content stringlengths 0 129k |
|---|
এই সময় ডোরবেল বাজল |
একটু পরে ষষ্ঠী এসে বলল, এক পুরুতঠাকুর এসেছেন বাবামশাই! |
কর্নেল তার দিকে চোখ কটমট করে তাকিয়ে বললেন, তুই কী করে জানলি পুতঠাকুর এসেছেন? |
ষষ্ঠীচরণ হাসল |
চেহারা দেখেই মানুষ চেনা যায় |
পুরুতঠাকুর কি আমি কখনও দেখিনি? |
খুব হয়েছে |
নিয়ে আয় |
এরপর যিনি কর্নেলের এই জাদুঘরসদৃশ ড্রয়িং রুমে ঢুকলেন, তাঁকে দেখামাত্র বুঝলাম ষষ্ঠী চিনতে ভুল করেনি |
আগন্তুক বয়সে প্রৌঢ় |
তার গায়ে সাদা উত্তরীয় জড়ানো, পরনে খাটো ধুতি, কপালে লাল তিলক এবং খুঁটিয়ে ছাঁটা চুলের কেন্দ্রে গিট দিয়ে বাঁধা শিখাও আছে |
পৈতে তো আছেই |
নমস্কার করে কাঁচুমাচু মুখে তিনি বললেন, আমি কর্নেল সায়েবের সঙ্গে কিছু প্রাইভেট কথা বলতে চাই |
ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে নিয়ে বিনীতভাবে বললেন, কথাটা প্রাইভেট |
কর্নেল একটু হেসে বললেন, আলাপ করিয়ে দিই |
জয়ন্ত চৌধুরী |
দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার সাংবাদিক |
আমাকে কেউ যা কিছু গোপন কথা বলুন, জয়ন্তর তা অজানা থাকবে না |
ভদ্রলোক আমাকে নমস্কার করে বললেন, আমার সৌভাগ্য! সত্যসেবক পত্রিকায় আপনার লেখার মাধ্যমেই কর্নেল সায়েবের পরিচয় পেয়েছি |
আপনাদের কাগজের অফিস থেকে কর্নেল সায়েবের ঠিকানা জোগাড় করে সোজা এখানে চলে এলাম |
হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল |
কর্নেল বললেন, আপনি গাড়িতে এসেছেন দেখছি |
আজ্ঞে হ্যাঁ |
পুরুতমশাইয়ের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল |
কাগজে যা পড়েছি, ঠিক তা-ই |
আপনি সত্যিই |
অন্তর্যামী নই |
আপনি একটুও ভেজেননি |
এই বাড়ির নীচে পোর্টিকো আছে |
যাই হোক, যা বলার শিগগির বলুন |
কারণ রাস্তায় জল জমে গেলে আপনার গাড়ি ফেঁসে যাবে |
পুরুতমশাই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন |
চাপা গলায় বললেন, আপনি মোহনপুরের রাজবংশের কথা শুনে থাকবেন |
দমদম এরিয়ায় ওঁদের একটা প্যালেস আছে |
নামেই এখন মোহনপুর প্যালেস |
জরাজীর্ণ খাঁ খাঁ অবস্থা |
ওই বাড়িতে ওঁদের আরাধ্য দেবতা শ্রীবিষ্ণুর মন্দির আছে |
সেই মন্দিরের সেবাইত আমি |
আমার নাম নরহরি ভট্টাচার্য |
কী ঘটেছে বলুন? |
ভট্টাচার্যমশাই আরও চাপা গলায় বললেন, কথাটা কুমারবাহাদুরকে বলতে সাহস পাইনি |
উনি বৃদ্ধ মানুষ |
তার ওপর গত মাসে বাথরুমে পড়ে গিয়ে পক্ষাঘাত রোগে শয্যাশায়ী |
ওঁর বউমা ছন্দা আমাকে বাবার মতো ভক্তি শ্রদ্ধা করে |
তাই তাকেই শুধু জানিয়েছি! কুমারবাহাদুরকে জানাতে নিষেধ করেছি |
তো ছন্দা আমাকে পুলিসের কাছে যেতে বলেছিল |
কিন্তু ভেবে দেখলাম |
সংক্ষেপে বলুন |
বৃষ্টি বেড়ে যাচ্ছে |
মন্দিরের লোহার দরজা ব্রিটিশ আমলে সায়েব কোম্পানির তৈরি |
ওতে একটা অদ্ভুত তালা আছে |
সেই তালা কীভাবে খুলতে হয় |
তা জানেন শুধু কুমারবাহাদুর আর আমি |
তো সম্প্রতি কিছুদিন থেকে লক্ষ্য করছি, শ্রীবিষ্ণুর বুকের কাছে একটা রেখা ফুটে উঠেছে |
