত হলো মিসরে |
এমনকি যেই আমেরিকার গোলামিতে সারাটা জীবন সে ব্যয় করলো, সেই আমেরিকাও তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলো |
শাপুর বখতিয়ার সরকারের মার্কিন প্রভুরা ভাবলো, 'এইসব মোল্লারাই আপাতত বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিক |
এরা তো দুনিয়াবি বিষয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন নয় এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতাও এদের নেই; কিছুদিন পার হলে আমরাই আবার ক্ষমতা লাভ করবো |
' কিন্তু আল্লাহ তায়ালার পরিকল্পনা ছিলো ভিন্ন |
আর আল্লাহর পরিকল্পনার বিজয়ী হওয়া অনিবার্য |
শাপুর বখতিয়ার তার মার্কিন প্রভুদের সাহসে এমনকি ইমাম খোমেনিকে 'মাথা খারাপ বুড়ো' পর্যন্ত বলে বসলো |
কিন্তু শাপুরের গদিলাভের একমাস যেতে না যেতে সেই 'বুড়োই' তাকে সমূলে উৎখাত করে দিলেন |
দেশত্যাগের সময় প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান ও প্রধান বিচারপতির সমন্বয়ে যে রাজপরিষদ গঠন করে গিয়েছিলো শাহ, সে পরিষদের সভাপতি প্রধান বিচারপতি নিজে প্যারিসে গিয়ে ইমামের আনুগত্য ঘোষণা করেন |
ইরানের রাস্তায় রাস্তায় তখন আনন্দ মিছিল আর মানুষের হাতে ইমামের ছবি |
বেহেশতে যাহরা কবরস্থান |
ইমামের দেশে ফেরার প্রস্তুতি |
এবার প্যারিস থেকে ইমাম আরেকটি ডাক দিলেন |
তা ছিলো শাপুর বখতিয়ারের এক মাস বয়সী সরকারকে উৎখাত করা |
১৪ বছরের 'ধ্বংস হোক শাহ' শ্লোগান বদলে গেলো 'ধ্বংস হোক বখতিয়ার' এ |
আবারও রাস্তায় নেমে এলো জনগণ |
ইমাম আকস্মিকই দেশে ফেরার ঘোষণা দিলেন |
সেই সংবাদে বখতিয়ার সরকার এয়াপোর্ট বন্ধ ঘোষণা করলো |
অবশিষ্ট যেসব শাহপন্থী সৈন্য ছিলো, তাদের ট্যাংক, অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ঘেরাও করে রাখলো এয়ারপোর্ট |
ইমাম ঘোষণা দিলেন যে এয়ারপোর্ট খোলামাত্রই তিনি দেশে ফিরবেন |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.