content
stringlengths
0
129k
একটা এঁদো পুকুরের ধারে জরাজীর্ণ দোতলা বাড়ি
অবিশ্যি একটা ফটক আছে
ফটকে আটকানো মার্বেল ফলকটা পড়া যায় না
ফটক হাট করে খোলা
ভেতরটা জঙ্গল হয়ে আছে
সংকীর্ণ রাস্তায় কোন আমলে পাথরের ইট বসানো হয়েছিল
এখন খানাখন্দে হতশ্রী হয়ে গেছে
বাউন্ডারি ওয়াল মুখ থুবড়ে পড়েছে
সাবধানে এগিয়ে পোর্টিকোর তলায় গাড়ি দাঁড় করালাম
পোর্টিকোর যা অবস্থা, ভয় হচ্ছিল যে-কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়বে যেন
সামনে একটা অ্যাজবেস্টস চাপানো চালাঘরে একটা কালো অ্যামবাসাডার গাড়ি দেখে বুঝলাম, ওই গাড়ি চালিয়েই কাল বিকেলে ভটচাৰ্মশাই কর্নেলের বাড়ি গিয়েছিলেন
এবং ওটাই গাড়িটার গ্যারাজ ঘর
সিঁড়ির মাথায় একটুকরো বারান্দা
সেখানে এক ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়েছিলেন
পরনে ছাইরঙা সাধারণ তাঁতের শাড়ি
মহিলাদের বয়স আঁচ করার সাধ্য আমার নেই
তবে মনে হল, এঁর বয়স তিরিশের কাছাকাছি
মুখে তীক্ষ্ণ লাবণ্য এবং ব্যক্তিত্ব আছে
আমরা নামলে তিনি নমস্কার করে মৃদুস্বরে কর্নেলকে বললেন, আপনার অনেক গল্প আমি শ্বশুর মশাইয়ের কাছে শুনেছি
আপনাকে দেখে সাহস পেলাম
কর্নেল বললেন, পুলিশ কি বডি নিয়ে চলে গেছে?
একঘন্টা আগে
পুলিসের মতে ব্যক্তিগত শত্রুতা! কারণ ভটচাঙ্কাকুর সঙ্গে নাকি পাড়ার লোকেদের সদ্ভাব ছিল না
আমি কিছু বুঝতে পারছি না
তবে কিছু লোক খানিকটা জমি জবরদখল করতে চেয়েছিল
উনি বিরোধী পক্ষের কিছু লোক নিয়ে তাদের বাধা দিয়েছিলেন
কোনও ভিড় দেখলাম না কোথাও
কর্নেল সিঁড়িতে উঠতে উঠতে বললেন
একটা খুনোখুনি হলে আজকাল লোকেরা জটলা করে
কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, যেন কিছুই ঘটেনি
ছন্দা বললেন, গেটের কাছে জটলা হচ্ছিল
পুলিস বডি নিয়ে যাওয়ার পর জটলা ভেঙে গেল
আসলে খুনোখুনি আজকাল লোকের যেন গা সওয়া হয়ে গেছে
হলঘরে সেকেলে কিছু আসবাব আর দেয়ালে পেন্টিং সাজানো আছে
সবই বিবর্ণ এবং জীর্ণ
হলঘরের একধারে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি
কর্নেল বললেন, ভটচাযমশাইয়ের ফ্যামিলি কোথায় থাকে?
ওঁর কোনও ফ্যামিলি ছিল না
বিয়ে করেননি
আমাদের ফ্যামিলির মানুষ হিসেবেই ছিলেন
বাজার করা, রান্নাবান্না সবই উনি করতেন
আমাকে সংসারের কোনও কাজে হাত লাগাতে দিতেন না
তাই-ছন্দা অশ্রু সম্বরণ করে বললেন, কাজের লোক রাখতে দেননি
এমন কি আমার মেয়ে টিনিকেও উনি রোজ গাড়িতে করে স্কুলে পৌঁছে দিতেন
আবার স্কুল থেকে নিয়েও আসতেন
আমি আসছি এ কথা কি আপনার শ্বশুরমশাইকে বলেছেন?
