content
stringlengths
0
129k
অগত্যা চুপটি করেই বসে রইলাম
কর্নেল ষষ্ঠীকে ডেকে আরেক পেয়ালা কফির হুকুম দিয়ে সেই গাব্দা বইটা টেনে নিলেন
এতক্ষণে লক্ষ্য করলাম, বইটার নাম দি মিসটিরিয়াস বাটারফ্লাই
আমার বৃদ্ধ বন্ধুর অবিশ্যি পাখি-প্রজাপতি-ক্যাক্টাস-অর্কিড এসব বিষয়ে প্রচণ্ড বাতিক আছে
কোথাও বাইরে গিয়ে বিরল প্রজাপতির খোঁজে দিনভর টো টো করে ঘোরেন
কিন্তু রহস্যময় প্রজাপতি ব্যাপারটা বুঝলাম না
কিছুক্ষণ পরে ষষ্ঠী কফি দিয়ে গেল এবং চোখ নাচিয়ে ফ্রায়েড রাইস-চিকেনের আভাসও দিল
কর্নেলের দৃষ্টি বইটার পাতায়
বৃষ্টি কখনও জোরে কখনও আস্তে প্রকৃতির অর্কেস্ট্রা শোনাচ্ছে
কফি খেতে খেতে হঠাৎ মোহনপুর রাজবাড়ির বিষ্ণুমূর্তির কথা মনে পড়ে গেল
আজকাল দামি রত্নের মূর্তি বলেও নয়, যে-কোনও মূর্তি প্রাচীন হলেই বিদেশে চড়া দামে পাচার হয়ে যায়
তবে এই মূর্তিটা নাকি নিরেট সোনার
যদি কোনও চোর সেটা হাতিয়ে থাকে, সোনা বেচেই সে বড়লোক হয়ে যাবে
কতক্ষণ পরে টেলিফোনের শব্দে আমার চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে গেল
কর্নেল বললেন, ফোনটা ধরো জয়ন্ত!
ফোন তুলে সাড়া দিতেই কেউ ধমক দিল, এই ব্যাটা বুড়ো ঘুঘু! মরণ ফাঁদ পাতা আছে
সাবধান!তার পরই লাইন কেটে গেল
ফোন রেখে কর্নেলের দিকে তাকালাম
আমার বুকটা ধড়াস করে কেঁপে উঠেছিল
তখনও কাঁপুনি থামেনি
কর্নেল মুখ তুলে একটু হেসে বললেন, কেউ হুমকি দিল তো? বাহ! খুব ভালো
হত্যাকাণ্ড এবং অদ্ভুত তালা
কর্নেল আমার মুখ দেখেই কীভাবে বুঝেছিলেন কেউ টেলিফোনে হুমকি দিল, তা জানি না
অবিশ্যি এমন হতেই পারে, আমার মুখে আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠেছিল
কিন্তু হুমকি দিলে সেটা কেন কর্নেলের কাছে খুব ভালো হয়
এইতে একটু অবাক হয়েছিলাম
উনি কি এমন হুমকির জন্য প্রতীক্ষা করছিলেন?
প্রশ্নটা বার দুই তুলে কোনও জবাব পাইনি
তবে আমার কপাল গুণে বৃষ্টিটা সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ থেমে গিয়েছিল
রাত নটায় জানালায় উঁকি মেরে দেখেছিলাম রাস্তায় জল প্রায় নেমে গেছে
তাই কর্নেলকে তাগিদ দিয়ে সকাল-সকাল ডিনার খেয়ে সল্টলেকে ফিরে গিয়েছিলাম
কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে কখনও রাত কাটাইনি এমন নয়
কিন্তু সমস্যা হল, সঙ্গে রাতের পোশাক না থাকলে ওই বিশালদেহী মানুষের রাতের পোশাক পরে শুতে হয়
সেটা আমার পক্ষে অস্বস্তিকর
তার পোশাকে আমার মতো আড়াইখানা লোক ঢুকে যেতে পারে
তা ছাড়াও ঘুম থেকে দেরি করে ওঠা আমার অভ্যাস
এদিকে ষষ্ঠীচরণ সাতটা বাজলেই আমাকে বেড-টি খাওয়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে
সকালে টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল! তখন সাড়ে সাতটা বাজে
বিরক্ত হয়ে টেলিফোন তুলে অভ্যাস মতো বললাম, রং নাম্বার!
রাইট নাম্বার ডার্লিং!
হেসে ফেললাম
প্লিজ কর্নেল! এই ডার্লিং বলাটা আপনি ছাড়ুন তো! লোকেরা এই নিয়ে
ডার্লিং! পুরনো বাংলা প্রবাদ আছে, কারও পৌষ মাস কারও সর্বনাশ
তোমার-মানে সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরির পৌষ মাসের খবর আছে
কিন্তু সর্বনাশটা কার হল?
