content
stringlengths
0
129k
এলেরি কুইনের , দ্য ডোর বিটুইন নিজের শুন্যস্থানে ফিরে গেল
একই সারির বাকি বই গুলো দেখতে থাকলেন বিপিন বাবু
জুলিয়াস রেডেলের মস্তিস্কের ব্যারাম সম্পর্কিত বই, শম্ভুচরন বোসের লেখা "টেররস অফ তেরাই", "এ বেঙ্গলী ইন লামাল্যান্ড", স্ট্যানলি গিবনের ডাকটিকিটের ক্যাটালগ, ক্যাপ্টেন স্কটের মেরু অভিযানের ওপর একখানা বই, মাঙ্গো পার্কের পশ্চিম আফ্রিকার অভি্যান, মহিতোষ সিংহরায়ের "বাঘে বন্দুকে", জটায়ুর "কঙ্গোর গঙ্গোরিলা", কোনোটাই ঠিক মনে ধ...
শেষে চোখ আটকালো চার্লস ওয়েকম্যানের দু ভল্যুমের "হিস্ট্রি অফ ম্যাজিক" বইটার ওপর
একটু ভেবে প্রথম খন্ডটা নামালেন বিপিনবাবু
বাইরে মেঘ ডেকে উঠলো দূরে কোথাও, গুরু গম্ভীর মেঘের ডাক বড় ভাল লাগে
বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ে চলেছে
গ্রামাফোনে এখন মালকোষ বাজছে সেতারে
বিপিন বাবু ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়েছেন
শুধু পাশে খাটো চায়ের টেবিলের অপর ছোটো একখানা আলো জ্বলছে বই পড়ার জন্যে
আলোর পাশে রাখা একখানা ছোটো রামের বোতল, তার পাশে একটা কোকা কোলা আর একটা সাধারন কাচের গ্লাসে কিছুটা গাঢ় রঙের তরল
এই সুন্দর সঙ্গীতের সঙ্গে বর্ষার রাতে অনেক দিন পর একটু পান করতে ইচ্ছে করলো বিপিনবাবুর
হাতে চারমিনার জ্বলছে
রোজকার থেকে আজ যেন একটু আলাদা
এই বৃষ্টি, সঙ্গীত, অ্যালকোহল, সিগারেট, সব মিলিয়ে অনুভুতি গুলো কেমন আচ্ছন্ন হয়ে আসছে
আর তার ওপরে প্রভাব ফেলেছে এই বই
ভাবতে অবাক লাগে, এ বই তিনি আগে পড়েননি কেন! মানুষের ইতিহাস যতদিনের, জাদুর ইতিহাসও ততটাই পুরোনো
বিপিন বাবু ভাবতে থাকলেন অনেক অনেক দিন আগে ইশকুলে পড়ার সময়ের এক জাদু আর জাদুকরের কথা
ভদ্রলোকের নামটাও মনে আছে , রসময় সূর
বইটা পাশে টেবিলের ওপর রেখে দিলেন বিপিনবাবু
পাখার হাওয়ায় বইয়ের মলাটের ওপরের জ্যাকেটটা উড়ে যাচ্ছে
পুরোনো বই, পাছে আরো ছিঁড়ে যায়, তাই রামের বোতলটা চাপা দিয়ে রাখলেন বিপিন বাবু
আহা, এ বাড়িতে একদিন খাশ স্কচ হুইস্কি, শঁপাঞ কিম্বা বোর্দো , বার্গেন্ডি খাওয়ার রেওয়াজ ছিলো
রাম কেউ ছুঁয়ে দেখার কথাও ভাবতোনা
আবছা আলোয় গিন্নির ছবিটা দেখা যাচ্ছে
বিপিন বাবু ফিসফিস করে বললেন - "বুঝলে গিন্নি, সবই ভুতে খেয়েছে একথা সত্যি বটে, কিন্তু আজও এই রক্তের ভেতরে বাবুয়ানির নেশাটা যায়নি
রাম খেয়ে কি আর হয়? হতো ভাল স্কচ, দেখতে আজ সারা সারা একা একাই মাইফেল জমিয়ে দিতাম
" একটু থেমে গ্লাসে একটা চুমুক দিলেন বিপিন বাবু, তার পর ছবির দিকে চেয়ে বললেন - "গ্রামাফোন নয় গিন্নি, গাইয়ের সামনে বসে তার নিজের গলায় গান শুনতাম"
একটু হাসি মুখে চেয়ে রইলেন ছবির দিকে বিপিন বাবু
তার পর একটা ছোট্ট "গুড নাইট" বলে আলো নিভিয়ে দিলেন
সকালের রোদ্দুরের সঙ্গে ঘরে ঢুকছে একটা অচেনা শব্দ
গানের শব্দ
নজরুলগীতি - "তুমি কি এখন, দেখিছ স্বপন..."