সিঁড়িতে ছন্দা হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন
বললেন, উনি অসুস্থ মানুষ
ওঁকে কিছু বলিনি এখনও
পুলিসকেও ওঁকে ডিসটার্ব করতে নিষেধ করেছিলাম
উনি কি এখনও জানেন না ভটচাযমশাই খুন হয়েছেন?
ছন্দা আস্তে বললেন, না, ওঁর সারারাত ঘুম হয় না
শেষ রাতে ঘুমোন
বেলা এগারোটার আগে ঘুম ভাঙে না
ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন
ওঁকে খাওয়ানো যায়নি
কোনও ওষুধই উনি খান না
আসলে শ্বশুরমশাই খুব আত্মবিশ্বাসী মানুষ
উনি বলেন, ওঁর অসুখ মনের জোরেই সেরে যাবে
কর্নেল একটু ইতস্তত করে বললেন, তা হলে কুমার বাহাদুর ঘুম থেকে না
জাগা অব্দি আমরা ওপরে যাচ্ছি না
বরং ততক্ষণ আমাদের মন্দিরে নিয়ে চলুন
আগে অন্তত এক কাপ কফি
আগে ঘটনাস্থল দেখা দরকার
সিঁড়ি থেকে নেমে ছন্দা হলঘরের অন্যদিকে একটা দরজার তালা খুললেন
বললেন, এই দরজার ডুপ্লিকেট চাবি ভটচার্য কাকুর কাছে থাকত
উনি খুব ভোরে স্নান করে এই দরজা খুলে মন্দিরে পুজো করতে যেতেন
একটা সংকীর্ণ করিডরের পর আবার একটা সিঁড়ি এবং নীচে একটুকরো উঠোনের প্রান্তে ছোট্ট একটা মন্দির দেখতে পেলাম
উঠোন ঘেরা উঁচু পাঁচিলটার অবস্থাও জরাজীর্ণ
মন্দিরের পাশে একটা দরজা দেখিয়ে ছন্দা বললেন, ওদিকে একটা পুকুর আছে
তবে বহুবছর ওই দরজাটা আমরা খুলি না
এই দেখুন! এখানে ভটচার্য্য কাকুর ডেডবডি পড়ে ছিল
মন্দিরের সামনে একটুকরো খোলা বারান্দা
পুরোটাই মার্বেল পাথরে বাঁধানেনা
বারান্দার ওঠার জন্য মাত্র একটা ধাপ আছে
সেটা অবশ্য সিমেন্টের
কর্নেল বারান্দায় নীচে গিয়ে বললেন, বারান্দা কি ধোয়া হয়েছে?
পুলিস ধুয়ে দিতে বলে গেল
একটুখানি রক্ত ছিল
তাই ধুয়ে দিয়েছি
বডি তো আপনিই দেখতে পেয়েছিলেন?
তখন প্রায় ছটা বাজে
এখানে প্রচণ্ড মশা
তাই মশারি খাটাতে হয়
তার ওপর শেষ রাত থেকে লোডশেডিং ছিল
মশারি থেকে বেরিয়েছে, তখন কারেন্ট এল
তারপর জানালা দিয়ে তাকিয়ে চমকে উঠলাম
ভটচার্য কাকু উপুড় হয়ে মন্দিরের দরজার সামনে পড়ে আছেন
প্রথমে বুঝতে পারিনি কী হয়েছে
তক্ষুনি এখানে চলে এলাম
এসে দেখি, মাথার পেছনে চাপ-চাপ রক্ত
তখনও ওঁর পা দুটো নড়ছিল
তাই ওঁকে ধরে চিত করতে গেলাম
উনি অতিকষ্টে শুধু বললেন, বীরু! তারপর ওঁর শরীর স্থির হয়ে গেল
কী বললেন? বীরু-
কিন্তু বীরু -
ছন্দা শ্বাস ছেড়ে বললেন, আমার স্বামীর এক কলিগ ছিলেন
তাঁর নাম বীরেশ্বর সেন
আমার স্বামীর সঙ্গে এ বাড়িতে তিনি আসতেন
তাকে ও বীরু বলে ডাকত