content stringlengths 0 129k |
|---|
গত দশ বছর চলছে যখন |
হাল ফ্যাশনের ফোনের কোনো প্রয়োজন তাঁর নেই |
মোবাইলে নম্বরটা সেভ করলেন বিপিন বাবু |
ভোর বেলা গানের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল বিপিনবাবুর |
না আজ নজরুল নন |
খাঁটি রবি ঠাকুর |
"তারে আমি চোখে দেখিনি, শুধু বাঁশি শুনেছি" |
বিপিন বাবু একটু গান শুনলেন |
তার পর কিছু একটা মনে পড়তেই ধড়মড় করে উঠে বসে মশারি তুলে বেরিয়ে এলেন বাইরে |
বইয়ের ওপর ঝকঝক করছে একটা বিদেশী ঘড়ি |
নামটা ঠিক ঠাওর করতে পারলেন না প্রথম দেখায় |
হাতে তুলে নিয়ে দেখলেন রোলেক্স |
এমন ঘড়ি বিপিনবাবু জম্মে হাতে গলাননি |
কিন্তু বাকিটা? ঘড়ি নামিয়ে রেখে বইয়ের ভাঁজ খুলে বের করে আনলেন ছোট্ট ভাঁজকরা কাগজটা |
কাগজে ফোন নম্বর লেখা আছে |
তার নিচে যোগ হয়েছে কয়েকটা কথা |
"পড়শীর সঙ্গে আলাপ করার জন্যে রেখে দেবেন নম্বরটা" |
বিপিন বাবুর কাঁপা হাত থেকে কাগজটা পড়ে গেল |
ধড়মড় করে উঠে মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিলেন কাগজটা |
বইয়ের ওপর তৃতীয় এবং শেষ প্রমান অপেক্ষা করছিল |
বিপিন বাবু অ্যাাপেল কোম্পানির নতুন আই ফোনটি হাতে তুলে দেখলেন |
এটি চালাতে শিখতে হবে কারোর কাছে |
কেননা এমন অত্যাধুনিক ফোনে কি করে কি হয়, সে সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারনা নেই |
ওদিকে গান থেমে গেছে |
জানলা দিয়ে বাইরে উঁকি মেরে দেখলেন বিপিন বাবু |
তার পর ফিরে এসে বিছানার প্রান্তে বসে আর একবার কাগজটা পড়লেন |
এ বই যেন পরশপাথর |
তবে পরশপাথর শুধু লোহা থেকে সোনা করে |
এ বই শুধু বস্তুগত রূপান্তরই ঘটায়না, ব্যবহারকারি এবং তার পারিপার্শ্বীককেও বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে |
খুবই সাজানো বৈঠকখানা শ্রীতমার |
অন্ততঃ বিপিনবাবুর বৈঠকখানার তুলনায় তো বটেই |
যদিও ঘরটি অনেক ছোটো, কিন্তু চতুর্দিকে ছড়িয়ে আছে পরিশিলিত রুচির ছাপ |
ছোটো গোল টেবিলের ওপর রাখা চায়ের সরঞ্জাম |
একটা ছোটো রেকাবিতে কিছু নিমকি |
দুটো চেয়ারে মুখোমুখি বসে আছে বিপিন বাবু আর তাঁর নতুন পড়শী শ্রীতমা |
আজ শ্রীতমা একটা কালো টপ আর লং স্কার্টে এক্কেবারে অন্যরকম |
তবে লম্বাটে টিপ, কানে গলায় বাহারি কাঠ আর গালার তৈরি কি সব গয়না আর স্কার্টের আদিবাসী প্রিন্টে তাকে অপরূপ লাগছে |
এরকম নারীর সংস্পর্শের এর আগে আসেননি বিপিন বাবু |
কালো টপের গলার কাছ থেকে বুক পর্যন্ত খোলা জায়গাটা কি একটু বেশী ? শ্রীতমা চা ঢালার সময় কি একটু বেশী নিচু লাগছিল? |
- এসব আপনার নিজের আঁকা? |
চায়ের কাপ হাতে তুলে নিয়ে পেছনের দেওয়ালে কয়েকটা বাঁধানো ছবি দেখতে দেখতে শ্রীতমা কে প্রশ্ন করলেন বিপিন বাবু |
- আমাকে স্বচ্ছন্দে তুমি বলতে পারেন কিন্তু |
- না, মানে প্রথমেই...... |
- (অল্প হেসে ) আমাদের বাড়ি শান্তিনিকেতনে, আর ছোটোবেলা ওখানেই কেটেছে |
বাবা ছবি আঁকতেন, আর মা গান |
কলকাতা আসা আমার চাকরি সূত্রেই |
ছোটোবেলায় দুটোই করতাম |
তার পর গান নিয়েই থেকে গেলাম, ছবি আঁকাটা হবি থেকে গেল |
- ও বাবা, এ জিনিস তো...... এও কি আপনার, মানে তোমার তৈরি? |
বিপিন বাবু চায়ের সঙ্গে আনা নিমকিতে একটা কামড় বসিয়েছেন |
দোকানের চেয়ে স্বাদ ও আকার একেবারেই আলাদা |
আজ বিকেলে ফিরতি রাস্তায় দেখা হয়ে যায় শ্রীতমার সঙ্গে |