এ বাড়ির চৌহদ্দিতে কেউ কোনোদিন গান টান করেনা
বিপিনবাবু শুয়ে শুয়ে শুনলেন কিছুক্ষন
ওদিকে শ্রীনাথ ঢুকেছে চায়ের কাপ আর খবরের কাগজ নিয়ে
- এই সাত সকালে কে গান গাইছে রে শ্রীনাথ?
- পাশের বাড়িতে ভাড়াটে এসেচে গো
নতুন ভাড়াটে
দিদিমনি নাকি গান করেন
- এই সাত সকালে তাই বলে............ গলাটা মন্দ নয় অবিশ্যি...
- শুনলুম টিভি রেডিওতেও নাকি গানটান করেন...
পাশের ছোটো টেবিলের ওপর চায়ের কাপ আর খবরের কাগজ আর কাগজের সঙ্গে আসা "ভ্রমন" পত্রিকা রাখতে রাখতে বলল শ্রীনাথ
বিপিন বাবু তখনো জানলার বাইরে তাকিয়ে গানটা শোনার চেষ্টা করছেন
- ও ব্বাবা! এত দামী বিলিতি আর এই সিগারেট আনালে কোথা থেকে?
বিপিন বাবু তাকিয়ে দেখলেন টেবিলের দিকে
তাঁর চায়ের কাপ, তার পাশে টেবিল ল্যাম্প, ল্যাম্পের সামনে চার্লস ওয়েকম্যানের "হিস্ট্রি অফ ম্যাজিক" আর তার ওপরে রাখা রয়েছে একখানা খাঁটি স্কচ জনি ওয়াকার হুইস্কির বোতল, আর এক প্যাকেট মার্লবরো সিগারেট
প্রথমটা বিপিনবাবু কি বলবেন ঠিক বুঝতে পারলেন না
প্রথমেই যেটা মাথায় এলো, সেটা সুরা ও সিগারেটের বদলে যাওয়া নয়, বরং মনে হলো, এই দুটি বস্তু তাঁর জীবনধারনের ক্ষমতার অনেক অনেক ওপরে
ওদিকে শ্রীনাথ ঘর ঝাড়পোঁছ করতে করতে কথা বলেই চলেছে
- বলি চল্লিস পেরিয়েছ তো অনেক দিন
আর কারবারের হালও ভালোনা
এখন এই সব নেশা তোমার সইবে?
- ও তুই বুঝবিনা শ্রীনাথ.........
- আমি কি আর বুঝবো? তিন কাল ধরে এ বাড়িতে কত কি দেখে এলুম, তাই বলচি
যা ভালো বোঝও করো, আমার আর কি? যা বলবে করে দেবো, যেমন বলবে করে দেবো......