কিন্তু তার চেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, নিরেট সোনার মূর্তির রঙ কেমন যেন বদলে যাচ্ছে |
এত বছর ধরে আমি শ্রীবিষ্ণুর সেবা করছি |
কিন্তু এমন তো কখনও দেখিনি! তাই মনে একটা খটকা লেগেছে |
আপনার খটকা কি এই যে, আসল মূর্তিটা কেউ হাতিয়ে নিয়ে অবিকল-একই চেহারার একটা নকল মূর্তি বসিয়ে রেখেছে? |
আজ্ঞে হ্যাঁ |
ঠিক ধরেছেন |
কুমারবাহাদুর জানতে পারলে সর্বনাশ হবে |
আপনি যদি দয়া করে আসল মূর্তিটা উদ্ধার করে দেন, প্রাণে বেঁচে যাব |
কুমারবাহাদুরের ছেলে, মানে ছন্দাদেবীর স্বামী কী করেন? |
মৃগেন্দ্র গত বছর ক্যান্সারে মারা গেছে |
সে একটা কোম্পানিতে বড় পোস্টে চাকরি করত |
তার মৃত্যুর পর ছন্দা শ্বশুরমশাইয়ের কাছেই আছে |
একমাত্র সন্তান ছিল মৃগেন্দ্র |
যে গাড়িতে এসেছেন, সেটা কার? |
মৃগেন্দ্রর গাড়ি |
গাড়িটা ছন্দা স্বামীর স্মৃতি বলে বেচে দেয়নি |
নিজেই ড্রাইভিং শিখেছে |
এবং আপনিও ড্রাইভিং শিখেছেন! |
নরহরি ভট্টাচার্য আড়ষ্টভাবে একটু হেসে বললেন, আজ্ঞে, এ বয়সে ড্রাইভিং শেখা শক্ত |
তবে বাধ্য হয়েই শিখতে হয়েছে |
ছন্দা তো সবসময় শ্বশুরমশাইয়ের সেবাযত্ন নিয়ে ব্যস্ত |
মাইনে দিয়ে ড্রাইভার পোষারও ক্ষমতা নেই |
তাই ছন্দা আমাকে তাগিদ দিয়েছিল |
কিন্তু আপনি দেখছি, সত্যিই |
আপনার হাতে গাড়ির চাবি দেখতে পাচ্ছি |
যাই হোক, আর দেরি করবেন না |
রাস্তায় জল জমে যাচ্ছে |
ভট্টাচার্যমশাই উঠে দাঁড়ালেন |
আবার নমস্কার করে বললেন, ব্যাপারটা খুব গোলমেলে |
লোহার কপাট না ভাঙলে মন্দিরে চোর ঢোকা অসম্ভব |
দয়া করে যদি একবার পায়ের ধূলো দেন, ভালো হয় |
মোহনপুর প্যালেসের ঠিকানা আমি লিখে এনেছি |
ভাঁজ করা একটা কাগজ দিয়ে রাজবাড়ি পুরোহিত দ্রুত প্রস্থান করলেন |
দেখলাম, কর্নেল টেবিলের ড্রয়ার থেকে আতস কাচ বের করে ঠিকানাটা খুঁটিয়ে দেখছেন |
একটা ঠিকানা পড়ার জন্য আতস কাচ কেন দরকার হল বুঝতে পারলাম না |
উঠে গিয়ে জানলার পর্দা সরিয়ে নীচের রাস্তার অবস্থা দেখে এলাম |
বৃষ্টি সমানে ঝরছে |
তবে এখনও রাস্তায় বেশি জল জমেনি |
এখনই বেরিয়ে পড়তে পারলে অফিসে না ফিরে বরং ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাস হয়ে সল্টলেকে ফিরতে পারতাম |
কর্নেল আতস কাচ এবং ঠিকানাটা ড্রয়ারে রেখে বললেন, তুমি কী চিন্তা করছ, তা বুঝতে পারছি জয়ন্ত! কিন্তু তুমি ইলিয়ট রোড থেকে যদি বা বেরুতে পারো, মল্লিকবাজারের সামনে জ্যামে আটকে যাবে |
কারণ আমি দেখেছি, এই সময়টাতে ওখানে প্রতিদিন ট্রাফিক জ্যাম হয় |
এদিকে বৃষ্টি পড়লেই সব গাড়ি যেন বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠে |
এখন তুমি যদি শর্টকাটে যেতে চাও, তোমাকে ই এম বাইপাসে পৌঁছুতে দরগা রোড ধরতে হবে |
সেখানে ততক্ষণে একহাঁটু জলে |
তোমার পেট্রোল কার ফেঁসে যাবে |
কাজেই চুপটি করে বসো |
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.