মোহনপুর রাজমন্দিরের সেবাইতমশাইয়ের
আজ ভোরে রাজমন্দিরের দরজার সামনে তার ডেডবডি পাওয়া গেছে
শিগগির চলে এস
বলেই কর্নেল মত বদলালেন
আমাদের দমদম এরিয়ায় যেতে হবে
কাজেই তুমি বরং তৈরি হয়ে থাকো
আমি ট্যাক্সি করে তোমার কাছে যাচ্ছি
তারপর তোমাকে নিয়ে বেরুব
কর্নেলের ফোনের লাইন কেটে গেল
কিন্তু তখনও আমি ফোন ধরে বসে আছি
এ তো ভারি অদ্ভুত ঘটনা! ভট্টাচার্যৰ্মশাইকে কাল বিকেলে বৃষ্টির সময় জলজ্যান্ত দেখেছি
আর উনি এখন ডেডবডি হয়ে গেলেন! সোনার বিষ্ণুমূর্তি হাতিয়েও চোর ওঁকে প্রাণে মারল কেন? উনি কর্নেলের কাছে এসেছিলেন, শুধু
এটাই কি তাকে হত্যার কারণ হতে পারে?
এক রহস্যভেদীর সঙ্গদোষে আমিও দেখছি রহস্য নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি
আমার দরকার একটা জমকালো প্রতিবেদন, আজকাল সংবাদপত্রে পরিভাষার যাকে বলে ইনভেস্টিগেটিভ স্টোরি
বিছানা ছেড়ে বাথরুমে গেলাম
তারপর ব্যাপারটা মাথা থেকে মুছে ফেললাম
কর্নেল এলেন প্রায় সাড়ে আটটায়
বললেন, ই এম বাইপাসে দুর্ঘটনা লেগেই আছে
দুবার ট্যাক্সি বদল করতে হয়েছে
তুমি তৈরি তো?
তৈরি হয়েই ছিলাম
গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম
পথে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলাম, নরহরি ভট্টাচার্যের মার্ডার হওয়ার খবর কি আপনি পুলিসসূত্রে পেয়েছেন?
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, না
ছন্দা রায়চৌধুরী আমাকে সাতটা নাগাদ ফোনে জানিয়েছেন
তিনি আপনার ফোন নাম্বার কী ভাবে জানলেন?
গত রাতে ভটচাযমশাই ওঁকে আমার কাছে আসার কথা বলেছিলেন
আমার ঠিকানা-ফোন নাম্বারও তাকে দিয়েছিলেন
ভটচাযমশাই কাল তোমাদের পত্রিকা অফিস থেকেই আমার ঠিকানা যোগাড় করেন, তা তুমি শুনেছ
কিন্তু ফোন নাম্বার?
কর্নেল হাসলেন
আমি নিজে চোখে দেখে এসেছি, তোমাদের নিউজ ব্যুরোর চিফ অমরেশবাবুর টেবিলে কাচের তলায় আমার নেমকার্ড রাখা আছে
কাজেই ফোন নাম্বারের ব্যাপারে কোনও রহস্য নেই
ছন্দা আপনাকে ডিটেলস কিছু কি জানিয়েছেন?
এখন কোনও কথা নয়
গাড়ি ড্রাইভ করার সময় তুমি কথা বললে আমার ভয় হয়
বলে কর্নেল চুরুট ধরালেন
ই এম বাইপাস আর এই ভি আই রোড, দুটো রাস্তায় বিপজ্জনক
আস্তে চলল
অত তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই
গাড়ির গতি কমিয়ে বললাম, দমদম এলাকা আমার কাছে গোলকধাঁধা মনে হয়
আপনি মোহনপুর প্যালেসে কীভাবে পৌঁছুতে হবে জেনে নিয়েছেন তো?
ডার্লিং! মোহনপুর প্যালেসে আমি বছর পনের আগে বহুবার গেছি
কুমারবাহাদুর সত্যেন্দ্রনাথ আমার সুপরিচিত এবং বন্ধুস্থানীয় মানুষ
উনি আমার মতোই প্রকৃতিপ্রেমী
বিহারের মোহনপুরে ওঁর ঠাকুর্দার জমিদারি মহল ছিল
সেই বাড়িতেও একবার গিয়েছিলাম
কিন্তু ভটচাযমশাইকে তো কাল আপনি এসব কথা কিছুই বললেন না?
গাড়ি চালানোর সময় কথা নয়
আমার মনে হচ্ছে, এই ধরনের রাস্তায় গাড়ি আস্তে চালানোই বিপজ্জনক
তোমার খুশিমতো ড্রাইভ করো!
আমার এই বৃদ্ধ বন্ধুর এ ধরনের খেয়ালের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে
এই রকম মানুষকেই সম্ভবত আনপ্রেডিক্টেব ম্যান বলা হয়
ওঁর নির্দেশমতো গোলকধাঁধার ভেতর ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে যখন মোহনপুর প্যালেসে পৌঁছুলাম, তখন খুবই হতাশ হয়ে গেলাম