শ্রীনাথের বকবক মাথায় ঢুকছিলো না বিপিনিবাবুর
ঊঠে বসে বোতলটা হাতে ধরে ভাল করে দেখলেন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে
অর্ধেকটা তরলে ভর্তি
ছিপি খুলে শুঁকে দেখলেন
হ্যাঁ, খাঁটি জনি ওয়াকারই বটে
মার্লবরোর প্যাকেটে দুটো সিগারেট নেই
কাল যে চারমিনার খাচ্ছিলেন, সে প্যাকেটে দু খানা খাওয়া হয়ে গিয়েছে কাল রাতেরটা ধরলেন
বিড়বিড় করে আবার বললেন - "তুই বুঝবিনা শ্রীনাথ...... আমিও ছাই বুঝছিনা কি হলো"
চা আর খবরের কাগজের সঙ্গে শ্রীনাথ কয়েকটা খাম রেখে গেছে
ডাকবাক্সে পিওন এসে ফেলে দিয়ে যায়
শ্রীনাথ সকাল বেলা একবার করে ডাকবাক্সে উঁকি মারে
নতুন কিছু দেখলে নিয়ে আসে ওপরে
ইলেকট্রিক বিল এসেছে
এ মাসে বেশ বেশী
বিলটা হাতে ধরে দেখতে দেখতে গলা তুলে বিপিন বাবু শ্রীনাথ কে বললেন ফ্রিজে তেমন কিছু না থাকলে ফ্রিজ যেন বন্ধ রাখা হয়, বর্ষা এসে গেলেও গরমের তুলনায় বিলের পরিমান কমছেনা
চা খেয়ে বিপিন বাবু খাট থেকে নামলেন
ইলেক্ট্রিকের বিলটা গুঁজে রাখলেন ভ্রমন পত্রিকার খাঁজে, আর পত্রিকাটি আশ্রয় পেল কালকের পড়তে থাকা "হিস্ট্রি অফ ম্যাজিক" বইয়ের ওপর
দূর থেকে শ্রীনাথের গজগজ কানে আসে - "শুধু ফ্রিজ বন্ধ করলেই হবে? ওদিকে বিলিতি ইয়ে......"
কাজে বেরোবার আগে, বৈঠকখানায় টাঙানো অনেক গুলো ঠাকুর দেবতার ছবিতে একবার করে মাথা ঠেকিয়ে বেরোনো বহুকালের অভ্যেস বিপিন বাবুর
আজকেও মাথা ঠেকাচ্ছিলেন, এমন সময় সদর দরজায় একটা ঠক ঠক করে জোরে আওয়াজ হলো
এত জোরে দরজায় আজকাল কেউ ডাকেনা
"কলিং বেল আছে কি করতে? যত্তসব অশিক্ষিত ইয়ে..." বিড়বিড় করতে করতে বিপিন বাবু দরজা খুললেন
সামনে দাঁড়িয়ে এক মহিলা
তিরিশের মাঝামাঝি
যথেষ্ট আধুনিকা, তবে আজ ইনি শাড়ীতে
অচেনা মুখ
মাথার ওপর রোদচশমা তোলা
মাঝারি গড়ন, মুখ পানপাতা, চোখের দিকে তাকালে বুক ঢিপঢিপ করে
মেয়েটি বোধহয় বিপিন বাবুর বিড়বিড় করে বলা কথার শেষ টুকু শুনে ফেলে থাকবে
মুখে একটা অপ্রস্তুতের হাসি
- কিছু মনে করবেন না, মানে, কলিং বেলটা দেখতে না পেয়ে......
এমন হাসির সামনে দাঁড়াতে পারে তেমন বিরক্তি খুব কমই আছে
এক গাল হেসে বিপিন বাবুও -
- না , মানে পুরোনো দরজা আর বেল তো, সব সময় নজরে পড়েনা
- আমি আসলে এ পাড়ায় নতুন, আমার নাম শ্রীতমা
আপনার ঠিক পাশের বাড়িতেই এসেছি
- আপনি , মানে ভেতরে আসুন না
- আমাকে তুমি বলতে পারেন স্বচ্ছন্দে
আজ একটু তাড়া আছে, আর একদিন হবেখন
আমি শুধু একটু খোঁজ করছিলাম, মানে, কাজের লোক পাওয়া যাবে কোথায়...... মানে বাড়িতে আর কেউ? ... বৌদি......
- আর কেউ তো নেই, আমি একাই থাকি, সঙ্গে ২৪ ঘন্টার কাজের লোক
তা আপনার বোধহয় ঠিকে কাজের লোক দরকার...
- হ্যাঁ ঠিকে কাজের লোক
একটু সকাল সকাল এসে কাজ করে দিয়ে চলে যাবে