শ্রীনাথ একখানি ভাল কাজের লোক জোগাড় করে দিয়েছে এরই মধ্যে |
শ্রীতমা তাই ধরে এনেছে বিপিন বাবুকে চা খাওয়াতে |
- হ্যাঁ , মানে ওই টুকটাক করে রাখি, চায়ের সঙ্গে খাবার জন্যে |
আগে অনেক দক্ষিনে থাকতাম, সময় পেতাম না, এখন এ পাড়ায় এসে কর্মক্ষেত্র কাছে হয়ে গিয়ে অনেকটা সময় পাবো |
- হ্যাঁ আমার ও আপিস কাছেই |
এই হেঁটে মিনিট দশ |
- কোন অফিস? |
- না, মানে ইয়ে, আমার তো ব্যাবসা |
ওই বই টই ছাপা... |
- ও মা, আপনি প্রকাশক? এই দেখুন, আমার যে প্রকাশনার ব্যাপারে বড্ড সাহায্য দরকার |
মানে আমাদের একটা পত্রিকা...... |
পত্রিকা ছাপার বহু ঝামেলা |
একে সময় কম |
তার ওপরে হাজার রকম পাতার ছাঁদ |
আর টাকা পয়সা? বিপিন বাবু বেশ কয়েকবারের ভুক্তভুগী |
আর তিনি ঐ পত্রিকার চক্করে পড়ছেন না |
- হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চই, কি সাহায্য বলো না, আমার তো কাজই ওই... |
- মানে, আমরা কয়েকজন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সঙ্গীত সভা চালাই, তার একটা বার্ষিক স্মরনিকা বের করার কথা ভাবা হচ্ছিল |
- বেশ তো, বেশ তো, কেমন চাইছ, কি আকার, কত কপি ছাপা হবে, ডিজাইনার চাই কিনা, এসব নিয়ে আপনি একদিন চলে এসো অফিসে, সেখানে বসেই একদম দেখিয়ে দেওয়া যাবে |
কিছু নমুনাও দেখাতে পারব |
- আপনি বাঁচালেন |
আমি ভাবছিলাম কোথায় কোথায় ঘুরতে হবে |
কলকাতায় তো তেমন কাউকে চিনিনা......... |
অনেক কিছু বদলাতে হবে |
হুলিয়া বদলে ফেলতে হবে |
বিপিন বাবুর রক্ত গরম হয়ে উঠেছে |
পূর্বপুরুষের তেজ আবার ফিরে আসছে তাঁর মধ্যে এটা বিপিনবাবু স্পষ্ট বুঝতে পারছেন |
অনেক অনেক দিন পর, নিজেকে বেশ টগবগে লাগছে |
ঝিমিয়ে পড়া জীবনের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে যেন নতুন করে বাঁচার একটা উদ্দ্যেশ্য দেখা যাচ্ছে |
শ্রীতমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা পান খেতে ইচ্ছে হলো বড় |
বিপিন বাবু সচরাচর এসব ইচ্ছেকে তেমন পাত্তা দেন না |
কিন্তু নিজেই অবাক হলেন, যখন এই সামান্য ইচ্ছের জেরে গলির মুখের দোকানে গিয়ে একখানা জর্দা দেওয়া পান হুকুম করে বসলেন |
পানওয়ালা বিপিনবাবুকে চারমিনার বেচে |
আজ হঠাৎ পান চাইতে দেখে অবাক হলো |
জর্দা অল্পই দিয়েছিল, কিন্তু বিপিন বাবু ভাল করে দিতে বললেন |
পানের খিলি মুখে পুরতেই যেন এক লহমায় সন্ধ্যের উত্তর কলকাতার এই গলিতে একটা মাইফেলি মেজাজ নেমে এলো |
বাড়ি ফেরার বদলে সামনে আরো দু পা এগিয়ে মনিহারি দোকানে ঢুকলেন বিপিন বাবু |
সাধারনত তিনি এসব দোকানে ঢোকেন না |
তাই পাড়ার লোক হলেও, দোকানি একটু অবাকই হলো, আর খাতির করে "আসুন আসুন , কি চাই বলুন..." |
বিপিন বাবু অনেক দেখে শুনে একখানা সুগন্ধী কিনলেন |
নিজের জন্যেই |
মাঝে মাঝে মাখলে দিব্যি লাগবে |
দোকান থেকে বেরোতেই দেখলেন এক ছোকরা দোকানের সামনের সিঁড়িতে বসে বসে লটারির টিকিট বিক্রি করছে |
তাকে পাশ কাটিয়ে রাস্তায় নেমে কয়েক পা হাঁটতেই মাথায় কেমন যেন একটা বিদ্যুতের শিখা খেলে গেল |
এ ও কি হতে পারে? উত্তেজনায় মিনিট খানেক চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন বিপিন বাবু |
তার পর ধিরে ধিরে পেছন ফিরে দেখলেন |
ছোকরা হেঁকে চলেছে "বঙ্গলক্ষী সুপার বাম্পার, এক কোটি জেতার সুযোগ......" |
বিপিন বাবু কোনো উত্তেজনা দেখালেন না |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.